অমিত দেবনাথ
স্থান-কোয়াকার স্ট্রিট; সময়-সকাল আটটা; পাত্র – মহামহিম শাইলক ওমস এবং এই অধম, যার নাম উইলকিনস। আমরা বসার ঘরে অপেক্ষা করছিলাম ব্রেকফাস্টের জন্য। ওমস গা এলিয়ে দিয়েছিল আর্মচেয়ারে, দেখে মনে হচ্ছিল বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে; ধোঁয়া ছাড়ছিল ফুকফুক করে তার পাইপ থেকে। ব্রেকফাস্টের আগে ধুম্রপান তার বরাবরের অভ্যেস। ভারি বিচ্ছিরি তার এই স্বভাবটা, তার উপর সে আবার গতকালের না-খাওয়া তামাকের অংশাবশেষ আর ছিপিগুলোও সে সকালের পাইপে গুঁজে নেয়। আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।
“মক্কেল আসছে, বুঝলে,” আমি বললাম। আমি দেখছিলাম নীচের রাস্তায় একটা দশাসই চেহারার লোক বাড়ির নম্বর খুঁজতে খুঁজতে এগোচ্ছে।
“দেখেছি,” বলল ওমস জড়ানো গলায়।
আমি একটু অবাক হয়েই তাকালাম তার দিকে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল ম্যান্টলপিসের ওপরে একটা আয়না রাখা আছে, যেখান দিয়ে রাস্তাটা দেখা যায়।
“গোঁফ চুরির কেস। লোকটার চমৎকার একটা কালো গোঁফ ছিল, সেটা চুরি গেছে,” বলল ওমস, “মনে হচ্ছে লোকটা আমার কাছে আসছে আরেকটা খুঁজে দেওয়ার জন্য।”
“আরিব্বাস! তুমি জানলে কি করে?”
“মাই ডিয়ার উইলকিনস,” বলল ওমস, যেন দৈববাণী করছে, “আমার ভয় হচ্ছে, তুমি বৈজ্ঞানিক প্রথায় অবরোহমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছুই শেখোনি। তুমি খেয়াল করেছ কি যে লোকটা পরিষ্কার কামানো মুখের ওপরের ঠোঁটটার ওপরেই সমানে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কুচকুচে কালো চুলে একবারও বোলাচ্ছে না? কোনও লোক যখনই কোনও ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকে, তখনই গোঁফ চোমড়ায়।”
তাই তো! আমি আর একবার লোকটাকে দেখলাম - সত্যিই লোকটার হাত বারবারই ঠোঁটের উপরের অংশে চলে যাচ্ছে, আর কিছুই না পেয়ে, মনে হল লোকটা আরও নার্ভাস হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময়েই ব্রেকফাস্টও এল, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেলটাও বেজে উঠল দারুণ জোরে। শুনতে পেলাম দরজা খোলার শব্দ, তারপর দ্রুত গলায় কিছু প্রশ্নোত্তর, আর তারপরই সিঁড়িতে ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ। পরমুহূর্তেই ধড়াস করে খুলে গেল আমাদের ঘরের দরজাটা, আর ঘরে ঢুকল সেই লোকটা, হাতে ধরা টুপিটা তাড়াহুড়োর চোটে পড়েই গেল মেঝের ওপর। ওমস সেটা তুলে নিয়ে লোকটার হাতে দিল।
“বলুন মিঃ জোনস, আপনার জন্য কী করতে পারি?” বলল সে।
ওমসের মুখে নিজের নাম শুনে লোকটা ধপাস করে বসে পড়ল একটা চেয়ারে, অ্যাত্তো বড় একটা হাঁ করে তাকিয়ে রইল ওমসের প্রশান্ত মুখের দিকে।
“আপনার নাম আপনার টুপিতেই লেখা আছে,” বলল ওমস।
লোকটা চট করে একবার টুপিটায় চোখ বুলিয়ে নিল, যেন সেটা জাদুর টুপি।
“বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি?” ওমস জিজ্ঞেস করল আর একবার।
শুনেই যেন লোকটার মনে পড়ে গেল সে কিসের জন্য এখানে এসেছে, ছিটকে লাফিয়ে উঠল চেয়ার থেকে, দারুণ উত্তেজিত হয়ে হাত কচলাতে লাগল, মাথা ঠুকে গেল দেয়ালে - মানে কী যে সে করছিল, আর কী যে করছিল না, বোঝাই দায়!
যাই হোক, ওমসকে দেখেই বোধহয় লোকটা নিজেকে সামলে নিল। আর ওমসের কথাই ঠিক। লোকটার গোঁফ চুরি গেছে।
“রাত্রে যখন ঘুমোচ্ছিলাম, তখনই চুরি করেছে স্যার।” লোকটা রাগে ফেটে পড়ল। “ঘুমের মধ্যে, ভাবতে পারেন? আর কিভাবে কেটেছে দেখুন,” লোকটা তার বাঁ দিকের নাকটা দেখাল, সেখানে একটা লম্বা কাটা দাগ। “ব্যাটাকে একবার ধরে দিন স্যার, আমি সারাজীবন আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব।” রাগের চোটে লোকটা নাচতে লাগল সারা ঘর জুড়ে, “কী করব বুঝতে পারছি না। অফিসে বন্ধুরা দেখলে আমাকে যে কী বলবে – তারপর -”
“আপনি তো ব্যাংকে আছেন, কেরানির কাজ করেন, তাই না?” বলল ওমস।
লোকটা আবার মুখটা হাঁ করেই হাঁ বুঁজিয়ে মাথা নাড়ল।
“সকালে কটায় ঘুম থেকে উঠেছেন?” বলল ওমস।
“পাঁচটার সময়।”
“তখন শরীর খারাপ লাগছিল?”
“হ্যাঁ স্যার, খুব খারাপ লাগছিল। কেন?”
“কারণ জানতে চাইবেন না, যা জানতে চাইছি, তার জবাব দিন। ঘরের দরজা বন্ধ ছিল?”
“হ্যাঁ। বাইরের ওককাঠের দরজায় তালা দেওয়া ছিল, ভেতরটা ভেজানো ছিল।”
“আপনি চেম্বারস-এ থাকেন?”
“হ্যাঁ - বেডফোর্ড রো–এ।”
“সেখানে এমন কেউ আছে, যাকে আপনি বিয়ে করতে চান?”
লোকটার মুখে রঙ ধরল, মনে হল যেন একটু লজ্জা পেল
আর বিরক্তও হল।
“তার সঙ্গে এটার সম্পর্ক কী?” লোকটার গলা তীক্ষ।
“প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে,” কাঁধ ঝাঁকাল ওমস, “পুলিশে যান।”
“হ্যাঁ, তাই যাব,” বলল লোকটা।
“ঠিক আছে। যাত্রা শুভ হোক,” বলল ওমস, “উইলকিনস, ব্রেকফাস্ট ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
লোকটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ, একটি কথাও না বলে। বোধহয় চলেই যেত, কিন্তু তখনই বেল বাজল আরেকবার, সিঁড়িতে শোনা গেল দ্রুত পদশব্দ, আর তারপরেই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিল।
“এবারে আসছেন এক মহিলা,” বলল ওমস এবং সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে ঘরে ঢুকল এক তরুণী, সে যে খুব কান্নাকাটি করেছে, সেটা আর বলে দিতে হয় না।
“মিঃ ওমস!” বলল তরুণী, “কী করব জানি না! দেখুন আজ সকালে আমি কী পেয়েছি! অ্যাঁ? -”
তরুণীর চোখ আটকে গেছে ঘরের আরেক দর্শনার্থীর ওপর এবং দেখামাত্র সাংঘাতিক চমক খেয়েছে সে। মনে হল অজ্ঞানই হয়ে যাবে। একটা চাপা চিৎকার বেরিয়ে আসছিল তার গলা দিয়ে, সেটাকে চাপা দিয়ে সে কাঠকাঠভাবে লোকটাকে একটা অভিবাদন করে বলল, “সুপ্রভাত, মিঃ জোনস।” মিস্টার কথাটার ওপর সে একটু বেশিরকমের জোর দিল খেয়াল করলাম।
লোকটার অবস্থা ততক্ষণে খুবই খারাপ হয়ে গেছে। সে মহিলার দিকে পাল্টা মাথা নীচু করার চেষ্টা করেই পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ চাপা দিল।
তরুণী ওমসের দিকে ঘুরে ঠান্ডা গলায় বলল, “এই ভদ্রলোক সম্ভবত সবই বলেছেন। যখন এই খামটা আপনি ওঁকে দেখাবেন, উনি বোধহয় সবই বুঝতে পারবেন। সুপ্রভাত। সুপ্রভাত, মিঃ জোনস,” ঘামতে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে একটা জোরদার অভিবাদন করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মহিলা। ওমস খামটা খুলে দেখল ভেতরে একটা কার্ড, তাতে একটা কালো গোঁফ আঠা দিয়ে সাঁটা, আর একটা লেখাঃ “এই সেই জিনিস, তুমি যার প্রেমে পড়েছিলে”। এর নীচে একটা লাল রঙের ক্রস আঁকা, যেটা ওমস অনুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা করে বলল, রক্তের দাগ।
“এটা রক্তের চিহ্ন- দি সাইন অব গোর,” বলল ওমস। তারপর সে ঘুরে লোকটার দিকে তাকাল।
“এই হল আপনার গোঁফ,” বলল সে, “আচ্ছা, ওই মহিলার ব্যাপারে আপনার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নাকি?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আছে তো! এইবার বুঝেছি! ওই হামবড়া মালটা”
ওমস হাত তুলে তাকে থামাল। “ওই মা - মানে যেই হোক না কেন, সে আপনার ঘরের চাবিটা কোনওভাবে বাগিয়েছে, তারপর ঘরে ঢুকে আপনাকে ক্লোরোফর্ম করেছে।”
“ও আমার নীচের তলাতেই থাকে,” বলল লোকটা।
“যাই হোক, আপনার চলে যাওয়ার আগে একটা উপদেশ দিচ্ছি। যদ্দিন আপনার গোঁফ না গজায়, তদ্দিন মহিলার ধারে কাছে যাবেন না, গোঁফ ছাড়া আপনার কোনও দাম নেই - এমনকী, মহিলা চিরদিনের মতো হাতছাড়াও হয়ে যেতে পারেন। আর এর পরেও যদি আবার এরকম কোনও সমস্যা হয়, আপনি সোজা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে চলে যাবেন। ঠিক আছে? আসুন তাহলে, আপনার বোধহয় ব্যাংকে যেতে আজ একটু দেরিই হয়ে যাবে।”
চলে গেল লোকটা, তখনও তার চোখ দুটো বিস্ময়ে গোলগোল হয়ে আছে। ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসার পর ওমস বলল, “জার্মান দার্শনিকের সেই মন্তব্যটা মনে পড়ছে, উইলকিনস? ‘ডোনার আন্ড ব্লিৎজেন!’ এটা হল সেই ঝড়ঝঞ্ঝা-বজ্রপাত!”
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন