উপমন্যু রায়
কিছু-একটা আছে প্রাসাদে। কিন্তু কী সেটা? বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু রাত বাড়লেই মনে হয়, প্রাসাদে যাঁরা থাকেন যেমন—মাইকেল, মার্সেলা এবং মাইকেলজিনহো, —তাঁরা ছাড়াও আরও অনেকে রয়েছে সেখানে।
তাদের দেখা যায় না, কিন্তু তাদের উপস্থিতি পরিষ্কার টের পাওয়া যায়। তারা যেন ব্যস্ততার সঙ্গে চলাফেরা করছে। কখনো কখনো মনে হয় তারা যেন স্থিরদৃষ্টিতে প্রধান তিন বাসিন্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা যেন বিরক্ত। যেন ওই তিন বাসিন্দাকে তারা সহ্য করতে পারছে না। তারা যেন বলতে চাইছে, এই প্রাসাদ আমাদের। আমরা এখানেই থাকব। তোমরা চলে যাও।
ব্রাজিলে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হল আলভোরাদা প্যালেস। এই প্রাসাদটি রয়েছে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায়। জনপ্রিয় স্থপতি অস্কার নাইমেয়ার এই প্রাসাদের ডিজাইন করেছেন। আধুনিক রীতিতে এটি তৈরি হয়েছিল ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে।
ব্রাজিলে জাতীয় ঐতিহাসিক হেরিটেজ সাইটের তালিকায় এই প্রাসাদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রাসাদে শুধু প্রেসিডেন্টের থাকা, খাওয়া বা শোবার ঘরই নয়, রয়েছে আরও অনেক কিছু। যেমন রয়েছে বিশাল আয়তনের সুইমিং পুল। এ ছাড়া ব্রাজিলীয়দের রক্তে যেহেতু ফুটবল খেলা মিশে রয়েছে, তাই আলভোরাদা প্রাসাদে রয়েছে একটি ফুটবল মাঠও।
প্রেসিডেন্টের যাতে কোনোরকম অসুবিধে না হয় সেইজন্য এই প্রাসাদে এক-শো ষাট জন কর্মী রয়েছেন। কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন সচিব, সহকারী, ওয়েটার, রাঁধুনি, চিকিৎসক এবং নিরাপত্তাকর্মীও। প্রাসাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট কঠোর। পুরো প্রাসাদ ও প্রাসাদ চত্বরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ব্রাজিলের বিখ্যাত প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড ব্যাটেলিয়ান। প্রাসাদের ভিতরে উপাসনালয়, মেডিক্যাল সেন্টার এবং একটি বিশাল লন রয়েছে।
প্রাসাদের ভিতরে ঢুকলে আপনার মনে হবে বাইরে বের হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, প্রাসাদের ভিতরে আপনার থাকা, খাওয়া, ঘুরে-বেড়ানো, আমোদপ্রমোদ এবং শরীর যদি খারাপ করে তাহলে চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থাই রয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই প্রাসাদের প্রথম আবাসিক ছিলেন জুসসেলিনো কুবিতসচেক। সেই থেকে ব্রাজিলের প্রত্যেক প্রেসিডেন্টই নিজেদের পদাধিকার বলে এই প্রাসাদে থেকে গিয়েছেন।
কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটে গিয়েছে প্রেসিডেন্ট মাইকেল তেমেরের ক্ষেত্রে। তেমের হলেন ব্রাজিলের সাঁইত্রিশ-তম প্রেসিডেন্ট। দিলমা রৌসেফের ইমপিচমেন্টের পর ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন।
দিলমা যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিও স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই প্রাসাদের বাসিন্দা হয়েছিলেন।
কিন্তু ২০১৭ সালের ১২ মার্চ প্রায় গোটা পৃথিবীকেই চমকে দিয়েছে এএফপি। এএফপি ব্রাজিলের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে জানায় মাইকেল তেমের সম্পর্কে একটি চমকে ওঠার মতো খবর। খবরটি হল—ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মাইকেল তেমের স্বয়ং স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে বিলাসবহুল সরকারি আবাস ‘আলভোরাদা প্যালেস’ ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
কিন্তু কেন? তার আগে পরের কথাটুকু আগে বলি। এই প্রাসাদ ছেড়ে তিনি সাময়িকভাবে আশ্রয় নেন ভাইস প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকেন জাবুরু প্যালেসে।
এই প্রাসাদটিও যে বিলাসবহুল, সেকথা বলাই বাহুল্য। তবে এই প্রাসাদকে কখনো আলভোরাদা প্যালেসের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। আলভোরাদার চেয়ে জাবুরু প্রাসাদটি অনেকটাই ছোটো। আর সুযোগসুবিধাও অনেক কম।
অসংখ্য ব্রাজিলিয়ানের কাছে স্বপ্নের প্রাসাদ হল এই আলভোরাদা। তাই তেমেরের আলভোরাদা প্রাসাদ ছাড়ার কারণে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কিন্তু কেন? সেই প্রশ্ন—কেন তিনি অমন প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলেন?
কারণ হিসেবে জবাব গোপন রাখেননি প্রেসিডেন্ট তেমের বা তাঁর স্ত্রী মার্সেলা তেদেস্কি তেমের। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে আলভোরাদা প্যালেস ছিল ভয়ংকর গুহার মতো।
ভয়ংকর গুহা! —কিন্তু কেন? হ্যাঁ, কারণ আছে বই কী। কারণ, অশুভ শক্তি!
চমকে উঠবেন না। এ কোনো মনগড়া কাহিনি নয়। একথা বলেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট মাইকেল তেমের। একই কথা বলেছেন তাঁর স্ত্রী মার্সেলাও।
আমরা জানি কেউ কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট হলে সেই ব্যক্তিকে অনেক মেপে কথা বলতে হয়। একটা পোশাকি আবরণে নিজেকে সবসময় ঢেকে রাখতে হয়। এমন কোনো কথা তিনি বলতে পারেন না, যা তাঁর পদের অমর্যাদা করতে পারে। কারণ, তিনি একটি দেশের প্রেসিডেন্ট!
কিন্তু মাইকেল তেমের প্রেসিডেন্ট হলেও তেমন ব্যক্তি নন। তিনি যা বিশ্বাস করেন সেকথা প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা করেন না। তাই প্রাসাদ ছাড়ার কারণ সম্পর্কে তিনি খোলাখুলিই সব কথা বলে দিয়েছেন।
জানিয়েছেন, আলভোরাদা প্রাসাদে অশুভ আত্মা ভর করেছে। আর সেই আত্মারা চায় না তিনি সেখানে থাকুন। তবু তিনি সেখানে থাকতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই আত্মারা তাঁর সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ করে দিয়েছে।
তারা তাঁকে এমনভাবে বিরক্ত করে চলেছিল, যে কারণে তিনি ওই প্রাসাদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তিনি যদি সেই প্রাসাদ না ছাড়তেন, তাহলে তাঁর বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের অনেক বড়ো ক্ষতি হতে পারত। বিষয়টি নিয়ে তাই তাঁর পক্ষে কোনোরকম সমঝোতা করা সম্ভব ছিল না।
প্রেসিডেন্ট তেমের স্পষ্ট বলেছেন, ‘আমি আলভোরাদায় সবসময়ই অদ্ভুত কিছুর উপস্থিতি অনুভব করতাম। আমার মনে হত কোনো অস্বাভাবিক শক্তি প্রতি মুহূর্তে আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি ঠিকমতো ঘুমোতেও পারতাম না। উফ, কী ভয়ংকর রাত আমি কাটিয়েছি এতদিন!’
সত্যিই ভাবার মতো কথা বটে!
তিনি আরও বলেছেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম, এই অনুভূতি শুধু আমারই। যদি তারা থেকে থাকে, তারা শুধু আমাকেই বিরক্ত করে যাচ্ছে। কিন্তু পরে আমার সেই ভুল ভাঙল। দেখলাম মার্সেলাও সেই একই ঘটনার শিকার। তারপর আমার ছেলে। আর ঝুঁকি নিতে পারলাম না।’
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, তেমের যখন প্রাসাদ ছাড়েন তখন তাঁর বয়স ছিয়াত্তর। আর তাঁর স্ত্রী মার্সেলার বয়স তেত্রিশ।
মার্সেলা তাঁর প্রথম স্ত্রী নন। এর আগেও তিনি দু-বার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম মারিয়া ডি তোলেদো। মারিয়ার সঙ্গে তাঁর সেই বিয়ে টেকেনি। আইনি পথেই দু-জনের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম নেউসা পপিনিগিস। দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর বনিবনা হয়নি। একসঙ্গে থাকা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। দু-জনে আলাদা হয়ে যান।
এরপরই তাঁর পরিচয় মার্সেলার সঙ্গে। সুন্দরী মার্সেলা আগে মডেল ছিলেন। পরিচয় থেকে প্রেম, তারপর বিয়ে।
২০০৩ সালে দু-জনে বিয়ে করেন। মার্সেলা এখন ব্রাজিলের ফার্স্ট লেডি। মাইকেল তেমেরের মোট ছেলে-মেয়ের সংখ্যা ছয়। এর মধ্যে পাঁচ সন্তান প্রথম দুই পক্ষের। আর শেষ সন্তানটি মার্সেলা তেদেস্কি তেমেরের।
কিন্তু মার্সেলাকে নিয়ে ব্রাজিলে কম সমালোচনাও হচ্ছে না। অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও মার্সেলার আভিজাত্য এবং খরচের বহর নিয়ে ব্রাজিল ও বিদেশের সংবাদমাধ্যমে তাঁর তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।
বিশেষ করে ঘরবাড়ি সাজানোর ক্ষেত্রে এবং নিজের পোশাক-পরিচ্ছদের পিছনে যে বিপুল খরচ করেন মার্সেলা, তা ব্রাজিল বা বিদেশের মিডিয়া ভালোভাবে নেয়নি। তারা তাঁর এই খরচের বহর নিয়ে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন তুলেছে। মার্সেলা অবশ্য কোনো সমালোচনাকেই পাত্তা দেননি।
আরও একটি তথ্য বলা যাক। ২০১৬ সালের ১২ মে ব্রাজিলের পুলিশ তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তারা মার্সেলার ব্যক্তিগত ইন্টারনেট অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তাঁর কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ টাকা আদায় করতে গিয়েছিল।
কিন্তু, কী এমন ঘটনা ঘটল যে অতিপ্রাকৃত শক্তির ভয় পেয়ে বসল প্রেসিডেন্ট-দম্পতিকে? এমন নয় তো যে, শরীরের পাশাপাশি মনের বয়সও বেড়েছে বলে এমন অস্বাভাবিক সব ভাবনাচিন্তা তেমেরের মাথায় এসে জড়ো হয়েছে? যদিও শরীর ও মননে তিনি নিজেকে বেশ তরুণ বলেই মনে করেন।
যা-ই হোক, তাঁর স্ত্রী মোটেও বার্ধক্যে পৌঁছোননি। তিনি এখনও যুবতী। তাঁর সাহসিকতা বা আধুনিক ভাবনাচিন্তার কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই মার্সেলারও একই অনুভূতি হয়েছে সেই প্রাসাদে। এরপর তেমের সেই অনুভূতির জন্য নিজেকেই-বা দোষ দেবেন কী যুক্তিতে?
