খালি জাহাজের রহস্য

উপমন্যু রায়

জাহাজগুলি সমুদ্রে ভাসছিল। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ভেসে যাচ্ছিল সেগুলি। একটা নয়, দুটো নয়, পর পর বারোটি জাহাজ!

জাহাজগুলি বেশ ছোটো। বড়ো বোটও বলা যেতে পারে। কেউ কেউ বোট বলেই উল্লেখ করেন। আবার কেউ বলেন জাহাজ।

যা-ই হোক, এতগুলো জাহাজ যদি এমনভাবে জলে ভাসে, তাহলে সন্দেহ তো হবেই। কিন্তু কী আশ্চর্য, সেগুলি অন্য কোনো জাহাজের চোখেও পর্যন্ত পড়েনি! অথবা পড়লেও তারা কেউই গুরুত্ব দেয়নি এই বারোটি জাহাজকে। তারপর স্রোতের টানে এবং হাওয়ার খামখেয়ালিপনায় একসময় সেই সব জাহাজ এসে থামল একটি উপকূলে। উপকূলটি জাপানের।

ঘটনাটি ২০১৫ সালের। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের শেষ সময় পর্যন্ত জাহাজগুলি একটা একটা করে জাপানের উপকূলে এসে থামে। প্রথমে একটি জাহাজ ভিড়লে উপকূল বিভাগের কতৃপক্ষ তেমন কিছু মনে করেনি। কিন্তু দেড় মাসে বারোটি জাহাজ যদি এসে সেই উপকূলে থামে, তাহলে সন্দেহ তো হবেই।

তবে সন্দেহ শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগেই। কারণ রহস্যজনক ওই জাহাজগুলিতে জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র ছিল না। পুরো খালি জাহাজ! থাকার মধ্যে কিছু জিনিসপত্র ছিল। আর ছিল...!

চমকে উঠেছিলেন উপকূলের উদ্ধারকারী বাহিনীর কর্মীরা। প্রথম জাহাজটি উপকূলে আসার পরই নিয়মমাফিক তাঁরা জাহাজটিতে তল্লাশি চালান।

দেখেন জাহাজে কোনো মানুষ নেই। তবে ভারি অদ্ভুত জাহাজটি। কেমন যেন পুরোনো দিনের গন্ধ সেই জাহাজে! আর জাহাজে কেউ না-থেকেও যেন আছে তারা। কিন্তু কোথায়? চোখের দৃষ্টির সীমায় কোনো ব্যক্তির শরীর ধরা পড়ল না তাঁদের।

তবু যেন মনে হল, জাহাজে বেশ কয়েক জন আছে। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর লক্ষ করছে উদ্ধারকারীদের।

বিষয়টি নিয়ে উদ্ধারকারী বাহিনীর কর্মীদের মধ্যে নানা ধারণা তৈরি হল। কেউ কেউ জাহাজটিকে ‘ভৌতিক’ বলেও উল্লেখ করলেন। বললেন, জাহাজটিতে নাকি রয়েছে অশরীরীদের অস্তিত্ব, যাদের খালি চোখে দেখা যায় না। অথচ তারা আছে। আর আছে এই জাহাজেই।

স্বাভাবিক কারণেই উপকূল বিভাগ কিছু কর্মীর এমন ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়নি। তারা তল্লাশি চালিয়ে যেতে বলে তাঁদের।

প্রথম জাহাজের পর যে জাহাজগুলি এসে উপকূলে থামতে থাকে, সেগুলিও তাঁরা একটি একটি করে তল্লাশি শুরু করেন। আর এভাবে তাঁরা জাহাজগুলিতে পেলেন কঙ্কাল। হ্যাঁ, বারোটি জাহাজে রয়েছে মানুষের কঙ্কাল!

প্রথম জাহাজটিতেই পাওয়া গিয়েছিল দু-টি কঙ্কাল। তারপর প্রতিটি জাহাজেই কঙ্কাল পাওয়া যেতে থাকে। শেষে দেখা যায়, মোট বারোটি জাহাজে পঁচিশটি মানুষের কঙ্কাল পাওয়া যায়। গড়ে দুই থেকে তিনটি করে কঙ্কাল ছিল প্রতিটি জাহাজে।

কঙ্কালগুলিও সব অদ্ভুত। কোনো কঙ্কালের ধড় আছে তো মুন্ড নেই। আবার, কোনো কঙ্কালের মুন্ড আছে তো ধড় নেই। পঁচিশটি কঙ্কাল পাওয়ার পর দেখা গেল দুটি কঙ্কালের মুন্ড নেই, আর ছ-টি কঙ্কালের মুন্ড রয়েছে, কিন্তু ধড় নেই। বাকি সতেরোটি কঙ্কালের ধড় মুন্ড সব কিছুই রয়েছে।

আর, এভাবে যদি বারোটি জাহাজের প্রতিটিতেই কঙ্কাল থাকে, তা হলে সেই জাহাজে উঠলে কোনো মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি হতে পারে না। হয়ওনি। কেমন যেন অস্বস্তি হয় ওই জাহাজে উঠলে। উদ্ধারকারী বাহিনীর কর্মীদেরও তা হতে থাকে। সেকথা তাঁরা গোপনও রাখেননি।

কিন্তু তাঁদের এই ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয়নি জাপানি উপকূল বিভাগ। বরং তারা উৎসাহিত ছিল ওই বারোটি জাহাজে পাওয়া কঙ্কাল নিয়ে। তা নিয়ে খুব কৌতূহল তৈরি হয় উপকূল বিভাগের। তারা জাহাজগুলি পরীক্ষা করতে শুরু করে। জাহাজগুলির মাথায় প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া পতাকা রয়েছে।

পতাকা দেখে তারা সিদ্ধান্তে আসে, জাহাজগুলি উত্তর কোরিয়ার। তাই অনুমান করা হয়, উত্তর কোরিয়া থেকেই জাহাজগুলি জলে ভেসেছিল।

এখন প্রশ্ন হল, উত্তর কোরিয়া থেকে রওনা হলেও জাহাজগুলির শেষপর্যন্ত কী হয়েছিল? কেন এত কঙ্কাল নিয়ে এমন উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ভেসে যেতে হল সেগুলিকে? জাহাজগুলি কবে রওনা হয় উত্তর কোরিয়া থেকে? কী এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল সেই জাহাজগুলিকে?

যদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে জাহাজগুলি ডুবে যেত তাহলে না-হয় বোঝা যেত। কিন্তু এই জাহাজগুলি তো ডোবেনি, বরং ভেসেই চলেছিল!

অবশ্য উত্তর কোরিয়ার তরফে এমন বারোটি রহস্যজনক জাহাজ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। তারপর জাপান সরকারও এ নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করেনি। তবে জাপানি উপকূল বিভাগের কৌতূহলের খামতি ছিল না।

পরীক্ষা করে দেখা যায়, জাহাজগুলি খুবই ভারী কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছে। এমনভাবে জাহাজ তৈরি হত অনেক দিন আগে।

এর অর্থ, জাহাজগুলি বেশ পুরোনো। তার মানে অনেক বছর আগে জাহাজগুলি উত্তর কোরিয়া থেকে জলে ভেসেছিল! ঠিক কত বছর তা অবশ্য নিশ্চিত করে বলতে পারেননি উপকূল বিভাগের অনুসন্ধানকারীরা।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, অনেক পুরোনো হলেও কীভাবে জাহাজগুলি প্রায় অক্ষত থেকে গিয়েছে এতদিন ধরে, তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। আরও একটি প্রশ্ন হল, এতদিনে জল-হাওয়ার এত পরিবর্তন সত্ত্বেও জাহাজগুলির তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি কেন? রহস্যজনক তো বটেই।

কিন্তু কী করে তা সম্ভব? এই প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি। হয়তো মিলবেও না কোনো দিন, কারণ জাহাজগুলি নিয়ে আর ভাবনাচিন্তা করতে জাপান বা উত্তর কোরিয়া কোনো সরকারই তেমন আগ্রহী নয়।

জাহাজগুলি নিয়ে গবেষণা করার কাজ থেকে জাপান হাত গুটিয়ে নেয়। হয়তো জাহাজগুলি থেকে তাদের রাষ্ট্রীয় কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই দেখে সেগুলিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না টোকিও সরকারের।

তবে তাঁরা জানিয়েছেন, বড়ো বোট বা জাহাজগুলির ইঞ্জিন ভালো ছিল না। তাঁদের ধারণা, জাহাজগুলি ভারী হলেও ইঞ্জিনের মান তেমন উন্নত ছিল না।

কিন্তু এক্ষেত্রেও প্রশ্ন একটা থাকছেই, যদি জাহাজগুলি অনেক পুরোনো হয়ে থাকে, তাহলে এত দিনে ইঞ্জিনগুলির খারাপ হয়ে যাওয়া বা দুর্বল হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়।

অনুসন্ধানকারীরা জাহাজে বেশ কিছু মাছ ধরার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম খুঁজে পান। এসব দেখে তাঁদের অনুমান, জাহাজগুলি সম্ভবত মাছ ধরার জন্যই সমুদ্রে ভেসেছিল। বোধ হয় খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে সেগুলি দিক হারিয়ে ফেলে। অথবা, মাঝসমুদ্রে ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যায়। তাই সমুদ্রে ভেসে থাকা ছাড়া জাহাজগুলির আর কোনো উপায় ছিল না।

যদি তা-ই হয়, তবু সংশয় একটা থাকছেই। এতদিন ধরে সমুদ্রে ভাসছে এতগুলো জাহাজ, আর তা সমুদ্রে যাতায়াতকারী অন্য কোনো জাহাজের চোখে পড়েনি! তা ছাড়া একসঙ্গে এতগুলি জাহাজ সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে গেল অথচ উত্তর কোরিয়া সরকারের তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না!

তবে জাহাজগুলি যে ভূতুড়ে ছিল, সেই ধারণা কিন্তু উদ্ধারকারীদের কয়েক জনের মনে গেঁথেই রইল। সরকারি স্বীকৃতি না পেলেও নিজস্ব অনুভূতি ও ভাবনা থেকে তাঁরা সরে গেলেন না। তাঁরা মনে করেন, বারোটি জাহাজ যেমন রহস্যময়, তেমনই প্রতিটিতেই রয়েছে অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব। তাঁরা সকলে অস্বাভাবিক সেই জাহাজগুলিকে ‘ঘোস্টলি শিপস’ নাম দেন। তাঁদের বিশ্বাস, জাহাজগুলিতে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে থাকে।

এবার বলি ‘ম্যারি কেলেস্টে’ নামে একটি জাহাজের সত্যিঘটনা। তবে এই জাহাজের নাম ম্যারি কেলেস্টে ছিল না। প্রথমে এই জাহাজের নাম ছিল ‘আমাজন’। জাহাজটি লম্বায় ১০৩ ফুট আর সেটির ওজন ছিল ২৮০ টন।

প্রথম দিকে আমাজন ভালোই পরিসেবা দিচ্ছিল। কিন্তু আচমকাই বার বার দুর্ঘটনার শিকার হতে শুরু করল এই জাহাজ। টানা দশ বছর ধরে এই দুর্ঘটনা ঘটেই চলল। অনেকেই মনে করল, জাহাজটি বুঝি ভূতুড়ে হয়ে উঠেছে। যা-ই হোক, মালিকের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠল এই আমাজন। স্বভাবতই হাতবদল হতে শুরু করল জাহাজের মালিকানা।

এভাবে বেশ কয়েক বার মালিকানা হাতবদল হওয়ার পর নিউ ইয়র্কের স্যালভিজ হাউসে জাহাজটি বিক্রি হয় তিন হাজার ডলারে। নতুন মালিক জাহাজটির নাম পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন। তখনই জাহাজটির নতুন নাম হয় ‘ম্যারি কেলেস্টে’।

শুধু তাই নয়, জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে নিযুক্ত করা হয় অভিজ্ঞ বেঞ্জামিন ব্রিগসকে। ব্রিগস এর আগে তিনটি সমুদ্র অভিযানে সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরপর আসে ১৮৭২ সালের ৭ নভেম্বর। ম্যারি কেলেস্ট-এর যাত্রা শুরু হয়।

জাহাজটির ওপর দায়িত্ব ছিল সতেরো-শো ব্যারেল আমেরিকান মদ ইটালিতে পৌঁছে দেওয়ার। তাই ওইদিন নিউ ইয়র্ক থেকে জেনোয়ার পথে পাড়ি দেয় ম্যারি কেলেস্টে। যাত্রী ছিলেন এগারো জন। ক্যাপ্টেন ব্রিগস, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে এবং অন্য আট জন ক্রু। সকলের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে জাহাজটি নিউ ইয়র্ক বন্দর ছাড়ে।

কিন্তু যাত্রা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটে যায় একটি বিপর্যয়। মাঝসমুদ্রে হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যায় ম্যারি কেলেস্টে। অনেক খোঁজাখুঁজি হয়। কিন্তু জাহাজটির সন্ধান পাওয়া যায় না।

কিন্তু জাহাজটি একেবারে হারিয়ে যায়নি। শেষপর্যন্ত জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছে জাহাজটি ভাসতে দেখা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, জাহাজে কোনো মানুষ ছিল না। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, ক্যাপ্টেন ব্রিগস ও জাহাজের অপর দশ জন কোথায় গেলেন?

ম্যারি কেলেস্টে জাহাজে যান তদন্তকারীরা। তাঁরা অনেক পরীক্ষা করলেন জাহাজটি। সেখানে ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন ছিল না। তাই জাহাজে জলদস্যুর আক্রমণ হওয়ার কথা বলা যায় না। তা ছাড়া জাহাজটি ডুবেও যায়নি, গেলে ফের এভাবে জাহাজটিকে পাওয়া যেত না। পাওয়া গেল না ক্যাপ্টেনের লগবুকও। এই ব্যাপারটা তদন্তকারীদের রীতিমতো বিস্মিত করেছিল।

কিন্তু ক্যাপ্টেন ব্রিগস ও তাঁর স্ত্রী-কন্যা এবং অন্য আট জন ক্রুয়ের কোনো হদিশ করতে পারলেন না তদন্তকারীরা। শুধু তাই নয়, তাঁদের আর কখনো খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে যায়। অবশেষে ১৮৭৩ সালে স্পেন উপকূলে দু-টি লাইফবোট পাওয়া যায়। দুটি লাইফবোটে পাঁচটি মৃতদেহ ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন জলে থাকায় এবং সামুদ্রিক প্রাণীরা খুবলে খাওয়ায় দেহগুলি অনেকটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তাই দেহগুলি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তবে অনেকের মত হল, ওই পাঁচ মৃতদেহ ম্যারি কেলেস্ট-এর নিখোঁজ যাত্রীরা হতে পারেন। কিন্তু অনেকেই এই মত মানতে চাইলেন না। তাঁদের ধারণা, ম্যারি কেলেস্টে মোট এগারো জন যাত্রী ছিলেন। এখানে পাঁচটি দেহ পাওয়া গিয়েছে। তাহলে বাকি ছয় যাত্রী কোথায়?

এর উত্তর পাওয়া গেল না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যদি তাঁরা প্রাণ হারিয়ে থাকেন, তার সামান্য কোনো চিহ্ন কি জাহাজটিতে থাকত না? এই রহস্যের মীমাংসা হয়নি। বহু মানুষ জাহাজটিকে ‘ভৌতিক’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%