অমিত দেবনাথ
হোল্ট উইলের ব্যাপারটা নিয়ে যে সব রহস্যময় ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো নিয়ে যখন আমাকে খোঁজ খবর করতে বলা হল, আমি তক্ষুনি ভেবেছিলাম এত জটিল একটা কেস সেরা গোয়েন্দাদের নজরেই আনা উচিত। মানবজীবনের বিভিন্ন বাঁক, বিভিন্ন প্যাঁচঘোঁচের পাক খোলার ব্যাপারে ভাগ্য একটা বিরাট নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়ায়। আর এও আমি বলব, এ রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে যাঁর সাহায্য আমি পেয়েছি সবচেয়ে বেশি, লন্ডনের সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা – যাঁকে বিখ্যাত করেছেন কোনান ডয়েল নামের কোনও এক ভদ্রলোক – মিঃ শার্লক হোমসকে যে আমি ওয়াশিংটনে দেখতে পাব, এ নিতান্তই কপালের জোর।
যে দিন সেই পোড়া উইলটা আমার হাতে এল সেটা খুঁটিয়ে দেখার জন্য – খুবই কঠিন কাজ ছিল সেটা – সে দিন বিকেলে আমি পেনসিলভ্যানিয়া অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটছিলাম, হঠাৎই আমার নজর গেল এক অদ্ভুত দর্শন লোকের দিকে, যে ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটছিল। তক্ষুনি বুঝতে পারলাম কোনও দুর্ঘটনায় পড়েছিল লোকটা, এবং এও বুঝতে পারলাম ওকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে কোনও বড়সড় গল্প পেয়ে যেতেও পারি। লোকটার বাঁ হাতে ব্যান্ডেজ আর থুতনির নীচে বড় প্লাস্টার আটকানো।
“রেল দুর্ঘটনা?” লোকটা আমার দিকে এক ঝলক তাকাতে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
লোকটা আমার প্রশ্নের উত্তর তো দিলই না, উলটে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দ্রুত চোখ বুলিয়ে বলল, “আমার সঙ্গে সন্ধে ৭.৩০ মিনিটে দেখা করবেন। ঠিকানা দিচ্ছি।”
আমাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ছোট্ট একটা কাগজ আমার হাতে গুঁজে দিয়ে ক্র্যাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল লোকটা, একটি কথাও না বলে। আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কী আশ্চর্য! হাতে বেশি সময় ছিল না বলে আমি এগোতে লাগলাম ঠিকই, তার ফাঁকে হাতের কাগজটায় চোখ বোলালাম। এবং আরও হতভম্ব হয়ে গেলাম! সেখানে লেখাঃ
শার্লক হোমস
_নং _স্ট্রিট
ওয়াশিংটন ডি.সি.
“শার্লক হোমস, শার্লক হোমস,” আমি বিড়বিড় করলাম। “ও, সেই কোনান ডয়েলের ডিটেকটিভ। মনে পড়েছে। কিন্তু সে তো কাল্পনিক চরিত্র। আর যদ্দুর মনে পড়ছে, কোন এক দুর্ধর্ষ অপরাধীকে ধাওয়া করতে গিয়ে সে সুইজারল্যান্ডে মারাও গেছে।”
এই রহস্যময় লোকটি অবশ্য পুরোপুরিই রক্তমাংসের মানুষ, তবে অবস্থা খুবই খারাপ। আমি ঠিক করলাম যাব, কারণ এই লোকটা আর তার দুর্ঘটনার ব্যাপারটা জানা দরকার।
“চলে আসুন।” দরজায় টোকা মারতেই আওয়াজ ভেসে এল ভেতর থেকে। বাড়িটা নোংরা আর অপরিচ্ছন্ন। লোকটা থাকে সবচেয়ে উঁচু তলার পেছনের দিকের একটা ঘরে। একটু ইতস্তত করে দরজা খুললাম। ঘরটা রীতিমতো বড়, চমৎকার সাজানো, দক্ষিণ খোলা দুটো জানলা, ফুরফুরে হাওয়া আসছে সেখান দিয়ে। গ্যাসের আলো জ্বলছে হালকাভাবে, সেই আলোতে দেখলাম সোফায় আধশোয়া একটা লোককে।
“বসুন। জানলার ধারে বসলে হাওয়া পাবেন,” বলল লোকটা।
লোকটা এখনও আধশোয়াই। অস্বস্তিই লাগছিল। দরজা বন্ধ করে লোকটার কথা মতো – অথবা তার নির্দেশ মতো, গলার সুরটা সেই রকমই – ঘরে ঢুকলাম। চেয়ারে বসলাম। ভুলেই গেছিলাম যে আমি মিঃ হোমসের খোঁজে এসেছি। এবার উঠে বসল লোকটা, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হেঁটে আমার কাছে এসে আমার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল। এবারে বোঝা যাচ্ছিল, আমি রাস্তায় যাকে দেখেছিলাম, এটাই সেই লোকটা, তবে এখন আর সে খোঁড়াচ্ছে না, বা তার হাতে-মুখে ব্যান্ডেজ-প্লাস্টার কিছুই নেই।
“কী ব্যাপারে রিপোর্ট বানাচ্ছেন?” জিজ্ঞেস করল সে।
আমি তাকে কিছুই বলিনি, যাতে সে বুঝতে পারে আমি খবরের কাগজের লোক। এতই হকচকিয়ে গেছিলাম যে কোনও কথাই বেরোল না মুখ দিয়ে।
“আরে জানি মশাই, হোল্ট উইলের ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছেন,” বলল লোকটা। “গুরুত্ব দিচ্ছেন যে, এই অনেক। এটার সমাধান আমিই করব – উকিলরা থই পাবে না – রিপোর্টাররাও না,” এমন ভঙ্গিতে তাকাল লোকটা, যেন তাচ্ছিল্য করল।
ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম লোকটাকে। হয় পাগল, নয়তো খামখেয়ালি। চুপ করে থাকাই ভাল।
“কাজের কথা শুনুন,” বলল অদ্ভুত লোকটা, “আমি সমাধান করে দেব একটা শর্তে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মাথামোটা গোয়েন্দাগুলোই বরাবর আমার কাজের কৃতিত্ব নিয়েছে। হ্যাঁ, তারা পয়সা দিয়েছে, তবে তাতে কিছু আসে যায় না। কাজ করেছি, পয়সা পেয়েছি, পেশাদারি আনন্দও পেয়েছি, নাম কিনেছে ওরা। তাই আমি ইংল্যান্ড ছেড়ে দিয়ে এখানে চলে এসেছি বরাবরের মতো – এই ওয়াশিংটনেই ডেরা বেঁধেছি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজধানী তো এটাই হতে চলেছে। কোনান ডয়েল যে লিখেছে না, আমি সুইজারল্যান্ডে পটল তুলেছি, ওটা ফালতু।”
হোমসের মুখে একটা সন্তোষী হাসি ফুটে উঠল। “অবশ্য তার জন্য ওকে দোষ দিই না। বেচারা আসল ব্যাপার কিছুই জানে না। ওটা আমিই করেছিলাম, লোকের চোখে ধুলো দিয়েছিলাম, কারণ আমার কিছু কাজ ছিল। কিন্তু সে অন্য কথা।
“কাজের কথায় আসা যাক। আমি এখানে পাকাপাকিভাবে থাকতে চাই, আর আমার কিছু বিজ্ঞাপন দরকার। এখানে একবার সবাই আমার নাম জেনে গেলে কাজের অভাব হবে না। আমি এই পোড়া উইলের কেসটার ফয়সলা করে দেব, কিন্তু তার কৃতিত্ব আমাকে দিতে হবে। একবার এখানে নাম হয়ে গেলে পরবর্তীকালে কেউ আমায় কৃতিত্ব দিল কি না দিল তাতে কিছু আসে যায় না। রাজি আছেন?”
“রাজি মানে? বর্তে যাব স্যার!” উত্তর দিতে আমার এক মুহূর্ত সময় লাগল না। “কিন্তু এ রকম একটা জটিল কেসের ফয়সলা করতে পারবেন তো?”
“জটিল কেস!” এমনভাবে বললেন হোমস কথাটা, যেন আমায় ভ্যাঙাচ্ছেন। “জটিল কেস শুধু বোকা আর অন্ধদের জন্য। আমি অবশ্য এটা নিয়ে এখনও কিছুই ভাবিনি, তবে দেখেছি কাগজগুলো এটা নিয়ে খুব চেল্লামেল্লি করছে। রিপোর্টারগুলোও দেখছি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দাগুলোর মতোই ভোঁতা।”
আমাকে বারংবার আশ্বাস দিতে হল যে রহস্য সমাধানের পুরো কৃতিত্বই তিনি পাবেন। তারপর তাঁর অনুরোধে পুরো ঘটনাটাই আমাকে বলতে হল যে কীভাবে বিচারক হোল্টের বিষয়সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বাঁটোয়ারা হচ্ছিল, এমন সময় কিছু রহস্যময় পোড়া কাগজ আসে রেজিস্টার অব উইলস-এর অফিসে। আমি এ ব্যাপারে যা যা জানি সবই বললাম, তবে উনি শুনলেন বলে মনে হল না। আমার ধারণা, একজন গোয়েন্দাকে যা যা জানালে ভাল হয়, সবই আমি বলেছি, কিন্তু সব শুনে-টুনে তিনি বললেন এই-ই সব কিনা; তিনি আরও বললেন গোয়েন্দা, উকিল আর রিপোর্টাররা গুরুত্বহীন জিনিসগুলোই দেখে, আসল তথ্যগুলো তাদের চোখে পড়ে না।
“পোড়া কাগজগুলোতে কোনও চিহ্ন-টিহ্ন পাওয়া গেছে – আঙুলের ছাপ-টাপ?”
আমি বললাম যে এ রকম কোনও কিছুর চিহ্ন খোঁজা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
“সে তো বটেই,” গরগরে গলায় বললেন তিনি অধৈর্য সুরে, “পোকামাকড়ের কোনও নোংরা ছিল? থাকলে কাগজের কোন পিঠে ছিল?”
“সে তো জানি না।”
“কাগজের কোনও পিঠে কি হলদেটে ভাব ছিল, অনেকদিন রোদে খোলা পড়ে থাকলে যেমন হয়?”
“সে তো জানি না।”
“কাগজের উল্টোদিকের ওপরের দিকের কোনায় লাল কালির ছোপ আছে কি?”
“সে তো জানি না।”
“জানবেন তো নাই,” বলেই লাফিয়ে উঠলেন শার্লক হোমস।
“এর থেকেও সোজা কেস পেতে গেলে খুঁজে বেড়াতে হবে। মনে হচ্ছে রিপোর্টার আর উকিলরা এই কাগজে কার দস্তখত আছে আর কোন পোস্টবক্সে এটা ফেলা হয়েছিল, এটা বার করতেই তাদের সময় নষ্ট করেছে। ওই ভাবে সময় নষ্ট করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বুদ্ধুগুলো। আগেই থিওরি খাড়া করে সেইভাবে কাজ করে। কাল সন্ধ্যেবেলা আসবেন। এই সময়।”
শার্লক হোমস ঘরের ওধারে গিয়ে চেয়ারে শোয়ানো একটা বেহালা তুলে নিয়ে বাজাতে লাগলেন একটা চমৎকার ওয়াল্ত্জ্-এর সুর, মনে হল আমি যে ঘরে আছি, সেটা তিনি ভুলেই গেছেন। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে - বাড়িটার থেকেই বেরিয়ে একেবারে রাস্তায় নেমে তবেই স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারলাম। আমার তখনও দৃঢ় বিশ্বাস, আমি কোনও পাগলের পাল্লায় পড়েছি, কিন্তু তাও পরের দিন সন্ধ্যেবেলা ওখানে না গিয়ে পারলাম না।
গিয়ে দেখলাম শার্লক হোমস দুহাত তুলে প্রবলভাবে দোলাতে দোলাতে পাগলের মতো নাচছেন। ঘরের দরজা পুরো খোলা আর তিনি আমাকে দেখেনওনি। যখন দেখলেন, তখন তিনি শান্ত হয়ে গেলেন, শান্ত ভাবে আমাকে অভিবাদন করলেন, শান্ত গলায় বললেন তিনি ডিনারের পরবর্তী ব্যায়াম সেরে নিচ্ছিলেন। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল, আমাকে তিনি সেখানে নিয়ে গেলেন, গ্যাসের আলো জ্বালিয়ে দিলেন। এতক্ষণ আমি থাকা সত্ত্বেও রাস্তার আলোতেই ঘর আলোকিত হচ্ছিল। তিনি টেবিলের ওপর পোড়া উইলটার একটা ফোটোগ্রাফিক কপি রাখলেন। তারপর আনলেন আরেক খন্ড কাগজ, খানিকটা পোড়া, সেটাও পাতলেন পোড়া উইলটার ওপর। আমি এক ঝলক দেখেই বুঝলাম পোড়া জায়গাটা দুটো কাগজেই হুবহু একরকম। এমনকি আসল পোড়া উইলটায় যেরকম ফুটো ফুটো রয়েছে, পরের কাগজের টুকরোটাতেও একই রকমের ফুটো। যখন দুটো এক সঙ্গে পাতা হল, বোঝা গেল যখন আগুন লেগেছিল, তখন দুটো কাগজই এক সঙ্গে জোড়া ছিল। দুটো কাগজ এক সঙ্গে না ধরলে ওভাবে পোড়ানো সম্ভব নয়। আমি বুঝতে পারলাম যে এই দুটো কাগজ কিভাবে পুড়ল, সেটা শার্লক হোমস বলতে যাচ্ছেন এবং এই প্রথম আমি এই সদ্য পরিচিত অদ্ভুত লোকটার সম্পর্কে সত্যি সত্যিই সচেতন হয়ে উঠলাম।
“এটা পড়ুন,” কাগজের ওপরের একটা হালকা দাগের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন তিনি আমায়, আমার হাতে একটা আতস কাচ তুলে দিয়ে। আমি পড়লাম:
“বাতিল। পুড়িয়ে ফেল।”
“এই হাতের লেখাটা,” বললেন মিঃ হোমস, “বিচারক হোল্টের। সেটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। এই কাগজগুলো নষ্ট করে ফেলার জন্য অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে কোথাও রেখে দেওয়া হয়েছিল, আর এই লেখাটা থেকে বোঝা যাচ্ছে বিচারকমশাই তাঁর কোনও চাকরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পুড়িয়ে ফেলার জন্য। এগুলো কোনও খোলা কাঠের উনুনের ওপরে ধরা হয়েছিল বলে খানিক খানিক পুড়েছে। যদি এটা গ্যাসের আগুনে পোড়ানো হত, তাহলে কাগজগুলোর মাঝখানে এই রকম ছোট ছোট ফুটো হত না। কিন্তু যখনই চাকরটা এগুলো উনুনের ওপর ধরেছিল, তখনই সে এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি এগুলো সরিয়ে আনে। ব্যাপার হল, বিচারক হোল্ট এই কাগজে লিখেছিলেন “বাতিল। পুড়িয়ে ফেল।” আর ভেবেছিলেন উইলের উল্টোপিঠে লিখছেন, এতে কিছু হবে না। কাগজগুলো তাঁর ডেস্কের ওপর ছিল এবং এক সঙ্গেই আটকে ছিল। দেখুন,” মিঃ হোমস যে কাগজে লেখা ছিল “বাতিল। পুড়িয়ে ফেল।,” তার পেছনের দিকের খুবই হালকা হলদে রঙের একটা ছাপ দেখালেন। “আমি এই দাগগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি। ওগুলো হচ্ছে গঁদের আঠা, এই পাতাটায় কোনও ভাবে পড়ে যাওয়ায় দুটো কাগজ একসঙ্গে জুড়ে গেছিল। উইলের পেছনেও একই রকমের দাগ পাওয়া উচিত এবং পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে ওগুলো গঁদের আঠা। আমি আসল উইল দেখিনি, তবে আমার বিশ্বাস, আমি যে ছোট্ট ব্যাখ্যাটা করলাম, সেগুলো সবই সত্যি এবং এই কেসের আইনজীবী বা সংবাদপত্র প্রমাণ হিসেবে সেগুলো স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারে।
“দেখতে পাচ্ছেন? এই কাগজগুলো একসঙ্গে আটকে ছিল, যখন বিচারক হোল্ট ভাবছেন তিনি তাঁর উইলের উল্টোপিঠেই এটা বাতিল করার নির্দেশ দিচ্ছেন। চাকর পোড়ানো শুরু করেও এটা বাঁচাতে পেরেছিল। সে এটা ছুঁড়ে ফেলেছিল এক পাশে। সেই কাগজটাই আমার হাতে আছে এখন,” হাতের কাগজটা দেখিয়ে বললেন তিনি, “এটা আগুনের এক্কেবারে কাছে ছিল, এই যে হলুদ হয়ে গেছে কাগজটা, এটা আগুনের তাপে হয়েছে, একমাত্র এরকম জায়গায় থাকলেই কাগজ যে পোড়াচ্ছিল, তার পক্ষে উইলের লেখা দেখা সম্ভব।”
“চাকরটা ঠিক করল বাঁচাবে, অথচ ফাঁকা কাগজটা পুড়ল না, এটা কি করে সম্ভব?”
“বুঝিয়ে দিচ্ছি। মূল্যবান কিছু পুড়ে যাচ্ছে দেখে যে এটা পোড়াচ্ছিল, সে আগুনের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে আলোর কাছে গিয়ে কাগজে যা লেখা ছিল, খুব মন দিয়ে পড়ে। তারপর যখন দেখে সাদা কাগজটা উইলের সঙ্গে আটকে রয়েছে, সে এটাকে টেনে তুলে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেয় আর উইলটা রেখে দেয়।”
“কিন্তু মিঃ হোমস,” আমি বললাম, “আপনি কী করে জানলেন কাগজগুলো বরাবরই একসঙ্গে ছিল? তাহলে নিশ্চয়ই যে চাকরটা উইলটা ডাকে ছেড়েছে, তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন।” আমি বললাম, আগ্রহ বাড়ছিল ক্রমশ। “না হলে আপনার থিওরি যতই বুদ্ধিদীপ্ত হোক, ওর কোনও মূল্য নেই।”
“থিওরি?” বললেন হোমস, “আমি থিওরি খাড়া করি না। আমি সত্যকে খুঁজি। আমি এই কাগজটা একটা বাতিল জিনিসের দোকানে পেয়েছি।”
মজার ব্যাপার বটে! আমি শুধু শুধু একটা পাগলের প্রলাপ শুনে সময় নষ্ট করছি বিখ্যাত গোয়েন্দার প্রজ্ঞা নেওয়ার বদলে।
“যখন আমি দেখলাম উইলটা পোড়ানো হয়েছে,” বললেন মিঃ শার্লক হোমস, “তখনই ভাবলাম অন্যান্য কাগজপত্রও তাহলে একই সঙ্গে পোড়ানো হয়েছে। মানুষ শুধু একটা কাগজই পোড়াচ্ছে, এ খুব কম হয়। যখন ডেস্ক পরিষ্কার করা হয়, তখন মানুষ কাগজপত্র এক জায়গায় জড়ো করে অদরকারিগুলো পুড়িয়ে ফেলে। যদিও শুনেছি বিচারক হোল্টমশাই খ্যাপাটে ছিলেন, তবুও এই একটা ব্যাপারে তিনি অন্যদের থেকে আলাদা নন বলেই আমার বিশ্বাস।”
“কিন্তু,” আমি প্রতিবাদ করলাম, “আপনি এই কাগজটা পেলেন কোথায়?”
“বিশ্বের সহজতম কাজ,” বললেন মিঃ হোমস। “আমি সিদ্ধান্তে এসেছিলাম যে বিচারক হোল্টের মতো একজন মানুষের কাছে নিশ্চয়ই প্রচুর কাগজপত্র থাকবে। তিনি যখন এত বিশাল পরিমাণ কাগজপত্র মৃত্যুর দিন পর্যন্ত জমিয়ে রেখেছিলেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর দীর্ঘ অসুস্থতার সময়ে – যা তাঁর মৃত্যুর কারণ – তিনি প্রচুর বাজে কাগজও পোড়ানোর জন্য রেখেছিলেন। সাধারণত দেখা যায় যে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অথচ বাতিল কাগজই পোড়ায়, অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ কাগজগুলো আলাদা করে সরিয়ে রাখা হয়, পরে চাকর-বাকরেরা পুরোন জিনিসপত্রের দোকানে বেচে দেয়, বদলে কিছু পয়সা পায়। এই আধপোড়া কাগজগুলোও সেভাবেই জাংক শপ-এ গেছে।”
“কিন্তু এ সবই ঠিক আপনি ধরে নিলেন কী করে?” আমি বললাম। আমার বদ্ধমূল ধারণা লোকটা কল্পনার জগতে রয়েছে।
“এ ব্যাপারে সবচেয়ে সন্তোষজনক প্রমাণ আমার হাতে আছে,” বললেন মিঃ হোমস। “আমি দেখেছি ওয়াশিংটন শহরটাকে – অন্যান্য বড় শহরের মতোই – এই জাংক ডিলাররা বেশ কয়েকটা ভাগে ভাগ করে নিয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যে। বিশেষ কোনও ক্ষেত্রে এই বাতিল কাগজগুলো যে কোনও দোকানে চলে গেলেও সাধারণত এই সব কাগজ, নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট দোকানেই যায়। কাগজের পরিমাণ কম থাকলে সাধারণত এগুলো বাড়ির চাকরবাকরেরাই পুড়িয়ে ফেলে, কিন্তু বিচারকমশাইয়ের বাড়িতে যে বিশাল পরিমাণ কাগজ ছিল, সেগুলো সম্ভবত জাংক ডিলারের কাছেই বিক্রি করা হয়েছে ভাল টাকার বিনিময়ে। সমস্ত খুঁটিনাটি নেওয়ার প্রয়োজন আমি বোধ করিনি, নাহলে আমি পুরোটাই হুবহু বার করে ফেলতে পারতাম, কিভাবে এটা ও বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু ও কাগজ যে শহরের দক্ষিণ পূর্ব দিকের কোনও দোকানে ঢুকেছে, তাতে সন্দেহ নেই। বিচারক যেখানে থাকতেন, সেখানকার সমস্ত বাতিল কাগজ সংগ্রহ করে একজন বিশেষ ডিলার – এটা জানতে পেরে আমি তার সঙ্গে দেখা করি।”
“আপনার থিওরি যদি সঠিকও হয়, তাহলেও আপনি নিশ্চয়ই এটা বলতে চাইছেন না যে ওই কাগজ – যেটা বেশ কয়েক বছর আগেই ও বাড়ি থেকে সরানো হয়েছে, সেটাই আপনি জাংক শপে পেয়েছেন?” আমি বললাম।
“ইয়ংম্যান, শার্লক হোমস থিওরি নয়, সত্যে বিশ্বাসী। এটা কোনও সাধারণ কাগজ হলে সেটা খুঁজতে জাংক শপে যাওয়া বোকামি হত। কিন্তু মনে রাখবেন, আমি একটা আংশিক পোড়া কাগজ খুঁজছিলাম। আপনার বোধহয় জানা নেই যে ডিলাররা বাতিল কাগজকে অনেকগুলো ভাগে ভাগ করে। বিভিন্ন ধরণের কাগজ বিভিন্ন ব্যাগে রাখা হয়। আপনি কি জানেন, অন্যতম সেরা একটা টুথ পাউডার তৈরি হয় পোড়া লিনেন কাগজ দিয়ে? জাংক ডিলাররা সেটা জানে এবং সে জন্যই তারা এই সব আংশিক পোড়া লিনেন কাগজগুলো আলাদা ব্যাগে রাখে, যাতে অন্যান্য একই রকমের লিনেন কাগজের সঙ্গে মিশে না যায়। এখন, এই আংশিক পোড়া লিনেন কাগজ এই সব দোকানে খুব কম পরিমাণেই আসে এবং সেই জন্যই যে ব্যাগে এটা জমানো হয়, সেটা ভরতে অনেক সময় লাগে। আমি এরকম ঘটনাও জানি, যেখানে একটা জাংক শপে দশ বছরের পুরোন কাগজও রয়েছে। কাজেই আমি সেই জাংক ডিলারের কাছে যাই এবং তাকে এ ব্যাপারে বলি। সে বলে তার কাছে গত তিন বছরের পুরোন কাগজ রয়েছে এবং এই সময়টা – বিচারক হোল্ট যে সময়ে তাঁর পুরোন উইল বাতিলের জন্য বলেছিলেন, তার সঙ্গে মিলে যায়। আমার বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এই উইলের পেছনের লেখাটা ১৮৯২ সালের আগে ওখানে লেখা হয়নি, কিন্তু অন্যান্য তথ্য থেকে এটাও প্রমাণ হচ্ছে যে এর বহু আগেই উইলটা বাতিল হয়েছিল। আমার এই বিশ্বাসের ভিত্তিটা কী, সেটা আপনাকে বোঝাতে পারলে ভাল হত, কিন্তু আমার এই মুহূর্তে অত সময় নেই। উইলটা বহু আগেই বাতিল করে অন্যান্য পুরোন কাগজের সঙ্গে রাখা হয়েছিল, এক সময় যখন ঘর বাড়ি ঝাড়পোঁছ আর পরিষ্কার করা হচ্ছিল, তখনই এটা চোখে পড়ে যাওয়ায় বাতিল করে পোড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।”
“আপনার উদ্ভাবনী শক্তির প্রশংসা করতেই হয়,” আমি বললাম, “তবে কোনও আদালত আপনার এই কথাগুলো মানবে বলে মনে হয় না।”
হোমস হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর ঘরের অন্যদিকের টেবিল থেকে এক টুকরো কাগজ তুলে নিয়ে আমার কাছে এলেন।
“আপনার বোধহয় সন্দেহ হচ্ছে,” বললেন তিনি, “যে কাগজটা আপনাকে দিয়েছি, সেটা আসল পোড়া কাগজের অংশ কিনা – যেটা এখন রেজিস্টার অব উইলের হেফাজতে আছে। আমি আপনাকে বলেছিলাম, যে চাকরের এমন কিছু চোখে পড়েছিল যে সে উইলটাকে সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পেরেছিল। এটাই সেটা।”
তিনি কাগজটা আমাকে পড়তে দিলেন। চোখে পড়ার মতোই বটে। যদ্দুর মনে হল, লাল কালিতে লেখা, অক্ষরগুলো বড় বড় আর ঘন। সেটা এরকম:
“মানুষের চঞ্চলতার আরেকটি প্রমাণ। আমার রক্ত-লেখায় দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে ভালবাসা জন্মায় মরার জন্য অথবা অন্যের আবেগকে পথ ছেড়ে দেওয়ার জন্য।
জে. হোল্ট”
“এই লেখাটা,” বললেন হোমস, “মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে। পরীক্ষা করে জেনেছি। এই লেখাটা দেখেই চাকরটা উইলটাকে সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার থেকে বাঁচায়। কাগজের এই পাতাটা পিন দিয়ে আটকানো ছিল। খেয়াল করলে দেখবেন এটাও একইরকমভাবে পুড়েছে। লেখাটা নিয়ে অবশ্য আমি ভাবছি না। মানুষের মনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবের উদয় হয়, তখন সে অনেক কিছুই করে ফেলে। কেন করে বলা খুব কঠিন।”
হোমস একটা ভঙ্গি করে বুঝিয়ে দিলেন তিনি এই বিষয় নিয়ে আর এগোতে চান না। ঘরের অন্য ধারে গিয়ে জানলার পাশে অদ্ভুতভাবে বসে পড়লেন তিনি। আমি চুপ করে তাঁকে দেখতে লাগলাম। একটু বাদে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তিনি আমার কাছে মার্জনা চাইলেন, বললেন তিনি এতক্ষণ ধরে এই পোড়া উইলের ব্যাপারে যা যা জেনেছিলেন, সব ভুলে যাচ্ছিলেন, কারণ তিনি এর পর যে কাজটি করতে চলেছেন, তাতে এগুলো কোনও কাজেই লাগবে না। তাঁর পরের কাজটি হল, বিচারক হোল্ট তাঁর পরের যে উইলটা বানিয়েছিলেন, সেটার খোঁজ করা।
আমি চলেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মনে পড়ল শার্লক হোমস কেন রাস্তায় ব্যান্ডেজ বেঁধে ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটছিলেন, সেটা জিজ্ঞেস করা হল না। তাঁকে বলতেই তিনি বললেন, “ওভাবে আমি আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে চাইছিলাম। আমি আসলে সত্যিই এই কাজটা কোনও খবরের কাগজের জন্য করতে চাইছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি এ শহরে নতুন, তাই আমি জানতাম একমাত্র ছদ্মবেশে চলাফেরা করলেই সেটা সম্ভব, কারণ তাহলেই আমাকে কোনও না কোনও কৌতূহলী সাংবাদিক প্রশ্ন করবেই। আমার অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।”
আমি বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। বেরোনোর আগে শুধু বলে এলাম আমি যদি তাঁর হারানো উইলের অভিযান সঙ্গী হতে চাই, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরব।
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন