উপমন্যু রায়
ব্রাজিল মানে ফুটবলের দেশ।
ফুটবলে অনেক বার বিশ্বকাপ জিতেছে বলেই নয়; পেলে থেকে গ্যারিঞ্চা, জিয়ারজিনহো, ডিডি, টোস্টাও, গার্সন অথবা জিকো, সক্রেটিস, ক্যারেকা, রোমারিও, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো বা নেইমারের মতো বিখ্যাত ফুটবলারদের জন্যই নয়; মারাকানা স্টেডিয়াম সেদেশে আছে বলেই নয়; ফুটবল আছে এই দেশটির মানুষের রক্তে।
বলা হয়ে থাকে, শিশু বয়সেই এ দেশের ছেলেদের পায়ে বল তুলে দেন বাবা-মায়েরা। যাঁদের বল কেনার সামর্থ্য নেই, তাঁরা কাগজের দলাকে গোল্লা পাকিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে বল বানিয়ে দেন সন্তানদের পায়ে। এমনই রীতি রয়েছে যে-দেশে, সেই দেশকে ফুটবলের দেশ বলাটা বোধ হয় ভুল কিছু নয়।
শুধুই ফুটবল? না, আরও আছে। যেমন রহস্যময় আমাজন অববাহিকা। বিখ্যাত আমাজনের জঙ্গলের বিস্তীর্ণ এলাকা তো ব্রাজিলের বিশাল অংশ জুড়েই রয়েছে। যে আমাজনে ভয়ংকর হিংস্র সব প্রাণীরা প্রতি মুহূর্তে দাপিয়ে বেড়ায়, যে আমাজন আবার ভয়ংকর অ্যানাকোণ্ডা সাপের বাসস্থান বলে, সেই আমাজনই ব্রাজিলকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
আর রয়েছে আমাজন নদী। ব্রাজিলের অহংকার। দক্ষিণ আমেরিকার এই দীর্ঘতম নদীটির একটি বড়ো অংশই গিয়েছে ব্রাজিলের উপর দিয়ে।
এই হল ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার একটি দেশ। যে-দেশের জনজীবনে একটা বেপরোয়া ভাব আছে। দুর্নীতিগ্রস্ত থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোশহীন সব ধরনের মানুষের মধ্যেই সেই বেপরোয়া ভাব দেখা যায়। সেই বেপরোয়া মনোভাব মদ ও নারী নিয়ে পুরুষের উল্লাসেও মিশে থাকে।
দেশটির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশে রয়েছে অতলান্তিক মহাসাগর। তাই দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত যেমন ব্রাজিলীয়দের আমোদপ্রমোদ ও রৌদ্রস্নানের সুযোগ করে দিয়েছে, সেইরকমই এই সমুদ্র উপকূল ঘিরে বহু অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে চলে পুলিশ ও প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
আর আছে সাম্বা। এই নাচ পৃথিবীতে ব্রাজিলের প্রতীক ও ব্রাজিলীয় উৎসবের স্বীকৃতি পেয়েছে। যদিও এই নাচের উৎপত্তি পশ্চিম আফ্রিকার দাস ব্যাবসা ও ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকেই। তারপর তার বিকাশ ঘটেছে ব্রাজিলের বাহাই ও রিও ডি জেনেইরোয়।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সাম্বা নাচ ব্রাজিলের গান ও নৃত্যকলার একটি কলা বলে গণ্য হয়। সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আবেগসম্পন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সাম্বা এখন ব্রাজিলের জাতীয় পরিচয় বহন করে।
২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাহাইয়ের সাম্বা ডি রোডাকে মানবধর্মী হেরিটেজের মর্যাদা দেয়। রিও ডি জেনেইরোতে সাম্বা কারিওকা অসম্ভব জনপ্রিয়। সেখানে ব্রাজিলীয়রা সম্মিলিতভাবে এই নাচ পরিবেশন করে থাকে।
সেই ব্রাজিলে যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে, তেমনই রয়েছে কিছু মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাও। যে ধ্যানধারণা দেশটির একটা বিশাল অংশের মানুষকে সংস্কারাচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেই সংস্কার ধর্ম থেকে ভৌতিক বিশ্বাস, সবক্ষেত্রেই জড়িয়ে রয়েছে। কখনো কখনো এই সংস্কারই বহু ব্রাজিলীয়কে কুসংস্কারে নিয়ে গিয়েছে, যা কোনো সমাজের পক্ষেই শুভ নয়।
কুসংস্কার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তবে ব্রাজিলীয়দের ভৌতিক বিশ্বাসের কিছু কিছু ক্ষেত্রকে অনেক প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞই অবান্তর বলে উড়িয়ে দিতে পারেননি। সেগুলি নিয়ে আজও আলোচনা চলে সেদেশে।
ব্রাজিলীয়দের সেই ভৌতিক বিশ্বাসের সূত্র ধরেই এসে যায় কিছু এলাকা বা অট্টালিকা, প্রাসাদের কথা; যেগুলির মধ্যে অস্বাভাবিক কোনো শক্তির উপস্থিতি রয়েছে বলে অনেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। ব্রাজিলের তেমনই কয়েকটি অঞ্চল, প্রাসাদ বা বাড়ি নিয়ে এখানে আলোচনা করা যাক।
জোয়েলমা বিল্ডিং
এই বহুতলটি রয়েছে সাও পাওলোতে। ঠিকানা অ্যাভেনিডা ৯ ডি জুলহো, ২২৫। তৈরি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এই বহুতলটিতে অতিপ্রাকৃত ঘটনার বহু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি। সেই প্রমাণের কথা শুনলে অনেক সাহসী ব্যক্তিরই শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।
১৯৭৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে আটটায় এই পঁচিশ-তলা উঁচু বাড়িটিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুন লাগার কারণ হিসেবে এয়ার কন্ডিশণ্ড মেশিনের ত্রুটির কথা বলা হয়ে থাকে। বহুতলটির বারোতলায় এসি মেশিন গরম হয়ে আগুন লাগে। আগুন লাগার পর বহুতলটি ভয়ানক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে ওই এলাকা জুড়ে তীব্র আতঙ্ক দেখা দেয়।
আগুন লাগার সময় বহুতলের ভিতরে ছিলেন সাত-শো ছাপান্ন জন মানুষ। সেই সময় পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, বেআইনিভাবেই ওই বহুতল দাহ্যবস্তুতে ঠাসা ছিল। তা ছাড়া বহুতলের প্রতিটি ঘরেই ছিল ডেস্ক, চেয়ার। এ ছাড়া বাড়ির ছাদ, মেঝে, অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশন কাঠ দিয়ে করা হয়েছিল। তাই আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বঁাচার জন্য বহুতলটির ভিতরে মানুষের হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কিন্তু আগুনের ব্যাপকতা বহু মানুষের বঁাচার প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে দেয়। ওই ভয়ংকর আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান প্রায় দু-শো মানুষ।
বহুতল থেকে তখন নামার একমাত্র পথ ছিল সিঁড়িই। দমকল বাহিনী এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। খুব দ্রুত তারা লিফট ব্যবহার করে ভিতরে আটকে থাকা মানুষকে বের করে আনে। এভাবে তিন-শো-র মতো মানুষের প্রাণ-বঁাচানো সম্ভব হয়।
এরপর বাড়িটি পুনর্গঠন শুরু হয়। সেইজন্য চার বছর বাড়িটি বন্ধ ছিল। পুনর্নির্মাণের পর বহুতলটির নতুন নাম দেওয়া হয় ‘প্রাসা ডা বানডেরিয়া’। জোয়েলমা বিল্ডিঙে অগ্নিকান্ড শুধু ব্রাজিলই নয়, সেই সময় সারা পৃথিবীতেই আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল।
নতুন বিল্ডিং তৈরি হওয়ার পরই ওই বহুতলে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করে। যাঁরা ওই বহুতলে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাঁদের অনেকেই দাবি করেন, বহুতলের বড়ো বড়ো হল ঘর এবং অফিসগুলি এখন নাকি বহু অস্বাভাবিক শক্তির বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এর প্রমাণও তাঁরা বহু বার পেয়েছেন। তাই ওই বহুতলে গিয়ে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করে থাকেন।
জোয়েল মা বিল্ডিং নিয়ে যেসব ঘটনার কথা শোনা যায় তার একটি হল—আগুন লাগার পর বহুতল থেকে লিফটে নীচে নামার জন্য সকলে হুড়োহুড়ি শুরু করে, তাতে সকলের পক্ষে লিফটে নীচে নামা সম্ভব হয়নি।
তেরো জন লিফটে আটকা পড়ে যান। মর্মান্তিক পরিণতি হয় তাঁদের। ওই তেরো জনই লিফটের মধ্যে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। পুড়ে যাওয়ার পর তাঁদের দেহগুলির অবস্থা এমন হয়েছিল যে তাঁদের শনাক্তই করা সম্ভব হয়নি।
এই বহুতলে নিয়মিত যাঁরা যাতায়াত করেন তাঁরা বলেন, প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি (আগুন লাগার দিন) ওই তেরো জনের অতৃপ্ত আত্মা বেপরোয়া হয়ে ওঠে বহুতলে। তাদের অতি সক্রিয়তা দেখা যায় লিফটগুলিতেই। তাদের চলাফেরা, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ, হাহাকার তীব্র হয়ে ওঠে ১ ফেব্রুয়ারির রাতে।
এ ছাড়া প্রতিদিন রাতেই ওই বহুতলে নাকি অতিপ্রাকৃত শক্তির উপস্থিতি অনেকেই টের পেয়েছেন। তাই রাতে ওই বহুতলে কেউই থাকতে চান না।
ব্রাসিলিয়া সিটি হল
নাম থেকেই স্পষ্ট হলটি রয়েছে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায়। এই হলেও নাকি অস্বাভাবিক শক্তির উপস্থিতি রয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, ওই হলে নাকি এক ভয়ংকর শক্তি আছে। যখন কেউ অফিসে থাকে না, তখন ওই শক্তির কার্যকলাপ মারাত্মক বেড়ে যায়। কয়েক জন বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সেখানে রাতে গিয়েছিলেন। তাঁরাও সেখানে গিয়ে নাকি অস্বাভাবিক কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করে এসেছেন। এখন কেউই সেখানে রাতে থাকতে বা যেতে চান না।
অনেকেই বলেছেন, এই হলের বিভিন্ন ঘরের দরজা আপনা-আপনিই খোলে বা বন্ধ হয়। আলমারিগুলিও সশব্দে কখনো কখনো খুলে যায়, আবার বন্ধও হয়ে যায়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে সেখানে দেখা যায় না।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হল কাউকে সেখানে দেখা না গেলেও টেবিলের ফাইলপত্রগুলি নিজে থেকেই নাকি সেখানে স্থান পরিবর্তন করে।
একবার হলের মধ্যেকার একটি অফিসের এক কর্মী রাতে সেখানে ছিলেন। ওই কর্মীর সাহস ছিল ভয়ংকর। গভীর রাতে তিনি দেখেন, তাঁর ঘরের দরজা কেউ যেন বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয়, দরজাটি তালাবন্ধও করে দেওয়া হয়। কিন্তু কে করল এই কাজ?
এর জবাব ওই কর্মীর কাছে ছিল না। কারণ তখন সেখানে কেউই ছিলেন না। ওই ঘটনায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিল না।
এলাকার মানুষের বক্তব্য ছিল, ওই ঘটনার কারণটা বোঝা কঠিন নয়। যেমন তাঁরা জানিয়েছেন, ওই হলটি আগে হল ছিল না। সেটি ছিল আসলে একটি মর্গ। অপঘাতে মৃত্যু হওয়া অসংখ্য মানুষের দেহ সেখানে রাখা থাকত। তাই বহু অতৃপ্ত আত্মার বিচরণক্ষেত্র হয়ে ওঠে ব্রাসিলিয়ার ওই সিটি হল।
এ ছাড়া ওই সিটি হল আগুনেও পুড়েছে। শোনা যায়, হলটির একটি দিক একবার পুড়ে গেলে সেখানকার কর্মীদের কয়েক জন পুড়ে মারা যান। তাঁদের প্রেতও নাকি রাতে সিটি হলে নিজেদের প্রভাবের প্রমাণ দেয়।
ইতানহায়েম— দ্য ড্রিম বিচ
দ্য ড্রিম বিচ ইতানহায়েমের অবস্থান সাওপাওলোতে। অনেকে বলেন, এক অল্পবয়সি কাপলের অকালমৃত্যু এই বিচটিকে রহস্যময় করে রেখেছে। একটি দুর্ঘটনায় সেখানে মৃত্যু হয়েছিল ওই যুগলের।
যদিও ওই প্রেমিক যুগলের মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছিল, তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। সেখানকার কেউ পরিষ্কার করে এ বিষয়ে বলতেও পারেননি। অনেকে মনে করেন, তাদের মৃত্যু হয়েছিল জলে ডুবে।
তাঁদের ধারণা, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে তারা ভেসে গিয়েছিল। তারপর তাদের মাথার সঙ্গে সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকা পাথরের আঘাত লাগে। আর তাতেই যুগলের প্রাণ যায়।
তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কেউই কিছু বলতে পারেন না। আর তাই সেই প্রেমিক-প্রেমিকার পরিণতি কী হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও অনেক ব্রাজিলীয়র মনে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা বা বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু কেউই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাননি।
এই বিষয়টি নিয়ে এখনও অনেক কথা শোনা যায়। সেই সব কথা কেউ বিশ্বাস করেন, আবার কেউ করেন না। কিন্তু প্রণয়ী যুগলের মৃত্যু যে সেখানে হয়েছিল, তাতে দ্বিমত নেই কারও। তাই কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছিল, সেই বিতর্ক এখনও অমীমাংসিত থেকে গিয়েছে।
ঘটনা হল, মৃত্যু যেভাবেই হোক-না কেন, ওই জায়গায় এখনও নাকি যুগলের উপস্থিতি রয়েছে। আর তা নিয়ে সেখানকার অধিকাংশ মানুষই সহমত। ওই দুই প্রেমিক-প্রেমিকা নাকি সমুদ্রের ধারে বিচ ধরে এখনও নিয়মিত হেঁটে যায়। সন্দেহ নেই রীতিমতো রোমহর্ষক ঘটনা এটি।
সাধারণ দৃষ্টিতে কেউই তাঁদের দেখে কোনো সন্দেহ করবেন না। তবে, যাঁরা ওই প্রেমিক-প্রেমিকাকে জানতেন, তাঁরা বুঝতে পারেন, সেই যুগল আসলে মানুষ নয়! আর যাঁরা যুগলকে জানেন না, তাঁরা দেখে মনে করবেন, সত্যিই বুঝি কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা বিচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
তবে বিচ ধরে হেঁটে যাওয়া সেই প্রেমিক ও প্রেমিকার দিকে ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে, সাধারণ মানুষের চেয়ে তাদের চলাফেরার ধরন নাকি ভিন্ন। বিষয়টি নিয়ে চর্চাও কম হয়নি। ইতানহায়েমের নিকটবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশেরই কিন্তু বিশ্বাস, ওই প্রণয়ী যুগলের অতৃপ্ত আত্মাই এখনও দ্য ড্রিম বিচে ঘুরে বেড়ায়।
সেখানে আবার এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, তাঁরা সেখানে ওই যুগলকে তীব্র চিৎকার করতে দেখেছেন। আর তার সাক্ষী বলে নিজেদের দাবি করেছেন। কোনো কোনো দিন মাঝ রাতে যখন সেখানে কেউ থাকে না, তখন নাকি ওই প্রেমিক যুগল চিৎকার করে কারও কাছে যেন সাহায্য চায়! অনেক দূর থেকে সেই চিৎকার শোনা যায়!
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, সমুদ্রের বিচ ধরে যে প্রেমিক যুগল হেঁটে যায় বা কখনো কখনো তারা চিৎকার করে, তারা কি বাস্তবিকই অতৃপ্ত আত্মা?
অনেকে নিশ্চিত, তারা আত্মাই। যেহেতু অপঘাতে মারা গিয়েছে, মারা যাওয়ার আগে তারা একটা রোমান্টিক সময় কাটাচ্ছিল, তাদের চোখে ছিল সুন্দর একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন, তাই মৃত্যুর পরও তাদের আত্মা অতৃপ্ত থেকে গিয়েছে। তাই তারা মারা গিয়েছে কিন্তু বিচ ছেড়ে যেতে পারছে না!
পেট্রোপোলিস মিউজিয়াম, রিও ডি জেনেইরো
অত্যন্ত বিখ্যাত মিউজিয়াম এটি। রিও ডি জেনেইরোর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্র বলা হয়ে থাকে ব্রাজিলের এই দ্য ইম্পেরিয়াল মিউজিয়ামকে।
পেট্রোপোলিসের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মিউজিয়ামটি। তৈরি হয় ১৮৪৫ সালে। সম্রাট দ্বিতীয় ডোম পেড্রোর অত্যাশ্চর্য গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদেই এই মিউজিয়ামটি গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া সেখানে রয়েছে একটি সাময়িক এগজিবিশন হলও।
সেখানে তুলনামূলক শিল্প প্রদর্শনী হয়ে থাকে। গোটা ব্রাজিলে যেসব মিউজিয়ামে সবথেকে বেশি আগ্রহী দর্শক গিয়ে ভিড় করেন, সেগুলির মধ্যে এই ইম্পেরিয়াল মিউজিয়ামটি একটি।
মিউজিয়ামটি সকালে এগারোটায় সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। খোলা থাকে সন্ধ্যা ছ-টা পর্যন্ত। তারপর মিউজিয়াম পুরো বন্ধ হয়ে যায়। তখন জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে এই স্থান। তখন থেকেই মিউজিয়ামটি রহস্যময় হয়ে ওঠে। এমনকী, বিভিন্ন সময় নাকি নানা ধরনের ঘটনাও ঘটে।
এই মিউজিয়াম নিয়েও অনেক কথা শোনা যায়। যেমন বলা হয়ে থাকে সেই কোন কালে মারা গিয়েছেন সম্রাট পেড্রো, কিন্তু এখনও তিনি তাঁর এই প্রিয় প্রাসাদটির মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেননি। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে তিনি এই প্রাসাদেই থাকতেন। তাঁর আমোদপ্রমোদ-সহ বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত তিনি এই প্রাসাদেই নিতেন।
তাই এখনও প্রাসাদ ছেড়ে যেতে পারেননি তিনি। কোনো কোনো রাতে তাঁর অস্পষ্ট অবয়ব প্রাসাদের বাগানে দেখা যায়। অনেকেই নাকি তাঁকে প্রাসাদের বাগানে দেখেছেন। সেখানে ওই সম্রাট ঘুরে বেড়ান। তখন তাঁকে খুব চঞ্চল মনে হয়। উত্তেজিতভাবে তিনি সেখানে পায়চারি করেন। হাঁটতে হাঁটতে কখনো তিনি চলে আসেন মিউজিয়ামের ভিতরেও।
সাধারণত সন্ধেয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মিউজিয়ামে কেউ যান না। কিন্তু প্রয়োজনে কখনো কখনো কাউকে বাধ্য হয়ে সেখানে যেতে হয়েছে। তাঁদের অনেকেই তখন তাঁদের অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, মিউজিয়ামের ভিতরে অনেক অস্পষ্ট মূর্তি তাঁরা দেখেছেন। তবে সেই মূর্তি যে সম্রাট পেড্রোর নয় সেকথা জানাতে ভোলেননি তাঁরা। এখন প্রশ্ন হল, তাঁরা কারা? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি আজও।
রিও ডি জেনেইরো-ক্যাম্পোজ, ভিক্টোরিয়ার দিকে গিয়েছে যে রাস্তা
এই রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে বহু ট্রাক ড্রাইভারেরই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলার সময় বার বার তাঁরা শিউরে উঠেছেন। কিন্তু কেউই সেই অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
রাস্তাটি রিও ডি জেনেইরোতে। গিয়েছে ভিক্টোরিয়ার দিকে। রাস্তাটি আসলে একটি হাইওয়ে। যাঁরা লং ড্রাইভে যান তাঁরা অনেকেই এই রাস্তাটি ব্যবহার করে থাকেন। এই রাস্তা দিয়েই দ্রুত গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে যান সকলে।
তবে প্রাইভেট ছোটো গাড়িগুলি রাতের দিকে এই রাস্তা ব্যবহার করে না। মনে করা হয়, তারা ড্রাইভারদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানে। তাই হয়তো রাতে ছোটো প্রাইভেট গাড়িগুলি এই রাস্তা এড়িয়ে যায়।
ড্রাইভাররা জানিয়েছেন, ট্রাক নিয়ে তাঁরা ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পান একদল মানুষ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। দেখে তাদের মনে হবে তারা সম্ভবত রাস্তা পার হবে, সেইজন্যই সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
পথচারীরা যাতে রাস্তা পার হয়ে যেতে পারে সেইজন্য ব্রেক কষে ড্রাইভাররা ট্রাক থামিয়ে দেন। কিন্তু ট্রাক থামিয়েই চমকে উঠেছেন ড্রাইভাররা। যাদের সহজে রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ করে দিতে তাঁরা ট্রাক থামিয়েছেন, সেই মানুষগুলো নিমেষের মধ্যে সেখান থেকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে।
যাঁরা সেই রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে ট্রাক নিয়ে যান, তাঁদের অধিকাংশেরই একইরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। যাঁরা অত্যধিক সাহসী, তাঁরা ট্রাক থেকে নেমে রাস্তার চারপাশে খুঁজেছেন তাদের, কিন্তু তাদের কাউকেই তাঁরা খুঁজে পাননি।
তাই তাঁরা কেউই ভেবে পাননি, রাস্তা পার হওয়ার জন্য যারা সেখানে এসেছিল তারা মুহূর্তে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল!
এরপরই প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। তাঁরা তথ্য ঘাঁটতে শুরু করলে উঠে আসে মর্মান্তিক একটি ঘটনার কথা। সেই তথ্য হয়তো অনেকেরই বিস্মৃতিতে চাপা পড়ে গিয়েছিল। তথ্যে দেখা গেল, এই রাস্তায় যখন সংস্কারের কাজ চলছিল, তখন একটি ভয়ংকর দুর্ঘটনায় সেখানে বেশ কয়েক জন নির্মাণ শ্রমিক প্রাণ হারান। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭০ সালে।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সেই নির্মাণ শ্রমিকদের অতৃপ্ত আত্মাই ওই রাস্তায় ঘোরাফেরা করে। গভীর রাতে ওই রাস্তা দিয়ে যেসব গাড়ি যায়, সেই গাড়িগুলিকে দাঁড় করিয়ে দেয় এভাবেই।
গভীর রাতে ওই রাস্তা দিয়ে সাধারণত ট্রাকই চলাচল করে। তাই ট্রাক ড্রাইভাররাই সাধারণত এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়ে থাকেন বেশি।
রিও ডি জেনেইরো থেকে যে রাস্তা পেট্রোপোলিসে গিয়েছে
রিও ডি জেনেইরো থেকে অপর যে রাস্তাটি পেট্রোপোলিস পর্যন্ত প্রসারিত, সেই রাস্তাটি নিয়েও অনেক ঘটনার কথা শোনা যায়। সেই রাস্তায় বহু ভৌতিক কার্যকলাপ ঘটে থাকে বলে দাবি করেছেন অনেকে। এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শী বহু সাক্ষীও রয়েছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা ওই ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন এই রাস্তায়। কিন্তু তাঁরা কী দেখেছিলেন সেই রাস্তায়?
সেই রাস্তায় এক সোনালি চুলের অসহায় নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার চোখের দৃষ্টিতে থাকে গভীর উদবেগ। সেই নারী দুই হাত আকাশের দিকে তুলে ধরে নাড়াতে নাড়াতে লাফাতে থাকে।
আসলে সেই রাস্তা দিয়ে যেসব গাড়ি যায় সেই গাড়িগুলির ড্রাইভারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই সেওইরকম করে। হাইওয়েতে কেউ বিপদে পড়লে এভাবেই গাড়িগুলির কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে থাকে।
সোনালি চুলের সেই নারীকে ওই অবস্থায় দেখে বেশিরভাগ গাড়ির ড্রাইভারই মনে করেন, হয়তো তার গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছে। তাই সেএভাবে সাহায্য চাইছে। এসব ভেবেই ড্রাইভাররা গাড়ি থামান।
তারপর তাঁরা যখন কী হয়েছে জানতে চান, তখন সেই নারীটি জবাব দেয়, কেউ একজন রাস্তার ধারে নীচে পড়ে গিয়েছে। সেসাহায্য চাইছে।
শুধু তাই নয়, সেই সোনালি চুলের নারীটি হাত তুলে একটি দিকে নির্দেশ করে কিছু দেখায়। তার নির্দেশমতো ড্রাইভাররা দেখেন সেখানে একটি গাড়ি ভেঙেচুরে পড়ে রয়েছে। গাড়িটির পাশে একজন পড়ে রয়েছে। তার কথামতো ড্রাইভাররা সেই গাড়ির দিকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে যান।
কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে তাঁরা চমকে ওঠেন। দেখেন, সত্যিই একটি গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। পাশে কেউ একজন পড়ে রয়েছে। গাড়ির কাছে গিয়ে ড্রাইভাররা আঁতকে ওঠেন। দেখেন, যে মেয়েটি তাঁদের কাছে সাহায্য চেয়েছে, সেই সোনালি চুলের মেয়েটিই মাটিতে পড়ে রয়েছে।
কিন্তু এটা কী করে সম্ভব?
তবে, সেই ড্রাইভারদের চমকের আরও কিছু ছিল সেখানে। কারণ তারপর তাঁরা রাস্তার দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যান। সোনালি চুলের সেই নারীটিকে তাঁরা আর দেখতে পাননি। বোঝাই যাচ্ছে, কেউ যদি এমন ঘটনার সম্মুখীন হন তাহলে তাঁর মানসিক অবস্থা কী হতে পারে! সেখান থেকে পালিয়ে আসাই তখন তাঁদের কাছে কঠিন হয়ে ওঠে।
তবে কোনো কোনো ড্রাইভার এই বিষয়ে আরও কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। যেমন অনেকে সাহস করে রাস্তায় উঠে এসেছেন। মনে সাহসসঞ্চয় করে সেই সোনালি চুলের নারীটির মুখোমুখি হওয়ার জন্য এগিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা সবিস্ময়ে দেখেছেন, মেয়েটি রাস্তায় রয়েছে, তবে তার শরীর ক্রমশ অস্পষ্ট হতে হতে শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।
তখন সেই ড্রাইভার ফের পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখেছেন রাস্তার ধারে নীচের দিকে। কিন্তু ড্রাইভার অবাক হয়ে দেখেছেন, সেই গাড়ি এবং আহত নারীটিও পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছে। কেউ কোথাও নেই। সেখানে সেই ড্রাইভার একাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
না, এটা কোনো গল্পকথা নয়। এমন ঘটনা নাকি গভীর রাতের দিকে ওই রাস্তায় ঘটে থাকে। বহু গাড়ির ড্রাইভারই এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন সেখানে। সবাই যে ভুল দেখবেন সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
তা ছাড়া বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে অনেক তথ্যপ্রমাণও নাকি অনেকে সংগ্রহ করেছেন। তাঁরা জেনেছেন, পথদুর্ঘটনায় এভাবেই নাকি সোনালি চুলের এক নারী মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান।
তারপর থেকে সেই নারীর আত্মা নাকি ওই রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আর, সেখান দিয়ে কোনো গাড়িকে আসতে দেখলে এভাবেই নাকি সাহায্য চায়!
মাইনাস গেরাইস, কাম্বুকুইরা, দ্য গ্র্যাণ্ড হোটেল
সেটা ২০০৯ সালের ঘটনা। ওই বছর এই হোটেলে অভিযান চালায় ঘোস্ট হন্টার্স ইন্টারন্যাশনাল। সেই অভিযানে তাদের কাছে উঠে আসে বেশ কয়েকটি রোমাঞ্চকর তথ্য। সেই তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করে ঘোস্ট হন্টার্স ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, ওই হোটেলে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে।
গ্র্যাণ্ড হোটেলে অস্বাভাবিক নানা ঘটনার কথা অনেক শোনা গিয়েছিল আগেই। হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছেও বিষয়টি নিয়ে বহু অভিযোগ জমা পড়ে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই ঘোস্ট হন্টার্স ইন্টারন্যাশনাল ওই হোটেলে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশেষ করে হোটেলের ২০৪ নম্বর ঘরটি নিয়েই হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগকারীরা জানিয়েছিলেন, রাতে কে বা কারা যেন ওই ঘরে দরজায় ঠক ঠক শব্দ করে। দরজা খুলে বাইরে কাউকে দেখতে পাওয়া যায় না।
এ ছাড়া রাতে ঘরে শোওয়ার পর শোনা যায়, কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলে! ঘুম থেকে উঠে আলো জ্বাললে কাউকেই দেখা যায় না। আবার গভীর রাতে হোটেলের লন ধরে হাঁটার সময় অনেকেই অপরিচিত হাতের অদ্ভুত রকমের শীতল স্পর্শ পেয়েছেন। অথচ কাউকেই তাঁরা দেখতে পাননি। এইসব ঘটনা কারা ঘটাচ্ছে? এর উত্তর হোটেলে আসা কেউই খুঁজে পান না।
শুধু সেখানেই নয়। শেফ-সহ রান্নার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও হোটেলের কিচেন রুমেও অস্বাভাবিক অনেক ঘটনার কথা জানিয়েও হামেশাই অভিযোগ করতেন। বিনা কারণেই কিচেন রুমের জিনিসপত্র পড়ে ভেঙে যেত। জিনিসপত্র উলটোপালটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে থাকত। কিন্তু কে বা কারা এসব করত তা কেউই বুঝতে পারতেন না।
স্বভাবতই বিষয়টি যে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাবে ঘটছে এমন একটা ধারণা তৈরি হয় সকলের মধ্যে। তবে এইসব অভিযোগ নতুন নয়। বিষয়টি প্রথম দিকে হোটেল কর্তৃপক্ষ উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত অভিযোগ আসতে থাকায় তারা বাধ্য হয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উদ্যোগী হয়। তারপরই সেখানে আসে ঘোস্ট হন্টার্স ইন্টারন্যাশনাল।
ঘোস্ট হন্টার্স ইন্টারন্যাশনাল সেখানে এসে পুরো হোটেলটির প্রতিটি জায়গার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে। তাদের ক্যামেরার ফুটেজে যা দেখা যায়, তা দেখে চক্ষুস্থির হয়ে যায় হোটেল কতৃপক্ষেরও। বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হলেও হোটেল কতৃপক্ষ ব্যবসায়িক কারণেই তার প্রচার বেশি হতে দিতে চায়নি।
হোটেলের ঘরগুলিতে যেতে যে সরু পথগুলি রয়েছে, সেখানেই একটি পুরুষের পূর্ণ অথচ অস্পষ্ট শরীর দেখা যায়। সেই শরীরটি উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হেঁটে চলে। আবার দেখা যায়, কুয়াশার মতো ঝাপসা অন্য একটি শরীরকে রান্নাঘরের দিকে চলে যেতে।
এ ছাড়া খালি চোখে দেখা যায় না, অথচ হোটেলের বিভিন্ন জায়গায় কিছু ঠাণ্ডা দাগ ঘোস্ট হন্টার্স ইন্টারন্যাশনালের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। বলা বাহুল্য, এইসব অস্বাভাবিক ঘটনা হোটেল কর্তৃপক্ষ লুকিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ঘটনাগুলি গ্র্যাণ্ড হোটেলকে আলাদা একটি পরিচিতি দিয়েছে।
যাঁরা রহস্য বা ভৌতিক বিষয় পছন্দ করেন, তা নিয়ে চর্চাও করে থাকেন, তাঁদের কাছে এই হোটেল গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রের পরিচিতি পেয়েছে।
ইপানেমার দ্য ভিনিসিয়া বার, রিও ডি জেনেইরো
বারটির সঙ্গে বিখ্যাত ব্রাজিলীয় কবি ভিনিসিয়াস ডি মোয়ারেজের নাম জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৮০ সালে এই কবির মৃত্যু হয়। তাঁর নাম অনুসারেই বারটির এই নাম হয়। বারটিকে বিখ্যাত ‘পিয়ানো বার ভিনিসিয়াস’ বলা হয়।
এটি আসলে বার-কাম-রেস্তরাঁ। আবার এই বিখ্যাত পিয়ানো বার ভিনিসিয়াস ইপানেমার বিচের খুব কাছেই। ফলে বারটির আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে ব্রাজিলীয়দের কাছে।
যাঁরা সত্যিই ব্রাজিলীয় সংগীত বোসা নোভা উপভোগ করতে চান, তাঁদের কাছে এই রেস্তরাঁর তুলনা হয় না। রেস্তরাঁটির উদবোধন হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৮৯ সালে এখানেই কার্লোস লিরার কনসার্ট হয়। তারপর থেকেই এই রেস্তরাঁ ‘বোসা নোভা টেম্পল’ নামে পরিচিত হয়।
বোসা নোভা হল এক ধরনের ব্রাজিলীয় সংগীত। উনিশ শতকের পাঁচ ও ছয়-এর দশকে এই সংগীত ব্রাজিল জুড়ে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। এখনও বিদেশে এই বোসা নোভা জনপ্রিয় ব্রাজিলীয় সংগীত হিসেবে পরিচিত। বোসা নোভা একটি পোর্তুগিজ শব্দ। এর অর্থ হল ‘নতুন রীতি’।
ভিনিসিয়াস বারে বোসা নোভা সংগীত এখনও নিয়মিত বেজে থাকে। আর তার তালে তালে দুলতে দুলতে উপস্থিত পুরুষরা পানীয়ের গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে থাকেন। পানীয় এবং সংগীতের মিশেলে বারের মধ্যে তখন একটা অন্যরকম মাধুর্য তৈরি হয়।
তবে, ইপানেমার ভিনিসিয়াস বারের আরও একটি পরিচয় রয়েছে। আর সেই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রহস্য এবং রোমাঞ্চ। ব্রাজিলের অপর একটি ভৌতিক স্থান হিসেবে পরিচিত এই ভিনিসিয়াস বার।
এখানে কেউ যদি যান এবং গভীর রাত পর্যন্ত কাটান, তাহলে তাঁর সঙ্গে অশরীরী কোনো আত্মা বা শক্তির সাক্ষাৎ ঘটলেও ঘটে যেতে পারে। কারণ সেই অভিজ্ঞতা অনেক ব্রাজিলীয়র হয়েছে বলে খোদ তাঁরাই দাবি করেছেন।
শুধু সেই আত্মাই নয়, সেখানে দেখা হয়ে যেতে পারে বিখ্যাত ব্রাজিলীয় কবি ভিনিসিয়াস ডি মোয়ারেজের সঙ্গেও! হ্যাঁ, অস্বাভাবিক হলেও এটাই ঘটনা। অনেকেই নাকি মোয়ারেজের সাক্ষাৎ পেয়েছেন এখানে।
বেশি রাতে এই বারে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নানা অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। বারে এসে অনেকেই দেখেছেন, কারও কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়াই সেই বিখ্যাত ব্রাজিলীয় কবির ছবির সঙ্গে হুইস্কির বোতলগুলিকে ঝনঝন করে মাটিতে পড়তে! ব্যাপারটা যে অদ্ভুত, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
মারকেডো মডেলো (সালভাদোর—বিএ)
সালভাদোরে অত্যন্ত বিখ্যাত হল মারকেডো মডেলো। তবে এর খ্যাতি কেবল তার বাণিজ্যিক ইতিহাসের জন্যই ছিল না। মারকেডো মডেলোর কথা বলতে গেলে একটি কাহিনির কথা শোনা যায়।
সেখানকার বাজারের শ্রমিকরা হঠাৎই আতঙ্কে পড়ে যান এলাকার সুড়ঙ্গ নিয়ে। কাজও বন্ধ করে দেন। তাঁরা জানান, পানীয় সঞ্চয়ের জন্য যে সুড়ঙ্গটি ব্যবহৃত হয়, সেখানে অতিপ্রাকৃত শক্তির উপস্থিতি রয়েছে।
শ্রমিকরা রীতিমতো বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ তাঁদের সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা শুরু করে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হল, শ্রমিকদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। সুড়ঙ্গে কারা যেন বেপরোয়া গলায় সাহায্য চেয়ে চিৎকার করে। সুড়ঙ্গে সেই চিৎকারের প্রতিধ্বনিও হয়। পাশাপাশি কাদের যেন দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দও পাওয়া যায়!
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রাজিলে দাসপ্রথা চালু থাকার সময় আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাসদের নিয়ে আসা হত এখানে। তারপর তাদের এমন ধরনের সুড়ঙ্গগুলিতে তালাবন্ধ করে রাখা হত।
মনে করা হয়, এই সুড়ঙ্গে তেমনই বহু ক্রীতদাস বন্দি অবস্থায় মারা যায়। তাদের অতৃপ্ত আত্মাই হয়তো রাতের দিকে জেগে উঠত। শুধু তখনই নয়, এখনও নাকি সেখানে দাসদের অসহায় আত্মা হাহাকার করে!
পেনিটেনসিয়ারি অফ কারিরি (জুয়াজেইরো—সিই)
জুয়াজেইরো ডো নর্তের কারিরি পেনিটেনসিয়ারিতে যারা আটক ছিল তারা প্রায় সকলেই বলে থাকে, এই কারাগার নাকি ভূতুড়ে।
তারাই জানিয়েছে, রাতের দিকে এই কারাগারের দরজা, জানালা নিজে থেকেই সশব্দে বন্ধ হয় আবার খুলেও যায়। এ ছাড়া বেশি রাতের দিকে এখানে কোনো মহিলা যেন অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। তাকে করুণ গলায় কাঁদতে এবং গভীর কোনো যন্ত্রণায় হাহাকার করতে শোনা যায়।
শুধু বন্দিরাই নয়, কারাগারের রক্ষীদের কাছ থেকেও এই কাহিনির সমর্থন পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু কেন এসব হয়, তা কারাগারের বন্দি বা রক্ষী কেউই জানে না। শোনা যায় একসময় এখানে আটক কিছু বন্দি নাকি ওই মহিলাকে নৃশংসভাবে খুন করেছিল। তারপর থেকে রাত হলেই ওই মহিলার আত্মা নাকি এই কারাগারের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়।
ফাজেণ্ডা ক্যাপাও বোনিতো (সিড্রোল্যান্ডিয়া—এমএস)
১৯৩৫ সালে এক মহিলা সিড্রোল্যান্সিয়ার একটি খামারবাড়িতে আত্মহত্যা করেন। তারপর থেকে ওই মহিলার আত্মা নাকি এখনও সেখানে ঘুরে বেড়ায়।
শোনা যায় ওই মহিলা নাকি বেশ কয়েকটি সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেইসব সমস্যার সমাধান তিনি করতে পারেননি, তাই তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন। এখনও নাকি সেই অসমাপ্ত সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য তাঁর আত্মা হাহাকার করে বেড়ায় সেখানে।
এই এলাকার কৃষকরা দাবি করে থাকেন, তাঁদের বাড়ির রান্নাঘরগুলিতেই ওই মহিলার আত্মা বিরক্ত করে বেশি। এখনও আচমকাই ফাঁকা রান্নাঘরের বাসনপত্র অস্বাভাবিকভাবে নিজে থেকে পড়ে যায়। এক বার দু-বার নয়, অনেক অনেক বার।
আবার, বাতাস না বইলেও এখানকার ঘরবাড়িগুলির দরজা রহস্যজনকভাবে হঠাৎ হঠাৎ আপনা-আপনিই সশব্দে বন্ধ হয়ে যায়। কখনো কখনো খুলেও যায়। এ ছাড়াও এই এলাকার সব জায়গা থেকেই কারও যেন দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। কোনো কোনো সময় শোনা যায় গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ। বুঝতে অসুবিধে হয় না, ওই কান্নার শব্দ কার!
হাউস ইন বুরিতি ডোস লোপেজ (পিয়াউই)
বুরিতি ডোস লোপেজের তিরাডেন্তেস স্ট্রিটে রয়েছে একটি রহস্যজনক বাড়ি। বাড়িটি ছিল খুবই সাধারণ। কিন্তু পরে ভৌতিক কারণেই এটি বিখ্যাত হয়ে যায়। সেখানে থাকতেন এক বৃদ্ধা। সারাজীবনে বহু টাকা সঞ্চয় করেছিলেন তিনি। সম্পত্তিও কম ছিল না! তবু তিনি সব হারিয়েছিলেন। শেষজীবনে নি:স্ব অবস্থায় এই বাড়িতে কাটিয়েছিলেন।
ওই বৃদ্ধাই ক্রমে সেখানকার আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। তাঁর বাড়িতেই অস্বাভাবিক সব ঘটনা ঘটতে হরু করে। কোনো কারণ ছাড়াই তাঁর বাড়ির জিনিসপত্র পাখির মতো তীব্র গতিতে উড়ে গিয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ত দেওয়ালে। তারপর ভেঙে চুরমার হয়ে যেত।
ব্যাপারটা প্রথম দিকে বৃদ্ধাকে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দিত। তা নিয়ে তিনি স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে কম আলোচনা করেননি। অতিপ্রাকৃত শক্তি নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের কাছে দৌড়োদৌড়িও তিনি করেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। শেষে ব্যাপারটার সঙ্গে তিনিও অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীকালে অনেকে বৃদ্ধার বক্তব্য জানতে চান। কিন্তু ঘটনার ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। তবে যেহেতু ব্যাপারটি নিয়ে তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাই এক্ষেত্রে তাঁর ধারণার কথাও জানতে চাইতেন কেউ কেউ। জবাবে তিনি রহস্যকন্ঠে বলতেন, বাড়ির ভিতরে এমন ঘটনা কেন হয় তা তিনি না জানলেও ব্যাপারটা যে ভালো নয় তা তিনি বোঝেন!
সোলার ম্যানসন অফ দ্য সেভেন মোর্তেস (সালভাডোর—বাহিয়া)
ঔপনিবেশিক সময় থেকেই সালভাদোরের এই অট্টালিকাটি হানাবাড়ি হিসেবেই চিহ্নিত। কারণ, ওই বিশাল বাড়িতেই একসময় ঘটে গিয়েছিল একটি মর্মান্তিক প্রতিশোধের ঘটনা।
ঘটনাটি ঘটেছিল আঠারো শতকে। ওই অট্টালিকায় যাঁরা থাকতেন, তাঁদের কাছে একজন ক্রীতদাসও ছিল। বাড়ির মালিকরা সেই দাসের প্রতি সবসময়ই দুর্ব্যবহার করতেন। কাজে ভুল বা দেরি হলে মারধরও করতেন। তাই প্রতিশোধ নিতে একদিন বাড়ির মালিক ও তাঁদের সন্তানদের বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে ওই নির্যাতিত ক্রীতদাস।
তারপর থেকেই ওই অট্টালিকা সাধারণ মানুষের কাছে ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এখনও রাতের দিকে অথবা কোনো নির্জন দুপুরে সেই বাড়িতে থেকে থেকে কেউ যেন ক্রোধে চিৎকার করে ওঠে। আবার কখনো কখনো শিশুদের কান্না বা কারও দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন