উপমন্যু রায়
স্কটল্যাণ্ড একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। তার নামও ‘কিংডম অফ স্কটল্যাণ্ড’। যদিও সেটি গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত। দেশটি নিজেদের আলাদা আন্তর্জাতিক অস্তিত্ব বা পরিচিতির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটেনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছে।
২০১৪ সালে বিষয়টি নিয়ে একটি গণভোটও হয়। সেই ভোটে অবশ্য স্কটল্যাণ্ডের অধিকাংশ নাগরিক ব্রিটেনের অধীনে থাকার পক্ষেই মত দেন। সেই ভোট নিয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ছলচাতুরির অভিযোগও করেছিলেন আলাদা দেশের পক্ষে থাকা অনেক স্কটিশ।
সাম্রাজ্য হিসেবেও স্কটল্যাণ্ডে রাজপরিবারের জন্য নিজস্ব একটি দুর্গ রয়েছে। সেই দুর্গটি হল এডিনবার্গ দুর্গ। সেই দুর্গটি রাজপরিবারের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত। স্কটল্যাণ্ডের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অট্টালিকা হল ওই এডিনবার্গ দুর্গ। একইসঙ্গে এডিনবার্গ এবং এমনকী স্কটল্যাণ্ডেরও আইকনিক ল্যাণ্ডমার্ক বলে এই দুর্গটির কথা বলা হয়ে থাকে।
কিন্তু এই দুর্গে অস্বাভাবিক অনেক ঘটনার খবর পাওয়া যায়। ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে এই এডিনবার্গ দুর্গে হাজির হয়েছিলেন অনেক গবেষক। ছিলেন প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরাও।
তাঁরা সকলেই এই দুর্গের অস্বাভাবিক ঘটনাগুলির ওপর গবেষণা ও বিশ্লেষণ শুরু করেন। এই কাজ চলে দশ দিন। গবেষণার কাজে সাহায্য করার জন্য দু-শো চল্লিশ জন সাধারণ মানুষকে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের স্বেচ্ছাসেবক বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁরা ন-শো বছর আগে এই স্কটিশ দুর্গে কী হয়েছিল তার বিন্দুবিসর্গও জানতেন না।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখা গেল, রাত কাটানোর পর তাঁদের মনের অবস্থা রীতিমতো বদলে গিয়েছে। মারাত্মক ভয় পেয়ে গিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বিবরণ থেকে জানা গেল অদ্ভুত সব ঘটনা।
এই দুর্গের অতীত সম্পর্কে যেসব রিপোর্ট ছিল, তার সঙ্গে হুবহু মিলে গেল তাঁদের বক্তব্য। এই ঘটনার পর সেখানে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরাও এডিনবার্গ দুর্গে অতিপ্রাকৃত শক্তি থাকার কথা মেনে নেন।
তাঁরা বলেছেন, দুর্গের ভিতরে এখনও এমন সব ভয়ংকর অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, যা এককথায় অবিশ্বাস্য। খালি চোখে দেখলে তা বিশ্বাসও হবে না। কখনো কিম্ভূতকিমাকার ছায়া, কখনো-বা সাদা কাপড়পরা আবছা মানুষের অবয়ব, কখনো কখনো ফিসফিস করে বলা কথার শব্দ দুর্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভেসে আসে। এসব বিবরণ দিতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা চমকে উঠেছেন।
বাস্তবিকই স্কটল্যাণ্ডের সবচাইতে ভয়ের জায়গা হিসেবে যে-সমস্ত স্থান চিহ্নিত হয়ে রয়েছে, সেগুলির মধ্যে বেশি ভয়ংকর বলে এডিনবার্গ ক্যাসলকে প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছেন। এটি ন-শো বছরের পুরোনো একটি দুর্গ। ঐতিহাসিক দুর্গ হিসেবেও এই স্কটিশ দুর্গটির পরিচিতি রয়েছে।
এখানকার অন্ধকূপে বহু মানুষকে খুন করা হয়। তাই সেই সব মানুষের অতৃপ্ত আত্মা এখনও এই দুর্গের মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এডিনবার্গ নিজে বলে গিয়েছেন, এই জায়গাটি নাকি ইউরোপের সবচেয়ে ভূতুড়ে স্থান।
দুর্গটি দেখতে অসাধারণ সুন্দর। তবে তথ্য হল, এই দুর্গে বন্দিদের রাখা এবং তাদের ওপর অত্যাচার করার জন্য বিশেষ জায়গা ও ব্যবস্থা ছিল। তাদের অনেকেরই অস্পষ্ট ছায়া নাকি আজও এই দুর্গে আর্তনাদ করে চলে।
এ ছাড়াও প্লেগে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তাদের কবর দেওয়া হয়েছিল এখানেই। তাদের আত্মাও নাকি রাত হলে জেগে ওঠে এখানে। ঘুরে বেড়ায় দুর্গের সর্বত্র। তাদের বিকৃত অবয়ব এখানে অনেকেই দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন।
এই দুর্গেই কালোজাদুর চর্চা করতেন এক মহিলা। তাঁর নাম লেডি গ্লামিস। তিনি ওই চর্চা করতেন অত্যন্ত গোপনে। কিন্তু একদিন তাঁর সেই গোপন চর্চা দেখে ফেলে তাঁরই ছেলে। সেবিষয়টি মানতে পারেনি। ভয় পেয়ে যায়। চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।
সেটা ছিল ১৫৩৭ সাল। মহিলাটি কিন্তু নিজের ছেলে বলে ব্যাপারটির সঙ্গে আপোশ করেননি। নিজের ছেলেকেই তিনি এই দুর্গে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারেন। তারপর থেকে তাঁর সেই ছেলের অতৃপ্ত আত্মাও নাকি এই দুর্গকে আঁকড়ে ধরে। দাপিয়ে বেড়ায় এখানে।
এই দুর্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুন্ডহীন ড্রামবাদক, ভৌতিক বঁাশিওয়ালা, বন্দিদের কান্না-আর্তনাদ, ন-শো বছর আগেকার মানুষের আত্মা, এমনকী কবরস্থানের দিকে একটি কুকুরের আত্মাকেও নাকি দেখতে পাওয়া যায়। অনেকে সেই আত্মাদের দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন।
ওভারটাউন ব্রিজ, ওয়েস্ট ডানবার্টনশায়ার
ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এই ওভারটাউন ব্রিজ। তৈরি হয় ১৮৯৫ সালে। এটির অবস্থান স্কটল্যাণ্ডের মিল্টন গ্রামে। ব্রিজটির সামনেই রয়েছে গথিক ক্যাসল ওভারটাউন হাউস।
১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে এই ব্রিজ থেকে ৫০ ফুট নীচে বয়ে যাওয়া জলপ্রপাতে ৫০টি কুকুর ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হল, কুকুরগুলোর ঝাঁপ দেওয়ার সময় আবহাওয়া বেশ অনুকূলই থাকে। কুকুরগুলোও ব্রিজের একই দিক থেকে নীচে ঝাঁপ দেয়। বিষয়টি এখনও রহস্যজনকই থেকে গিয়েছে।
শুধু ৫০টি কুকুরই ওই ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দেয়নি, ১৯৬০ সালের পরও মাঝে মাঝেই অনেক কুকুরই আচমকা এই ব্রিজ থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখনও পর্যন্ত ৬০০-রও অনেক বেশি কুকুর নাকি ওই ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। এই কারণে এই ব্রিজটিকে অনেকেই ‘কুকুর শিকারি ব্রিজ’ বলে থাকেন।
অনেকে বলেন, নিজের পোষ্য কোনো কুকুর নিয়ে কোনো মানুষ ওই ব্রিজে এলেই নাকি সেই কুকুরটি কী এক ভয়ংকর প্রভাবে ব্রিজের নীচে সেই প্রপাতে ঝাঁপ দেয়। সব কিছু বিবেচনা করে পুলিশের তরফে একটি সতর্কবার্তা সেই ব্রিজে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা, এই ব্রিজ দিয়ে যাওয়ার সময় আপনার কুকুরটিকে সাবধানে রাখুন।
বিষয়টি অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিতে পেরেছে। অনেকেই এমন ঘটনাকে ‘কুকুরগুলির আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
কুকুর নিয়ে গবেষক মনোবিজ্ঞানী ডেভিড সেক্সটন বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালান। সেখানকার গন্ধ, আওয়াজও যাচাই করেছেন। ডেভিড দেখেছেন, কুকুরগুলি ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সময় ইঁদুর এবং বেজির মতো দেখতে কিছু প্রাণী নীচের জলে, আর ব্রিজের কাঠামোর মধ্যে কাঠবিড়ালি থাকে।
বিষয়টিকে অনেকে ভৌতিক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখন কম মানুষই সাহস করে ওই ব্রিজের কাছে যান!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন