অমিত দেবনাথ
আমরা দুজন ডিনার করছিলাম। ক্রিসমাস ডিনার। যদিও আজ বড়দিন, তবুও আমাদের ঘরে তার সাজসজ্জার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই, যা দেখে বলা যায় সেই চমৎকার সময়টা এসে গেছে – প্রশান্তি, রাজহাঁসের মাংস, বদহজম আর শুভ ইচ্ছে যেখানে একাকার হয়ে যায়।
যে উল্লেখযোগ্য মানুষটির সঙ্গে আহার সারছিলাম আমি, তার কাছে ঘরের সাজসজ্জা বা আবেগ সম্পূর্ণ মূল্যহীন। মানুষটা বাস্তববাদী, ঘোর বাস্তববাদী। তার কাছে প্রতিটি জিনিসেরই একটা মানে আছে, আর যার কোনও মানে নেই, তার মধ্যে থেকেও মুহূর্তের মধ্যে মানে বার করে ফেলতে সে ওস্তাদ।
আমি অবশ্য এই ডিনারটা আমার বাড়িতেই সারতে পারতাম, সারতে পারতাম কোনও হোটেলে বা রেস্তোরাঁয়। এই রকম একটা অতি সাধারণ ভাড়া বাড়িতে আসার কারণ, আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছিল। যদি আমাকে আসতে বলা না হত, তাহলে আমি এখানে আসতাম না, আর যদি আমি না আসতাম, তাহলে আমি একটা অন্যতম অসাধারণ যুক্তির জাল বোনা দেখা থেকে বঞ্চিত হতাম, যে যুক্তির মায়াজাল এই উল্লেখযোগ্য মানুষটি প্রায়ই দেখিয়ে থাকে।
তখন আমাদের খাওয়া প্রায় শেষ। আমাদের আহারের তালিকায় ছিল স্যুপ, ঝিনুকের সস দিয়ে মাছ, গরুর মাংসের রোস্ট, এমনকি ধীরে সুস্থে খানিকটা করে মুরগিও খাওয়া হল। তারপর আমরা হাত বাড়ালাম প্লাম-পুডিং-এর দিকে। তালিকা দেখে বোঝাই যাচ্ছে আহার আমাদের খুবই সাধারণ, কিন্তু চমৎকার। বস্তুতপক্ষে, যে কোনও দিনই এ ধরণের ডিনার করা যায় – একমাত্র প্লাম-পুডিংটা ছাড়া, প্লাম-পুডিং সাধারণত উৎসবমুখর দিনগুলোতেই করা হয়।
খাওয়ার টেবিলের পরিবেশ ছিল প্রায় নিঃশব্দ। উল্লেখযোগ্য মানুষটি খাবারের দিকেই সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছিল – যেরকম মনোযোগ সে যে ব্যাপারেই ঢোকে, সেখানেই দিয়ে থাকে। খাওয়ার সময় মাত্র দুবার সে কথা বলেছিল। একবার তার অনুরোধ ছিল মাস্টার্ডটা এগিয়ে দেওয়ার, আরেকবার সে আমাকে বলেছিল আরেকটু গ্রেভি নিতে। আমি দেখছিলাম সে চিন্তায় মগ্ন, এ অবস্থায় কথা বলা মানেই তার চিন্তার গতিকে ব্যহত করা।
দ্বিতীয় চামচ পুডিংটা মুখে তোলার সময়ই খেয়াল করলাম সে আচমকা থমকে গেল। যারা তাকে আমার মত না দেখেছে, তারা কিছুই বুঝতে পারবে না, কিন্তু আমি এক মুহূর্তেই বুঝে গেলাম কিছু একটা ঘটেছে। হঠাৎই সে তার হাতটা তুলল, তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটা জড়ো করে ঠোঁটের একপাশে লাগাল, তারপর হাতটা নামিয়ে এনে সেটা ঘষল তার প্লেটের একপ্রান্তে। কিছু একটা যে সে সেখানে রাখল, সেটা বুঝতে পারলেও সেটা কী, কিছুই বুঝতে পারলাম না।
তীক্ষ্ণ স্বরে ঘন্টা বাজাল সে তারপরেই এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকল বাড়িওয়ালি।
“মিসেস স্মিথ,” বলল সেই উল্লেখযোগ্য মানুষটি, “নীচের তলায় একটা কমবয়সী মেয়েকে রেখেছেন, তাই না?”
“লুকোব না স্যার, রেখেছি,” বলল বাড়িওয়ালি।
“মেয়েটা অত্যন্ত নোংরা আর অপরিচ্ছন্ন,” বলল উল্লেখযোগ্য মানুষটি।
“দুঃখিত স্যার। মেয়েটা সত্যিই নোংরা।”
“সবরকম কাজই করে, তাই না?”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“মাথার চুল লাল?”
হ্যাঁ, স্যার।”
“জানতাম। যথেষ্ট হয়েছে। এ সপ্তাহের শেষেই আমি এ বাড়ি ছেড়ে দেব।”
“দুঃখিত স্যার। কী আর করব, সবই কপাল!” মিনমিন করে কথাটা বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল বাড়িওয়ালি।
কী ব্যাপার কিছুই বুঝতে না পেরে আমি তার দিকে তাকালাম। উত্তর দেওয়ার বদলে সেই উল্লেখযোগ্য মানুষটি আমাকে নিয়ে গেল জানলার ধারে, মেলে ধরল তার হাতের পাতা, আর আমি দেখলাম সেখানে রয়েছে একটা লাল চুল।
“পুডিং-এর প্রথম চামচের সঙ্গেই উঠেছিল এটা,” বলল সে ফিসফিস করে।
পুরো ব্যাপারটাই অত্যন্ত সহজ, এক ঝলক দেখে বোঝাও যায়, তবুও এই উল্লেখযোগ্য মানুষ – শার্লক হোমসের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছাড়া এ রহস্যের সমাধান কি এত সহজে হত!
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন