অমিত দেবনাথ
ডিসেম্বরের এক হাড় কাঁপানো শীতের সকালে আমার বন্ধু থিনলক বোনস আমায় ডেকে পাঠাল। কারণটা আর কিছুই না, তাকে একটু সঙ্গ দেওয়া। গিয়ে দেখি যথারীতি যত রাজ্যের খবরের কাগজ খুলে সে জাঁহাবাজ প্রাইভেট ডিটেকটিভদের বিজ্ঞাপনগুলো দেখছে আর ফিকফিক করে হাসছে। আমি ঢুকতেই একগাল হেসে আমায় অভ্যর্থনা জানাল।
“আরে এসো এসো হোয়াটসোনেম। ব্রেকফাস্ট তো করে আসনি, খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। সে জন্যই মনে হচ্ছে হ্যানসম চড়ে এসেছ। অবশ্য তোমার সময় ছিল, ব্যারোমিটার দেখতে পেয়েছ। আরে, অবাক হচ্ছো কেন! এ তো দেখেই বলা যায় – যে কোনও মূর্খও বলে দিতে পারবে যে তুমি সকালে কিছু খাওনি, কারণ তোমার দাঁত আর মুখ এক্কেবারে পরিষ্কার, কিছু লেগেটেগেও নেই। ঢোকার সময় যখনই তুমি হাসলে, তখনই দেখেছি। গাড়ি চেপে এসেছ – কারণ রাস্তায় কাদা আছে, অথচ তোমার জুতো একেবারে ঝকঝকে। হ্যানসমে চেপেই এসেছ, নাহলে এত তাড়াতাড়ি তুমি আসতে পারতে না। তুমি সকালে ক”টায় ঘুম থেকে ওঠো, তা কি আর আমি জানি না? বাসে বা অন্য চারচাকার গাড়িতে এত তাড়াতাড়ি আসা যায় না। আর ওই ব্যারোমিটারের ব্যাপারটা? জলের মতো সোজা। ঝকঝকে সকাল, অথচ তুমি এসেছ ছাতা নিয়ে, তার মানে তোমার ধারণা বৃষ্টি হতে পারে। তার মানে তুমি নির্ঘাত ব্যারোমিটার দেখেছ। তোমায় আরও বলছি, কোনও মজুর গোছের লোকের সঙ্গে তোমার ধাক্কা লেগেছিল। তোমার কাঁধে কাদার ছোপ, বুঝতেই পারছ।”
“না না, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে ধাক্কা লেগেছিল,” আমি বললাম।
“উঁহু, মজুর,” শান্ত গলা বোনসের।
হঠাৎই ঘরে ঢুকল এক তরুণ। মড়ার মতো সাদা মুখ, কাঁপছে থরথর করে। বোনস কথাবার্তা বলার জন্য নিজেকে গুছিয়ে নিল, লম্বা লিকলিকে হাতদুটো দিয়ে ঘসল নিজের নাকটা। এটা ওর বহুদিনের অভ্যেস, কাজে বসার আগে নাক ঘসা।
“বলুন স্যার, আপনার জন্য কী করতে পারি?” বলল বোনস। “আপনার মতো একজন তরুণ, অগাধ টাকাপয়সার মালিক, ব্রুহাম আছে, ওয়েস্ট এন্ড-এর কেতাদুরস্ত এলাকায় থাকেন, ব্যারনপুত্র –কোনও সমস্যায় পড়েননি নিশ্চয়ই?”
“কী আশ্চর্য! আপনি এত সব জানলেন কী করে?” চেঁচিয়ে উঠল ছোকরা।
“ও বোঝা যায়,” বলল থিনলক, “আপনিই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এবার বলুন –”
“আমার নাম স্টুয়ার্ট টিমোন –”
“রবার্ট স্টুয়ার্ট টিমোন,” বোনসের মন্তব্য।
“হ্যাঁ, কিন্তু –”
“আপনার টুপিতে লেখা আছে,” বলল বোনস।
“আমার নাম রবার্ট স্টুয়ার্ট টিমোন, গ্রসভেনার স্কোয়ারের লর্ড স্টুয়ার্ট টিমোনের ছেলে, আর আমি –”
“আপনার বাবার প্রাইভেট সেক্রেটারি,” বলল থিনলক, “আপনার পকেট থেকে আপনার বাবার নামে “ব্যক্তিগত ও গোপনীয়” মার্কা একটা চিঠি উঁকি মারছে দেখতে পাচ্ছি।”
“ঠিক বলেছেন,” বলল স্টুয়ার্ট টিমোন, “সে জন্যই তো জানতে পেরেছি বাবার ঘাড়ে একজন চেপেছে, এক বয়স্ক –”
“মহিলা,” যেন চেয়ারের গভীর থেকে উঠে এল উত্তরটা। সত্যি, কত মনোযোগ দিয়ে বোনস লোকের কথা শোনে এবং রক্তশূন্য দুহাত দিয়ে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে (আশ্চর্য অভ্যেস বটে!) সমস্ত কিছুই বুঝে ফেলে, এ না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
“আবার বলে ফেললেন! একদম ঠিক!” বলে উঠল ছোকরা, “আশ্চর্য মানুষ মশাই আপনি! পারেন কি করে?”
“জলের মতো সোজা,” বলল বোনস, “কিন্তু সে সব বলে সময় নষ্ট করব না। হোয়াটসোনেম আজকাল আমার পদ্ধতি বুঝতে শিখেছে। ও পরে আপনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে দেবে।”
“ব্যাপারটা বলি তাহলে। মহিলা বয়স্ক এবং ধনী। ধনী মানে অগাধ ধনী। টাকার কুমির একেবারে।” রবার্ট স্টুয়ার্ট টিমোন বলতে লাগল, “তার নাম হল মাননীয়া মিসেস কোরান –”
“বিধবা মহিলা,” বোনস বাধা দিল।
“ঠিক বলেছেন!” বলল স্টুয়ার্ট টিমোন, “নাম হল মাননীয়া মিসেস কোরান এবং তিনি বিধবা। এই মহিলা আমার বাবার প্রেমে পড়েছেন। আমার বাবাও বিপত্নীক। তিনি অবশ্য মহিলাকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না, কিন্তু –”
“পাত্তা দিচ্ছেন ওঁর টাকাকে,” বলে উঠল রসিক চূড়ামণি গোয়েন্দাপ্রবর।
“কী করে বুঝছেন বলুন তো? আমি বলার আগেই একেবারে হাঁড়ির খবর টেনে বার করছেন! রহস্যটা কী?”
“আমি মনুষ্য চরিত্রটা বুঝি,” বলল থিনলক বোনস।
“এখন ব্যাপার হল, বাবা চাইছেন ওঁকে বিয়ে না করেই টাকাপয়সাগুলো বাগাতে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এটা কি সম্ভব? বাবার বয়স কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম, আর সে জন্যই উনি চাইবেন না বিনা কারণে একটা আশি বছরের বুড়ির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে, তা সে বুড়ি যতই কোটিপতি হোক না কেন। কিন্তু বিয়ে না করলে কি বুড়ির মরার পর তার সম্পত্তি বাবা পাবেন? সেই কারণেই দেরি হয়ে যাওয়ার আগে ঝটপট বিয়েটা সেরে ফেলা দরকার, না হলে সোনার ডিম-পাড়া হাঁস হাত ফসকে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিয়ে করাতেও বাবার অরুচি। তাহলে কী করা যায়? তখনই আমাদের কাছে একটা সুযোগ এল। কাউন্টেস প্লিঁ দ্য বির-এ একটা ডিনার পার্টিতে আমাদের নেমন্তন্ন ছিল, যেখানে ওই মাননীয়া মিসেস কোরানও উপস্থিত ছিলেন –”
“হ্যাঁ, আপনারা তো সেখানে গেছিলেন,” বলে উঠল বোনস, এবং আবার পাছে ছোকরা “কী করে জানলেন, কী করে বুঝলেন” করে ওঠে, তাই আগেই বুঝিয়ে দিল, “আরে, সোজা ব্যাপার, খবরটা “ডেইলি টেলিগ্রাফ”-এ বেরিয়েছিল।”
“হ্যাঁ, আমরা গেছিলাম,” বলল স্টুয়ার্ট টিমোন, “এবং যাওয়ার আগে আমরা একটা মতলব ভেঁজেছিলাম। সেটা এরকম : আমি বুড়িকে নিয়ে ডিনারে বসব এবং তাকে ভাল ভাল ওয়াইন খাইয়ে তার গোপন কথা জেনে নেব। বুড়ি ওয়াইনের খুব ভক্ত। আমাকে জানতে হবে বাবা সম্পত্তি পাবেন কি পাবেন না। তাকে বিয়ে না করলে সম্পত্তি দেবে কি দেবে না। সময় কম, কাজেই যদি বলে দেব না, তাহলে সেই রাত্তিরেই ডিনারের পর বাবা বুড়িকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন। আমার আর বাবার মধ্যে এরকম কথাবার্তা হল যে বাবা বিয়ে না করলেও যদি বুড়ি বাবাকে সম্পত্তি দেয়, তাহলে আমি বাবার পায়ে পা দিয়ে ঠোকা মারব আর বাবা মোটেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন না – আর না হলে দেবেন। কী আর বলব মিঃ বোনস,” ফুঁপিয়ে উঠল ছোকরা, ফোঁৎ ফোঁৎ করে নাক টেনে ফ্যাকাসে মুখে থিনলকের দিকে তাকাল। “কী যে হল, কিছুই বুঝলাম না – এখন আপনিই পারেন আমাকে উদ্ধার করতে।”
“আমাদের প্ল্যানটা ভালই চলছিল,” বলল সে। “আমি বুড়িকে মদ খাইয়ে, মরার পর তার সম্পত্তির কী হবে, সে সম্পর্কে পুরো জেনে ফেললাম। আমার বাবাই তার পুরো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন। মনে মনে এরকম একখানা সৎমা না পাওয়ার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে, প্ল্যানমাফিক টেবিলের তলা দিয়ে বাবার পায়ে একটা লাথি মারলাম আর বাবা – বাবা ডিনার খাওয়ার ঠিক পরপরই মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। মহিলাও রাজি হয়ে গেল! এর মানে কী মিঃ বোনস, এর মানে কী?”
“এর মানে আপনি টেবিলের তলা দিয়ে বাবার পায়ে লাথি না মেরে টেবিলের পায়ায় লাথি মেরেছিলেন!” প্রশান্তমুখে বলল থিনলক বোনস, এই সময়ের সেরা গোয়েন্দা এবং তার সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হল আরেকটা পালক।
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন