ব্রিটেনের রহস্য-বাড়ি

উপমন্যু রায়

মধ্যযুগে শক্তিশালী দেশ হিসেবে উত্থান যে দেশের, কুড়ি শতকের মধ্যভাগ অবধি যে দেশ সারা পৃথিবীকে প্রায় নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে, সেই দেশটি হল ব্রিটেন। রাজনীতি, প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতির পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্রিটেনের আধিপত্য যেমন পৃথিবীজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল, ঠিক তেমনই এই দেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে অস্বাভাবিক সব ব্যাখ্যাতীত নানা ঘটনা।

গোটা ব্রিটেনে বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দাপট লক্ষ করা গিয়েছে। তাঁরা ব্রিটেনজুড়ে নানা জায়গায় অসংখ্য অট্টালিকা বা মহল নির্মাণ করে গিয়েছেন। সেই সব বাড়ির অনেকগুলিই আজ রহস্যময় বাড়ি হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে রয়েছে।

প্রাচীন র‌্যাম ইন

ব্রিটেনের অন্যতম ভয়ংকর ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে অ্যানসিয়েন্ট র‌্যাম ইনের কথা বলা হয়ে থাকে। এই বাড়িটির অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে নানা সময়ে অসংখ্য অশুভ ঘটনা ঘটেছে। যেমন শিশুহত্যা বা আত্মহননের ঘটনা এবং ধর্মীয় কারণে জাদুবিদ্যার ব্যবহার এখানে বার বার দেখা গিয়েছে।

আবার বহু সময় এই বাড়িটি অপরাধীদের গুপ্ত আশ্রয়স্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বাড়ির বর্তমান মালিক জন হ্যাম্ফিসও বিশ্বাস করেন, তিনি এই বাড়িটিতে বিশৃঙ্খলভাবে বিরাজ করা সমস্ত ভূতপ্রেতের সঙ্গে বাস করেন। এখানে নাকি আছে দু-টি দানব, একটি ডাইনি, দু-টি অক্ষিগোলক এবং অন্য বিভিন্ন ধরনের অশরীরী আত্মা। এই বাড়িটিতে যাঁরাই এসেছেন, তাঁরাই পরে বলেছেন, এমন ভীতিপ্রদ জায়গায় তাঁরা এর আগে কখনো যাননি।

এই সেই হোটেল, যার একটি অদ্ভুত রেকর্ড রয়েছে। তা হল, এই হোটেলে নাকি আজ পর্যন্ত কেউ একা রাত কাটাতে পারেননি। হোটেলের ভিতরে গভীর রাতে এমন সব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, তা অনেকেই সহ্য করতে পারেননি। তাঁদের মনে হয়েছে, হোটেলে যদি বাকি রাতটুকু থাকার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁরা হয়তো প্রাণে বঁাচবেন না। তাই তাঁরা প্রাণ বঁাচানোর জন্য হোটেলের জানালা দিয়ে বাইরে ঝাঁপ দিয়েছেন।

কিন্তু হোটেলে রাতে কী এমন ঘটে, যে কারণে যাঁরাই হোটেলে রাত কাটাতে যান, তাঁরা এমন সমস্যায় পড়েন? সমস্যায় শুধু বাইরে থেকে আসা অতিথিরাই পড়েন না, এমনকী হোটেলের পুরোনো মালিকরাও বার বার এই হোটেলেই সমস্যায় পড়েছেন। ফলে তাঁরা মালিকানাও ধরে রাখতে পারেননি। তাই হোটেলের মালিকানারও বার বার বদল ঘটেছে।

১১৪৫ সাল থেকে বহু ব্যক্তির হাতে এই হোটেলের মালিকানা গিয়েছে। এখন এই হোটেলের মালিক জন হ্যাম্ফিস। মনে করা হয়, যখন এই বাড়িটি তৈরি হয়, তখন সেটির মালিক ছিল স্থানীয় সেন্ট মেরিস চার্চ।

বহু প্রাচীন এই হোটেলটি রয়েছে গ্লস্টারশায়ারের স্ট্রাউড জেলায়। সেখানকার একটি মার্কেট টাউন হল ওটন-আণ্ডার-এজ। সেখানেই এই হোটেলটির অবস্থান। এই বাড়িটি ছিল ইংল্যাণ্ডের নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় শ্রেণির। আগে এটি বার ছিল।

হোটেলটি তৈরি হয়েছিল প্যাগান কবরস্থানের ওপর। আর, পরে রক্ষণাবেক্ষণের সময়ও কিছু খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়। তখন সেখান থেকে উদ্ধার হয় প্রচুর মানুষের হাড়গোড় ও কঙ্কাল। সেই কারণেই হয়তো হোটেলটিতে এত অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে থাকে। নতুবা হোটেলে ঘটে চলা অতিপ্রাকৃত ঘটনার অন্য কোনো কারণ আজ অবধি কেউ খুঁজে পাননি।

শেষ অবধি এইসব রহস্য জানতে এখানে আসেন প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা এখানে বেশ কিছুদিন গবেষণা চালান। রাতও কাটান। কিন্তু কোনোরকম ভৌতিক ব্যাপার তাঁদের চোখে পড়েনি। তবুও তাঁরা হোটেলটিকে রহস্যমুক্ত বলে ঘোষণা করতে পারেননি।

কারণ, তাঁদের হোটেলে থাকার সময়ই ঘটে যায় একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। হোটেলের মালিকও তখন সেখানকার একটি ঘরে ছিলেন। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি মালিককে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, তাঁকে উঁচু জায়গা থেকে নীচে ফেলেও দেয়। চোখের সামনে দেখলেও বিশেষজ্ঞদের কেউই তাঁকে বঁাচাতে যাওয়ার সাহস পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। তাই তাঁরাও সেই হোটেলে অশরীরী অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

কেন্টের প্রাকলে গ্রাম

এই প্রসঙ্গে কেন্টের প্রাকলে গ্রামের কথা বলা যেতে পারে। এই গ্রামটিকে ব্রিটেনের সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর ভূতুড়ে গ্রাম বলা হয়ে থাকে। আর এই কারণেই ১৯৮৯ সালে গিনেস বুকের বিশ্বরেকর্ডে স্থান করে নিয়েছে গ্রামটি। বলা হয়ে থাকে, এই গ্রামে নাকি বারো থেকে ষোলোটি ভূতের বাস।

এদের মধ্যে রয়েছে বেদম হাসতে থাকা এক পুরুষ, সড়কপথ ধরে অবিরাম চলতে থাকা আর এক পুরুষ, রাস্তার ডান দিকে একটি ভীতিপ্রদ স্থানে যাকে দস্যুরূপে হামেশাই নাকি দেখতে পাওয়া যায়।

এ ছাড়া একদল অল্পবয়সি ছেলে-মেয়ে এক স্কুলমাস্টারকে প্রায় দিনই ওই গ্রামে এনে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেয়। সেই দৃশ্যও নাকি রাতের অন্ধকারে সেখানে দেখা যায়। আবার ওই গ্রামেরই একটি ব্রিজে বসে এক বৃদ্ধাকে ধূমপান করতেও নাকি অনেকে দেখেছেন।

এই গ্রামকে নিয়ে ব্রিটেনের টেলিভিশনেও অনেক অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়েছে। যাঁরা ভূতপ্রেত নিয়ে চর্চা করেন, তাঁদের কাছে এই গ্রামটি অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা।

বোরলে রেকটরি, এসেক্স

বোরলে রেকটরি ছিল ভিক্টোরীয় আমলের অট্টালিকা। এটির অবস্থান এসেক্সের বোরলে গ্রামে। ১৯৩৯ সালে এই বাড়িটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। তারপরই এই বাড়িটি ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যায়।

ব্রিটেনের সবচেয়ে ভৌতিক বাড়ি কোনটি? এই প্রশ্ন করা হলে, অনেকেই উত্তরে বলবেন এই বোরলে রেকটরির কথা। বোরলে রেকটরি সত্যিই ব্রিটেনের সবচেয়ে ভৌতিক জায়গা কি না, তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে বলা যায়, এই বাড়িটি বাস্তবিকই রহস্যময়।

স্থানীয়দের মতে, ১৯৩৯ সালে বাড়িটি পুড়ে যাওয়ার পর থেকেই এই বাড়িতে নাকি হাজার এক অস্বাভাবিক ঘটনার কথা জানতে পারা যায়। এ ব্যাপারে একবার অনুসন্ধান চালান প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞ হ্যারি প্রাইস।

সেই ঘটনা বিস্তারিতভাবে ডেইলি মিরর প্রকাশ করলে গোটা ব্রিটেন জুড়ে আলোড়ন পড়ে যায়। হ্যারি প্রাইস গভীর রাতে ওই বাড়িতে বেশ কয়েক জনের হাঁটাচলার আওয়াজ শুনতে পান। কিন্তু কারা চলাফেরা করছে? অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই আওয়াজ আসলে সেই সব মৃত মানুষের, ১৮৬০-এর দশকের এক রাতে যাঁদের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছিল।

এ ব্যাপারে একটি মর্মান্তিক কাহিনির কথা শুনতে পাওয়া যায়। ১৮৬৩ সালে রেভারেণ্ড হেনরি ডসন এলিস বুল বোরলে গ্রামে একটি বাড়ি তৈরি করেন। বাড়িতে তিনি স্ত্রী ও চোদ্দো ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাস করতে শুরু করেন। তাঁদের সংসার সুখেরই ছিল। কয়েকটি প্রজন্মও কেটে যায়। কিন্তু ১৯৩৯ সালে আগুনে বাড়িটি পুড়ে যাওয়ার পর সব হঠাৎই যেন বদলে যায়।

বাড়িটিতে দিনের পর দিন ভূতুড়ে কান্ড ঘটতে থাকে। তারপরই প্রকাশ্যে আসে সেই ঘটনা। শোনা যায়, এক সন্ন্যাসীর প্রেমে পড়েন বোরলের এক নান। কিন্তু সমাজে তাঁদের প্রেম অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাঁরা দু-জন ঠিক করেন, পালিয়ে গিয়ে তাঁরা বিয়ে করবেন।

এক বন্ধুর সহায়তায় পরিকল্পনা করে তাঁরা পালিয়েও যান। কিন্তু রাতে রাস্তায় তাঁরা ধরা পড়ে যান। তাঁদের বেঁধে নিয়ে আসা হয়। বিচার হয় বন্ধু ও প্রণয়ী যুগলের। বিচারে তিন জনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বন্ধুটির মাথা কেটে ফেলা হয়। সন্ন্যাসীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আর নানকে অনেক উঁচু প্রাচীর থেকে ফেলে মেরে ফেলা হয়।

যদিও অনেকে বলে থাকেন, উঁচু জায়গা থেকে ফেলে নানকে মারা হয়নি। তাঁর শরীরে পেট্রোল ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়। বলা হয়ে থাকে, তারপর থেকেই রাতের দিকে বাড়িটি ঘিরে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটতে থাকে।

বোরলেতে প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন পি শ জেফরি। তিনি দেখেন, কারা যেন সেখানে পাথর ছুড়ছে। ১৮৮৫ সালে কোলচেস্টার রয়্যাল গ্রামার স্কুলের প্রাক্তন প্রধানশিক্ষক নাকি এক নানকে অনেক বার নীরবে হেঁটে যেতে দেখেছিলেন। এখানকার ডিনার পার্টিতে আসা অতিথিরাও বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, তাঁরা ওই নানের বিষণ্ণ মুখ রেকটরির জানালায় দেখেছেন।

এ ছাড়া রাতে এখানকার রাস্তা ধরে নাকি দুই মুন্ডহীন অশ্বারোহী ছুটে যায়। শুধু তাই নয়, রাতের বেলা যাত্রীহীন একটি রহস্যময় গাড়িও নাকি এখানকার পথ দিয়ে যায়। এক ভৃত্য নাকি রাতেই কখনো কখনো ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যায়। আবার, আচমকাই কারা যেন এখানে বোতল ছুড়তে থাকে।

১৯৪৪ সালে লাইফ ম্যাগাজিনে এই বিষয়ে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই নিবন্ধই ব্রিটেনজুড়ে হইচই ফেলে দেয়। জানা যায়, ওই নিবন্ধের পক্ষে ছবি তোলার জন্য ম্যাগাজিনের যে ফোটোগ্রাফারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি ওই বাড়িতে গিয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তিনি যখন ছবি তুলছিলেন, তখন কেউ তাঁকে ঢিল ছুড়ে যেন বাধা দিতে চাইছিল। ব্যাপারটা বেশ কয়েক বার ঘটলে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা গোটা বাড়ি ও তার চারদিকে তল্লাশি চালান। কিন্তু কোথাও কাউকে পাওয়া যায়নি।

তার পাশাপাশি ফোটোগ্রাফারের ক্যামেরায় নাকি অস্পষ্ট কিছু ছায়াশরীর ধরা পড়েছিল, যাদের খালি চোখে কেউই দেখতে পাননি। এরপরই ব্রিটেন তো বটেই, ব্রিটেন ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাড়িটির খবর ছড়িয়ে পড়ে।

দ্য স্কিরিড মাউন্টেন ইন, লণ্ডন

লাংফিহাঙ্গেল ক্রুকর্নেয়ের একটি ছোটো গ্রামে রয়েছে এই দ্য স্কিরিড মাউন্টেন ইন। ওয়েলসের মনমাউথশায়ারের উত্তর অ্যাবেরগাভেনির কয়েক মাইল দূরে রয়েছে এই ইন-টি। ওয়েলসের সবচেয়ে পুরোনো পাব হিসেবে এই স্কিরিড ইন-কে মনে করা হয়। সূচনার পর থেকে বিভিন্ন সময় বহু বিখ্যাত মানুষ এই পাবে এসেছেন।

বাড়িটি নির্মিত হওয়ার পর প্রথম দিকে তার প্রথম তলাটি আদালত কক্ষ হিসাবে ব্যবহৃত হত। অপরাধীদের এখানে বিচার হত এবং ফাঁসিও দেওয়া হত এখানেই। কথিত আছে, আজ থেকে ন-শো-রও বেশি বছর আগে এখানে এক-শো আশি জন লোককে সিঁড়ির বিম থেকে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। আর ওই ঘটনার পর থেকেই নাকি এই জায়গাটি ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

একদিন রাতে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক দেখেন, একটি গ্লাস বাতাসে ভাসছে। শুধু তাই নয়, একপ্রকার উড়েই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা কী করে সম্ভব, তা তখন ওই ভদ্রলোক বুঝতে পারেননি। তবে এটাই ছিল সেখানে মানুষের দেখা প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা।

তারপর থেকে প্রায় রাতেই সেখানে অদ্ভুত সব ঘটনা দেখা যেতে থাকে। যেমন অনেকেই দেখতে পেত, একদল লোক যেন সেখানে ফাঁস বানাচ্ছে। কোনো কোনো রাতে আবার সেই ফাঁসে কাউকে কাউকে ঝুলে পড়তেও দেখা যেত। যদিও সকালে সেখানে তাদের চিহ্নমাত্র দেখতে পাওয়া যেত না।

মনে করা হয়, যে এক-শো আশি জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তাদেরই আত্মা সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কখনো ফাঁস বানায়, কখনো-বা সেই ফাঁসে নিজেরা ঝুলে পড়ে। এই অশরীরীরা সেই সময় রীতিমতো সকলের কাছে আতঙ্কের হয়ে উঠেছিল। অনেকেই জায়গাটি এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।

এখানেই শেষ নয়। সেখানকার ঠাণ্ডা ঘরগুলির প্রকৃতিও আচমকা যেন বদলে যেত। কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠত সেই সব ঘর। সেই ঘরগুলির তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যেত যে, সেগুলি থেকে লোকজন বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হত।

বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান অট্টালিকার মালিক ফেনি প্রাইস। প্রথম দিকে গুরুত্ব না-দিলেও শেষপর্যন্ত তিনি মেনে নেন যে, ওই বাড়িতে অনেক সক্রিয় অশরীরী শক্তি রয়েছে। সেখানে আসা মানুষকে তিনি বিষয়টি নিয়ে সতর্কও করে দেন। জানিয়ে দেন, জায়গাটি বিপজ্জনক। সেখানে থাকা যে-কারও পক্ষেই অত্যন্ত ঝুঁকির কাজ হয়ে যাবে।

লণ্ডন টাওয়ার, লণ্ডন

লণ্ডন টাওয়ারকেও রীতিমতো রহস্যময় বলে ব্রিটিশরা মনে করে থাকেন। এই রহস্য উৎঘাটন করতে বহু গবেষক এখানে অনেক বছর ধরেই অসংখ্য বার অনুসন্ধান চালিয়েছেন।

লণ্ডনের বিখ্যাত ‘টাওয়ার অফ লণ্ডন’, যা আগে বাসস্থান এবং পরবর্তীতে একটি কারাগার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এখানেই বহু কুখ্যাত অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া এখানেই শাস্তি পেয়েছিলেন রাজা অষ্টম হেনরির স্ত্রী অ্যান বলেইনও। ঘটনাটি রীতিমতো দুঃখজনক।

অথচ অ্যান মোটেও প্রকৃত অপরাধী ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি কোনো পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে পারেননি। আর পুত্র না জন্মালে কে উত্তরাধীকারী হবে? তাই অ্যানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল!

১৫৩৬ সালে তৃতীয় হেনরির সময় তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। লণ্ডন টাওয়ারেই তাঁর মুন্ডচ্ছেদ করা হয়েছিল। তারপর থেকে প্রায় রাতেই ওই টাওয়ারে নাকি মস্তকবিহীন সেই রানিকে নীরবে হেঁটে যেতে দেখা যায়। অ্যানের অতৃপ্ত আত্মার হাহাকার আজও নাকি সময় বিশেষে শোনা যায় ওই টাওয়ারে।

লণ্ডন টাওয়ারে একটি সল্ট টাওয়ার আছে। জায়গাটি এতটাই বিপজ্জনক যে, সেখানে শুধু মানুষ কেন, কোনো কুকুরও নাকি যেতে চায় না। তখন সেখানে সেনারা পাহারা দিত। সেই সেনারাও নাকি অ্যানকে দেখেছে। অ্যানের শরীরে কোনো মাথা ছিল না!

ওয়েকফিল্ড টাওয়ারে রাজা ষষ্ঠ হেনরির আত্মাকেও নাকি তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দেখা যায়। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতে পৌঁছোলে শোকার্ত হেনরি নাকি ওই টাওয়ার ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় চলে যান!

এ ছাড়া হোয়াইট টাওয়ারে স্কুলের একদল শিশুর সঙ্গে এক শ্বেতাঙ্গ মহিলাকেও নাকি ছুটে বেড়াতে দেখেছেন অনেকে। সেইসময় তাঁর শরীর থেকে পারফিউমের গন্ধ বের হয়। শোনা যায়, ওই গন্ধে সেই টাওয়ারের অনেক রক্ষীই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

লণ্ডন টাওয়ারে ৮,৮৮,২৪৬ সিরামিকের তৈরি পপি গাছ রয়েছে। এই গাছগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্রিটিশ সেনাদের স্মরণে লাগানো হয়েছিল। এই গাছের ফুলগুলি লাল টকটকে। দূর থেকে দেখলে রক্তস্রোত মনে হবে। অমাবস্যার রাতে এই টাওয়ারের পরিবেশ নাকি অস্বাভাবিক বদলে যায়।

বেরি পমেরয় ক্যাসল

বেরি পমেরয় ক্যাসল বা দুর্গটি রয়েছে দেভন শহরে। দুর্গটি অসাধারণ দেখতে, ঠিক যেন ছবির মতো। আবার, তেমনই ছবির মতো সুন্দর দেখতে একটি শহরেই রয়েছে সেই দুর্গ। কিন্তু, এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অনেক অশুভ রহস্যময় ব্যাপার।

ব্রিটেনে অসংখ্য দুর্গ রয়েছে। সেগুলির মধ্যে এই দুর্গটিকে অন্যতম ভূতুড়ে দুর্গ বলে বিশ্বাস করে থাকেন ব্রিটিশরা। এই দুর্গে এমন দু-জন মহিলাকে দেখা যায় যাঁরা নাকি ঠিক মানুষ নন, বরং অশরীরী বলা যায় তাঁদের। এই দু-জনের একজন সাধারণ ব্রিটিশদের মতো শ্বেতাঙ্গিনি।

কিন্তু অপরজন তা নন। তাঁর গায়ের রং নাকি নীল। তাঁকে ব্লু লেডি বলে উল্লেখ করে থাকেন ওই দুর্গের নিকটবর্তী বাসিন্দারা। এই মহিলাকে একাই দেখা যায় দুর্গের টাওয়ারে। তাঁর নাকি ঘুম হয় না তাই তিনি রাতে সেখানে ঘুরে বেড়ান; পথচারীদের ডেকে কথা বলেন; নানা ধরনের সাহায্যও চান সকলের। কেউ যদি তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান তাহলেই বিপদ। সেই সাহায্যকারীকে টাওয়ার থেকে নীচে ফেলে দেন ওই মহিলা।

আর সেই টাওয়ার থেকে পড়ে গিয়ে এ পর্যন্ত কেউ প্রাণে বঁাচেননি। অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ মহিলাটিকে নাকি অন্ধকূপের মধ্যে দেখা যায়।

চিলিংহাম দুর্গ, নর্দাম্বারল্যাণ্ড

দ্বাদশ শতকে নর্দাম্বারল্যাণ্ডের চিলিংহাম দুর্গে আট জনের মৃত্যুদন্ড একসঙ্গে কার্যকর করা হয়েছিল। কোনো দুর্গে সরকারিভাবে একসঙ্গে এত মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার দিক থেকে এটা একটা রেকর্ড বলা যায়। এখনও নাকি রাত গভীর হলে ওই আট জনের প্রেতাত্মারা দুর্গময় দাপিয়ে বেড়ায়।

দুর্গটির ভৌতিক কাহিনি এবং ভীতিপ্রদ নানা ঘটনার কথা এখানকার মানুষের মুখে শোনা যায়। যদিও বিষয়টি নিয়ে দুর্গ কতৃপক্ষ কোনোরকম গোপনীয়তার আশ্রয় নেননি কখনো। আগ্রহীদের দুর্গটি ঘুরে দেখার জন্য অনুমতিও দেওয়া হয়ে থাকে। অনেক পর্যটকই নাকি দুর্গটির ভিতরে মারাত্মক কিছু রহস্যময় ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন।

তাঁদের অনেকেরই চোখে পড়েছে গম্ভীরভাবে চলতে থাকা একটি নীল বালক এবং কাঁদতে থাকা একটি অত্যাচারিত শিশুকে। এ ছাড়া লেডি মেরির প্রেত এবং একটি রাজকীয় ভূতুড়ে মিছিলও দেখা যায় ওই দুর্গে।

তাই এই চিলিংহাম দুর্গটি ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে অনেক পরিচিতি পেয়ে যায়। দুর্গটি ব্রিটেনের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গগুলোর অন্যতম। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্রাটরা বিভিন্ন সময় এই দুর্গে বাস করেছেন। তাঁদের মধ্যে যেমন প্রজাদরদি সম্রাট ছিলেন, তেমনই ছিলেন নিষ্ঠুর-অত্যাচারী শাসকও। কোনো কোনো সম্রাট তো এই দুর্গেই তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন নির্যাতন কেন্দ্র।

তাই এই দুর্গের অসংখ্য ঘরের বিভিন্ন ঘর নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা লোককাহিনি। শোনা যায়, আঠারো শতকে এই দুর্গেই থাকতেন সুন্দরী লেডি মেরি বার্কলি। তিনি বেশ সম্ভ্রান্ত ছিলেন। তবে তাঁর স্বামী লর্ড গ্রে একজন লম্পট ও চরিত্রহীন পুরুষ ছাড়া আর কিছু ছিলেন না।

সেই গ্রে শেষপর্যন্ত মজেন নিজের শ্যালিকার সৌন্দর্যে। এমনকী তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পালিয়ে যান তিনি। বিয়েও করেন। এই অপমান ও দুঃখ সহ্য করতে পারেননি মেরি বার্কলি। তিনি আত্মহত্যা করেন।

এরপর দুর্গটিও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। দুর্গের সেই ঘরে নাকি এখনও কাঁদে মেরি বার্কলির আত্মা। অপমান ও প্রেম হারানোর যন্ত্রণায় পায়চারিও করে। মেরি বার্কলি যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরের দেওয়ালে একটি পোট্রেট টাঙানো রয়েছে। দুর্গের বাসিন্দা ও কর্মীদের বক্তব্য, মাঝরাতে নীরব দুর্গে সেই পোট্রেট নাকি জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে মেরির অতৃপ্ত আত্মা।

এই দুর্গের আরও একটি রহস্যময় ঘরের নাম ‘পিংক’। মধ্যরাতে সেই ঘর থেকে এক কিশোরের গোঙানির শব্দ প্রায়ই বাইরে ভেসে আসে। মনে হয় যেন কিশোরটির ওপর কেউ নৃশংস অত্যাচার চালাচ্ছে। যন্ত্রণায় কিশোরটি কাঁদতেও পারছে না। তাই তার গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

শুধু তা-ই নয়, ওই ঘরে রাত কাটিয়েছেন যাঁরা, তাঁরাই রাতে ভয়াবহ এক দৃশ্য দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেওয়াল ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে আসে কোনো আতঙ্কিত কিশোর। তার শরীরের পোশাক সম্পূর্ণ নীল। এমনই নানা ঘটনা এই দুর্গটিকে ভয়াবহ করে রেখেছে আজও।

ডেনহাম চার্চ, অক্সব্রিজ

ইংল্যাণ্ডের ভয়ংকর ও রহস্যজনক চার্চগুলির মধ্যে অন্যতম হল ডেনহাম চার্চ। এই গির্জাটি অক্সব্রিজের ডেনহামে অবস্থিত। এখানেও নাকি রয়েছে অনেক অশরীরীর আনাগোনা। এখনও পর্যন্ত যাঁরা এখানে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রমাণ পেয়েছেন তাঁদের বক্তব্য, এখানে মোট এগারোটি অশরীরী আত্মা ঘুরে বেড়ায়।

অনেকেই এই গির্জায় এক বয়স্ক যাজককে দেখেছেন। কিন্তু ওই যাজকটির মৃত্যু অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে। খ্রিস্টান যাজকটিকে পুরোনো গির্জা থেকে বের হয়ে হেঁটে চলে যেতে দেখা যায়। যাজকটির গন্তব্য যে কোথায়, তার উত্তর কেউ জানেন না।

আবার, কেউ কেউ এক বৃদ্ধার কায়াহীন আত্মাকেও দেখেছেন এখানে। ওই আত্মা নাকি গির্জার পাশে থাকা ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকে। অনেকে সাহস করে ওই গির্জায় গিয়ে বিপদেও পড়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা নাকি এক ভয়ংকর অপচ্ছায়ার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সেই অপচ্ছায়ার চোখ দু-টি ছিল ভয়াল। সেই রক্তবর্ণ ও গোলাকার চোখ দু-টি একবার দেখলেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠবে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসবে।

তথ্য বলছে, ১৯২০ সালে এই গির্জায় একটি ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে। এক কৃষক নাকি শস্য কাটার একটি যন্ত্রে পড়ে যান। মুহূর্তেই তাঁর সারা শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাঁর আত্মাও নাকি অতৃপ্ত থেকে গিয়েছে।

গির্জার অধীন খামারবাড়িতে নাকি গভীর রাতে ওই কৃষকের আত্মাকে শস্য কাটার কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কখনো কখনো তাঁকে বিকট শব্দে চিৎকার করতেও শোনা যায়। অসম্ভব যন্ত্রণার সেই চিৎকার।

সবচেয়ে রহস্যময় হল গির্জার মেঝে। প্রায়ই নাকি এই মেঝেতে রক্তের ছোপ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু ওই রক্ত কোত্থেকে আসে, তা আজ পর্যন্ত কেউই বলতে পারেননি। কারণ, কোনো আহত বা নিহত ব্যক্তিকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া মাঝে মাঝে গির্জার ভিতরে অদ্ভুত সব আলো দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলি কীসের আলো তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। অনেকে প্রথমে ভেবেছিলেন আলোগুলি বুঝি ফসফরাসের। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায়, তা নয়। তবে ওই সব আলোর কাছে কেউ পৌঁছোতে পারেননি।

এই গির্জার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক সুন্দরী যুবতীর কাহিনি। মনে করা হয়, ওই যুবতী নাকি ডাকিনীবিদ্যা জানত। অনেকে আবার যুবতীটিকেই ডাকিনী বলে মনে করত। অনেক দিন পর গির্জার মধ্যে থাকা একটি কূপে ওই যুবতীটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

কেউ কেউ মনে করেন, তার মৃত্যু নাকি স্বাভাবিক ছিল না। সেই সুন্দরীকে নাকি খুন করে ওই কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ‘ডাকিনী’র আত্মা নাকি এখনও মুক্তি পায়নি। তার অতৃপ্ত আত্মা এখনও গির্জা চত্বরে ঘোরাফেরা করে। অনেকেই সেই সুন্দরী যুবতীর কায়াহীন ছায়া দেখেছেন সেখানে।

এ ছাড়া গভীর রাতে প্রায়ই সাফলকের ইপসউইসের পাইপার ভ্যালি ব্রিজের উপর দিয়ে গোলাকার একটি আলোর বস্তুকে উড়ে যেতে দেখা যায়। সেটি কোত্থেকে আসে আর কোথায় যায় কেউ বলতে পারেন না। আবার অনেকে দাবি করেন, সাদা পোশাক পরিহিত একটি দেহও নাকি এখানে শূন্যে ভাসে। এমন অদ্ভুত দৃশ্য ও ঘটনা গির্জাটিকে রহস্যময় করে রেখেছে আজও।

সুনার হোটেল, অলমাউথ, নর্দাম্বারল্যাণ্ড

সুনার হোটেল শুধু ইংল্যাণ্ডের নয়, গোটা বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো হোটেল। ষোলো শতকে হোটেলটি তৈরি হয়। তাই হোটেলটির অনেক সুনামও রয়েছে।

একসময় হোটেলটিতে বহু স্মাগলার, খুনি ও বাউণ্ডুলেদের যাতায়াত ছিল। রাজা তৃতীয় জর্জ, চালর্স ডিকেন্সের মতো বিখ্যাত লেখকও নাকি এই হোটেলে রাত কাটিয়েছেন। এখনও অনেক অতিথি এখানে রাত কাটাতে আসেন। তবে এই হোটেলের একটি কুখ্যাতিও আছে। আর তা হোটেলটির ভৌতিক রহস্যের জন্য।

একসময় এই হোটেলে বহু আত্মহত্যা, খুন, পারিবারিক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই হোটেলের ৬০টি বা তার বেশি ঘর ও করিডোর নাকি নানা ধরনের ভৌতিক ঘটনার সাক্ষী। যাঁরা এই হোটেলে রাত কাটিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখানে অস্বাভাবিক বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি করে থাকেন। এই হোটেলের ১৬, ১৭ ও ২৮ নম্বর এই তিনটি ঘর নাকি ভয়ংকর। দিনে বোঝা না গেলেও এমন সুন্দর ঘর তিনটির প্রকৃতি পুরোপুরি বদলে যায় রাত হলে।

বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা শুরু হলে হোটেল মালিক খবর দেন একটি গবেষণাসংস্থাকে। প্যারানর্মাল বিষয়ে গবেষণা চালানো সংস্থাটিও এই হোটেলটিকে ভৌতিক বলে উল্লেখ করে। আর একটি তথ্য হল, এখানে এখনও পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি ভৌতিক ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছে।

রবিন হুডের সমাধি, পশ্চিম ইয়র্কশায়ার

ওয়েস্ট মিডল্যাণ্ডসের শার্লির কাছেই রয়েছে রবিন হুডের কবর ও কবরস্থান। এই কবরস্থানটির সূচনা হয় ১৯১৭ সালে এবং এই কবরস্থানটি রয়েছে ৪৫ একর জায়গাজুড়ে প্রাচীন বনভূমির মধ্যেই। তবে রবিন হুডের প্রকৃত কবরটি রয়েছে পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের কিরকলিস পার্ক এস্টেটে। বলা হয়ে থাকে, খ্রিস্টান নারীমঠে রবিন হুডকে খুন করা হয়।

রবিন হুডের খুনি ছিল রেড রজার। এই রেড রজারের আত্মাকে অনেকেই এখানে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন। ব্যাপারটা রহস্যজনক মনে হওয়ায় অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানের ফলাফল জানা যায়নি তবে এই জায়গায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

উডচেস্টার ম্যানসন, গ্লস্টারশায়ার

ভয়ংকর বাড়ি বললেও কম বলা হবে এই উডচেস্টার ম্যানসনকে। বাড়িটি গ্লস্টারশায়ারে অবস্থিত। সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয়টি হল, এই অট্টালিকার নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছে আজও। দু-শো বছর আগে শেষ বার এই বাড়িটির নির্মাণকাজ হয়েছিল। কিন্তু শেষ হয়নি সে-বারেও।

উডচেস্টারের অট্টালিকা গথিক স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী তৈরি হয়। তবে এই রীতিতে অট্টালিকার নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়নি। বাইরে থেকে এই অট্টালিকার ভিতরের অবস্থা, বিভিন্ন ঘর, সমস্ত প্লাস্টার এবং পুরো মেঝে দেখা যায় না।

হয়তো সেই কারণে উডচেস্টার ম্যানসনকেও অনেকে ভৌতিক অট্টালিকা বলে অভিহিত করে থাকেন। বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত রয়েছে। তার একটি হল, যিনি বা যাঁরাই এই বাড়িটির নির্মাণ সমাপ্ত করার উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেন, তিনি বা তাঁরা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই মারা যান। আর সব মৃত্যুই ঘটে অস্বাভাবিকভাবে।

এইসব ঘটনা ক্রমাগত ঘটে যেতে থাকলে এই বাড়িটি সম্পর্কে আগ্রহ হারান ক্রেতারা। তাই বাড়িটির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেননি আর কেউই। এই বাড়িটির পরিবেশ ও প্রকৃতি রাতের দিকে গম্ভীর হয়ে যায় বলে অনেকে দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, গভীর রাতে এই বাড়িতে নাকি অদ্ভুত নাক ডাকার শব্দ পাওয়া যায়।

অস্বাভাবিক বিভিন্ন ঘটনা নাকি এই পুরোনো অট্টালিকায় ঘটতে দেখেছেন অনেকে। এক প্রেত অশ্বারোহী, এখানকার খ্রিস্টানদের নিজস্ব প্রার্থনাগৃহে একজন দীর্ঘ মানুষ, আর এই অট্টালিকার ভূগর্ভে এক প্রেতকে নাকি প্রায় রাতেই দেখা যায়। এখানে আসা অনেক পর্যটকই নাকি এই প্রেতদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন। অনেককে নাকি ফেলেও দিয়েছে এই রহস্যময় প্রেতরা।

সবচাইতে চমকপ্রদ হল এক মহিলা পর্যটকের বক্তব্য। তিনি নাকি রাতে বাথরুমে গিয়ে ভাসমান কাটা মাথা দেখেছেন! গভীর রাতে এই অট্টালিকায় একটি বাচ্চা মেয়েকেও খেলা করতে দেখেছেন অনেকে।

তবে মেয়েটি সাধারণ মেয়ের মতো নয়। মেয়েটি মুহূর্তে অদৃশ্যও হয়ে যায়। এ ছাড়া রাতের শেষ প্রহরে এক মহিলা প্রেতাত্মাকেও অট্টালিকার সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে উঠতে দেখা যায়।

আবার অনেকসময় এমন শব্দ পাওয়া যায়, মনে হবে এই বাড়িতে বুঝি নির্মাণকাজ চলছে। মনে করা হয়, যাঁরা বাড়িটি নির্মাণ করতে গিয়ে অস্বাভাবিকভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের অতৃপ্ত আত্মাই রাতে ওইরকম শব্দ করে থাকে। এ ছাড়া অনেকে বলেছেন, তাঁরা নাকি রাতে এই বাড়িতে রোমান সেনাদের দেখেছেন।

বিষয়টি এখনকার সময়ে অস্বাভাবিক মনে হলেও যখন রোমান সেনাদের দেখা যাওয়ার কথা প্রকাশ্যে আসে, তখন ব্রিটিশ সমাজে বেশ শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। জানা গিয়েছিল আরও অনেক মানুষের কথা, যাঁরা ওই বাড়িতে রোমান সেনাদের দৌড়োদৌড়ি করতে দেখেছেন বলে জানিয়েছিলেন।

আরও একটি অদ্ভুত কথা শোনা গিয়েছিল ওই বাড়ি সম্পর্কে। ওই বাড়িতে নাকি সুন্দরী কিছু যুবতীকে রাতে দেখা যায়। তারা কারা, জানা যায়নি। অন্ধকারে তারা ঘুরে বেড়ায়, আবার অন্ধকারেই মিলিয়ে যায়।

কুইনস হেড হোটেল, লিয়েস্টাশায়ার

কুইনস হেড হোটেলটি তিন-তলার একটি সরাইখানা। এটি তৈরি হয় সতেরো-শো সাল নাগাদ। ইংল্যাণ্ডের লিয়েস্টাশায়ারে অবস্থিত এই কুইনস হেড হোটেল। এই হোটেলে বহু কর্মী কাজ করেন। তাঁদের কাছ থেকেই এই হোটেলের প্যারানর্মাল শক্তি সম্পর্কে জানা যায়।

কর্মীদের কথায়, রাতে হোটেল সাধারণত ফাঁকা থাকে। তাঁরা যখন নাইট ডিউটিতে হোটেলের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন কখনো কখনো অনুভব করেন তাঁরা ছাড়াও অন্য কেউ যেন সেই হোটেলে রয়েছে। আবার কখনো তাঁরা দেখেন, যেন কোনো ঝাপসা বা অস্পষ্ট ছায়া সেখানে চলাফেরা করে।

তাঁদের কাছ থেকেই জানা গিয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য। রাতে তাঁরা কালো কোট-প্যান্টপরা একটি কালো মানুষকে নাকি প্রায়ই দেখেন। সেই মানুষটি নাকি নিজের মতো করে হোটেল ও হোটেল চত্বরে ঘুরে বেড়ান। প্রথম প্রথম হোটেলের কর্মীরা ভয় পেয়ে বিষয়টি নিয়ে কতৃপক্ষের কাছে অনেক অভিযোগ করেছেন।

তবে পরে দেখা গেছে সেই মানুষটি কাউকে বিরক্ত করেন না। তাই তিনি যাতে বিরক্ত না-হন, কর্মীরাও সেই চেষ্টা করেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%