উপমন্যু রায়
শেষপর্যন্ত বলা যায়, প্রযুক্তির সৌজন্যে আমাদের সভ্যতা যতই এগিয়ে যাক-না কেন, এই পৃথিবী থেকে রহস্য এখনও হারিয়ে যায়নি। আর রহস্য আছে বলেই রোমাঞ্চও পুরোমাত্রায় রয়ে গিয়েছে আমাদের উত্তর-আধুনিক সভ্যতার শিরা-উপশিরায়। তাই পৃথিবীকে এখনও এত বৈচিত্র্যময় লাগে।
একথা তো ঠিক, অস্বাভাবিক যা, তা ব্যতিক্রমীও। জানি কিছু মানুষ কোনো কিছুই শুনবেন না। তাঁরা এককথায় উড়িয়ে দেবেন যাবতীয় রহস্যঘন প্যারানর্মাল বিষয়কে। যুক্তিতে জেতার জন্য তাঁরা এর সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে গুলিয়ে দিতে চাইবেন সংস্কার-কুসংস্কারের মতো কিছু প্রাচীন বিষয়বস্তুকে।
যদিও তাঁরা জানেন, দু-টি বিষয় পুরোপুরি আলাদা। সংস্কার-কুসংস্কারের যে রীতি রয়েছে, রহস্য রয়েছে তার চেয়ে অনেক-অনেক দূরে। আমরা রহস্যকে পছন্দ করি, কারণ রহস্যের মধ্যে থাকে রোমাঞ্চের মাধুর্য।
অন্যদিকে, সকলেই জানেন, সংস্কার-কুসংস্কার মানুষকে বেঁধে ফেলে। পালিয়ে যাওয়ার মনোবৃত্তিতে প্ররোচিত করে। তাই মানুষ সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে যায়। যা রহস্য কখনো করে না। রহস্য সবসময় রহস্যভেদে উৎসাহিত করে। আর সেটা পুরোপুরি আলাদা একটি বিষয়।
এই পৃথিবী, পৃথিবী ছাড়িয়ে যে গোটা মহাবিশ্ব, সমস্ত কিছুতে অজানা, ব্যাখ্যাতীত, রোমহর্ষক বা রোমাঞ্চকর যে অসংখ্য ঘটনা ও বিষয় ছড়িয়ে রয়েছে, তা আমরা জোর করে অস্বীকার করতে পারি, কিন্তু তাতে সেই সব বিষয় কখনো হারিয়ে যায় না। কখনো কখনো তার ব্যাখ্যা আবিষ্কার করি আমরা, আবার অনেকসময় অনেক কিছুই ব্যাখ্যাতীত থেকে যায়।
বিশ্বাস আর অবিশ্বাস নিয়ে মানুষের ভন্ডামি আমাকে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য করে। কারণ, পাঁচ হাজার বছরের এই সভ্যতায় এখনও নাস্তিকের তুলনায় আস্তিকের সংখ্যা বেশি। তার মানে, ঈশ্বরের অস্তিত্বে যাঁরা বিশ্বাসী নন, তাঁদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক বেশি বিশ্বাসীর সংখ্যা।
বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, ঈশ্বর-বিশ্বাসীদের অনেকেই ভূত বিশ্বাস করেন না। কিন্তু সত্য হল—ঈশ্বর বা ভূত কাউকেই সাধারণত খোলা চোখে দেখা যায় না। তাই প্রশ্ন হল, দেখা না-যাওয়া সত্ত্বেও যদি ঈশ্বর থাকতে পারেন, তাহলে ভূত থাকবে না কেন? এটা যুক্তির প্রশ্ন।
ঈশ্বরকে যে একেবারে দেখা যায় না, তা অনেকে স্বীকার করেন না। তাঁরা বলেন, অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ নাকি অনেক সাধ্যসাধনা করে ঈশ্বর দর্শন করেছেন। যদিও সারা পৃথিবীতে তাঁদের সংখ্যা নগণ্য। তাঁরা নাকি মহাপুরুষ!
যদি এই যুক্তি সত্য বলে ধরে নিই, তাহলে ভূতপ্রেতের ব্যাপারেও তো একই যুক্তি দেওয়া যায়! কারণ খুব অল্পসংখ্যক মানুষ হলেও স্বচক্ষে ভূত দেখেছেন বলে অনেকেই জানিয়েছেন।
খুব বেশি উদাহরণ দিতে হবে না। আমাদের বাংলার প্রিয় সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও নিজের মুখে জানিয়েছেন, তিনি অশরীরী শক্তির অস্তিত্বে বিশ্বাসী। কারণ তিনি নিজের চোখে তা দেখেছেন।
এরপরও এই বিষয়ে আরও একটি কথা বলার থাকে। এখন ঈশ্বর যদি পজিটিভ পাওয়ার হন, আর তা যদি সত্য হয়, তাহলে নেগেটিভ পাওয়ারও একটা থাকবেই। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ সমস্ত কিছুরই একটি বিপরীত অস্তিত্ব থাকে। সেটাই বাস্তবসম্মত।
তাই পজিটিভ পাওয়ার হিসেবে যদি ঈশ্বরকে ধরে নিই, তাহলে অশরীরী অতিপ্রাকৃত শক্তিকে আমরা নেগেটিভ হিসেবে ধরতে পারি। সুতরাং ঐশ্বরিক ক্ষমতা যদি থেকে থাকে, তাহলে ভৌতিক শক্তিরও থাকার কথা।
থাকবেই। দুটোর একটা থাকবে, অন্যটা থাকবে না, এমন কথার মধ্যে একটা দ্বিচারিতা রয়েছে। তাতে আর যা-ই হোক, সত্যের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক জিইয়ে রাখতেই এমন কথা বলা হয়ে থাকে।
একথা তো অনস্বীকার্য যে, আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে গোটা মহাবিশ্বটাই একটা রহস্যের আধার। আর পৃথিবীর সর্বকালের সবচাইতে বৃহত্তম অমীমাংসিত রহস্য সম্ভবত অতিপ্রাকৃত শক্তিই।
পৃথিবীর বাইরের কথা ছেড়ে দিন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষ ও উন্নতির যুগেও আমাদের এই পৃথিবীর এমন বহু স্থান রয়েছে, যে স্থানগুলি ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের কোনো কিনারা আজও পাওয়া যায়নি।
অস্বীকার তো সব কিছুকেই করা যায়। আবার একথাও তো মিথ্যে নয়, কারও স্বীকার বা অস্বীকারে কোনো কিছুরই ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় না। তবু কোথাও কোথাও তো মনে হয়, আমাদের এই অস্বীকার আমাদেরই সীমাবদ্ধ গন্ডিতে বন্দি করে রাখে! আজ এই সময়ে সেই সীমবদ্ধতায় কেন আমরা বন্দি হব?
কারণ, তাতে পৃথিবী ছাড়িয়ে গোটা মহাবিশ্ব-সংসারের কিছু হ্রাস-বৃদ্ধি না-হলেও তা আমাদের কিন্তু অনেকটাই রহস্য থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। অনুৎসাহিত করতে চাইবে। তাতে বোধ করি আমাদেরই ক্ষতি।
আমার বিশ্বাস, যতই আমরা অস্বীকার করে বিষয়গুলিকে পিছনে ঠেলে দিই-না কেন, তাতে কোনো দিনই মানুষের ধারণা থেকে রহস্য-রোমাঞ্চ বিদায় নেবে না। এটাই বাস্তব।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। মগুইচেং-এর কথা নিশ্চয় সকলেই শুনেছেন। এটি একটি মরুভূমির নাম। এই মরুভূমি চীনের ঝিনজিয়াং অঞ্চলে অবস্থিত। মগুইচেং-এর আক্ষরিক অর্থ হল শয়তানের নগরী। এই স্থানটি পুরোপুরি জনশূন্য এবং সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত।
যাঁরা মগুইচেং-এ গিয়েছেন, তাঁরা জানিয়েছেন, অনেক অদ্ভুত ঘটনা নাকি ঘটে এই মরুভূমিতে। তাঁদের অনেকে নাকি এখানে রহস্যময় শব্দ, বিষণ্ণ সুর ও গিটারের মন-কেমন-করা মৃদু ধ্বনি শুনতে পেয়েছেন। আবার অনেকে বলেছেন, সেখানে অদ্ভুত এক বাচ্চার কান্না শুনতে পাওয়া যায়।
মরুভূমিতে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যে রীতিমতো বিস্ময়কর ব্যাপার, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। অনেকে বাঘের গর্জনও শুনেছেন সেই মরুভূমিতে। অরণ্যে বাঘের গর্জন স্বাভাবিক। কিন্তু জলহীন মরুভূমিতে বাঘ যে কোত্থেকে এসে হাজির হয়, তা ভেবে আশ্চর্য না-হয়ে পারা যায় না।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এইসব শব্দ আসে কোথা থেকে? অনেকেই বিষয়টির অনুসন্ধান করেছেন। কিন্তু সেই রহস্য রহস্যই থেকে গিয়েছে। মীমাংসা হয়নি। এবার ভাবুন, এমন রহস্যের কথা শুনলে রোমাঞ্চিত না হয়ে পারা যায়?
যেদিন পৃথিবী থেকে রহস্য-রোমাঞ্চ হারিয়ে যাবে, সেদিন মনে রাখবেন, পৃথিবীর বাসিন্দা মানুষের জীবন একেবারে রসহীন ধু-ধু মরুভূমি হয়ে যাবে। সেই পৃথিবী নিশ্চয়ই আমরা চাইব না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন