অমিত দেবনাথ
প্রকৃত ঘটনা এটাই যে আমার বন্ধু শার্লক হোমস পরিণত বয়সে পৌঁছনোর আগেই ওপরে চলে গেছে। কিন্তু এটাও প্রকৃত ঘটনা যে তার এই মারা যাওয়াটা তাকে পরিণত বয়সে পৌঁছোতে কোনও বাধারই সৃষ্টি করেনি। অভিজ্ঞ পাঠকমাত্রেই বুঝবেন সেটা। জনপ্রিয়তম গোয়েন্দা কাহিনিগুলোতে যেভাবে লেখা হয়, সেরকমভাবেই কিন্তু আমি তাকে বহুবার - প্রতিটি হঠকারী অ্যাডভেঞ্চারের শেষেই মেরে ফেলতে পারতাম। তার কাহিনিকার হিসেবে সেটুকু অধিকার আমার আছে। কিন্তু অন্য দিকে, আমার লক্ষ্য ছিল তার কীর্তিকলাপগুলো এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে পাঠককে বুঝিয়ে দেওয়া যায় যে এগুলো সেরেফ গালগল্প নয় - সব সত্যি – যে ধরণের সত্যি কথা যে কোনও বিবাহিত মানুষের ডায়েরিতেই পাওয়া যায়। সে কারণেই, সাধারণ লোকের মনে যে ধারণা প্রচলিত আছে প্রতিটি সম্ভাব্য ঘটনাতেই তার মারাত্মক ডোজের কোকেন নেওয়ার ব্যাপারে - যেরকম ডোজ নিয়মিত নিলে কোনও মানুষের বেঁচে থাকারই কথা নয়- আমি তাকে মাত্র একবারই মরার অনুমতি দিয়েছি।
আমার প্রতিভাধর বন্ধুর এখন অনেক বয়স হয়েছে। তার উন্নত কপাল আরো উন্নত হতে হতে এখন শার্টের কলারের পেছন অবধি চলে গেছে - টাক পড়ে গেছে আর কী - দাঁত এখনও কয়েকটা আছে বটে, তবে সে কটাও তার দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া; তবে তার চোখ এখনও আগের মতই উজ্জ্বল, এবং অতিরিক্ত কোকেনের প্রভাবে সে এখনও যে সব জিনিস চোখের সামনে নেই, তাও দেখতে পায়। তার বর্তমান অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলাম, এবার আমি কয়েকটা ধারাবাহিক ঘটনার বিবরণ দিতে চাই। এগুলোর সঙ্গে তার আগের কাহিনিগুলো দয়া করে গোলাতে যাবেন না। তার আগের বিভিন্ন অভিযানের সঙ্গে এগুলোর জের টানার কোন ইচ্ছেই আমার নেই, আমি শুধু দেখাতে চাই বিগত কয়েক বছরের মধ্যে আমার এই অসাধারণ বন্ধুটির কতটা উন্নতি ঘটেছে।
ডায়েরিতে দেখছি এটা ১৯১৩ সালের গোড়ার দিকের ঘটনা। হোমস তার বিরল এবং অসামান্য বুদ্ধির চর্চা চালাতে চালাতে এখনও অবিবাহিতই রয়ে গেছে। সে এখনও বেকার স্ট্রিটে তার পুরোন বাসাতেই থাকে। বাড়িওয়ালা বদ্ধ কালা হয়ে গেছে, কাজেই হোমসের বেহালা চর্চার আওয়াজ-টাওয়াজে তার বিন্দুমাত্র আসে যায় না। তখন বেশ রাত হয়ে গেছে, আমি আগুনের পাশে বসে বসে ঝিমোচ্ছিলাম, হঠাৎ ঘন্টা বাজল। দরজা খুলে দেখি হোমস।
“এই যে ওয়াটসন,” বলল সে, “একটু বিরক্ত করতে এলাম। কয়েক মিনিট সময় হবে?”
আমি বিনয়ের পরাকাষ্ঠা হলাম। খাঁটি ইংরেজের ভদ্রতা দেখিয়ে বললাম তার সঙ্গ পেলে আমার আর অন্য কিছু না হলেও মোটামুটি চলে যাবে।
“আবার ধূমপান শুরু করেছ?” ঘরে ঢুকে বলল হোমস।
“বন্ধু হে,” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “কী করে বুঝলে?
“সোজা ব্যাপার,” বলল হোমস, “ঘর ভর্তি তামাকের গন্ধ। আমি তো জানিই যে এ বাড়িতে তুমি আর মিসেস ওয়াটসন ছাড়া আর কেউ নেই, তাহলে আর কে খাবে? হ্যাঁ, তোমার স্টোভ থেকেও ধোঁয়া বেরোয় বটে, কিন্তু তামাকের ধোঁয়া তো আর বেরোয় না। তাহলে বুঝতেই পারছ, ব্যাপারটা জটিল মনে হলেও আসলে সোজা।”
“সে আর বলতে,” আমি বললাম। নিজের বোকামিতে নিজেই বিরক্ত হলাম।
“জানো ওয়াটসন,” বলল হোমস, “আমার প্রতিটা অভিযানের শেষেই সমাধানগুলো বুঝিয়ে দেওয়াটা বড় ভুল হয়ে গেছে। এতে রহস্যটা হারিয়ে যায়। কিন্তু কী জানো, এটা করলে বইয়ের পাতাগুলোও ভরে, আর লেখার ক্ষেত্রে শব্দ প্রতি এক গিনি পাওয়ার ব্যাপারটাও তো কম কথা নয়। যাই হোক, আমার সঙ্গে নিউইয়র্ক যাবে?”
“নিশ্চয়ই,” সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলাম আমি। “আমার প্রতিবেশী ডাক্তার বরাবরের মতই আমার সব রোগীর দায়িত্ব নেবে’খন। মাস কয়েকের ব্যাপার তো। আমার রোগীরা এখন যতটা খারাপ, তার থেকে খারাপ আর কি হবে? জাহাজে উঠছি কবে? আর কেসটা কী?”
“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজে উঠব, আজকে হলে আজকেই,” বলল হোমস, “আর যাচ্ছি একটা সংস্থার কাজের ব্যাপারে - তার নাম “সোসাইটি ফর দ্য ডিসকারেজমেন্ট অব থিভস”- তস্কর নিরুৎসাহ সমিতি।”
“কোনও দিন নাম শুনিনি।”
“শোনার কথাও নয়। আমি এই সংস্থার সভাপতি এবং এই মুহূর্তের একমাত্র সদস্য। আমি ব্যর্থ হয়েছি, বুঝলে। আমি এমন একজনকেও খুঁজে বার করতে পারিনি যাকে এই সংস্থার সদস্য করা যায়। চুরি করতে দেখছি সবারই খুব উৎসাহ। এটা তো ঠিক নয়।”
“আর তুমি আমাকে এই সংস্থার সদস্য করতে চাইছ?”
“আরে ওয়াটসন, যখন তুমি তোমার রোজকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দেবে, তখন আমরা ভেবে দেখব তোমাকে সদস্য করা যায় কিনা। এখন নিউইয়র্ক যাবে কিনা বল। আমি আশা করছি ওখানে সত্যি সত্যিই কিছু চোরের সন্ধান পাওয়া যাবে যাদের নিরুৎসাহ করা যায়। সেই যে তিনশো বছর আগে ওরা ইন্ডিয়ানদের থেকে মানহাটানের দ্বীপটা চুরি করল, তখন থেকেই ওদের কাছে অনেক চোরাই মাল আছে।”
“দু’মিনিটে রেডি হচ্ছি,” আমি বললাম, “শুধু বউকে একবার বলে আসি। ও কখনোই না করে না, তুমি জানো। তবে একবার এক পাঠক পরামর্শ দিয়েছিল আমার বেরোনোর সময় ওকে একটু উদ্বিগ্ন করে তুলতে।”
গোটা জাহাজ-যাত্রায় বলার মতো কোনও কিছুই ঘটেনি, কাজেই সেই সময়টায় আমি এই সংস্থার কার্যকলাপ সম্বন্ধে জেনে ফেললাম। এর উদ্দেশ্য নাকি, হোমসের মতে, স্রেফ মজা। সে তার পেশা থেকে বিপুল টাকা কামিয়েছে, অতএব এখন আর তার পয়সার জন্য গোয়েন্দাগিরি করতে ভাল লাগছে না। প্রিন্স অব ওয়েলস-এর যে কাজটা সে করল এই শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে - যে ঘটনাটা “দি অ্যাডভেঞ্চারস অব দ্য থিন-এজড ডিল-বক্স” নামের গল্পটাতে বলা হয়েছে - তাতে সে এখন প্রায় স্বাধীন হয়েই গেছে। এখন সে তার বিশাল প্রতিভা এবং শক্তিশালী কল্পনাশক্তির দু একটা সাধারণ প্রয়োগ করে তস্করবর্গের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে চাইছে। তার দু”একটা নমুনা আমি দেখতেও পেলাম। নিউইয়র্ক না পৌছানো পর্যন্ত হোমস জাহাজের স্মোকিং রুমের তাসের টেবিলে বসে বসে এমন তাসের ঝড় তুলে দিল যে রুইতনের সাহেবটা পর্যন্ত তার চোখ পিটপিট করে মাথা চুলকোতে লাগল, আর হোমসকে ঘিরে বসে থাকা জুয়াড়ির দল একেবারে ভ্যাবাগঙ্গারাম হয়ে গেল।
নতুন মহানগরীতে আমাদের প্রথম উল্লেখযোগ্য অভিযান হল এখানে আসার তৃতীয় দিন। আমরা ফোর্থ অ্যাভিনিউর একটা গাড়িতে উঠে সামনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ হোমস আমার কনুইয়ে একটা চাপ দিল।
“ওই যে চেক-চেক প্যান্ট পরা ভদ্রলোক সামনের ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে আছে,” বলল সে, “দেখবে ও এই গাড়িতেই উঠবে আর আমাদের এখানেই দাঁড়াবে।”
ওর কথা শেষ হতে না হতেই দেখলাম লোকটা হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করাতে বলছে।
“দারুণ, হোমস,” আমি ফিসফিস করে বললাম, “কিন্তু বুঝলে কী করে?”
“লোকটা চোর,” বলল হোমস। “যে কোনও লোকই ওকে দেখে বুঝতে পারবে যে ও নিউইয়র্ক শহরের সাথে খুব ভালই পরিচিত। ওর জামাকাপড় দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি। আর ও যে চোর, সেটা দেখেই আমি এটাও বার করে আনলাম,” বলেই হোমস একটা বড়সড় আর দামি ঘড়ি আমাকে দেখাল। “দেখো না, ওর চোখ এদিকেই। ওর ধান্দা এটাকে চুরি করা।”
হোমস বেশ দেখিয়ে দেখিয়ে দম দিল ঘড়িটায়, তারপর রেখে দিল তার ওয়েস্টকোট পকেটে, তারপর বাইরের দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে দেখতে লাগল উঁচু উঁচু বাড়িঘর। আমি নজর রেখেছিলাম লোকটার ওপরে। কয়েকমিনিটের মধ্যেই দেখলাম লোকটা চমৎকার হাতসাফাই করল ঘড়িটা এবং তৎক্ষণাৎ ঘড়িটার মধ্যে থেকে এমন জোরে ঘন্টা বাজতে লাগলো যে মনে হল যেন খান পনেরো অ্যালার্ম বাজছে একসঙ্গে। লোকটা এমন হকচকিয়ে গেল যে সে ঘড়িটা পকেটে রাখতেই ভুলে গেল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সেটাকে। এর মধ্যেই ঘড়িটার খাপ খুলে গিয়ে ভেতরের জিনিসগুলো পড়ে গেল মেঝেতে। সেখানে একটা বড় স্টিলের স্প্রিং আর একটা ঘন্টাও আছে, অ্যালার্ম ঘড়িতে যেরকম থাকে।
“ঘড়িটা পিতলের তৈরি,” আমরা মেঝে থেকে মালপত্রগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার পর বলল হোমস, “খুবই সহজ সরল একটা যন্ত্র, কিন্তু অসাধারণ কাজ দেয়। মনে হচ্ছে আমাদের এখনকার বন্ধুদের ধাক্কাটা একটু বেশিই লাগবে। যাক, আশা করি আমাদের এই বন্ধুটি যখন সুস্থ হয়ে উঠবেন, তখন উনি পেশা বদলানোর কথা ভাববেন।”
এমন চমৎকার ঘটনা ঘটার পর সেদিন সারাক্ষণ যে আমি হোমসের গায়ে গায়েই সেঁটে থাকব, সেটা আশা করি বোঝাই যাচ্ছে। আমরা ঘুরতে লাগলাম সারা শহর জুড়ে। গ্রাম থেকে বহু লোক এরকম শহরে বেড়াতে আসে, কাজেই আমাদের দেখে কেউই কিছু বুঝতে পারেনি। এরকম ক্ষেত্রে হোমস করে কি, একখানা বড়সড় কালো চামড়ার পকেটবই সঙ্গে রাখে, যার খানিকটা পকেট থেকে বেরিয়ে থাকে। এর সঙ্গে বাঁধা থাকে একটা শক্তপোক্ত ইলাসটিক ব্যান্ড, যার একটা প্রান্ত বাঁধা থাকে হোমসের কোমরের বেল্টের সঙ্গে। বেশ খানিকক্ষণ মজা করা গেল তারপর। দেখলাম এক হাতসাফাইবাবু এসে পকেটবইটা ছিনিয়ে নিয়েই দৌড় মারলেন। ইলাসটিক ব্যান্ডটা লম্বা হয়ে প্রায় একটা রডের মত হয়ে গেল, তারপর এর সঙ্গেই ফিরে এলেন হাতসাফাইবাবু বন্দুকের গুলির বেগে, পকেটবইটা হাতে ধরে রাখতে তার অবশ্য ভুল হয়নি। হোমস এর জন্য তৈরিই ছিল, বাবু ফিরে আসতেই সে তাকে জড়িয়ে ধরল। বেশ কয়েকবার বেশ কয়েকজনের সঙ্গে এরকম কান্ড ঘটল এবং প্রতিবারই হোমস তাদের যা ধর্মোপদেশ শোনাল, সে একটা শোনার মত জিনিস।
বহুক্ষণ ধরে এরকম চলার পর একঘেয়েমি কাটাতে হোমস তার কর্মপদ্ধতি পালটে ফেলল। সে চলে গেল গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল রেল রোড স্টেশনে, সঙ্গে বড় একটা কার্পেট ব্যাগ - বেড়াতে গেলে যেমন ব্যাগ লোকে নেয়। ব্যাগটা মেঝেতে রেখে সে চলে গেল টিকিট কাউন্টারে, ভাবটা এমন, যেন টিকিট কাটবে। এই ব্যাগটা একটা আশ্চর্য বস্তু। এটা এমনভাবে তৈরি যে মেঝেয় রাখলেই এর ভেতর থেকে দুটো শক্ত স্ক্রু বেরিয়ে মেঝের সঙ্গে এটাকে তৎক্ষণাৎ আটকে দেয়। সে যাওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই এক ভদ্রলোক - এরকম লোক স্টেশনে হরদম দেখা যায়, যারা হুড়মুড় করে দৌড়ে আসা লোকজনদের গাড়ি ধরতে উৎসাহ দেয় - এটাকে ধরে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল এবং এমন চমৎকারভাবে উলটে পড়ে গেল যে মনে হল খুব উঁচুমানের সার্কাসের খেলা দেখানো হচ্ছে। কি হল বেচারা বুঝতেই পারেনি।
“এই যন্ত্রটা একসঙ্গে দুজন চোরকে দমিয়ে দেবে,” কান্ডটা দেখার পর বলল হোমস।
“কিন্তু হোমস,” আমি বললাম, “আমি যে একজনকে দেখলাম!”
“আঃ, ওয়াটসন,” বলল হোমস, “আমি বহুবার তোমাকে বলেছি যে তোমার পর্যবেক্ষণে গন্ডগোল আছে। তুমি কি দেখেছ যে আমি টিকিট কাটতে গেছিলাম?”
“হ্যাঁ, দেখেছি।”
“কিন্তু কেটেছি কি?”
“না, কাটোনি।”
“তাহলে দেখছো, এটা নিউইয়র্ক, নিউ হাভেন অ্যান্ড হার্টফোর্ড রেল রোড কোম্পানিকে নিরুৎসাহ করল।”
“আরে, তাই তো!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “আমি খালি যে চোরটা তোমার ব্যাগ নিয়ে পালাচ্ছিল, তাকেই দেখেছিলাম।”
“আরে, এত বড়ো বড়ো চোরেদের তুলনায় ও তো কিছুই না,” বলেই হোমস আবার মেঝেতে ব্যাগটা রেখে টিকিট কাউন্টারের দিকে গেল।
আমার ধারণা, হোমসের তার সবচেয়ে বড় খেলাটা দেখিয়েছিল শহরের কেন্দ্রস্থলে এক কোটিপতির লাঞ্চ ক্লাবে। আমরা সবে টেবিলে বসেছি, হোমস এক ভদ্রলোকের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আমাদের কাছাকাছিই লাঞ্চ করছিলেন ভদ্রলোক। খুবই আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা।
“তুমি ভাবতেই পারবে না,” বলল হোমস, “যে এরকম একজন ভদ্রলোক আমাদের সমিতির পরের শিকার।”
“পাঁচে-এক বাজি ধরছি,” যে ভদ্রলোক আমাদের নেমন্তন্ন করেছিলেন এখানে, তিনি বললেন, “ও লোকটা কারোর শিকার হতেই পারে না। ওর নাম স্যাম রোডস, চল্লিশ বছর ধরে ওয়াল স্ট্রিটে আছে। হাজারের ওপরে রেলরোড ওর নিয়ন্ত্রণে, আর হিসেব করে দেখা গেছে, আজ অবধি যত স্টকহোল্ডার ওর জন্য গলায় দড়ি দিয়েছে, সেগুলো যদি একসঙ্গে করা যায়, তাহলে পৃথিবীকে দুবার পাক খাওয়ানো যাবে, ডাবল বো-নট সমেত।”
“আর এর জন্য কখনো ও শাস্তিও পায়নি?” জিজ্ঞেস করল হোমস।
“শাস্তি!” বলে উঠলেন আমাদের আপ্যায়নকর্তা, “ওর সম্পত্তির পরিমাণ কত জানেন? চার কোটি ডলার।”
“এবার পাবে,” হোমস বলল, গলায় একটা আত্মবিশ্বাসের সুর।
আমরা নজর রাখছিলাম মিঃ রোডসের ওপর। লাঞ্চ শেষ করে তিনি উঠলেন, আমরাও উঠে তার পিছু নিলাম, হোমসের ইঙ্গিত মতো। তিনি সোজা চলে গেলেন ক্লাবের সেই জায়গায়, যেখানে খাওয়ার আগে লোকেরা তাদের টুপি, কোট আর ছাতা রাখে। মিঃ রোডস তাঁর টুপি আর কোট নিলেন।
“আপনার ছাতা আছে নাকি স্যার?” বলল একজন কর্মচারী, “বাইরে জোর বৃষ্টি পড়ছে।”
“অ্যাঁ? ও হ্যাঁ হ্যাঁ, ছাতা আছে তো,” বললেন রোডস। তিনি র্যাক থেকে চটপট একটা ছাতা বার করে নিলেন।
হোমস আমার হাত চেপে ধরল। কোটিপতি মিঃ রোডস দ্রুত পা চালিয়ে দিলেন সিঁড়ির দিকে, ছাতাটা খুললেন মাথার উপর। এবং তখনই প্রায় সিকি গ্যালন মতো কি একটা কালচে বস্তু - যেটা আমার কালি বলেই মনে হল - ছাতা থেকে বেরিয়ে রোডসের মাথায় পড়ল এবং একই সঙ্গে ছাতার হ্যান্ডেল থেকে টপটপ করে পড়তে শুরু করল একই রকমের কালচে একটা জলীয় পদার্থ, গড়িয়ে গেল রোডসের জামার হাতার মধ্যে দিয়ে।
“তুমি কি ছাতাটা নিতে যাবে নাকি?” আমি ফিসফিস করে হোমসকে বললাম।
“এখন নয়,” বলল হোমস একই রকম সাবধানী গলায়। “মিঃ রোডসের বিশাল চেহারাখানা দেখছ তো? আর ওর এখন যা অবস্থা, ধরতে পারলে হয়তো খুনই করে ফেলবে। আমার এখন বয়স হয়েছে, কাজেই এই মুহূর্তে চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
আমরা আবার ক্লাবের স্মোকিং রুমে ফিরে গেলাম। আমাদের হোস্ট এক বোতল শ্যাম্পেনই খুলে ফেললেন। পুরো ব্যাপারটা এত ধোঁয়াশা লাগছিল যে আমি হোমসকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম।
“ব্যাপারটা সম্ভব হল কী করে?” আমি বললাম, “তুমি কী করে বুঝলে যে মিঃ রোডস ছাতা চুরি করবেন, এবং শুধু তাই নয়, তোমার ছাতাটাই চুরি করবেন?”
“একেবারে সোজা ব্যাপার,” বলল হোমস। “আমি একটা কর্মচারীকে পয়সা খাইয়েছিলাম, যাতে কোনও ভাবেই এ ছাতাটা অন্য কারোর হাতে না যায়, একমাত্র রোডস ছাড়া। আমি একটা কথাই বলতে পারি, এটা র্যাকের মধ্যে যত ছাতা ছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দেখতে। কাজেই দেখতেই পাচ্ছ, আমি পুরো ব্যাপারটাই আগে থাকতে ছকে রেখেছিলাম, যেটা এই গোয়েন্দা গল্পের গোপন রহস্য। অপরাধীকে ধরা গোয়েন্দার কাছে কোনও ব্যাপারই না। লেখক যেরকমভাবে ঠিক করে দেয়, সেভাবেই সে অপরাধীকে ধরে, এই কেসটায় যেমন আমি করলাম। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে গোয়েন্দাকে অনেক প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এবং তখন সাধারণত তার কাছে দুটো রাস্তা খোলা থাকে। এক হচ্ছে- কিস্যু না করে শুধু পারিশ্রমিকটা নেওয়া, আর দুই হচ্ছে- যে লোকটাকে সে প্রথমে ধরবে, তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা - তা সে দোষী হোক বা নির্দোষ।”
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন