উপমন্যু রায়
পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যতগুলি রহস্যময় জাহাজের কথা শোনা গিয়েছে, সেগুলির মধ্যে দ্য ফ্লাইং ডাচম্যানের কোনো তুলনা হয় না। এই জাহাজ নাকি কখনো কোনো বন্দরে নোঙর ফেলে না। কেবল উত্তাল সমুদ্রেই এই রহস্যময় পাল-তোলা জাহাজের দেখা মেলে।
তথ্য বলছে, এই জাহাজকে নিয়ে যে কাহিনি শোনা যায় তা মূলত লোককাহিনি। এই কাহিনির উৎপত্তি সতেরো শতকের সামুদ্রিক লোকাচারবিদ্যা থেকে। তবে প্রাচীন নথিপত্রে এই জাহাজের ঘটনা আঠারো শতকের শেষের দিকের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, উনিশ এবং কুড়ি শতকে মাঝসমুদ্রে এই জাহাজটিতে নাকি ভূতুড়ে আলোও অনেকে দেখেছেন।
ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজটি নিয়ে অনেক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, সামুদ্রিক ঝড়ের মধ্যে পড়ে জাহাজটি হারিয়ে যায়। পরে আর সেটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর যাঁরা অতিরিক্ত ঈশ্বর বিশ্বাসী, তাঁদের মতে জাহাজ ও তার ক্রু-রা অভিশপ্ত ছিল। তাই ঈশ্বরের অভিশাপের কারণেই জাহাজটি কোনো বন্দরে নোঙর ফেলতে পারেনি।
যাঁরা জাহাজটিকে সমুদ্রে দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করে থাকেন তাঁরা বলেন, জাহাজটি যখন সমুদ্রে অন্য কোনো জাহাজকে অতিক্রম করত, তখন সেই জাহাজ থেকে তার ক্রু-রা নাকি বহু দূরের প্রেতাত্মা বা অশুভ শক্তিকে বার্তা পাঠাত। যদিও এমন কথা আজকের সময়ে অদ্ভুতই মনে হয়।
তবে একটি তথ্য বহু নাবিকের তথ্যের সঙ্গে মিলে গিয়েছে। তা হল, ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজটি নাকি সমুদ্রে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। যাঁরা জাহাজটিকে দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন তাঁরা বলেছেন, জাহাজটি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে কোনো ইঙ্গিত তাঁদের দেয়নি।
পাশাপাশি যাঁরা সমুদ্রে জাহাজটিকে দেখেছেন তাঁরা জানিয়েছেন, সমুদ্রে তাঁরা হঠাৎই জাহাজটিকে যেমন উদয় হতে দেখেছেন, তেমনই আচমকাই কাউকে কিছু বুঝতে না-দিয়ে সমুদ্র থেকে অদৃশ্যও হয়ে গিয়েছে ওই জাহাজ।
জাহাজটি নিয়ে বহুল প্রচলিত যে তথ্য-কাহিনিটি শোনা যায় তা হল—১৭২৯ সালে দ্য ফ্লাইং ডাচম্যান ১ নামে একটি ওলন্দাজ জাহাজ নেদারল্যাণ্ডস থেকে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটির ক্যাপ্টেন ছিলেন হেনড্রিক ভ্যাণ্ডারডেকেন।
কিন্তু মাঝসমুদ্রেই জাহাজটি সমস্যায় পড়ে। ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়ের মুখোমুখি হয় জাহাজটি। ঝড়ের দাপটে রীতিমতো বেসামাল হয়ে যায়।
তার নাবিকরা তখন জাহাজটি নিয়ে এগোতে রাজি ছিলেন না। তাঁরা চাইছিলেন জাহাজটি নিয়ে ফিরে যেতে। কিন্তু জাহাজের ক্যাপ্টেন ফিরতে রাজি ছিলেন না। কেপটাউন পৌঁছোতে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আর তা নিয়ে নাবিকদের সঙ্গে তীব্র মতান্তর হয় ক্যাপ্টেনের। তখন নাবিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফলে সংঘর্ষ ও রক্তপাত শুরু হয় জাহাজে। একসময় ক্যাপ্টেন বিদ্রোহীদের গুলি করে মারেন ও তাঁদের দেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। তারপর অবশ্য তিনিও এগোতে বা পিছোতে পারেননি। ঝড়ের আঘাতে জাহাজটি নিয়ে সমুদ্রের বুকেই তিনি হারিয়ে যান।
দ্য ফ্লাইং ডাচম্যানকে নিয়ে অভিজ্ঞ নাবিক ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন নাবিকের লেখা পত্রেও ‘দ্য ডাচম্যান’ সম্পর্কে অনেক কথা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে অনেক লেখালেখিও হয়েছে।
সেগুলির মধ্যে জর্জ বেরিংটনের লেখাতেই প্রথম এ বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৯৫ সালে প্রকাশিত নিজের লেখা আ ভয়েজ টু বোটানি বে গ্রন্থের এক জায়গায় তিনি এ বিষয়ে তাঁর মতামত জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, নাবিকদের বেশিরভাগ কাহিনিই কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তবে শেষপর্যন্ত সেই সব কুসংস্কারের দায় নেননি কোনো নাবিকই। তাঁর ধারণা, বেশ কয়েক বছর আগে (তার মানে ১৭৯৫ সালের আগে) এক ওলন্দাজ নাবিক কেপ অফ গুড হোপে হারিয়ে যান।
জাহাজের সব নাবিকই তাঁর মতো দুর্ভাগ্যের শিকার হননি। সেই সময় জাহাজটি মাঝসমুদ্রে এক ভয়ংকর ঝড়ের মধ্যে পড়ে। কিন্তু কোনোরকমে নিজেদের রক্ষা করে তাঁরা শেষপর্যন্ত কেপটাউন বন্দরে গিয়ে পৌঁছোন।
সেখানে ওই কয়েক জন নাবিক জাহাজটির সংস্কার করেন। তারপর তাঁরা ফের ইউরোপের পথে যাত্রা করেন। কিন্তু সেই যাত্রাও তাঁদের শুভ হয় না।
মাঝসমুদ্রে ফের তাঁরা ঝড়ের কবলে পড়েন। রহস্যজনক বা কাকতালীয় ব্যাপার হল, যে জায়গায় তাঁরা ঝড়ের মুখে পড়েন, সেখানকার অক্ষাংশ, আর আগে তাঁরা যে জায়গায় বিপদে পড়েছিলেন সেই অক্ষাংশও একই।
বেরিংটনের বক্তব্য, দ্বিতীয় বার যখন জাহাজটি বিপদে পড়ে, তখন সেই জাহাজটিকে অন্য কয়েকটি জাহাজের নাবিক হয়তো দেখেছিলেন। ঝড়ের মধ্যে পড়ার পর জাহাজটি হারিয়ে যায়। তাই তাঁরাও জাহাজটিকে কিছুক্ষণ পর আর দেখেননি। তাই তাঁরা মনে করেছেন, জাহাজটি উধাও হয়ে গিয়েছে।
জাহাজটির ডেকে যেহেতু বেশ কিছু নাবিক ছিলেন, তাই অন্য জাহাজগুলির নাবিকরা তাঁদের দেখতে পান। কিন্তু তাঁরা যেহেতু ধরে নিয়েছিলেন জাহাজটি আর পার্থিব নয়, তাই তার ডেকে যাঁদের তাঁরা দেখেছিলেন, তাঁরা মনে করেছিলেন, ডেকের মানুষগুলো কেউ মানুষ নন। তাঁরা নাবিকদের আত্মা।
যাঁরা সেই রহস্যময় জাহাজটিকে দেখেছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন বেশ কয়েক জন ব্রিটিশ ও ভারতীয় নাবিকও। তখন সেই নাবিকরাই জাহাজটির কথা বিভিন্নজনকে বলতে শুরু করেন।
আর সেই কাহিনিও দ্রুত বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। নাবিকদের সৌজন্যে সেই সময় জাহাজটির একটা নামও জুটে যায়। জাহাজটিকে সকলে চিনতে শুরু করেন ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ বলে। এর বাংলা হল ‘উড়ন্ত ওলন্দাজ’।
১৮৩৫ সালে এক ব্রিটিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনের লগবুক থেকে জানা যায়, তিনি মাঝসমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে একটি জাহাজকে দেখেন।
জাহাজটি তাঁদের জাহাজের দিকেই এগিয়ে আসছিল। জাহাজটির সঙ্গে ঝড়ও যেন দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, ঝড়-সহ জাহাজটি তাঁদের জাহাজকেই ধাক্কা মারবে। তাঁরা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের কাছে এসে পৌঁছোনোর আগেই জাহাজটি কোথায় যেন হারিয়ে যায়!
ফ্লাইং ডাচম্যান জাহাজটিকে ওই ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ‘ভূতুড়ে জাহাজ’ বলেই উল্লেখ করেন। এর পর ১৮৮১, ১৯১১, ১৯৩৯ ও ১৯৪২ সালেও অনেক জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকরা মাঝসমুদ্রে ফ্লাইং ডাচম্যানকে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। সকলের বক্তব্য মোটামুটি একই। তাঁদের মূলবক্তব্য, দেখার পর একসময় হঠাৎই জাহাজটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
১৯৪২ সালেও জাহাজটিকে কেপটাউন উপকূলে দেখা যায়। সেখানেই সেটি অদৃশ্য হয়ে যায়। এখনও জাহাজটিকে নিয়ে নাবিকদের কৌতূহলের শেষ নেই। অনেকেই তাই আফ্রিকা উপকূলে জাহাজ নিয়ে যেতে ভয় পান।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন