অমিত দেবনাথ
আমরা লাফিয়ে উঠলাম রাতের ট্রেনে। সেই পুরোন গ্রোসার স্কোয়ারের দিনগুলোতে রাতের মেল ট্রেনে লাফিয়ে ওঠাই আমাদের দস্তুর ছিল। কামরায় বসলাম। গার্ডকে এক ঝলক দেখেই রোস বুঝে গেল যে সে কোনও এক সময় নরখাদক ছিল। লুকোনোর কোনও চেষ্টা না করেই সে সেটা বলে ফেলল গার্ডকে, আর একই সঙ্গে বলল আমাদের একটা খালি কামরা হলে ভাল হয়। গার্ড লোকটা করিৎকর্মা। সে দুজন বিশপ, একজন বয়স্ক প্রফেসর আর তিনজন চ্যাম্পিয়ন বক্সারকে একটা কামরা থেকে চোখের নিমেষে বার করে দিয়ে আমাদের বলল সেখানে বসতে। ট্রেন ছুটে চলেছিল নিজের গতিতে।
“খুবই রহস্যময় ব্যাপার, ওয়াটসিং,” বলল রোস অবশেষে।
“কোনটা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“এই সেন্ট অ্যাসটেরিস্ক-এর খুনটা।”
“মানে, বাক্সটন-স্মাইথের ব্যাপারটা বলছো? সে তো আমি – মানে আমরা বহু আগেই কিনারা
করেছি।”
“না না, ওটা নয়,” রাগের সুরে বলল রোস। কেন জানি না ওটার কথা তুললেই রোস রেগে যায়। “এটা অন্য ব্যাপার। ওয়াটসিং –” হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল, “আজ সকালে তুমি ঠান্ডা জলে দাড়ি কামিয়েছ কেন?”
“মোটেই না। তুমিই বা কেন বিকেলে বেরোনোর আগে শুধু লেমন স্কোয়াশ খেয়ে এসেছ শুনি?”
“কী আশ্চর্য, ওয়াটসিং, তুমি কী করে –”
“চুক চুক! এত ছোটোখাটো জিনিস আমি ব্যাখ্যা করি না, রোস। কিন্তু সেন্ট অ্যাসটেরিস্ক-এর এবারের ব্যাপারটা কী?”
রোস পকেট থেকে একটা খবরের কাগজের কাটিং বার করল। “আমি তোমার কাছে এটা পড়ব না,” বলল সে, “কারণ লেখার স্টাইলটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। অবশ্য তার কারণও আছে। যে সাংবাদিক এটা লিখেছে, তখন তার কানে খুবই যন্ত্রণা হচ্ছিল, আর সে যেভাবে জুভেনাল থেকে কোটেশন ঝেড়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে সে সদ্য বাতের ব্যথা থেকে উঠেছে। যাই হোক, ঘটনাটা এরকমঃ সেন্ট অ্যাসটেরিস্ক স্কুলের দারোয়ান – যার নাম স্মিথ – গত শুক্রবার সকালে স্কুলে টহল দেওয়ার সময় খেয়াল করে সিক্সথ ক্লাসরুমে একটা সাংঘাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যার শিকার হয়েছে ইংরেজি ব্যাকরণ। কোনও ভোঁতা অস্ত্র – সম্ভবত কোনও বাজে কলম দিয়েই এটা করা হয়েছে। লাশ পাওয়া গেছিল একগাদা কাগজের ওপরে, প্রচুর কালির দাগ ছিল সেই কাগজে, এবং দেখে মনে হয় – স্মিথের বক্তব্য অনুযায়ী – শিকার সহজে হাল ছাড়েনি, মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। স্মিথ খুব বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে, যেটা ওই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মাথামোটাগুলোর নেই – অকুস্থলের কিছু নাড়াচাড়া করেনি, যেরকম ছিল, সেরকমই রেখে দিয়েছে।”
“কাউকে সন্দেহ হয়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সেই কথাতেই আসছি। ওই ক্লাসেরই একজন ছাত্র, নাম ভ্যান্ডেরপুপ – যার ডেস্কে লাশ পাওয়া গেছে – তাকে এর মধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে।”
“সে কোনও জবানবন্দী দিয়েছে?”
“হ্যাঁ, সে কনস্টেবলের চোয়ালের নীচে এক ঘুষি মেরেছে, যদি এটাকে জবানবন্দী বলা হয়। এখন ওকে রাখা হয়েছে স্থানীয় থানায়, বিচারের জন্য। সবার মতে, কাজটা ওই করেছে।”
“তাহলে তো হয়েই গেল। ও শিগগিরই ছাড়া পেয়ে যাবে। সবাই যেটা বলে, বরাবর তার উলটোটাই হয়।”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, পরে দেখা যাবে,” বলল রোস।
“যে দিক দিয়েই দেখা যাক, কেসটায় নানারকম বৈশিষ্ট্য আছে।”
“হ্যাঁ,” আমি বাধা দিয়ে বললাম, “এটা আমাকে ব্ল্যাক রিঅ্যাকশন থেকে বাঁচিয়েছে।”
রোস আমার দিকে তাকাল। বোধহয় ভাবল আমি তার সম্বন্ধে কিছু বলছি।
“আবার আমরা এখানে এলাম,” পরদিন সিক্সথ গ্রেড ক্লাসঘরে ঢুকে বললাম আমি, “রোস, এই ঘরে কত কান্ড হয়েছে, মনে পড়ে? লাশ কোথায়?”
দারোয়ান স্মিথ সেটা দেখিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রোস হামাগুড়ি দিয়ে বসে পকেট থেকে বার করে আনল একটা আতস কাচ এবং সংক্ষেপে, তার কাজ শুরু করে দিল। আমি আমার অনুসন্ধান চালাচ্ছিলাম ঠান্ডা মাথায়। তারপর মন্তব্য করল রোস।
“ওয়াটসিং, কেসটা সোজা। ভ্যান্ডারপুপই করেছে এটা।”
“আজ সকালের কাগজটা কি তুমি পড়েছ, রোস?”
“না।”
“অ। পড়লে জানতে, আজ সকালেই ভ্যান্ডারপুপকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ।”
“ছেড়ে দিয়েছে! গাধা, গাধা, ওরা সব গাধা! এই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের –”
“শোনো রোস, ওর অ্যালিবাই আছে। অকাট্য অ্যালিবাই। খুনটা অবশ্যই হয়েছে বৃহস্পতিবার দিনের কোনও এক সময়ে। আর ভ্যান্ডারপুপ বুধ আর বৃহস্পতিবার স্কুলের হাসপাতালে ছিল। কিন্তু রোস –”
“কী হল?”
“আসল কাজ কে করেছে, আমি জানতে পেরেছি।”
রোস মস্ত হাঁ করল একটা।
“বুঝে গেছ? কে সেই –”
“হেডমাস্টার, স্যার,” হঠাৎ দরজা খুলে ঘরে ঢুকল স্মিথ।
“সুপ্রভাত, স্যার,” হেডমাস্টার ঘরে ঢুকতেই আমি বললাম, “আসুন, চেয়ারে বসুন। ও, চেয়ারই তো নেই। ডেস্কেই বসুন তাহলে।”
হেডমাস্টার জানলার গোবরাটে বসলেন। খুবই বিষণ্ণ চেহারা। গতকালও ভালো ছিলেন, আজ ভেঙে পড়েছেন।
“আমি আপনার লেখা কাগজটা পেয়েছি, ডাঃ ওয়াটসিং,” তিনি বললেন নীচু গলায়, “কিন্তু ইনি কে?” তিনি দেখালেন রোসকে, যে এখনও হামাগুড়ি দিয়ে আছে।
“ইনি হলেন,” আমি বললাম, “আমার বন্ধু মিঃ বারডক রোস। আপনি ওঁর সামনে স্বচ্ছন্দেই আমাকে সব কথা বলতে পারেন। তবে একটা কথা আগেই জানিয়ে দিচ্ছি, উনি কিন্তু এই কেসে নিজের দায়িত্বেই খবরদারি করার চেষ্টা করতে পারেন। যাই হোক, এবার বলুন।”
“আমি আপনার লেখা কাগজটা পেয়েছি,” আবার বললেন হেডমাস্টার। “আপনি কী করে সব জেনে ফেললেন জানি না।”
“আমি খুব সরল সাদাসিধে রাস্তায় চলি। হ্যাঁ, তাহলে আপনি বলছেন -?”
“আপনি ঠিকই ধরেছেন, ডাঃ ওয়াটসিং। আমিই খুন করেছি ইংরেজি ব্যাকরণকে – আর কেউ না। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।” তাঁর ভাবসাব দেখে মনে হল এক্ষুনি ভেঙে পড়বেন।
“আপনি কি অজ্ঞান হওয়ার কথা ভাবছেন?” আমি বললাম, “চিন্তা নেই, সারিয়ে তুলব। ভাল কালি আছে। একদম নির্জলা। তবে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ শুনুন, হবেন না।”
তিনি হলেন না।
“এবার বলতে পারেন,” আমি বললাম।
“বলছি,” বললেন তিনি। “আমি ধনী পরিবারে জন্মেছি। মা-বাবা ছিলেন ভাল মানুষ। আমি খুব ছোট বয়সেই পাবলিক স্কুলে ভর্তি হই।”
“মাপ করবেন,” আমি সৌজন্য দেখিয়েই বললাম, “কিন্তু ছোট করে বললে খুশি হব। ট্রেন ধরার আছে। সংক্ষেপ করুন।”
“খুব ভাল। পাবলিক স্কুল। লাতিন। গ্রিক। গ্রিক। লাতিন। ইংরেজি না। ইংরেজি ভাল না। ইউনিভার্সিটি। লাতিন। গ্রিক। গ্রিক। লাতিন। ইংরেজি ভাল না। এই আমার কথা। বুঝতে পারলেন?”
“বুঝলাম যে লাতিন আর গ্রিক পড়তে গিয়ে আপনার ইংরেজিটা কিছুই শেখা হয়নি। ঠিক আছে?”
“এক্কেবারে ঠিক। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ করেছেন।”
“শুনুন,” আমি বললাম, “আপনি নির্দোষ। এখন যা পাপ করলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি পাপ আগেই করেছেন। যান, নিজেকে শোধরান।”
তিনি দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন এবং আমার ধারণা, শুধরেও গেলেন।
“তুমি যে বিয়ে করছো, এতে আমি সত্যিই খুশি, ওয়াটসিং,” শহরে যাওয়ার পথে রোস বলল আমায়। “কবে হবে এটা?”
“সামনের মাসেই।” ট্রেন থেকে নেমে প্রথমেই রোস একটা ক্যালেন্ডার কিনল। সে সেটা এখন তার ডেস্কে রেখে দিয়েছে। প্রত্যেকদিন সে তার থেকে একটা করে তারিখ কেটে দেয়, আর মুচকি হাসে।
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন