উপমন্যু রায়
আমাদের সভ্যতায় আধুনিক যুগের সূচনা হয়েছিল ইটালিতে। মধ্যযুগের পাথুরে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার আর কুশিক্ষাকে ভেঙেচুরে এখানকার রেনেসাঁসই বদলে দিয়েছিল সারা পৃথিবীকে। আর সেই পথ ধরে আমরা একুশ শতকে পৌঁছেছি। সেই পথ দিয়েই আজও আমরা এগিয়ে চলেছি।
ইটালি সম্পর্কে এককথায় কিছু বলা সম্ভব নয়। প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক যুগ পেরিয়ে বর্তমানে যে উত্তর আধুনিক সময়ে পৃথিবী প্রবেশ করেছে, তার বহু ঘটনার সাক্ষী এই দেশ। শিল্প, সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, খেলাধুলা—সব কিছুতেই চোখ-ধাঁধানো সাফল্য দেখিয়ে এই ইটালিই বার বার পৃথিবীকে চমকে দিয়েছে।
এই ইটালি কেমন?
সেদেশেরই বিখ্যাত লেখক বেপ্পে সেভারন্যিনির কথায় বলা যায়, ‘আপনার মনে ইটালির যে ছবিটি আঁকা রয়েছে, তার সঙ্গে কিন্তু ইটালিয়ার বাস্তব ছবিটি একেবারেই মিলবে না। পাহাড়ে সূর্যাস্তের অপরূপ শোভা, সবুজ অলিভ গাছ, লেবুর বাগান, হোয়াইট ওয়াইন আর সুন্দরী, কৃষ্ণকেশি নারীর দল, ইটালি নিয়ে বাইরের দুনিয়ায় এমন একটি মোহময় পরিচিতি আছে। কিন্তু আসল ইটালিয়া একটি গোলকধাঁধা, লোভনীয় কিন্তু জটিল।’
গ্যেটে, বায়রন, মার্ক টোয়েনরা ইটালিকে নিয়ে যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, সেই ইটালি আজ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এই সময়ের পর্যটকদেরও ইটালি নিয়ে তেমন ধারণা নেই। সভ্যতা উন্নতির ধারক এবং বাহক হলেও স্থাপত্যের দিক থেকে ইটালির প্রাসাদ, অট্টালিকা ও দুর্গগুলি আজও সকলকে মুগ্ধ করে।
এই বাড়িগুলি যেমন প্রাচীন, তেমনই অনেকগুলিরই বহু ইতিহাস রয়েছে। আবার সেগুলিকে নিয়ে বহু ভৌতিক কাহিনিও শোনা যায়। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর রহস্যময় অঞ্চল বা বাড়িগুলির অধিকাংশই রয়েছে এই ইটালিতে।
যেমন নেপলসে একটি অপরূপ দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপটি যেমন সুন্দর, তেমনই রহস্যময়। কারণ, যাঁরাই এই দ্বীপের মালিক হয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগই মারা গিয়েছেন অস্বাভাবিকভাবে। ১৯২০ সালে দ্বীপটির মালিক হন সুইটজারল্যাণ্ডের হ্যানস ব্রাউন। কয়েক বছর সেখানে থাকার পর তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর শরীর মোড়ানো ছিল কার্পেট দিয়ে। ব্রাউনের মৃত্যুর কয়েক মাস পর তাঁর স্ত্রীও রহস্যজনকভাবে সমুদ্রে ডুবে মারা যান।
এরপর বিভিন্ন সময় অনেকেই দ্বীপটির মালিক হয়েছেন। তাঁদের বেশিরভাগেরই আকস্মিক মৃত্যু হয়। আবার কেউ চরম ধনী থেকে ফকিরে পরিণত হন। কোনো মালিকের আত্মীয়দের রহস্যমৃত্যু ঘটে। শুধু তা-ই নয়, দ্বীপের এক মালিকের নাতিকে অপহরণও করা হয়। তার খোঁজ আর পাওয়া যায়নি।
২০০৯ সালে দ্বীপটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তখন ফ্র্যাঙ্কো এম্ব্রোসিও ও তাঁর স্ত্রী জিওভান্নো সাচো দ্বীপের উলটোদিকে থাকার জন্য একটি ভিলা ভাড়া নিয়েছিলেন। কিন্তু আচমকাই তাঁরা খুন হয়ে যান। কিন্তু কেন? উত্তর পাওয়া যায়নি। তারপর থেকেই দ্বীপটি ‘রহস্যজনক দ্বীপ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।
ক্যাস্তেলো ডি পপির এভিল টাওয়ার
অস্বাভাবিক রহস্যময় বিষয় নিয়ে তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল ক্যাস্তেলো ডি পপির এভিল টাওয়ার। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রহস্যপ্রিয় মানুষ পাগলের মতো এই টাওয়ারে ছুটে যান।
এই রহস্যময় টাওয়ারেই নাকি নিজের প্রেমিককে খুন করেছিল মাতেলদা নামে এক ইটালীয় সুন্দরী পরিচারিকা। সেই মাতেলদার কারণেই কাস্তেলো ডি পপির ওই টাওয়ার আজ এভিল টাওয়ার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কাহিনিটা সত্য। এক রাতে যখন দু-জন গভীর প্রেমে মগ্ন, তখনই খুন হয় সেই প্রেমিক। সেই রাতেই তাকে সেখানে কবর দেওয়া হয়। অভিযোগ, মাতেলদাই নাকি তার প্রেমিক পুরুষটিকে খুন করে।
যদিও মাতেলদা তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে। তার মানে, মাতেলদা তার প্রেমিককে খুন করেনি?
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, কে খুন করল? মাতেলদা না-হলে অন্য কেউ তো বটেই! মাতেলদা যদি খুন না-করে থাকে, তাহলে যে খুন করেছে, তাকে কি দেখেছে মাতেলদা? নাকি দেখেনি?
আর যদি দেখে থাকে, তাহলে তাকে কি সেচেনে? নাকি চেনে না? চিনলেও কি তার নাম প্রকাশ করতে পারবে? যদি না-পারে, কেন পারবে না? খুনি কি তার আপন কেউ? নাকি খুনিকে সেভয় পায়?
এমন হাজার এক প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?
তবে, মাতেলদাকে সন্দেহের বাইরে রাখা হল না। তাকে গ্রেফতার করা হল। হাজির করানো হল বিচারালয়ে। কিন্তু তখনকার বিচারালয় আজকের মতো এত আধুনিক ছিল না।
বিচারালয়ে এক জন বিচারক ছিলেন না। ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে বিচারক ছিলেন বেশ কয়েক জন।
সেই বিচারকদের সামনে মাতেলদা জানাল, সেতার প্রেমিককে খুন করেনি।
প্রশ্ন উঠল, তাহলে খুন করল কে? মাতেলদা চুপ।
বার বার জিজ্ঞাসা করায় জানাল, সেজানে না।
কিন্তু, সত্যিই কি সেজানে না? নাকি বলতে চাইছে না। মাতেলদার একটাই কথা, সেখুন করেনি।
বিচারকরা তার কথা বিশ্বাস করেননি। তাঁরা তাকে মৃত্যুদন্ড দেন।
নির্দিষ্ট একটি দিনে প্রেমিককে খুনের অভিযোগে বিচারালয়ে দোষী সাব্যস্ত মাতেলদাকে মেরে ফেলা হল।
মাতেলদা মরল কিন্তু তার আত্মার বিনাশ হল না। তার আত্মা কিন্তু রয়ে গেল অতৃপ্ত। শোনা যায় মাতেলদার আত্মা এখনও সেই টাওয়ারে ঘুরে বেড়ায়।
সেযে মৃত্যুর আগে পরিচারিকা ছিল, মৃত্যুর পরেও সেকথা নাকি সেভোলেনি। তাই কখনো তাকে দেখা যায় ঘর পরিষ্কার করতে, আবার কখনো দেখা যায় বেশ কিছু জামাকাপড় নিয়ে শশব্যস্ত হয়ে কোথায় যেন সেযাচ্ছে! সম্ভবত ধোপার কাছেই যাচ্ছিল সে।
টাওয়ারে আসা পর্যটকরাও নাকি কখনো কখনো তাকে দেখে থাকেন। তার আচরণে থাকে আগের সেই ব্যস্ততা!
পালাতজো দারিও
পালাতজো দারিও একটি প্রাসাদের নাম। প্রাসাদটির অবস্থান ভেনিসের দোরসোদুরো এলাকায়। সেই কারণে এই প্রাসাদটিকে ভেনিসের প্রাসাদ বলেই অনেকে উল্লেখ করতে পছন্দ করেন। ১৪৮৭ সালে গ্র্যাণ্ড ক্যানালের উপর ইসত্রিয়া পাথরে এই প্রাসাদটি তৈরি হয়।
এই প্রাসাদটি একটু আলাদা রকমের। এর কাছাকাছি অন্য যেসব বড়ো বড়ো ভবন রয়েছে, সেগুলির সঙ্গে এই প্রাসাদের গঠন কাঠামো এক নয়। বাস্তবিকই এই প্রাসাদটির সৌন্দর্য অসাধারণ। প্রাসাদটির চিমনি স্বতন্ত্র। খুব কম চিমনিরই এখনও এমন শৈলী রয়েছে।
এই প্রাসাদটিকে মৃত্যু উপত্যকা বলা হয়। যাঁরা এই প্রাসাদটির মালিকানা পেয়েছেন, তাঁদের অনেকের বা তাঁদের পরিবার, বন্ধুবান্ধবদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা অনেক ঘটেছে এখানে।
রহস্যজনক বিষয় হল, প্রাসাদটি যাঁরা কিনেছেন, কেনার পর যাঁরা সেখানে কুড়ি দিনের বেশি বসবাস করেছেন, তাঁরা হয় অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন অথবা আত্মহত্যা করেছেন, নতুবা খুন হয়ে গিয়েছেন।
পরবর্তীকালে পরিস্থিতি এমনই হয় যে, কেউ আর এই প্রাসাদ কিনতে রাজি হতেন না। প্রাসাদটির শেষ মালিকানা ছিল একটি ধনী মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার। শোনা যায়, এই প্রাসাদ তারাও বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। আর একথাও শোনা যায়, প্রাসাদ সম্পর্কে এসব কথা এতটাই প্রচার পায় যে, সেটি বিক্রি করতে মার্কিন সংস্থাটিকে খুবই বেগ পেতে হয়েছিল।
এই প্রাসাদের প্রথম মালিকের নাম ছিল গিওভানি দারিও। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ীই এই প্রাসাদ তৈরি হয়। উনিশ শতক পর্যন্ত তাঁর পরিবার এই প্রাসাদেই বাস করেছে। কিন্তু এই প্রাসাদে বাস করার সময়েই গিওভানি দারিও ও তাঁর পরিবারের শেষের শুরু হয়ে যায়।
গিওভানি দারিওর মেয়ে নাকি এখানেই আত্মহত্যা করে। শুধু তাই নয়, মেয়ের পর দারিওর ছেলেরও অপমৃত্যু হয় এখানে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাঁর সেই ছেলে এখানে রহস্যজনকভাবে খুন হয়ে যায়।
এই প্রাসাদেরই বাসিন্দা ছিলেন বিখ্যাত মারিও ডেল মোনাকো। ১৯৬৪ সালে পথ দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন।
আর একবার অদ্ভুত একটি খুনের ঘটনা ঘটে এখানে। তখন মালিক ছিলেন কাউন্ট দেল লানতজে। স্বয়ং তিনিই বিশ শতকের সাতের দশকে এই প্রাসাদে আচমকা একদিন খুন হয়ে যান।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনা সেই সময় যথেষ্ট চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। জানা গিয়েছিল, তাঁর খুনি ছিল এক ক্রোয়েশীয়। আশ্চর্যের বিষয় হল, লানতজের সেই ক্রোয়েশীয় খুনি পরে নিজেও খুন হয়ে যায় লণ্ডনে।
এ ছাড়া এখানেই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় তাঁর ম্যানেজার ক্রিস্টোফার ল্যামবার্টের। প্রাসাদের উঁচু সিঁড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
আরেক মালিক রাউল গার্দিনিও রহস্যজনক কারণে এখানে আত্মহত্যা করেছিলেন ১৯৯৩ সালে। গত শতকের আটের দশকে আত্মহত্যা করেছিলেন নিকোলেতা ফেরারিও। তিনিও ছিলেন অপর এক মালিকের পরিবারের সদস্যা। জানা যায়, তেরো জনেরও বেশি মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এই প্রাসাদে থাকা বা প্রাসাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে।
কিন্তু, ...ব্যাপারটা কী? সকলকেই এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হতে হয়েছিল কেন? এর পরিষ্কার জবাব আজ আর জানার উপায় নেই।
কিন্তু, যেকথা ইটালি-সহ পৃথিবীর বহু মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন, তা হল, নিহতদের অশান্ত আত্মা নাকি এখনও এই প্রাসাদ দখল করে রেখেছে। রাতের অন্ধকারে তাদের অবাধ বিচরণের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে প্রাসাদটি। প্রাসাদের ভিতরে তাঁদের গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যায় এখনও।
এই প্রাসাদটিকে অভিশপ্ত বলে মনে করেন ইটালীয়রা। ইটালির প্রথম তিনটি ভয়ংকর ভৌতিক স্থানগুলির মধ্যে একটি হিসেবে মনে করা হয় এই পালাতজো দারিওকে।
পিজো কালাব্রোর ক্যাস্তেলো আরাগোনিসে
ক্যাস্তেলো আরাগোনিসে হল মধ্যযুগীয় একটি বিখ্যাত দুর্গ। ইটালির নেপলস উপসাগরের উত্তরাংশের শেষে এই দুর্গের অবস্থান। একটি আগ্নেয় শিলা বা পাথুরে ক্ষুদ্র দ্বীপের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই পুরোনো দুর্গটি, যার প্রতি ইটেরই নাকি রয়েছে ভয়ংকর সব ঐতিহাসিক ঘটনার অভিজ্ঞতা।
এই দুর্গটিকে ইশ্চিয়ার সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে মনে করা হয়। সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গগুলির অন্যতম এই ক্যাস্তেলো আরাগোনিসে। দুর্গটি তৈরি হয় যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও ৪৭৪ বছর আগে। তৈরি করেছিলেন সিরাকসের প্রথম হিয়েরো।
এই দুর্গ নির্মাণের সময় তৎকালীন যুদ্ধাবস্থার কথা মাথায় রাখা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল দু-টি বেশ বড়ো টাওয়ার। ওই দু-টি টাওয়ার তৈরি হয়েছিল শত্রুপক্ষের সশস্ত্র অভিযান নিয়ন্ত্রণের জন্য। নেপলসের প্রাচীন অধিবাসীদের বলা হত পার্থেনোপিয়ান। এই পার্থেনোপিয়ানরাই শেষপর্যন্ত এই দুর্গ অধিকার করে নেয়।
৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই দুর্গ রোমানরা দখল করে নেয়। পরে ফের এই দুর্গ পুনরুদ্ধার করে পার্থেনোপিয়ানরা। তারপর বহু বছর কেটে গিয়েছে। ইতিহাসের বহু উত্থান-পতন দেখেছে এই দুর্গ।
এই দুর্গের মধ্যে আগে একটি কাঠের সেতু ছিল। কিন্তু শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওই সেতু নিরাপদ মনে করেননি অ্যারাগনের রাজা পঞ্চম আলফান্সো। তাই ১৪৪১ সালে তিনি সেই অঞ্চলে প্রধান দ্বীপটির সঙ্গে কাঠের সেতুর পরিবর্তে পাথুরে সেতুর সাহায্যে দুর্গটি সংযুক্ত করেন।
সেই সময় জলদস্যুদের আক্রমণের আশঙ্কা ছিল প্রবল। তাদের আক্রমণ থেকে দুর্গের বাসিন্দাদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই দুর্গের দেওয়াল অত্যন্ত সুরক্ষিত ছিল। মধ্যযুগে দুর্গটির নাম পরিবর্তন হয়। নতুন নাম হয় ক্যাস্তেলো আরাগোনিসে।
তখন এই দুর্গটির মালিকানা ছিল আরাগোনিসে রাজপরিবারের। ওই নামটিই এখনও রয়ে গিয়েছে। রাজপরিবার দুর্গটির অনেক সংস্কার করেছিল। সংস্কার হওয়ার পর সেই নয়া কাঠামো নিয়ে দুর্গটি এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে নেপলস উপসাগরের উত্তরাংশে।
বহু ঘটনার সাক্ষী এই দুর্গটি কিন্তু রহস্যময় হয়ে ওঠে রাজা গিওয়াচিনো মুরাতের মৃত্যুর পর। পিজো কালাব্রোর ক্যাস্তেলো আরাগোনিসেতেই খুন হন ওই রাজা। নেপোলিয়ান পরাজিত হওয়ার কিছু পরে ১৮১৫ সালে গুলি করে এই রাজাকে খুন করা হয়েছিল।
শোনা যায়, মৃত্যুর পরও এই রাজার অতৃপ্ত আত্মা দুর্গটির মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেননি। শুধু তাই নয়, তাঁকে যে খুন হতে হয়েছিল, সেই শোকও তিনি ভুলতে পারেননি। তাই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাঁর ক্রোধোন্মত্ত আত্মা নাকি এখানে এখনও ঘুরে বেড়ায়।
গত দু-শো বছরে বহু মানুষ নাকি রাজা গিওয়াচিনো মুরাতের অতৃপ্ত ও ক্ষুব্ধ আত্মাকে এই দুর্গে দেখেছেন! সেকথা তাঁরা গোপনও রাখেননি। তাঁদের প্রকাশ করা কথাগুলিই ধীরে ধীরে গোটা ইটালিতে প্রচার হয়ে যায়।
শুধু ইটালি নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সারা ইউরোপও জেনে যায় ক্যাস্তেলো আরাগোনিসে দুর্গটির রহস্যময় কাহিনির কথা। এখন তো গোটা পৃথিবীই জানে। সারা বছরই বহু রহস্যপ্রিয় মানুষ এসে হাজির হন এই দুর্গে। বর্তমানে দুর্গটিকে ‘মোস্ট হন্টেড প্লেস’ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করে নিয়েছেন।
কাসা ডেল এনিম
এবার আসা যাক কাসা ডেল এনিমের কথায়। ইটালির বিখ্যাত হানাবাড়ির কথা বলতে গেলে কাসা ডেল এনিমের কথা প্রথম দিকেই আসবে।
রহস্য, রোমাঞ্চে এই বাড়ির ইতিহাস যেমন বহু মানুষকে বিস্মিত করে দেয়, তেমনই এখনও গভীর রাতে এই বাড়ির চরিত্র দেখে নাকি সকলেই স্তম্ভিত হয়ে যান। বাড়িটি রয়েছে উত্তর-পশ্চিম ইটালির জেনোয়ার ভোলত্রি শহরে। আসলে এই বাড়িটি ছিল একটি পাবলিক হাউস।
এই বাড়িতে একটি সরাইখানাও ছিল। সেখানে বহু মানুষ খেতে আসতেন। কেউ কেউ রাতে থাকতেনও। যাঁরা খেতে আসতেন তাঁদের অসুবিধে হত না। কিন্তু যাঁরা থাকতেন, তাঁরাই পড়তেন সমস্যায়। তাঁরা কেউই নাকি আর ফিরতেন না। প্রশ্ন হল, তাঁরা যেতেন কোথায়?
তথ্য হল, বাড়িটির মালিক ছিল মানসিক ভারসাম্যহীন একটি পরিবার। দিনে তাদের স্বভাব-প্রকৃতি কেউই সেভাবে বুঝতে পারত না; তবে রাতে তাদের আচরণ নাকি আমূল বদলে যেত।
যতটুকু জানা যায়, ওই সরাইখানায় বাইরের কেউ কাজ করতেন না। আগন্তুকদের প্রয়োজন মেটানোর সমস্ত কাজই করত ওই পরিবারের সদস্যরাই।
এই বাড়িতে যাঁরা আসতেন, রাতে থাকতেন, তাঁদের ঘুম ভেঙে যেত বেশি রাতে। তাঁদের প্রত্যেককেই এই পরিবারের সদস্যরা নাকি খুন করে গর্তে ফেলে দিত। ব্যাপারটা একটু খুলে বলা যেতে পারে।
রাতের অন্ধকারে অতিথিদের ওপর চড়াও হত মানসিক ভারসাম্যহীন পরিবারের সদস্যরা। আক্রান্তদের ওপর তারা ভারী আসবাবপত্রের টুকরো ক্রমাগত ছুড়ে মারত। মারতে মারতে তাঁদের একেবারে ঘায়েল করে ফেলত।
আতঙ্কে আক্রান্তরা যখন তীব্র চিৎকার করত, তাতে তারা আমোদ বোধ করত। সেই চিৎকার উপেক্ষা করে নিষ্ঠুরভাবে পা দিয়ে তাঁদের গলা, মুখ পিষতে থাকত তারা। এভাবেই তারা আক্রান্তদের নৃশংসভাবে মেরে ফেলত।
আক্রান্তদের মৃত্যু হলে তাঁদের ব্যাগপত্র থেকে টাকাপয়সা সব নিয়ে নিত। তারপর তারা তাঁদের দেহগুলি বিশাল একটি গর্তে একটা একটা করে ছুড়ে ফেলে দিত। এভাবেই একসময় সেই গর্তটি গণকবর হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার এই বাড়িতে ফের বসবাস করতে শুরু করে। সেই পরিবারও নাকি এই বাড়িতে বহু ভৌতিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। রাতে নাকি ওই পরিবারের কেউই ঘুমোতে পারতেন না। কারা যেন বাড়ির বিভিন্ন ঘরে রাতের দিকে মারামারি করে। আর সেইসব শব্দ ওই পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট শুনতে পেতেন।
তাঁরাই জানিয়েছেন, রাতে বহু অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যায় এই বাড়িতে। চীনেমাটির কাপ-প্লেট কারা যেন মেঝেতে ছুড়ে ফেলতে থাকে। গভীর রাতে হঠাৎ হঠাৎ কারা যেন প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকার শুনে মনে হবে কারা যেন মৃত্যুযন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে!
তখন সারা বাড়ি খুঁজে তেমন কাউকে ওই পরিবারের সদস্যরা পাননি।
ওই বাড়িতে এখনও অধিকাংশ লোকই রাতে থাকতে ভয় পান। কারণ হিসেবে অনেকে বলেন, এখনও নাকি রহস্য ছেড়ে যায়নি ওই বাড়িকে। সাহস করে ওই বাড়িতে যাঁরা থাকতে যান, তাঁদের অনেকেই নাকি এখনও নানা ব্যাখ্যাতীত ঘটনার সম্মুখীন হন।
মোনাস্তেরো ডি সন্ত আন্না
এবার বলি মোনাস্তেরো ডি সন্ত আন্না নামে সুবিশাল গির্জার কথা।
ইটালির পেরুগিয়া প্রদেশের প্রাচীন শহর ফোলিগনোর এই বিশাল বাড়িটি নিয়েও অনেক ভৌতিক কথা শোনা যায়। এই সেই ভৌতিক স্থান, যেখানে আপনি গিয়ে যদি রাত কাটান, তাহলে হয়তো শুনতে পাবেন সিস্টার তেরেসা মার্গারিটা গেস্তার বুকফাটা হাহাকার।
শুধু শুনতেই পাবেন না, দেখতে পেলেও পেতে পারেন তাঁর অধস্তন সিস্টার আন্না ফেলিক্সের ঘরের দরজায় কারও অগ্নিদগ্ধ হাতের ছাপ। ওই দগ্ধহাত আসলে সিস্টার তেরেসা মার্গারিটা গেস্তারই। আর তা দেখলে শুধু আপনি কেন, যে কারও শরীর-মন ছমছম করে উঠবেই।
সিস্টার তেরেসা মার্গারিটা গেস্তার কথা বলব, তার আগে গির্জাটির কথা একটু বলা যাক। একেবারে প্রথম দিকে সেখানে পাঁচটি গির্জা ছিল। সেগুলির মধ্যে মোনাস্তেরো ডি সন্ত আন্নাই হল সেই গির্জা, যেটি এখনও টিকে রয়েছে। আর সেই গির্জার নামেই এখানকার রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।
তবে গির্জাটির বর্তমান বা আধুনিক রূপ আগে ছিল না। ষোলো শতকে গির্জাটির সংস্কার করা হয়। তখনই এই খ্রিস্টান মঠের নয়া কাঠামো তৈরি হয়। সেই সময়ই সেখানে দু-টি কাঠের তৈরি বহুবর্ণের মূর্তি বসানো হয়। মূর্তি দু-টিতে যেমন বিভিন্ন রং ছিল, তেমনই সুন্দর ছিল তার শিল্পসুষমা। মূর্তি দু-টির একটি হল ম্যাডোনার, অপরটি হল সেন্ট আন্নার।
তারপর ১৫৬৫ সাল থেকে ১৭৯৭ সাল পর্যন্ত দুই শতাব্দী ধরে আরও বেশ কয়েকটি বিখ্যাত চিত্র গির্জার দেওয়ালে লাগানো হয়েছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি ছবি ছিল গির্জার সন্ন্যাসিনীদের পাওয়া উপহার। অনেক ছবি ছিল ফেলিগনোর। গির্জার দেওয়ালে সেই ছবিগুলির অনেকগুলি এখনও রয়েছে। ছবিগুলি দেখলে গির্জার প্রাচীনতা অনুমান করা যায়।
১৭২৯ সালে গির্জাটির একাংশের ফের সংস্কার হয়। তবে যত বার সংস্কার হয়েছে, কোনো বারই মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে গির্জাটির মূল স্থাপত্যরীতি বা শিল্প এখনও পুরোপুরি অক্ষত রয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে থেকে গিয়েছে পনেরো শতকের ফেলিগনোর চিত্রকরদের ছবি। আর গির্জার কাঠামোয় যেটুকু নষ্ট হয়েছে, তা কালের নিয়মে।
আবার ফিরে আসা যাক সিস্টার তেরেসার কথায়। বড়ো রহস্যময় এই সন্ন্যাসিনীর কাহিনি। তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে যেটুকু জানা গিয়েছে, তা তাঁর সন্ন্যাসজীবনেরই কথা। খুব ধার্মিক ছিলেন তিনি। তাঁর ধর্মাচরণে কোনো ফাঁক বা ফাঁকি ছিল না।
সেই সিস্টার তেরেসা মার্গারিটা গেস্তা ১৮৮৫ সালের ৪ নভেম্বর এখানেই মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল বাষট্টি। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ বলে তখন উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবু তাঁর মৃত্যু রহস্যজনক বলে মনে করা হয়। কারণ, তাঁর মৃত্যুর পর এই গির্জার প্রকৃতি আকস্মিকভাবে অনেকটাই বদলে যায়।
সন্ন্যাসিনী হিসেবে তিনি চৌত্রিশ বছরের ধর্মীয়জীবন কাটিয়েছিলেন। বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, এই বাড়িটিতে নাকি তাঁর কান্নার আওয়াজ এখনও শোনা যায়। যে ঘরে তিনি বাস করতেন, সেই ঘরটিই নাকি রাতের দিকে আতঙ্কের হয়ে ওঠে। সেখানে এখনও নাকি সেই সিস্টার তেরেসা মার্গারিটা গেস্তার অশান্ত প্রেত ঘুরে বেড়ায়।
কিন্তু মৃত্যুর এত বছর সন্ন্যাসজীবন কাটানোর পরেও কেন তাঁর আত্মা এত অতৃপ্ত? এর জবাবও রয়েছে তথ্যানুসন্ধানীদের কাছে। তাঁদের মতে, মৃত্যুর আগে ওই সন্ন্যাসিনীকে ভয়ংকর যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। তাই মৃত্যুর পরেও তাঁর আত্মাকে কাঁদতে শোনা যায়।
কিন্তু মৃত্যুর সময় কী যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন তিনি? কেন ভোগ করেছিলেন? এখনও যেন ওই গির্জার রাতগুলি সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে চলে।
মনিয়েরো দেল্লা রোত্তা
তোরিনোকেই অতিপ্রাকৃত শক্তির দিক থেকে পৃথিবীর অতিসক্রিয় স্থান হিসেবে মনে করা হয়। এখানেই রয়েছে মনসেলিয়ারি বলে একটি শহর। এই শহরের বিশাল একটি প্রাচীন মধ্যযুগীয় অট্টালিকার নাম ক্যাস্তেলো দেল্লা রোত্তা।
এটি আসলে একটি দুর্গ। রাতের দিকে এই বহু পুরোনো দুর্গটিকে দেখলেই কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয়। একসময় দুর্গটি যে মানুষের আনাগোনায় জমজমাট ছিল, আজ দেখে বোঝার উপায় নেই। দুর্গটি ছিল বেসরকারি মালিকানার। এখন পরিত্যক্ত।
এই নির্জন দুর্গে ঢুকলেই সকলেরই কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়। সারা শরীর ছমছম করে ওঠে। অস্বস্তি হয়। কেমন যেন ভয় ভয় করে। রাতের দিকে এই দুর্গ ও তার চত্বর নাকি বদলে যায়। এমন অস্বাভাবিক প্রকৃতির কথা বিবেচনা করে ইটালির সবচেয়ে ভয়ংকর ভৌতিক স্থানগুলির তালিকায় রাখা হয়েছে এই মনিয়েরো দেল্লা রোত্তা ডি মনসালিয়েরি ক্যাসলকে।
বহু ব্যক্তিই ওই দুর্গে অনেক অস্বাভাবিক দৃশ্য বা ঘটনা দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন। তাঁদের দাবির সত্যতা যাচাই করতে অনেক অত্যুৎসাহী সেখানে অভিযানও চালিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই সেই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলি স্বীকার করে নিয়েছেন। অনেকে আবার সেই সব ঘটনার সম্মুখীন না হলেও সেখানে অস্বাভাবিক কিছুর উপস্থিতি থাকার বিষয়টি অনুভব করেছেন।
সেই সব ঘটনার মধ্যে একটি ছিল এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসীকে কেন্দ্র করে। কোনো কোনো রাতে এই দুর্গে নাকি সেই সন্ন্যাসীকে এখনও দেখা যায়। রীতিমতো অস্বাভাবিক চেহারার সন্ন্যাসীটির পোশাক দেখলে এখন খুবই অদ্ভুত মনে হবে। তাঁর পরনে থাকে ক্রুসেডের সাজ। তিনি যেন ওই পোশাকে সজ্জিত হয়ে ধর্মযুদ্ধে অংশ নিতে চলেছেন।
এই একুশ শতকে ওই পোশাকে কোনো সন্ন্যাসীকে দেখলে ভিরমি তো খেতে হবেই। মনিয়েরো দেল্লা রোত্তায় যাঁরা সেই সন্ন্যাসীকে দেখেছেন, তাঁরাই চমকে উঠেছেন। তাঁদের ওই সন্ন্যাসীকে ভয়ংকর ক্রুদ্ধ মনে হয়েছে। সন্ন্যাসীকে দেখে তাঁদের সকলেরই মনে হয়েছে, তাঁর দৃষ্টিসীমার মধ্যে পড়ে গেলে যে-কারও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তবে তাঁদের কেউই এখনও ওই অতিপ্রাকৃত সন্ন্যাসীর রোষানলে পড়েননি।
এ ছাড়াও ওই দুর্গ এবং দুর্গ চত্বরের রাস্তায় নাকি আরও অনেক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায় রাতের আঁধারে। দেখা যায় নাইট, মহিলা, জুয়াচোর এবং ফাঁসিতে ঝুলে থাকা কিছু অদ্ভুত মানুষকে। দুর্গ ও দুর্গ চত্বরে এমন বিচিত্র ব্যক্তিদের দেখলে যে-কারও সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাবেই। সম্পূর্ণটা যেন কোনো এক সময়ের জীবনযাত্রাকে এই সময়ে এনে হাজির করে!
এই অদ্ভুত ব্যক্তিদের নানা রূপে সেখানে দেখা যায়। হয় তারা মনিয়েরো দেল্লা রোত্তার মধ্যেই থাকে অথবা ব্যস্তভাবে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অনেকে নাকি মনসেলিয়েরির দিকে হেঁটে যায়। অনেককে শহরের দিকে দশ কিলোমিটার দীর্ঘ নোংরা রাস্তা ধরে যেতেও দেখা যায়। এক সময়ের দৃশ্যকল্প যেন সেই সময় অভিনীত হয় সেই অঞ্চলজুড়ে। বিষয়টি যেমন রহস্যময় তেমনই রোমাঞ্চেরও বটে।
ভেনিসের পোভেগ্লিয়া আইল্যাণ্ড
যাঁরা ভেনিসের পোভেগ্লিয়া দ্বীপটিতে গিয়েছেন, তাঁরা সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন, এই দ্বীপটি নি:সন্দেহে রহস্যময়। দ্বীপটির অস্বাভাবিকত্ব সেটিকে ভৌতিক স্থান হিসেবে রহস্যপ্রিয় মানুষের কাছে বিখ্যাত করেছে। শুধু তাই নয়, এটি আসলে ঝিলমিল দ্বীপের মার্জিত সংস্করণ ও অনেক সুন্দর।
একথা নিশ্চিতভাবেই বলে দেওয়া যায়, সারা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ভৌতিক স্থানগুলির মধ্যে এই দ্বীপ অন্যতম। রহস্যপ্রিয় পর্যটকরা ভৌতিক রহস্যের স্বাদ পেতে এই দ্বীপে যান। ইটালিতে জলপথে যখন নৌকোয় সেই দ্বীপে কেউ যান, তখন সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও তারিফ করে থাকেন।
দ্বীপ নিয়ে যে রহস্যের কথা শোনা যায়, তা যেমন বিতর্কিত তেমনই ভীতিপ্রদ। কারণ এই দ্বীপের রহস্য কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ভবন, প্রাসাদ বা দুর্গের নয়। সেই রহস্য পুরো দ্বীপটিতে মৃত্যুর মিছিল নিয়েই। অনেকে তাই দ্বীপটিকে মৃত্যুর উপত্যকা বলেও উল্লেখ করে থাকেন।
শোনা যায়, একসময় প্লেগ মহামারি হিসেবে দেখা দেওয়ায় এক লক্ষ ষাট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এই দ্বীপে। তাদের কবর দেওয়া হয়েছিল এখানেই। তাই বলা হয়ে থাকে, এই দ্বীপের অর্ধেক মাটিতেই তাদের দেহাবশেষ মিশে রয়েছে। তাদের অতৃপ্ত আত্মা এখনও নাকি এই দ্বীপে ঘুরে বেড়ায়।
আজও নাকি এই দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে প্লেগে আক্রান্ত সেই সব মৃত মানুষের কঙ্কালের অংশবিশেষ দেখতে পাওয়া যায়। বাইরে থেকে আসা পর্যটকরা নাকি এই দ্বীপে ঘোরাফেরা করার সময় অনুভব করেন, তাঁরা যেন একা নন, তাঁদের সঙ্গে আরও অনেকেই যেন চলেছে, অথবা তাঁদের চারপাশে আরও অনেকেই রয়েছে। অথচ তাদের কাউকেই দেখতে পাওয়া যায় না।
শুধু প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের কাহিনিতেই সীমাবদ্ধ নয় এখানকার ইতিহাস। রয়েছে আরও অনেক নির্লজ্জ কাহিনি। তাই এখানকার মূল বাসিন্দাদের দুঃখকষ্টের ইতিহাস বা ঐতিহ্য যেন এই দ্বীপের সর্বত্র লুকিয়ে রয়েছে। একসময় এই অঞ্চল বর্বরদের জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিচিত ছিল যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে, যেখানে প্রতিমুহূর্তে গোলাগুলি চলত।
পরাজিত সেনাদের এই অঞ্চলে আটক করে রাখা হত। তাদের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হত। পরে একসময় তাদের পুড়িয়ে মারা হত।
আরও অনেক নিষ্ঠুর কাহিনি আছে এই দ্বীপের। বিউবোনিক প্লেগ আক্রান্তদের চিহ্নিত করে এই দ্বীপে আলাদা করে রাখা হত। বিউবোনিক প্লেগ হল তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে একসময় সারা পৃথিবীতেই বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া মানসিক ভারসাম্যহীনদেরও এই দ্বীপে এনে ছেড়ে দেওয়া হত। এই দ্বীপের কথা বলতে গেলে শেষপর্যন্ত যে কথাগুলি অভিজ্ঞ মানুষেরা উল্লেখ করে থাকেন তা হল—এই দ্বীপ হল তেমনই একটি স্থান, যেখানে কেউ গেলে তার অস্বস্তি হবে, একটা ভয় ভয় অনুভূতি হবে। কারণ হিসেবে এই দ্বীপ নিয়ে কথিত একটি কাহিনির কথা বলা যায়।
ওই কাহিনিতে জড়িয়ে রয়েছে এক ধর্ষকামী চিকিৎসকের কথা, যে অন্যকে দুঃখকষ্ট বা যন্ত্রণা দিয়ে নিজে আমোদ উপভোগ করত। আবার কাউকে অস্বস্তি বা অসম্মানে পড়তে দেখলে খুশি হত। ওই চিকিৎসক নাকি তার কাছে আসা রোগীদের নিয়ে ভয়ংকর সব পরীক্ষানিরীক্ষাও চালাত। চিকিৎসকটির মেধা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না।
ওই চিকিৎসক নাকি তার কাছে আসা মানসিক ভারসাম্যহীনদের ওপর হাতুড়ি, নখ, ড্রিলস এবং বাটালি দিয়ে বীভৎস শারীরিক অত্যাচার চালাত। শুধু তাই নয়, ওই চিকিৎসকটি একটি রহস্যজনক পরীক্ষাও চালিয়েছিল হাসপাতালের মাথায় যে ঘণ্টা রয়েছে, সেখানে।
সেখানে মানসিক ভারসাম্যহীনদের নিয়ে যেত। সারারাত জাগিয়ে রাখত। সেখানে অশুভ অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব পড়ত ওই মানসিক ভারসাম্যহীনদের ওপর। তারা সারারাত ভয়ে, যন্ত্রণা এবং হতাশায় চিৎকার করত। তাদের সেই চিৎকার নাকি এখনও এই দ্বীপে মাঝে মাঝে শোনা যায়।
কিন্তু হিতে বিপরীত হয়। সেই অশুভ শক্তির প্রভাব ক্রমশ চিকিৎসকের ওপরই পড়তে শুরু করে। শোনা যায়, সেই শক্তি নাকি চিকিৎসককে নানাভাবে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। চিকিৎসক ক্রমশ নিজের মানসিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করে।
একসময় হাসপাতালের মাথায় যেখানে ঘণ্টা বঁাধা রয়েছে, সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে ওই চিকিৎসক। একদিন যেখানে চিকিৎসকটি চিকিৎসা ও পরীক্ষার নামে মানসিক ভারসাম্যহীনদের ওপর অত্যাচার করত, পরে সেই নৃশংসতার শিকার হয় নিজেই।
ওই চিকিৎসকের মৃত্যুর পরই হাসপাতালটিও নাকি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু দ্বীপে নতুন উপসর্গ দেখা দেয়। সেই থেকে কোনো কোনো রাতে ওই দ্বীপে সেই চিকিৎসক ও অন্য মানসিক ভারসাম্যহীনদের চিৎকার শোনা যায়। অস্বাভাবিক সেই চিৎকার! রাতের অন্ধকার ভেঙেচুরে দিয়ে যখন ওই চিৎকার বাতাসে ভেসে আসে, তখন অনেকেরই মেরুদন্ড দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যায়।
বিশেষ করে সেই পরিত্যক্ত হাসপাতালটিতে গেলে অনেক অস্বাভাবিক কিছুর উপস্থিতি অনুভব করেন অনেকেই। অনেকের ধারণা তারা আর কেউ নয়, হাসপাতালের সেই চিকিৎসক ও মানসিক ভারসাম্যহীনদেরই অশরীরী উপস্থিতি এখনও অনুভব করা যায়।
ওর্তো বোতানিকো কমুনালে ডি লুকা
ইটালির ভৌতিক স্থানগুলির মধ্যে এই বোটানিক্যাল গার্ডেন অত্যন্ত সুন্দর একটি জায়গা। এই গার্ডেনের একটি প্রচলিত ইটালীয় নাম ছিল ‘ওর্তো বোতানিকো কমুনালে ডি লুকা’।
বাগানটির ঠিকানা হল ভিয়া দেল গিয়ারডিনো বোতানিকো, ১৪ লুকা, ইটালি। শহর থেকেই এই বাগানটি পরিচালিত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে এই বাগানটি সর্বসাধারণের জন্য প্রত্যেক দিনই খোলা থাকে। অন্য সময়ে কেবল কাজের দিনগুলিতেই সকাল বেলা এই বাগানে প্রবেশ করা যায়। তবে বাগানে ঢুকতে হলে প্রবেশমূল্য দিতে হয়।
বাগানটি তৈরির সময়কাল এবং মালিকানা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। তার একটি হল, বাগানটি ১৮২০ সালে তৈরি করেছিলেন পারমার ডাচেস মারি লুসি। মারি লুসি ছিলেন অস্ট্রিয়ার সম্রাটের মেয়ে। তাঁর জম্ম ১৭৯১ সালের ১২ ডিসেম্বর ভিয়েনায়।
১৮১৪ সাল থেকে পারমার ডাচেস হিসেবে তিনি রাজত্ব করেছিলেন। তিনি ছিলেন নেপোলিয়ানের দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৮১০ সাল থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ফরাসি সম্রাজ্ঞী ছিলেন। ইটালির পারমায় ১৮৪৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
সবুজ গাছপালা এবং উদ্ভিদবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ ছিল অপরিসীম। তাই সেখানে প্রচুর পরিমাণে নানা ধরনের গাছ লাগিয়েছিলেন। বাগানের আকৃতি ছিল অনেকটা ত্রিভুজাকৃতির। বাগানের এক কোণে ছিল নগরপ্রাচীর। পুরো বাগানটিকে প্রাচীরটি দু-টি প্রধান ভাগে ভাগ করেছিল।
এক ভাগে ছিল উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে চর্চা করার উপযোগী বিভিন্ন গাছপালা, পুকুর এবং ছোটো ছোটো প্রচুর গাছ। অন্য ভাগে ছিল গ্রিন হাউস, উদ্ভিদতত্ত্বের স্কুল এবং গবেষণাগার।
এই বাগান নিয়ে আরেকটি কাহিনিও প্রচলিত। যেমন এই বাগানটি ছিল নাকি বিখ্যাত লুসিডা মানসির। এখন প্রশ্ন হল, কে এই লুসিডা মানসি? লুসিডা মানসি ছিলেন ফ্রান্সের একজন অভিজাত পরিবারের নারী। তাঁর বাবার নাম ছিল লুচিসে নোবলস। তাঁর জন্ম ১৬০৬ সালে লুকায়। মৃত্যু ১৬৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।
তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে এটুকু জানা যায়, তিনি ইটালির লুকা প্রদেশের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এক মহিলা ছিলেন। লুসিডা তাঁর চেয়ে অনেক ছোটো ভিনসেঞ্জো ডাইভার্সিকে বিয়ে করেন। তবে সেই বিয়ের অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ভিনসেঞ্জোর রহস্যমৃত্যু হয়।
অল্পবয়সে বিধবা হলেও লুসিডার কোনো দুঃখ ছিল না। তিনি তখন এক বৃদ্ধকে বিয়ে করেন। তাঁর নাম ছিল গ্যাসপার ডি নিকোলাও মানসি। বৃদ্ধ হলেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট বিত্তবান। মানসি পরিবারও ছিল যথেষ্ট বিত্তশালী।
ষোলো শতকের আগে সিল্কের ব্যাবসায় যথেষ্ট সফল হয়ে গ্যাসপার ইউরোপে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তবে লুসিডা এবং গ্যাসপারের বিয়ে নিয়ে নানা মহলে অনেক গসিপ শোনা গিয়েছে। কারণ, দু-জনের বয়সের ব্যবধান এতটাই বেশি ছিল যে, তাঁরা বিয়ে করতে পারেন বলে কেউ ভাবতে পারেননি।
গ্যাসপার যেমন অত্যধিক ধনী ছিলেন, তেমনই লুসিডা ছিলেন অনেক আকর্ষণীয়া। শোনা যায়, লুসিডার রূপমুগ্ধ ছিলেন ধনী গ্যাসপার। আর লুসিডা মুগ্ধ ছিলেন গ্যাসপারের বিত্তে।
ধনীপতির স্ত্রী হওয়ায় লুসিডা অনেকসময়ই অর্থহীন সব কাজে ব্যস্ত থাকতেন। শোনা যায়, নিজের রূপে তিনি নিজেই এত মুগ্ধ এবং অহংকারী ছিলেন যে, মানসি ভিলার একটি বিশাল ঘর আয়না দিয়ে ভরিয়ে রেখেছিলেন যাতে ঘরের চারদিকে শুধু তাঁকেই দেখা যায়। তাই তিনি যখন সেই ঘরে ঢুকতেন, তখন চারদিকে তিনিই উদ্ভাসিত হয়ে উঠতেন।
গ্যাসপারকে বিয়ে করলেও নিত্যনতুন পুরুষে নাকি আসক্তি ছিল লুসিডার। অসম্ভব সুন্দরী হলেও তিনি নাকি নিষ্ঠুর প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। বৃদ্ধকে বিয়ে করলেও নিজের চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো ছেলেদেরই তিনি খুব পছন্দ করতেন।
তাদের নিয়ে বিছানায় খেলা করতে ভালোবাসতেন। তাঁর এমন প্রেমিকের সংখ্যা ছিল অনেক। এমন দুশ্চরিত্রা স্ত্রীকে যেকোনো স্বামীই সহ্য করবেন না তা স্বাভাবিক। কিন্তু লুসিডাকে বাগে আনা সহজ নয়। শোনা যায়, লুসিডা নিজের প্রেমজীবন অক্ষত রাখতে সেই বিত্তবান স্বামীকেই খুন করেন।
শোনা যায়, প্রেমিকদেরও তিনি বঁাচতে দিতেন না। যেহেতু তারা তাঁর চেয়ে অল্পবয়সি প্রেমিক, তাই অল্পবয়সি মেয়েদের দিকে তারা যেন আকর্ষিত না-হয় তাই তাদের তিনি মেরে ফেলতেন।
তাঁর হনন প্রক্রিয়াও ছিল অভিনব। যেমন, যে প্রেমিককে তিনি খুন করবেন বলে ঠিক করতেন, আগের রাতে তার সঙ্গে বিছানায় যেতেন। উদ্দাম যৌনতায় মেতে উঠতেন। তারপর সেই প্রেমিকটিকে তিনি অনেক উঁচু জায়গায় নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে একটি পরিখায় ছুড়ে ফেলে দিতেন।
পরিখাটি ধারালো ব্লেডে ভরা থাকত। প্রেমিকটিও সেখানে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ছটফট করতে করতে মারা যেত। আর তা দেখে তিনি তৃপ্তি পেতেন!
নিজের যৌবন ধরে রাখতে তিনি মরিয়া ছিলেন। কথিত আছে, যখন তাঁর ত্রিশ বছর বয়স, তখন থেকেই নিজের সৌন্দর্য যাতে নষ্ট হয়ে না-যায়, সেইজন্য তিনি নিজের আত্মা নাকি শয়তান বা অশুভ শক্তির কাছে বিক্রি করে দিতেন। বিনিময়ে সেই শক্তি নাকি তাঁকে ত্রিশ বছরের যৌবন অটুট থাকতে দিত।
শোনা যায়, বিশেষ দিনে বোটানিক্যাল গার্ডেনের লেকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যদি কোনো পর্যটক সেই লেকের জলে নিজের মুখের প্রতিবিম্ব দেখার জন্য ঝোঁকে, তাহলে সেনাকি লুসিডারই অভিব্যক্তি দেখতে পায়। ঠিক যেভাবে লুসিডা আয়নায় ভরা সেই বিশাল ঘরে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতেন, তেমনই লুসিডার অভিব্যক্তি দেখতে পাবেন সেই পর্যটক!
অনেকে বিশ্বাস করেন, পূর্ণিমার রাতে যদি সেই বাগানে কেউ যান, তাহলে তিনি অস্বাভাবিক অনেক দৃশ্য দেখতে পাবেন। যেমন অনেকে নাকি বাগান দিয়ে একটি জ্বলন্ত গাড়িকে ছুটে চলে যেতে দেখেছেন। এ ছাড়া অনেক অস্পষ্ট ছায়াশরীরকেও দ্রুত গতিতে যাতায়াত করতে দেখেন অনেকে।
মোনাস্তেরো সন্ত রাডেগোণ্ডা
ভৌতিক স্থান হিসেবে মোনাস্তেরো সন্ত রাডেগোণ্ডা বেশ পরিচিত একটি জায়গা। এই স্থানটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি দীর্ঘ বিতর্কিত কাহিনি। সেই কাহিনিতে রয়েছে বিখ্যাত ভিসকন্তিদের কথা। এই পরিবারেরই মেয়ে ছিল বার্নার্ডা। তার অপর নাম ছিল বেরোয়ার্ডা। এখানকার ভৌতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই বার্নার্ডা বা বেরোয়ার্ডার কাহিনি।
চোদ্দো শতকের দ্বিতীয় ভাগের কথা। বিখ্যাত বার্নাবো ভিসকন্তির অবৈধ সন্তান ছিল বার্নার্ডা। এই বার্নার্ডাই বিয়ে করেছিল বেরগামোর গিওভান্নি সুয়ার্ডিকে। স্বামী ছাড়াও তার একটি গোপন প্রেমিকও ছিল। সেই প্রেমিককে নিজের স্বামীর সঙ্গে দেখে চমকে গিয়েছিল সে। ঘটনাটা যে একটা বড়ো ধরনের ষড়যন্ত্র তা বুঝতে বার্নার্ডার অসুবিধে হয়নি।
এখানেই শেষ নয়। বার্নার্ডার সম্পর্কে আরও অনেক কাহিনি শোনা যায়। যেমন মঠের মধ্যেই নিজের সম্পর্কে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সেবহু বার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। তীব্র চিৎকার করেছে। তবু নিজের কাজের জন্য কোনোরকম অনুতাপ হয়নি তার।
আবার বোলোগনা এবং ফ্লোরেন্সেও তাকে ভিন্ন ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। কখনো তাকে দেখা গিয়েছে একজন গণিকা হিসেবে। আবার কখনো বিয়ের পাত্রী হিসেবেও সেহাজির হয়েছে। যা-ই হোক, ব্যভিচারের অভিযোগে রোচেত্তা ডি পোর্তা নুওভার একটি জেলে বন্দি ছিল সে। সেখানকার একটি ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছিল তাকে। এটাই ছিল তার শাস্তি।
পোর্তা নুওভা হল ইটালির একটি অন্যতম প্রধান বন্দর। মিলানের দেওয়ালের মধ্যযুগীয় বিন্যাসে এই বন্দরের অবস্থান। ১৩৩০ সাল থেকে ১৩৩৯ সালের মধ্যে এই বন্দরে যুক্ত হয়েছিল খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ম্যাডোনা ও শিশুর মার্বেলের মাজার। তখন বেশ নামডাক ছিল এই বন্দরের। এখানকারই কারাগারে বন্দি ছিল বার্নার্ডা।
বন্দি অবস্থায় দীর্ঘ সাত মাস জল আর রুটি খেয়ে কাটিয়েছিল বার্নার্ডা। তারপর সেখানেই সেমারা যায়। তখন থেকেই সন্ত রাডেগোণ্ডা গির্জার মঠের মধ্যে বার্নার্ডাকে নাকি হামেশাই দেখা যেতে থাকে। অনেক পর্যটক নাকি সেখানে তাকে দেখেছেন। কাহিনির এখানেই শেষ নয়, বার্নার্ডার স্বামীরও অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় সেখানে।
বলা হয়ে থাকে যে, সন্ত রাডেগোণ্ডার মঠে বার্নার্ডার স্বামীর প্রেতকেও ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। পোর্তা রোমানার দরজার কাছে ছিল রোচেত্তা ডি পোর্তা নুওভা। এখনও শীতের বা ঝড়জলের নির্জন রাতগুলিতে মোনাস্তেরো সন্ত রাডেগোণ্ডায় পরিবেশ বেশ ভারী হয়ে ওঠে। সেখানে বেরোয়ার্ডা বা বার্নার্ডা, তার স্বামী-সহ আরও অনেক অশরীরীর অস্বাভাবিক আচরণের সাক্ষী নাকি অনেকেই হয়েছেন। তাই তেমন দিনগুলিতে কেউই সাধারণত মোনাস্তেরো সন্ত রাডেগোণ্ডায় যাওয়ার কথা ভাবেন না।
পারমার ক্যাস্তেলো ডি বার্ডি
এবার বলা যাক বার্ডি দুর্গের কথা। এই দুর্গ সম্পর্কে অনেক কথা শোনা যায়। সেইসব কথা বা কাহিনি যা-ই বলুন, সেগুলির জন্যই ইটালির বিখ্যাত ভৌতিক স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম বলে পারমার এই ক্যাস্তেলো ডি বার্ডি বা বার্ডি ক্যাসলের কথা অনেকে উল্লেখ করে থাকেন।
এই বার্ডি দুর্গের সঙ্গেও অন্যান্য কাহিনির পাশাপাশি জড়িয়ে রয়েছে প্রেম সংক্রান্ত একটি মর্মান্তিক কাহিনিও। চোদ্দো শতকের ওই প্রেমকাহিনি আজও ইটালীয়দের মুখে মুখে ফেরে। সেই গল্পটিই এখানে বলা যাক।
অল্পবয়সি এক অফিসার মোরোয়েল্লো গভীর প্রেমে পড়ে যায় সোলেস্তে নামে এক সুন্দরীর। সুন্দরী মেয়েটির রূপই শুধু অসাধারণ ছিল তা নয়, সেই রূপসি ছিল এক সভ্রান্ত পরিবারের মেয়েও। দুজনের প্রেম গভীর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে তাদের সেই প্রেম বেশ গোপনীয় ছিল।
কারণ, আর্থিক দিক থেকে অফিসারটি মোটেও ধনী ছিল না। তাই বিত্ত বা মর্যাদায় সোলেস্তের সমকক্ষ ছিল না মোরোয়েল্লো নামে ওই অফিসার। তারা বুঝেছিল, শুধুমাত্র এই কারণেই মেয়েটির পরিবার তাদের দুজনের প্রেম মেনে নেবে না এবং বিয়ে করারও অনুমতি দেবে না।
এরপর ঘটল সেই ঘটনা। ওই তরুণ অফিসার ব্যস্ত ছিল যুদ্ধে। আর সোলেস্তে সেই দুর্গে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সেভাবেই কেটে গেল বেশ কয়েক সপ্তাহ। একদিন সোলেস্তে অবাক হয়ে দেখল, কিছু সশস্ত্র সেনা চিৎকার করতে করতে সেই দুর্গে ঢুকে এল। তারা শত্রুপক্ষের বিজয়পতাকা বয়ে এনে দুর্গের মাথায় লাগিয়ে দিল।
সেনাদের আচার-আচরণ, অঙ্গভঙ্গি বা উদ্দেশ্য সোলেস্তে কিছুই বুঝতে পারল না। সেভাবল যুদ্ধে হয়তো তার প্রেমিক নিহত হয়েছে, সেইজন্যই হয়তো সেনারা সকলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। সেই শোক সামলাতে পারল না সোলেস্তে। দুর্গের খুব উঁচু একটি প্রাচীরে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করল।
কিন্তু একসময় মোরোয়েল্লো দুর্গে ফিরে এল। জানতে পারল তার প্রেমের করুণ পরিণতির কথা। ব্যাপারটা সহ্য করতে পারল না সে-ও। সোলেস্তের এমন আত্মহত্যা তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করল। সেসিদ্ধান্ত নিল, সোলেস্তে যে পথে গিয়েছে, সে-ও তা-ই করবে।
যেমন ভাবা তেমনই কাজ। দুর্গের সুউচ্চ টাওয়ারগুলির মধ্যে একটি থেকে সে-ও নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর এভাবেই শেষ হয়ে গেল বার্ডি ক্যাসলের মোরোয়েল্লো-সোলেস্তে প্রেমকাহিনি।
কিন্তু কাহিনির সমাপ্তি ঘটলেও তাদের প্রেম কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? বোধ হয় না। কারণ, তারপর থেকেই দুর্গটির পরিবেশ কেমন যেন বদলে যায়। প্রায় প্রতি রাতেই নাকি ভারী হয়ে যায় সেখানকার পরিবেশ। সেই তরুণ অফিসার মোরোয়েল্লোকে সেখানে দেখা যেতে থাকে।
মৃত মানুষকে রাতে দেখা যাওয়ার অর্থ অননুমেয় নয়। যাঁরা দেখেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই বলেছেন, মোরোয়েল্লো পাগলের মতো দুর্গ জুড়ে কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়। বুঝতে অসুবিধে হয় না, সেখোঁজে তার সেই সুন্দরী প্রেমিকা সোলেস্তেকে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, যে সোলেস্তের সঙ্গে মিলিত হবে ভেবে মোরোয়েল্লো আত্মহত্যা করেছিল, মৃত্যুর পর কি তাহলে দু-জনে মিলিত হতে পারেনি? আর তাই কি মোরোয়েল্লোর অতৃপ্ত আত্মা এভাবেই প্রতি রাতে সোলেস্তেকে দুর্গে খুঁজতে থাকে? তা হলে প্রশ্ন হল, সোলেস্তের আত্মা কোথায় গেল?
তারপর অনেক সময় পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু মোরোয়েল্লোর আত্মা এখনও নাকি অতৃপ্ত! এখনও নাকি প্রায় রাতেই ওই দুর্গে সোলেস্তেকে পাগলের মতো খুঁজতে দেখা যায় মোরোয়েল্লোকে। স্বাভাবিক কারণেই এই কাহিনি উৎসাহিত করেছিল ইটালীয় ঘোস্টবাস্টারদের। তাঁরা সেই দুর্গে অভিযান চালিয়েছিলেন।
তবে তাঁরা দিয়েছিলেন অন্য তথ্য। টানা বেশ কয়েক রাত তাঁরা সেই দুর্গে কাটান। অত্যাধুনিক ক্যামেরার সাহায্যে প্রচুর ছবি তোলেন। সেই ছবির কথা জানিয়ে তাঁরা বলেন, তাঁদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে খ্রিস্টান যাজকের ছবি। কিন্তু তরুণ দুর্ভাগা প্রেমিকটির কোনো ছবি তাঁদের ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
খ্রিস্টান যাজকের ছবি তাঁদের ক্যামেরায় ধরা পড়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। কারণ বার্ডি ক্যাসলে শুধু মোরোয়েল্লো-সোলেস্তেই নয়, ওই যাজক-সহ আরও অনেকেরই অপমৃত্যু ঘটেছে। তাই ওই দুর্গকে বহু মৃত মানুষের আত্মার বিচরণক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে।
কিন্তু ঘোস্টবাস্টারদের দাবি মানতে নারাজ অনেক মানুষই। তাঁদের দাবি, ওই দুর্গে নাকি এখনও ঘুরে বেড়ায় মোরোয়েল্লোর অতৃপ্ত আত্মা। তবে তার প্রেমিকা সোলেস্তের আত্মাকে তারা কেউই দেখেনি। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি আজও।
লুগারিয়ার কাসা দেল ভায়োলিনো
লিগুরিয়া হল একটি উপকূলীয় অঞ্চল। ইটালির উত্তর-পশ্চিম অংশে এই অঞ্চলটির অবস্থান। সেখানকার একটি অংশ স্কোগনা সোত্তানার একটা ছোটো গ্রাম বলা চলে লিগুরিয়াকে। লা স্পেজিয়ার খুব কাছাকাছিই গ্রামটি অবস্থিত।
একসময় এই অঞ্চলকে বলা হত সোকোগনা। গ্রামটি বেশ পুরোনো। মধ্যযুগে হয়তো এই গ্রামটি গড়ে উঠেছিল। তবে গ্রামটি আজ জনবিরল একটি অঞ্চল বিশেষ। এখন হয়তো বড়োজোর কয়েক-শো পরিবারের বাস এখানে।
তবে এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দাই বৃদ্ধ। নির্জনতার কারণেই হয়তো এই গ্রাম সম্পর্কে অনেক কথা শোনা যায়। বলা হয়ে থাকে, এই গ্রামে রাতের দিকে কেউ গেলে তিনি হয়তো কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার মুখোমুখি হবেন।
ওই গ্রামে বেশিরভাগ বাড়িই পরিত্যক্ত। সেই পরিত্যক্ত বাড়িগুলির মধ্যে এমন একটি বাড়ি আছে, বাইরে থেকে যে বাড়িটিকে ব্যতিক্রমী কিছু বলে মনে হবে না। কেননা, ওই বাড়িটির আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই। তবু স্থানীয় মানুষ এই বাড়িটিকে এড়িয়ে চলেন।
বাড়িটিকে সেখানে সকলেই ‘ভায়োলিন হাউস’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। কারণ আগে কোনো একসময় এই বাড়িটি যন্ত্রসংগীতের মূর্ছনায় গমগম করত। বিশেষ করে বেহালার আওয়াজে ভরে থাকত বাড়িটি। আজ সেই বাড়িটিকে ইটালির অন্যতম প্রধান হন্টেড হাউস বলে মনে করা হয়।
বলা হয়ে থাকে, ১৮০০ সাল থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে এই বাড়িটিতে থাকতেন এক তরুণ সুরকার। তাঁর বেহালার হাতটি ছিল চমৎকার। তবে নিজের প্রকৃত দক্ষতা অনুযায়ী বেহালা বাজানোয় সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য তিনি পাননি। সেইজন্য তিনি প্রকৃত অনুপ্রেরণা খুঁজে বেড়াতেন। তাই যাঁরা ভালো বেহালা বাজাতে পারেন তাঁদের বাড়িতে আশ্রয় দিতেন। আর তাঁদের সঙ্গে সারা দিনে প্রায় সময়ই বেহালা অনুশীলন করতে ব্যস্ত থাকতেন।
তিনি মোটেও ধনী ছিলেন না। তাই ওই বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্য বিশেষ ছিল না। এমনকী ঠাণ্ডায় বাড়িটির মধ্যে উষ্ণতা রক্ষার উপায় ছিল না। সেই কারণে শীতকালে থাকার জন্য বাড়িটি মোটেও আরামদায়ক ছিল না।
সেই ঠাণ্ডা বাড়িতে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করলেন। শুধু তাই নয়, এক এক করে অনেকের মৃত্যুও হতে লাগল। অনুমান করা হয়, বাড়ির বাসিন্দারা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে থাকেন।
সকলে মারা গেলেও ওই বাড়িতে বেহালার সুর থেমে যায়নি। তরুণ সুরকার নিয়মিত বেহালা বাজাতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বেহালা বাজিয়ে তিনি ভবিষ্যতে একদিন খ্যাতি অর্জন করতে পারবেন। প্রচুর অর্থও উপার্জন করবেন।
তাই তিনি অনুশীলন আরও বাড়িয়ে দেন। আর এভাবেই একসময় তিনি পাগল হয়ে যান। তাঁর যে সামান্য কয়েক জন বন্ধু বেঁচে ছিলেন তখনও, তাঁরাও সেই বাড়িতে তাঁকে ফেলে রেখেই চলে যান।
এর কিছুদিন পর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। গ্রামের যে কৃষকরা তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াত করতেন, তাঁরা কেউই বেহালার সুর শুনতে পেলেন না। এভাবে কয়েক দিন কাটলে গ্রামবাসীরা বেশ বিস্মিত হলেন।
তাঁদেরই একজন সাহস করে সেই বাড়িতে গেলেন এবং সুরকারের মরদেহ আবিষ্কার করলেন। সেই সুরকার গ্রামের কারও সঙ্গে মিশতেন না। হয়তো সেটাই তাঁর স্বভাব ছিল। তিনি বেহালা নিয়েই থাকতে ভালোবাসতেন। তাই তাঁর প্রতি গ্রামবাসীদের একটা গোপন শ্রদ্ধাবোধও ছিল।
গ্রামবাসীরা ঠিক করলেন তাঁর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা তাঁরা করবেন। তাঁর বাড়ির সামনেই গ্রামবাসীরা তাঁকে কবর দেন। তাঁর নিজের বলে কেউ ছিল না। তাই সেই বাড়ির মালিকানা দাবি করার জন্য তাঁর মৃত্যুর পরও কোনো আত্মীয় বা উত্তরাধিকারী এগিয়ে আসেননি।
এর কয়েক মাস পরই অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। রাতের দিকে ওই বাড়ি থেকে ফের বেহালার সুর ভেসে আসতে শুরু করে। ওই বাড়ির পাশ দিয়ে কেউ গেলে তিনিও সেই সুর শুনতে পেতেন।
ব্যাপারটা গ্রামবাসীদের বিস্মিত করেছিল। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, হয়তো সুরকারের আত্মীয় কেউ হয়তো বাড়িটিতে এসেছেন। তিনিই হয়তো থাকতে শুরু করেছেন। তাই হয়তো বেহালা বাজানোর রেওয়াজ ফের শুরু হয়েছে।
কিন্তু তিনিও কি বেহালা বাজান? প্রশ্নটা উঠল তাঁদের মধ্যেই। পরে তাঁদের মনে সন্দেহ দেখা দিল বিষয়টা নিয়ে। কারণ, বেহালার যে সুর শোনা যেত, সেই সুরগুলিই প্রয়াত সুরকার বাজাতেন।
এটা কী করে সম্ভব? গ্রামবাসীদের মধ্যে আগ্রহী কয়েক জন ঘটনাটা কী জানতে বাড়ির ভিতরে যান। কিন্তু বাড়ির ভিতরে ঢুকে তাঁরা রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে গেলেন। দেখলেন, বাড়িতে রয়েছে সুরকারের বেহালা-সহ সব আসবাবপত্রই। তবে সেগুলি ধুলোয় ভরা। তার মানে বাড়িতে কেউ থাকে না! তাহলে বেহালা কে বাজায় এই বাড়িতে?
তারপর থেকেই বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়েই থেকে যায়। কোনো কোনো রাতে বাড়ি ও তার আশেপাশের বাতাস কেমন যেন ভারী মনে হয়। মনে হয় সেখানে যেন সেই তরুণ সুরকার রয়েছেন। তাঁর উপস্থিতি অনেকে অনুভবও করেছেন। তবে সরাসরি তাঁকে দেখতে পাননি কেউই।
আর শোনা যায় বেহালার করুণ সুর। যাঁরা এসব ঘটনার পরও ওই বাড়িতে গিয়েছেন, তাঁরা আশ্চর্য হয়ে দেখেছেন বাড়িতে সব কিছু ঠিক আগের মতোই ধুলোয় ভরা অবস্থায় রয়েছে। কেবল বেহালাটি ধুলোমাখা হলেও সেটি এমনভাবে রাখা রয়েছে, যেন কিছুক্ষণ আগে কেউ সেটি বাজিয়েছেন।
এরপর বেশ কিছুদিন বাড়িটি ফাঁকাই পড়ে রইল। কেউ বাড়িটি কেনার জন্য আগ্রহও দেখালেন না। কিন্তু ওই বাড়িতে প্রায় রাতে বেহালার সুরসৃষ্টিতে খামতি ছিল না। গ্রামবাসীরা ঠিক করেন সুরকারকে বিশেষ সম্মান জানাবেন। বেহালাটি একটি শোকেসে এবং তাঁর ব্যবহৃত সমস্ত জিনিসপত্র পরিষ্কার করে আলমারিতে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলেন তাঁরা।
তারপরও রাতে ওই বাড়িতে শোনা যেত বেহালার সুর। কিন্তু সেই বেহালায় কারও আঙুলের ছাপ দেখা যেত না। শোকেসে যেভাবে সাজিয়ে রাখা ছিল, অবিকল তেমনভাবেই থাকতে দেখা যেত বেহালাটিকে। এই আশ্চর্য ঘটনার কথা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল গোটা স্কোগনা সোত্তানায়।
এখনও বাড়িটির শোকেসে একইভাবে তালাবন্ধ রয়েছে বেহালাটি। তবে বাড়িটি এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন। আগ্রহী পর্যটকদের জন্য বাড়িটির দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকী প্যারানর্মাল বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও সেখানে যান। অনেকের পরীক্ষাতেই সেখানে অস্বাভাবিক শক্তির অস্তিত্ব ধরা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এখনও নাকি কোনো কোনো হিমেল-নির্জন রাতে ওই বাড়িতে বেহালার করুণ সুর শোনা যায়। অনেকে বলে থাকেন, তরুণ সুরকারের অতৃপ্ত আত্মা এখনও নাকি ওই বাড়িতে বাস করেন। এখনও রাতের দিকে মাঝে মাঝে তিনি সেখানে বেহালা বাজান।
মিলানের পালাজো কারম্যাগনোলা
এই প্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল চোদ্দো শতকে। এই প্রাসাদের একটি অংশ এখন ব্যবহৃত হয় থিয়েটার হিসেবে। এখানে আছে কোম্পানি এবং বিনিময় কেন্দ্রের ন্যাশনাল কমিশনের দফতরও।
কিন্তু সবচেয়ে যে বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল বেশ কয়েক জন বিখ্যাত মানুষ এই প্রাসাদকে ভৌতিক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের কথার সমর্থনও করেছেন অনেকে। জানিয়েছেন, এই প্রাসাদে নাকি নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন তাঁরা।
বাস্তবিকই এই প্রাসাদের সঙ্গে তেমন কিছু কাহিনিও জড়িয়ে রয়েছে। যেমন এই প্রাসাদে রহস্যজনক অশরীরীদের মধ্যে দু-জনকে শনাক্ত করা গিয়েছে। তাঁরা একসময় ইটালিতে খুবই পরিচিত ছিলেন।
তাঁদের একজন হলেন এই প্রাসাদের প্রকৃত মালিক। কারম্যাগনোলার কাউন্ট ফ্রান্সেসকো বুসোনে। অপরজনও রীতিমতো বিখ্যাত ও সুন্দরী মহিলা। তাঁর নাম সিসিলিয়া গ্যালারানি।
সিসিলিয়া গ্যালারানির নামটি সম্ভবত অনেকেরই জানা। এই সেই আরমিনের বিখ্যাত রূপসি, যাঁর ছবি এঁকেছিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। মনে করা হয়, সেই ছবি আঁকার সময়কাল ছিল ১৪৮৯ সাল থেকে ১৪৯০ সালের মধ্যে। সিসিলিয়ার আরও একটি পরিচয় ছিল। মিলানের ডিউক লুডোভিকো স্ফোরজার উপপত্নী ছিলেন তিনি।
মিলানের ডিউকের কাছেই চাকরি করতেন লিওনার্দো। ডিউকের অনুরোধেই নাকি তিনি কাঠের প্যানেলে তেলরঙে সুন্দরী সিসিলিয়ার ছবি এঁকেছিলেন।
পশ্চিমি দুনিয়ায় খ্রিস্টানরা ২ নভেম্বর দিনটিকে ‘আত্মাদের দিন’ হিসেবে পালন করে থাকেন। ইটালিতেও ওই তারিখে ‘অল সোল ডে’ পালিত হয়। ওই দিনটিতে পালাজো কারম্যাগনোলায় নাকি দেখা যায় ফ্রান্সেসকো বুসোনে এবং সিসিলিয়া গ্যালারানিকে।
কারম্যাগনোলার কাউন্ট ফ্রান্সেসকো বুসোনের মৃত্যুকে অপমৃত্যুই বলতে হবে। তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। তাই মৃত্যুর পরেও তিনি নিজের প্রাসাদটিকে ভুলতে পারেননি। তবে সিসিলিয়ার মৃত্যু স্বাভাবিকই ছিল। তবু এই প্রাসাদের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি তিনিও। অনেকেই তাঁদের ওই প্রাসাদে দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন।
লাভার্স হাউস— ভিলা লোমেলো
ভিলা লোমেলো পরিত্যক্ত একটি বাড়ি। অনেকেরই দাবি এই ভিলা আসলে একটি হানাবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়। সত্যি সত্যিই এই বাড়ির অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নব বিবাহিত এক দম্পতির ঈর্ষা এবং ঘৃণার কাহিনি।
সেটা ছিল ১৯১২ সালের গ্রীষ্ম। স্বামীর হবি ছিল শিকার করা। সেদিনও তিনি শিকারে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিকার থেকে ফিরেই তিনি চমকে উঠলেন। দেখলেন তাঁর ঘোড়া দেখভালের দায়িত্বে থাকা পুরুষের সঙ্গে গভীর শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত রয়েছেন নিজেরই স্ত্রী!
এমন দৃশ্য দেখলে কারই-বা মাথা ঠিক থাকে? তিনিও মেজাজ হারালেন। মাথা আগুনের গোলার মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠল তাঁর। ক্রোধোন্মাদ হয়ে তাঁদের দু-জনকেই গুলি করে খুন করলেন। তারপর বাড়ির মধ্যেই এক জায়গায় তাঁদের দু-জনকে পুঁতে দেন। কিন্তু, তারপর থেকে এই বাড়ির প্রকৃতি বদলে গেল। সেই স্ত্রীহত্যাকারী স্বামী বাড়িতে শান্তিতে থাকতে পারলেন না।
শুধু তিনি নন, পরেও ওই বাড়িতে কেউ থাকতে পারেননি। রাত্রি হলেই নাকি ওই বাড়িতে গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের শীৎকার, কখনো অস্বাভাবিক আওয়াজ, কখনো-বা কারও আর্তকন্ঠে চিৎকার শোনা যায়। কানে আসে গুলির শব্দও।
অনুভব করা যায়, কারা যেন ওই বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকেরই ধারণা, বাড়ির মালিকের স্ত্রী এবং তাঁর প্রেমিক ঘোড়ারক্ষকের অতৃপ্ত আত্মাই এখনও সারারাত বাড়িময় ঘুরে বেড়ান। সেইসময় থেকেই কেউই ওই বাড়িতে রাত কাটাতে চান না।
এখনও অধিকাংশ মানুষ ওই বাড়িটিকে এড়িয়ে চলেন। কারণ, এখনও নাকি ওই সব অস্বাভাবিক আওয়াজের পাশাপাশি অনেক অশরীরী উপস্থিতি অনুভব করা এবং কখনো কখনো তাদের দেখাও যায় ভিলা লোমেলোতে।
ভেনিসের পালাজো মাস্তেলি
পালাজো মাস্তেলি বাড়িটি অনেক পুরোনো। ইটালির ভয়ংকর ভৌতিক বাড়িগুলির মধ্যে ভেনিসের এই বাড়িটি অন্যতম বলে মনে করা হয়। কারণ হিসেবে এই বাড়ির অস্থির ইতিহাস এবং বাড়িটির রহস্যময় মালিক ও বাসিন্দাদের কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
শোনা যায়, এই বাড়িতেই নাকি থাকত খুবই ধনী তিন বণিক। তারা হল রিওবা, অফানি এবং স্যান্ডি। তবে তাদের বাণিজ্য নাকি ন্যায়সংগত ছিল না। মানুষকে ঠকিয়েই তাদের বিশাল পসার তৈরি হয়। ১১০০ সাল নাগাদ তারা তেমনই আর একটি কান্ড ঘটায়।
ওই সময় ভেনিসেরই এক নারীকে ওই তিন বণিক নাকি বিশাল দামে নিম্ন মানের কাপড় বিক্রি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিন বণিকের এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তাদের প্রতারণা ধরা পড়ে যায়।
টাকা দিলেও ওই নারী নাকি তিন বণিককে অভিশাপও দিয়েছিলেন। তাঁর অভিশাপে বণিক তিনজন নাকি পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়। তিন জনের পাথরের মূর্তিতে পরিণত হওয়াটা নিছকই একটি গল্প হতে পারে। তবে ওই ঘটনার পর তাদের বাস্তবে কী পরিণতি হয়েছিল, তা আজ জানা যায় না। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ওই তিন জনকে হয়তো সেই বাড়িতে খুন করা হয়।
সেই বিশাল বাড়িটি আজ যে-কেউ ঘুরে দেখতে পারেন। বাড়ির প্রাঙ্গণ সত্যিই সুন্দর। আর বাড়ির ভিতরে গেলে রোমাঞ্চ অনুভব হবেই। অন্তত যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা সেই দাবি করে থাকেন।
যাঁরা সেখানে রাত কাটিয়েছেন তাঁরা জানিয়েছেন, অশরীরী শক্তির উপস্থিতি তাঁরা অনুভব করেছেন। কেউ কেউ তিনটি অস্পষ্ট শরীরও দেখেছেন। অনেকেরই ধারণা, তিন বণিকের আত্মা এখনও বাড়িটিতে ঘুরে বেড়ায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন