উপমন্যু রায়
‘জাহাজগুলি সমুদ্রে ভাসছিল। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ভেসে যাচ্ছিল সেগুলি। একটা নয়, দুটো নয়, একসঙ্গে বারোটি জাহাজ!’
এমন সব জাহাজ নিয়েও রহস্যজনক ঘটনা কম ঘটেনি পৃথিবীতে। বহু ক্ষেত্রেই সেই সব রহস্যের আবরণ সরানো যায়নি আজও। সেই সব রহস্যের সৌজন্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক জাহাজকেই ভূতুড়ে বলেও উল্লেখ করেছেন অনেক নাবিক।
সেই জাহাজগুলিতে এমন সব ভৌতিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে এবং এখনও যায়, যা শুনলে এখনও বহু মানুষের শিড়দাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়।
জাহাজের নাম ‘ইয়াং টিজার’
বড়ো রহস্যময় জাহাজ এই ‘ইয়াং টিজার’। জাহাজটি ছিল আমেরিকার এবং সেই সময়ের তুলনায় অসম্ভব দ্রুতগতিসম্পন্ন। যেসব জাহাজে ব্রিটেনে পণ্য রফতানি করা হত, সেই জাহাজগুলির ওপর নজরদারি চালানোর জন্য ১৮১৩ সালে নিযুক্ত করা হয় এই ইয়াং টিজার স্কুনারটিকে।
বলা বাহুল্য, জাহাজটি সেই কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালনও করছিল। কিন্তু ওই বছরেরই ২৭ জুন জাহাজটির গোয়েন্দাগিরি ধরা পড়ে যায়। তার পরই দু-টি সশস্ত্র ও শক্তিশালী জাহাজ তাড়া করে ইয়াং টিজার জাহাজটিকে। তখন ইয়াং টিজারে যাত্রী ছিল ত্রিশ জন।
ত্রিশ জন যাত্রীকে নিয়ে ইয়াং টিজার জাহাজটি বেপরোয়া গতিতে পালাতে থাকে। শোনা যায় এভাবে পালাতে গিয়ে নোভা স্কোটিয়ার মেরিন বে-তে ইয়াং টিজার ডুবে যায়। তবে একথা অনেকে বিশ্বাস করেন না। তাঁরা বলেন, ইয়াং টিজার স্কুনারটির ক্রু-মেটরাই নাকি সেই দু-টি শক্তিশালী জাহাজের কাছ থেকে রক্ষা পেতে তাঁদের প্রিয় জাহাজটিকে মেরিন বে-তে ডুবিয়ে দেন।
তারপরই ঘটে সেই অস্বাভাবিক ঘটনা। ঠিক এক বছর পর, অর্থাৎ ১৮১৪ সালের ২৭ জুন নোভা স্কোটিয়ার মেরিন বে-তে দেখা যায় ইয়াং টিজার জাহাজটিকে। শোনা যায়, যেসব জাহাজ ওই সমুদ্রপথ দিয়ে গিয়েছে, সেই সব জাহাজের অধিকাংশ নাবিকই নাকি দূর থেকে ইয়াং টিজার জাহাজটিকে দেখেছেন। এই ঘটনা দারুণ বিস্মিত করেছিল সেই সব জাহাজের নাবিকদের। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? এর উত্তর তাঁদের কারও কাছেই ছিল না।
তাই তাঁরা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না-করে ইয়াং টিজার স্কুনারের কাছে রওনা দেন। কারণ, ঠিক এক বছর আগে এই ইয়াং টিজার ত্রিশ যাত্রী সমেত সমুদ্রে ডুবে যায়। তাহলে জাহাজটি ফের সমুদ্রে ভেসে উঠল কীভাবে? তাও আবার এক বছর পর! দূর থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, সেটি উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সমুদ্রপথে চলছে না, যেন নির্দিষ্ট গতিপথেই চলেছে।
কিন্তু, যাঁরা ইয়াং টিজার জাহাজটিকে তখন দেখেছিলেন, তাঁদের কাছে চমকের আরও বাকি ছিল। তাঁরা যখন নিজেদের জাহাজ নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছোলেন, দেখলেন ইয়াং টিজার হঠাৎই যেন সেখানে ভ্যানিশ হয়ে গেল।
শুধু ১৮১৪ সালেই নয়, পর পর দু-বছর ইয়াং টিজার জাহাজটিকে বহু নাবিক দেখেছেন ঠিক একই জায়গায়, যে জায়গায় ওই জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁদের সকলের চোখের সামনেই ইয়াং টিজার স্কুনারটি নাকি তার ধ্বংসস্থলের কাছেই আগুনের কুন্ডলির ভিতরে ঢুকে যেত।
আরও একটি ঘটনা ঘটে এখানে। ইয়াং টিজার স্কুনারটি সমুদ্রে যে জায়গায় ডুবে গিয়েছিল, সেই জায়গাটিতে একটি রহস্যময় কুয়াশা নাকি দেখা যায়। সেই কুয়াশা দেখেছেন বহু নাবিকই। ইয়াং টিজার জাহাজটির কথা মনে রেখে ওই কুয়াশারও নতুন নাম দেওয়া হয় ‘টিজার লাইট’।
যাঁরা বিভিন্ন দেশের নৌ-বিভাগে যুক্ত রয়েছেন, তাঁদের কাছে এই ইয়াং টিজার জাহাজটি একটি ভূতুড়ে স্কুনার ছাড়া আর কিছু নয়।
‘এলিজা বেটেল’ জাহাজের কথা
এলিজা বেটেল জাহাজটিকে প্রমোদ তরণি বলা যায়। আমেরিকার ইন্ডিয়ানার মেয়র ও অভিজাত মানুষ এই জাহাজটিতে করে বিলাসভ্রমণে গিয়েছিলেন। ১৮৫২ সালে জাহাজটি তৈরি হয়।
জাহাজটি বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ছ-বছরই সেটি পরিসেবা দিয়েছিল। ১৮৫৮ সালে ঘটে সেই বিপর্যয়। অন্য বছরগুলির মতো সে-বারও এক-শো যাত্রী নিয়ে জাহাজটি প্রমোদভ্রমণে বেরিয়েছিল। কিন্তু মাঝসমুদ্রেই জাহাজটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।
অনেক যাত্রীই প্রাণ বঁাচানোর জন্য সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এভাবে চুয়াত্তর জন যাত্রী বেঁচেও যান। কিন্তু হতভাগ্য ছাব্বিশ জন যাত্রী মারা যান। এলিজা বেটেল জাহাজটিও সমুদ্রের ৮০০ ফুট নীচে ডুবে যায়। একটি বিলাসবহুল আমেরিকান জাহাজের এমন অসহায়ভাবে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় তখন অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন।
এরপরই জাহাজটি নিয়ে সমুদ্রপথে নানা ঘটনা ঘটতে শুরু করে। পূর্ণিমার রাতে নাকি এলিজা বেটেল জাহাজটিকে দেখা যায়। সমুদ্রপথে যাতায়াত করতে থাকা বিভিন্ন জাহাজের ক্যাপ্টেন-সহ নাবিকদের কাছে পাওয়া যেতে থাকে সেই সব ঘটনার বিবরণ। সেই সব বিবরণ শুনে জাহাজটিকে ‘ভূতুড়ে’ বলে অনেক নাবিকই উল্লেখ করেন।
তাঁরা বলেছেন, পূর্ণিমার রাতে জাহাজটি যখন সমুদ্রের নীচ থেকে উপরে উঠে আসে, তখন জাহাজটি সম্পূর্ণ জ্বলন্ত অবস্থায় থাকে। এখানেই শেষ নয়। নাবিকদের যাঁরা জাহাজটিকে দেখেছেন, তাঁদের অনেকেই বলেছেন, জ্বলন্ত জাহাজের ভিতর থেকে ভেসে আসে গানের সুর।
অনুমান করা হয়, জাহাজটিতে যখন আগুন লাগে, সম্ভবত তখন সেখানে পার্টি চলছিল। হয়তো সেইসময় সেখানে বসেছিল খাওয়া-দাওয়া এবং নাচ-গানের আসর। তাই এখনও যখন জ্বলন্ত জাহাজটিকে সমুদ্রে ভেসে উঠতে দেখা যায়, তখন সেখান থেকে গানের সুর ভেসে আসে।
ভূতুড়ে জাহাজ ‘ওরাং মেডান’
এটি একটি পণ্যবাহী জাহাজ। জাহাজটি ছিল নেদারল্যাণ্ডসের। জাহাজটি করে সেদেশের পণ্য যেত বিভিন্ন দেশে। এই জাহাজটিই আচমকা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল সমুদ্রে। তখন জাহাজটিতে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন এবং নাবিক, স্ক্রু-সহ কিছু যাত্রী ছিলেন।
জাহাজটিকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে নেদারল্যাণ্ডসের উদ্ধারকারী জাহাজকে সাহায্য করতে আমেরিকাও জাহাজ পাঠায়। উদ্ধারকারীদের সঙ্গে ছিলেন তদন্তকারীরাও। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ১৯৪৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার কাছাকাছি জায়গায় এই ‘ওরাং মেডান’ জাহাজটিকে খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে সেই জাহাজে গিয়ে রীতিমতো অবাক হয়ে যান উদ্ধারকারীরা। জাহাজটিকে দেখে মনে হয়, কিছুক্ষণ আগেই যেন সমুদ্রে ভেসেছে সেটি। জাহাজের ভিতরে কোনো জিনিসপত্রই এলোমেলো হয়ে নেই। পরিপাটি করে সব কিছু সাজানো-গোছানো ছিল এই জাহাজে। সেই অবস্থায় সমুদ্রে ভাসছিল পণ্যবাহী ওরাং মেডান!
এমনকী সেই জাহাজে ছিল মানুষও। তাদের দেখে উদ্ধারকারীরা চমকে ওঠেন। জাহাজের ভেতরে নির্দিষ্ট জায়গাতেই যাত্রীরা স্থির হয়ে বসেছিলেন। খুবই স্বাভাবিক লাগছিল তাদের। আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হবে, সকলেই যেন ঠিকঠাক রয়েছে। কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে যান তদন্তকারীরা। তাদের শরীরে প্রাণ ছিল না।
জাহাজের সেই মানুষগুলি সকলেই ছিল মৃত। দূর থেকে দেখে বোঝা না-গেলেও কাছে গিয়ে তাঁদের ওই অবস্থায় বসে থাকার ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায়। উদ্ধারকারীরা মৃতদেহগুলি ভালো করে পরীক্ষা করেন। দেহের কোথাও তাদের কোনো ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তাহলে প্রশ্ন হল, তারা মারা গেলেন কীভাবে?
এবার তদন্তকারীদের চোখে পড়ল অন্য জিনিস। তাঁরা দেখলেন, মৃত যাত্রীদের মুখে ভয়ংকর ভয়ের চিহ্ন ফুটে রয়েছে। তদন্তকারীদের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি যাত্রীরা সকলে ভয় পেয়ে মারা গিয়েছে? কিন্তু কীসের এত ভয় তারা পেয়েছিল? তবে মৃতদের দেখে তার কোনো জবাব তদন্তকারীরা পেলেন না। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে সংশয় থেকেই গেল।
উদ্ধারের পর জাহাজটিকে নিয়ে আসা হয় উপকূলে। পরীক্ষা করে জাহাজটিতে দু-টি বার্তা পাওয়া যায়। সেই দু-টি বার্তার একটিতে লেখা ছিল, ‘নাবিক-সহ সমস্ত শীর্ষকর্তা চার্টরুম ও ব্রিজে পড়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে, তারা সকলেই মৃত।’ আর, দ্বিতীয় বার্তাটিতে লেখা ছিল, ‘আমি মারা যাচ্ছি।’
মনে করা হয়ে থাকে, যাত্রী-সহ জাহাজের সকলেই মৃত্যুর আগে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। তবে প্রথম বার্তা অনুযায়ী, নাবিক-সহ সমস্ত শীর্ষকর্তা চার্টরুম ও ব্রিজে পড়েছিল কেন? কী হয়েছিল তখন? বার্তা প্রেরক পরিষ্কার লিখেছেন, মনে হচ্ছে তারা সকলেই মৃত। তাহলে যারা তখনও বেঁচেছিল, তারা সকলেই সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল! যদি তা-ই হয়, চার্টরুম ও ব্রিজে তখন কী হয়েছিল?
কিন্তু এরপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। বার্তা প্রেরক ও তার সঙ্গীরা সবাই যদি স্বাভাবিক অবস্থায় থেকে থাকে, তাহলে তারাই কি ওই সাধারণভাবে যারা বসেছিল, তারা? তাহলে মৃত্যুর মুহূর্তে তাদের মুখে অমন ভয়ের ছায়া ফুটে উঠেছিল কেন?
এর অর্থ, তারা এমন কোনো দৃশ্য চোখের সামনে দেখেছিল, যা দেখে তারা মারাত্মক ভয় পেয়ে যায়। আর সেই মানসিক চাপ সহ্য করতে না-পেরেই তাদের মৃত্যু হয়!
অর্থাৎ ভয়াবহ কোনো দৃশ্য দেখেই জাহাজের যাত্রীরা প্রাণ হারায়। এ ছাড়া আরও একটি কাহিনিও শোনা যায়। বলা হয়, জাহাজটি করে সালফিউরিক অ্যাসিড নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তারপর হঠাৎই প্রথমে সাধারণ পাত্রে, পরে জাহাজটির কোনো ফুটো দিয়ে পুরো সালফিউরিক অ্যাসিড বেরিয়ে আসে। আর তাতেই জাহাজের সব নাবিক পুড়ে মারা যায়।
কিন্তু এমন বক্তব্যে সকলের সমর্থন মেলেনি। কারণ, তা হলে যাত্রীদের শরীরে অ্যাসিডে পোড়ার দাগ থাকত। তা তো ছিল না! যা-ই হোক, নেদারল্যাণ্ডসের ওই জাহাজটি উদ্ধারের পর তাতে নাকি অস্বাভাবিক কিছু ব্যাপার দেখা গিয়েছে। যেমন রাতের দিকে ওই জাহাজের মধ্যে নাকি একটা ব্যস্ততা লক্ষ করা যায়।
কিন্তু কাদের ব্যস্ততা তা বোঝা যায় না বা দেখা যায় না। অনেকে মনে করেন, ওই জাহাজের মৃত নাবিকদের আত্মাই নাকি রাতের দিকে ব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় জাহাজে। তখন অনেকেই এই ওরাং মেডান জাহাজটিকে ভূতুড়ে বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ভৌতিক ‘অক্টাভিয়াস’
অক্টাভিয়াস জাহাজটিও একটি রহস্যজনক জাহাজ। আঠারো শতকের ভূতুড়ে জাহাজ বলে এই অক্টাভিয়াসকে উল্লেখ করে থাকেন অনেকেই। গ্রিনল্যাণ্ডের পশ্চিম উপকূলের কাছে হেরাল্ড নামে এক তিমি শিকারি ১৭৭৫ সালের ১১ অক্টোবর এই জাহাজটিকে খুঁজে পান।
তারপর তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা পুরো জাহাজটি ঘুরে দেখেন। তাঁরা দেখেন, ডেকের নীচে পড়ে রয়েছে আঠাশ জনের ক্রু-সদস্য। তারা প্রত্যেকেই মৃত, নিথর এবং বরফে ঢাকা। দেখে মনে হবে যেন তাদের দেহগুলি সেখানে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
তারপর তাঁরা জাহাজের ক্যাপ্টেনকে দেখতে পান কেবিনে। তিনি সেখানে একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একজন মহিলা ও এক শিশু। তাঁদের শরীর ছিল কম্বলে ঢাকা। সম্ভবত ঠাণ্ডার কারণেই ওই মহিলা নিজের ও তাঁর সন্তানের শরীরে কম্বল চাপা দিয়ে ঘুমে অচেতন ছিলেন।
মনে করা হয়, ওই মহিলা ও শিশুটি ক্যাপ্টেনের স্ত্রী ও পুত্র। তাঁরা ছাড়া সেখানে ছিলেন একজন নাবিকও। তাঁর সঙ্গে ছিল একটি শুকনো খড়কুটো রাখার বাক্স। আর ক্যাপ্টেন কেবিনে বসে ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি কলম। তাঁর সামনে খোলা ছিল একটি লগবুক। তিনি হয়তো কিছু লিখছিলেন।
লগবুকটির ওপর বরফ জমে গিয়েছিল। তার বঁাধনও আলগা হয়ে গিয়েছিল। সমস্ত পাতাও ছিল না। কেবল প্রথম ও শেষ কয়েকটি পাতাই তাতে ছিল। কিন্তু মাঝের পাতাগুলি উধাও।
দীর্ঘদিন কেবিনে পড়ে থাকার জন্যই এমন হয়েছিল কি না তা নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। কারণ অনেকেরই মত হল, পাতা যদি নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সমস্ত পাতাই কম-বেশি নষ্ট হতে পারে। মাঝখান থেকে পাতা উধাও হয়ে যেতে পারে না।
এই লগবুকটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটিতে শেষ লেখার তারিখ হিসেবে উল্লেখ ছিল ১১ নভেম্বর ১৭৬২। তার মানে, জাহাজটি যখন পাওয়া যায়, ঠিক তার তেরো বছর আগে জাহাজটি উত্তর মেরুর কাছাকাছি সমুদ্রে হারিয়ে যায়। কিন্তু জাহাজে যাঁদের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে, তারা সবাই স্বাভাবিক ছিল। কেউ ঘুমোচ্ছিল, তো কেউ বসে ছিল। তা হলে প্রশ্ন হল, তখন কী এমন হয়েছিল যে, জাহাজের সকলে এভাবে প্রাণ হারান।
লগবুকটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অক্টাভিয়াস জাহাজটি ইংল্যাণ্ড ছেড়েছিল ১৭৬১ সালে। তার পর এক বছর ভালোভাবেই সমুদ্রযাত্রা করেছিল জাহাজটি। ১৭৬২ সালের ১১ নভেম্বর সব এলোমেলো হয়ে যায়।
কিন্তু জাহাজে পাওয়া দেহগুলি দেখে বিস্ময় তৈরি হয় এই কারণে, দেহগুলিতে কোনো আঘাত বা ক্ষত ছিল না। ছিল না কোনো যন্ত্রণা পাওয়া বা ভীত হওয়ার চিহ্ন। তাহলে কী হয়েছিল ওই দিন? কেন কেউ কিছু বুঝতে পারলেন না? অথচ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন!
আর এখানেই রয়েছে যাবতীয় রহস্য। এই জাহাজটিকেও ভৌতিক জাহাজ বলে উল্লেখ করা হয়।
‘জেব্রিনা’ জাহাজের কথা
পৃথিবীর রহস্যজনক জাহাজের তালিকায় রয়েছে জেব্রিনা জাহাজের নামও। জাহাজটি তৈরি হয়েছিল ১৮৭৩ সালে হুইটস্ট্যাবলে। এই হুইটস্ট্যাবল হল দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যাণ্ডের কেন্টের উত্তর উপকূলের একটি বন্দর। জাহাজটির ওজন ছিল ১৮৯ টন।
জাহাজটি ১৯১৭ সালের অক্টোবরে ইংল্যাণ্ডের ফলমাউথ থেকে রওনা হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার উদ্দেশ্যে। লক্ষ্য ছিল রিভারপ্লেটে বাণিজ্য করা। জাহাজটির ক্যাপ্টেন ছিলেন মার্টিন। এ ছাড়া আরও চার জন নাবিক ও ক্রু সদস্য জাহাজে ছিলেন।
প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের সেন্ট ব্রিউকে জাহাজটি সোয়ানসি কয়লা নিয়ে যায়। কিন্তু জাহাজটি গন্তব্যে পৌঁছোতে পারেনি। মাত্র দু-দিন পরেই ফ্রান্সের চেরবুর্গের দক্ষিণে রীতিমতো অদ্ভুতভাবে জাহাজটিকে পাওয়া যায়। কিন্তু রহস্যজনক বিষয় হল, তখন জাহাজে জনপ্রাণীর চিহ্ন ছিল না।
অথচ জাহাজের কোনো অংশের কোনো ক্ষতি হয়নি। হয়নি কোনো জিনিসপত্র ভাঙচুরও। জলদস্যুদেরও আক্রমণ হয়নি, হলে জাহাজে তার প্রমাণ পাওয়া যেত। তাহলে এতগুলি মানুষ কোথায় হারিয়ে গেলেন?
সেই সময় প্রথমে অনুমান করা হয়েছিল, জাহাজটি নাকি জার্মান ইউ বোটের বন্দুকযুদ্ধের মুখে পড়ে ডুবে যাচ্ছিল। মনে করা হয়, তখন জার্মান ইউ বোটই ক্রু সদস্যদের ধরে নিয়ে যায়। আবার অনেকে বলেন, জেব্রিনার একটি বন্ধুজাহাজ সেখানে হাজির হয়েছিল। তারাই জেব্রিনা ডুবে যাওয়ার আগে জাহাজের সমস্ত সদস্যকে নিয়ে চলে যায়।
কিন্তু কথা হল জেব্রিনা যেমন ডুবে যায়নি, পরবর্তীকালে জাহাজের সদস্যদের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে বলেও জানা যায়নি। আবার, জেব্রিনায় গুলিগোলার আঘাত-চিহ্ন দেখা যায়নি। তাই এই মতগুলি সর্বজনগ্রাহ্য নয়। যা-ই হোক, শেষপর্যন্ত জেব্রিনা জাহাজটির ঠাঁই হয় পোর্টসমাউথের ভেল্ডার ক্রিকে। ভেল্ডার ক্রিক হল ল্যাংস্টোন হারবারের একটি খাঁড়ি।
পরে এই জেব্রিনা জাহাজ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বই প্রকাশও হয়েছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে কোনো লেখকই কিছু বলতে পারেননি। যদিও প্রত্যেক লেখকই নিজেদের যুক্তিকে সঠিক বলে দাবি করেছেন।
তাই প্রকৃত সত্য কী, তা কোনো দিনই জানা যায়নি। হয়তো যাবেও না। তবে পৃথিবীর রহস্যময় জাহাজগুলির মধ্যে জেব্রিনাও তেমনই একটি জাহাজ হিসেবে থেকে গিয়েছে।
ভূতুড়ে ‘রৌজ সিমনস’ জাহাজের কাহিনি
১৯১২ সালের কথা। রৌজ সিমনস একটি কার্গো জাহাজের নাম। জাহাজটি ক্রিসমাস ট্রি বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মিশিগান হ্রদে জাহাজটি ভয়ংকর ঝড়ের মুখে পড়ে। সেই ঝড়ের দাপট সামলাতে পারেনি রৌজ সিমনস নামের জাহাজটি। রীতিমতো অসহায়ভাবেই জাহাজটি মিশিগান হ্রদে ডুবে যায়।
জাহাজটি যাচ্ছিল শিকাগোয়। তাতে বড়োদিনের জন্য প্রচুর ক্রিসমাস ট্রি ছিল। পরে যখন উইসকনসিনের দু-টি নদীর মাঝে জাহাজটি উদ্ধার হয়, তখন সেটিতে কোনো যাত্রীই জীবিত ছিলেন না। উদ্ধারের পর জাহাজটিকে আর ব্যবহার করা হয়নি। তাই জাহাজটি পরিত্যক্ত হয়।
জাহাজটি যখন ডুবে যায়, তখন মৃত্যুর আগে এক নাবিক একটি বার্তা লিখে যান। সেই বার্তাটি একটি বোতলে ঢুকিয়ে জলে ভাসিয়ে দেন তিনি। পরে পাওয়া যায় বোতলটি। তারমধ্যে বার্তা থেকে জানা যায় জাহাজটির দুরবস্থার কথা।
তারপরই এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যেতে থাকে। যে জায়গায় জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল, ঠিক সেই জায়গায় নাকি রৌজ সিমনস জাহাজটি ভেসে ওঠে। শুধু তাই নয়, সেই জাহাজে জ্বলে উঠত অসংখ্য ক্রিসমাস ট্রি। তখন থেকেই জাহাজটিকে ভূতুড়ে জাহাজ বলে সকলে উল্লেখ করতে থাকেন।
জাহাজটি যে পথ দিয়ে গিয়েছিল, বোতলে থাকা বার্তা থেকে সেকথাও জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় পরিত্যক্ত জাহাজটি রেখে দেওয়া হয়। সেই পথ এবং জায়গাটি এখন পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছে। সারা পৃথিবী থেকে অনেকেই সেখানে যান। রৌজ সিমনস কী ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল, তা অনুভব করার চেষ্টা করেন।
জাহাজটিকে অনেকে ‘ক্রিসমাস ট্রি জাহাজ’ বলেও উল্লেখ করে থাকেন। ওই হ্রদ দিয়ে আরও অনেক জাহাজ ক্রিসমাস ট্রি নিয়ে যেত। সেই জাহাজগুলির মধ্যে এই রৌজ সিমনস ছিল একটি। ক্রিসমাস ট্রি বা গাছ নিয়ে যাওয়া ছিল একটি ব্যাবসা। পরে অবশ্য জাহাজে করে গাছ নিয়ে যাওয়ার শিল্পের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ খারাপ হতে থাকে। বরং পরবর্তী সময়ে রেলপথ, হাইওয়ে এবং গাছ-খামারগুলি ব্যবসায়িকভাবে অনেক বেশি লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়।
সব কিছু বিবেচনা করে ১৯২০ সালে জাহাজে করে গাছ নিয়ে যাওয়ার বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে রৌজ সিমনসের ভৌতিক কাহিনি আজও ফুরিয়ে যায়নি। মিশিগান হ্রদের সেই জায়গা সম্পর্কে পর্যটকদের আকর্ষণে সেই প্রমাণ পাওয়া যায়।
রহস্য-জাহাজের নাম ‘এম ভি তাই চিং ২১’
সত্যিই রহস্যজনক জাহাজ এম ভি তাই চিং ২১। জাহাজটি তাইওয়ানের। এটি ছিল মাছ ধরার জাহাজ। তাইওয়ানিজ জাহাজটির ওজন ছিল ৫০ টন।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। সেটা ২০০৮ সাল। ওই বছরেরই ৯ নভেম্বর কিরিবাতির কাছে জাহাজটিকে পুরো খালি অবস্থায় পাওয়া যায়। জাহাজটিতে আগুন লাগার চিহ্ন ছিল। এর অর্থ, জাহাজটিতে কোনো কারণে আগুন লেগে গিয়েছিল।
এর আগেও কয়েক বার জাহাজটিতে আগুন লেগেছিল বলে শোনা যায়। জাহাজটিকে যখন পাওয়া যায়, তখন সেটিতে যেমন কোনো মানুষ ছিল না, তেমনই ছিল না জাহাজে থাকা কোনো লাইফবোট বা লাইফ জ্যাকেটও।
জাহাজটি রওনা হয়েছিল অক্টোবরে। তখন এম ভি তাই চিং ২১ জাহাজটিতে ছিলেন তাইওয়ানিজ ক্যাপ্টেন, যাঁর নাম ইয়ান জিন-গ্যাং। আর ছিলেন আঠাশ জন ক্রু সদস্য, যাঁদের মধ্যে চীনা ছিলেন আঠারো জন, ইন্দোনেশীয় ছয় জন এবং ফিলিপিন্সের চার জন।
কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার হল, জাহাজটিতে আগুন লাগার পর কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি। সাধারণত জাহাজে কোনো বিপদ-আপদ ঘটলে, সেই জাহাজ থেকে নিকটবর্তী তীরে বার্তা পাঠানোই সমুদ্রযাত্রার নিয়ম। এক্ষেত্রে তেমন কেন হয়নি, তা আজও রহস্য হয়েই থেকে গিয়েছে।
জাহাজ থেকে শেষ রেডিয়ো বার্তা পাঠানো হয় ২৮ অক্টোবর। তারপর আর কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি। তবে জাহাজটি থেকে লাইফবোট ও লাইফ জ্যাকেটগুলি খোয়া যাওয়ায় অনেকের অনুমান, জাহাজে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সকলে প্রাণে বঁাচতে ওগুলো নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
প্রশ্ন হল, জাহাজের যাত্রীরা যদি পালিয়েই গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের তো পাওয়া যেত। কিন্তু তাঁদের কোথাও পাওয়া যায়নি। এখন সময় অনেক এগিয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। অনুসন্ধানের কাজও অনেক আধুনিক হয়েছে। যাত্রী-খোঁজে সেই আধুনিকতার ব্যবহারও দেখা গিয়েছে।
মার্কিন এয়ারফোর্স সি-১৩০ হারকিউলিস এবং নিউজিল্যাণ্ড এয়ারফোর্স পি-৩ ওরিয়ন যৌথভাবে উত্তর ফিজি থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের একুশ হাজার বর্গমাইল জায়গা জুড়ে জাহাজটির যাত্রীদের খোঁজে তল্লাশি চালায়। কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার হল, কোথাও তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি!
‘এমভি জয়িতা’ও একটি রহস্য-জাহাজ
এমভি জয়িতা ছিল একটি মোটরচালিত বিলাসবহুল জাহাজ। এই জাহাজটিও নাবিকদের কাছে ভৌতিক জাহাজ হিসেবে পরিচিত।
১৯৩১ সালে জাহাজটি তৈরি হয়েছিল আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে। নির্মাণের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট আধুনিক ছিল এই এমভি জয়িতা। তার নকশা এমন ছিল যে, কেউ ষড়যন্ত্র করে ডোবাতে চাইলেও সেই জাহাজটিকে কেউ ডোবাতে পারবে না। রোনাল্ড ওয়েস্ট নামে সিনেমার এক পরিচালকের নির্দেশে জাহাজটি তৈরি হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই জাহাজটিকে আমেরিকা কাজে লাগিয়েছিল। সেই এমভি জয়িতা ১৯৫৫ সালে পঁচিশ জন যাত্রী ও ক্রু-সদস্য নিয়ে টোকিলাও দ্বীপের দিকে রওনা হয়। তারপর মাত্র দু-দিন জাহাজটি জলে ভেসেছিল। কিন্তু দু-দিন পর থেকে জাহাজটির আর খবর পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে নিখোঁজ হয়ে যায় জাহাজটি।
স্বভাবতই জাহাজটির খোঁজে তল্লাশি শুরু করে আমেরিকা। তবে, ঠিক পাঁচ সপ্তাহ পর জাহাজটিকে ফের ভাসতে দেখা যায় দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে। দেখামাত্রই জাহাজটিকে উদ্ধার করে তারা। জাহাজটি সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল।
তবে পাঁচ দিন ধরে সকলের চোখের আড়ালে পড়ে ছিল এবং আগুন লাগার কারণে কিছুটা বেহাল ছিল সেটি। জাহাজটির সঙ্গে পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি পাইপ এবং একটি রেডিয়ো। যখন রেডিয়োটি কার্যক্ষম ছিল, তখন তার পরিসীমা ছিল মাত্র ৩ মাইল পর্যন্ত। রেডিয়ো পরিসীমা এত কম হওয়ার কারণ রেডিয়োতে ভুল তার লাগানো হয়েছিল। তবে জাহাজটিতে মানুষের চিহ্নমাত্র ছিল না।
জাহাজটিতে অনুসন্ধান চালিয়ে রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যান তদন্তকারীরা। প্রশ্ন ওঠে, জাহাজটি যখন ডুবতে শুরু করে, তখন কেন তাঁরা সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করেননি? তারপর থেকে বিষয়টি নিয়ে প্রচুর চর্চা হয়েছে।
কারও মতে, ক্রু-রা বিদ্রোহ করেছিলেন জাহাজে। সেই বিদ্রোহেই তাঁরা যাত্রীদের খুন করেছিলেন। আবার একদল মানুষ আছেন, যাঁদের বক্তব্য হল, জাহাজের ইঞ্জিনঘরে জল ঢুকে যায়। তা দেখে কেউই আর জাহাজে থাকার ঝুঁকি নিতে পারেননি। তাঁরা সকলেই পালিয়ে গিয়েছিলেন জাহাজ থেকে।
রহস্যময় বোট ‘টি টি জিয়োন’
অদ্ভুত এক জাহাজ টি টি জিয়োন। রহস্যময় জাহাজগুলির কথা বলতে গেলে এই জাহাজটির কথা প্রথম দিকেই উঠে আসবে।
এই জাহাজ সম্পর্কে প্রথমেই বলতে হবে গুমা লিয়ান্দ্রো আগুইয়ারের কথা। তিনি জন্মসূত্রে ব্রাজিলীয়। তবে, তিনি ছিলেন মার্কিন নাগরিক। থাকতেনও আমেরিকায়। তাঁর পরিচয়ও মার্কিন পাওয়ার-ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হিসেবে। তাঁকে মিলিওনিয়ার বিজনেসম্যান বলেও উল্লেখ করা হত। তাঁর সফল কর্মজীবনের পুরোটাই কাটে আমেরিকা ও ইজরায়েলে।
আগুইয়ার গোটা পৃথিবীতে মানবপ্রেমিক বলেও পরিচিতি পেয়েছিলেন। ইহুদিদের দিকে অনেক বিষয়ে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে নেফেশ বি’নেফেশ ও মার্চ অফ দ্য লিভিং।
এখন প্রশ্ন হল, নেফেশ বি’নেফেশ কী? নেফেশ বি’নেফেশ বা জিউস সোলস ইউনাইটেড হল একটি অলাভজনক সংগঠন। আমেরিকা, কানাডা এবং ব্রিটেন থেকে অভিবাসী ইহুদিদের কথা প্রচার করে, তাঁদের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে উৎসাহ দেয় এবং তাঁদের জীবনসংগ্রামকে সহজতর করতে নানাভাবে সাহায্য করে থাকে এই সংগঠন।
এ তো গেল নেফেশ বি’নেফেশের কথা। এখন প্রশ্ন হল, মার্চ অফ দ্য লিভিং ব্যাপারটা কী? আন্তর্জাতিক মার্চ অফ দ্য লিভিং হল একটি বার্ষিক শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচি, যা হলোকাস্টের ইতিহাস এবং প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণার শিকড় পরীক্ষা করে, একইসঙ্গে গোটা পৃথিবী থেকে পোল্যাণ্ড এবং ইজরায়েলের নাগরিকদের স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়ে থাকে।
গুমা লিয়ান্দ্রো আগুইয়ার ২০০৯ সালের জুলাই মাসে বেইতার জেরুজালেম ফুটবল ক্লাবে চার মিলিয়ন মার্কিন ডলার লগ্নি করেছিলেন। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, কাজের ক্ষেত্রে আগুইয়ার যথেষ্ট তৎপর এক শিল্পপতি ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯৭৭ সালের ৩১ মে। কিন্তু ২০১২ সালের ২০ জুন তিনি রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যান। আর তার প্রায় তিন বছর পর ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
২০১২ সালের ২০ জুন রাত ১টা ১৫। যেহেতু রাত ১টা ১৫, তাই অনেকে ভুল করে তারিখটা ১৯ জুন বলে থাকেন। তাঁর নিজের একটি বিলাসবহুল জুপিটার বোট ছিল। বোটটি ছিল ৩১ ফুট লম্বা। সেই বোটে ছিলেন স্বয়ং আগুইয়ার। বসেছিলেন ঠিক মাঝখানে।
ফ্লোরিডা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র সানসেন্টিনেল থেকে জানা যায়, আগুইয়ারের টি টি জিয়োন পূর্ব লাস ওলাস বোউলেভার্ডের ফোর্ট লাউডেরডাল বিচের পূর্বে এসে থামে ঠিক ওই সময়। সেইসময় তাঁর বোটের আলো জ্বলছিল এবং ইঞ্জিনও চালু ছিল।
কিন্তু, তারপর? তারপরই আসল কথা। ওই বোটে কোনো ব্যক্তি ছিল না। না বোটটির মালিক জুপিটার, না অন্য কোনো নৌ-কর্মী বা আগুইয়ারের সহযোগী। অথচ বোটটি দারুণভাবে সুসজ্জিত ছিল। দেখতেও লাগছিল আর-পাঁচটা ছোটো জাহাজের মতোই।
কথা হল, বোটটিকে কয়েক দিন ধরে সমুদ্রে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেকে সন্দেহ করছিলেন, হয়তো বোটটি অতলান্তিকে তলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বোটটির খোঁজ পাওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন সকলে। কিন্তু বোটটির যাত্রীরা সকলে কোথায় গেলেন?
কারও কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। এমনকী তাঁদের কারও নিষ্প্রাণ দেহও খুঁজে পাওয়া গেল না। অথচ বোটটি সম্পূর্ণ সুসজ্জিতই ছিল। যদি কোনো দুর্ঘটনার কবলে পড়ত বোটটি, বা জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হত, তাহলে বোটটি লন্ডভন্ড হয়ে থাকত। তা তো হয়নি!
বরং সাজানো-গোছানো দেখে মনে হচ্ছে, বোটটিতে অনেকেই রয়েছেন। অথচ রহস্যের বিষয় হল, সেখানে কেউই নেই। যেন বোট থেকে তাঁরা সকলে কর্পূরের মতো উবে গিয়েছেন! অদ্ভুত লাগলেও সত্য যে, এত বড়ো একটি বোটে ছিল না কোনো মানুষ বা তার কোনো চিহ্ন পর্যন্ত।
বোটটিতে খুঁজে গোয়েন্দারা উদ্ধার করেন মালিক আগুইয়ারের মানিব্যাগ এবং মোবাইল। ওই দু-টি বস্তুও ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। যেন অতিযত্নে আগুইয়ার সেগুলি রেখে দিয়েছেন।
এই সূত্র ধরে অনেক তদন্ত করেন গোয়েন্দারা। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারলেন না তাঁরা। ফলে জানা গেল না আগুইয়ার ও তাঁর সঙ্গীদের কোনো তথ্য। উপকূল রক্ষী বাহিনীও তাঁদের খোঁজে সমুদ্রে তল্লাশি চালায়। কিন্তু কিছুই পায়নি তারা।
এরপর গোয়েন্দারা আগুইয়ারের বাড়িতে হানা দেন। সেখানে তাঁর ঘড়ি এবং বিয়ের স্মারক কিছুই পাননি তাঁরা। ২০১২ সালের জুলাই এবং ২০১৩ সালের জুন মাসে ফোর্ট লাউডেরডালের পুলিশ বিভাগ জানায়, তদন্ত চলছে। তবে তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবু তদন্ত চলতে থাকবে।
নিখোঁজ হওয়ার দুই বছর সাত মাস পর সরকারিভাবে আগুইয়ারের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাঁর দেহ?
না, পাওয়া যায়নি। তাই টি টি জিয়োন বোটটি রহস্যময়ই থেকে গিয়েছে।
‘বেল আমিকা’ ও বিতর্ক
বেল আমিকাকেও ভৌতিক জাহাজ বলে উল্লেখ করা হয়। পুন্তা ভোল্পের কাছে সার্ডিনিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপের উপকূলে এই ভৌতিক জাহাজটিকে খুঁজে পাওয়া যায় ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট। এই জাহাজটিও ভয়ংকর রহস্যময় হিসেবে অসংখ্য মানুষের কাছে পরিচিত।
ইটালীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী যখন এই জাহাজটিকে খুঁজে পায় তখন তাতে কোনো মানুষ ছিল না। সমুদ্রে জাহাজটিকে দেখতে পেয়ে দ্রুতগতিতে সেটির কাছে গিয়ে পৌঁছোয় ইটালীয় বাহিনী। জাহাজটি উপকূলে পাহাড়ের কাছে অগভীর জলে ভাসছিল। সম্পূর্ণ অচেনা লাগছিল সেই জাহাজটিকে। সেটিকে দেখে বিস্মিত হয়েছিল উপকূলীয় বাহিনী। তারপর জাহাজটিকে পাহাড় থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইটালির উপকূলরক্ষীরা সেই জাহাজে উঠে যা দেখেছিল, তাতে তাদের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছিল। দেখেছিল, জাহাজে খাবারের টেবিলে রয়েছে অর্ধেক খাওয়া মিশরীয় খাবার। অথচ জাহাজে কেউ নেই। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে খাচ্ছিলেন! আর খাবার শেষ না-করেই তাঁরা উঠে গিয়েছেন এবং নিখোঁজও হয়ে গিয়েছেন।
বিষয়টি যে-কাউকে বিস্মিত করার পক্ষে যথেষ্ট। এখানেই শেষ নয়, জাহাজটিতে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় উত্তর আফ্রিকান সাগরের একটি ফরাসি মানচিত্র, বেশ কিছু জামাকাপড় এবং লুক্সেমবুর্গের একটি পতাকা।
এসব দেখে অনেকে অনুমান করেন, জাহাজটি এই সময়ের নয়। বহু পুরোনো সময়ের জাহাজ এটি। তাঁরা বলেছিলেন, এর আগে এমন সর্বোত্তম ধাঁচের জাহাজ ইটালিতে দেখা যায়নি।
এরপরই ইটালির গোয়েন্দারা জাহাজটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে সবচেয়ে যে রহস্যময় বিষয়টি জানা যায় তা হল—এই জাহাজটি নাকি কোনো দেশেরই নয়। কারণ, ইটালি বা অন্য কোনো দেশে এই জাহাজটির রেজিস্ট্রেশন করানো হয়নি। আর একথা তো সত্য, বিনা রেজিস্ট্রেশনে কোনো জাহাজ সমুদ্রে চলাচল করতে পারে না।
তাহলে এই জাহাজটি সত্যিই কি ভূতুড়ে? সত্যিই কি হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্রে ভেসে চলেছে এই জাহাজ? চারদিকে শুরু হয়ে যায় জল্পনা। বিশেষ করে ইটালির নৌ বিভাগে এই জাহাজটি নিয়ে বেশি চর্চা হতে থাকে।
ফলে ইটালির গোয়েন্দারা বিষয়টি নিয়ে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত শুরু করেন। তখন প্রথমেই যে বিষয়টি গোয়েন্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা কিছু কাগজপত্রে লেখা হয়। বলা হয়, জাহাজটি ছিল একটি কাঠের ট্যাবলেট বা প্লেক। আর সেই ট্যাবলেটটিকেই জাহাজটি শনাক্ত করার একমাত্র প্রকাশ্য চিহ্ন বলা যেতে পারে।
শুধু তাই নয়, জাহাজটির যে নাম তখন জানা গিয়েছিল, ইটালীয় ভাষায় তা নাকি হবে ‘সুন্দর বন্ধু’। ভুল করে ভুল বানানে ‘বেল আমিকা’ হয়ে গিয়েছে জাহাজটি। কিন্তু বেশ কিছুদিন তদন্ত চালানোর পর গোয়েন্দাদের হাতে আসে আরও কিছু তথ্য।
আর সেই তথ্যকেই সঠিক বলে উল্লেখ করেছিল ইটালির নৌ বিভাগ। ইটালির সংবাদপত্রে সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা হয়, ওই জাহাজের প্রকৃত মালিকের নাম নাকি জানা গিয়েছে। জাহাজের প্রকৃত মালিকের নাম ফ্রাঙ্ক রাউয়ারুক্স। তিনি ছিলেন লুক্সেমবুর্গের নাগরিক।
এই ফ্রাঙ্ক নাকি অত্যন্ত ধনী ছিলেন। ইটালীয় সংবাদমাধ্যমের মতে, কর ফাঁকি দিতে নিজের বিশাল অঙ্কের কালো টাকার কিছু অংশ দিয়ে কিনেছিলেন এই জাহাজটি। তাই কিছু নেতিবাচক কারণে জাহাজটি গভীর সমুদ্র থেকে সরে এসেছিল ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপের উপকূলে।
রাউয়ারুক্সকেও নাকি খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তিনি নাকি সাংবাদিকদের বলেছেন, জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি ফেরার পর তিনি আশা করেছিলেন জাহাজটি ইয়টে ফিরে আসবে।
গোয়েন্দাদের বিভিন্ন রিপোর্টও তখন স্কুনার হিসেবে বেল আমিকাকে শনাক্ত করে। বলা হয়, বর্তমান সময়ে স্কুনারগুলি বিভিন্ন আকার বিশিষ্ট হয়ে থাকে। প্রাচীন জাহাজ বলে এই আধুনিক ইয়টটির ভুল শনাক্তকরণ করা হয়েছিল।
তবে ইটালীয় গোয়েন্দাদের রিপোর্ট অনেকেই বিশ্বাস করেন না। তেমনই ইটালীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলি ধ্রুবসত্য বলে তাঁরা মনে করেন না। তাঁদের ধারণা, ইটালি সরকার যে তৎপরতার সঙ্গে এই জাহাজটি নিয়ে তদন্ত করিয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা সন্দেহজনক। তাই অনেকে মনে করেন, এই জাহাজটি রহস্যজনকই থেকে গিয়েছে।
‘এস ভি লুনাটিক’
এস ভি লুনাটিকের কথা বলতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় সত্তর বছরের জুর স্টার্কের কথা। ধনী হিসেবে তাঁর মোটামুটি খ্যাতি ছিল।
২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি নিজের বোট এস ভি লুনাটিক বা লুনাটিক পিরানকে নিয়ে নিউজিল্যাণ্ডের টাউরাঙ্গা ছাড়েন। বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীভ্রমণে। তাঁর জাহাজটি ছিল ছোটো, কিন্তু তাঁর ইচ্ছে ছিল বিশাল। তিনি চেয়েছিলেন কোথাও না-থেমে জলপথে গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবেন।
তাঁর কাছে ছিল একটি রেডিয়ো। তাও যথেষ্ট আধুনিক নয়। মিশ্র মানের সেই রেডিয়ো দিয়েই তিনি স্থলভূমির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁর গল্প কিন্তু এখানেই শুরু হয়নি। গল্প শুরু তারপর।
সমুদ্রের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল তীব্র। আবার নাবিক হিসেবে স্বাভাবিক আপোশহীন একটা ইচ্ছাও তাঁর মধ্যে ছিল। আর এই দু-টি বিষয়ই পুরোপুরি ছিল তাঁর মনের মধ্যে।
দু-বছর ঘোরার পরই ঘটে একটি ঘটনা। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকেই সেটা শুরু হয়। তাঁর রেডিয়ো থেকে স্থলভূমিতে সংকেত পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্থলভূমির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, তাঁকে নিয়েই নিখোঁজ হয়ে যায় এস ভি লুনাটিক। যদিও এবারই যে তিনি প্রথম পৃথিবীভ্রমণে বের হলেন তা নয়। এর আগেও তিনি ইউরোপ গিয়েছিলেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন দেশে। ২০০৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি ইউরোপ থেকে নিউজিল্যাণ্ডে ফিরে আসেন।
কিন্তু পৃথিবীভ্রমণে বের হওয়ার আগেই তিনি নিজের বোট নিয়ে প্রতি মুহূর্তেই সমস্যায় পড়তে থাকেন। তবে তাতে তিনি বিরক্ত হননি। তা থেকে তিনি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন বলেই মনে করেছিলেন। আর এটাই ছিল তাঁর বিশ্বাস। তিনি সেটি মেরামতের জন্য বন্দরেও যান।
শেষে তিনি তাঁর যাত্রাপথ স্থির করেন। নিউজিল্যাণ্ড থেকে পূর্বে যাত্রা শুরু করে দেন। তারপর তিনি কেপ হর্ন, আজোরস হয়ে উত্তমাশা অন্তরীপকে পিছনে রেখে তাসমানিয়ার কাছাকাছি দক্ষিণ মহাসাগর ঘুরে টাউরাঙ্গায় ফিরে আসার পথ ধরেন।
যা-ই হোক, তিনি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন খোঁজাখুঁজি হয়। তারপর ব্যর্থ হয়ে সেই অনুসন্ধানপর্ব বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ৩০ এপ্রিল অস্ট্রেলীয় উপকূলে তাঁর লুনাটিককে দেখতে পাওয়া যায়। দেখেছিলেন আরভি রজার রেভেলের নেতৃত্বাধীন গবেষক দলের একজন।
আর ভি রজার ছিলেন মার্কিন নাগরিক। তাঁর বাড়ি ছিল সান ডিয়েগোয়। তিনি তাঁর দলবল-সহ তখন সমুদ্রবিদ্যা নিয়ে গবেষণার কাজে পার্থে এসেছিলেন। কিন্তু ওই গবেষক দলের সদস্য যখন লুনাটিক জাহাজটিকে দেখেন, তখন সেটিতে কোনো যাত্রী ছিলেন না।
পরে ওই সদস্য তাঁর দেখার বিষয়টি ব্যাখ্যাও করেছিলেন। তিনি নাকি লুনাটিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। লুনাটিকের পিছু ধাওয়াও করেছিলেন। এমনকী একটা রেডিয়ো সংকেত সেখানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর সেই লুনাটিকের আর কোনো যাত্রীকে তিনি দেখতে পাননি।
আরও মাস তিনেক পরে ওই লুনাটিক জাহাজকে মাঝসমুদ্রে ভাসতে দেখেছেন অনেকেই। কিন্তু তখনও সেই জাহাজে কোনো যাত্রী ছিলেন না। না জুর স্টার্ক না অন্য কেউ। বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে গিয়েছে আজও।
‘কোবেনহ্যাভেন’ জাহাজের রহস্য-কাহিনি
এবার বলা যাক কোবেনহ্যাভেন জাহাজের কথা। কোবেনহ্যাভেন ছিল ডেনমার্কের একটি জাহাজ। জাহাজটিতে নাবিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। ১৯২৮ সালে জাহাজটি নিখোঁজ হয়ে যায়। তার আগে পর্যন্ত নাবিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ হয়েছে এই জাহাজে।
১৯২১ সালে জাহাজটি তৈরি হয়েছিল ডেনিশ ইস্ট এশিয়াটিক কোম্পানির জন্য। সেই সময় পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো পালতোলা জাহাজ ছিল এই কোবেনহ্যাভেন। এই জাহাজেই তরুণ ক্যাডেটদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। প্রশিক্ষিত তরুণদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দক্ষ নাবিক হিসেবে সুনাম অর্জন করতে পেরেছিলেন।
১৯২৮ সালের ২১ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এয়ার্স থেকে কোবেনহ্যাভেন জাহাজটি অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাত্রা করে। আর সেটাই ছিল তার শেষ যাত্রা।
সেই যাত্রায় জাহাজটিতে ছিলেন পঁচাত্তর জন যাত্রী। যখন সকলের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, জাহাজটি হারিয়ে গিয়েছে, তখন তার খোঁজে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালানো হয়। কিন্তু কোনো অনুসন্ধানেই কোবেনহ্যাভেন জাহাজটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আধুনিক সময়ে সর্বাধিক সামুদ্রিক রহস্যগুলির মধ্যে এই জাহাজের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি একটি বলে বিবেচনা করা হয়। ফলে জাহাজটিকে নিয়ে বহু নাবিকের মুখে নানা কথা শোনা গিয়েছে। আবার সাধারণ মানুষের মধ্যেও অনেক রহস্য কাহিনির জন্ম হয়েছে।
কোনো কোনো নাবিক জাহাজটি সম্পর্কে বলেছেন, সেটি নাকি সাগরে ভাসমান কোনো হিমবাহে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তাই সেটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এই যুক্তি স্বীকার করে নিলেও তা বাস্তবিকই ঘটেছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়নি। তাই এমন যুক্তি সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি। অনেকে বিশ্বাসও করেননি।
স্বভাবতই জাহাজটি সম্পর্কে নানা মহলে নানা কাহিনি শোনা যেতে থাকে। ১৯৩৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ জাহাজটি সম্পর্কে একটি খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, কোবেনহ্যাভেন জাহাজের এক নাবিকের একটি ডায়েরি পাওয়া গিয়েছে। সেই ডায়েরি একটি বোতলের মধ্যে ছিল। বোতলটি উদ্ধার হয়েছে দক্ষিণ অতলান্তিকের বোভেট দ্বীপে।
যাঁরা হিমবাহের সঙ্গে জাহাজটির সংঘর্ষের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, ওই ডায়েরিতে নাকি তারই প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সেখানে নাকি বলা হয়েছে, হিমবাহের সঙ্গে ধাক্কা লেগে জাহাজটি ধ্বংস হয়ে যায়। তখন সমস্ত নাবিকরা লাইফবোট নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
এরপরই ১৯৩৫ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলে কিছু লাইফবোট ও কিছু মানুষের দেহ পাওয়া যায়। দেহগুলি সমুদ্রের বালিতে ঢাকা-পড়া ছিল। অনেকের অনুমান, দেহগুলি হয়তো কোবেনহ্যাভেন জাহাজের নাবিকদের। তারপর ২০১২ সালে ত্রিস্তান দ্য কুনহার পশ্চিম উপকূলে একটি রেক পাওয়া যায়। এই রেকটিও শনাক্ত করা যায়নি।
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রেকটি কোবেনহ্যাভেনের বলে অনুমান করা হয়। তাই উপকূল কতৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে ডেনমার্কের বিদেশ মন্ত্রক এবং ডেনিশ ইস্ট এশিয়াটিক কোম্পানি। কিন্তু এতদিন পর সেই রেকটি কোবেনহ্যাভেনেরই যে হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় কি? তাই বিষয়টি বিতর্কিত।
সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হল, ১৯২৮ সালে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরও কোবেনহ্যাভেন জাহাজটিকে অতলান্তিক মহাসাগর-সহ বিভিন্ন মহাসাগরে বিভিন্ন সময় দেখা গিয়েছে। অনেক জাহাজই ওই কোবেনহ্যাভেনকে দেখতে পেয়েছে বলে দাবি করেছে। এখন প্রশ্ন হল, এটা কী করে সম্ভব? এর উত্তর পাওয়া যায়নি আজও। কোনো দিন পাওয়া যাবে কি?
‘জিয়ান সেং’ নিয়ে নানা কথা
জিয়ান সেং আসলে ৮০ মিটার দীর্ঘ একটি তরল পদার্থবাহী জাহাজ। জাহাজটি কোন দেশের বা তার মালিক কে, তা জানা যায়নি আজও। আর কোনো দিন জানা যাবে বলে মনেও হয় না। এই জাহাজটিকেও ভৌতিক জাহাজ বলে মনে করেন অনেকে।
২০০৬ সালে এই জাহাজটি খুঁজে পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে। অস্ট্রেলীয় উপকূলে নজরদারি চালানো একটি বিমানের নজরে পড়ে যায় এই জাহাজটি। রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায় এই বিমানে।
জিয়ান সেং জাহাজটিকে দেখা যায় উত্তর অস্ট্রেলিয়ার কার্পেন্টারিয়া উপসাগরে কুইন্সল্যাণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উইপার ১৮০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু জাহাজটির পরিচয় পায়নি অস্ট্রেলিয়ার উপকূল বিভাগ।
তবে তদন্ত করে অস্ট্রেলীয় নৌ বিভাগের তদন্তকারীরা দেখেছিলেন, জাহাজটি বিকল হয়ে গিয়েছে। সেটিকে আর সমুদ্রে চালানো সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, জাহাজে কোনো ক্রু সদস্যও ছিলেন না।
এমনকী জাহাজের পরিচিতি লেখার জায়গাগুলি হয়তো দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার কারণে পুরোপুরি মুছে গিয়েছে। আবার জাহাজটি পরীক্ষা করেও তাঁরা সেখানে কোনো অবৈধ কার্যকলাপের প্রমাণ পাননি। প্রমাণ পাওয়া যায়নি হিংসাত্মক কোনো ঘটনারও।
উপকূলরক্ষী বিভাগের তদন্তকারীরা অনেক খোঁজখবর নিয়েও জাহাজের উৎস খুঁজে পাননি। তাই জাহাজটি যে কোথা থেকে এসেছিল, তা-ও জানাতে পারেননি তাঁরা। এরপরই ঘটে একটি ঘটনা।
সেই সময় জাহাজটি সম্পর্কে আচমকা একটি তথ্য প্রকাশ করা হয়। তথ্যটি সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো। তখন হঠাৎই বলা হয়, সমুদ্রপথে মানুষ ও মাদক পাচার থেকে শুরু করে মাছের অবৈধ ব্যাবসা চালানো হত এই জাহাজ দিয়ে। আর তা করা হত গোপনে।
তাই নিজেদের গোপন রাখতে চেয়েছিল জাহাজটি। তাই নিজেদের সম্পর্কে কোনো পরিচিতি সংক্রান্ত তথ্য জাহাজে অতিসচেতনভাবেই রাখা হয়নি।
একসময় জাহাজটি ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন নাকি তার মালিক। তা হলে ভয়ংকর শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তাই বিপদ বুঝে গোপনে জাহাজটি জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আরও একটি ঘটনা ঘটানো হয় এই সময়। জাহাজের মালিকানা নিয়ে কোনো দাবি না ওঠায় সেটিকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এমন তথ্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন মহলে।
যেমন অনেকে বলে থাকেন, জাহাজটি যদি তার মালিকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নষ্ট করে ফেললেই হত। সেটিকে এভাবে ভাসিয়ে দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল?
শুধু তাই নয়, আরও একটি প্রশ্ন ওঠে। আর সেটি ওঠে একটি ঘটনা নিয়ে। জাহাজে যখন অস্ট্রেলীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী তল্লাশি চালায়, তখন জাহাজে প্রচুর চাল মজুত ছিল। উপকূলরক্ষী বাহিনী সেই চাল উদ্ধার করে।
স্বভাবতই অনেকে জিজ্ঞাসা করেন, জনমানবহীন একটি ফাঁকা জাহাজে এত চাল কী করে এল? এত চাল-সহ জাহাজটি কেউ কি সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে পারে? বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের উত্তর অস্ট্রেলিয়ার উপকূল বিভাগ দিতে পারেনি।
আরও একটি প্রশ্ন ওঠে তখন। প্রথমে তো উপকূল বিভাগের তদন্তকারীরা জানিয়েছিল জাহাজটি সম্পর্কে অপরাধমূলক কোনো কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাহলে পরে সেই বক্তব্য থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে জাহাজটি সম্পর্কে কেন এমন কথা বলা হচ্ছে?
অনেকে মনে করেন, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই নাকি উপকূল বিভাগ জাহাজটি সম্পর্কে এমন ধারণা রটিয়ে দিয়েছিল। স্বভাবতই জাহাজটি সম্পর্কে রহস্য যেখানে ছিল, সেখানেই থেকে যায়। ফলে অনেকেই জাহাজটি ভৌতিক বলে উল্লেখ করে থাকেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এমন কথাও শোনা যায়, জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার পরও নাকি কোনো কোনো জাহাজের নাবিক সেই জাহাজটিকে অস্ট্রেলীয় উপকূল থেকে অনেকটা দূরে সমুদ্রে দেখেছেন।
‘ক্যারোল আ ডিয়ারিং’ কি সত্যিই ভৌতিক?
পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় জাহাজ বলা হয় এই ‘ক্যারোল আ ডিয়ারিং’কে। কারণ এই জাহাজটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে রহস্যময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গালের নামও। তাই জাহাজটিকে ভৌতিক বলতে দ্বিধা করেন না অনেক নাবিকই।
আসলে এই ‘ক্যারোল আ ডিয়ারিং’ ছিল একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। ১৯২১ সালে জাহাজটিকে খুঁজে পাওয়া যায় উত্তর ক্যারোলিনার কেপ হেটার্সে। আর তখনই জাহাজটির রহস্যময়তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোড়ন পড়ে যায়। কারণ, জাহাজটি নাকি বারামুডা ট্রায়াঙ্গালে পড়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল!
জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো থেকে। শোনা যায়, তারপরই মাঝসমুদ্রে কিছু সমস্যায় পড়েছিল জাহাজটি। কিন্তু সেই সব সমস্যা জাহাজটি কাটিয়ে উঠেছিল তার দক্ষ ক্যাপ্টেন ও অন্য নাবিকদের সহযোগিতায়। কিন্তু সব কিছু বদলে যায় ১৯২১ সালের ২৮ জানুয়ারি।
ওই দিন থেকে জাহাজটির সঙ্গে উপকূল বিভাগের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তখনই কোনো কোনো পক্ষ থেকে বলা হয়, বারমুডা ট্রায়াঙ্গালের সীমানায় ভুল করে ঢুকে পড়ে হারিয়ে গিয়েছে জাহাজটি।
আর, ওই ভয়ংকর ত্রিভুজের কথা কে না জানে! ওই রহস্যময় ত্রিক্ষেত্রে পড়ে জাহাজ থেকে বিমান, অনেক কিছু শুধু হারিয়েই যায়নি, নিশ্চিহ্ন পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। বিষয়গুলি নিয়ে বহু আলোচনা-লেখালেখিও হয়েছে।
সুতরাং, ক্যারোল আ ডিয়ারিং যদি বারমুডা ট্রায়াঙ্গালেই ঢুকে পড়ে থাকে, তাহলে ওই জাহাজের হদিশ আর না পাওয়ারই কথা।
কিন্তু তা হল না। হারিয়ে যাওয়ার মাত্র তিন দিন পরেই জাহাজটিকে কেপ হেটার্সে খুঁজে পায় উদ্ধারকারী দল। তার মানে, জাহাজটি বারমুডা ট্রায়াঙ্গালে পড়েনি! সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে রহস্য কমেনি, বরং বেড়েছে।
কেননা, জাহাজে কোনো জনপ্রাণী ছিল না। ক্রু সদস্য থেকে সাধারণ যাত্রী, কেউই ছিলেন না সেখানে। উদ্ধারকারীরা পুরো জাহাজ ঘুরে দেখেন। কিন্তু সেখানে কোনো মানুষকে না দেখলেও তাঁরা দেখেছিলেন জাহাজটি সুন্দর করে যেন পরিকল্পিতভাবে সাজানো-গোছানো ছিল।
এ ছাড়াও জাহাজের খাওয়ার ঘরে খাওয়ার-টেবিলও পরিপাটি করে সাজানো ছিল। মনে হচ্ছিল খাওয়ার টেবিলে সকলে বসেও ছিলেন। কিন্তু খাবার খাওয়ার আগে কোনো এক রহস্যময় কারণে প্রতিটি মানুষ জাহাজ থেকে উধাও হয়ে যান! কিন্তু, ...ব্যাপারটা কী করে সম্ভব?
বারমুডা ট্রায়াঙ্গালে পড়লে জাহাজটিরই যেমন খোঁজ পাওয়ার কথা ছিল না, তেমনই জাহাজের ভিতরে অমন সুন্দর করে সব কিছু সাজানো ও গোছানো থাকতে পারত না। তাই ভৌতিক জাহাজ হিসেবে পরিচিত ক্যারোল আ ডিয়ারিং-এর রহস্য আজও রহস্যই থেকে গিয়েছে।
এই ডিয়ারিংই হল সেই জাহাজ, যার রহস্য নিয়ে অনেক পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে। আর একথাও ঠিক, আজ অবধি যেসব জাহাজের রহস্য নিয়ে সব চাইতে বেশি লেখালেখি হয়েছে, তার একটি হল এই জাহাজটিই।
৫০ বছর পর পর সমুদ্রে ভেসে উঠত ‘লেডি লোভিবণ্ড’
খুবই মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী ছিল এই ‘লেডি লোভিবণ্ড’। যেন চিরকালের কোনো হিংসাত্মক সাহিত্য-কাহিনির নাট্যাভিনয় হয়েছিল ওই জাহাজে। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল জাহাজের ক্যাপ্টেন সাইমন রিডের স্ত্রীর পরকীয়া নিয়ে।
বিয়ের পর নিজের সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্রযাত্রায় বের হওয়ার পরিকল্পনা করেন সাইমন। যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ। তাই লেডি লোভিবণ্ড জাহাজে বের হওয়ার সময় নিজের স্ত্রীকেই সহযাত্রী করেন।
সঙ্গী ছিল আরও একজন। তিনি জন রিভার্স। এ ছাড়াও জাহাজের বিভিন্ন কাজে সহায়তার জন্য ছিলেন আরও বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ কয়েক জন ব্যক্তি।
আবার, জন রিভার্স ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন সাইমনের বন্ধুও। কিন্তু জন কতখানি মোহমুগ্ধ ছিলেন তাঁর স্ত্রীর প্রতি, তা জানতেন না সাইমন। তাঁর স্ত্রী বাস্তবিকই অসামান্য সুন্দরী ছিলেন। আর তাই সাইমনকে তাঁর স্ত্রীর জন্যই ভয়ংকর ঈর্ষা করতেন জন।
সেই ঈর্ষাই ভয়ংকর বিপর্যয় নামিয়ে আনে লেডি লোভিবণ্ডে। তাই যে-জাহাজে সাইমন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সুন্দর কিছুদিন কাটাতে গিয়েছিলেন, সেখানে তৈরি হয়েছিল রক্তাক্ত ঘটনার ইতিহাস।
জাহাজ জলে ভাসার কয়েক দিন পরই জন রিভার্সের বন্ধুত্বের মুখোশ খুলে পড়ে। বন্ধুপত্নীকে নিজের করে পেতে তিনি খুন করেন সাইমন রিডকে। সেইসঙ্গে নিজেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের দায়িত্বও নিয়ে নেন।
তারপর তাঁর নির্দেশনায় চলতে থাকে লেডি লোভিবণ্ড জাহাজ। কিন্তু সাইমনকে মারার পর তাঁর স্ত্রীকে জন নিজের করে পেয়েছিল কি না তা জানা যায়নি। সাইমনের স্ত্রীও কি তাঁকে মেনে নিয়েছিলেন?
না, এই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া যায়নি আজও।
কিন্তু ঘটনার শেষ হল না সেই জাহাজে। রহস্যজনকভাবে একে একে জাহাজের সকলে মারা যান। এমনকী মরে গেলেন সাইমনের সুন্দরী স্ত্রীও। বেঁচে গেলেন শুধু জন রিভার্স। কিন্তু তিনিও থাকতে পারলেন না। ধ্বংস করে দিলেন পুরো জাহাজটিকেই।
স্বভাবতই জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেলেন তিনিও। এরপর ঘটল সেই অস্বাভাবিক ঘটনা। ঠিক ৫০ বছর পর সেই লেডি লোভিবণ্ড জাহাজটিকে সমুদ্রের বুকে ফের দেখা গেল। দেখলেন অনেক জাহাজের যাত্রী, নাবিক ও ক্যাপ্টেনরা। কিন্তু কী করে সম্ভব হল এই ঘটনা?
শুধু সে-বারই নয়, তারপর আরও ৫০ বছর পর সমুদ্রে দেখা গেল সেই লেডি লোভিবণ্ড জাহাজকে। এভাবে প্রতি ৫০ বছর পর পর সমুদ্রে কী এক অজ্ঞাত কারণে লেডি লোভিবণ্ড জাহাজকে দেখা যেতে থাকে।
অনেকে বলে থাকেন, ৫০ বছর পর পর লেডি লোভিবণ্ড জাহাজটি জলে ভেসে ওঠে হারানো কিছু খুঁজতে। কিন্তু, কী খুঁজতে সেই জাহাজ ফের সমুদ্রে ভেসে ওঠে? কেউ অবশ্য জানে না এই প্রশ্নের উত্তর।
এভাবে বেশ কয়েক বার ৫০ বছর পর পর জাহাজটি সমুদ্রে ভেসে উঠলেও শেষে সেটি একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
তারপর ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও জাহাজটিকে আর সমুদ্রে ভাসতে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রেও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক কেন জাহাজটিকে আর সমুদ্রে ভাসতে দেখা যায়নি?
অনেকে বলে থাকেন, যে বস্তু খুঁজতে জাহাজটি ৫০ বছর পর পর সমুদ্রের বুকে ভেসে উঠত, তা সম্ভবত পেয়ে গিয়েছে তাই হয়তো সেটি আর জলে ভেসে ওঠে না। কিন্তু কী বস্তু খুঁজে পেয়েছে জাহাজটি, সেই প্রশ্নেরও উত্তর কারও জানা নেই।
তবে জাহাজের রহস্যময় সেই চরিত্রের কথা কিন্তু সমুদ্রকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের অধিকাংশেরই জানা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন