উপমন্যু রায়
ভারত নি:সন্দেহে একটি বড়ো দেশ। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়ার পরও ভারতের বিশাল আয়তন গোটা পৃথিবীর সমীহ আদায় করে নিতে সাহায্য করেছে। আয়তনের দিক থেকে সারা পৃথিবীতে ভারতের স্থান সপ্তম। তেমনই অত্যধিক এ দেশের লোকসংখ্যা। চীনের পর ভারতই দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল দেশ।
বিশাল আয়তন ও বিপুল লোকসংখ্যা সত্ত্বেও ভারতের বহু স্থানে কিন্তু এখনও তেমন জনাধিক্য নেই। আসলে ভারতের জাতীয় সম্পদ যেভাবে সকলের কাছে সমানভাবে বন্টিত হয়নি, সেইভাবেই বিশাল দেশ হলেও ভারতের সব জায়গায় সমান জনবসতি দেখা যায় না। স্বাভাবিক কারণেই কিছু জায়গায় জনতার ভিড় বেশি। আবার কিছু জায়গা অনেকটাই জনবিরল।
তাই ভারতের বহু স্থান রয়েছে, যেগুলির পিছনে যেমন রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, তেমনই হয়তো সময়ের নিয়মেই থেকে গিয়েছে রহস্যময়। অনেক অনেক জায়গা রয়েছে, যেগুলি ঘিরে তৈরি হয়েছে রোমহর্ষক নানা কাহিনি।
বৃন্দাবন সোসাইটি, থানে, মহারাষ্ট্র
মুম্বইয়ের উন্নত এবং বিত্তবানদের জায়গা বলে পরিচিত এই বৃন্দাবন সোসাইটি। তবে এই সোসাইটির একটি বদনামও রয়েছে। আর তা রয়েছে ভৌতিক কারণে। বলা হয়ে থাকে, মুম্বইয়ের সবচেয়ে রহস্যজনক বা ভৌতিক জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম হল এই বৃন্দাবন সোসাইটি।
সেই কারণে অনেকেই রাতের দিকে এই জায়গাটি এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন। অনেকে মনে করেন, এখানে নাকি রাতের দিকে এক অস্থির মানুষের অতৃপ্ত আত্মা ঘোরাফেরা করে। কিন্তু সেই অস্থির মানুষটির মৃত্যু নিয়ে নানা কথা শোনা যায়।
যেমন কেউ কেউ বলে থাকেন, ওই মানুষটি নাকি আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার কারও মত হল, এখানে রাতের ডিউটি করার সময় দুই নিরাপত্তারক্ষীর মধ্যে ঝামেলা বঁাধে। সেই ঝামেলা সংঘর্ষে গড়ায়। তখন একজন নাকি অন্যজনকে গুলি করে মেরেছিল। সেই থেকে নিহত রক্ষীর আত্মা সারারাত এই সোসাইটির চারদিকে ঘুরে বেড়ায়।
এইসময় সোসাইটির নিরাপত্তারক্ষীরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকেন। শোনা যায়, পাহারা দেওয়ার সময় যদি কোনো নিরাপত্তারক্ষীর ক্লান্ত লাগে এবং ঘুম পায়, আর তার পরিণতিতে কারও চোখের পাতা বুজে আসে, তাহলে সেই রক্ষী ভয়ংকর সমস্যায় পড়ে যান। কারণ তখন কে যেন সেই রক্ষীর গালে সপাটে চড় কষান।
কিন্তু কে যে সেই রক্ষীকে চড় মারেন, তা সেই রক্ষী বা অন্য কেউ দেখতেও পান না। এমন ঘটনা অনেক বার ঘটেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই আক্রমণকারীকে কেউ পাননি। তখনই বিষয়টি নিয়ে অনেকে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। দেখা যায়, নিরাপত্তা রক্ষীদের যাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন, তাঁরাই শুধু আক্রান্ত হন। আর সেই সময়ই উঠে আসে সেই নিহত রক্ষীর কথা।
এর ব্যাখ্যাও উঠে আসে, কেবল রক্ষীদের মধ্যে যাঁরা রাতে পাহারা দিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, তাঁরাই অজানা লোকের চড় খান। এর অর্থ, রক্ষীদের কাজে ফাঁকি দিতে দেখলেই সেই আক্রমণকারীর রাগ হয়। এরপর সকলেই বুঝে যান, এই চড় মারার পিছনে রয়েছে সেই নিরাপত্তারক্ষীর আত্মাই।
দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট
তখন রাত এগারোটা বাজে। এক ভদ্রলোক কোলাহলমুখরিত দিল্লিকে পিছনে ফেলে নিস্তব্ধ ক্যান্টনমেন্ট রোড দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সেদিন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। শীতের রাতে হিমেল হাওয়া গাড়ির জানালা দিয়ে ঢুকে তাঁর মুখে ধাক্কা মারছিল। ওই ভদ্রলোক জানতেন না, কী ভয়ংকর এক মুহূর্ত তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল!
হঠাৎ ভদ্রলোক দেখতে পেলেন এক মহিলা তাঁর গাড়ির বঁা-দিকে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি রাস্তায় তাঁর গাড়ির দিকে হাত তুলে লিফট দেওয়ার জন্য ইশারা করছিলেন। ভদ্রলোক গাড়ির গতি কিছুটা কমালেন। মহিলাটিকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলেন। মহিলাটি সাদাশাড়ি পরিহিতা। কিন্তু তাঁর মুখ ভালো দেখা যাচ্ছে না।
ভদ্রলোক অবাক হলেন, এত রাতে মহিলা! ভুরু কুঁচকে গেল তাঁর। হঠাৎ মনে হল, দিনকাল ভালো নয়। কী থেকে কী হয়ে যায়! তাই ফের গাড়ির গতি বাড়ালেন। তারপর কয়েক মুহূর্তমাত্র। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। দেখলেন, গাড়ি না-থামিয়ে যে মহিলাটিকে তিনি পিছনে ফেলে এসেছেন, সেই মহিলা ফের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। তবে এবার বঁা-দিকে নয়, এবার ডান দিকে রয়েছেন এবং একইভাবে হাত দেখিয়ে লিফট চাইছেন।
মাই গড! এটা কী করে সম্ভব?
শীতের ওই রাতেও তাঁর শরীর যেন গরম হয়ে উঠল। তাঁর আর গাড়ি থামানোর কোনো প্রশ্নই ছিল না। তবে এবার মহিলাটির আচরণ বদলে গেল। মহিলাটি তাঁর গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই গতিতে ছুটতে লাগলেন। ভয়ে ভদ্রলোকের শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, যাঁকে তিনি মহিলা বলে মনে করছেন, তিনি কোনো সাধারণ মহিলা নন!
আর ভাবতে পারলেন না ভদ্রলোক। গাড়ি নিয়ে আর ছুটতে পারলেন না। কোনোরকমে গাড়ি থামালেন। দেখলেন সেই মহিলাটি তাঁর গাড়ির সামনে রাস্তার একদিক থেকে অন্যদিকে ঝাঁপ দিয়ে পার হলেন এবং সঙ্গেসঙ্গে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ভদ্রলোক নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। অজ্ঞান হয়ে স্টিয়ারিঙের উপরেই লুটিয়ে পড়লেন।
এটি কোনো মনগড়া কাহিনি নয়। এমন ঘটনা দিল্লির ক্যান্টনমেন্ট রোডে ঘটেছে। অনেকেই দাবি করেছেন, তাঁরাও নাকি মহিলার রূপধারণ-করা ওই আত্মার মুখোমুখি হয়েছেন সেই রাস্তায়।
দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট হল বড়ো বড়ো গাছ দিয়ে ঘেরা একটি এলাকা। ধাউলা কাউনের কাছে মোটামুটি ১০ হাজার ৫২১ একরের মতো জায়গা জুড়ে অঞ্চলটি বিস্তৃত। জায়গাটা অনেকটাই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। কাছাকাছি বাস স্টপ ধাউলা কাউন। আর, কাছাকাছি ল্যাণ্ডমার্ক হল ওভারহেড ওয়াটার ট্যাঙ্ক।
তথ্য বলছে, এই অঞ্চলটি গড়ে ওঠে ১৯১৪ সালে। ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড দিল্লিই ছিল এই অঞ্চলের কতৃপক্ষ। ২০১১ সালের সেনসাস অনুযায়ী, গোটা ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৫২।
একটি হিসাব অনুযায়ী, এক-শোরও বেশি মানুষ সাদাশাড়ি পরা ওই মহিলার খপ্পরে পড়েছেন। আর তাঁদের মধ্যে দশ-বারো জন মারাও গিয়েছেন। এইসব ঘটনাই দিল্লির এই রাস্তাকে রহস্যময় করে রেখেছে। যাঁরা মহিলাটির আত্মার মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরাই বলেছেন, তাঁদের সকলেরই চোখের সামনে মহিলাটি ভেসে উঠেছে, আবার অদৃশ্যও হয়ে গিয়েছে।
তাঁরা অনুভব করেছেন, মহিলাটির আত্মা তাঁদের নার্ভাস ও ভীত করে দিতে চেয়েছে। গাড়ির গতি বাড়ালে কারও কারও গাড়ির দরজায় নাকি মহিলাটি ধাক্কাও দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, এই ক্যান্টনমেন্ট রোডেই হয়তো কোনো একসময় মহিলাটি পথদুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।
তাই রাতে যাঁরাই ক্যান্টনমেন্ট রোড দিয়ে গাড়ি নিয়ে যান, ওই ভুক্তভোগীরা তাঁদের সাবধান করে দেন এই বলে যে, সেখানে কোনো মহিলা যদি লিফট চান, তাহলে কেউ যেন ভুল করেও গাড়ি না থামান।
এই ভয়ংকর কাহিনি প্রচারিত হওয়ার পর অবশ্য খুব দরকার না-পড়লে কেউ ওই রাস্তা দিয়ে রাতে গাড়ি নিয়ে যান না।
ভানগড় দুর্গ, রাজস্থান
সতেরো শতকের দুর্গটি রাজস্থানে। তথ্য বলছে, এই দুর্গ তৈরি করেছিলেন প্রথম মান সিং। তিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের রাজদরবারের নবরত্নদের একজন। এই মান সিংই আসলে ছিলেন অম্বরের রাজপুত রাজা। আকবরের পরম বিশ্বাসভাজন। মান সিং এই দুর্গ তৈরি করেছিলেন তাঁর ভাই মহারাজা প্রথম মাধো সিং-এর জন্য।
আবার অনেকে বলেন, দুর্গটি আগে থেকেই ছিল। মান সিং সেটি সংস্কার করেছিলেন। আর দুর্গের নামকরণ করেছিলেন মাধো সিং। নিজের ঠাকুরদা মান সিং বা ভান সিং-এর পর তিনি দুর্গটির এমন নামকরণ করেছিলেন।
তবে এই জায়গার নামকরণ নিয়ে আরও একটি তথ্যও রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, স্থানীয় লোকজনই নাকি এই জায়গার নামকরণ করেন। ভানগড়ে নতুন গ্রামের ২০০টি পরিবারের জনসংখ্যা ১ হাজার ৩০৬। পরবর্তীকালে দুর্গের বাইরে থাকা এই অঞ্চলেরও উন্নয়ন করা হয়। বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে দুর্গ এবং তার প্রান্তসীমার সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এখানকার মানুষের মুখে ভানগড় নিয়ে অনেক কাহিনি শোনা যায়। তাঁরা মনে করেন, এই জায়গার ওপর নাকি অনেক অভিশাপ রয়েছে। প্রাচীন কালে কোনো এক ঋষি নাকি এই জায়গাটি নিয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, যাঁরা এখানে মারা যাবেন, তাঁদের আত্মা কোনোদিনই মুক্তি পাবে না। যুগ যুগ ধরে তাঁদের আত্মা এখানেই বন্দি থাকবে।
হয়তো তাই এই জায়গায় যেসব অশরীরী শক্তি ঘুরে বেড়ায় বলে এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, তারা নাকি বহু দিন আগের। তবে ভানগড় দুর্গ বা তার সন্নিহিত অঞ্চলে রহস্যজনক কিছুর প্রভাব রয়েছে বলে অনেকেই মানেন।
আর তাই এই দুর্গ বা জায়গাটি যে রহস্যময়, তা ভারত সরকারও হয়তো স্বীকার করে নিয়েছে। সেইজন্য এই দুর্গে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। সন্ধ্যার পর এই দুর্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবশেষ দেখতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।
এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে একটা অদ্ভুত বিশ্বাস রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, সন্ধ্যার পর এই দুর্গে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা কেউই নাকি ফিরে আসেননি। অনেকে অবশ্য বলেন, কারও কারও ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছিল। তবে এখন হয়তো ভয়ের কারণেই কেউ সন্ধ্যার পর সেখানে যান না। শোনা যায়, যাঁরা সাহস করে এই দুর্গে রাত কাটিয়ে ফিরতে পেরেছেন, পরে তাঁরাই অনেক অস্বাভাবিক ঘটনার কথা বলেছেন।
অনেকে মনে করেন, মাধো সিং এই কেল্লাটি পাওয়ার পর নতুন কিছু সংস্কারের কাজও করেছিলেন। কিন্তু পরে এই দুর্গটি একদিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। তখন দুর্গটি থেকে কেউই নাকি বেরিয়ে আসতে পারেননি। সকলেরই মৃত্যু হয়েছিল পাথরচাপা পড়ে। হয়তো তাই দুর্গটি সম্পর্কে এত ভয়াল ধারণার জন্ম হয়। তাই রাতের দিকে কেউই দুর্গটিতে যান না।
আরও একটি বিষয় এখানে বলা যেতে পারে। এখানকার কোনো বাড়ির ছাদ নেই। বলা হয়ে থাকে, এখানে যখনই কোনো বাড়ির ছাদ তৈরি করা হয়, তখনই সেটি ভেঙে পড়ে। তাই এখানকার বাড়িগুলি সবই ছাদবিহীন। আবার অনেকের ধারণা, সতেরো শতকে বিদেশি সেনারা এই দুর্গটি ধ্বংস করে দিয়েছিল।
তবে একথা ঠিক, অধিকাংশ মানুষই এই দুর্গটির রহস্যময়তার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চালানোর সময় একটি কাহিনির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। শোনা যায়, এখানকার এক রাজকুমারীকে ভালো লেগেছিল এক জাদুকরের। সেই জাদুকর ওই রাজকুমারীকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। শুধু তা-ই নয়, রাজকুমারীকে বিয়ের প্রস্তাবও পাঠায় সে।
কিন্তু পত্রপাঠ সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয় রাজকুমারী। এই অপমান সহ্য করতে পারেনি জাদুকর। ক্রুদ্ধ হয়ে সেনাকি এই পুরো জায়গাটিই ধ্বংস করে দেয়। এমনকী সেখানেই মারা যায় জাদুকরও। শোনা যায়, জাদুকরের অতৃপ্ত আত্মা এখনও এই অঞ্চলে থেকে গিয়েছে।
জাদুকর কোনো পশুপাখির ডাক সহ্য করতে পারত না। তাই এখানে নাকি কোনো পাখি বা কোনো পশুকে ডাকতে শোনা যায় না। পাখি বা পশু এখানে দেখা গেলেও তারা যেন সকলেই বোবা। প্রচলিত কাহিনি যা-ই হোক-না কেন, এখানকার রহস্যজনক পরিবেশ ও আবহাওয়ার কথা অনস্বীকার্য।
সঞ্জয় ভান, দিল্লি
দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এবং মেহরাউলির কাছে এক বনাঞ্চল হল এই সঞ্জয় ভান। এই অঞ্চলটি ৭৮৩ একর জুড়ে বিস্তৃত। দিল্লির সবচেয়ে সবুজ এলাকা বলা হয় এই এলাকাকে। এখানে ঘন বৃক্ষের সমাবেশ ঘটেছে।
এই জায়গাটি রাতের দিকে বেশ রহস্যময় হয়ে যায়। শোনা যায়, কেউ একজন নাকি এখানকার গাছের নীচে অনেক মোমবাতি জ্বালিয়ে দেন। অন্ধকার গভীর হলে পিরবাবা জেগে ওঠেন। অনেকের বিশ্বাস, সেই আলোকিত পথে হেঁটে যান সেই পির। তাঁর চলার পথে পাথর পড়ে থাকে। সেই আলোয় নাকি পিরবাবা পাথর এড়িয়ে পথ চলেন।
হজরত শেখ শাহাবুদ্দিন আশিকল্লাহের আত্মা নাকি প্রতি রাতে এভাবেই এখানে জেগে ওঠে আর গাছের নীচে সেই পথ ধরে চলতে থাকে। এমনই সব হাজার এক কাহিনি শোনা যায় এই অঞ্চলকে নিয়ে। আর সেই সব কাহিনিই এই বনাঞ্চলটিকে করে তুলেছে রোমহর্ষক।
অথচ দিনের বেলায় সবুজ বাতাসের ছোঁয়ায় হাজার এক চঞ্চল গাছ এবং পাখিদের গানে এই সঞ্জয় ভান সকলের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হয়ে ওঠে। বসন্তকুঞ্জ এবং মেহরাউলির কাছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লিকে আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে এটি একটি অসাধারণ সুন্দর জায়গা।
কিন্তু রাতের দিকে গাছগুলি আশ্চর্যরকম নীরব হয়ে যায়। আর তখনই এই সঞ্জয় ভান হয়ে যায় দিল্লির সবচেয়ে বিপজ্জনক ভৌতিক জায়গা।
এই এলাকার দশ কিলোমিটারের মধ্যে লালকোটের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। পরে এর নাম হয় কিলা রাই পিথোরা। অনেকের বিশ্বাস, রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরিণতির জন্য শোক প্রকাশ করে চলেছে এখানকার দেওয়াল। কিন্তু লালকোটের পরে মুসলিম কবরস্থানটিই সেখানে সবচেয়ে রহস্যজনক স্থান হিসেবে চিহ্নিত।
এই কবরগুলিতে মূলত গরিব শিশুদের মৃতদেহ পুঁতে রাখা আছে। গভীর রাতে নাকি ওই কবরস্থানগুলি জেগে ওঠে। আর মৃত মুসলিম শিশুরাও জীবন্ত হয়ে ওঠে। রাতের নৈ:শব্দ ভেঙেচুরে প্রকট হয়ে ওঠে তাদের হাসি, কান্না আর চিৎকার। তখন যেন পরিচিত এই সঞ্জয় ভান হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ আলাদা এক পৃথিবী, যা ভৌতিক এবং রহস্যময়।
এখানকার মাজারগুলো অদ্ভুত শান্ত। সেখানকার সমাধিগুলিতে যেন বিশ্রাম করছেন অসংখ্য পির সাহেব। রাতে যখন স্বাভাবিক পৃথিবী থেকে সঞ্জয় ভান অনেক দূরে অবস্থান করে, তখন তাঁদের আত্মা নাকি এখানে ঘুরে বেড়ায়।
এ ব্যাপারে পির হজরত শেখ শাহাবুদ্দিন আশিকল্লাহকে নিয়ে একটি সুন্দর কাহিনি রয়েছে। তিনি নাকি এই পথ ধরে প্রতিদিন হেঁটে মাজারে যান। সেখানে দিল্লিতে প্রথম আসা সুফি সাধকরাও থাকেন।
একবার আবদল বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর দিন তাঁর পুত্র হজরত শেখ শাহাবুদ্দিন আশিকল্লাহ সাধারণ মানুষের জন্য একটি খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সেখানে খাবার কম পড়ে যায়। কিন্তু তিনি শান্তভাবে খাবারশূন্য পাত্রগুলিও কাপড় দিয়ে চাপা দিয়ে রাখেন।
যখন তিনি সেই পাত্রগুলির উপর থেকে কাপড় সরান, তখন দেখা যায়, সমস্ত পাত্রগুলিই খাবারে ঢাকা ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর সাত-শো বছর পেরিয়ে গেলেও অনেকে বিশ্বাস করেন, এখনও নাকি সেই পির সাহেব প্রতিদিন রাতে এই অঞ্চলের পথ ধরে হেঁটে যান। সেই রহস্যজনক দিনটিকে মনে রেখে এখনও দরগা থেকে সকলকে খাবার দেওয়া হয়।
তবে এখানে এক ভয়ংকর আত্মাকেও দেখা যায়। সেই আত্মাটি এক মহিলার। বলা হয়ে থাকে, সেই আত্মাটিকে নাকি এখানকার একটি পিপুল গাছ থেকে ঝুলতে দেখা যায়। সাদাশাড়ি পরিহিতা মহিলাটির আত্মা সেখানকার গাছগুলির চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। বহু মানুষ তাকে দেখেছেন বলে দাবি করে থাকেন।
তাঁদের কেউ কেউ বলেন, তাঁরা দেখেছেন সেই মহিলার ভীতিকর দু-টি চোখ। মহিলাটি হয়তো পিপুল গাছে দড়ি বেঁধে নিজের গলায় ফাঁস দিয়ে কখনো আত্মহত্যা করেছিলেন। আর সেই দৃশ্যটিই মাঝে মাঝে গভীর রাতে নাকি ওই এলাকায় কেউ কেউ দেখে থাকেন। এই মহিলার আত্মার ঘটনাই রাতের সঞ্জয় ভানকে ভয়ংকর রহস্যময় এলাকায় পরিণত করেছে।
২৫ নম্বর ব্রথেল, কামাথিপুরা, মুম্বই
কামাথিপুরা হল মুম্বইয়ের প্রাচীন এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম রেড লাইট (নিষিদ্ধপল্লি) প্লেস। ১৭৯৫ সালের পর এখানে প্রথম এই বসতি গড়ে ওঠে।
তখনই বোম্বের পূর্ববর্তী সাতটি দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তা তৈরি হয়। প্রাথমিকভাবে এই অঞ্চলটি লালবাজার নামে পরিচিত। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিক কামাথিদের সৌজন্যে এই অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় কামাথিপুরা। এই কামাথিপুরা শ্রমিকরা নির্মাণ প্রকল্পগুলিতে কাজ করতেন।
তথ্য বলছে, ঔপনিবেশিক সময়ে ব্রিটিশ সেনারা এখানকার একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে আসতেন। আর ব্রিটিশ সেনাদের মনোরঞ্জন করত রাশিয়া এবং জাপান থেকে নিয়ে আসা মহিলারা। সেই স্থানটিই ২৫ নম্বর ব্রথেল নামে পরিচিত।
আর এই ২৫ নম্বর ব্রথেলেই নাকি রয়েছে এক গণিকার অতৃপ্ত আত্মা। রাত হলে সেই আত্মা নাকি ওই স্থানে ঘুরে বেড়ায়। যারা ওই জায়গায় প্রথম যায়, অথবা যাদের এখানকার মহিলারা চেনে না, সেই পুরুষরাই নাকি ওই গণিকার আত্মার খপ্পরে পড়ে যায়। অনেকেই নাকি সেই আত্মার সম্মুখীন হয়ে আমোদ করা দূরের কথা, এমন বিপদে পড়েছে যে, পালিয়ে বেঁচেছে।
ডুমাস তট, গুজরাত
সৌন্দর্যের দিক থেকে ভারতের যে কয়েকটি সমুদ্রসৈকত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছে, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ডুমাস বিচ। তবে বিচটিতে যাওয়া ও সময় কাটানো নিয়ে ভারত সরকারের তরফে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শোনা যায়, এই বিধিনিষেধের পিছনে রহস্যজনক কিছু কারণ রয়েছে। যদিও ভারত সরকার বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলেনি।
সাধারণ মানুষের কাছেও এই সৈকত রহস্যময় বিচ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে সুরাটের বাসিন্দাদের অনেকে মনে করেন, কেউ যদি ওই সৈকতে গিয়ে রাত কাটান, তাহলে তাঁরা কেউই আর জীবিত ফিরে আসেন না। তাই যদি কেউ সেই সৈকতে ঘুরতে যান, তাঁদের সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তাঁরা।
আগে ডুমাস বিচে একটি শ্মশান ছিল। সেখানে বহু মৃতদেহ পোড়ানো হত। শোনা যায়, সেই সব মৃতের অতৃপ্ত আত্মা নাকি গভীর রাতে এই সৈকতে জেগে ওঠে। ঘুরে বেড়ায়। রাতের দিকে সরকারি বিধিনিষেধ আরোপের আগে বা পরে বিশেষ অনুমতি নিয়ে যাঁরা এই বিচে গিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নাকি অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন।
তাঁরা নাকি অনুভব করেছেন, তাঁদের কাঁধের কাছে কারা যেন মুখ এনে ফিসফিস করে কিছু বলে থাকে। কিন্তু যারা ওভাবে কথা বলে তাদের কাউকেই দেখা যায় না। এমন অভিজ্ঞতার কথা প্রচারিত হওয়ার পরই রাতে সেখানে মানুষের যাতায়াত একেবারেই কমে যায়। এখন তো রাতে বিচে যাওয়া পুরোপুরিই বন্ধ হয়ে গেছে।
গ্র্যাণ্ড তাজ হোটেল, মুম্বই
মুম্বইয়ের গ্র্যাণ্ড তাজ হোটেলে অশরীরী শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। চমকে উঠলেন কি একথা শুনে? না, উঠবেন না। আমি নিজেও মুম্বইয়ের ওই হোটেল দেখেছি।
সাধারণভাবে সেকথা শুনলে একটু বিস্মিত হবেন অনেকেই। কিন্তু যাঁরা জানেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, ওই হোটেলে অতিপ্রাকৃত শক্তির উপস্থিতি রয়েছে।
তথ্য বলছে, ওয়াটসন হোটেলে ঢুকতে একসময় বাধা দেওয়া হয়েছিল জামশেদজি টাটাকে। কারণ ওই হোটেলে নাকি একমাত্র শ্বেতাঙ্গদেরই প্রবেশাধিকার রয়েছে। তারপরই জামশেদজির মাথায় এমন একটি হোটেল তৈরি করার পরিকল্পনা আসে।
তিনি মনে করেছিলেন, তাঁর এবং বাকি ভারতীয়দের জন্য এমন একটি হোটেল তৈরি করে সেই বর্ণবৈষ্যমের প্রতিবাদ জানাবেন। হোটেলের নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় সিদ্ধেশ এস, সীতারাম খান্ডেরাও বৈদ্য এবং ডি এন মির্জার মতো তিন ভারতীয় স্থপতিকে।
জামশেদজি চেয়েছিলেন, তাঁরা এমন হোটেল তৈরি করুন, যার তুলনা গোটা পৃথিবীতে পাওয়া যাবে না। সীতারাম খান্ডেরাও বৈদ্য ছিলেন প্রধান স্থপতি। কিন্তু হোটেলটি তৈরি হওয়ার সময়ই ওই স্থপতির মৃত্যু হয়। তাঁর পর প্রধান স্থপতির দায়িত্বে আসেন ডব্লিউ এ চেম্বার্স।
এত ঝক্কি সামলে শেষপর্যন্ত হোটেলের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় এবং ১৯০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর হোটেলটির উদবোধন হয়। সাত-তলার হোটেলটি তৈরি করতে মোট খরচ পড়ে আড়াই লক্ষ পাউণ্ড। হোটেলে ৫৬০টি ঘর এবং ৪৪টি সুট রয়েছে। এই হোটেলে তাজমহল প্যালেস এবং টাওয়ার হল, এই দু-টি ভবন রয়েছে।
তারপরই ঘটে সেই অদ্ভুত ঘটনা। সেই ঘটনার কোনো সরকারি রেকর্ড নেই, তবে শোনা যায়, হোটেল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করার পরই ভবনটির ভিতরে ডান দিকে একটি ঘর থেকে বাইরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন চেম্বার্স। তবে এই আত্মহত্যার পিছনে যে কারণ দেখানো হয়েছিল, তা খুবই হাস্যকর।
বলা হয়ে থাকে, তিনি যে নকশা করেছিলেন হোটেলটির জন্য, সেই অনুযায়ী সেটি তৈরি হয়নি। হোটেলের নকশা তৈরি করার পর তিনি ইংল্যাণ্ড চলে যান। ফিরে আসেন ১৯০৩ সালে।
তিনি নাকি নিজের সৃষ্টির ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে ছিলেন। হোটেলটি তৈরি হলে তিনি প্রচুর খুঁত খুঁজে পান। তার কয়েক দিনের মধ্যে তিনি হোটেলটির পাঁচ-তলার উপরে যান এবং জানালা দিয়ে বাইরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
তারপর এক-শো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তাজমহল হোটেলের মধ্যে এখনও রয়েছে ওই স্থপতির আত্মা। হোটেলের বহু কর্মী এবং অতিথিরা চেম্বার্সের আত্মাকে দেখেন বলে রিপোর্ট করেছিলেন। কেউ কেউ দেখেন, হোটেলের করিডোর দিয়ে এক সাহেবকে হেঁটে যেতে। তিনি নাকি হোটেলের দেওয়াল থেকে মেঝে, সব পরীক্ষা করেন।
এ ব্যাপারে একটি কাহিনি শোনা যায়। এক সাফাইকর্মী হোটেল থেকে কিছু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। তারপরই সাফাইকর্মীকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। হোটেলের কাঁটাচামচ পাওয়া যায় তার কাছে। তার যখন জ্ঞান ফেরে, সেজানায়, চুরি করার সময় নাকি চেম্বার্সের আত্মা তাকে ধরে ফেলে এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। তাতেই সেঅজ্ঞান হয়ে যায়।
কিন্তু ঘটনা হল, চেম্বার্স এই হোটেল ভবনের প্রকৃত নকশা তৈরি করেননি, তৈরি করেন সীতারাম খান্ডেরাও বৈদ্য। আর চেম্বার্স যখন হোটেলটি তৈরির দায়িত্বে আসেন, তখন অর্ধেক ভবন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাই চেম্বার্সের আত্মহত্যার পিছনে যে কারণটি শোনা যায়, তার সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তবে চেম্বার্সের আত্মহত্যার কারণ যা-ই হোক, অনেকেই বিশ্বাস করেন এখনও নাকি হোটেলের বিভিন্ন ঘরে চেম্বার্সের আত্মা ঘুরে বেড়ায়। সমস্ত কিছু নাকি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে। কখনো কখনো তার চিৎকারের শব্দও নাকি কেউ কেউ কোনো কোনো রাতে শুনতে পেয়েছেন বলে দাবি করে থাকেন।
সানিওয়ারওয়াদা দুর্গ, পুনে
পুনের একটি বিখ্যাত দুর্গ হল এই সানিওয়ারওয়াদা দুর্গ। মহারাষ্ট্রের প্রাচীনতম দুর্গগুলির মধ্যে অন্যতম বলা হয়ে থাকে সানিওয়ারওয়াদার দুর্গকে। এই দুর্গটিতে অশরীরী আত্মার উপস্থিতি রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস। তাই এই দুর্গে যাওয়া পর্যটকদের তাঁরা সতর্কও করে দেন অনেকসময়।
শোনা যায়, অনেক দিন আগে এই দুর্গেই খুন হন সেখানকার এক যুবরাজ। তাঁকে বাইরের কোনো শত্রু খুন করেনি, তিনি খুন হয়েছিলেন নিজেরই খুড়তুতো ভাই-বোন ও তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতেই।
তখন যুবরাজের বয়স ছিল মাত্র তেরো। একথা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়, সিংহাসনের লোভেই আত্মীয়রা সেই যুবরাজকে খুন করেছিল।
সেই যুবরাজেরই ক্রুদ্ধ আত্মা নাকি প্রতিশোধস্পৃহায় এখনও সারারাত ধরে ঘুরে বেড়ায় ওই দুর্গে। বিশেষ করে পূর্ণিমার রাতগুলিতে সেই আত্মার দাপট বেশি দেখা যায়। আগে যাঁরা ওই সময় সেখানে রাত কাটিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই সেখানকার রোমহর্ষক ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
বৃজরাজ ভবন প্রাসাদ, কোটা, রাজস্থান
পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হল রাজস্থান। এখানকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক দুর্গ ও রাজপ্রাসাদগুলিতে প্রতি বছরই বহু বিদেশি পর্যটক আসেন। এই রাজস্থানেরই বেশ কিছু জায়গা ভৌতিক স্থান হিসেবে পরিচিত। তেমনই একটি রহস্যজনক স্থান হল কোটার ১৭৮ বছরের ব্রিজরাজ ভবন প্যালেস। বিমানবন্দর থেকে পাঁচ কিলোমিটার এবং রেলস্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ১৯৮০-র দশকে এই প্রাসাদকে হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়।
ব্রিটিশ আমলে এই প্রাসাদেই একসময় থাকতেন মেজর চার্লস বার্টন এবং তাঁর পরিবার। মহাবিদ্রোহের সময় ১৮৫৭ সালে মেজর বার্টন ও তাঁর দুই ছেলেকে এখানেই খুন করে ভারতীয় সিপাহিরা। বার্টন এবং তাঁর দুই ছেলে প্রাসাদের উপরতলার ঘরে ছিলেন। তারপর সিপাহিরা প্রাসাদটি লুঠ করে।
প্রাসাদটি পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। তারপর তারা আত্মসমর্পণ করে। ব্রিটিশ সরকারও সেটি সিপাহিদের কাছ থেকে উদ্ধার করে। পরে এই ভবনটিই কোটার মহারাজার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হয়। যা-ই হোক, ব্রিটিশ সরকার কোটা কবরস্থানে বার্টন-সহ তিন জনের দেহকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় কবর দেয়।
এখানকার বাসিন্দারা বলে থাকেন, এই প্রাসাদে নাকি এখনও রয়েছে চার্লস বার্টন ও তাঁর দুই ছেলের অতৃপ্ত আত্মা। যদিও ওই আত্মারা এখানকার কারও ক্ষতি করেছে বলে খবর নেই। এখানকার রক্ষীরা বলে থাকে, পাহারা দেওয়ার সময় তারা কাউকে মাঝে মাঝে ইংরেজিতে কথা বলতে শোনে। শুধু তাই নয়, তাদের নির্দেশও দেন তিনি। কখনো পাহারা দেওয়ার সময় ঘুমিয়ে পড়তে বারণ করেন, আবার কখনো বা ধূমপান না করার নির্দেশ দেন।
তবু যদি কেউ কাজের সময় ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে তাদের নাকি চড়ও মারেন তিনি, এবং জাগিয়ে দেন। আবার কোনো কোনো রক্ষী হোটেলের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় বাচ্চাদের ছোটাছুটি ও চিৎকার করে খেলার আওয়াজ পেয়েছে। যদিও তাদের তারা দেখতে পায়নি কখনো। কিন্তু তাদের কথা শুনেছে। তারা সকলেই ইংরেজিতে কথা বলত।
এমনই সব অদ্ভুতুড়ে ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে নাকি বেশ কয়েক জন রক্ষী। তবে বর্তমানে এই হোটেলে যেসব পর্যটক বা অতিথিরা আসেন, তাঁদের কোনো দিন সমস্যায় ফেলেনি ওই ব্রিটিশ মেজর বা তার ছেলেদের আত্মা। তাঁরা নির্বিঘ্নেই সেখানে কাটিয়েছেন।
তবে কোনো কোনো অতিথি জানিয়েছেন, হোটেলের কোনো কোনো অংশে তাঁরা নাকি অস্বস্তি বোধ করেছেন। তাঁদের মনে হয়েছে, সেখানে যেন আরও কেউ কেউ রয়েছে। অথচ তাদের কাউকেই তাঁরা দেখতে পাননি।
এইসব ঘটনাই হোটেলটিকে ভৌতিক ও রহস্যময় করে তুলেছে।
লম্বি দেহারের খনি, উত্তরাখন্ড
উত্তরাখন্ডের মুসৌরিতেই রয়েছে লম্বি দেহারের খনি। এটি মূলত চুনাপাথরের খনি। এই খনি অঞ্চলটিকেও এখানকার মানুষ ভয়ংকর ভৌতিক বলে মনে করেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে এখানে অকালপ্রয়াত পঞ্চাশ হাজার খনিশ্রমিকের অতৃপ্ত আত্মার কথা।
এই জায়গাটি একটি পরিত্যক্ত জায়গা। দেখে মনে হয় এখানে কখনো কোনো সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। আসলে ব্রিটিশ আমলে এখানেই মাটির নীচে খনি থেকে চুনাপাথর বের করে আনতেন শ্রমিকরা। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ ছিল রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর। আর, শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারেও ব্রিটিশ সরকার ছিল উদাসীন।
ফলে বার বার ধস নামত এখানকার খনিগুলিতে। ধসের কারণে বহু শ্রমিকই বহু বার খনির নীচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করার জন্য অনেক শ্রমিকের ফুসফুসও ক্ষতিগ্রস্ত হত। অনেকের রক্তবমি হত। কারও মুখ দিয়ে যখন-তখন রক্ত বের হয়ে আসত। এভাবে রোগগ্রস্ত হয়ে অনেক শ্রমিকই ভয়ংকর যন্ত্রণা ভোগ করে মারা গিয়েছেন।
এভাবেই নাকি সেই সময় প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। শীতের রাতগুলিতে যখন ভয়ংকর ঠাণ্ডায় কাঁপতে থাকে গোটা উত্তরাখন্ড, তখন নাকি এখানকার মাটির নীচে তাদের আত্মার চিৎকার শোনা যায়। মনে করা হয়, মাটির নীচে চাপা পড়ে মৃত শ্রমিকদের আত্মাই চিৎকার করে।
হারসিল গ্রাম, উত্তরাখন্ড
উত্তরাখন্ডের উত্তরকাশী জেলার একটি গ্রাম ও ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চল হল গাড়োয়ালের এই হারসিল। গঙ্গোত্রী যেতে হিন্দু পুণ্যার্থীরা এই গ্রামের পথ দিয়েই যান। উনিশ শতকে এই গ্রামে থাকতেন ফ্রেডরিক উইলসন নামে এক প্রাক্তন সেনা। তাঁর সঙ্গেই থাকতেন তাঁর দুই স্ত্রীও।
সাহেব সেখানে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। সকলে তাঁকে ‘পাহাড়ি উইলসন’ বলে ডাকত। হারসিল গ্রামকে ওই সাহেব খুব ভালোবাসতেন। মৃত্যুর পর তার আত্মা নাকি এখনও গ্রামের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। গ্রামবাসীরা এখনও হিমেল রাতগুলিতে মাঝে মাঝে গ্রামে তাঁর আত্মাকে ঘুরে বেড়াতে দেখেন।
ডিসুজা চাউলপট্টি, মাহিম
ভৌতিক জায়গা হিসেবে মুম্বইয়ের ডিসুজা চাউলপট্টির কথা বহুল প্রচলিত। এখানকার বাড়িগুলি চার-পাঁচ তলার। এর ভিতরে ক্যানোসা প্রাইমারি স্কুলের কাছে একটি কুয়ো আছে। সেই কুয়োর চারদিকে কোনো প্রাচীর নেই। অতীতে এক মহিলা নাকি কুয়ো থেকে জল আনতে গিয়ে সেখানে পড়ে মারা যান।
স্থানীয়রা বলে থাকেন, রাত হলেই সেখানে ওই মহিলার অতৃপ্ত আত্মা নাকি পুরো এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। অপরিচিত কাউকে এখানে ঘেঁষতে দেয় না। অনেকেই নাকি ওই মহিলার আত্মাকে কুয়োর চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। ভোর হলেই সেই আত্মা অদৃশ্য হয়ে যায়।
তবে ওই আত্মা কারও ক্ষতি করে না। তবু স্থানীয় বাসিন্দারা রাত হলে ওই কুয়োর কাছে যাতে কেউ না-যান, সেজন্য সকলকে সাবধান করে দেন।
কুলধারা গ্রাম, রাজস্থান
রাজস্থানের মরু শহর জয়সলমিরের পশ্চিমে ২০ কিমি দূরে রয়েছে কুলধারা গ্রাম। গ্রামটিতে যাওয়ার রাস্তা ধুলোয় ভরা। আর সেখানে গাছপালাও প্রায় নেই। তাই এখানে কোনো গোরু-ছাগলও নেই। গ্রামটিতে ঢুকলে মনে হবে যেন কোনো নির্বাসিত জায়গা এটি। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা যেন চারদিকে বিরাজ করছে। প্রায় দু-শো বছর ধরে এই গ্রামে কোনো মানুষ নেই!
বলা হয়ে থাকে, দু-শো বছর আগে এক প্রভাবশালী রাজা ও মন্ত্রীদের অধীনে থাকার সময় এই কুলধারায় ছিল পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের বাস। তখন জয়সলমিরের দেওয়ান সালিম সিং-এর চোখ পড়েছিল গ্রাম প্রধানের মেয়ের ওপর। তিনি গ্রামবাসীদের বলেন, তাঁরা যদি গ্রাম ছেড়ে চলে যান তাহলে তাঁদের সমস্ত কর মকুব করে দেবেন। তাঁর নির্দেশেই রাতের অন্ধকারে ভয়ে বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে চলে যান। তারপরই কুলধারা পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
কিন্তু কথা হল, এখনও কেউ জানেন না পালিওয়ালরা অন্য কোথায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন! তবে তাঁরা চলে গেলেও বাড়িঘরগুলি একইরকম থেকে যায়। অনেকেই মনে করেন, কুলধারায় নাকি অসংখ্য অতৃপ্ত আত্মা রয়েছে। ফাঁকা বলে কেউ যদি ওই গ্রামের বাড়িঘর দখল করার চেষ্টা করে, তাহলে ওই আত্মারা নাকি তাদের মেরে ফেলে।
স্যাভয় হোটেল, উত্তরাখন্ড
মুসৌরির পাহাড়ি উপত্যকায় রয়েছে এই ঐতিহাসিক লাক্সারি হোটেলটি। মালিকানা হোটেল কন্ট্রোলস প্রাইভেট লিমিটেডের। ব্রিটিশ গথিক স্থাপত্যে এই হোটেলটি তৈরি হয় ১৯০২ সালে।
গ্রীষ্মকালে গরম থেকে বঁাচতে অভিজাত ব্রিটিশরা তখন ছুটে যেতেন উত্তরাখন্ডে। তাঁদের অনেকেই আশ্রয় নিতেন এই হোটেলে। পরে ইউরোপীয় অন্য দেশগুলির নাগরিকরাও এখানে আসতে শুরু করেছেন। ১১ একর জায়গা জুড়ে এই হোটেলটি উত্তরাখন্ডের আভিজাত্যের প্রতীক। এখানে রয়েছে ৫০টি ঘর ও ২টি রেস্তরাঁ। এই হোটেলের প্রায় প্রতি জায়গা থেকেই সরাসরি দেখা যায় হিমালয়কে।
এই হোটেলে নাকি মাঝে মাঝেই গভীর রাতে এক মেমসাহেবকে দেখা যায়। তাঁকে খুবই ক্রুদ্ধ দেখায়। অন্তত যাঁরা রাতে তাঁকে দেখেছেন, তাঁদের অভিমত তেমনই। যাঁরা প্রথম বার তাঁকে দেখবেন, তাঁদের ভুল হতে পারে। তাঁরা হয়তো ভাববেন, বিদেশি কোনো মহিলা এখানে ঘুরতে এসেছেন।
আসলে তা নয়। ওই মহিলা নাকি লেডি ফ্রান্সেস গারনেট ওরমের আত্মা। ১৯১১ সালে এখানে এসেছিলেন তিনি। সেই সময় এক রহস্যজনক কারণে এখানেই খুন হয়ে যান। তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ তাঁর মৃত্যুরহস্যের কিনারা করতে পারেনি। মুসুরির এই ঘটনা নাকি আগাথা ক্রিস্টি এবং রাসকিন বণ্ডের উপন্যাসের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
শোনা যায়, এখনও কোনো কোনো নির্জন হিমেল রাতে তাঁর অতৃপ্ত আত্মা এই হোটেলে ঘুরে বেড়ায়। খুঁজে চলে সেই খুনিকে। হোটেলকর্মীদের অনেকেই জানেন একথা। অতিথিদেরও কেউ কেউ জানেন। যাঁরা জানেন, রাতে সেই মেমকে দেখলে সামনে যান না। মেমসাহেবের আত্মাকে বিরক্ত না করলে সেই আত্মা নাকি এখানকার অতিথি বা অন্যান্যদের সম্পর্কেও উদাসীন থাকে।
উত্তরাখন্ড সরকার এখন ওই রাজ্যের ভৌতিক স্থানগুলিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। আমেরিকা ও ইউরোপের মতো এখানকার ভূতুড়ে স্থান হিসেবে পরিচিত জায়গাগুলির উন্নয়নে নজর দিয়েছে সরকার। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু মানুষ শুধু ভৌতিক আকর্ষণেই অনেক জায়গায় যান। তাই তাঁদের কথা ভেবেই এই হোটেলটির উন্নয়ন করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন