আমব্রোসা চুরির মামলা

অমিত দেবনাথ

আমার বন্ধু জেমস সিলভারের একটা চমৎকার বাড়ি আছে টেমসের ধারে। বাড়িটার নাম আমব্রোসা। সেখানে আমি মাঝে মাঝে ছোটোখাটো গরমের ছুটিগুলো কাটিয়ে আসতাম। জেমসের আতিথেয়তার তুলনা নেই। যারাই সেখানে গেছে বা থেকেছে, তারাই এ কথা একবাক্যে স্বীকার করবে। এখানেই একবার আমি এমন কয়েকটা ঘটনার সাক্ষী ছিলাম, যাতে দেশ জুড়ে হুলুস্থুল পড়ে গেছিল। নেহাত পিকলক হোলস তার মাথাটা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিত সামলে দিয়েছিল, তাই রক্ষে, না হলে বেশ কয়েকটা নামকরা ফ্যামিলির মানসম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত।

সেবার একটা পার্টি হচ্ছিল আমব্রোসায়। সিলভার পরিবারের অনেকেই উপস্থিত ছিল তাতে। মিঃ আর মিসেস সিলভার ছাড়াও ছিল তিনজন কম বয়সী ছোকরা আর দুজন সুন্দরী তরুণী। সকলেই অবিবাহিত। পিকলক হোলসেরও নেমন্তন্ন ছিল সেখানে। সত্যি বলতে কি, আমি অনেক পরে খেয়াল করেছি, আমি যেখানেই যাই, সেখানেই হোলস পেশাদার ডিটেকটিভ হিসেবে আমার সঙ্গে যায়, যদি কোনও কাজ-টাজ জুটে যায়, তার জন্য। জেমস সিলভার অবশ্য প্রথমে আমার বন্ধুর শান্ত অথচ হুতুমথুমো মুখ দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি হুঁশিয়ার লোক, কোনও পার্টির মেজাজ নষ্ট হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ তিনি দেবেন না, কাজেই পরে হাসিহাসি মুখে হোলসকে অভ্যর্থনা জানালেন। পার্টির ষোলকলা পূর্ণ হয়েছিল পিটার বাওম্যান নামে বছর আঠেরোর এক ছোকরা থাকায়। এরকম চরম ফুর্তিবাজ আর রামফক্কর ছেলে আমি আর দেখিনি। ওর ঝাঁটার মত কটা রঙের চুলের জন্য সবাই ওকে শকহেডেড পিটার বলে ডাকে, তবে ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ওকে মাঝেমাঝে ভেনাস বলেও ডাকছিল - আর ওর চমৎকার স্যাক্সন চেহারার সঙ্গে সে নাম মানাচ্ছিলও ভালো। যাই হোক, আমার পরিষ্কার মনে আছে, আমরা সবাই টেমসের পাড়ে বসে বসে নদীর শোভা দেখছি। অজস্র নৌকো ভেসে যাচ্ছিল নদীর ওপর দিয়ে। তখন একটা নৌকো সদ্য আমাদের সামনে দিয়ে ভেসে গেল। বৈঠা বাইছিল ছিপছিপে চেহারার কমবয়সী এক ছোকরা। হঠাৎ হোলস মুখ খুলল।

“কী আশ্চর্য! ছোকরা এখনও বাইরে আছে!”

“কে? কোথায়? কেন?” আমাদের সমস্বরে প্রশ্ন।

“ঐ যে ছোকরা, বৈঠা বাইছে,” বলল হোলস, বিচ্ছিরিরকমের ঠান্ডা গলায়, “ওর দুই বিয়ে, আর ব্যাটা ওর ঠাকুমাকে খুন করেছে।”

“অসম্ভব,” বললেন মিঃ সিলভার ফ্যাসফেসে গলায়, “আমি ওকে বহুদিন ধরে চিনি। ও এরকম কাজ করতেই পারে না।”

“আমি সত্যি কথা বলি,” নিরুত্তাপ গলায় বলল হোলস, “ও লাল টাই পরেছে। টাইয়ের রঙ লাল ছিল না। তার মানে ওটায় কিছুর দাগ লেগেছে। রক্তের রঙ লাল। তার মানে এটাতে রক্ত লেগেছে। বুড়ি ঠাকুমাদের রক্তের রঙ হালকাই হয়। টাইয়ের লাল রঙটাও হালকা। তার মানে এতে ওর ঠাকুমার রক্তই লেগেছে। আর দুই বিয়ে? সোজা ব্যাপার। আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, ও যখন এখান দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দুখানা সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ছেড়েছিল। দুটোই একসঙ্গে হাওয়ায় ভাসল। একটা রিং হল বিয়ের চিহ্ন। তাহলে দুটো রিং মানেই হল ওর দুই বিয়ে।”

খানিকক্ষণের জন্য আমরা এক্কেবারে চুপ মেরে গেলাম। তারপর আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “বাহবা, হোলস! তুমি যা করলে, এর জন্য সমগ্র জাতি তোমায় ধন্যবাদ দেবে। পুলিশে খবর দেবে তো?”

“না,” বলল হোলস, “ওরা গাধা, কিস্যু জানে না। ওদের সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলবে না। তাছাড়া, আমার অন্য একটা ব্যাপার আছে।” বলেই সে আমাকে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কাউকে বলবে না। আজ রাত্তিরে এখানে চুরি হবে।”

“বল কি?” আমি চমকে উঠলাম। কী শান্ত আর নির্বিকার গলায় কথাটা বলল হোলস। সত্যি, ও যে কী করে এত সব জেনে ফেলে কে জানে!

“কিন্তু হোলস, তা হলে তো আমাদের তৈরি হতে হয়। চাকরবাকরদের অস্ত্রশস্ত্র দিতে হবে, পুলিশে খবর দিতে হবে, দরজা জানলা সব আটকে রাখতে হবে – না হলে তো মহা বিপদ! মিঃ সিলভারকে জানাবো তো?”

“পটসন, তুমি আর মানুষ হলে না দেখছি! এত বছর ধরেও আমার কাজের ধারা কিছুই বুঝতে পারনি।”

কী কথার কী উত্তর! আমি চুপ করেই রইলাম, কী আর বলব! সন্ধেবেলায় দিব্যি পার্টি হতে লাগল, আমব্রোসায় যেমন হয়। ড্রয়িং রুমে ধুমধাম করে গান হতে লাগল; এই গান আবার আমব্রোসার নিজস্ব – এই পরিবারের লোকজন আর অতিথিরা মিলেই বেঁধেছে গানখানা। পিটার আবার সুপরিচিত “দি ডিউটিফুল সন” আর “দি কার্ট্রিজ বেয়ারার” গানদুটো এমন গাইল যে সবার চোখ ছলছল করে উঠল। এর পরেই ভঙ্গ হল পার্টি, মহিলারা চলে গেল শোওয়ার ঘরে, খানিকক্ষণ ধূমপান করার পর পুরুষরাও গেল তাদের পেছন পেছন। সবারই দারুণ খোশমেজাজ – কাল কী করা যায়, তার নানারকম প্ল্যানও হয়ে গেছিল এর মধ্যেই। একমাত্র হোলসকেই দেখলাম কী সব ভাবছে।

ঘন্টাখানেক মাত্র ঘুমিয়েছি, হঠাৎই চমকে জেগে উঠলাম। বাইরের প্যাসেজে পিটার আর সিলভারের ছোট ছেলের গলা শোনা যাচ্ছে।

“পিটার,” জনি সিলভারের গলা পেলাম, “বাড়িতে চোর ঢুকেছে মনে হচ্ছে। কি মজা!”

“দারুণ!” বলল পিটার, “কাউকে বলেছ নাকি?”

“না না, মা বাবাকে জাগিয়ে লাভ নেই! যা করার আমরা করব। মেয়েদের শুধু বলে দিয়েছি, তাতেই ওরা ঘরের দরজা বন্ধ করে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। ওদের নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি তৈরি তো?”

“নিশ্চয়ই।”

“তাহলে চল।”

তারপর শুনলাম ওরা সিঁড়ি দিয়ে নামছে। আমি অন্যান্য দিনের চেয়েও তাড়াতাড়ি জামাজুতো সব পরে নিলাম। তারপর হোলসের ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখি সে পুরোপুরি জেগে, তার সবচেয়ে ভাল ডিটেকটিভ স্যুটটা পরে বিছানায় শুয়ে আঙুল মটকাচ্ছে।

“এসে গেছে,” আমি বললাম।

“কে?”

“চোর।”

“যা ভেবেছিলাম,” বলল হোলস। ঘরের মাঝখানে রাখা জিনিসপত্রের মাঝখান থেকে সে তার

সংগ্রহের সবচেয়ে ভালো একটা ছোরা তুলে নিল। এটা তার আত্মরক্ষার কাজে লাগে। বলল, “চুপচাপ আমার পেছন পেছন এস।”

আমরা সবে ল্যান্ডিং-এ পৌঁছেছি, আচমকা একটা রক্ত জমানো চিৎকার ভেসে এল - পর পর কয়েকবার। সারা বাড়ির নৈঃশব্দ ভেঙে খানখান হয়ে গেল সেই চিৎকারে।

“বাপরে!” আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা।

“চুপ!” বলল হোলস। আমি চুপ মেরে গেলাম। চিৎকারটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই শুনলাম ঐ দুই ছোকরার গলার আওয়াজ। আওয়াজ তো নয়, যেন জয়োল্লাস।

“উঁহু! একদম নড়াচড়া করবে না, মাথা ভেঙে দেব তাহলে!” পিটারের গলা পেলাম, “দড়ি দিয়ে আরেকটা প্যাঁচ দাও, জনি। হ্যাঁ, ঠিক আছে। এবার তোমার বাবাকে বলে এস, আর হোলসকেও বল, আমরা ব্যাটাকে ধরেছি।”

বলার অবশ্য দরকার ছিল না, কারণ সারা বাড়ি চিৎকারের চোটে জেগেই উঠেছিল। মহিলা আর পুরুষদের ভিড় জমে গেছিল সিঁড়ির গোড়ায়। আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর তাতেই দেখলাম দৃশ্যটা। ড্রয়িং রুমের মেঝেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চোরটা পড়ে আছে, আর পিটার চেপে বসেছে ওর মাথায়।

“জনি আর আমি দুজনে মিলে ধরেছি ব্যাটাকে,” বলল পিটার, “যাক, সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেছে। এবার একটা জিঞ্জার-বিয়ার খাব।”

চোরটাকে থানায় পাচার করা হল। হোলস সবাইকে বলল যে কিভাবে ও জানতে পেরেছিল এ বাড়িতে চুরি হবেই আর সেই মত ব্যবস্থা নিয়েছিল। কাউন্টি কাউন্সিল ধন্যবাদ জানাল হোলসকে।

“এই লোকটা হচ্ছে,” পরে হোলস বলল আমাকে, “আমার পোষা তস্কর-সঙ্ঘের মধ্যে সবচেয়ে চালাক আর চটপটে। ওকে আর ওর সাঙ্গোপাঙ্গোদের দিয়ে যে আমি কত কাজ করিয়েছি, তার ঠিক নেই। আর এই দুই চ্যাংড়া বজ্জাত মিলে আমার কাজটা প্রায় মাটি করে দিয়েছিল। আমার কথা শোন পটসন, বাড়ি ভর্তি ছেলেছোকরা থাকলে সেখানে কোনও কেরদানি দেখাতে যাবে না। মনে রেখ কথাটা। এই দুজন বাগড়া না দিলে আমি নিজেই চোরটাকে ধরতাম। ও তো আমাকে আগেই টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দিয়েছিল ও কোথায় থাকবে।”

------------

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%