আক্রমণকারী যখন অদৃশ্য

উপমন্যু রায়

কোনো একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে তেরো জন একটি বাড়িতে মিলিত হয়েছিলেন। ওই বাড়িতে তাঁরা তিনটি ঘর নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন। প্রতিটি ঘরই ছিল আলোকোজ্জ্বল।

তাঁদের মধ্যে কয়েক জন একটি ঘরে সময় কাটানোর জন্য তাস খেলতে বসে গিয়েছিলেন। ঘণ্টাখানেক কাটার পর একটা অদ্ভুত কান্ড শুরু হল সেই ঘরে। তাঁদের তাস খেলায় ব্যাঘাত ঘটতে শুরু হল। মনে হল, তাঁদের শান্তিতে তাস খেলতে না দেওয়ার জন্য কেউ যেন প্রতিজ্ঞা করেছে।

চারদিক থেকে কেমন সব অদ্ভুত শব্দ হতে লাগল। বাড়ির বিভিন্ন ঘর থেকে যেন তুমুল শোরগোলের আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করল। আচমকা বাড়ির প্রধান সিঁড়িতে যেন ভয়ংকর একটা হট্টগোল আরম্ভ হল। মনে হল সেই সিঁড়ি দিয়ে সেনাবাহিনীর একটা দল যেন হুড়মুড় করে নেমে এল।

তারপর দেওয়ালের আওয়াজ শোনা গেল। যেন দেওয়ালে কোনো ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে, আর সেখান থেকে একটা অস্বাভাবিক আওয়াজ বের হয়ে আসছে। সেইসঙ্গে দরজা ও জানালায় কেউ যেন দুমদুম করে আঘাত করতে লাগল। যেন কোনো হাতুড়িতে কাপড় বেঁধে তা দিয়ে দরজা ও জানালায় আঘাত করছে কেউ।

যে ঘরে তেরো জন তাস খেলছিল, সেই ঘরের পরিবেশ দ্রুত বদলে গেল। হাওয়া-বাতাস সব স্তব্ধ হয়ে গেল যেন। তারই মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই সেই ঘরের দেওয়ালে-ঝোলানো কয়েকটি ক্যালেণ্ডার ও ছবি দুলতে শুরু করল। কিন্তু তা কী করে সম্ভব?

কোনো হাওয়া-বাতাস নেই তবু ক্যালেণ্ডার ও ছবিগুলি দুলছে! মনে হচ্ছে কেউ যেন ইচ্ছে করে সেই সব ক্যালেণ্ডার ও ছবি দোলাচ্ছে!

যাঁরা তাস খেলছিলেন, তাঁদেরও শেষপর্যন্ত ধৈর্যের বঁাধ ভাঙল। তাঁরা বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। বাইরে গেলেন। সারা বাড়ি ঘুরে এলেন। কেউ কোথাও নেই। বাড়ি সেই যে অবস্থায় ছিল তেমনই রয়েছে! তাহলে এমন সব কান্ড ঘটল কী করে? এর উত্তর তাঁরা পেলেন না।

যে বাড়িটিতে এত কান্ড ঘটে গেল, সেটি ফ্রান্সের নিস শহরে অবস্থিত। খনি এলাকার কাছেই ছিল বাড়িটি। যাঁরা সেখানে তাস খেলছিলেন, সেখানে যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে তেমন কোনো ধারণা তাঁদের ছিল না। তাই বিষয়টি তাঁদের হতচকিত করে দেয়। পরে তাঁরা জানতে পারেন বাড়িটির এমন ভৌতিক চরিত্রের কথা। তাঁদের মারফত ঘটনাটি ছড়িয়েও পড়ে।

অস্বাভাবিক ঘটনার কথা প্রচারিত হওয়ার পর সেখানে হাজার দুয়েক মানুষ উপস্থিত হন। সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টি দেখে ভালো করে বোঝা। কিন্তু তারা তেমন কিছুই দেখতে পাননি বা বাড়ি দেখে বুঝতে পারেননি যে, সেখানেই ধারাবাহিকভাবে এমন সব অস্বাভাবিক ঘটনা নিয়মিত ঘটে চলে!

এটি লি পোর্তের বাড়ি বলেই সকলের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু ১৮৯১ সালের বসন্তের সময় ওই বাড়িতে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সেই ঘটনার মূলে নাকি রয়েছে এক অশরীরী। তবে ওই অশরীরী শক্তি বড়োই অস্পষ্ট। কিন্তু তার প্রভাব মারাত্মক। একথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তারপর থেকেই বাড়িটি সকলের কাছে রহস্যময় হয়ে ওঠে।

‘ট্রু ঘোস্ট স্টোরিজ’ বইয়ে এই বাড়িটির কথা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন হেয়ারওয়ার্ড ক্যারিংটন। ওই বাড়িটিতে অশরীরী তান্ডবের কথা এসেছে তাঁর লেখায়। হেয়ারওয়ার্ড ক্যারিংটনের বইটি ছিল সত্যি অশরীরীদের কাহিনিনির্ভর। লি পোর্তের বাড়ি নিয়ে যে ঘটনাগুলির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তা-ও তাঁর মনগড়া ছিল না। তার প্রমাণ সেখানকার ভুক্তভোগী মানুষ।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, অশরীরী তান্ডবের কথা চারদিকে বন্যার জলের মতো ছড়িয়ে পড়লেও কেউ কিন্তু তাকে নিজের চোখে দেখেননি। সেই দাবিও কেউ করেননি। তবে সেই অশরীরী শক্তিকে দেখার জন্য বহু লোক বহু চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন।

সেজন্য অবশ্য অশরীরী শক্তির দাপট লি পোর্তের বাড়িতে থেমে যায়নি। মূল রহস্যজনক বিষয়টি হল, চারদিকে ওই অশরীরী আত্মা দাপিয়ে বেড়ায়, তার শিকার হন অসংখ্য মানুষ, অথচ সেই আত্মাকে দেখা যায় না!

ওই আত্মার রোষের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন লি পোর্তের বাড়ির বাসিন্দারা। তাঁদের অধিকাংশকেই বেধড়ক পিটিয়েছে ওই আত্মা। যেন তাঁদের পেটানোর জন্যই ওই আত্মা সেই বাড়িতে হাজির হয়েছে! তার আক্রমণে কেউ কেউ এতটাই আঘাত পান যে, তাঁদের শরীরে কালশিটে দাগ পড়ে যায়।

অবাক হওয়ার মতো বিষয় হল, যাঁরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁরাও কেউ ওই অশরীরী আত্মাকে দেখেননি। খবরটা গিয়ে পৌঁছোয় পুলিশের কাছে। অশরীরী আত্মা এমন কাজ করেছে বলে যেসব দাবি উঠেছিল, ফরাসি পুলিশ তা উড়িয়ে দেয়। তাদের সন্দেহ, এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনো মানুষ রয়েছে। নিজের স্বার্থে এমন সব অস্বাভাবিক কাজ করে চলেছে। ব্যাস, শুরু হল তদন্ত।

সেখানে ওই আত্মার হাতে যাঁরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল পুলিশ। পুলিশের হাজার এক জিজ্ঞাসার জবাবেও প্রত্যেকেই জানালেন, তাঁরা কেউই আক্রমণকারীকে দেখেননি।

তদন্ত চলতে লাগল। কিন্তু ফল হল শূন্য। কারণ দিন কাটলেও তদন্ত আর এগোয় না। কোথাও গিয়ে যেন থমকে যায়। আক্রমণকারীকে কেউ দেখেনি। তার পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি। পুলিশের জন্য কোনো ক্লুও রেখে যায়নি সে। আক্রমণকারীর আক্রমণের প্রমাণ রয়েছে, নেই শুধু তার অস্তিত্ব। পুলিশ ভাবল, আক্রমণকারী নিশ্চয়ই একটা বর্ন ক্রিমিনাল!

তদন্ত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে না এগোনোয় পুলিশেরও জেদ বেড়ে যায়। বেশ আটঘাট বেঁধে রহস্যের সমাধানে নামে। তারা নিশ্চিত, এই আক্রমণগুলির পিছনে নিশ্চয়ই কোনো মানুষ রয়েছে। তাই জোরদার অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। মানুষের হাত থাকতে পারে এমন সব সম্ভাবনাই যাচাই করে দেখে। ফরাসি পুলিশ বিভাগ তাদের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে সমস্যার সমাধানে।

বেশ কিছুদিন অনুসন্ধান চালানোর পরেও আক্রমণকারীকে চিহ্নিত করতে পারল না তারা। অথচ সেই লি পোর্তের বাড়িতে অশরীরী আত্মার দাপাদাপি চলতে থাকল। সেই আত্মা বা প্রেতকে কেউ দেখতেও পেলেন না।

শুধু বোঝা গেল, জীবিত মানুষের ওপর তার রাগ মারাত্মক। তাই তার আক্রমণ চলতেই থাকল।

আক্রান্ত মানুষকে সকলেই দেখলেন। বুঝতে পারলেন, তাঁর ওপর আক্রমণের ঘটনা সত্য। কিন্তু যে আক্রমণ করেছে, তাকে দেখেনি স্বয়ং আক্রান্তও। ক্রমে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

তারপর ধীরে ধীরে রহস্য দেখার জন্য যাঁরা অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হতেন, তাঁরা ভীত হলেন। তাঁদের সংখ্যাও কমতে শুরু করল। তবে যাঁরা প্রকৃতই রহস্যপ্রিয়, তাঁরা কিন্তু নিরাশ হলেন না। আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকলেও তাঁরা কিন্তু লি পোর্তের সেই বাড়িটিতে গিয়ে হাজির হতেন।

ওই বাড়িটির আরও একটি খবর শোনা গেল। কোনো একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে সেই বাড়িতে কয়েক জন গিয়েছিলেন। বাড়ির মধ্যে একটি বেশ বড়ো ঘরে তাঁরা ছিলেন। দরজা-জানালা বন্ধ থাকলেও সেগুলির ফাঁক দিয়ে ঘরটিতে যথেষ্ট আলো-বাতাস খেলছিল। বাইরে থেকে সূর্যের সোনালি আলো প্রবেশ করে ঘরটিকে যেন ভরিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু আচমকা কোনো কারণ ছাড়াই ঘরটি অন্ধকার হয়ে যায়। ঘরের লোকজন ভাবলেন, আকাশে বুঝি মেঘ জমে বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। তাই হয়তো ঘরের ভিতরটাও অন্ধকার হয়ে গিয়েছে।

প্রথমে তাঁরা জানালা খুলে বাইরে তাকালেন। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু বাইরে যথারীতি দিনের উজ্জ্বল আলো বিরাজ করছে। আকাশে মোটেও মেঘ করেনি। সূর্যও যথারীতি আকাশে নিজের জায়গায় রয়েছে। তাহলে ঘরের ভিতরটা এতটা অন্ধকার হল কী করে?

বুঝতে পারলেন না ঘরে থাকা মানুষগুলি। তাঁদের সঙ্গেও ঘটল একটার পর একটা অস্বাভাবিক ঘটনা এবং সেই দিনদুপুরেই।

তাঁরা শুনতে পেলেন, সারা বাড়িতে যেন কলরব হচ্ছে। তাঁরা ছুটে গিয়ে সারা বাড়ি ঘুরলেন। কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পেলেন না। দিনদুপুরে এমন কান্ডে তাঁরা বিস্মিত হলেন। অবশ্য তাঁদের কাউকে শারীরিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়নি।

আরেক বার অন্য একটি কারণে সেই বাড়িতে কয়েক জন বেশ সাহসী মানুষ গিয়েছিলেন। যে কারণেই তাঁরা সেখানে গিয়ে থাকুন-না কেন, তাঁদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল অন্য। কে বা কারা এই বাড়িতে এমন সব অস্বাভাবিক কাজ করে চলেছে, তাদের দেখাই ছিল তাঁদের ওই বাড়িতে যাওয়ার আসল কারণ।

সারাদিন তাঁরা কোনো কিছুই দেখলেন না। তাঁরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করলেন। সারা বাড়ি ঘুরে দেখলেন। খাওয়া-দাওয়া করলেন। কোনো সমস্যা হল না বা অস্বাভাবিক কিছু দেখলেন না। এভাবেই দিন কেটে গেল। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে হল। তারপর রাত। না, তাঁরা কিছুই দেখতে পেলেন না।

সেই রাতও থেমে থাকল না। রাত ক্রমশ গভীর হতে শুরু করল। ঠিক মাঝরাতে ঘটল সেই ঘটনা। তাঁরা সকলে কিন্তু জেগেই ছিলেন। হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল। বাড়িতে তাঁরাই শুধু ছিলেন, আর কেউ ছিলেন না।

এমতাবস্থায় আচমকা যদি গোটা বাড়ি অন্ধকার হয়ে যায় তাহলে অস্বস্তি তো হবেই। যদিও তাঁরা একা ছিলেন না বলে কেউ ভীতও ছিলেন না।

কিন্তু তাঁরা ভয় পেলেন। একসময় তাঁদের সকলকে চমকে দিয়ে কেউ যেন চিৎকার করে উঠল। চিৎকারের কয়েক মুহূর্ত পরে বিকট এক হাসিতে সারা বাড়ি যেন কেঁপে উঠল। বিশেষ করে বাড়ির খালি ঘরগুলি থেকেই ওই শব্দগুলি আসতে লাগল বেশি।

বাড়িতে যাঁরা ছিলেন তাঁরা যেন এই সুযোগেরই প্রতীক্ষায় ছিলেন। কারা চিৎকার করছে বা বিকট শব্দে হাসছে তা হাতেনাতে ধরবেন ভেবে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু সারা বাড়ির কোথাও সেই আত্মা বা অশরীরীকে খুঁজে পেলেন না।

তারপর ব্যর্থ মন নিয়ে তাঁরা নিজেদের ঘরে ফেরার পথ ধরলেন। কিন্তু ঘরে ঢুকে পড়ে গেলেন মহাবিপদে। অদৃশ্য কারও মুষ্টিবদ্ধ হাত তাঁদের মুখের দিকে যেন ছুটে এল। এক বার নয়, বেশ কয়েক বার। ঘুসি থেকে চড়, অদৃশ্য কারও হাতে বেদম মার খেলেন তাঁরা।

যখনই মার খাচ্ছিলেন, তখন যে মারছিল তাকে ধরার জন্য তাঁরা হাত-পা ছুড়লেন। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে সাহায্য করার জন্য সেই কাজ করে গেলেন। কিন্তু যে তাঁদের বেধড়ক মারল তাকে তাঁরা ধরতে পারলেন না।

শেষপর্যন্ত ওই মারের হাত থেকে বঁাচার জন্য তাঁরা ঘর থেকে কোনোমতে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু সিঁড়ির দিকে এগোতে পারলেন না।

সিঁড়ির দিক থেকে তাঁদের দিকে কেউ যেন কালির বেশ বড়ো একটা বোতল ছুড়ে মারল। তাঁদের সারা শরীর কালিতে ভরে যায়। কিন্তু কে এই কাজ করল তা তাঁরা উদ্ধার করতে পারলেন না।

লি পোর্তের বাড়িতে এমন সব ঘটনার রহস্য আজও রহস্যই থেকে গিয়েছে। মাঝে মাঝে কিছুদিন অশরীরী শক্তির ওই ঘটনা বন্ধ থাকে। কিন্তু কিছুদিন পর ফের অশরীরী শক্তির উৎপাত শুরু হয়ে যায়।

বিভিন্ন মহলের তরফে অনেক চেষ্টার পরও সেই বাড়ির রহস্যজনক সমস্যার মীমাংসা হয়নি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%