রহস্যের বিপরীত ব্যাখ্যা

উপমন্যু রায়

মানুষ নিজেকে যতই বুদ্ধিমান, সাহসী ও শক্তিশালী বলে মনে করুক-না কেন, মনস্তত্ত্ব বলে, সেসব আসলে মানুষের একটা মানসিক আবরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ স্বার্থপর, দুর্বল ও ভীরু স্বভাবের একটি প্রাণী ছাড়া আর কিছু নয়।

নির্জন জায়গা বা বাড়ি, আলো-আঁধারি বা অন্ধকার বিভিন্ন অবস্থায় সময় বিশেষে পরিবেশ-প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটায়। তাই যখন পরিবেশ বদলে যায়, তখন নিজের ওপর আরোপিত মানুষের সেই বুদ্ধিমান, সাহসী ও শক্তিমানের আবরণ খসে পড়তে সময় লাগে না।

আর তখনই মানুষের মনে অস্বাভাবিক কল্পনার সৃষ্টি হয়। সেই কল্পনা থেকেই ভয় তৈরি হয়। আর সেই ভয় থেকেই ভৌতিক বাড়ি বা জায়গার ধারণার জন্ম।

একথা ঠিক, ভৌতিক বা হানাবাড়ি বা স্থান বা ঠিকানার রহস্য কেউ বিশ্বাস করেন, কেউ-বা করেন না। যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের যেমন বিষয়টি নিয়ে একটা ধারণা ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তেমনই যাঁরা বিশ্বাস করেন না, তাঁরাও এই রহস্যের পিছনে নানা যুক্তি দিয়ে থাকেন।

যাঁরা বিশ্বাস করেন না, তাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইসব রহস্যের পিছনে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, ভূতপ্রেত বা অতিপ্রাকৃত শক্তি বলে কিছু নেই। সেগুলি আসলে সব আমাদের অবচেতন মনের কল্পনা মাত্র। আর ভূতপ্রেত বলে যদি কিছু না-ই থাকে, তা হলে ভূতুড়ে বাড়ি বা স্থান বলে কিছু থাকতে পারে না।

যেমন বিজ্ঞান লেখক টেরেন্স হাইনে। তিনি ভূতের বাড়ির অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। বিষয়টিকে তিনি মানুষের ভুল বলেই ব্যাখ্যা করেছেন।

তাঁর মতে, যেকোনো বাড়িতেই, বিশেষ করে তা যদি পুরোনো বাড়ি হয়, সেখানে অদ্ভুত একরকম শীতল অনুভূতি, কখনো-বা ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ, অথবা নানারকম গোলমালের আওয়াজ শোনা যেতেই পারে। এর মধ্যে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।

তিনি আরও জানিয়েছেন, কোনো বাড়িতে কারও মৃত্যু হলে সেই ব্যক্তিকে কল্পনায় নিয়ে আসাটা সেই বাড়ির বাসিন্দা বা প্রতিবেশীদের একটা মানসিক ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়। তাই সেই মৃত ব্যক্তিদের কল্পনা করে প্রভাবিত হওয়াটাও স্বাভাবিক একটা বিষয়। তাঁরাই অনেকসময় ভুল করে নানারকম শব্দ বেশি শুনতে পান।

এ ছাড়া ডেভিড টার্নারেরও প্রায় একই মত। তিনি মনে করেন, পুরোনো বা পরিত্যক্ত বাড়িতে আলোর জ্বলা-নেভার কারণে জড় বস্তু নিয়েও আমাদের মনে নানারকম ধারণা তৈরি হতে পারে। এইজন্য সেই সব বস্তুর অনিয়মিত স্থান পরিবর্তনের কথা মনে হতে পারে।

ডেভিড টার্নার একজন ফিজিক্যাল কেমিস্ট। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় ফেটোইলেকট্রন স্পেকট্রস্কপির ওপর তাঁর লেখা প্রথম পত্র। ১৯৭৫ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। কাজ করেছেন লণ্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতেও। ফেলো হিসেবে গবেষণা চালিয়েছেন অক্সফোর্ডের ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে। সুতরাং, তাঁর বক্তব্যের যে যথেষ্ট ভার থাকবে, তাতে সংশয় থাকার কথা নয়।

তবু পুরোনো বাড়িগুলির রহস্য সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা অতিসরল মনে হয়।

এবার বলা যাক জো নিকেলের কথা। এই ধরনের বিভিন্ন সন্দেহজনক ঘটনার তদন্ত করে জো নিকেল শারীরিক ভ্রম, জেগে স্বপ্ন দেখা এবং স্মৃতির প্রভাবের যুক্তি দিয়ে ভৌতিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্যারানর্মাল বিষয় নিয়ে তদন্ত করার ক্ষেত্রে জো নিকেলও বিখ্যাত। ভৌতিক বিষয় ছাড়াও ইউএফও, এলিয়েন (ভিনগ্রহের প্রাণী), পদার্থবিদ্যা বা অন্যান্য রহস্য নিয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। তিরিশটির মতো বই লিখেছেন বা সম্পাদনা করেছেন তিনি।

নিকেল অবশ্য ভৌতিক রহস্য প্রসঙ্গে মানুষের মানসিক বিভ্রমের উপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো বাড়ি, হোটেল বা অন্য কোনো জায়গা সম্পর্কে যখনই কোনো ভৌতিক বা রহস্যের সংবাদ প্রচারিত হয়, তখনই অধিকাংশ মানুষের মধ্যে তা নিয়ে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।’

তাঁর বক্তব্য, ‘মানুষ যখন কোথাও থেকে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটবে বলে প্রত্যাশা করে, তখনই তাদের মন ঠিক সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়। তারই প্রতিফলন লক্ষ করা যায় বিভিন্ন ঘটনায়।’’ অর্থাৎ, পুরো ব্যাপারটিকেই তিনি ‘মানসিক সমস্যা’ বলে মনে করেন।

হোয়াইট হাউসে অনেকেই প্রেসিডেন্ট, ফার্স্ট লেডি-সহ অনেকের আত্মা দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরা যেমন চর্চা করেছেন, তেমনই যাঁরা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে উড়িয়ে দেন, তাঁরাও তাঁর ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। বিষয়টি নিয়ে অনেক বইপত্রও লেখা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে অশরীরীদের আনাগোনা নিয়ে যত বিশ্লেষণই হোক-না কেন, সেসব নিয়ে স্পষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। যাঁরা নিজেদের যুক্তিবাদী বলে দাবি করে থাকেন, এই বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য হল, যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে প্রচারে শীর্ষে রয়েছে এই হোয়াইট হাউস। তাই এই বাড়িতে ঢুকে অনেকেই হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়ে থাকেন। সেইজন্যই এমন সব কাহিনি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছেন তাঁরা।

আমেরিকানদের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক। তাঁরা বলেছেন, আমেরিকানদের নাকি ভূতপ্রেত দেখার একটা বাতিক আছে। ভূতের বাড়ির মতো করে তাঁরা নিজেদের বাড়ি সাজায় হ্যালোইনের রাতে। হোয়াইট হাউসের ক্ষেত্রেও তেমন ব্যাপারই ঘটে থাকে।

আসলে হোয়াইট হাউস এত বড়ো বাড়ি যে, সেই বাড়ি নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে কল্পনার শেষ নেই। মার্কিন সমাজজীবনে তাই হোয়াইট হাউসের প্রভাব রয়েছে মারাত্মক। সেই কারণে তাঁদের মনে এমন কাহিনি বা ভুল অনুভূতির সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়।

টক্সিকোলজিস্ট আলবার্ট ডোনেই বিশ্বাস করেন, কার্বন মনোক্সাইড, কীটনাশক পদার্থ এবং ফর্মালডিহাইডের মতো পদার্থের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি কোনো জায়গার পরিবেশ ও প্রকৃতি বদলে দিতে পারে। সেখানে যদি কোনো মানুষ যান বা থাকেন, তাহলে তিনিও হ্যালুসিনেশনের শিকার হতে পারেন।

আর তা থেকেই তিনি নানা ধরনের দৃশ্য দেখতে পারেন বা শব্দ শুনে থাকতে পারেন। এসব ক্ষেত্র থেকেই হানাবাড়ি বা ভৌতিক জায়গার ধারণা তৈরি হয় কারও কারও মনে।

ডোনেইর ধারণা, ভিক্টোরীয় আমলে রাস্তাঘাট থেকে বিভিন্ন বাড়িঘরে গ্যাসীয় আলোর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। আর, কুড়ি শতকেই ভূত দেখার পাশাপাশি গা-ছমছমে ভৌতিক কাহিনির জনপ্রিয়তা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এই দু-টি বিষয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ককেই ডোনেই ভূতুড়ে বাড়ির কল্পনার উৎস বা তার লক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন।

মাইকেল পারসিঙ্গার, জ্যাসন ব্রেইথওয়েট এবং অন্য কয়েক জন বিশেষজ্ঞের মতে, কারও উপস্থিতি অনুভব করা, ঠাণ্ডা দাগ এবং ভৌতিক স্পর্শ পাওয়ার বিষয়টি আসলে একটি ভুল। স্বাভাবিক বিষয়গুলির বৈচিত্র্য বা মানুষের তৈরি চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের কারণে তার প্রকৃত ধারণা বদলে যায়।

তবে তাঁদের বক্তব্য বিতর্কের অতীত নয়। তাই পারসিঙ্গারদের বক্তব্যের বিরোধিতাও করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তাঁরা পরিষ্কার বলেছেন, ভৌতিক বা রহস্যজনক স্থানের সঙ্গে পারসিঙ্গারদের যুক্তি সবসময় মেলে না।

ভূতুড়ে বাড়ি বা জায়গার বিরুদ্ধ যুক্তি হিসেবে মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণের কৌশলের কথাও অনেকে বলে থাকেন। কোনো স্থানকে ভৌতিক আখ্যা দিয়ে সেখানে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয় নিজেদের স্বার্থপূরণ করতেই।

তবে ভূতুড়ে বাড়ি বা জায়গা নিয়ে যতই বিরুদ্ধ যুক্তি দেওয়া হোক-না কেন, আশ্চর্যের বিষয় হল গোটা পৃথিবীর বহু মানুষই এই ধরনের বাড়ি বা স্থানের কথা বিশ্বাস করেন। এইসব মানুষের মধ্যে অনেক সচেতন ও শিক্ষিত মানুষও রয়েছেন। ভূতুড়ে স্থান বা বাড়ির বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি দেওয়া হয় তা কি তাঁরা জানেন না?

উত্তর হল, জানেন। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কেন তাঁরা এসব জায়গা বা বাড়ির কথা বা কাহিনি বিশ্বাস করেন? মনস্তত্ত্বই কি তার প্রধান কারণ? নাকি এইসব ভাবনার পিছনে বাস্তব কোনো ভিত্তি রয়েছে?

আবার, রহস্যবাড়ি বা ভৌতিক বিষয়ের বিরুদ্ধে যাঁরা যুক্তি দিয়ে থাকেন, তার কিছু যেমন গ্রহণযোগ্য, ঠিক তেমনই অনেক যুক্তি মনে হয় চাপিয়ে দেওয়া। এই বিষয়টিকে অনেক বিশেষজ্ঞই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তাই যুক্তিবাদীদের এক ধরনের মৌলবাদী বলতেও অনেকে দ্বিধাবোধ করেন না।

ভূতুড়ে বাড়ির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যেন রহস্যকে অবিশ্বাস করতে হবে ভেবেই এই যুক্তিগুলি পেশ করেন তাঁরা। স্বাভাবিক কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের যুক্তি সকলের স্বীকৃতি পায় না। সেই কারণে রহস্যেরও মৃত্যু হয় না। অন্তত এখনও হয়নি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%