মার্কিন উপত্যকায় ছায়ামানুষ

উপমন্যু রায়

আমেরিকা বিশাল একটি দেশ। এর আয়তন ৩৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ১০১ বর্গ মাইল। আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হল আমেরিকা।

তুলনায় জনসংখ্যা এখনও অনেকটাই কম। এখন এদেশের জনসংখ্যা আনুমানিক ৩২ কোটি ৩৬ লক্ষ ৮৪ হাজার। ভারতের তুলনায় অনেক অনেক বড়ো দেশ হলেও লোকসংখ্যা চার ভাগের মাত্র এক ভাগ। এই জনসংখ্যার হিসাবে এখনও আমেরিকাকে মোটামুটি নির্জন একটি দেশ বলা চলে। তবু মার্কিন সরকার তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

আজকের অবস্থায় আমেরিকার পৌঁছোনোর পিছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ ইতিহাস। বহু বছর ব্রিটেন-সহ ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের উপনিবেশ ছিল এই দেশ। তারপর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা পায়। আর তার ২৫০ বছরের মধ্যে আমেরিকা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত হয়।

এত উন্নত দেশ আমেরিকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সহ সমস্ত ক্ষেত্রে চোখ-ধাঁধানো উন্নতি, তবু সেদেশের মানুষের মধ্যে ঈশ্বর বা ভৌতিক বিশ্বাস কিন্তু পুরো মাত্রায়ই রয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো গোপনীয়তাও নেই তাদের।

ধর্ম ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে পিউ ফোরামের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অসংখ্য মার্কিন নাগরিক ভূত দেখেছেন বলে মনে করেন অথবা নিউ এজ বিপ্লব বা প্রাচ্যের ধর্মীয় আধিভৌতিক বিষয়গুলি বিশ্বাস করেন।

পিউ-র গবেষক অ্যালেন কুপারম্যান জানিয়েছেন, ধর্মবিশ্বাসী আমেরিকানদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেককেই নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে ফেলা যাবে না।

২০০৯ সালের আগস্ট মাসে বিষয়টি নিয়ে আমেরিকায় সমীক্ষা চালায় পিউ। আর ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত সেই সমীক্ষার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, প্রতি দশ জনের মধ্যে তিন জন আমেরিকান মনে করেন তাঁরা কোনো মৃত ব্যক্তির স্পর্শ পেয়েছেন। ১৮ শতাংশ মনে করেন, তাঁরা ভূত দেখেছেন বা তার উপস্থিতি অনুভব করেছেন।

প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন। ২৩ শতাংশ মনে করেন যোগব্যায়াম একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। গবেষকরা বলেছেন, এ ব্যাপারে তাঁরা সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ রেখেছেন, পুনর্জন্ম বলতে তাঁরা যিশুখ্রিস্টের পুনর্জন্ম বোঝাননি। বরং একজন মানুষের পৃথিবীতে ফের জন্ম নেওয়াকেই বুঝিয়েছেন। আর আমেরিকানরা তা জেনেই নিজেদের মত জানিয়েছেন।

বিশাল দেশ বলে আমেরিকায় নির্জন স্থানে বহু বাড়িতে যেমন মানুষের বাস রয়েছে, তেমনই রয়েছে পরিত্যক্ত অসংখ্য বাড়িও। সেই বাড়িগুলির অনেকগুলি নিয়েই শোনা যায় নানা অদ্ভুত ঘটনার কথা। সোজা বাংলায় সেই বাড়িগুলিকে ভূতুড়ে বাড়ি বলে উল্লেখ করা যেতে পারে।

আমেরিকার সরকারও এই বিষয়ে হয়তো কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখায়। তা না হলে এমন বিষয়গুলি নিয়ে কেন আমেরিকায় আইন তৈরি হবে? শুনলে হয়তো অবাক হবেন, আমেরিকায় কোনো বাড়ি যদি ‘ভূতুড়ে’ হয়ে থাকে, আর তার মালিক যদি বাড়িটি বিক্রি করে দিতে চান, তাহলে ক্রেতাকে বাড়িটির ভৌতিক অবস্থার কথা না-জানিয়ে বিক্রি করা যাবে না।

যদিও সেক্ষেত্রে বাড়িগুলির একটি আইনি নাম রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সাইকোলজিক্যালি ইম্প্যাক্টেড’ বাড়ি কেনাবেচার কথা। আর ওই বাড়ি বলতে বোঝানো হয়েছে, যেখানে কেউ খুন হয়েছে বা আত্মহত্যা করেছে।

এই বিশেষ ক্যাটাগরির মধ্যে পড়েছে ভূতুড়ে বাড়িও। যেমন হানাবাড়ি বলে বদনাম রয়েছে এমন কোনো বাড়ি ক্রেতাকে না জানিয়ে বিক্রি করতে পারবেন না বিক্রেতা।

বিষয়টি নিয়ে মার্কিন সরকার ভাবতে বাধ্য হয় একটি মামলার রায়ের পর। ১৯৯১ সালে একটি বাড়ি এক দম্পতিকে বিক্রি করেন এক ভদ্রমহিলা। কিন্তু কিছুদিন পর ওই দম্পতি আদালতে হাজির হন। তাঁদের অভিযোগ, বাড়িটি ভৌতিক। সেকথা তাঁদের না জানিয়েই ওই ভদ্রমহিলা বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

মামলায় বিক্রেতা ভদ্রমহিলা হেরে যান। যদিও বাড়িটিকে ভৌতিক বলা যাবে কি না সেটা বিতর্কিতই থেকে গিয়েছে। কারণ, কোন অবস্থায় একটি বাড়িকে ভৌতিক বলা যাবে তা নিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো পন্থা নেই। মানে পৃথিবীর ‘শিক্ষিত’ আইন ব্যবস্থা তা সার্বিকভাবে স্বীকার করে নেয়নি। হয়তো কোনো দিন নেবেও না। তবু আমেরিকায় এমন আইন তৈরি হয়েছে!

ভিলিসকা হাউস, অ্যাটকিসন, কানসাস

আমেরিকায় বহু পুরোনো বাড়ি রয়েছে, যেগুলি ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবেই সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। এই বাড়িগুলিকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আড়াল করে রাখা হয়নি। বরং বেশ কিছু বাড়ি সকলের দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে উল্লেখ করা যেতে পারে ভিলিসকা হাউসের কথা। আইওয়ার এই বাড়িতেই একটি ভয়ংকর খুনের ঘটনা ঘটেছিল ১৯১২ সালে।

ওই বছরের ১০ জুন সকালে বাড়ির মালিক জোসিয়া মুর, তাঁর স্ত্রী, তাঁদের চার ছেলে মেয়ে হারমান, ক্যাথরিন, বয়েড ও পল এবং সেখানে আসা তাঁদের দুই বন্ধু লিনা ও ইনা স্টিলিঙ্গারকে নৃশংসভাবে ঘুমের মধ্যে কুঠার দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। খুনিকে চিহ্নিত করা বা ধরা যায়নি।

ওই ঘটনার বহুদিন পর ১৯৯৪ সালে স্থানীয় কয়েক জন ব্যক্তি মিলে বাড়িটি কিনে নেন। বাড়িটিকে মেরামত করে ১৯১২ সালে যে অবস্থায় সেটি ছিল, সেই অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। ১৯৯৮ সালে সাধারণ মানুষের দেখার জন্য বাড়িটি খুলে দেওয়া হয়। এমনকী রাতে থাকার সুযোগও দেওয়া হয়।

এই সময়েই বহু পর্যটক ওই বাড়িতে রাতে অদ্ভুত কিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। এক ডিস্ক জকি জানিয়েছেন, মধ্যরাতে ওই বাড়িতে নাকি বাচ্চাদের কথাবার্তা স্পষ্ট শুনেছেন।

কিছু মানুষ জানিয়েছেন, রাতে ওই বাড়ি ঘুরে দেখার সময় অস্বাভাবিক কিছু চলন্ত বস্তু দেখেছেন। ওই বস্তুগুলি নাকি তাঁদের ঘোরাফেরায় বাধা দিয়েছে। এ ছাড়া বাচ্চাদের হাসির শব্দও তাঁরা নাকি শুনেছেন।

অসংখ্য পর্যটক ওই বাড়িতে রাতে নানারকম অস্বাভাবিক আওয়াজ শুনেছেন বলেও দাবি করেছেন। এমনকী গভীর রাতে কুঠার-সহ কোনো এক অদ্ভুত ছায়ামানুষকে ওই বাড়িতে দেখা যায় বলে শোনা গিয়েছে। বাড়িটির ঠিকানা ৫০৮ এন সেকেণ্ড স্ট্রিট, অ্যাটকিসন, কানসাস।

স্ট্রানাহান হাউস, ফ্লোরিডা

আমেরিকায় আরও একটি ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডার ফোর্ট লাউডারডেলের স্ট্রানাহান হাউস। ১৯০৬ সালে ফ্রাঙ্ক স্ট্রানাহান তাঁর বিশাল ফেরি ব্যাবসার অংশ হিসেবে এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন।

এ ছাড়া ফোর্ট লাউডারডেলের প্রথম পোস্ট অফিস হিসেবেও নিজের ডাক ব্যবসায় এই বাড়িটি ব্যবহার করেছিলেন স্ট্রানাহান। তাঁর ব্যাবসায়িক রমরমার সমাপ্তি ঘটে ১৯২৭ সালে ভয়ংকর মন্দার কারণে। সেই সময় ভাগ্য বিপর্যয়ের পাশাপাশি বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন তিনি।

বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়েন। ১৯২৯ সালের ২৩ জুন নিজের পায়ে (বা গোড়ালিতে) লোহার দরজা বেঁধে অতলান্তিক মহাসাগরে তিনি ঝাঁপ দেন এবং ডুবে মারা যান।

তারপর থেকেই বাড়িটি সম্পর্কে নানা কথা শোনা যেতে থাকে। এখনও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলিতে এই বাড়ির রহস্যময় নানা ঘটনার কথা প্রকাশিত হয়ে থাকে। কেবল স্ট্রানাহানই নন, তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরিবারের ছয় সদস্যের অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছে এই বাড়িতেই।

শোনা যায়, এই বাড়িতে তাঁদের রহস্যময় উপস্থিতি অনেকের কাছেই ধরা পড়েছে বার বার। এখন এই বাড়িটি একটি মিউজিয়াম। প্রতিদিন দুপুর একটার পর থেকে সাধারণ দর্শকদের জন্য এই মিউজিয়াম খুলে দেওয়া হয়।

হাউস অফ ডেথ, নিউ ইয়র্ক

কথায় বলে, এই বাড়ির দরজা বন্ধ না-হলে নিউ ইয়র্ক শহর নাকি কখনো ঘুমোয় না। কারণ এই বাড়িটিতেই নাকি রয়েছে বাইশ জন মানুষের আত্মা। তারা এই বাড়িটির প্রকৃতিকে কেমন যেন ভারী ও ভয়াবহ করে রেখেছে। বাড়িটি হাউস অফ ডেথ নামেই সকলের কাছে পরিচিত।

বিভিন্ন সময় এই বাড়িতে থাকতেন অনেক বিখ্যাত মানুষ। যেমন ১৯০০ সাল থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতেই ছিলেন বিখ্যাত লেখক মার্ক টুইন। তবে এই বাড়ির সবচাইতে করুণ কাহিনি সম্ভবত একটি ছ-বছরের মেয়ের খুনের ঘটনা। ১৯৮৭ সালে ওই মেয়েটিকে নাকি পিটিয়ে মেরেই ফেলেছিল তার বাবা। মেয়েটির বাবা ছিল একজন ক্রিমিনাল প্রসিকিউটর জোয়েল স্টেইনবার্গ।

বাড়িটির মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এমন সব হিংসা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গিয়েছে যে, সেই ঘটনাগুলি বাড়িটির যেন আলাদা একটি পরিচয় দিয়েছে। অকালপ্রয়াত সেই সব মানুষকে আজও নাকি ওই বাড়িতে দেখা যায়। বিশেষ করে সেই ছ-বছরের মেয়েটি। এই বাড়ির বাসিন্দাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে তার কান্নার আওয়াজ শুনেছেন। এমনকী গভীর রাতে মেয়েটিকে ওই বাড়িতে ছোটাছুটিও করতে দেখেছেন কেউ কেউ।

অনেকে আবার দাবি করেন, মার্ক টুইনের আত্মাকেও নাকি তাঁরা দেখেছেন। যদিও মার্ক টুইনের মৃত্যু হয়েছিল ১৯১০ সালের ২১ এপ্রিল। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি কানেকটিকাটের রেডিংয়ে মারা যান।

তবু যেহেতু তিনি দুই বছর এই বাড়িতে ছিলেন, তাই এই বাড়িতে তাঁর আত্মাকে দেখা গিয়েছে বলেও শোনা যায়। যাঁরা তাঁর আত্মা দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন, তাঁদের মতে, দু-বছর থাকলেও বাড়িটি খুবই পছন্দ হয়েছিল তাঁর। তাই এই বাড়ির মায়া নাকি তিনি মৃত্যুর পরেও ত্যাগ করতে পারেননি!

ক্লেভল্যাণ্ডের ফ্রাঙ্কলিন দুর্গ, ওহিও

এবার বলা যাক ওহিওর ক্লেভল্যাণ্ডের ফ্রাঙ্কলিন দুর্গের কথা। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই অসামান্য দুর্গটি তৈরি করেছিলেন হান্স টাউডম্যান। দুর্গটির চুড়ো ছিল যথেষ্ট আকর্ষণীয় এবং চতুর্থ তলে ছিল বিশাল বল্লম। দুর্গটির ঠিকানা হল ৪৩০৮ ফ্র্যাঙ্কলিন বুলেভার্ড, ক্লিভল্যাণ্ড, ওহিও।

এই দুর্গটিকে নিয়ে অনেক ভৌতিক কাহিনি প্রচলিত আছে। তেমনই শোনা যায় নানা ধরনের কথাও। যেমন এই দুর্গের পিছন দিকের একটি ঘরে পাওয়া গিয়েছে বেশ কিছু শিশুর কঙ্কাল। আবার, এই দুর্গেই নাকি আশ্রয় নিয়েছিল কিছু নাতসি। এই খবর জেনে সেখানে যান টাউডম্যান। নাতসিদের সঙ্গে তর্ক বেঁধে যায় তাঁর। তিনি নাকি তাঁদের গুলি করে খুন করেন।

এই দুর্গ-বাড়িতেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে টাউডম্যানের ছোটোমেয়ে মারা যায়। তাঁর স্ত্রীও লিভারের রোগে ভুগে এখানেই মারা যান। এখানেই শেষ নয়। অগ্রিম নিতে অস্বীকার করায় এক ভৃত্যকে তিনি খুন করেন। এ ছাড়া নিজের রক্ষিতাকেও এখানেই তিনি মেরে ফেলেছিলেন।

ওই রক্ষিতা অন্য কাউকে বিয়ে করবে বলে মনস্থির করেছিল। তা মেনে নিতে পারেননি টাইডম্যান।

আরও একটি ঘটনার কথা শোনা যায়। এই দুর্গেই নাকি নিজের মেয়ের সঙ্গে মারামারি করেছিলেন তিনি। পরে তাঁকে খুন করে ব্যাপারটি দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য মৃত মেয়েকে বরগা থেকে ঝুলিয়ে রাখেন।

এরপর থেকে বহু বার দুর্গটির মালিকানার হাতবদল হয়েছে। কিন্তু যাঁরাই দুর্গটি কিনেছেন, তাঁরাই এটিকে মানুষের কাছে ভৌতিক বা হানাবাড়ি বলে উল্লেখ করেছেন।

এই দুর্গ-বাড়িতেই এখন রয়েছে ফ্রাঙ্কলিন ক্যাসল ক্লাব। তাঁরা দুর্গ-বাড়িটির সংস্কার করেছেন। সাধারণ মানুষের দেখার জন্য বাড়িটি খুলেও দেওয়া হয়েছে।

উইনচেস্টার মিস্ট্রি হাউস, সান জোস, ক্যালিফোর্নিয়া

উইনচেস্টার মিস্ট্রি হাউস আসলে একটি বিশাল রহস্যময় অট্টালিকা। এই বাড়িটি ক্যালিফোর্নিয়ার সানজোসে।

আরও পরিষ্কারভাবে বললে বাড়িটির ঠিকানা হল ৫২৫ সাউথ উইনচেস্টার বুলেভার্ড, সান জোস, ক্যালিফোর্নিয়া ৯৫১২৮। একসময় এই প্রাসাদোপম বাড়িটি ছিল সারাহ উইনচেস্টারের ব্যক্তিগত বাসস্থান। সারাহ ছিলেন উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টারের বিধবা পত্নী। উইলিয়াম ছিলেন একজন ‘বন্দুক ব্যবসায়ী’।

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বাড়ি কি এটিই? এ নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। তবে অট্টালিকাটির রহস্য আজও মানুষকে ভাবিয়ে চলেছে। এই ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের অট্টালিকাটি রানি অ্যানের শৈলীতে তৈরি। এই অট্টালিকা বিখ্যাত তার আকার, আয়তন ও রহস্যের জন্য। তা নিয়ে জল্পনাও কম হয়নি। এখনও আলোচনা হয়। আসলে অট্টালিকাটি তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মাস্টার প্ল্যান ছিল না। তবে অট্টালিকাটির স্থাপত্যকৌশল ছিল একটু অভিনবই।

বাড়িটি তৈরির জন্য সারাহ কোনো স্থপতির সঙ্গে পরামর্শ করেননি। প্রতিদিন সকালে তিনি হেডমিস্ত্রির সঙ্গে বসতেন আর সেদিনের কাজের নকশা তৈরি করে দিতেন। তাই একদিনের কাজের সঙ্গে অন্যদিনের কাজের কোনো মিল ছিল না। তাই বাড়িটিও তৈরি হয়েছিল এলোমেলোভাবে।

এই বাড়িটিকেই ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহাসিক ল্যাণ্ডমার্ক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থানও বলা হয় বাড়িটিকে। সেই মাপকাঠিতেই বাড়িটিকে ন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও এখন বাড়িটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি কেন্দ্র।

১৮৮১ সালের ৭ মার্চ সারাহ-র স্বামী উইলিয়াম মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে কানেকটিকাটের ওয়েস্ট হেভেনের একটি হাসপাতালে মারা যান টিউবারকুলোসিসে। উইলিয়ামের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সারাহ বিশাল সম্পত্তির মালকিন হয়ে যান। উইনচেস্টার কোম্পানির অর্ধেক মালিকানার সঙ্গে উইলিয়ামের রেখে যাওয়া দুই কোটি ডলারও পেয়ে যান।

সারাহ সুখী ছিলেন না। কারণ, তাঁদের একমাত্র সন্তানও বঁাচেনি। ১৮৬৬ সালে মাত্র এক মাস বয়সে তাঁদের মেয়ে অ্যানি মারা যায়। উইলিয়ামের মৃত্যুর পর তাই একা হয়ে যান সারাহ।

বিষয়টি তাঁর ওপর প্রবল প্রভাব ফেলে। প্রথমে একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেন তিনি। ওয়েস্ট হ্যাভেনে স্বামী উইলিয়ামের স্মরণে একটি টিবি হাসপাতাল তৈরি করেন। আর তারপরই তাঁর আচরণে চমকে যায় সকলে।

মেয়ের পর স্বামীকে হারিয়ে সারাহ কিছুতেই নিজের শোক সামলাতে পারেননি। বস্টনের এক প্রেতচর্চাকারীর সঙ্গে আলোচনা করেন।

তিনি সারাহকে বলেন, তাঁদের পরিবারের ওপর বেশ কিছু অশুভ আত্মার ক্ষোভ রয়েছে। এই অশুভ আত্মাদের মধ্যে রয়েছে আমেরিকান ইন্ডিয়ান, গৃহযুদ্ধের সেনা-সহ যারা ওই বিখ্যাত উইনচেস্টার রাইফেলের গুলিতে মারা গিয়েছে, তারা। তারাই সারাহ-র পরিবারকে শেষ করে দিতে চাইছে।

সেই ব্যক্তি তাঁকে পরামর্শ দেন, তাঁর বর্তমান বাড়ি ছেড়ে আমেরিকার পশ্চিম দিকে অন্য কোথাও নতুন বাড়ি তৈরি করতে হবে। উইলিয়ামের কোম্পানি থেকে বিক্রি হওয়া বন্দুকের গুলিতে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের আত্মা যাতে তাঁর স্ত্রীর কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেইজন্য ওই বাড়ি তৈরির কাজে তাঁকে নিজেকেই হাত দিতে হবে।

বাড়ি তৈরি নিয়ে একটি শর্তও দেওয়া হয়। ওই বাড়ি তৈরির কাজ কখনো পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। অর্থাৎ, বাড়িটি তৈরির কাজ বছরের পর বছর অনির্দিষ্ট সময় ধরে চালিয়ে যেতে হবে। আর যদি বাড়ি তৈরির কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই মৃত ব্যক্তিদের আত্মা ফের তাঁর ও তাঁর পরিবারের ক্ষতি করবে। তাই বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ হোক চাননি সারাহ।

তাঁর এমন বাড়ি তৈরি নিয়ে আরেকটি মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এভাবে ধারাবাহিকভাবে বাড়ি তৈরির ব্যাপারে যুক্ত থেকে সারাহ চাইতেন স্বামী ও সন্তানের মৃত্যুশোক ভুলে থাকতে।

প্রেতচর্চাকারীর পরামর্শ মতো সারাহ পশ্চিম দিকে সান জোসেতে চলে আসেন এবং নিজের সম্পত্তি থেকে দু-শো লক্ষ ডলার খরচ করে সাড়ে চার একর জমির উপর ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন। শোনা যায়, সারাহ যাঁদের বাড়ি তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা নাকি সাত-তলা অবধি তৈরি করা পর্যন্ত দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন।

১৮৮৪ সাল থেকে টানা আটত্রিশ বছর, মানে ১৯২২ সাল পর্যন্ত বাড়িটির নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে। সারাহ চাননি স্বামী উইলিয়াম এবং মেয়ের মতো মারা যেতে। সেইজন্য বাড়িটি তিনি গোলকধাঁধার মতো করে তৈরি করেন।

তাঁর ধারণা ছিল, মৃত ব্যক্তিদের আত্মারা বাড়িতে ঢুকলেও তাঁকে খুঁজে পাবে না। যদি কোনো কারণে সেই বাড়িতে আত্মারা ঢোকে, তবু তারা পথ হারিয়ে ফেলবে। কিছুতেই তাঁর কাছে পৌঁছোতে পারবে না।

আশ্চর্যের বিষয় হল, এত বড়ো বাড়িতে ছিল মাত্র দুটো আয়না। আজ মনে হতে পারে সারাহ উইনচেস্টার ছিলেন প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। হয়তো সেটাই স্বাভাবিক। তবে এর পরিষ্কার জবাব আজ দেওয়া বেশ কঠিন।

দুটো আয়না বাড়িতে রাখার কারণ, তাঁর ধারণা ছিল প্রেত বা আত্মারা আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে ভয় পায়।

এত সব পথ অনুসরণ করেও কিছু লাভ হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, এভাবে বাড়িটি তৈরি করলে তিনি বেঁচে থাকবেন। কিন্তু বাড়ি তৈরি চলেছিল আটত্রিশ বছর। পর ১৯২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঘুমের মধ্যেই তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ি তৈরির কাজও বন্ধ হয়ে যায়। সেই বাড়িটিই পরবর্তীকালে উইনচেস্টারের রহস্যবাড়ি হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হয়।

বাড়িটিকে বাইরে দেখলে আর-পাঁচটা সাধারণ বাড়ির মতোই দেখতে লাগে। তবে ভিতরে ঢুকলেই গোলমাল হয়ে যায়। বাড়ির নীচে থেকে একটিমাত্র সিঁড়ি সোজা চলে গিয়েছে একেবারে উপরে। হয়তো তা ছাদ। মাঝের তলাগুলির ঘরগুলিতে যাওয়ার কোনো সিঁড়ি নেই।

আবার কোনো সিঁড়ি দিয়ে কোথাও পৌঁছোনো যায় না। মাঝপথেই দেওয়ালের বাধায় থমকে যেতে হয়। অনেক স্কাইলাইট বসানো হয়েছে দু-টি ঘরের মাঝে। কোথাও একটা চিমনি রয়েছে কিন্তু তা দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার পথ নেই। দেখলে রীতিমতো হেঁয়ালি মনে হয়।

আর এমনই হেঁয়ালিতে রহস্যময় উইনচেস্টার প্রাসাদ। বাড়িতে ক-টি ঘর রয়েছে তা নিয়ে নানা কথা শোনা গিয়েছে। প্রথমে গুনে দেখা যায় বাড়িটিতে রয়েছে ১৪৮টি ঘর। পরে গুনে দেখা যায় ঘরের সংখ্যা ১৬০টি। শেষে আরও একটি ঘর খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তাই এখনও পর্যন্ত হিসাব হল ওই বাড়িতে মোট ঘর রয়েছে ১৬১টি। আর সেগুলি ছিল এলোমেলো স্থাপত্যে গড়া।

আর সেটাই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের বিষয় হয়ে রয়েছে। শোনা যায়, পর্যটকদের এই সময় নাকি গাইড করার দায়িত্ব নেয় মৃত মানুষের আত্মারাই।

সেন্ট জেমস হোটেল, সিমারন, নিউ মেক্সিকো

এবার বলা যাক এমন একটি হোটেলের কথা, যে হোটেলে বহু বার ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক নানা ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বহু প্রত্যক্ষদর্শীই। হোটেলটির নাম সেন্ট জেমস হোটেল।

নিউ মেক্সিকোর সিমারনে বিশাল বাড়িজুড়ে ১৮৭২ সালে হোটেলটি তৈরি করেন হেনরি ল্যাম্ববার্ট। তখন হোটেলটির নাম ছিল ‘ল্যাম্ববার্টস ইন’। এই হোটেলে ছিল সেলুন, রেস্তরাঁ এবং অতিথিদের জন্য ছিল ৪৩টি ঘর। অর্থাৎ, অতিথিদের যাতে কোনো অসুবিধে না-হয় তার পূর্ণ ব্যবস্থা ছিল।

এই বিশাল বাড়িটির ইতিহাস কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত নিষ্ঠুর ও রক্তাক্ত। এই হোটেলে ২৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ওয়াইল্ড ওয়েস্টের আইকনরা, যেমন—ক্লে অ্যালিসন, জিসি জেমস, ব্ল্যাক জ্যাক কেচাম এবং বাফালো বিল কোডি এই হোটেলে ঘুরে গিয়েছেন।

এই হোটেলে আসা অতিথিদের অনেকেই বহু অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, যে রহস্যগুলির সমাধান করা যায়নি। তাই সেগুলিকে ‘অমীমাংসিত রহস্য’ বলে উল্লেখ করেছেন প্যারাসাইকোলজিস্টরা।

অস্বাভাবিক কিছু ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন এই হোটেলের প্রাক্তন মালিক ছিলেন এক মহিলা। তিনি নিজে বলেছেন, ১৮ নম্বর ঘরে কেউ একজন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল।

কিন্তু তখন সেই ঘরে কেউ ছিল না। ১৮ নম্বর ঘরটিকে এই কারণে ভূতুড়ে বলে মনে করা হয়। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এই ঘরে নাকি থমাস জেমস রাইটের আত্মা বাস করে। পোকার খেলায় জিতে এই ঘরে এসেই আচমকা খুন হয়ে গিয়েছিলেন রাইট। তখন থেকেই ঘরটিতে নানা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটতে দেখা যেতে থাকে। তাই কর্মীরা ঘরটি তালাবন্ধ করে দেন এবং সেই থেকে ঘরটি এখনও অব্যবহৃত অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে।

হেনরি ল্যাম্ববার্টের দ্বিতীয় স্ত্রী মেরি এলিজাবেথ গোলাপের গন্ধযুক্ত এক ধরনের বিশেষ পারফিউম ব্যবহার করতেন। মেরি এই হোটেলে যে ঘরটিতে থাকতেন, সেই ঘরে তাঁর ব্যবহৃত পারফিউমের গন্ধ নাকি এখনও পাওয়া যায় বলে এখানে আসা বহু অতিথিই দাবি করেছেন।

এখানে বিভিন্ন জিনিস অস্বাভাবিকভাবে পড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখেছেন অনেকে। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, অনেক জিনিস নাকি অদৃশ্য-কেউ দেওয়ালে ছুড়ে মারে। এমনকী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বা সুইচও বিভিন্ন সময় অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে বলে জানিয়েছেন অতিথিরা। তেমনই অতিথিদের দাবির কথা অস্বীকার করেননি হোটেলের পুরোনো কর্মীরাও।

অতিথিদের পাশাপাশি এমন নানা ধরনের অশরীরী অস্তিত্ব এবং আত্মার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া ছাড়াও অস্বাভাবিক সব শব্দ বা আওয়াজ শোনা যাওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন হোটেলের আধিকারিকরা।

সাধারণ পর্যটকদের এই হোটেলে যেতে মানা নেই। প্রয়োজনে তাঁরা সেখানে থাকতেও পারেন। তবে পর্যটকদের সেখানে থাকা বা যাওয়ার সময় ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তন করে থাকেন হোটেল কর্তৃপক্ষ। তাই এখানে যেতে হলে হোটেলের ওয়েবসাইটটি দেখে নেওয়া উচিত।

ওয়েভার্লি হিলস সানাটোরিয়াম, কেনটাকি

এই হাসপাতালটি তৈরি হয় ১৮৮৩ সালে। প্রথমে এটি ছিল একটি বাসস্থান। পরে সেই বাসস্থান হয়ে যায় স্কুল। শেষে সেই স্কুলও উঠে যায়। তখন বাড়িটিতে তৈরি হয় একটি হাসপাতাল। নাম দেওয়া হয় ওয়েভার্লি হিলস সানাটোরিয়াম।

তবে হাসপাতালটিও টিকে থাকার কথা ছিল না। সেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, জেলখানা এবং আরও অনেক কিছু তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব কিছুই শেষপর্যন্ত হয়নি।

২০০১ সালে এই বিশাল বাড়ির মালিক হন চার্লি ও টিনা নামে দুই ব্যক্তি। যা-ই হোক, এই বাড়ির অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। তা হল, এখনও পর্যন্ত এই বাড়িতে মারা গিয়েছেন বেশ কয়েক হাজার মানুষ। একটা বাড়ি যত বড়োই হোক, তাতে যদি কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তাহলে সেই বাড়িটি অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হবে না।

প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো এই বাড়িটিও এখন হন্টেড হাউস নামে পরিচিত। রাতে নাকি নানা অশরীরীর আনাগোনা চলে এই বাড়িতে। শোনা যায় কাদের যেন কান্না এবং ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ।

নিউটন কমিউনিটি থিয়েটার, নিউটন, আইওয়া

আইওয়ার নিউটনেই রয়েছে এই নিউটন কমিউনিটি থিয়েটার। ঠিকানা হল ১৭০১ এস ৮ অ্যাভিনিউ ই, নিউটন, আইওয়া ৫০২০৮। এই কমিউনিটি থিয়েটারটিও ভূতুড়ে বলে কুখ্যাত হয়ে রয়েছে মানুষের কাছে।

১৯৬০ সালে শর্ট সার্কিট থেকে এই থিয়েটারে আগুন লেগে যায়। থিয়েটারটি পুড়ে গেলেও হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনা হল, আগুন লাগার পর থেকে স্টেজে নাকি প্রায়ই একটি অস্পষ্ট ছায়া দেখা যায়। কিন্তু,ছায়াটি কীসের, তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি আজও। ওই ছায়াটিকে নাকি স্টেজ থেকে গ্রিন রুম, লাইটিং নিয়ন্ত্রণ রুমেও দেখা যায়।

উইলিস হাউস, সান ডিয়েগো

হানাবাড়ি হিসেবে উইলিস হাউসকে কুখ্যাত বলা যায়। পৃথিবীর ভয়ংকর হানাবাড়িগুলির তালিকায় এই বাড়িটি প্রথম দিকেই থাকবে। বাড়িটি তৈরি করেছিলেন থমাস উইলি।

১৮৫৭ সালে বাড়িটি তৈরি হওয়ার কয়েক বছর আগেই সেখানে ঘটে গিয়েছিল একটি ঘটনা। সেই সময় জিম রবিনসন নামে এক ইয়াঙ্কিকে জনসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়। সেখানেই বাড়িটি তৈরি হওয়ায় সেটি নাকি জিম রবিনসনের আত্মার আক্রোশে পড়ে যায়।

বাড়িটি তৈরি হওয়ার পর তাই তা রহস্যময় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সেখানে অপঘাতে অনেক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এখানেই উইলি পরিবারের সদস্য ভায়োলেট উইলি আত্মহত্যা করেন ১৮৮৫ সালে।

শুধু তিনিই নন, উইলি পরিবারের আরও অনেক সদস্যেরই সেই বাড়িতে অকালমৃত্যু ঘটেছে। তারপরই উইলি পরিবার এবং ওই বাড়ির কথা জানেন, এমন বহু মানুষই বিশ্বাস করতে শুরু করেন, ওই সব মৃত্যুর পিছনে নাকি সেই জিম রবিনসনের আত্মাই দায়ী।

ফলে বাড়িটিও ক্রমশ হানাবাড়ি হয়ে ওঠে সকলের কাছে। বাড়িটিতে নাকি এখনও জিম রবিনসনের অতৃপ্ত আত্মার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। অনেকেই তার শীতল স্পর্শ পেয়েছেন বলে দাবি করেন।

স্টোনস পাবলিক হাউস, ম্যাসাচুসেটস

স্টোনস পাবলিক হাউস আসলে একটি দেহাতি রেস্তরাঁ ও পাব। ম্যাসাচুসেটসের অ্যাশল্যাণ্ডে ১৮৩৪ সালে খাঁটি পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর এই অট্টালিকাটি তৈরি করেছিলেন জন স্টোন। এখন এটি একটি রেস্তরাঁ ও পাব হলেও তখন এই বাড়িটি পরিচিত ছিল ‘দ্য রেলওয়ে হাউস’ নামে।

তখন এই বাড়িটি বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির খুব পছন্দের ছিল। প্রথম খোলার পরই বাড়িটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল, এখানেই ঘটে গিয়েছে কিছু দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাও। সেই মৃত ব্যক্তিদের ছায়াশরীরকে নাকি এখনও এখানে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

জন স্টোনের বড়ো প্রিয় ছিল এই বাড়িটি। এই বাড়ির পৃষ্ঠপোষক ও মালিকরা দাবি করে থাকেন, স্টোনের আত্মা নাকি সারা রাত এই বাড়ির চারদিকে এখনও ঘুরে বেড়ায়। অনেকেই নাকি সেই আত্মার অস্পষ্ট ছায়া দেখেছেন।

আবার ১৮৯০ সালে মদ্যপ অবস্থায় এখানকার ট্রেনের ট্রাক ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় বার্ট ফিলিপস নামে এক ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়েন। ১৮৬২ সালে ঘটে আরও একটি দুঃখজনক ঘটনা।

মেরি স্মিথ নামে একটি দশ বছরের মেয়ে খেলতে খেলতে এই রেলওয়ে হাউসের বাইরে চলে আসে। তারপর রেললাইনের উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কাটা পড়ে ট্রেনে। অনেকের দাবি, এখানকার সংগ্রহশালার জানালায় মেয়েটিকে নাকি এখনও গভীর রাতে দেখা যায়।

এই রেস্তরাঁর চিলেকোঠায় মেরি স্মিথের পোশাক এখনও সযত্নে রক্ষিত রয়েছে। সেই পোশাকগুলি কাউকে স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি সত্যি। স্টোনস পাবলিক হাউসের রহস্য অনুসন্ধান করেছিলেন বিখ্যাত লেখক ও সত্যসন্ধানী জেফ বেল্যাঙ্গার। তাঁর তোলা ভিডিয়ো চিত্রে দশ বছরের মেরির সেই রক্ষিত পোশাক দেখানো হয়েছে।

এই পাবলিক রেস্তরাঁটি সপ্তাহে ছ-দিন (কাজের দিন) খোলা থাকে। তবে রেস্তরাঁ কতৃপক্ষের তরফে অস্বাভাবিক ঘটনা অনুসন্ধানের অনুমতি এখন আর সহজে দেওয়া হয় না।

ক্যাপ্টেন লিণ্ডসে হাউস ইন, রকল্যাণ্ড

ক্যাপ্টেন লিণ্ডসে হাউস ইন তৈরি হয় ১৮৩৫ সালে। তখন এটি ছিল একটি ব্যক্তিগত বাসস্থান। এখানে থাকতেন জর্জ লিণ্ডসে নামে এক ক্যাপ্টেন। ১৮৩৭ সালে এই বাড়িটিই একটি শৌখিন সরাইখানায় পরিণত হয়।

মনে করা হয়, এটিই রকল্যাণ্ডের প্রথম সরাইখানা এবং ১৯০০ সাল পর্যন্ত সেটি চলেছিল। তারপর সেটি কিনে নেয় স্থানীয় ওয়াটার কোম্পানি। তখন থেকে এই বাড়ির মালিক ছিল ওই সংস্থাই। তারপর বাড়িটি কিনে নেন ক্যাপ্টেন এলেন এবং কেন বার্নস। তাঁরা বাড়িটি পুরো ভেঙে নতুন করে তৈরি করেন। নাম দেন ‘দ্য ক্যাপ্টেন লিণ্ডসে হাউস ইন’।

এই বাড়িটি থমাস্টন এবং রকপোর্টের মধ্যে উপকূলীয় রুট ১-এ অবস্থিত। পোর্টল্যাণ্ড থেকে এই বাড়ি তথা সরাইখানাটি ৮২ মাইল দূরে। এই সরাইখানার বৈশিষ্ট্য হল, এখানে ছিল বিভিন্ন দোকান, কাফে, রেস্তরাঁ, মেইন লাইটহাউস মিউজিয়াম এবং ফার্নসর্থ আর্ট মিউজিয়াম। এই সরাইখানায় ন-টি অত্যন্ত সুন্দর ঘর রয়েছে। ঘরগুলি নানারকম অ্যান্টিক বস্তু দিয়ে সাজানো।

এই ‘দ্য ক্যাপ্টেন লিণ্ডসে হাউস ইন’ নাকি হাজার এক ভৌতিক ঘটনার সাক্ষী। অনেক অশরীরী নাকি এই সরাইখানার প্রতিটি ঘরে ঘুরে বেড়ায়। তাদের মধ্যে রয়েছে নাকি স্বয়ং ক্যাপ্টেন লিণ্ডসের আত্মাও। আছে দু-টি শিশুর আত্মাও। তারা হল জেফ্রি এবং তার চার বছরের বোন এমিও।

এই সরাইখানায় নাকি রাতে নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে একটি হল অশরীরী আত্মার চলাফেরা করার শব্দ। এ ছাড়া একটি ঘরে কেউ থাকলে, তিনি পাশের ঘরে আসবাবপত্র সরানোর আওয়াজ শুনতে পান। কিন্তু সেই ঘরে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কেউ নেই। আর, আসবাবপত্রও একইরকম ভাবে রাখা রয়েছে। সরানো হয়নি।

আবার কোনো কোনো সময় এখানকার ঘরগুলির দরজা নিজে থেকেই খোলে এবং বন্ধও হয়। কোনো মানুষকে সেখানে দেখা যায় না। সরাইখানায় আসা অতিথিরা এবং এখানে যাঁরা কাজ করেন তাঁরাও অনেক বার রিপোর্ট করেছেন, ঘরের বিছানা তৈরি করে বাইরে গেলে ফিরে এসে দেখা যায় বিছানাটি এলোমেলো হয়ে রয়েছে। দেখে মনে হবে কেউ যেন সেখানে বসেছিল।

প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার সাহায্যে ‘দ্য ক্যাপ্টেন লিণ্ডসে হাউস ইন’-এর ন-টি ঘরেরই ছবি তোলেন। সেই সব ছবিতে ফাঁকা ঘরের পাশাপাশি মানুষের অক্ষিগোলকের অস্পষ্ট ছবিও ধরা পড়েছে। অথচ তখন কোনো মানুষই সেখানে ছিল না।

লালাউরি হাউস, নিউ অর্লিন্স, লুইসিয়ানা

বাড়িটির মালিকানায় হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা নিকোলাস কেগের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাই এই বাড়ি সম্পর্কে আগ্রহ অনেকেরই। বাড়িটি ভূতুড়ে ফরাসি কোয়ার্টার হিসেবেই সকলের কাছে চিহ্নিত। তবে এই বাড়িরও একটি ইতিহাস আছে। বাড়িটির ঠিকানা ১১৪০ রয়্যাল স্ট্রিট, নিউ অর্লিন্স, লুইসিয়ানা।

এই বাড়িটি সম্পর্কে যে ভৌতিক কাহিনি শোনা যায়, তা নিয়ে টিভি সিরিয়ালও তৈরি হয়েছে। ‘আমেরিকান হরর স্টোরি’ নামে সেই সিরিয়ালে এই লালাউরি হাউসের ঘটনা দেখানো হয়। উল্লেখ্য, ওই সিরিয়ালটিতে ভৌতিক কিন্তু বাস্তব ঘটনা দেখানো হত। ওই সিরিয়ালে মাদাম দেলফিন লালাউরির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী ক্যাথি বেটস।

মাদাম দেলফিন লালাউরি ছিলেন নৃশংস প্রকৃতির এক মহিলা। রয়্যাল স্ট্রিটের এই বিশাল বাড়িটি ছিল তাঁরই। ক্রীতদাসদের ওপর নির্যাতন করার জন্য সেখানে একটি চেম্বারও তৈরি করেছিলেন তিনি।

১৮৩১ সাল থেকে ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত তাঁর নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন বহু ক্রীতদাস। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হয়েছিল আক্রান্তদের মধ্যে। আর, তার ফলেই ওই গোপন কাহিনি প্রকাশ্যে চলে আসে।

লালাউরির শিকার দাসদের মধ্যে যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেরই অতৃপ্ত আত্মা নাকি এই বাড়িটিতেই রয়ে গিয়েছে। বেশি রাতে ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করেন, তাঁরা অদ্ভুত চিৎকার এবং কখনো কখনো কান্নার শব্দ শুনতে পান। কেউ কেউ আবার বলেছেন, তাঁরা নাকি ওই বাড়ির উপরতলার জানালায় কারও মুখ দেখেছেন। কখনো কখনো কোনো কোনো মুখ তাঁদের বিকৃত মনে হয়েছে।

তবে বাড়ির এই ভৌতিক চরিত্র বা তার অতীত ইতিহাস কিন্তু ধনী ক্রেতাদের অনুৎসাহিত করেনি। তাই বাড়ির মালিকানা হাতবদল হতে অসুবিধে হয়নি। ২০০৯ সালে বাড়িটি ঋণগ্রহীতার ঋণখেলাপের কোপে পড়ার আগে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা নিকোলাসে কেগ ছিলেন বাড়িটির মালিক। এখন এক প্রভাবশালী ধনী তেল ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এই বাড়ির দলিল।

ইস্টার্ন স্টেট জেল, পেনসিলভানিয়া

ভয়ংকর জেল বললেও কম বলা হবে এই ইস্টার্ন স্টেট কারাগারকে। ১৮২৯ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই কারাগারটি সরকারিভাবে ব্যবহৃত হত।

১৪২ বছর ধরে এখানে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এখানকার গার্ড টাওয়ারে নাকি এক ব্যক্তিকে বসে থাকতে দেখা যায়। কথা হল, ওই টাওয়ারে কেউই বসে থাকে না। যাকে বসে থাকতে দেখা যায়, অনেক তল্লাশি করেও তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি।

অনেকেরই বক্তব্য, সেই ব্যক্তি কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, সেটি আসলে কোনো অশরীরী। এ ছাড়াও রাতের দিকে মাঝে মাঝে কাদের যেন অট্টহাসি শোনা যায়। কারা হাসে, অনেক অনুসন্ধান চালিয়েও তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। পাওয়া গিয়েছে অদ্ভুত পায়ের ছাপ। কিন্তু সেই ছাপ কার, জানা যায়নি অনেক চেষ্টা করেও। সেখানে এমনই অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলে রাতভর।

বেল উইটচ ফার্ম, অ্যাডামস, টেনেসি

এই ফার্মটি বেলের জাদুকরি গুহা বা বেল ফার্ম হন্টিং হিসেবেই জনপ্রিয়। ঠিকানা ৪৩০ কিসবার্গ রোড, অ্যাডামস, টেনেসি। এই বাড়িটিও আমেরিকার মানুষের কাছে ভয়ংকর রহস্য-বাড়ি বলে চিহ্নিত।

যদিও এই বাড়িটি নিয়ে রয়েছে একটি প্রতিহিংসার করুণ কাহিনি। ১৮১৭ সাল থেকে ১৮২১ সালের মধ্যে কেট বাট নামে এক মহিলার আত্মা বেল পরিবারের মধ্যে ঢুকে পড়ে। অত্যাচার শুরু করে বেল পরিবারের ওপর।

তখন বেল পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই নাকি নানারকম অতিপ্রাকৃত ঘটনার মুখোমুখি হন। এমনকী শারীরিক দিক থেকেও আক্রান্ত হন কেউ কেউ। অনেকসময় রাতের শেষ দিকে তাঁরা শুনতে পেয়েছেন, মেঝে দিয়ে লোহার চেন টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। দেওয়ালে কিছুর আঘাত লাগার আওয়াজও পেয়েছেন অনেকে।

এই প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে কেট বাটের কথা। বেল পরিবারেরই প্রতিবেশী ছিলেন কেট। তাঁর সন্দেহ ছিল, জন বেল তাঁকে প্রতারণা করে কিছু জমি হাতিয়ে নিয়েছেন। তাই তার প্রতিশোধ নিতে ওই মহিলা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।

কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। জমি-সম্পত্তি হারানোর শোকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুশয্যায় তিনি নাকি বলেছিলেন, মারা গেলেও তিনি বেল পরিবারের কাউকে ভালো থাকতে দেবেন না। তাঁদের ওপর নানারকম সমস্যা তৈরি করবেন তিনি।

নিজের কথা রেখেছিলেন কেট। মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা বেল পরিবারের সকলের ওপর অত্যাচার শুরু করে। তাঁর অত্যাচার থেকে বাদ যাননি পরিবারের কর্তা জন বেলও। সেই সময় জন বেল হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এটাকেই সুযোগ হিসেবে নেয় কেটের আত্মা। অন্তত বেল পরিবারের বিশ্বাস ছিল তা-ই।

মনে করা হয়, জন বেলের স্নায়ুতন্ত্রের কোনো সমস্যা হয়। অনেক ডাক্তার দেখানো হলেও তিনি সুস্থ হননি। শেষপর্যন্ত একটি ওষুধ খেয়েই জন মারা যান। কিন্তু সেই ওষুধ কে তাঁকে দিয়েছে, তার জবাব তারা পায়নি। বিষয়টি নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করে।

বেল পরিবারের ধারণা ছিল, জন বেলের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। তাই বিষয়টি পরিষ্কার জানার জন্য তাঁরা প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়।

বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞরা সেখানে আসেন। তাঁরা জন বেলের বিছানার পাশে একটি শিশি পান। তাতে ছিল কালো রঙের তরল জাতীয় কোনো বস্তু। মনে করা হয়, ওই তরল পান করেই মারা যান জন।

প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরা তখন কেটের আত্মার সম্মুখীন হন। বিষয়টি নিয়ে সেই আত্মাকে প্রশ্ন করেন বিশেষজ্ঞরা। জানতে চান, এটা কীসের শিশি?

কেটের আত্মা জানায়, সেটি নাকি একটি ওষুধের শিশি।

আর সেই ওষুধ দেওয়া হয়েছিল পরিবারের কর্তা জন বেলকে। ব্যাপারটা তখন যেন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায় প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞদের কাছে।

বেলবাড়িতে অনেক বিড়াল বাস করত। বিশেষজ্ঞরা তখন সেই শিশি থেকে কিছুটা ওষুধ একটি বিড়ালকে দেন। বিড়াল সেই ওষুধ খায়ও। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বিড়ালটি মারা যায়।

এরপর প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞদের আর সন্দেহ রইল না যে, কেটের ওই ওষুধ ছিল আসলে বিষ। আর তা খেয়েই মারা গিয়েছেন জন বেল।

তারপর থেকে ওই বাড়িটি আরও ভয়ংকর রহস্যময় হয়ে ওঠে। মনে করা হয় কেট বাটের পাশাপাশি জন বেলের আত্মাও ওই বাড়ি এবং বাড়ির আশেপাশে নাকি ঘুরে বেড়ায়। অনেকেই দু-জনের অশরীরী আত্মাকে সেখানে দেখেছেন বলে দাবিও করেছেন।

শুধু তাই নয়, গভীর রাতে বিকৃত দেখতে কিছু পশুকেও সেই ফার্মে নাকি ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। সেই পশুগুলির মধ্যে একটি কুকুরও রয়েছে, যার মাথাটি অবিকল ইঁদুরের মতো।

পশুগুলি হিংস্র প্রকৃতির। একইসঙ্গে তাদের চিৎকারও ভয়ংকর। রাতে এমন সব পশুকে ফার্মের চারপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন অনেকেই।

এখন অবশ্য পর্যটকদের জন্য এই বেল ফার্মের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে আণ্ডারগ্রাউণ্ড চেম্বার এবং পুনর্নির্মীয়মাণ কেবিনও দেখতে যান পর্যটকরা। সেখানে প্রতি বছর বেল উইটচ ফেস্টিভ্যাল বা বেল জাদুকরি উৎসব হয়। সেই উৎসবেও অনেক আগ্রহী যোগ দিতে যান।

সামারউইণ্ড ম্যানসন, ভিলাস কাউন্টি, এস্কনসিন

পৃথিবীতে কুখ্যাত ভূতুড়ে বাড়িগুলির মধ্যে অন্যতম হল এই সামারউইণ্ড ম্যানসন। বিশ শতকের গোড়ার দিকে আমেরিকার এস্কনসিনের ভিলাস কাউন্টিতে এই বাড়িটি তৈরি হয়। ১৯১৬ সালে বাড়িটি কিনে নেন রবার্ট প্যাটারসন ল্যামন্ট।

তিনি নতুন করে সাজান বাড়িটিকে। নাম দেন ল্যামন্ট ম্যানসন। বাড়িটি আগেই ভূতুড়ে বলে গুজব ছিল। তিনি সেসবে কান দেননি। প্রথমে বাড়িতে থাকতে তাঁর অসুবিধে হয়নি। কিন্তু কদিন পরই অবস্থা বদলায়। অশরীরীরা রীতিমতো উৎপাত শুরু করে। শোনা যায়, অশরীরীদের লক্ষ্য করে ল্যামন্ট নাকি গুলিও ছোড়েন। একটি ঘরের দরজায় দু-টি গুলির দাগ এখনও আছে।

শেষে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি নিজের পরিবার নিয়ে ১৯৩০ সালে বাড়িটি ছেড়ে চলে যান। তারপর চল্লিশ বছর বাড়িটি ফাঁকা পড়েছিল। ১৯৭০ সালে বাড়িটির মালিকানা যায় জিঞ্জার হিউয়েনসাউ এবং আর্নল্ড হিউয়েনসাউয়ের হাতে। তাঁরাও ওই বাড়িতে নানা অতিপ্রাকৃত শক্তির মুখোমুখি হন।

প্রায় রাতে এক অশরীরী নারী-অবয়ব তাঁরা দেখতে পেতেন। রাতের দিকে বাড়ির বেসমেন্টে কাদের যেন ফিসফিস শব্দও শোনা যেত। এই সময় নাকি আর্নল্ড হিউয়েনসাউ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপর বাড়িটি বিক্রির কথা ভাবতে শুরু করেন তাঁরা। জিঞ্জারের বাবা দুই সম্ভাব্য ক্রেতাকে ওই বাড়িতে নিয়ে যান।

তাঁরা সেখানে রেস্তরাঁ তৈরির কথা ভাবেন। কিন্তু কাজ শুরু হলে ভূতুড়ে তান্ডব বেড়ে যায়। জিনিসপত্র উধাও হয়ে যেতে থাকে। অনেক খুঁজেও সেই সব জিনিস পাওয়া যায়নি। ফলে রেস্তরাঁ তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

বাড়িটি কিছুদিন ফাঁকা পড়েছিল। ১৯৮৮ সালে বাড়িটির কিছু অংশ পুড়ে যায়। ২০১৪ সালে বাড়িটি কিনে নেন হ্যারল্ড ও বব ট্রেসি। বাড়িটি ভেঙে নতুন করে তৈরির সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। ২০০৫ সালের নভেম্বরে ডিসকভারি চ্যানেলে বাড়িটির রহস্যময়তা নিয়ে একটি অনুষ্ঠানও সম্প্রচারিত হয়েছিল।

ওহিও ইউনিভার্সিটি, এথেন্স, আমেরিকা

ওহিও ইউনিভার্সিটি আমেরিকার একটি বিখ্যাত ও অন্যতম জনপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। পেশাগত ক্ষেত্রে বহু নামি ব্যক্তিই একসময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রয়েছে।

কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের প্রকৃতি নাকি স্বাভাবিক নয়। অনেকেই এই ক্যাম্পাসকে ভূতুড়ে বলে উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে একটি তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাসে রয়েছে পাঁচটি কবর। আর এই পাঁচটি কবর এমনভাবে রয়েছে, যা একটি পঞ্চভুজ তৈরি করেছে।

ওহিও ইউনিভার্সিটির অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংটি ওই পঞ্চভুজ বা পাঁচটি কবরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। স্বভাবতই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংটির ওপর অশরীরী শক্তির প্রভাব রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। কেউ কেউ মনে করেন, ওই পাঁচটি কবরের কারণেই ওহিও ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটি কখনো কখনো অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁরা বলেছেন, জেফারসন হলের কবরে প্রায়ই অশরীরী আত্মা ঘুরে বেড়ায়।

আবার ক্যাম্পাসেই রয়েছে পরিত্যক্ত মানসিক রোগীর অ্যাসাইলাম। সেখানে চিকিৎসার জন্য বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সেই জায়গাটিও পরে রহস্যময় হয়ে ওঠে। অনেকেরই সেখানে অদ্ভুত অনেক কিছু নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন।

চার্লসগেট হোটেল, বস্টন

একসময় বস্টনের এই চার্লসগেট হোটেলটিকে বস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা হস্টেল হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের কাছে হোটেলটি বেশ জনপ্রিয়ও ছিল। কিন্তু একবার এই হোটেলেই এক ছাত্র আত্মহত্যা করে।

এই ঘটনায় সেখানে শোরগোল পড়ে যায়। ফলে হোটেল কর্তৃপক্ষ মালিকানা ছেড়ে দেয়। ১৯৮১ সালে হোটেলের মালিকানা তারা বেচে দেয় এমারসন কলেজকে। তাতে কিন্তু হোটেলের অঘটন আটকানো যায়নি।

কলেজেরই এক ছাত্রী আচমকাই এখানকার লিফটে আটকে যায়। অথচ সেখানে আটকে যাওয়ার কোনো কারণ কলেজ কতৃপক্ষ খুঁজে পায়নি। কিন্তু ওই অস্বাভাবিকভাবেই ছাত্রীটির মৃত্যু হয়। তারপরই এই হোটেলটি সম্পর্কে নানা কথা শোনা যেতে থাকে।

অনেকে হোটেলটিকে ভূতুড়ে বলে আখ্যা দেয়। এরপরই নানা ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। অনেক শিক্ষার্থীকে নাকি বিভিন্ন অশরীরী ছায়া নানারকম ইঙ্গিত দেয়। ব্যাপারটা নিয়ে তারাই অনুসন্ধানে নামে। তখন জানা যায় অতীতের একটি অস্বাভাবিক তথ্য।

তথ্যটি হল, ওই হোটেলে নাকি একসময় কালো জাদুর চর্চা হত। আর তার প্রমাণ শিক্ষার্থীরা পায় হোটেলের একটি গোপন কামরার দেওয়ালে। সেখানে নানারকম রহস্যময় ছবি ও সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা ছিল।

নানা বিতর্কের পর ১৯৯৪ সালে হোটেলটি নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। তখন হোটেলটি কনডোমিনিয়ামে রূপান্তরিত হয়।

গেটিসবার্গ ব্যাটলফিল্ড, গেটিসবার্গ, পেনসিলভানিয়া

গেটিসবার্গের ব্যাটলফিল্ডের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। এই জায়গাটি আসলে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। আর এই যুদ্ধক্ষেত্রটি পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গে অবস্থিত। এই যুদ্ধক্ষেত্রটিকে মার্কিন সরকারের তরফে জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

গেটিসবার্গের যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৬৩ সালের ১ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত। যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গেই। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় এই সংঘাত বেঁধেছিল ইউনিয়ন ও কনফেডারেট বাহিনীর মধ্যে। যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা সভ্যজগৎকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আর সেই মৃত্যুই যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল।

ইউনিয়নের মেজর জেনারেল জর্জ মেডের সেনারা হেরে গিয়েছিল উত্তর ভার্জিনিয়ার কনফেডারেট জেনারেল রবার্ট ই লি-র সেনাদের কাছে। তাতে জেনারেল লি-র উত্তরাভিযানের সমাপ্তি ঘটে। বলা হয়ে থাকে, দুই সেনাবাহিনী মিলিয়ে হতাহতের সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার থেকে ৫১ হাজারের মতো।

ইউনিয়ন বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৫৫ জন। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১৫৫ জন, আহত ১৪ হাজার ৫৩১ জন এবং বিপক্ষের হাতে ধরা পড়েছিলেন বা নিখোঁজ হয়ে যান ৫ হাজার ৩৬৯ জন।

অন্যদিকে, কনফেডারেট বাহিনীর হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা হিসাব বা অনুমান করা বেশ কঠিন। অনেক লেখকের দাবি, কনফেডারেট বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার। ২০০৫ সালে শেষ যে হিসাব পাওয়া গিয়েছে, তা হল গেটিসবার্গের যুদ্ধে তাদের হতাহতের সংখ্যা ২৩ হাজার ২৩১ জন। তাঁদের মধ্যে নিহত ৪ হাজার ৭০৮ জন, আহত ১২ হাজার ৬৯৩ জন এবং ধৃত বা নিখোঁজ ৫ হাজার ৮৩০ জন।

এত মৃত্যুর ঘটনাই এই যুদ্ধক্ষেত্রকে ভয়াবহ করে তোলে। বলা হয়ে থাকে, এখানে নাকি অতিপ্রাকৃত শক্তির মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। অনেকে সেই সব ঘটনা প্রত্যক্ষও করেছেন বলে জানিয়েছেন।

প্রায়ই এখানে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটার কথা শোনা যায়। কখনো নাকি এখানে গোলাগুলি চলার শব্দ শোনা যায়। অথবা, কখনো গুলিবিদ্ধ কোনো সেনার যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠার আওয়াজও কেউ কেউ শুনতে পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ শুনেছেন ভারী বুটের আওয়াজ। অনেকসময় দলবদ্ধভাবে একদল সেনাকে দূর থেকে ছুটে যেতেও দেখেছেন অনেকে।

এই যুদ্ধক্ষেত্রকে আমেরিকার সবচাইতে ভয়ংকর ভূতুড়ে স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হয়। অনেকেই রাতে এই যুদ্ধক্ষেত্র এড়িয়ে চলেন।

ইউএস রুট ৪৪, ম্যাসাচুসেটস

ইউএস রুট ৪৪ হল আমেরিকার একটি পূর্ব-পশ্চিম হাইওয়ে। এই রাস্তা ৩৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ। আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চারটি রাজ্যের ওপর দিয়ে এই রাস্তা গিয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের প্লিমাউথের ম্যাসাচুসেটস রুট ৩এ হল এই রাস্তার পূর্ব টার্মিনাস।

ম্যাসাচুসেটসের পথে এই ইউএস রুট ৪৪-এ গভীর রাতে এক আশ্চর্য পুরুষকে নাকি দেখা যায়। পুরুষটির লাল চুল। মুখে বেশ বড়ো দাড়ি-গোঁফ। পরনে জিন্সের প্যান্ট। গায়ে থাকে লাল ফ্লানেলের শার্ট।

রাতে ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে অনেকেই সেই পুরুষটিকে দেখে থাকেন। পুরুষটি নাকি হাঁটতে থাকে। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে সেশেষপর্যন্ত কোথায় যায়, তা কেউই জানেন না বা বলা ভালো জানতে পারেননি।

বেশ কয়েক বার অনেক অত্যুৎসাহী মানুষ লোকটির অনুসন্ধান শুরু করেন। বেশ কয়েক বার তাকে অনুসরণও করা হয়। কিন্তু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লোকটি কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। ব্যাপারটির মীমাংসা করতে না-পেরে শেষে কয়েক জন ব্যক্তি পুলিশের শরণাপন্ন হন।

শেষে তাঁদের বর্ণনা শুনে এক পুলিশকর্তা লোকটিকে চিনতে পারেন। তিনিই ফাইলপত্র ঘেঁটে ওই রাস্তায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলির রিপোর্ট বের করেন। খুঁজতে খুঁজতে একটি রিপোর্টে থাকা এক ব্যক্তির ছবি বের করেন। অনুসন্ধানকারীদের বর্ণনার সঙ্গে ওই লোকটির চেহারা মিলে যায়।

অনুসন্ধানকারীরাও ছবি দেখে চিনতে পারেন। লাল চুলের সেই পুরুষটি, যে ম্যাসাচুসেটসের সেই ইউএস রুট ৪৪ ধরে হেঁটে চলে। বেশ কয়েক বছর আগে লাল চুলের পুরুষটি ওই রাস্তাতেই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে।

এখনও নাকি ওই রাস্তায় সেই লাল চুলের পুরুষটিকে একইভাবে হেঁটে যেতে দেখা যায়। অনেকেই দেখেন, তবে আর আগ্রহ প্রকাশ করেন না কেউই।

স্ট্যানলি হোটেল, এস্টেট, কলোরাডো

হোটেলটি তৈরি হয় ১৯০৯ সালে। সেই সময় অভিজাত আমেরিকানদের অনেকেরই একটা হবি ছিল ঘুরে বেড়ানো। এই অভিজাত শ্রেণির মানুষদের মধ্যে যাঁরা কলোরাডোয় আসতেন, মূলত তাঁদের আকর্ষণের কথা ভেবেই ফ্রিলান অস্কার স্ট্যানলি এই হোটেলটি এস্টেট পার্ক শহরে তৈরি করেন। হোটেলে পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু যে উদ্দেশ্যে হোটেলটি তৈরি করেছিলেন স্ট্যানলি, তার চেয়ে অন্য কারণে হোটেলটি বিখ্যাত হয়ে যায়। হোটেলটি চালু হওয়ার পরই সেখানে নানারকম অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এইসব কারণে হোটেলটি শেষপর্যন্ত ‘ভৌতিক হোটেল’ হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিত হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত ভূতুড়ে হোটেলের তালিকা করা হলে সেই তালিকায় এই হোটেলটি প্রথম দিকেই থাকবে।

যাঁরা সেই হোটেলে গিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই সেখানকার নানারকম ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সকলের বক্তব্যে সবথেকে বেশি উঠে এসেছে ফ্লোরা স্ট্যানলির কথা। ফ্লোরা ছিলেন এই হোটেলের মালিক ফ্রিলান অস্কারের স্ত্রী। ফ্লোরার প্রেত নাকি প্রতি রাতে এই হোটেলের প্রতিটি ঘরেই ঘুরে বেড়ায়। আর সেই দৃশ্য নাকি হোটেলে আসা অনেক পর্যটকই দেখেছেন।

ফ্লোরা দেখতে যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমনই ভালো পিয়ানো বাজাতে জানতেন। হোটেলে থাকতে আসা পর্যটকদের অনেকেই রাতে সেই পিয়ানো বাজানোর আওয়াজ শুনেছেন। অনেকে সেই আওয়াজের অনুসন্ধান করতে গিয়ে এক সুন্দরী নারীকে পিয়ানো বাজাতে দেখেছেন। তাঁরা পরে জেনেছেন, ওই সুন্দরী নারী আর কেউ নন, স্বয়ং ফ্রিলান অস্কার স্ট্যানলির প্রয়াত স্ত্রী।

হোটেলের এমন সব অস্বাভাবিক ঘটনার কথা শুনেছিলেন সাহিত্যিক স্টিফেন কিং। সেই সব শোনা ঘটনাই তাঁকে হোটেলটি সম্পর্কে জানতে উৎসাহী করে তোলে। সময় হিসাব করে এক অফ সিজনে তিনি নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন সেই হোটেলে। অফ সিজন থাকায় তখন হোটেলে পর্যটক প্রায় ছিলই না বললে চলে। তাই হোটেলে ঘর পেতে তাঁর অসুবিধে হয়নি।

তারপর বেশ কয়েক রাত তিনি কাটান সেই রহস্যময় স্ট্যানলি হোটেলে। তাঁর ঘরের নম্বর ছিল ২১৭। হোটেলের নিস্তব্ধ আঙিনা, অন্ধকার দীর্ঘ করিডোর, মনুষ্যবিহীন বিশাল ডাইনিং রুম আর পাশাপাশি ঘরগুলি দেখলেই মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগে। কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয়। সেখানে কয়েকটা রাত স্টিফেনের কাটে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

সারা রাত ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই স্টিফেন শুনতেন অদ্ভুত সব আওয়াজ। মনে হত সারা হোটেলে যেন কেউ হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে। কোনো কোনো সময় জুতোর আওয়াজ শুনে মনে হত যেন কোনো নারী হেঁটে যাচ্ছে।

কখনো কখনো কেউ যেন হঠাৎই চিৎকার করে উঠত। আরও এমন কিছু অদ্ভুত আওয়াজ তিনি শুনেছেন, যার ব্যাখ্যা তিনি পাননি। শেষ রাতে দেখেছিলেন ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।

স্ট্যানলি হোটেলে তিনি যে ক-টি ভয়াবহ রাত কাটিয়েছিলেন, তাঁকে পুরোপুরি সঙ্গ দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী। হয়তো স্টিফেনের সঙ্গে থাকতে থাকতে তাঁরও বেশ সাহস বেড়ে গিয়েছিল। অন্য কোনো নারী হলে হয়তো ভয়েই হোটেল ছেড়ে চলে যেতেন।

হোটেলের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাই স্টিফেন কিং ফুটিয়ে তোলেন তাঁর লেখা একটি বিখ্যাত উপন্যাসের পাতায়। উপন্যাসটির নাম ‘দ্য সাইনিং’। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। উপন্যাসটি বেস্ট সেলার হরর উপন্যাসের স্বীকৃতি পায়।

এই উপন্যাসটি নিয়ে হলিউডে একটি সিনেমাও তৈরি হয়। সিনেমাটির নামও ‘দ্য সাইনিং’। সিনেমার নির্মাতা নিজেও আগ্রহী হয়ে ওই হোটেলে গিয়ে রাত কাটিয়েছিলেন। তিনিও সেখানে অস্বাভাবিক সমস্ত ঘটনার সাক্ষী হন। তিনিও রাত কাটান ২১৭ নম্বর ঘরে।

রাতে তিনিও শুনেছেন পাশের ঘরে অশরীরী আত্মাদের পাশা খেলার আওয়াজ। খেলার ফাঁকে আত্মারা নাকি চিৎকারও করে উঠত। হোটেলের বিভিন্ন ঘরে, করিডোরে এবং এমনকী নিজের ঘরেও আত্মাদের যাতায়াত করার শব্দ তিনি পেয়েছেন, অনুভবও করেছেন তাদের অস্তিত্ব।

পিয়ানোর শব্দের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি কোনো নারীকে দেখেননি। তবে দেখেছেন, নিজে থেকেই পিয়ানোর কি-গুলি চলছে। ২০১৬ সালে জনপ্রিয় টেলিভিশন শো ঘোস্ট হান্টারের একটি পর্ব তৈরি হয় এই স্ট্যানলি হোটেলকে নিয়ে। রহস্যের স্বাদ পেতেই এখনও অনেকে সেখানে যান।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%