অমিত দেবনাথ
শার্লক হোমস আধশোয়া হয়ে আছেন তাঁর চেয়ারে, তাঁর চোখ ঘুরছে সারা ঘরের আনাচে-কানাচে বরাবরের অভ্যেস মতই। যখন তিনি নিজের বাড়িতে থাকেন, তখনও - সেই বিরল কিছু মুহূর্তেও তাঁর চোখের গোয়েন্দা সত্ত্বাটা হারায় না - কড়া নজর রাখে সারা ঘরের ভেতর, যদি কোনও কিছু আবিষ্কার করা যায়। কাজেই এই ঘরে অনিয়ম কিছু হওয়ার উপায় নেই। যেমন ধরা যাক- বাটলার কক্ষণো বলবে না যে জগে রাখা পুরোনো দুষ্প্রাপ্য ক্ল্যারেট মদ্টা বেড়ালে খেয়ে গেছে, বরং বলবে যে সে বোতল পরিষ্কার করার সময় ভুল করে ওটা ভিনিগার ভেবে ফেলে দিয়েছে। ভেড়ার মাংসের রাং-এর যে খন্ডটা বাড়ির সবাই ভাবছে ঠান্ডা করা হচ্ছে পরিবেশনের জন্য, রাধুনি একবাক্যে স্বীকার করে নেবে যে বেড়ালবাচ্চাটাই ওটা খেয়ে গেছে। এবং এটা বলার সময় সে এটাও বলবে যে এই কান্ডটা দেখে সে এমন চেঁচিয়েছিল যে রাস্তার টহলদার মোটা পুলিশটাও দাঁড়িয়ে পড়েছিল তার চিৎকার শুনে, এবং শুধু তাই নয়, রান্নাঘরে উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখেও গেছে।
যাই হোক, শার্লক হোমস চেয়ারে আধশোয়া হয়ে ঘরের চারপাশে নজর করতে করতেই খেয়াল করলেন তার কাছের চেয়ারটার পেছনে তাঁর স্ত্রীর সিল্কের শালটা দলামোচড়া করে রাখা। এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছুই নেই, অনেকেই অনেক সময় জামাকাপড় ওরকম তালগোল পাকিয়ে রাখে। কিন্তু তিনি শার্লক হোমস- তাঁর চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। তিনি উঠে গিয়ে শালটা তুলে নিয়ে ভাল করে দেখলেন। হুঁ, যা ভেবেছিলাম। শালের গায়ে একটা ছোট কোঁকড়া সোনালী চুল লেগে আছে। ম্যান্টলপিসের উপরে রাখা আয়নায় নিজেকে দেখলেন তিনি। না, তাঁর চুল কালো আর সোজা। “ওঃ, হ্যারিয়েট, হ্যারিয়েট,” তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কয়েকটা কথা বিড়বিড় করে, “শেষ পর্যন্ত তুমিও!” তাঁর মুখে ভাঁজ পড়েছিল, হঠাৎই সেই মুখ চকচকে হয়ে উঠল, উঠে গিয়ে বেল বাজালেন তিনি। ঘরে ঢুকল একজন ঝি, বেশ চালাকচতুর চেহারা।
“লুসি,” সপাটে প্রশ্ন করলেন শার্লক, “কাল রাত্রে বেরিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“কারোর সঙ্গে দেখা করেছিলে? ছোকরা গোছের?”
“হ্যাঁ - মানে হ্যাঁ স্যার,” ঝির গলায় রাগ রাগ ভাব।
“তুমি গিন্নিমার শাল গায়ে দিয়ে বেরিয়েছিলে।”
“ওঃ, স্যার,” ঝির গলা আবেগে বুজে এল, “ভুল হয়ে গেছিল, অন্ধকারে বুঝতে পারিনি।”
“সেই ছোকরার মাথার চুল সোনালী আর কোঁকড়া, সে তার মাথাটা তোমার কাঁধে রেখেছিল, আর তোমার কাঁধে ছিল গিন্নিমার শাল।”
“হ্যাঁ স্যার, আপনার কাছ থেকে তো কোনও কিছু লুকিয়ে রাখার জো নেই।”
“ঠিক আছে। তুমি রান্নাঘরে যেতে পার।”
“আচ্ছা স্যার, ধন্যবাদ স্যার,” লুসি প্রায় দৌড়েই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে, কাল্পনিক চোখের জল মুছতে মুছতে। শার্লক হোমস আবার আধশোয়া হলেন চেয়ারে, মুখে একটা স্মিত হাসির ছাপ। “হ্যারিয়েট, তুমি সব সন্দেহের উর্দ্ধে।” তিনি চোখটা একটু বুঁজেছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তাকালেন দরজায় একটা গাড়ির আওয়াজ পেয়ে। তাকিয়ে দেখলেন তাঁর স্ত্রী নামছেন গাড়ি থেকে। “শাল নিয়ে কিছু বলব না,” ভাবলেন শার্লক। “হ্যারিয়েট এত অল্পেই রেগে যায়, হয়তো এখনই লুসির ওপর চোটপাট শুরু করবে।” এই সময় দরজা খুলে ঘরে ঢুকল তাঁর ছেলে।
“বাবা, আমি এসে গেছি। স্কুলে আমি আজকে খুব ভাল হয়েছিলাম - তোমার একটা গল্প বল না বাবা!”
“আজকে আবার জ্যামে পড়েছিস আর জ্যাম খেয়েছিস,” ছেলের হাতদুটো যে তার পেছনে, সেটা শার্লক হোমস আগেই খেয়াল করেছেন।
“কী করে জানলে?” ছেলের সরল প্রশ্ন।
“তোর মুখে আর থুতনিতে কী সব লেগে আছে, আর রং-ও পাল্টে গেছে। মনে হচ্ছে ওটা রাস্পবেরি জ্যামের দাগ। এক্ষুনি গিয়ে হাত মুখ ধো।” ছেলেটা একটা হাত বের করে মুখে একটু ছুঁয়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল গোমড়া মুখে।
তারপরেই ঘরে ঢুকলেন শ্রীমতী হোমস। তাঁকে দেখেই শার্লক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। “তুমি কোচোয়ানকে বেশি পয়সা দিয়েছ, ডিয়ার।”
“আরিব্বাস! আরে, কোচোয়ানকে আমি আধ-ক্রাউন দিতে সে বলল, এত পয়সা হাত থেকে গললো! কিন্তু তুমি জানলে কী করে?”
“জানলা দিয়ে আমি ওর মুখটা দেখেছিলাম। তুমি যদি তাকে যা ভাড়া, তাই দিতে, সে কিছুই বলত না, বরং ভাবত মেয়েছেলের কাছ থেকে আর কিছু আশা করা যায় না। যদি তুমি ওকে ভাড়ার ওপর দুপেন্স বেশি দিতে, তাহলে ও একটু অবাক হত, বলত, “ধন্যবাদ,” কিন্তু তুমি ওকে নির্ঘাৎ দ্বিগুণ ভাড়া দিয়েছ, আর তাতেই ওর হাবভাব এমন হয়ে গেল যে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেলাম। যাকগে, এখন তোমাকে আরেকটা কথা বলি। তুমি আজকাল একটু বেশি পয়সা খরচ করছ।” তাঁর স্ত্রী চেয়ারে বসে পড়লেন।
“হ্যাঁ, বোসো, বোসো, বলি ব্যাপারটা। লম্বা লিস্ট তো। তোমার একটা পালকের টুপি আছে; আছে তো? কী করে জানলাম? আমি দেখলাম তোমার গাউনের ঝালরে অস্ট্রিচের পালক লেগে আছে। তুমি তো তোমার মাথার ঢাকনায় সিল্কের বো পর, তখনই বুঝলাম তুমি টুপিওয়ালার তৈরি সবচেয়ে দামি টুপিটাই কিনেছ। আমি আরও দেখলাম, আমাদের প্রতিবেশী মিসেস জোনস আসতে যেতে তোমার দিকে তাকাচ্ছেন, তখনই বুঝলাম তোমার টুপিটা একেবারে নতুন। আরও আছে! আমি যখনই দেখলাম তুমি গাড়ি থেকে নামলে তোমার স্কার্টটা একটু উঁচুতে তুলে, অথচ রাস্তায় জলকাদা কিছুই নেই, তখনই বুঝলাম তুমি নতুন সায়া আর মোজাও কিনেছ। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? তুমি এখন ঘরে এসেছ আমাকে বলতে যে তোমার কিছু টাকা চাই, এই পঞ্চাশ পাউন্ড মতো - চেক দিলেই চলবে। তাই তো?”
“শার্লক,” বললেন মিসেস হোমস, “তোমার জবাব নেই। আমি যে একটু হাত খুলে খরচ করে ফেলেছি, আর তার জন্য যে তুমি কিছু মনে করনি, এতে আমার বুক ভরে গেছে। আমার যত টাকা লাগবে, তুমি এক্কেবারে সেই টাকাটাই বললে। তুমি বোধহয় ম্যাজিক জান।”
“এই নাও তোমার চেক। আর আমার কাছে কিছু লুকোনোর চেষ্টা কোরো না, সেটা অসম্ভব।” শার্লক হোমস আবার আধশোয়া হলেন তাঁর চেয়ারে, মুখে একটা তৃপ্তির হাসি। তাঁর হাত কোটের পকেটে। সেখানে একটা কাগজ খড়মড় করে উঠল। মিসেস হোমস ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন হাসিমুখে।
“স্মিথ অ্যান্ড সন যে ওদের বিলটা এত তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবে, কে জানত! ও ভেবেছে ওর পকেটে যে বিলটা আছে, সেটা আমি টের পাইনি! ওকে বশ করা কোনও ব্যাপার! ম্যাজিশিয়ানই বটে! হা হা হা!”
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন