উপমন্যু রায়
ছবির দেশ কবিতার দেশ।
যে দেশে ট্রেনে-বাসে যাতায়াতের সময় মানুষের হাতে উঠে আসে কবিতার বই, গল্প-উপন্যাসের বই; যে দেশে এক বার না গেলে কোনো ছবি আঁকিয়েরই জীবন সার্থক হয় না, সেই দেশটির নাম ফ্রান্স। বিনোদনের হাজার এক উপকরণ আজ এই একুশ শতকে মানুষের হাতে উঠে এসেছে। তার প্রভাব হয়তো দুই মলাটের বইয়ের ওপর অনেকটাই পড়েছে। তবু ফ্রান্সের শিরা-উপশিরায় সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি প্রেম এখনও হারিয়ে যায়নি। আজও শিল্পী-সাহিত্যিকদের মর্যাদা সেদেশে অনেকখানিই।
ফ্রান্স সারা পৃথিবীতে ছবির দেশ কবিতার দেশ হিসেবেই বিখ্যাত। অবশ্য প্রাচীন কাল থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ শিল্প-কলা-সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। ফ্রান্সের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গ্রিস, ইটালি, স্পেন, জার্মানি, রাশিয়া, বেলজিয়াম, ইংল্যাণ্ড বা ডেনমার্ক সব দেশেরই একটা গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে।
তবে সমস্ত দেশের মধ্যে ফ্রান্সের জায়গাটা বোধ করি একটু অন্যরকম। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতা। সমস্ত কিছুর মধ্যে নিজস্ব স্বতন্ত্র একটা স্থান এই একুশ শতকেও ধরে রাখতে পেরেছে তারা।
সারা পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর ফ্রান্সে ঘুরতে যান। দেখে আসেন সেদেশের মানুষ ও তাঁদের শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিকে। তবে এই লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষও থাকেন, যাঁরা শুধু ফ্রান্সের শিল্প বা সংস্কৃতিকেই পরখ করতে যান না, যান অন্য কারণে। যান সেদেশের রহস্যে-ঘেরা কিছু জায়গার অশরীরী মাধুর্য অনুভব করতে।
সাহিত্য-সংস্কৃতির দেশ ফ্রান্সের মননে বাস্তব-পরাবাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এ দেশে রহস্যে ঘেরা বাড়ি বা প্রাসাদের সংখ্যা যেমন কম নয়, তেমনই অপমৃত্যুর কাহিনিও কম নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর এবং মেরুদন্ড হিম করে দেওয়া জায়গাগুলির বেশ কিছু রয়েছে এই ফ্রান্সেই।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞ থেকে রহস্যপ্রিয় বহু মানুষ সেই রহস্য-রোমাঞ্চ যাচাই করে গিয়েছেন ফ্রান্সের সেই সব জায়গায়। শুধু কথার কথা শুনে তাঁরা সেই স্থানগুলির বৈশিষ্ট্য স্বীকার করে নেননি। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর তাঁদের অধিকাংশই মেনে নিয়েছেন ফ্রান্সের ভয়ংকর ভৌতিক বাড়ি বা জায়গাগুলি নিয়ে বিভিন্ন মানুষের দাবি।
শাতো দ্য ব্রিসাক
শাতো ফরাসি শব্দ। এর অর্থ দুর্গ। এই প্রাসাদোপম দুর্গটি তৈরি হয় একাদশ শতকে। রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের সময় ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে ফ্রান্স জিতলে এই দুর্গ তৈরির জন্য গিওম দ্য রোজকে রাজা নিজের সম্পত্তির কিছু অংশ দেন। কিন্তু ধর্মযুদ্ধের সময় এই শাতো দ্য ব্রিসাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফ্রান্সের রাজা সপ্তম শার্লের ইচ্ছায় পঞ্চদশ শতকে এই প্রাসাদ বা দুর্গটি নতুন করে তৈরি করা হয়। তৈরি করেন সপ্তম শার্লের ধনী প্রধানমন্ত্রী পিয়ের দ্য ব্রেজ। ফরাসি বিপ্লবের সময় শার্লের উত্তরপুরুষরা এই শাতো নষ্ট করে ফেলেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিসাকের ডিউকরা ফের এই শাতোর ব্যাপক সংস্কার করেন।
তারপর প্রায় দেড়শো বছর পরে এই শাতো এখনও ব্রিসাকের ডিউকের হাতেই রয়েছে। বর্তমান ডিউকের বাসস্থান হিসেবেও এখন এই শাতো পরিচিত। এখন সাধারণ পর্যটকরা এই প্রাসাদ-দুর্গটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।
শুধু স্থাপত্য বা ঐতিহাসিক কারণেই যে পর্যটকরা এই শাতো দেখতে যান তা নয়। এর পিছনে রয়েছে আরও অনেক কারণ। বিশেষ করে অতিপ্রাকৃত নানা ঘটনা এই শাতোকে রহস্যপ্রিয় মানুষের মনে অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে জায়গা করে দিয়েছে।
প্রায় হাজার বছর ধরে বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই প্রাসাদ-দুর্গ। একাদশ শতকে এক বীভৎস জোড়া খুনেরও ঘটনা ঘটে গিয়েছে এখানে। এত বছর পরেও আজও এই প্রাসাদ-দুর্গের শিরা-উপশিরায় সেই ঘটনার ছায়া নাকি ভেসে বেড়ায়।
এই প্রাসাদের রহস্যের কথা বলতে গেলে পঞ্চদশ শতকের এক মহিলার কথাও একইসঙ্গে উঠে আসে। তিনি ‘গ্রিন লেডি’ নামে সকলের কাছে পরিচিত। সেই মহিলাটিকে এখনও নাকি এই প্রাসাদের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। সবুজ রঙের পোশাক থাকে তাঁর পরনে। কিন্তু তাঁর মুখটা যেন পচা-গলা মৃতদেহের মতো। গভীর রাতে এই মহিলার হাহাকার এবং আর্তনাদ নাকি এখনও শোনা যায় ওই শাতোয়।
সেই মহিলার নাম শার্লোত দ্য ব্রেজ। বলা হয়ে থাকে, তিনি নাকি রাজা সপ্তম শার্লের অবৈধ সন্তান। সেই সূত্রে তিনি রাজা একাদশ লুইসের বোনও। ১৪৬২ সালে শার্লোতের বিয়ে ঠিক হয় জ্যাকস দ্য ব্রেজ নামে এক অভিজাত পুরুষের সঙ্গে। ইতিহাসবেত্তারা বলে থাকেন, এই বিয়ে হয়েছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক কারণে।
তাই শার্লোত বা জ্যাকস তাঁরা কেউই কাউকে ভালোবাসতেন না। তাঁদের চরিত্রও ছিল পুরোপুরি আলাদা। জ্যাকস সাধারণত বাড়ির বাইরে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। যেমন শিকার করা ছিল তাঁর হবি। তাই শিকারেই তাঁর অনেকটা সময় কাটত। অন্যদিকে শার্লোত চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতেন। তবে তিনিও অত্যাধুনিক জীবন কাটাতেন।
এরপরই আসে সেই দিন। সেটা ছিল ১৪৭৭ সালের ৩১ মে। শিকার করে বাড়ি ফিরে জ্যাকস তাঁর স্ত্রী শার্লোতের সঙ্গে ডিনার সারেন। তারপর তিনি নিজের ঘরে চলে যান। জ্যাকস বা শার্লোত স্বামী-স্ত্রী হলেও এক বিছানায় শোয়া দূরের কথা, একঘরেও থাকতেন না।
কিন্তু মাঝরাতে জ্যাকসের ঘুম ভাঙিয়ে দেয় তাঁর নিজের কাজের লোক। শার্লোতের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা লোকটি তাঁকে জানিয়ে দেয়। যে ব্যক্তির সঙ্গে শার্লোতের এই সম্পর্ক ছিল, তাঁর নাম ছিল পিয়ের দ্য লাভ্যারনি। কাজের লোকের কাছ থেকে খবর পেয়ে সেই রাতেই দু-জনকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন ক্রুদ্ধ জ্যাকস।
নিজের স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন তিনি। তৎক্ষণাৎ দু-জনকেই খুন করে ফেলেন। তারপর কিন্তু ওই শাতোতে আর থাকতে পারেননি জ্যাকস। কারণ শার্লোতের অতৃপ্ত আত্মা নাকি ওই প্রাসাদ-দুর্গে ঘুরে বেড়াত। কাঁদত। হাহাকার করত। আর্তনাদ করত।
আর শার্লোতের পাশাপাশি দেখা যেত তাঁর প্রেমিক পুরুষটিকেও। দুই জনের আত্মা পাগল করে দেয় জ্যাকসকে। রাতে ঘুমোতে পারতেন না তিনি। অল্পদিনের মধ্যেই সেই শাতো ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
সেই শাতো আজও আছে। তবে রাতের অন্ধকারে সেখানে একা ঘুরে বেড়াতে সাহস পান না অনেকেই। শোনা যায়, এত বছর পরে আজও এই দুর্গ-প্রাসাদে ঘুরে বেড়ায় প্রণয়ী যুগলের ছায়াশরীর।
যাঁরা সেখানে গিয়েছেন বা রাত কাটিয়েছেন, গভীর রাতে নিজেদের অতিপ্রাকৃত অনুভূতির কথা তাঁদের অনেকেই বলেছেন। অনেকে নাকি আবার ওই ছায়াশরীর দুটির আবছা স্পর্শও পেয়েছেন। প্রাসাদের বড়ো বড়ো কক্ষগুলিতে নাকি ওই ছায়াশরীরগুলির হাহাকার শুনতে পাওয়া যায় আজও।
শাতো দ্য শাতোব্রিয়ঁ
এটি আসলে একটি দুর্গ। এই দুর্গটিও ফ্রান্সের ব্রিটানি রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে তৈরি হয় একাদশ শতকে। পরবর্তীকালে কয়েক বার এই দুর্গের সংস্কার হয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের পর বেশ কয়েক বার এই দুর্গ বিক্রি, বিভক্ত বা হস্তান্তরিত হয়েছে। শেষে এই দুর্গটিকে একটি প্রশাসনিক ভবনে রূপান্তরিত করা হয়।
সেই ভবনে আদালত, থানা বা বিভিন্ন সরকারি দফতরও চালু হয়। কিন্তু কোনো কিছুই কেন যেন শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৭০ সালের পর এইসব দফতর বা অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এখন এই দুর্গের কিছুটা অংশ সাধারণ পর্যটকদের ঘুরে দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। পুরো দুর্গ অবশ্য কাউকে ঘুরে দেখার অনুমতি দেওয়া হয় না। কেন দেওয়া হয় না সে-বিষয়ে সরকারের তরফে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে অনেকে বলে থাকেন, রহস্যজনক প্রকৃতির জন্যই নাকি সকলের কাছে পুরো দুর্গটি খুলে দেওয়া হয় না।
এই দুর্গটি নিয়েও হাজার এক ভৌতিক কাহিনি শোনা যায়। বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে সাধারণ মানুষ এখন এই দুর্গ ঘুরে দেখার সুযোগ পান। যাঁরা সেখানে ঘুরতে গিয়েছেন, রাত কাটিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা বার বার জানিয়েছেন।
রাত গভীর হলে এই দুর্গও নাকি জেগে ওঠে। বিশেষ করে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে গভীর রাতে এই দুর্গের চরিত্র নাকি একেবারেই বদলে যায়। তখন এক নারীশরীরকে সেখানে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
বলা হয়ে থাকে, ওই নারীটিই নাকি ফ্রঁসোয়া দ্য ফোয়া। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের রক্ষিতা। যদিও সেটাই তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল না। তিনি ছিলেন ব্রিটানির গভর্নর জঁ দ্য লাভাল শাতোব্রিয়ঁর স্ত্রী।
সুন্দরী ফ্রঁসোয়া চোখে পড়ে যান প্রথম ফ্রান্সিসের। বিবাহিতা হলেও রাজার আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেননি ফ্রঁসোয়া। দেখা থেকে মন দেওয়া-নেওয়া, তারপর সেই সম্পর্ক গড়ায় বিছানায়ও। অনেক বার রাজাকে বিয়ের কথা বলেছেন ফ্রঁসোয়া, কিন্তু রাজা তাঁর সেই অনুরোধ রাখেননি। বরং তাঁকে উপপত্নীই করে রেখে দিয়েছিলেন তিনি।
স্বাভাবিক কারণেই তাঁদের এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি জঁ দ্য লাভাল। কিন্তু তিনি কিছু বলতে পারতেন না। কারণ তাঁর স্ত্রীর প্রেমিক ছিলেন একজন রাজা। আর তিনি নিজে ব্রিটানির একজন গভর্নর মাত্র।
তাই নিজের স্ত্রীকে দেশের রাজার অঙ্কশায়িনী হওয়ার ব্যাপারটা দাঁতে দাঁত চেপে মেনে নিতে হত তাঁকে। স্ত্রীও তাঁকে এ ব্যাপারে বিশেষ পাত্তা দিতেন না। আসলে স্ত্রীও জানতেন, তাঁর সঙ্গে যাঁর প্রেম, তাঁর ক্ষমতা ও শৌর্য জঁ দ্য লাভালের চেয়ে অনেক বেশি।
তবু মাঝে মাঝে জঁ দ্য লাভালের মন বিদ্রোহ করে উঠত। সেই বিদ্রোহেরই বহি:প্রকাশ দেখা গিয়েছিল ১৫৩৭ সালের ১৬ অক্টোবর।
সেদিন রাতে ফ্রঁসোয়াকে নিজের শোবার ঘরে তালাবন্ধ করে দিয়েছিলেন জঁ দ্য লাভাল। শোনা যায়, ফ্রঁসোয়ার খাবারে জঁ দ্য লাভাল নাকি সেদিন বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। আবার একথাও শোনা যায়, জঁ নাকি নিজের স্ত্রীকে সেদিন গলা কেটে খুন করেছিলেন।
তারপর থেকেই এই দুর্গের চেহারা বদলে যেতে থাকে। বদলে যায় রাতে। আর বছরে নির্দিষ্ট একটি দিনে নাকি ভয়ংকর হয়ে ওঠে সেই দুর্গ। ১৬ অক্টোবর সেই দিন। এখনও এই দিনটিতে মধ্যরাতে ফ্রঁসোয়ার কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। তাঁর অস্পষ্ট শরীর নাকি ১৬ অক্টোবর রাতে সারা দুর্গে ঘুরে বেড়ায়। সেখানকার বাতাস নাকি তখন অস্বাভাবিক ভারী হয়ে ওঠে।
প্যারিসের নতর দাম
ফ্রান্সে পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হল এই নতর দাম। কিন্তু এই নতর দামেরও একটি রহস্যময় চরিত্র রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ জানেই না, অথবা কম মানুষই জানেন এখানে নাকি অগণিত অশরীরীর উপস্থিতি রয়েছে।
নতর দাম আসলে একটি মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক ক্যাথিড্রাল। ফরাসি গথিক স্থাপত্যের একটি অসামান্য উদাহরণ হল এই নতর দাম। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ও অতিপরিচিত গির্জাবাড়ি। ১৭৯০-এর ফরাসি বিপ্লবের মূল পর্যায়ে এই নতর দামের অনেক ধর্মীয় চিত্র নষ্ট এবং ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
১৮৪৫ সালে এউগেনে ভায়োলেট-লি-ডাকের তত্ত্বাবধানে পুনর্নির্মাণ শুরু হয় এই গির্জার। ১৯৯১ সালে গির্জাটির ফের সংস্কার ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই গির্জায় বেশ কিছু অদ্ভুত চিত্র রয়েছে, যেগুলি অন্ধকারে দেখলে ভয়ানক লাগে। রাতে দেওয়ালে খোদিত সুচালো পাথরগুলি আরও ভয়ংকর রোমহর্ষক আবহ তৈরি করে।
বলা হয়ে থাকে, এখানে নাকি বহু মহিলার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। চলাফেরা করতে দেখা যায় ফ্রান্সের অনেক রাজা, যাজক, অভিজাত পুরুষ ও নারী এবং অন্যান্য অশরীরীদের। প্রভাবশালী ফরাসি ব্যক্তিদের বিকৃত মুখ নাকি এখানকার দেওয়ালগুলিতে রাতের অন্ধকারে ভেসে ওঠে। অনেকেই নাকি সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছেন।
বাস্তি দুর্গ
ইতিহাসে বাস্তি (বাস্তিল) দুর্গ কুখ্যাত হয়ে রয়েছে। একসময় এই দুর্গ ছিল একটি শক্তিশালী কারাগার। এখানে বহু মানুষকে বন্দি করে রাখা হত। তাদের মধ্যে ছিল মারকি দ্য সাদেও একজন। ছিল অনেক রহস্যময় চরিত্রও। যেমন লোহার মুখোশপরা কিছু মানুষ।
একবার সেই বন্দিশালায় প্রবেশ করলে জীবিত অবস্থায় সেখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথ ছিল না। কারাগারের ভিতরেই মেরে ফেলা হত বহু বন্দিকে। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই এই বাস্তি দুর্গের পতন হয়।
এই দুর্গ বাস্তবিকই ছিল ফ্রান্সের স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী রাজার ভয়ংকর অত্যাচার ও নৃশংসতার প্রতীক। ওই দিনই সাধারণ ফরাসি মানুষ বাস্তি দুর্গ ভেঙে ফেলে বন্দিদের মুক্ত করে।
যদিও রক্তক্ষয় এড়াতে বিপ্লবী নেতা দ্য লোনের কাছে বাস্তি দুর্গের প্রধান সেখানে আটকে রাখা ৭ রাজবন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন লোন। উত্তেজিত জনতা আক্রমণ করে বাস্তি।
জবাবে বাস্তির রক্ষীরা কামান দাগাতে শুরু করে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বয়ে যায় বাস্তি দুর্গে। দু-শো-র মতো মানুষ হতাহত হন।
কিন্তু জনতাকে আটকে রাখতে পারেনি সেই কামান। চারদিক থেকে আক্রমণ করে জনতা। বাস্তি ধ্বংস করে স্বৈরাচারী শাসকের পতন ঘটায়। ফরাসি বিপ্লব শুরু হওয়ার আগে লেখা হয়েছিল বহু দুঃখ ও কষ্টের ইতিহাস। সেসব সহজে ভোলার নয়। এর দেওয়াল যেন তারই সাক্ষ্য বহন করছে।
বাস্তির কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনও পাওয়া যাবে চতুর্থ হেনরির বুলেভার্ডে। অশরীরী এবং রোমহর্ষক নানা ঘটনা নাকি সেই চতুর্থ হেনরির বুলেভার্ডে এখনও ঘটে থাকে। সেই সময় মৃত বহু মানুষের অতৃপ্ত আত্মা এখনও ওই দুর্গ এলাকায় দাপিয়ে বেড়ায়।
তাদের চিৎকার, ফিসফিস করে কথা বলা, দীর্ঘশ্বাসের শব্দ অনেকেই নাকি হনেছেন। এখনও নাকি কোনো কোনো ঝড়-বৃষ্টির রাতে লোহার মুখোশপরা কিছু ব্যক্তিকে দুর্গের রাস্তা দিয়ে ছুটে যেতে দেখা যায়।
প্যারিসের কাতাকঁব
কঙ্কালের মুন্ড বা হাড় আমাদের কাছে অজানা বা অচেনা কোনো বস্তু নয়। পথেঘাটে তান্ত্রিক থেকে মেডিক্যাল কলেজগুলির গবেষণা-ঘরে সম্পূর্ণ কঙ্কাল বা কঙ্কালের মাথা থেকে হাড়ের টুকরো আমরা অনেকসময় দেখে থাকি।
আগে আমাদের বাংলায় তারাপীঠ-সহ অনেক শ্মশানে কঙ্কালের মুন্ড থেকে হাড়গোড় হরবখত দেখা যেত। এখন অবশ্য শ্মশানগুলি সব আলোকোজ্জ্বল ও আধুনিক হয়ে গিয়েছে এবং ইলেকট্রিক চুল্লিতেই মৃতদেহ পোড়ানো হয়। তাই সেসব খুব-একটা দেখতে পাওয়া যায় না।
তবু যদি কোনো নির্জন স্থানে আপনি লক্ষ লক্ষ কঙ্কালের খুলি, হাড় দেখতে পান, আপনার কেমন অনুভূতি হবে? বলা বাহুল্য, তেমন অভিজ্ঞতা আপনার ভালো হবে না। কোনো স্বাভাবিক মানুষই ওই দৃশ্য স্বাভাবিকভাবে নিতে পারবে না। কিন্তু, ফ্রান্সে এমনই একটি স্থান রয়েছে, যেখানে অসংখ্য কঙ্কাল, মাথার খুলি ছড়িয়ে রয়েছে। তার নাম কাতাকঁব (বা, কাটাকম্ব)।
কাতাকঁব হল প্যারিসের একটি আণ্ডারগ্রাউণ্ড অসারি বা অস্থি আধার। প্যারিসের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে প্রাচীন খনির একটি ছোটো অংশে ষাট লক্ষেরও বেশি মৃত মানুষের মাথার খুলি ও কঙ্কাল রয়েছে। কাতাকঁব রয়েছে প্রাচীন শহরের প্রবেশপথ বারিয়্যার দঁফের দক্ষিণে। বারিয়্যার দঁফের অর্থ হল ‘নরকের দরজা’। এটি রয়েছে রু দ্য লা তম্ব ইসোয়ারের নীচে। কাতাকঁবের সরকারি ঠিকানা—১, আভেন্যু দ্যু কোলোনেল অঁরি রল, তঁগি: ৭৫০১৪, পারি (ইংরেজিতে হবে ১, অ্যাভিনিউ ডু কর্নেল হেনরি রোল-টাঙ্গুই: ৭৫০১৪, প্যারিস)।
কাতাকঁব তৈরির পিছনে একটি কাহিনি রয়েছে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে কবরস্থান নিয়ে প্যারিসে বেশ সমস্যা তৈরি হয়। ১৭৭৪ সালের শুরুতে গুহাপথের সারি এবং কবরের সংখ্যা অত্যধিক হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়ে যান শহরের আধিকারিকরা। ১৭৮৬ সাল থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে রাতের দিকে মিছিল করে সুড়ঙ্গ দিয়ে কবরস্থানগুলি থেকে মৃতদেহের মাথার খুলি, হাড়গোড় নিয়ে যাওয়া হত সেই অস্থি আধারে।
এই কাজ ১৭৮৮ সালেই শেষ হয়ে যায়নি। পরের বছরগুলিতেও সেই কাজ অব্যাহত থাকত। তবে তখন সেই সক্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল। তারপর থেকে একটা নিয়ম করা হয়। কমপক্ষে ত্রিশ বছর আগে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদেরই মাথার খুলি, হাড়গোড় কাতাকঁবে সংরক্ষণ করা হয়।
উনিশ শতকে এই কাতাকঁব নিয়ে মানুষের, বিশেষ করে যাঁরা ভ্রমণপিপাসু, তাঁদের কাছে আগ্রহ তৈরি হয়। কাতাকঁবের এই জনপ্রিয়তা দেখে এর কিছুটা অংশ পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ১৮৭৪ সাল থেকে সেখানে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয়। বিষয়টি জাদুঘর কতৃপক্ষের নজরে পড়ে।
২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এই কাতাকঁবকে প্যারিসের চোদ্দোতম জাদুঘর হিসেবে গণ্য করে। তারপরই এই কাতাকঁব আনুষ্ঠানিকভাবে মিউনিসিপ্যাল অস্থি-আধার বা সরকারি সমাধি হিসেবে পরিচিতি পায়। এখানে মৃত মানুষের দেহাবশেষের সংখ্যা বিচার করে এই কাতাকঁবকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো কবরস্থান বা সমাধিক্ষেত্র বলা হয়।
এরপরই কাতাকঁব নিয়ে মানুষের মুখে নানা কথা শোনা যেতে থাকে। ব্যাপারটা প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞদেরও আগ্রহী করে তোলে। অনেকেই সেখানে গিয়ে নানারকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। অনেকেই বলে থাকেন, কাতাকঁবে থাকা মৃত মানুষের মাথার খুলি, হাড়গোড় নাকি রাতের দিকে নিজেরাই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাফেরা করে।
শুধু তাই নয়, স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কবরস্থানে নাকি একসঙ্গে বহু মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। দেওয়ালের ভিতর দিয়ে কাদের যেন কথাবার্তা শোনা যায়। সেখানে কেউ না থাকলেও কাদের যেন অস্পষ্ট উপস্থিতি অনুভব করা যায়। এমনকী কখনো কখনো কাদের যেন বরফঠাণ্ডা শরীরের স্পর্শ পাওয়া যায়।
শীতকালের হিমেল রাতগুলিতে এমন কথা বেশি শোনা যায়। তাই রাতে কাতাকঁবে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম রয়েছে। মঙ্গলবার থেকে রবিবার পর্যন্ত সকাল দশটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত এই কাতাকঁব খোলা থাকে। ভিতরে প্রবেশের শেষ সময়সীমা রাত সাড়ে সাতটা।
আর শীতকালে গভীর রাতে এখানে কাউকেই যেতে দেওয়া হয় না। আবার, কোনো সময়ই দু-শোর বেশি পর্যটককে সেখানে যেতে দেওয়া হয় না। পর্যটকরা দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত ঘুরে দেখতে পারবেন। দেখার সময় মাত্র ৪৫ মিনিট।
তবু কোনোভাবে বিশেষ অনুমতি নিয়ে বা গোপনে সাহস দেখিয়ে এই কাতাকঁবে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নাকি সেখানে নানারকম অস্বাভাবিক কান্ডকারখানা দেখেছেন!
মঁ সাঁ-মিশেল
লে মঁ সাঁ-মিশেল হল ফ্রান্সের নরম্যান্ডির একটি নির্জন দ্বীপভূমি। চারদিকে সমুদ্রের গর্জন, আর মাঝে প্রায় জনশূন্য এক ভূমি।
পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে একটা গোটা চাঁদের দেখা মেলে, আর উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় চারদিক ভরে যায়, তখন যেন মায়াবী হয়ে ওঠে এই দ্বীপাঞ্চল। ঠিক তার বিপরীত চরিত্র দেখা যায় অমাবস্যা রাতে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেমন যেন ভয়ংকর ও বীভৎস মনে হয় এই মঁ সাঁ-মিশেলকে।
ফ্রান্সের এক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে আভ্রঁশের কাছে কুসনেঁর মুখে এই দ্বীপভূমির অবস্থান। এই অঞ্চলের আয়তন এক-শো হেক্টর বা ২৪৭ একর। ২০০৯ সাল পর্যন্ত যে হিসাব ফরাসি সরকারের কাছে রয়েছে, তখন এই দ্বীপভূমিতে বাস করতেন মাত্র চুয়াল্লিশ জন মানুষ।
স্বভাবতই এমন নির্জন দ্বীপভূমি যে রহস্যপ্রিয় মানুষকে রোমাঞ্চিত করবে, তাতে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। তাই এই নির্জন ভূমি নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায় ফরাসিদের কাছে।
মঁ সাঁ-মিশেলের প্রাচীন আশ্রম এখন ফ্রান্সের সবচাইতে দর্শনীয় স্থান হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এই জায়গা সম্পর্কে যেসব কাহিনি শোনা যায়, তার একটি হল আরশঁজেল মিশেলের কথা। তিনি নির্মাণকাজ শুরু করার আগে একটি গর্তে সাঁ ওব্যারের মাথার খুলি আগুনে পুড়িয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট একটি নয়, অসংখ্য ভৌতিক ঘটনা ঘটে বলে শোনা যায়। সেইজন্য এই জায়গাটিকে ফ্রান্সের অন্যতম ভয়ংকর ভৌতিক স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। বহু অতৃপ্ত আত্মা নাকি এখানে ঘোরাফেরা করে।
তাদের মধ্যে একটি আত্মা নাকি পুরোনো গির্জায় কিছু যেন খুঁজে বেড়ায়। এই আত্মাটি লুই দেসতুতভিলের। ১৪৩৪ সালে এই মঠে আসা সেনাদলে তিনিই নেতৃত্বে ছিলেন। এক-শো বছর ধরে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে যে দু-হাজার ব্রিটিশকে খুন করা হয়েছিল, তার পিছনে নাকি তিনিই ছিলেন প্রধান হোতা।
শাতো দ্য ভ্যার্সাই
একাদশ শতকে যখন এই শাতো তৈরি হয়, তখন ভ্যার্সাই ছিল একটি ছোটো গ্রাম। এখন এই ভ্যার্সাইকে প্যারিসের একটি ধনী শহরতলি বলা যায়। ফরাসি রাজধানীর কেন্দ্র থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এই ভ্যার্সাই। ১৬৮২ সালে যখন চতুর্দশ লুই প্যারিস থেকে রাজ-আদালত সরিয়ে নেন, তখন থেকে এই ভ্যার্সাই ছিল ফ্রান্সের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র।
১৭৮৯ সালের অক্টোবরে ফরাসি বিপ্লব শুরুর পর তিন মাসের মধ্যে রাজপরিবার রাজধানীতে ফিরে আসতে বাধ্য না-হওয়া পর্যন্ত ভ্যার্সাইয়ের দাপট অটুট ছিল। এক্ষেত্রে ভ্যার্সাইয়ের প্রাসাদ-দুর্গ নি:সন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তবে শুধু এই প্রাসাদের জন্যই ভ্যার্সাই বিখ্যাত নয়। প্রাচীন ঐতিহ্যের চূড়ান্ত রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবেও ভ্যার্সাইয়ের খ্যাতি রয়েছে।
অর্থাৎ, ১৬৮২ সাল থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত ফরাসি রাজপরিবারের বাসস্থান ছিল এই ভ্যার্সাই। কিছু পর্যটক এবং এখানকার কর্মীরা জানিয়েছেন, সেখানে তাঁরা এমন কিছু মানুষ দেখেছেন, যাদের পরনে ছিল আঠারো শতকের পোশাক। এই সময়ে সেই পোশাক কে আর পরবেন? তাহলে তাঁরা তেমন মানুষ দেখলেন কী করে? তাঁরা কি ভুল দেখেছেন? নাকি মিথ্যে বলছেন? ভুল যদি দেখে থাকেন, বা মিথ্যেও বলে থাকেন, তাহলে তা কয়েক জন বলতে পারেন। কিন্তু বেশ কিছু মানুষের মুখে যখন এমন কথা শোনা যায়, তখন ভাবতে হয় বই কী!
এখানেই শেষ নয়। সেখান থেকে ঘুরে আসা বহু মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছেন, তাঁরা নাকি ভ্যার্সাইয়ের শাতোয় রানি মারি অঁতোয়ানেতকে দেখেছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় রানির শরীরে কোনো মাথা ছিল না।
অর্থাৎ মুন্ডহীন রানিকে দেখেছেন তাঁরা। উল্লেখ্য, মারি অঁতোয়ানেত ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ও ন্যাভারের শেষ রানি। ১৭৯৩ সালের ১৪ অক্টোবর দুই দিনের বিচার শুরু হওয়ার পর বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে মারি অঁতোয়ানেতকে দোষী সাব্যস্ত করে। এর দু-দিন পর ১৬ অক্টোবর গিলোটিনে রানির শিরশ্ছেদ করা হয়।
তাই শাতো দ্য ভ্যার্সাইয়ে মুন্ডহীন রানিকে দেখাটা রীতিমতো রোমহর্ষক। শুধু মুন্ডহীন রানিকেই নয়, অন্ধকারে শরীরবিহীন শুধু জ্বলতে থাকা দুই চোখও দেখেছেন অনেকেই। পেয়েছেন কিছু অস্বাভাবিক উপস্থিতির অনুভূতি।
অনেক পর্যটকের ক্যামেরায়ও কিছু অস্বাভাবিক দৃশ্য ধরা পড়েছে। কোনো ছবিতে সব স্বাভাবিক বস্তুর পাশে অস্পষ্ট ছায়ামূর্তিও দেখা গিয়েছে। কোনো একটি ছায়াশরীরে মাথা ছিল না। অনেকেই মনে করেন ওই অস্পষ্ট ছায়াশরীরই নাকি রানি অঁতোয়ানেত।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, শাতো দ্য ভ্যার্সাইয়ে দেখতে না পাওয়া কিছু মানবশরীরের শীতল স্পর্শ পেয়েছেন। সাধারণ ফরাসিদের মতো প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরাও শাতো দ্য ভ্যার্সাইকে ভৌতিক স্থান বলে উল্লেখ করে থাকেন।
শাতো দ্য ত্রেকসঁ
শাতো দ্য ত্রেকসেঁর অবস্থান ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলে। ব্রিটানি অঞ্চলটি রয়েছে উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সে। এটি আসলে একটি মধ্যযুগীয় দুর্গ। দুর্গটির অবস্থান প্যাঁপঁ অরণ্যের কাছে কঁপনেয়াক কমিউনের মধ্যে এবং কোয়েতকিদেঁর সামরিক শিবিরের একেবারে ধারে। এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
এই দুর্গের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক কাহিনি। কিছু কাহিনি তো বেশ ভাবার মতোই। এখানে সাদা পোশাক পরিহিতা এক নারী, মুন্ডহীন যাজক, ভৌতিক কার্ড খেলোয়াড় ও এক বেনামা জমিদারের পা দেখতে পাওয়া যায়।
একটি কাহিনি ১৭৫০ সালের একটি ক্ষতচিহ্নের সাক্ষী। বলা বাহুল্য, কাহিনিটি সেই পুরোনো বিশ্বাসঘাতকতার। শাতলাঁর স্ত্রীর কবরকে অনেকে জেগে উঠতেও দেখেছেন! কবর থেকে উঠে ওই নারী হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন চলে যান। তাঁর হাঁটার ভঙ্গিমাও রীতিমতো অদ্ভুত।
প্যার লাশ্যাজ সিমেটারি
প্যার লাশ্যাজ সিমেটারি হল প্যারিসের সবচাইতে বড়ো কবরস্থান। এর আয়তন ৪৪ হেক্টর বা ১১০ একর। যদিও প্যারিসের শহরতলিতে বড়ো কবরস্থান আরও রয়েছে। তবে প্যার লাশ্যাজকে সবচেয়ে বড়ো সমাধিক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে।
প্যার লাশ্যাজকে প্রথম ‘বাগান সমাধিক্ষেত্র’ বলা হয়ে থাকে। একইসঙ্গে এটি প্রথম পুর কবরস্থান বা মিউনিসিপ্যাল সিমেটারি হিসেবেও চিহ্নিত। এই সমাধিক্ষেত্রটি তৈরি হয় ১৮০৪ সালে। মনে রাখতে হবে প্যার লাশ্যাজ কোনো পরিত্যক্ত কবরস্থান নয়, এটি এখনও প্রথম কার্যকর কবরস্থান। অর্থাৎ, এখানে এখনও মৃত মানুষকে কবর দেওয়া হয়।
এখানেই রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিনটি স্মৃতিসৌধ। প্রতি বছর পঁয়ত্রিশ লক্ষেরও বেশি পর্যটক প্যার লাশ্যাজ সিমেটারিতে আসেন। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম হয় এই প্যার লাশ্যাজ সিমেটারিতেই।
বহু পর্যটক যেমন প্যার লাশ্যাজে আসেন, তেমনই ইউরোপে সবচেয়ে ভৌতিক কবরস্থান হিসেবেও এই স্থানটি পরিচিত। রাতবিরেতে এখানে আসা বহু পর্যটকই নিজেদের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
তাঁদের বিবরণের সূত্র ধরে অনেক প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞ এখানে অভিযান চালিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের অভিযানে অতিপ্রাকৃত বিষয় ধরা পড়েছে। তাই পর্যটকদের সমস্ত দাবিই এককথায় উড়িয়ে দিতে পারেননি তাঁরা।
যাঁরা গভীর রাতে সেখানে গিয়েছেন, তাঁদের অনেকে বলেছেন, হঠাৎই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাঁদের সারা শরীরে অপ্রতিরোধ্য কাঁপুনি এসেছে। সেইসঙ্গে অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি তাঁদের গ্রাস করেছে।
এর ব্যাখ্যা তাঁরা খুঁজে পাননি। কিন্তু ওই কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসার পর তাঁদের শরীর বা অনুভূতি ফের স্বাভাবিক হয়ে যায়।
এখানে আসা বহু মানুষ আবার এই কবরস্থানে অসংখ্য ছবিও তুলেছেন। সেই সব ছবিতে অস্বাভাবিক ঝাপসা কিছু অবয়বও ধরা পড়েছে, যেগুলি তাঁরা খোলা চোখে দেখতে পাননি। সেই সব ছবি বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। অনেক ছবিকেই তাঁরা যথার্থ বলে উল্লেখ করেছেন। প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞদের ক্যামেরায়ও তেমন অনেক ছবি ধরা পড়েছে, যেখানে অন্ধকারে বেশ কয়েকটি জ্বলন্ত চোখ বা অস্পষ্ট শরীর ধরা পড়েছে।
সেই ছবিগুলি পরীক্ষা করে তার প্রমাণ সন্ধানে সেই কবরস্থানেও বহু অভিযান চালিয়েছেন তাঁরা। তখনই তাঁদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় সব কিছু। তাঁরা মনে করেন, কবরস্থানে অস্বাভাবিক কিছুর উপস্থিতি রয়েছে। সেই চোখ বা অক্ষিগোলক এবং শরীরগুলিও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।
তাঁরা খতিয়ে দেখেছেন, সেগুলি স্থিতিশীল কোনো বস্তু নয়। সেগুলিকে খুবই চঞ্চল মনে হয়েছে। সবসময় যেন কিছু-একটা খুঁজে বেড়ায় সেগুলি।
পার্ক মঁসুরি
প্যারিসের কেন্দ্রস্থলের দক্ষিণে রয়েছে এই সুন্দর পার্কটি। নাম পার্ক মঁসুরি। বিকেল বেলায় হেঁটে বেড়ানোর জন্য অথবা পিকনিকে লাঞ্চ করার জন্য এই স্থানটি অতি শান্ত ও মনোরম একটি জায়গা। অনেক মানুষ সময় কাটানোর জন্য এই পার্কটি বেছে নেন।
কিন্তু সেখানকার সাধারণ ফরাসিদের অনেকেই এই পার্ক সম্পর্কে বেশ সতর্কও থাকেন। কেউ সেখানে বেড়াতে গেলে সাবধানও করে দেন তাঁরা। কারণ সেখানে দুম করে আপনি এমন কোনো মানুষের মুখোমুখি হয়ে যেতেই পারেন, যাঁরা ঠিক মানুষ নয়। আপনি একা থাকলে চমকে উঠতে পারেন তাঁদের দেখে। তাঁদের কারও মাথা নেই! মুন্ডহীন কিছু মানুষ।
বলা হয়ে থাকে, সরকারিভাবে ব্যবহৃত হওয়ার আগে গিলোটিনে পরীক্ষামূলক মুন্ডচ্ছেদ করা হত এখানেই। এভাবে অসংখ্য মানুষকে এখানে খুন করা হয়েছে। ইসোর দ্য মঁসুরিকেও মুন্ডচ্ছেদ করে দস্যুরা এখানে খুন করেছিল। শোনা যায়, ছায়া হয়ে তাঁরই অতৃপ্ত মুন্ডহীন কায়া এখানে ঘুরে বেড়ায়। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে এখানে ঘুরে বেড়ায় আরও অনেক মুন্ডহীন আত্মাও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন