ফাঁদে পড়লেন বিশপ

অমিত দেবনাথ

গত নভেম্বরের ১৪ তারিখ রাত ১০.২৯ মিনিটে আমি আমার ঘরে বসেছিলাম। একাই ছিলাম। সারাদিন ধরে অনেক ধকল গেছে, এখন খুব ক্লান্ত লাগছে। তার ওপর আমার সেই পুরোন আফগান যুদ্ধের ব্যথাটা তো আছেই, যেটা মাঝে মাঝেই আমাকে ভোগায়। যাই হোক, সব কিছু তো আর আমার মন মতো হবে না। কাল তিনজন রোগীর হামের চিকিৎসা করেছি – দুজন ব্যাংকের কর্মচারী আর একজনের নাম লর্ড মেয়র, কাজেই আমার কাজের ব্যাপারে অভিযোগ করার মতো কিছু নেই। পুরোন আরামকেদারাটা টেনে নিয়ে বসেছিলাম আগুনের সামনে, হাতের সামনে টোস্ট করার মত কোনও রুটি-টুটি না থাকায় পা দুটোকেই গরম করার জন্য এগিয়ে দিয়েছিলাম আগুনের দিকে, এমন সময় ম্যান্টলপিসে রাখা ঘড়িটা বেজে উঠল সাড়ে দশটার ঘন্টি বাজিয়ে, আর দেখলাম পিকলক হোলস এসে দাঁড়িয়েছে আমার পাশে। আমি অবশ্য ওর এ ধরনের চমক দেওয়ায় অভ্যস্ত, তবুও খুবই জানতে ইচ্ছে করছিল ও ঘন্টা না বাজিয়ে আমার ঘরে ঢুকল কীভাবে। যাই হোক, কথা না বাড়িয়ে বসার জন্য ওর দিকে একখানা চেয়ার এগিয়ে দিলাম।

“বন্ধু হে,” বিন্দুমাত্র ভুমিকা না করেই বলল সে, “তুমি আবার ধূমপান শুরু করেছ। না না, অস্বীকার করে লাভ নেই।”

আমি একটা খাবি খেলাম, প্রায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তাকালাম এই অনন্যসাধারণ মানুষটার দিকে। আমার এই গোপন ব্যাপারটা ও জানল কী করে? আমার মুখ দেখে ব্যাপারটা আঁচ করেই ও মুচকি হাসল।

“সোজা ব্যাপার। তোমার জামার আস্তিনে কালো দাগ লেগে আছে। কিন্তু এটা হলদে, সবুজ, নীল, বাদামি অথবা রামধনু রঙেরও হতে পারত। আমি জানি তোমার ধূমপানের তামাক হচ্ছে রেনবো মিক্সচার। এইমাত্র ঘরের কোনায় তোমার ক্যানারি পাখিটা যেই চোখ বুজলো, আমি বুঝতে পেরে গেলাম এই তামাকের মিক্সচারের অন্যতম উপাদান হচ্ছে বার্ড”স আই।”

“হোলস,” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, মুখ থেকে পড়ে গেল মিরশাম পাইপখানা। “তুমি মানুষ না – তুমি একটা শয়তান–ডেভিল!”

“প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ,” কঠোর মুখখানার একটা পেশীও না নাড়িয়ে বলল হোলস, “তোমার উচিত হবে –” সে কী যেন একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ তার মাথায় বোধহয় তখন আরেকটা দুর্দান্ত আইডিয়া এসে গেছে, আর দুর্দান্ত ছাড়া আজেবাজে কোনও চিন্তা তার মাথায় আসে না। কি আশ্চর্য মানুষ!

“না,” বলল সে, “ডেভিলড বোনস মোটেই ভাল খাবার নয়। বাধা দেওয়ার চেষ্টা কোরো না, তুমি রাত্তিরে তাই খেয়েছ, অথবা খেতে যাচ্ছিলে, যদিও তুমি মোটেই ওটা পছন্দ কর না। বুঝতে পারছো না ব্যাপারটা? ওই যে, ওই দেশলাই বাক্সটা খেয়াল কর। ওটার তলার দিকের একটা ছোট্ট টুকরো ভেঙে গেলেও বেশির ভাগটাই রয়ে গেছে, বোঝাই যাচ্ছে ওটা লুসিফার বা অন্য কথায় বললে ডেভিল ছিল। তোমার ঐ কংকালটার পায়ের কাছেই ওটা পড়ে আছে – যেই কংকালটা দিয়ে তুমি তোমার নানারকম অ্যানাটমির পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাও। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে তুমি আজ রাত্তিরে ডেভিলড বোনস খাবে ঠিক করেছিলে - যদিও খাওনি, কারণ কংকালের হাড়ের একটা টুকরোও খোয়া যায়নি। আমি কি বোঝাতে পারলাম?”

“নিশ্চয়ই পারলে,” আমি বললাম। আরেকবার মানুষটার স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় পেলাম আমি। আগের চেয়েও মুগ্ধ হলাম। যদিও ঘটনা হল, আমি আজ রাত্তিরে স্রেফ রুটি আর চিজ খেয়েছি, তবুও আমার মতন একজন অতি সাধারণ ডাক্তারের পক্ষে ওর মতো একজন গোয়েন্দার সঙ্গে – যার খ্যাতি আজ পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে – তর্ক করতে মন চাইল না। পাইপটা তুলে আগুন ধরালাম। তারপর বেশ খানিকক্ষণ আমরা দুজনেই চুপচাপ বসে রইলাম। তারপর সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, “নতুন কিছু আছে নাকি?”

“না, তেমন নতুন কিছু নেই,” তার পেশীবহুল হাতখানা ভাবলেশহীন কপালে একবার বুলিয়ে বলল হোলস, “আজকের বিশেষ সংস্করণ ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড কাগজখানা আছে নাকি? আছে, সেটা অবশ্য আমি জানি, কারণ আর কোনও বিকেলের কাগজ তোমার ঘরে নেই। দাও তো কাগজটা একবার।”

এই অদ্ভুত মানুষটার কাছে কোনও কিছুই লুকোনোর উপায় নেই দেখছি। পড়ার টেবিলের ওপর থেকে তার দেখানো খবরের কাগজখানা নিঃশব্দে তুলে দিলাম তার হাতে।

“শোন,” বলল হোলস, তারপর আবেগহীন গলায় পড়তে শুরু করলঃ “আজ সকালে মিসেস ড্র্যাবলি নামের এক ভদ্রমহিলা পিকাডিলি দিয়ে যাওয়ার সময় কমলালেবুর খোসায় পা পিছলে ধড়াম করে পড়ে যান। তিনি তখন যাচ্ছিলেন বিখ্যাত রৌপ্যশিল্পী মেসার্স স্যাল্ভার অ্যান্ড ট্যানকার্ড-এর দোকানে। যাই হোক, সৌভাগ্যবশত ঠিক তখনই সেখান দিয়ে একজন ডাক্তারবাবু যাচ্ছিলেন, তিনি পরীক্ষা করে বলেন, চোট তেমন গুরুতর কিছু নয়। আধ ঘন্টাটাক বাদে ভদ্রমহিলা সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং তাঁর নিজের কাজে যেতে সক্ষম হন। গত এক সপ্তাহের মধ্যে একই জায়গায় কমলালেবুর খোসায় পা পিছলে পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটল।”

“কী সাংঘাতিক!” আমি বলে উঠলাম, “এভাবে যত্রতত্র কমলালেবুর খোসা ফেললে তো লন্ডন শহরটার ধ্বংস হতে বেশিদিন লাগবে না! কিন্তু ব্যাপারটা কী জান, ঐ ডাক্তারটা…”

“হলে তুমি। তুমিই তখন ওখান দিয়ে যাচ্ছিলে।”

“হোলস,” আমি বলে ফেললাম গদগদ সুরে, “তুমি জাদুকর।”

“কোনও জাদুকর নই, আমি শুধু আজেবাজে জিনিসগুলোকে বাদ দিয়ে সত্যটাকে খোঁজার চেষ্টা করি, যেগুলো অন্য লোকেরা না দেখে চোখ বুঁজে থাকে। তুমি বোধহয় ভেবেছ ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে গেল। তা নয়। আমি জানতে চাই কে এই কমলালেবুর খোসাগুলো রাস্তায় ছড়াচ্ছে। তুমি কি আমাকে সাহায্য করতে ইচ্ছুক?”

“বিলক্ষণ! তুমি কী ভাবো আমাকে? কিন্তু হোলস, তুমি এগোবে কীভাবে? লন্ডনে তো হাজার হাজার লোক আছে, যারা রোজ কমলালেবু খায়।”

“তোমাকে একটা কথা বলি, যখনই যা করবে, তা যেন নিখুঁত হয়। হাজার হাজার নয়, সঠিক সংখ্যাটা হল ৭৮,৯৬৫ – এর মধ্যে মেয়েদের ধরা হয়নি। তবে এই খোসাটা কোনও মহিলা ফেলেনি।”

“তুমি জানলে কী করে?”

“কিছু মনে কোরো না, আমি বলেছি, এটাই যথেষ্ট। এই জায়গাটা পড়ে দেখ,” বলে সে কাগজের একটা জায়গা আমাকে দেখিয়ে দিল। সেটা এইরকম:

“ধর্মপ্রচারকদের উদ্যোগ – আজ বিকেলে আমেরিকা এবং উপনিবেশের যাজকদের এক সম্মেলন এক্সসিটার হল-এ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফ্লোরিডার বিশপের এক আবেগহীন বক্তৃতা দিয়ে এই অনুষ্ঠান শুরু হয় –”

“আর পড়ার দরকার নেই,” বলল হোলস, “ওতেই হবে। এবার এটা পড়ো”:

“কিছু ইংরেজ ভক্ত ফ্লোরিডার বিশপকে একটি চমৎকার রৌপ্যখচিত পানপাত্র উপহার দেবেন, সেটি এখন পিকাডিলির মেসার্স স্যাল্ভার অ্যান্ড ট্যানকার্ড-এর দোকানে শোভা পাচ্ছে। ব্রিটিশ রৌপ্যশিল্পীদের হাতের কাজের এ এক অনন্যসাধারণ নিদর্শন।” তারপর আরও বিস্তারিত ধানাইপানাই।

“এই জায়গাটা পড়েই আমি যা জানার জেনে নিয়েছি,” বলল হোলস তার নিরুত্তাপ গলায়, “ফ্লোরিডাতে প্রচুর কমলালেবু হয়। চল, বিশপের কাছে যাওয়া যাক।”

মুহূর্তের মধ্যে আমরা মাথায় টুপি চড়িয়ে একটা হ্যানসম ডেকে সোহো-র চার্চ স্ট্রিটে বিশপের বাড়ির দিকে চললাম। সেখানে পৌঁছে হোলস তার হাড়ের তৈরি চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল, পেছন পেছন আমি। নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দরজায় ঠকঠক শব্দ না করেই সে সোজা বিশপের শোওয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। রাতপোশাক পরা বিশপ দুই আগন্তুককে দেখে একেবারে চমকে উঠলেন।

“আমি একজন গোয়েন্দা,” বলল হোলস।

“ও,” বিশপের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। “আপনারা বোধহয় আমার ফ্লোরিডার প্রাসাদের কাছে যে কুমির ভরা জলাটা আছে, তাতে যে সহকারী যাজক উধাও হয়ে গেছে, সে ব্যাপারেই এসেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি তাকে খুন করিনি। সে –”

“ছোঃ!” বলল হোলস, “আমি ওসব সামান্য ব্যাপারে মাথা ঘামাই না। আমি তার থেকেও বড় ব্যাপার নিয়ে এখানে এসেছি। আজ সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাত মহামান্য বিশপ স্যাল্ভার অ্যান্ড ট্যানকার্ড-এর দোকানের সামনে তাঁকে যে রুপোর পানপাত্রটা উপহার দেওয়া হবে, সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবং আপনি তখন কমলালেবু খাচ্ছিলেন। আপনি খোসার বেশির ভাগটাই আপনার কোটের পকেটে রেখেছিলেন, কিন্তু ইচ্ছে করে তার খানিকটা মাটিতেও ফেলেছিলেন। তার খানিকক্ষণ পরেই একজন মোটাসোটা মহিলা তাতে পা পিছলে আছাড় খান। এ ব্যাপারে আপনার কিছু বলার আছে?”

বিশপ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হোলস তার আগেই এগিয়ে গিয়ে দরজার পেছনে রাখা একটা কালো লম্বা ঝুলের কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করে এনেছে একটা বড় ফ্লোরিডা কমলালেবুর অংশবিশেষ।

“যা ভেবেছিলাম,” বলল সে, “খানিকটা অংশ নেই।”

কিন্তু ততক্ষণে ধপাস করে মেঝেয় পড়ে গেছেন বিশপ, একেবারে অজ্ঞান। সেই অবস্থাতেই তাঁকে রেখে আমরা বেরিয়ে এলাম।

“হোলস,” আমি বললাম, “এটা তোমার অন্যতম সেরা কাজ। কিন্তু তুমি বুঝলে কি করে যে তাঁর কোটের পকেটে খোসাগুলো থাকবে?”

“ওঁর কোটের পকেটে তো কিছু ছিল না,” উত্তর করল আমার বন্ধু, “আমিই ওগুলো আমার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম, আমিই হাতের মুঠোয় করে ওঁর কোটের পকেটে ওগুলো ভরে দিয়েছি। এরকম একখানা জাঁদরেল লোকের সঙ্গে লড়তে গেলে কিছু কায়দা খাটাতে হয়, বুঝলে বন্ধু।”

এভাবেই সমাধান হয়েছিল বিশপ আর কমলালেবুর খোসার রহস্যের।

------------

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%