এখনও কাঁদে অ্যাজুরিনা

উপমন্যু রায়

ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটির নাম অ্যাজুরিনা। ভারি সুন্দর এবং চঞ্চল। সারাদিন শুধু খেলা আর খেলা। খেলার জন্যই যেন তার জীবন। খেলা ছাড়া আর কিছুই সেচায় না। পুতুল নিয়ে খেলতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। এমনকী, তার খেলার উপকরণ থেকে বাদ যায়নি বলও।

সেই মেয়েটিই হঠাৎই এত বিখ্যাত হয়ে যায় যে, তার জন্মকালের সাড়ে ছ-শো বছর পরে আজও ইটালির মানুষের কাছে সেসমান পরিচিত। শুধু ইটালিই-বা বলি কেন, অস্বাভাবিক বিষয় নিয়ে চর্চায় মগ্ন পৃথিবীর বহু মানুষও একডাকে জানে এই অ্যাজুরিনাকে।

কিন্তু কে এই অ্যাজুরিনা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সাড়ে ছ-শো বছর। আর তখনই অবধারিতভাবে উঠে আসে একটি দুর্গের কথা। দুর্গটির নাম ক্যাস্তেলো ডি মন্তেবেলো।

ক্যাস্তেলো ডি মন্তেবেলোকেই ইটালির সবচাইতে বিখ্যাত দুর্গ মনে করা হয়। তোরিয়ানা মিউনিসিপ্যালিটির প্রাচীন এই দুর্গটি রিমিনি শহরের কাছাকাছি।

আজ থেকে ছ-শো চল্লিশ বছর আগে ওই দুর্গটি গমগম করত সেই ছোট্ট অ্যাজুরিনার দুষ্টুমিতে। এতটাই চঞ্চল ছিল সে, তাকে সামলানোই দায় হয়ে উঠত তার বাবা-মায়ের। দুর্গটির সর্বত্রই ছুটে বেড়াতে চাইত সে। কিন্তু এত বড়ো দুর্গে মেয়েকে একলা ছোটাছুটি করতে দিতে তার বাবা-মা চাইতেন না। কখন কী বিপদ-আপদ ঘটিয়ে ফেলে, তা নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতেন তাঁরা।

ক্যাস্তেলো ডি মন্তেবেলো দুর্গটি রয়েছে ইটালির তোরিনায়। এই দুর্গেই ১৩৭৫ সালে ঘটে গিয়েছিল একটি মর্মান্তিক ঘটনা। ওই বছরের ২১ জুন গুয়েনডালিনা মালাতেস্তা নামে একটি বাচ্চা মেয়ে অস্বাভাবিকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় এই দুর্গেই।

এই গুয়েনডালিনা মালাতেস্তাকেই ইটালি তো বটেই, গোটা পৃথিবী জানে ‘অ্যাজুরিনা’ বলে। এই অ্যাজুরিনাই অস্বাভাবিকভাবে হারিয়ে গিয়েছিল ক্যাস্তেলো ডি মন্তেবেলো দুর্গের বেসমেন্টে।

মেয়েটির চোখ দু-টি ছিল অস্বাভাবিক রকমের সুন্দর। চোখের রং ছিল ঘন নীল। অসম্ভব সুন্দরী ছিল সে। যে দেখত, সে-ই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। এমন বাচ্চাকে ভালো না-বেসে থাকা যায়!

১৬০০ সালে প্যারিস চার্চের এক যাজক মেয়েটি সম্পর্কে একটি কাহিনি লিখেছিলেন। ওই কাহিনি থেকেই সেই দুঃখজনক ঘটনার কথা জানা যায়।

সেই সময় সেখানকার মানুষ ছিল খুবই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু। অ্যাজুরিনার বাবা-মাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। আর তাঁদের নিজেদের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় তার প্রমাণও বহু বার পাওয়া গিয়েছে।

মেয়ের ওপর অশুভ শক্তির আক্রমণ এড়াতে তার বাবা লর্ড আগোলিনুসিও দ্য মন্তেবেলো সবসময়ের জন্য দু-জন রক্ষী রেখেছিলেন। মেয়েটির বাড়ির বাইরে যাওয়া ছিল মানা। আসলে মেয়েকে খুব ভালোবাসতেন বাবা।

এত বড়ো দুর্গে মেয়ের দুরন্তপনা তাঁকে সবসময়ই উদবেগে রাখত। স্বাভাবিক কারণেই তিনি চাইতেন না, তাঁর সন্তান কোনো বিপদে পড়ুক। তাই তাকে নিরাপদে রাখতে বাড়াবাড়িও করতেন। যেমন করেছিলেন দুই জন রক্ষী রেখে।

বাবার সঙ্গে সহমত ছিলেন মেয়েটির মা-ও। মেয়ে সম্পর্কে তাঁর একটা অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল। তাঁর ধারণা ছিল, সেছিল নাকি অন্যদের থেকে আলাদা। তাকে সকলের আড়ালে রাখতেন তিনি। কিন্তু পারতেন না। তাই তার ওপর যাতে কারও কুনজর না-লাগে সেইজন্য নানারকম নিয়ম করতেন। লতাপাতা দিয়ে তার চুল নীল রং করে দিতেন, যাতে তার বিস্ময়কর নীল চোখের মতো চুলও নীল রঙের হয়ে না-যায়!

শোনা যায়, সেই দিনটি বিশেষ সুবিধের ছিল না। আবহাওয়াও ছিল বেশ খারাপ। তবে, অ্যাজুরিনা তাতে মোটেও দমে যায়নি। তার দুষ্টুমি ছিল অব্যাহত। আবহাওয়ার ভালো-মন্দ সেথোড়াই কেয়ার করত! সেকাপড়ের তৈরি একটি বল (মতান্তরে পুতুল) নিয়ে খেলা করছিল। ছুটে বেড়াচ্ছিল দুর্গের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সঙ্গে ছিল অবশ্যই সেই দুই জন রক্ষী।

এরই মধ্যে ঘটল সেই ঘটনা। খেলার ফাঁকে হঠাৎই সেই পুতুলটি মাটির নীচে একটি চেম্বারে পড়ে যায়। খেলনা পুতুল (বা বলটি) মেয়েটির বড়ো প্রিয় ছিল। সেটি নীচে পড়ে যাওয়ায় সেকাঁদতে শুরু করে।

কিন্তু রক্ষীরা কেউই তার পুতুল খুঁজে দিতে এগিয়ে গেল না। তাদের কাজ ছিল মেয়েটিকে পাহারা দেওয়া। তাই দিচ্ছিল। মেয়েটির পুতুল এনে দেওয়া তাদের কাজ নয় ভেবে তারা চুপ করে দাঁড়িয়েই রইল।

পরে কান্না থামিয়ে পুতুল খুঁজতে নিজেই উদ্যোগী হয় মেয়েটি। পুতুল খুঁজতে সাহস করে মাটির নীচে সেই চেম্বারে নামে। তবে সেটি সেখুঁজে পেয়েছিল কি না জানা যায়নি। এখানেই শেষ নয়। পুতুল বা বল যা-ই হোক, সেটি পেয়ে বা না-পেয়ে তার ফের মাটির উপরে ফিরে আসার কথা ছিল।

কিন্তু এল না। এল না যে শুধু তা-ই নয়, একেবারে হারিয়েই গেল মেয়েটি। মাটির উপরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল রক্ষীরা। মেয়েটি ফিরে না-আসায় তারা চিন্তায় পড়ল। শেষে একপ্রকার ভয়ই পেয়ে গেল।

তাই বাধ্য হয়ে তারাও তাকে খুঁজতে নীচে নামে।

নীচে মেয়েটির কান্না তারা শুনতে পেল। সেই আওয়াজ শুনে চেম্বারের চারদিক খুঁজলও। কিন্তু কোথায় মেয়েটি?

অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজি করল তারা। কিন্তু মেয়েটিকে বা তার খেলনাটি তারা আর খুঁজে পায়নি। শেষে খবর গেল তার বাবা-মায়ের কাছে। তাঁরাও তাকে অনেক খুঁজলেন। কিন্তু খোঁজাই সার হল, মেয়েটিকে পাওয়া গেল না।

শুধু তারা কেন, পরে সরকারি নিরাপত্তা বিভাগের লোকেরা এসেছেন। তাঁরাও পাননি তাকে। শেষে সকলেই ধরে নিলেন মেয়েটি মারা গিয়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল অ্যাজুরিনার দেহ পাওয়া গেল না। তবে সেই দুর্গ ছেড়েও গেল না সে। রাতের দিকে তার কান্না প্রায়ই শোনা যেতে লাগল। কোথাও আটকা পড়ে গেলে বাচ্চারা যেমন প্রথমে বের হতে চায়, তারপর বের হতে না-পেরে কাঁদতে শুরু করে, সেই কান্নার আওয়াজটাও সেইরকম।

তারপর কত শত বছর কেটে গিয়েছে। ওই দুর্গ কিন্তু এখনও রহস্যময় থেকে গিয়েছে। অ্যাজুরিনার আত্মা এখনও নাকি সেই পুতুল (বা বল) খুঁজে চলেছে মাটির নীচে সেই চেম্বারে! রাত গভীর হলে তার সেই করুণ কান্নার আওয়াজ নাকি এখনও শোনা যায়।

শুধু তার কান্না যে শোনা যায় তা-ই নয়, তাকে নাকি দেখাও যায়। যে মেয়েটিকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি তখন, তাকেই দেখা যায় এখনও! প্রতি পাঁচ বছর পর পর (যে বছরের শেষ সংখ্যাটি ০ বা ৫) ওই নির্দিষ্ট দিনে তাকে নাকি এখনও পুতুল (বা বল) খুঁজতে দেখেন অনেকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%