কালো বাক্সের খোঁজে

উপমন্যু রায়

ওয়ারেন হেস্টিংস যেকোনো বাঙালির কাছেই অতিপরিচিত একটি নাম। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল। ১৭৭২ সাল থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত ছিল তাঁর শাসনকাল। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ ছিল।

তাঁর অপকীর্তিগুলির মধ্যে সর্বাধিক প্রচারিত হল মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির ঘটনা। হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার ইলাইজা ইম্পে ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই একদা সহপাঠী ইম্পের কাছ থেকে নন্দকুমারের ফাঁসির আদেশ বের করে নিতে তাঁকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি।

ইংল্যাণ্ডে ফিরে যাওয়ার পর ১৭৮৭ সালে তাঁকে ইমপিচ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ বিচারের পর ১৭৯৫ সালে তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। শুধু তাই নয়, ১৮১৪ সালে তিনি প্রিভি কাউন্সিলের সদস্যও হন।

এ দেশে তেরো বছর শাসনক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীন তিনি মোট তেরোটি বাড়ির মালিক হয়েছিলেন। এর মধ্যে বেশ কিছু বাড়ি তিনি কিনেছিলেন বা দখল করেছিলেন। কিছু বাড়ি নিজে তৈরি করিয়েছিলেন।

শোনা যায় সমস্ত বাড়িই নাকি নির্মিত হয়েছিল বিভিন্ন কবরস্থানের উপর। আলিপুরে ন্যাশনাল লাইব্রেরির সংশ্লিষ্ট বাড়িটির নাম ছিল বেলভেডিয়ার প্যালেস। মূলত এই বাড়িতেই হেস্টিংস থাকতেন। অন্য বাড়িগুলিতে ইচ্ছে ও সুবিধামতো যেতেন এবং সময় কাটাতেন। এককথায় এই বাড়িটি ছিল বড়োলাট মানে হেস্টিংসের আরামগৃহ।

তথ্য অনুযায়ী সতেরো শতকে এই প্যালেস ছিল ফ্রাঙ্কল্যাণ্ডের বাগানবাড়ি। আর ওই শতকের শেষ দিকে এই বাড়িটিই হয়ে যায় দিল্লির সম্রাট আজিম ওসমানের সাময়িক নিবাস। পরের শতকে এই বাড়ি হাতবদল হয়। চলে যায় মিরজাফরের অধিকারে। তাঁর কাছ থেকেই বাড়িটি নিয়ে নেন হেস্টিংস।

মিরজাফর আলি খাঁর অধিকারে ছিল দু-টি বাড়ি। একটি পরবর্তী সময়ে হেস্টিংস হাউস নামে যে বাড়িটি বিখ্যাত, সেটি। আর, অপরটি বেলভেডিয়ার হাউস। মিরজাফরের অধিকারে থাকার সময় বেলভেডিয়ার ছিল তাঁর স্ত্রী মণিবেগমের খাসমহল। একদিন কোনো এক কারণে সেখানে আসতে হয় হেস্টিংসকে। মণিবেগমকে দেখে তাঁর মাথা ঘুরে যায়।

বাস্তবিকই মণিবেগম ছিলেন অসাধারণ রূপবতী। যেমন ছিল মুখের সৌন্দর্য, তেমনই ছিল তাঁর শরীর। সেই শরীর যে এক বার দেখেছে, তাঁরই মাথা ঘুরে গিয়েছে। এমন অল্পবয়সি স্ত্রীকে নিয়ে চাপা অহংকারও ছিল মিরজাফরের।

ওয়ারেন হেস্টিংস ছিলেন ক্ষমতালোভী, মদ্যপ এবং চরিত্রহীন একজন পুরুষ। নিজের স্বার্থে তিনি করতেন না এমন কাজ ছিল না। কোনো জিনিস তাঁর পছন্দ হলে সেই জিনিস তিনি হাসিল করে তবেই ছাড়তেন। আর সেজন্য তাঁর মধ্যে কোনোরকম অনুতাপ ছিল না।

বেলভেডিয়ারে গিয়ে মণিবেগমকে দেখে যেমন হেস্টিংসের ভালো লেগেছিল, তেমনই মণিবেগমও গলে গিয়েছিলেন তাঁকে দেখে। আসলে বৃদ্ধ স্বামী মিরজাফরকে তাঁর ভালো লাগত না।

কিন্তু তাঁকে অস্বীকার করারও কোনো উপায় ছিল না। নিজের শরীরকে ইচ্ছেমতো ভোগ করার সুযোগ খুঁজছিলেন মণিবেগম। তাই হেস্টিংস ও মণিবেগমের উদ্দাম যৌনজীবন শুরু হতে সমস্যা হয়নি।

এমনকী প্রৌঢ় মিরজাফর আলিও একদিন আচমকাই দু-জনকে একই বিছানায় সঙ্গমলিপ্ত অবস্থায় দেখে ফেলেন।

কিন্তু তাঁরও কিছুই করার ছিল না। মণিবেগম ছিলেন বুদ্ধিমতী। হেস্টিংসের শরীর-সান্নিধ্য এতটাই পছন্দ ছিল তাঁর যে, নানা অছিলায় মিরজাফর আলি খাঁকে চুপ করিয়ে দিতে তিনি সময় নিতেন না।

আর হয়তো সেই সূত্রেই রহস্যজনকভাবে একদিন বেলভেডিয়ার এবং হেস্টিংস হাউসের মালিক হয়ে যান ওয়ারেন হেস্টিংস। শোনা যায়, নিজের শরীরতৃষ্ণা মেটানোর পুরস্কার হিসেবেই মণিবেগম দু-টি বাড়ি হেস্টিংসকে পাইয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন।

হেস্টিংসের চরিত্রহীনতার অনেক ঘটনার সাক্ষী ছিল এই বেলভেডিয়ার প্যালেস। এখানে হেস্টিংস আসতেন ঘোড়ায় চেপে। চমকপ্রদ ঘটনা হল, এই বাড়িতেই মাদাম গ্র্যাণ্ডকে কেন্দ্র করে কাউন্সিলর ফিলিপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে তাঁর রীতিমতো মারামারি হয়। সেটা ১৭৮০ সালের ১৭ আগস্ট।

সেখানে ফিলিপকে শুধু মারেননি হেস্টিংস, একেবারে খুনই করে ফেলেন। যদিও ঘটনাটিকে একটি ‘দ্বন্দ্বযুদ্ধ’ বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। গুলিবিদ্ধ ফ্রান্সিসকে সেখান থেকে পালকিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই দৃশ্য বেলভেডিয়ার প্যালেসের সঙ্গে যেন জড়িয়ে যায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল মাদাম গ্র্যাণ্ড। তিনি কিন্তু ফিলিপকে খুন করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা দেননি। এর অর্থ বোঝা বোধ করি কঠিন নয়। হেস্টিংসের জন্য হয়তো মনের গোপনে জায়গা ছিল তাঁর। তাই হয়তো ফিলিপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু তাঁর কাছে খুব বেশি আকস্মিক ছিল না।

মাদাম গ্র্যাণ্ড ছিলেন অপরূপা সুন্দরী। তাঁর স্বামী ফ্রান্সি গ্র্যাণ্ড। তাঁরা দু-জনে থাকতেন আলিপুর লেনের রেড গার্ডেন হাউসে। মাদামের স্বামী ফ্রান্সি ছিলেন খুবই ব্যস্ত। বাড়িতে থাকতেনই না প্রায়।

যদিও তাঁর ব্যস্ততার মধ্যে পেশাগত দায়বদ্ধতার পাশাপাশি নারীসঙ্গের মতো বিষয় ছিল বলেও অনেকের ধারণা। তিনি যখন বাড়ি থাকতেন না, তখন সেখানে আসতেন ফিলিপ। দু-জনের গভীর শরীরী সম্পর্ক ছিল।

এই দু-জনের সম্পর্কের মূলেও ছিলেন হেস্টিংস। ১৭৭৮ সালের ২০ নভেম্বর বেলভেডিয়ারে তিনি একটি বলড্যান্সের পার্টি দিয়েছিলেন। অন্যদের সঙ্গে নিমন্ত্রণ করেছিলেন গ্র্যাণ্ড দম্পতিকেও। সেখানে ছিলেন ফিলিপও। সেই পার্টিতেই পরিচয় হয়ে যায় মাদাম গ্র্যাণ্ড ও ফিলিপের। তারপর ক্রমে তা গড়িয়ে যায় উদ্দাম যৌন সম্পর্কে।

বিষয়টা জানতে পারেন হেস্টিংস। ব্যাপারটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। আসলে তাঁর বুকেও কামনার আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন মাদাম। মাদাম গ্র্যাণ্ডের শরীরী তৃষ্ণা এতটাই প্রবল ছিল যে হেস্টিংসকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। বরং হয়তো ফিলিপের চাইতেও একটু বেশিই পছন্দ করতেন।

তারপরই ১৭৮০ সালের ১৭ আগস্টের সেই ‘দ্বন্দ্বযুদ্ধ’। ফিলিপ ফ্রান্সিসের পক্ষে ছিলেন ওয়াটসন এবং হেস্টিংসের পক্ষে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল পিয়ার্স। সেখানে হেস্টিংসের গুলিতে ফিলিপের পরাজয় ও মৃত্যু।

এবার বলা যাক অন্য একটি কাহিনি। অধুনা চেন্নাইয়েও (আগের মাদ্রাজ) হেস্টিংসের একটি বাড়ি ছিল সেন্ট টমাস মাউন্টে। সেই বাড়িটিও হেস্টিংসের বেলেল্লাপনার একটি ক্ষেত্র। সেই হেস্টিংস হাউসে তিনি থাকতে দেন জার্মান মিলিটারি অফিসার কার্ল ইমহফকে। ইমহফ সেখানে একা বাস করতেন না। তাঁর সঙ্গে ছিল তাঁর অসামান্য সুন্দরী স্ত্রী মেরিয়ান এবং একমাত্র পুত্র জুলিয়াস।

এখানেও মেরিয়ানের সৌন্দর্যে পাগল হয়ে যান হেস্টিংস। ভালো লাগাতেই থেমে থাকেননি তিনি। ভুলে যান মেরিয়ান পরস্ত্রী। তাঁকে পাওয়ার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। প্রলুব্ধও করেন তাঁকে।

মেরিয়ানের মনে কী ছিল তা বলা কঠিন। তবে তিনিও হয়তো হেস্টিংসের চেয়ে খুব বেশি ব্যতিক্রমী ছিলেন না। সেই কারণে তাঁরও দ্বিচারী হতে দ্বিধা হয়নি। তাই হেস্টিংস সহজেই মেরিয়ানকে ফুসলিয়ে নিয়ে চলে আসেন সোজা কলকাতায়। তোলেন এই বেলভেডিয়ার প্যালেসেই।

কিন্তু মেরিয়ান অত সহজ-সরল নারী নন! হেস্টিংসের কাছে নিজের শরীর বিলিয়ে দিতে যেমন কোনো কৃপণতা দেখাননি, তেমনই শুধুমাত্র রক্ষিতা হয়ে থাকাটাকে তিনি সম্মানজনক বলেও মনে করেননি। সেইজন্য মেরিয়ানের চাপে তাঁকেই শেষপর্যন্ত বিয়ে করতে বাধ্য হন হেস্টিংস।

বেলভেডিয়ার প্রাসাদের পাশাপাশি বিখ্যাত হল আলিপুরের হেস্টিংস হাউস। ন্যাশনাল লাইব্রেরির কাছাকাছি জজ কোর্টের পাশেই রয়েছে এই হেস্টিংস হাউস। বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ১৭৭৭ সালে। অবশ্য কে তৈরি করেছিল এই বাড়ি, তা সঠিকভাবে জানা যায় না।

বিয়ের পর এই বাড়িতেই মেরিয়ানকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন হেস্টিংস। বাড়িটি হেস্টিংসের বড়ো প্রিয় ছিল। আরও অনেক বাড়ি থাকলেও এখানেই তিনি থাকতে পছন্দ করতেন।

কিন্তু এই বাড়ি নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান ছিল মেরিয়ানের। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মেরিয়ান এই বাড়িতে থাকতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে হেস্টিংসের সঙ্গে তাঁর বচসাও হত। শেষে হেস্টিংসই হার মানেন। আর ১৭৮৪ সালে মেরিয়ান ইংল্যাণ্ডে ফিরে যান।

যতই চরিত্রহীন হোন-না কেন, মেরিয়ানকে বুঝি ভালোই বেসে ফেলেছিলেন হেস্টিংস। তাই মেরিয়ান চলে যাওয়ার পর হেস্টিংস মানসিকভাবে একা হয়ে পড়েন। এমনকী ছেড়ে দিতে চাইছিলেন গভর্নর জেনারেলের দায়িত্বও।

শেষে ১৭৮৫ সালে সেই গুরুদায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান তিনি। তারপর আর দেরি করেননি। তিনিও সোজা ইংল্যাণ্ডে ফিরে যান।

ইতিহাস বলছে, এই বাড়িতেই বন্ধুদের সঙ্গে হেস্টিংস জমাতেন আড্ডা থেকে মেহফিল, কী নয়! রাতগুলোকে মধুর করে তুলতে হেস্টিংসের উদ্যোগে কোনো অভাব কখনো দেখা যায়নি। তখন কলকাতা ছিল অনেক সবুজ। ছিল অনেক নির্জন। আজকের মতো ব্যস্ততাও সেই সময় ছিল না। তাই হেস্টিংসের মেহফিলে মুক্তমনে আনন্দ-উৎসাহে কোনো খামতি ছিল না।

আসতেন ইলাইজা ইম্পে থেকে ফিলিপ ফ্রান্সিসের খাস সচিব তথা স্ত্রী মেরিয়ানের ভাই ম্যাক্রাবিও। আসতেন সেনাবিভাগের পদস্থ কর্তারাও। তখন বাড়িটির চারদিকে ছিল ঘন জঙ্গল। ফলে সেই আরণ্যক পরিবেশে বাড়ির অতিথিশালা একটা অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করত।

এরপরের ঘটনা যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক। ইংল্যাণ্ডে খালিহাতে ফেরেননি হেস্টিংস। দেশে ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে গিয়েছিল জাহাজ-ভরতি মালপত্র। এত মালপত্র ছিল যে, কোনটা দরকারি আর কোনটা দরকারি নয় তা বোঝাও ছিল বেশ মুশকিল।

কিন্তু ইংল্যাণ্ডে ফেরার বেশ কিছুদিন পর ভুলটি নজরে আসে হেস্টিংসের। কয়েকটি দরকারি জিনিসপত্রের খোঁজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর প্রিয় ও গোপনীয় একটি কালো বাক্স সেখানে নেই। কিন্তু কী ছিল ওই কালো বাক্সে? কেনই-বা ছিল গোপনীয়?

শোনা যায় ওই বাক্সে নাকি ছিল হেস্টিংসের কিছু গোপন ছবি ও ততোধিক গোপনীয় কাগজপত্র। হেস্টিংসের ভয় ছিল ওই সব ছবি বা কাগজপত্র প্রকাশ্যে এলে হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হতে পারে। সমস্যায় পড়তে পারে ব্রিটিশ সরকারও। তাই হারানো বাক্স ফিরে পেতে হেস্টিংস পাগল হয়ে উঠেছিলেন।

সেই কারণে বাক্সটি তিনি কলকাতা থেকে ইংল্যাণ্ডে আনতে উদ্যোগী হলেন। চিঠি লিখলেন ব্যক্তিগত সচিব টমসন সাহেবকে। টমসন সাহেব সেই বাক্সের অনেক খোঁজ করলেন। পেলেন না। প্রায় বছর দুয়েক কেটে গেল। হেস্টিংস কিন্তু নাছোড়বান্দা। তিনি লেগে রইলেন টমসন সাহেবের পিছনে।

শেষপর্যন্ত ক্যালকাটা গেজেটে বাক্সটির বিজ্ঞাপন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন টমসন সাহেব। ১৭৮৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বেশ বড়ো আকারে সেই বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ঘোষণা করা হয়, যিনি ওই বাক্সের সন্ধান দিতে পারবেন তাঁকে দুই হাজার সিক্কা পুরস্কার দেওয়া হবে।

কিন্তু সমস্ত প্রচেষ্টাই বিফলে গেল। বাক্সটির আর খোঁজ মেলেনি।

ইংল্যাণ্ডে ফিরে যাওয়ার পর কলকাতার এই বাড়িটি স্ত্রী মেরিয়ানের প্রথম পক্ষের সন্তান জুলিয়াস ইমহফকে দান করেন হেস্টিংস। তখন জুলিয়াস ইংল্যাণ্ডেই ছিলেন। জুলিয়াস ভারতে আসেন ১৭৮৮ সালে। ভারতে এসে এই বাড়িতেই বসবাস করতে শুরু করেন। কিন্তু মাত্র এগারো বছর তিনি এই বাড়িতে ছিলেন। ১৭৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

জুলিয়াসের ছিল তিন ছেলে। তাঁরা হলেন উইলিয়াম, চার্লস এবং জন। তাঁরাও এই বাড়িতেই থাকতেন। তাঁদেরও মৃত্যু হয় এই বাড়িতেই। অনেকে বলেন, তাঁদের মৃত্যুও ছিল রীতিমতো রহস্যজনক। এই বাড়িরই ভিতরের একটি মাঠে একই জায়গায় তাঁদের সকলকেই কবর দেওয়া হয়।

এই হেস্টিংস হাউসেই নাকি অশরীরী অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন অনেকে। গভীর রাতে এই বাড়ির বাগানে কবরস্থলের পাশে হাতে আলো নিয়ে কেউ একজন নাকি ঘুরে বেড়ান। কে তিনি?

অনেকে বলেন, তিনিই নাকি ব্যারন কার্ল ইমহফ। মানে মেরিয়ানের প্রাক্তন স্বামী। তিনি নাকি কিছু খুঁজে বেড়ান। কী খোঁজেন তিনি? স্ত্রী-পুত্রকে?

এ ছাড়াও রাতের শেষ দিকে হেস্টিংস হাউসের ভিতরে নাকি এক সাহেবকে দেখা যায়। সেই সাহেব নাকি সমস্ত আলমারি, দেরাজ খুলে কিছু খোঁজেন। ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করেন। কিন্তু কী খুঁজে চলেন তিনি? সেই কালো বাক্সটা? কে খোঁজেন? কে এই সাহেব? স্বয়ং হেস্টিংসই কি?

আবার আর একজন সাহেব নাকি ঘোড়া ছুটিয়ে এই বাড়িতে আসেন। ঘরে ঢুকে ব্যস্তভাবে ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেন। তখন তাঁর মুখে থাকে একরাশ বিরক্তি। ফের ঘোড়ায় চড়েই তিনি ফিরে যান।

অনেকে বলেন, এই সাহেবও নাকি স্বয়ং বড়োলাট ওয়ারেন হেস্টিংসই। শুধু তাই নয়, এখনও নাকি বছর শেষের রাতে এই হেস্টিংস হাউসেই নিউ ইয়ার পার্টি হয়। সেখানে উপস্থিত থাকেন সাহেবরাই। তাঁদের সকলেরই পোশাক-পরিচ্ছদ সেই ব্রিটিশ আমলের!

একবার এই হেস্টিংস হাউস চত্বরেই এক শিশুর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ছেলেটি নাকি সেখানে ফুটবল খেলার জন্য ঢুকেছিল। এ ছাড়াও আরও একবার মৃত এক ব্যক্তির দেহ উদ্ধার হয় এখানেই। দেহটি ছিল ক্ষতবিক্ষত।

একসময় বেলভেডিয়ারের ন্যাশনাল লাইব্রেরি হলের নৈশপ্রহরী ছিলেন বীরবাহাদুর। একদিন সন্ধ্যায় তিনি অন্ধকার বাগানে একটা পালকিকে চলে যেতে দেখেন। পালকির দুটো দরজাই খোলা ছিল।

চাঁদের আবছা আলোয় তিনি দেখেন পালকির ভিতরে এক সাহেব পড়ে রয়েছেন চিত হয়ে আর তাঁর একটি হাত বাইরে ঝুলছে। বুঝতে অসুবিধে হয় না, ওই সাহেব আসলে ফিলিপ ফ্রান্সিস।

এর অর্থ প্রায় দু-শো বছর পরেও তিনি দেখেছিলেন ফিলিপের অতৃপ্ত আত্মাকে। তথ্য হল, হেস্টিংসের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর ওভাবেই পালকিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফিলিপের দেহ।

এখানেই শেষ নয়। আলিপুর জেলের কারাবন্দিদের মুখেও অনেক কথা অনেক বার শোনা গিয়েছে। অনেকে বলেছেন, সেই রহস্যময় বাড়ি থেকে গভীর রাতে নাকি পিয়ানোয় মন-খারাপ-করা সুরের মায়াজাল ভেসে আসে।

এ ছাড়াও হেস্টিংসের বাড়ি ছিল ব্যারাকপুরের লাটবাগানে এবং বারাসাতে। নানা সময়ে সেখানে নানা কারণে যেতেন হেস্টিংস। কখনো একা যেতেন, কখনো যেতেন সঙ্গীসাথি-সহ। শোনা যায় ওই বাড়িগুলিতেও নাকি আধিভৌতিক ব্যাপার দেখা যায়।

এ ছাড়া রেসকোর্স ধরে গভীর রাতে এখনও নাকি মাঝেমধ্যে একটি ঘোড়ার গাড়ি যেতে দেখা যায়। ওই গাড়ির সহিসটি নাকি অদ্ভুত। তার মুখ ঠিকমতো দেখা যায় না। আর গাড়িতে বসে থাকেন এক মেমসাহেব ও তাঁর এক মেয়ে।

স্পষ্টই বোঝা যায়, এই এক্কাগাড়ির যাত্রীরা কেউই এই সময়ের নন। ঘোড়ার গাড়িতে তাঁদের এই যাওয়ার মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ সময়ের ছায়া। এখন প্রশ্ন হল, কারা তাঁরা? হেস্টিংসেরই স্ত্রী মেরিয়ান বা কেউ এবং তাঁর মেয়ে!

অবশ্য একথা ঠিক, কলকাতা এখন জনভারে নুয়ে পড়ছে। ভূত বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, অশরীরীরা নাকি নির্জনতা পছন্দ করেন। তাই হয়তো প্রাচীন কলকাতায় অশরীরী-কাহিনি যেভাবে শোনা যেত, বর্তমান কলকাতা শহরে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে।

এখন সেভাবে হানাবাড়ি বা ভূতের উপদ্রবের কথা আর শোনা যায় না। অধিকাংশ মানুষই সেইসব কাহিনি শুনলে হেসে উড়িয়ে দেন। রাতের আলোময় কলকাতায়ও আগের সেই রহস্য-রোমাঞ্চ আর বোঝা যায় না। ফলে কলকাতা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তার গাম্ভীর্যের সৌন্দর্য আর নির্জনতার রোমাঞ্চ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%