এই প্রসঙ্গে তেমেরের কথারই অনুরণন শোনা গেছে মার্সেলার কন্ঠেও। ওই অস্বাভাবিক কিছুর উপস্থিতি সেখানে এতটাই তীব্র ছিল যে, ভয়ে তাঁরা দু-জনের কেউই প্রাসাদের অনেক জায়গায় যেতেন না।
এত ভয় নিয়ে কখনো দীর্ঘদিন এক জায়গায় থাকা যায় না। তার ওপর তাঁরা প্রেসিডেন্ট এবং ফার্স্ট লেডি বলে কথা! দেশের গোটা সামরিক বাহিনী রয়েছে তাঁদের সঙ্গে। তাহলে তাঁরা কেন ভয়ের সঙ্গে আপোশ করবেন?
কিন্তু, তাঁদের সাত বছরের ছেলে মাইকেল জিনহো অত বোঝে না। তার বয়স এখন ছোটাছুটি করার, খেলা নিয়ে মেতে থাকার। সেতা-ই করে। আর সেভাবেই তার সময় কাটে।
কখনো কখনো অদ্ভুত কিছু অনুভূতি তার হলেও হয়ে থাকতে পারে। তবে সেসব মাইকেল জিনহো বোঝে না। বেশি কিছু হলে বড়োজোর হয়তো সেকেঁদে ফেলত। মাকে বলত, কেউ তাকে বিরক্ত করছে। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। বাবা-মা কাছে থাকলে ফের সব ভুলে যেত। আবার মেতে উঠত খেলাধুলোয়।
তাই সেসব কিছু ভুলে প্রাসাদের সব জায়গায় যেত। খেলতও। ব্যাপারটা চিন্তিত করেছিল প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে। ছেলের কোনো ক্ষতি হয়ে যায় কি না তা নিয়ে তাঁরা দু-জন সবসময়ই মানসিক চাপে থাকতেন। কিন্তু সবসময় ছেলেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন না তাঁরা।
এদিকে তাঁদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল সেই অশুভ শক্তি। রাত হলেই প্রাসাদটাকে ভয়ংকর মনে হত তাঁদের। গোটা প্রাসাদই চলে যেত সেই শক্তির নিয়ন্ত্রণে। ঘুম তো হতই না, রাতটাকেও বড়ো দীর্ঘ মনে হত। ঘুম হত সকালের দিকে। ফলে কাজেকর্মেও ব্যাঘাত হতে শুরু করেছিল প্রেসিডেন্ট তেমেরের।
শেষপর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করতে উদ্যোগী হন ব্রাজিলের ফার্স্ট লেডি মার্সেলা। যাঁরা অশুভ শক্তি নিয়ে চর্চা করেন, এমন পুরোহিত তিনি ডেকে আনেন প্রাসাদে। সেই পুরোহিতের নির্দেশে প্রাসাদে ধর্মীয় আচারও পালন করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
তারপর এল সেই রাত। অশুভ শক্তির মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবে আলভোরাদা প্রাসাদ যেন বীভৎস ও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাই আর নিজেদের স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি তেমের দম্পতি। তাঁরা আগুপিছু না-ভেবে প্রাসাদ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েন। তারপর সোজা চলে যান ভাইস প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন জাবুরু প্যালেসে।
কিন্তু আলভোরাদা প্যালেসে কী আছে? সেই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি। হয়তো একসময় প্যারানর্মাল বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সেখানে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাবেন। প্রকৃত সত্য উদ্ধার করবেন। তবে তেমের পরিবার এবং যাঁরা প্রাসাদকে জানেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন আলভোরাদার অশরীরী আতঙ্কের কথা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন