অমিত দেবনাথ
সেই পুরোন ব্রুক স্ট্রিটের বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম হেমলক জোনস ফায়ারপ্লেসের পাশে বুঁদ হয়ে বসে গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছে। পুরোন দিনের মতোই, আমি ওর কাছে গিয়ে ওর পায়ে একটা ঠোক্কর দিলাম। এটা অবশ্য করলাম দুটো কারণে – এক, যাতে ওকে ঝুঁকে ভালো করে দেখা যায়, আর অন্যটা অবশ্য সেই পুরোন কারণ, আমি এভাবেই ওকে, ওর অতিমানবিক অন্তর্দৃষ্টিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকি। যদিও সে নিজের চিন্তায় এতই মগ্ন ছিল যে আমার দিকে একবার তাকাল না পর্যন্ত। কিন্তু না – আমারই ভুল, ওর বুদ্ধিমত্তাকে বুঝতে আমার বরাবরই ভুল হয়ে যায়। মাথাটা না তুলেই বলল সে, “বৃষ্টি হচ্ছে।”
“বাইরে বেরিয়েছিলে বুঝি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“নাঃ। কিন্তু তোমার ছাতা ভেজা, আর তোমার ওভারকোট, যেটা খুলে রেখেছ, সেটা থেকেও জল ঝরছে।”
আমি চমৎকৃত হলাম। কী নজর! একটু চুপ করে থেকে ব্যাপারটা শেষ করার জন্যই ও বলল, “আর তা ছাড়া, জানলায় বৃষ্টির জল ঝরে পড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কান খাড়া কর, তুমিও শুনতে পাবে।”
যদিও নিজের কানের ওপর আমার কোনও দিনই ভরসা নেই, তবুও আমি শুনতে পেলাম পরিষ্কার – জানলার কাঠে জল ঝরে পড়ছে রিমঝিম শব্দে। নাঃ, এই লোকটার জবাব নেই!
“তুমি কি ব্যস্ত?” আমি প্রসঙ্গ পালটালাম, “নতুন কোনও সমস্যা – যেটা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও সমাধান করতে পারেনি?”
ওর পা দুটো একটু নড়ে উঠল, একটু যেন ইতস্তত করল ওগুলোকে আবার আগের জায়গায় নিয়ে যাবে কিনা ভেবে। তারপর বলল, “সামান্য ব্যাপার – বলার মতো কিছু নয়। ক্রেমলিন থেকে কিছু রুবি হারিয়েছে, সে ব্যাপারে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন প্রিন্স কোপোলি; পুটিবাদের রাজা তাঁর সমস্ত দেহরক্ষীদের গলা কেটে দেওয়ার পর রত্নখচিত তরোয়ালটা খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আমার সাহায্য চাইতে এসেছিলেন; প্রেটজেল-ব্রন্টসুইগের গ্র্যান্ড ডাচেস এসেছিলেন তাঁর স্বামী ফেব্রুয়ারির চোদ্দ তারিখে রাত্রে কোথায় ছিলেন সেটা জানার জন্য, আর গত রাত্তিরে –” গলাটা একটু নামিয়ে বলল সে, “এই বাড়িরই এক বাসিন্দা এ বাড়ির সিঁড়িতেই আমাকে ধরেছিল, ওরা কেন সে বেল বাজাতেও সাড়া দিচ্ছে না, সেটা জানার জন্য।”
প্রায় হেসে ফেলেছিলাম আর কি – কিন্তু দেখলাম ওর কপালে ভাঁজ পড়েছে।
“মনে রেখো,” সে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি কিন্তু “পল ফেরোল তার স্ত্রীকে কেন খুন করেছিল” বা “জোনসের কী হয়েছিল” – এসব মামুলি রহস্যেরও সমাধান করে ফেলেছি।”
শুনে আমি বাক্যহারা হয়ে গেলাম। এগুলো মামুলি রহস্য! কিন্তু কিছু বলার আগেই সে একটুক্ষণের জন্য থামল, তারপর হঠাৎই ফিরে গেল তার সেই কেজো, নীরস কথা বলার ভঙ্গিতে।
“শোন, আমি যখন বলছি এগুলো তুচ্ছ, তখন এগুলো তুচ্ছ, কারণ আরেকটা ঘটনা ঘটেছে। বিরাট ঘটনা। আর ঘটেছে কিনা আমার সঙ্গেই। চমকাবে তো বটেই, কারণ আমার সঙ্গে ঘটেছে মানে বিরাট ব্যাপার। আমার ঘরে চুরি হয়েছে। ভাবতে পারো?”
“তো-তোমার ঘরে চুরি! তুমি হেমলক জোনস, অপরাধীদের যম, আর তোমার ঘরে -!” আমার কথা আটকে গেল।
“ঠিক তাই। শোন, এ জিনিস তো আর সবাইকে বলা যায় না, তবে তুমি যেহেতু প্রথম থেকেই আমার সঙ্গে আছো, আমার কর্মপদ্ধতি জানো, যেহেতু তোমার লেখার জন্য আমার কিছু কিছু কর্মপদ্ধতি সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছে; যে তুমি দিনের পর দিন পরমানন্দে আমার আস্থাভাজন হয়ে থেকেছ, পাগলের মতো আমাকে শ্রদ্ধাভক্তি করেছ, আমার মোসাহেব, আমার ক্রীতদাস হয়ে আমার পা চেটেছ; যে তুমি আমার জন্য তোমার প্র্যাকটিস প্রায় ছেড়েই দিয়েছ – অবশ্য কিছু কিছু রোগী তুমি এখনও দেখে থাকো – যারা পয়সাকড়ি কিছুই দেয় না এবং যাদের শরীরের অবস্থা খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন – আমার সমস্যার কথা ভাবতে গিয়ে যাদের তুমি কুইনিনের বড়ির বদলে স্ট্রিকনিন আর এপসম সল্টের বদলে আর্সেনিক দাও; যে তুমি আমার কাছে তোমার সর্বস্ব নিবেদন করেছ – সেই তোমাকেই আমি একমাত্র এই কথা বলতে পারি।”
আমি অভিভূত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম, কিন্তু এর মধ্যেই সে গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে, যান্ত্রিকভাবে হাত রেখেছে তার ঘড়ির চেনে, যেন সময় জানতে চাইছে। “বোসো,” বলল সে, “চুরুট চলবে?”
“আমি চুরুট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি,” আমি বললাম।
“কেন?”
আমি ইতস্তত করলাম একটু। কেন ছাড়লাম, সেটা জানানোটা খুব গর্বের ব্যাপারটা নয়। আসলে আমার প্র্যাকটিসের যা অবস্থা, তাতে ওর খরচা আর পোষানো যাচ্ছে না। পাইপ অবধি ঠিক আছে। তাই অত আর ভাঙলাম না, শুধু হেসে বললাম, “পাইপ খেতেই বেশি ভালো লাগছে।” হেসেই উড়িয়ে দিলাম ব্যাপারটা। তারপর বললাম, “চুরির ঘটনাটা বল। কী চুরি হয়েছে?”
এর উত্তরে সে উঠে ফায়ারপ্লেসের সামনে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আমার সেই চুরুটের বাক্সটার কথা মনে আছে, যেটা হিলিয়ারি থিয়েটারে গ্র্যান্ড ভিজিয়ারের কোরাস দলের একটা মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটার সমাধান করে দিয়েছিলাম বলে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত আমায় উপহার দিয়েছিলেন? সেই চুরুটের বাক্সটা চুরি গেছে। হিরে বসানো ছিল এর মধ্যে।”
“যার সবচেয়ে বড়ো হিরেটার বদলে কাচ বসানো ছিল,” আমি বললাম।
জোনসের মুখে একটা অদ্ভুত হাসি লক্ষ করলাম। “ও, তুমি জানো তাহলে?”
“তুমিই তো বলেছো। তোমার আশ্চর্য ক্ষমতার পুরস্কার হিসেবেই এটা আমার মনে আছে। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই বলছ না যে এটাই চুরি গেছে?”
সে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এটা চুরি গেছে সত্যি, কিন্তু এটাও সত্যি, যে আমি এটা খুঁজে বার করবোই। একাই। তুমি ভালো করেই জানো যে তোমার পেশায় কেউ অসুস্থ হলে সে নিজে ডাক্তারি করে না, বরং আরেকজন বন্ধু ডাক্তারকে ডেকে পাঠায়। এখানেই তোমাদের সঙ্গে আমাদের তফাৎ। আমার সমস্যা আমিই সমাধান করব।”
“কীভাবে করবে?” আমি কৌতূহলী হলাম। “এতক্ষণ তো এটা পেয়ে যাওয়া উচিত ছিল বলেই আমার মনে হয়।”
“জানবে, জানবে,” সে বলল হালকা সুরে। “যদিও আমি এর সমাধান একাই করব বলেছি, তবুও তোমার চিন্তা ভাবনাকেও একটু সম্মান জানানো দরকার। তুমি এ বিষয়ে কী ভাবছো বল দেখি?”
কাষ্ঠহাসি হেসে সে পকেট থেকে একটা নোটবই আর পেনসিল বার করে আনল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মহান হেমলক জোনস আমার কথা শুনতে চাইছে! আমার মতো একটা তুচ্ছ লোকের কাছ থেকে! আমি জোনসের হাতে চুমু খেলাম ভক্তিভরে। গদগদ স্বরে বললাম:
“প্রথমেই আমি যা করতাম, তা হল পুরস্কার ঘোষণা করে কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া। হ্যান্ডবিলও ছাপাতাম অবশ্য, সেগুলো বিলি করতাম পানশালা আর খাবারের দোকানগুলোয়। বিভিন্ন বন্ধকী কারবারির দোকানগুলোয় ঢুঁ মারতাম, পুলিশে খবর দিতাম। চাকরবাকরগুলোকে পরীক্ষা করে দেখতাম, বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজতাম, এমনকী নিজের পকেটগুলোও খুঁজতাম। মানে নিজের বলতে এখানে আমি তোমার পকেটের কথাই বলছি।” আমি হেসে ফেললাম।
সে গম্ভীরভাবে খাতায় এগুলো সব নোট করে নিল।
“এগুলো সবই নিশ্চয়ই তুমি করে ফেলেছো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হয়তো করেছি,” তার নোটবইটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল জোনস, “শোন, তোমাকে খানিকক্ষণ একা থাকতে হবে। আমি একটু বেরোচ্ছি। তুমি ওই সামনের তাকগুলো দেখ, হয়তো ওখানে তোমার পছন্দসই জিনিস পাবে। সময় কাটিয়ে দিতে পারবে। ওদিকে রইল তামাক আর পাইপ, টেবিলে রইল হুইস্কি।” আমার দিকে ঝুঁকে অদ্ভুত মুখ করে সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আমি ওর কর্মপদ্ধতি জানি বলে এতে মোটেই আশ্চর্য হলাম না। হয়তো আচমকা কোনও চিন্তা মাথায় এসেছে, যাতে তদন্তের সুবিধে হয়।
তাকগুলোতে একবার চোখ বোলালাম। ছোট ছোট অনেক কাচের জার, যাতে লেবেল মারা: “ফুটপাথ আর রাস্তার ধুলো, পায়ের ছাপ ধরার জন্য।” এগুলো অবশ্য লন্ডন শহরতলির প্রধান প্রধান রাস্তা থেকে নেওয়া। সেখানে এরকম আরও অনেক জার আছে, কোনোটায় লেখা “বাস আর গাড়ির সিটের ফেঁসো,” কোনোটায় “কার্পেট আর শতরঞ্চির নারকেল দড়ির আঁশ,” “প্যালেস থিয়েটারের “এ” সারির ১-৫০ সিটের মেঝেয় পড়া সিগারেটের টুকরো আর ছাই” - ইত্যাদি। আশ্চর্য মানুষটার উদ্ভাবনী শক্তির ছাপ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
মুগ্ধ হয়ে এই সব দেখছি, এমন সময় ক্ষীণ একটা আওয়াজ করে দরজাটা খুলে গেল। তাকিয়ে দেখি একটা লোক ঘরে ঢুকেছে। রুক্ষ চেহারা, বিশ্রী ওভারকোট, গলায় আরও বিশ্রী মাফলার জড়ানো আর মাথায় টুপি। কে এটা? প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি, লোকটা ঘিনঘিনে গলায় ক্ষমা চেয়ে বলল তার নাকি ঘর চিনতে ভুল হয়ে গেছে, তারপর সুড়ুৎ করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আমি যেহেতু চুরির ঘটনাটা সিরিয়াসলি ভাবছিলাম, কাজেই এই লোকটার আচমকা ঘরে ঢোকার ব্যাপারটা আমায় বেশ চিন্তায় ফেলে দিল। আমি তো আমার বন্ধুর স্বভাব চরিত্র জানি। কখন যে কোন ঘোরে থাকে তার ঠিক নেই। সেই রকম ঘোরের মাথায় যখন তখন সে ঘর থেকে বেরিয়েও যায়। তখন ঘরের জিনিসপত্র যে কদ্দুর ঠিকঠাক থাকে, সন্দেহ আছে। হয়তো ড্রয়ার খোলা রেখেই চলে গেল। কয়েকটা ড্রয়ার টেনে দেখলাম, যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই। কোনোটাতেই চাবি দেওয়া নেই, যদিও একটা ড্রয়ার কেন যেন পুরোটা খুলতে পারলাম না। এটার হাতলটা চটচট করছে, যেন কেউ নোংরা হাতে ওটা ধরেছিল। এরকমটা তো হওয়ার কথা নয়, কারণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আমি জোনসের খুঁতখুঁতুনির কথা জানি। ভেবেছিলাম এ ব্যাপারটা ওকে জানাব, কিন্তু ভুলে গেলাম আর তার ফলেই আমার – না থাক, পরের কথা আগে বলে ফেলছি।
কিন্তু বহুক্ষণ হয়ে গেল জোনস ফিরছে না। খুবই আশ্চর্য ব্যাপার। কি আর করবো, শেষ অবধি আগুনের পাশে বসে জানলার ওপর ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্ন দেখছিলাম কিনা জানি না, ঘুমের মধ্যে মনে হল কে যেন আমার পকেটের ওপর আলতো করে হাত বোলাচ্ছে। চুরির গল্পেরই প্রভাব আর কী! জেগে উঠে দেখি হেমলক জোনস মেঝেয় পাতা কম্বলের অন্য দিকে বসে একদৃষ্টে আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকাতেই সে মৃদু হাসল, বলল, “তুমি ঘুমোচ্ছিলে দেখে আর ডাকিনি।”
আমি চোখ রগড়ে বললাম, “খবর কী? কাজ কিছু এগোলো?”
“যা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও ভাল,” সে নোটবইটায় টোকা মেরে বলল, “আর এর জন্য তোমারও ধন্যবাদ প্রাপ্য, বন্ধু।”
শুনে বুক দশ হাত হয়ে গেল আমার। চুপ করে রইলাম, ভাবলাম, দেখি জোনস আর কি বলে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে কিছুই বলল না। মাঝে মাঝে ভুলেই যাই যে হেমলক জোনস সবার থেকে আলাদা। আমি তাকে সেই লোকটার ঘরে ঢোকার কথাটা বললাম, সেটা শুনেও সে একটু হাসল মাত্র।
পরে আমি যখন বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি, দেখি সে আমার দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। মজার হাসি। বলল, “বিয়ে করেছ যখন, তখন বলি, বাড়ি ফেরার আগে নিজের কোটের হাতাটা ঝাড়তে ভুলো না। তোমার হাতার ভেতরের দিকে কয়েকটা ছোট ছোট বাদামি চুল লেগে রয়েছে – কাউকে জড়িয়ে ধরেছিলে নাকি হে?”
“এই তোমার ভুল ধরেছি,” আমি বিজয়গর্বে বলে উঠলাম, “ওটা আমার মাথার চুল। আসার আগে সেলুনে গেছিলাম চুল ছাঁটাতে, হাতটা বোধহয় অ্যাপ্রনের বাইরে ছিল।”
জোনসের ভুরুটা কুঁচকে উঠল, তবে সে সামান্য সময়ের
জন্যই, বরং বেরোনোর আগে সে আমাকে একেবারে জড়িয়ে ধরল। ওর মতো আবেগহীন মানুষের কাছ থেকে এরকম উষ্ণ আলিঙ্গন ভাবাই যায় না। তারপর ওভারকোটটা পরতে সাহায্য করল, পকেট-টকেটগুলো ঝেড়েঝুড়ে ঠিকঠাক করে দিল। এমনকি ফিটিংটা যাতে ঠিকঠাক হয়, তার জন্য ওভারকোটের হাতা, জামার হাতা, আস্তিন – সমস্ত জায়গাই চেপে চেপে সমান করে দিল। তারপর পিঠে চাপড় মারতে মারতে বলল, “আবার এসো।”
“যখন বলবে, তখনই,” আমি বললাম। “শুধু দুবেলা দশটা মিনিট করে সময় দাও খাওয়ার জন্য, আর রাতে চার ঘন্টার ঘুম – বাকি সময়টার পুরোটাই তোমার জন্য – তুমি তো জানোই।”
“সে তো বটেই,” বলল সে, মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ঝুলিয়ে রেখে। সে হাসির মানে বোঝে কার সাধ্য!
ব্যাপারটা হল, এরপরে কিন্তু আমি বাড়ি গিয়েও জোনসের দেখা পাইনি। একদিন বিকেলে আমি যখন আমার নিজের বাড়ির কাছাকাছি এসেছি, জোনসকে দেখলাম ওর অন্যতম প্রিয় ছদ্মবেশে – নীল লম্বা-ঝুলো কোট, স্ট্রাইপড সুতির প্যান্ট, বিরাট তোলা কলার, কালচে মুখ আর সাদা চুলে, হাতে একখানা ড্রাম। অন্য যে কোনও লোকের কাছে এই ছদ্মবেশ অপরিচিত হলেও আমি জানি বলে এক নজরেই তাকে চিনে ফেললাম। কথা বলিনি যদিও, বরং পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম, কারণ আমাদের মধ্যে কথাই আছে, এরকম অবস্থায় কেউ কাউকে চিনব না, বরং পরে এই নিয়ে কথা হবে। আরেকদিন ইস্ট এন্ড-এর এক পাবলিকানের স্ত্রীর চিকিৎসা করতে গিয়ে তাকে দেখলাম – বিধ্বস্ত এক মিস্তিরি সেজে কাছের এক বন্ধকি দোকানের জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে। আমার কথাগুলো সে মানছে দেখে খুবই আনন্দ হল আমার, আনন্দের চোটে তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলাম, সেও দেখলাম দিব্যি সেটা ফিরিয়ে দিল। কেউ বুঝতে পারেনি যদিও।
দুদিন বাদে আমি একটা চিরকুট পেলাম। জোনসই পাঠিয়েছে সেটা, সেদিন রাত্তিরে তার বাড়িতে দেখা করতে বলেছে। বলতে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে, তবুও বলছি, সেই দেখা আমার জীবনের একটা অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা এবং সেই দেখাই হেমলক জোনসের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি যতদূর সম্ভব ঘটনাটা গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, যদিও সেটা ভাবলেই এখনও আমার বুক ধকধক করছে।
সেদিন গিয়ে দেখলাম সে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে এমন একটা চাহনি, যেরকম চাহনি আমি তার সঙ্গে যতদিন ছিলাম, তার মধ্যে একবার কী দুবার দেখেছি। একাগ্র সে চাহনিতে রয়েছে শুধুমাত্র সঠিক যুক্তিসম্পন্ন চিন্তা এবং সে চাহনিতে করুণা বা সহানুভূতির ছাপ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন শীতল যুক্তিবোধের এক মূর্ত প্রতীক। তীক্ষ্ণ মনঃসংযোগে তার সারা শরীর এমন শুকিয়ে গেছে যে পোশাক হয়ে গেছে ঢলঢলে, চিন্তা করার শক্তি তীক্ষ্ণতম বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছনোয় মাথা শুকিয়ে ছোট হয়ে তার টুপি কপাল থেকে
হড়কে নেমে আক্ষরিক অর্থেই তার বড় বড় কানের ওপর ঝুলছে। আমি ঘরে ঢোকার পরেই জোনস দরজা আটকে দিল, জানলা বন্ধ করে দিল এবং এমনকি একখানা চেয়ার রেখে চিমনির সামনের জায়গাটাও বন্ধ করে দিল। তার এই কান্ডকারখানা মন দিয়ে দেখছি, এমন সময় সে একখানা রিভলভার বার করে আমার কপালে ঠেকিয়ে বরফঠান্ডা গলায় বলল, “চুরুটের বাক্সটা ফেরত দাও!”
হতবুদ্ধি হয়ে গেলেও উত্তরটা আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল স্বতস্ফূর্তভাবে। “আমি নিইনি।”
তিক্ত হেসে সে পকেটে গুঁজে ফেলল রিভলভারটা। “এই উত্তরই আশা করেছিলাম। ঠিক হ্যায়, এবার এমন জিনিস দেখাচ্ছি যে বাপ বাপ বলে স্বীকার করবে।” সে পকেট থেকে একখানা রোল করা কাগজ আর নোটবই বার করে আনল। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না, তাও বললাম, “তুমি নিশ্চয়ই ঠাট্টা করছ! তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস কর না যে আমি –”
“কথা বন্ধ!” হুংকার দিয়ে উঠল জোনস, “বোসো চুপচাপ!” আমি বসলাম।
“তুমি নিজের ফাঁদে নিজেই জড়িয়ে পড়েছ,” তার গলায় বিন্দুমাত্র দয়ার ছাপ নেই। “আর কার ফাঁদে জানো? আমার পাতা ফাঁদে! বছরের পর বছর তুমি এই ফাঁদ অন্যের জন্য পাততে দেখেছ! আমি একেবারে প্রথম দিনটায় চলে যাচ্ছি, যেদিন তুমি প্রথম চুরুটের বাক্সটা দেখেছিলে।” কাগজটা দেখতে দেখতে ঠান্ডা গলায় বলল জোনস। “সেদিন তুমি কী বলেছিলে? “কী সুন্দর! আমার যদি এরকম একটা থাকত!” এটাই তোমার অপরাধের প্রথম চিহ্ন এবং আমার প্রথম সনাক্তকরণ, কারণ তোমার ওই “আমার যদি এরকম একটা থাকত” আসলে “আমাকে এরকম একটা পেতে হবে”। শুধু তাই নয়, আসলে “আমি এটা বাগাবো কীভাবে”। চোপ! কোনও কথা নয়! তুমি তাই ভেবেছিলে! তবে আমি জানতাম, শুধু এটুকু নয়, আমি আরও সূত্র পাবো, কারণ তুমি চুরুট খাও।”
“কিন্তু,” বলতে গিয়ে আমার গলা বুজে এল, “আমি তোমাকে বলেছিলাম আমি চুরুট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।”
“মূর্খ!” ঠান্ডা গলায় বলল জোনস, “ওটা তোমার দ্বিতীয় ভুল। হ্যাঁ, তুমি আমাকে বলেছিলে! দোষ ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা। আমি আগেই বলেছিলাম, শুধু তোমার গতিবিধির ওপর নজর রাখলেই হবে না, দেখতে হবে এমন কী ঘটল, যাতে তুমি চুরিবিদ্যা ধরলে। আর তা হল – প্রেম! সমস্ত আবেগের মধ্যে এই আবেগই সাংঘাতিক, আর তুমি এটা অস্বীকার করতে পারো না,” তার গলা রীতিমত খিটখিট করছে, “সেই রাতে তোমার কোটের হাতায় তার প্রমাণ ছিল।”
“কিন্তু,” আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম, কিন্তু সে তার আগেই আরও জোরে হুংকার ছেড়ে আমায় থামিয়ে দিয়েছে। “চোপ! আমি জানি তুমি কী বলবে! তুমি বলতে যাচ্ছিলে যে তুমি যদি লোমশ চামড়ার পোশাক পরা কমবয়সী কাউকে জড়িয়েও ধরে থাকো, তার সঙ্গে এই চুরির কি সম্পর্ক? বোঝাচ্ছি! ওই লোমশ চামড়ার পোশাক তোমার এই হীন মনোভাবের চরিত্র বোঝাচ্ছে। হালকা ধরণের সাহিত্য পড়ার অভ্যেস যদি তোমার থাকতো, তাহলে বুঝতে যে এই লোমশ চামড়ার পোশাক খুবই ইতর প্রকৃতির প্রেম ইঙ্গিত করে। তুমি তোমার মান সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে এই চোরাই চূরুটের বাক্সটার বদলে ওই চামড়ার পোশাকওলার কাছে গেছ। ছি ছি! টাকা নেই, পয়সা নেই, পশার তলানিতে ঠেকেছে, কাজেই চুরিচামারি করে ওই সব হীন প্রবৃত্তি মেটানো ছাড়া আর উপায় কি! তাও তোমার কপাল ভাল, শুধু তোমার মুখ চেয়ে আমি সেই পোশাকওলার পিছু নিইনি। চুপ চুপ! একটা কথা নয়! কি কারণে তুমি এটা চুরি করেছিলে শুনলে, এবার কীভাবে চুরি করেছিলে তা শোনো। সাধারণ লোক অবশ্য চোরাই মালটা কোথায় গেল, সেটা দিয়েই শুরু করে। কিন্তু সেটা আমার পদ্ধতি নয়।”
আমি জানতাম আমি নির্দোষ, কিন্তু তার কথার জাদুতে বিমোহিত হয়ে কান পেতে রইলাম আমার অপরাধের কথা শোনার ইচ্ছায়।
“আমি যেদিন তোমাকে চুরুটের বাক্সটা দেখিয়ে হেলাফেলা করে ড্রয়ারে রেখেছিলাম, সেই রাত্তিরেই তুমি ওটা ঝেড়েছ। তুমি ওই চেয়ারে বসেছিলে আর আমি তখন কী একটা পাড়তে তাকের কাছে গেছিলাম। তক্ষুনি তুমি জিনিসটা নিয়ে নিয়েছিলে চেয়ার থেকে না উঠেই। কোনও কথা বলবে না! মনে আছে, সেদিন রাত্রে আমি তোমাকে ওভারকোট পরতে সাহায্য করেছিলাম? আমি আসলে তোমার হাতটা দেখছিলাম। তোমাকে সাহায্য করার নামে আমি একটা স্প্রিং-এর ফিতে দিয়ে তোমার কাঁধ থেকে কবজির মাপ কতখানি, সেটাই মাপছিলাম। তারপর তোমার দরজির কাছে গিয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে যাই। তোমার চেয়ার থেকে ড্রয়ার অবধি এক্কেবারে সেই মাপ।”
আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম।
“তার পরেরগুলোও শোনো তাহলে। তুমি তার পরেও ড্রয়ার খোলার চেষ্টা করেছ। না না, চমকে উঠো না! সেই রাত্রে যে লোকটা মাফলার পেঁচিয়ে এ ঘরে ঢুকেছিল – সেটা আমি। আরও শুনবে? সে রাত্রে আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে এ ঘরে একা রেখে বেরিয়ে গেছিলাম আর তার আগে ড্রয়ারের হাতলে সাবান লাগিয়ে রেখে গেছিলাম। তোমার হাতে সেই সাবান লেগে ছিল। বেরোনোর আগে হ্যান্ডশেক করার সময়ই আমি তা টের পেয়েছি। তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে, তখন তোমার পকেট হাতড়েছি, যদি কিছু পাওয়া যায়। বেরোনোর আগে তোমায় জড়িয়ে ধরেছিলাম – আসলে বুঝতে চাইছিলাম শরীরের কোথাও চুরুটের বাক্স বা অন্য কিছু লুকিয়ে রেখেছ কিনা। এতে আমি আরও নিশ্চিত হয়েছি যে মালটা তুমি এর মধ্যেই কোথাও পাচার করে দিয়েছ, কী কারণে, সেটা তোমায় বলেছি। তাও আমার মনে হয়েছিল তোমার যদি অনুশোচনা হয়, যদি অপরাধ স্বীকার কর – তার জন্য তোমার রাস্তাতেই দুবার হেঁটেছি, একবার মুখে কালিঝুলি মাখা নিগ্রো গায়ক সেজে, আরেকবার মিস্তিরি সেজে সেই বন্ধকির দোকানে, যেখানে তুমি চোরাই মাল বেচতে গেছিলে।”
আমি এবার ফেটে পড়লাম। “কিন্তু তুমি বন্ধকির দোকানে জিজ্ঞেস করলেই তো জানতে পারতে যে তুমি কতটা ভুল –”
“মূর্খ!” তার গলার আওয়াজ এখন সাপের মতো হিসহিস করছে। “বন্ধকির দোকানে ঢুঁ মারতে বলাটা ছিল তোমার পরামর্শ। তুমি কি ভেবেছিলে তোমার ওই সব পরামর্শ আমি মেনে চলব – একটা চোরের পরামর্শ!”
“তুমি কি তোমার ড্রয়ারগুলো খুঁজে দেখেছিলে?” আমি তেতো গলায় বললাম।
“না,” তার গলা এখন শান্ত।
পাগল পাগল লাগছিল আমার। উঠে গিয়ে কাছের ড্রয়ারটা ধরে এক টান মারলাম। আগের দিনের মতোই যথারীতি এটা পুরোটা খুললো না। ভাল করে পরীক্ষা করে দেখি কিছু একটা ড্রয়ারের ওপর দিকটায় আটকে গেছে বলেই এটা খুলছে না। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বার করে আনলাম জিনিসটা। এটা সেই হারানো চুরুটের বাক্স। ফুর্তিতে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা দিয়ে। আমি ঘুরে জোনসের দিকে তাকাতেই তার মুখের যা চেহারা দেখলাম, তাতে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল আমার। দেখলাম তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একটা ঘৃণার ছাপ পড়েছে। “ও! আমার ভুল হয়েছিল,” ধীরে ধীরে বলল সে, “তোমার দুর্বলতাগুলোও আমার ভাবা উচিত ছিল। তোমার সম্বন্ধে আমি একটু বেশিই ভেবে ফেলেছিলাম। তোমার সাহসই নেই। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি পরেরদিন রাত্তিরে তুমি কেন ড্রয়ার খুলেছিলে। সম্ভবত আরেকটা চুরির ধান্দায় তুমি বন্ধকি দোকান থেকে চুরুটের বাক্সটা ফেরত এনে এখানে রেখে দিয়েছিলে – এই হাস্যকর উপায়ে। তুমি ভেবেছিলে এভাবে আমাকে ভুল পথে চালিত করবে। আমার সুনাম নষ্ট করবে। বেরোও! বেরোও এখানে থেকে! তিন তিনজন পুলিশ পাশের ঘরে অপেক্ষা করছে, তাদের আমি ডাকছি না, কিন্তু তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। আর কোনও দিন যেন তোমার মুখ না দেখি!”
আমি হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে সে স্রেফ আমার কান ধরে ঘরের বাইরে বার করে দরজা বন্ধ করে দিল। একটু পরেই আবার খুলল, সেখান থেকে ছিটকে এল আমার টুপি, ওভারকোট, ছাতা আর গামবুট, তারপর সেই দরজা আমার জন্য বন্ধ হয়ে গেল চিরকালের মতো।
আমার সঙ্গে হেমলক জোনসের আর দেখা হয়নি। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে এরপরই আমার প্র্যাকটিস বাড়তে শুরু করল চড়চড় করে – পুরোন রোগীদের অনেকেরই চিকিৎসা শুরু করলাম আবার এবং তাদের মধ্যে কিছু আবার ভালও হয়ে গেল। আমি ধনী হয়ে গেলাম। ওয়েস্ট এন্ড-এ একটা বাড়ি কিনলাম, একটা ব্রুহ্যাম কিনলাম। কিন্তু আমি যখনই সেই আশ্চর্য মানুষটার আশ্চর্য মনঃসংযোগ আর অন্তর্দৃষ্টির কথা ভাবি, শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে আসে! ভাগ্যিস আমি সেই চুরুটের বাক্সটা চুরি করেছিলাম!
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন