অমিত দেবনাথ
সেই বিখ্যাত “ক্রাম্পেট মিস্ট্রি”-র কথা নিশ্চয়ই এখনও পাঠকদের মনে আছে, যে ঘটনা লন্ডন শহর কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং দুঃখের বিষয়, আমার গোবেচারা বন্ধু শেরউড হোকসকে প্রায় ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, যদিও এ ব্যাপারে সে কিছুই জানত না, বরাবরের মতোই। অবশ্যই তা তো হবেই, যখন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, ধরো ওকে। যত দোষ, নন্দ ঘোষ। যাই হোক, এখন যে ঘটনাটা আমি বলতে যাচ্ছি, সেটাও প্রায় একই রকম ঘটনাবহুল, আলোড়ন তোলা – যেটা নিয়ে জনগণের মধ্যে গল্পগুজবের ঝড় বয়ে গেছিল, খবরের কাগজের পাতায় পাতায় খবর ছাপা হয়েছিল দিনের পর দিন “বিশপের কী হল?” – এই হেডিং-এ। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার সঙ্গে হোকসের দেখা হচ্ছিল না, যদিও “ডেইলি ক্যাটারঅল” খবরের কাগজের দ্বিতীয় কলমে তার ছোট্ট বিজ্ঞাপনটা আমি রোজই খেয়াল করছিলাম। বুচার অ্যাভিনিউর ঘরে শেষ যেদিন ওর সঙ্গে আমার কথা হয়, সেদিন আমি ওকে দেখেছিলাম রীতিমতো ক্ষিপ্ত মেজাজে। কথায় কথায় বেরিয়ে এসেছিল যে, কয়েকজন বৃদ্ধ পাদ্রি – কাছাকাছিই থাকেন তাঁরা – ওকে নৈশভোজে ডেকেছিলেন একেবারে বিনয়ের অবতার হয়ে। ওঁরা প্রতি বছরই এরকম নৈশভোজের আয়োজন করে থাকেন – চোরেদের নিয়ে – এবং বলেছিলেন, সে যেন সংশোধনের আগে এবং পরে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে সেখানে কিছু বলে।
“এ সব স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কাজ,” তিতকুটে গলায় বলেছিল সে, “ওরাই আমার পেশাদার চরিত্র নিয়ে ইচ্ছে করে এসব কুৎসা রটিয়েছে। হ্যাঁ, আমি মানছি, আমার একটা দুটো কেসে ভুল হয়েছিল, তার জন্য আমি প্রায়শ্চিত্তও করেছি যথেষ্ট, কিন্তু তাই বলে পুলিশ সেগুলোই ধরে নিয়ে বার বার করে আমার নামে আজেবাজে কথা বলবে? ওরা আসলে আমাকে ঈর্ষা করে – বুঝলে চেসমোর – ঈর্ষা করে আমাকে – কারণ আমি সত্য নিয়ে নাড়াচড়া করি।”
প্রায় ছয় সপ্তাহ – মানে মাসদেড়েক বাদে আমি আবার হোকসের খবর পেলাম। একদিন রাত্তিরে, তখন আমি ব্যাবসাপত্তর গোটাচ্ছিলাম (আমি এতই চমৎকার এবং ব্যস্ত একজন কেমিস্ট যে রাত আটটার মধ্যেই ব্যবসাপত্র গুটিয়ে ফেলি), তখন এক তরুণ – একেবারেই সাদামাটা চেহারা, পরনে কোচোয়ানের পোশাক – কাউন্টারে ঢুকে আমার হাতে বাদামি কাগজে মোড়া এবং সিল করা একটা বোতল দিল।
“কী ব্যাপার হে ছোকরা? এটা কী?”
“সে আমি জানি না। ভেতরে লেখা আছে।”
মোড়ক খুলে দেখলাম এটা একটা পুরোন ওষুধের বোতল, বিচ্ছিরি দেখতে এবং স্টপারটা কাগজ দিয়ে স্ক্রু-র মতো করে আঁটা। এর সঙ্গে কোনও প্রেসক্রিপশন নেই এবং গন্ধ শুঁকে মনে হল ভেতরে এর আগে তেতো জিন ছিল। স্টপার কর্কটা খুলে দেখি – আশ্চর্যের ব্যাপার – বোতলের ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজে পেনসিল দিয়ে কী সব লেখা। কাগজটা পাঠিয়েছে শেরউড হোকস। লেখাটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা। সেটা এইরকম:
প্রিয় চেসমোর,
যদি সম্ভব হয়, যত তাড়াতাড়ি পারো চলে এস। সাংঘাতিক রহস্য, সাংঘাতিক প্রতিহিংসার ঘটনা। অদ্ভুত লোকজন সব এর সঙ্গে জড়িত। বোতলটা জলে ভরে লাল মোম দিয়ে সিল করবে, যদি তুমি আজ রাত্তিরেই আসো, না হলে কালো মোমে সিল করবে। লোকটার কাছ থেকে ছয় ডাইম নেবে “ওষুধের জন্য”।
- শে.হো.
এই ঠিকানায় এসঃ “ইহুদির বীণা” কোহেন স্ট্রিট, ইস্ট পাটনে।
আমি পাটনে-তে চলে গেলাম সাড়ে ন’টার মধ্যেই, কিন্তু “ইহুদির বীণা” খুঁজে বার করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হল। এটা একটা ছোট শুঁড়িখানা, তবে যদ্দুর বাজে হতে হয়। নোংরা একটা প্যাসেজ দিয়ে ভেতরের বার-রুমে ঢুকলাম। সেখানে একটা ছোট চুল্লির পাশে বসে বসে ঢুলছিল একটা লোক। গালে দুদিনের না-কাটা দাড়ি, কলারের বদলে রয়েছে এক টুকরো নীল কাপড় আর পোশাক আশাক যতদূর সস্তা হতে হয়।
“কে? কী ব্যাপার?” বলে উঠল লোকটা, “আচ্ছা, এসেছ যখন, বোসো।”
“ভালই হয়েছে,” আমি বললাম, “তবে নখটা বড্ড পরিষ্কার। যে ছদ্মবেশ ধরেছ, তাতে ওটা চলে না, হোকস।”
“তা বটে,” বলল সে, “তবে এটা শুধু ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য। পর্দা উঠবে কাল সকালে, আসল খেলা শুরু হবে তখন।”
“তাহলে তুমি এখন এখানে কীসের পার্ট করছো?”
“আমার হোস্টের শ্যালকের পার্ট। সে এখানকার জমিদার, ইহুদি, নাম র্যাফিয়েল লিউইস। শিগগিরই ফিরবে। কেসটা একটা মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে, তবে মৃত্যুটা খুবই সন্দেহজনক। করোনারের জুরি অবশ্য বলেছেন মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক – মানে অতিরিক্ত মদ্যপান। কিন্তু লিউইস এতে খুশি নয়। যে লোকটাকে নিয়ে ঘটনা, সে ছিল ওরই ছোট ভাই লাজারাস, যাকে সবাই লেজি লিউইস বলে জানে। সে সব ধরণের লোকেদের জন্য নানারকম কাজকর্ম করত। যখন মদ খেত, কিন্তু মাতাল হত না, তখন তাকে দেখাত একেবারে চূড়ান্ত আলসে আর চোরের মতো, কিন্তু সে যখন মাতাল হয়ে যেত, তখন – খুবই অদ্ভুত ব্যাপার – সে হয়ে যেত দারুণ বিনয়ী, ভদ্র এবং সৎ। গত মাসের পাঁচ আর ছয় তারিখে সে এখানকার একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের হয়ে কাজ করছিল। সবাই ওঁকে “বিশপ” বলে ডাকে, আর তিনি সত্যি সত্যিই আগে ব্রিটিশ গাম্বোজিয়ার বিশপ ছিলেন। সাত তারিখ সন্ধ্যেবেলা সে এই ঘরে ঢোকে টলতে টলতে – চূড়ান্ত মাতাল অবস্থায় – আর চিৎপাত হয়ে মেঝেতে পড়ে যায় । ওর ভাই ভাবে যে ও বোধহয় খুব অসুস্থ, তাই ডাক্তার ডেকে পাঠায়। কিন্তু সে মারা যায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। শেষ সময়ে ও যা বলেছিল, তা হল, “হলুদ আরশোলা!” দুবার বলেছিল কথাটা, তারপরেই তার প্রাণ বেরিয়ে যায়।”
“পোস্টমর্টেম হয়েছে?”
“হয়েছিল, তবে সেখানে দেখা গেছে ওর লিভারের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, সেখান থেকেই মৃত্যু হয়েছে।”
“লিউইস কি তার ভাইয়ের বলা এই “হলদে আরশোলা”-র মানে কী, বুঝতে পেরেছে?”
“না না, তবে মরার আগে ও এমনভাবে কথাটা বলেছিল যে লিউইসের মনে হয়েছিল এর সঙ্গে ওর ভাইয়ের মৃত্যুর নিশ্চয়ই কোনও সম্পর্ক আছে।”
হোকস উঠে আলমারি থেকে একটা জিনিসপত্রের গোছা নামিয়ে ছড়িয়ে দিল টেবিলের ওপর।
“এই দেখ ওর কাপড়চোপড়। ভালও না, আবার খুব খারাপও বলা যায় না, তাই না? বুটজোড়াটা খেয়াল কর – ও পা ঘষে ঘষে হাঁটত, মাতাল তো। জামাটা দেখে বোঝা যাচ্ছে ওর হাত কাঁপত – দেখ, কতবার মদ ছলকে পড়েছে এটাতে। আর এই লম্বা সুতোটা খেয়াল কর, আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র – দেখ, এর শেষে মুচির মোম লাগানো আছে।”
“এটা দিয়ে কি কিছু তোলা হয়েছিল বলে তোমার ধারণা?”
“তাই ভাবছি। এতে হলদে হলদে গুঁড়ো লেগে আছে, দেখতে পাচ্ছ? তুমি পাচ্ছ না, আমি পাচ্ছি। আর এটাও দেখ, এই বাঁকানো টিনের বাঁশিটা। এগুলোই মনে হচ্ছে রহস্যের চাবি-কাঠি।”
আমরা যখন এগুলো দেখছিলাম, সেই সময়েই ঘরে ঢুকলেন জমিদার র্যাফিয়েল লিউইস এবং আমাকে দেখেই চমকে উঠলেন, রীতিমতো সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন আমার দিকে। দেখলাম তাঁর জামার হাতা গোটানো, মাথায় একটা পট হ্যাট - কানের ওপর নেমে এসেছে সেটা - মুখে একটা লালসামাখা নীচ মানসিকতার ছাপ লেগে রয়েছে, আর সজল, ঘোরলাগা চোখদুটো দেখলেই মনে হয় ওদের বিশ্বাস করা যায় না, সে তিনি মুখে যতই ভাল ভাল কথা বলুন না কেন। একজন ধূর্ত ইহুদির থেকে বরং একজন পাশবিক চরিত্রের লোক হিসেবেই তাঁকে ভাল মানায়। তিনি কথা বলছিলেন শ্লেষ্মা জড়ানো গলায়।
“শুভ সন্ধ্যা, মশাইরা। ল্যাজারাস বুড়োর মালপত্তর দেখছেন নাকি?”
“ইনি আমার অনেক দিনের বন্ধু,” হোকস পরিচয় করিয়ে দিল আমার সঙ্গে, “আমিই ওঁকে এখানে আসতে বলেছিলাম এই কেসটায় আমাকে একটু সাহায্য করার জন্য।”
“আচ্ছা! ভাল, ভাল! তা উনি কি পান করেন? আপনার কী পছন্দ মশাই? আমি একটা দারুণ মদের কথা বলতে পারি।”
আমি সবিনয়ে প্রত্যাখান করে কেসটা নিয়েই কথাবার্তা বলতে লাগলাম, ফাঁকফোকর দিয়ে চলতে লাগল জমিদার মশাইয়ের শোকাকুল ধারাভাষ্য।
“আহা, বেচারা ল্যাজারাস – মদই ওকে শেষ করে দিল – কিন্তু কী জানেন, এক কোয়ার্ট মদ খেলেও মাতাল হত না, বোঝাই যেত না – আবার তেতো জিন একটুখানি খেলেও পাঁড় মাতাল হয়ে যেত – আমি জানি আমার কথা আপনারা বিশ্বাস করছেন না, মশাইরা। কিন্তু যতই ও গাধা হোক, বুদ্ধু হোক, ওকে কি এভাবে মরতে দেওয়া যায়, বলুন? যদি একবার জানতে পারি, ওর মরার পেছনে কোনও দু’নম্বরি আছে, তাহলে সেই ব্যাটার ছাল ছাড়িয়ে নেব!”
যদিও যেখানে সেখানে আমি রাতে ঘুমোই না, তবুও সেই রাত্তিরটা আমি হোকসের সঙ্গে “ইহুদির বীণা”-তেই কাটালাম। রাত এগারোটা অবধি সেখানে তান্ডব চলল, মদ্যপানের বন্যা বয়ে গেল, তারপর র্যাফিয়েল নিয়ে এলেন তাঁর এক দোস্তকে – নাম সাইমন – পেছনের একটা ঘরে। আমাদেরও ডাকা হল সেখানে – ধূমপান এবং কথাবার্তা বলার জন্য। বেশ গরম ছিল রাতে, তিনি তাঁর কলার খুলে ফেললেন – যদি অবশ্য সেটাকে কলার বলা যায় – মাথায় কিন্তু পরাই রইল টুপিটা। কথা বলতে বলতেই তিনি হঠাৎ আমাকে বললেন যে তিনি “ইহুদি নন, তবে খ্রিস্টান ইহুদি”।
“সে আবার কি? খ্রিস্টান ইহুদি?”
“সেটা আপনার না জানলেও চলবে,” তিনি বললেন রুক্ষ গলায়, “যা বললাম, আমি তাই, এবং সেটাই থাকব।”
“কিন্তু তাহলে আপনার ধর্মটা কী? আপনি কীসে বিশ্বাস করেন?”
“উঁহু, উঁহু, সব কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবেন না। গালাগাল খেয়ে যাবেন তাহলে। কি, সাইমন?”
শোয়ার সময় দেখলাম হোকস দু-পা পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে একটা কাগজের ওপর রাখা নস্যি নিয়ে কী যেন করছে। আমি খানিকটা নস্যি নাকে নিতেই একের পর এক কাশি আর হাঁচির চোটে দাঁতগুলো প্রায় খুলে বেরিয়ে আসার জোগাড় হল।
হোকস হাসল। “আহারে, বেচারা! ভায়া চেসমোর, ওতে বারুদ মেশানো আছে!”
“বা-বা-আঁ-আঁ-চ্ছ-চ্ছো! বা-রু-দ!” আমার কথাগুলো হাঁচির সঙ্গে বেরিয়ে এল।
“হ্যাঁ। খুব ভাল কোয়ালিটির। এলি-র তৈরি। আমি দেখেছি এটা ব্যবহার করলে চিন্তাশক্তি বেড়ে যায় – অবশ্য তার আগে এটার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হবে।”
আশ্চর্য লোক বটে! বহুক্ষণ ধরে দেখলাম হোকস খাটে বসে আছে পাথরের মূর্তির মতো – নস্যি নিতে নিতে কী সব যেন ভাবছে। তারপর আমার চোখ লেগে এসেছিল। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম জানলার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে ঘরের ভেতর আবছা হয়ে, হোকস শোওয়ার জোগাড় করছে, নস্যির ফাঁকা কাগজটা পড়ে আছে মেঝেতে।
“কাল রাত্তিরে আমি একটা তত্ত্ব খাড়া করেছি,” ব্রেকফাস্ট করতে করতে বলল হোকস, “একটা সপ্তাহ খুব ধকল যাবে এর জন্য।”
“কিন্তু সাবধান ভায়া। যা করবার সাবধানে কোরো। তোমার এই র্যাফিয়েল লোকটিকে কিন্তু আমার বিশেষ সুবিধের মনে হচ্ছে না।”
সেই সপ্তাহের বুধবার হোকস আমার দোকানে এল, পরনে চেককাটা স্যুট, মুখে নিভাঁজ হাসি। আমার স্ত্রী তখন ছিল না, আমিই তাকে নিয়ে এলাম আমার ছোট্ট ঘরে, যেখানে আমি রুটির বড়ি আর নীল অপরাজিতার কুইনিন তৈরি করি। তারপর জিজ্ঞেস করলাম তার এমন চমৎকার হাসির কারণ কী।
“বিশপ বুড়োর বাড়িতে কাজ নিয়েছি,” বলার সময় গলাটা দেখলাম প্রায় তার মক্কেলের মতোই হয়ে গেল।
“কীসের কাজ? চাকরের? পেজবয়ের?”
“মালি – চাপরাশি –দারোয়ান – যা বল। শোন, সামনের শনিবার গামবোজি লজে চলে এস। তোমার সাহায্য দরকার হতে পারে। তোমাকে দুয়েকটা জিনিস দেখাব, খোলা মনে মতামত দেবে।”
“কিন্তু আমি ওখানে ঢুকব কীভাবে? আমার সঙ্গে তো বিশপের বন্ধুত্ব নেই।”
“আরে আমার সঙ্গে তো আছে। গেটে গিয়ে বলবে জ্যাকসনের সঙ্গে দেখা করব। আমি ওই নাম নিয়েছি। বিশপ – ওঁর নাম বার্কার – কানে শোনেন না, কিন্তু মানুষটি অমায়িক। তিনি যদি দেখেন তাঁর নতুন চাকর তার এক বন্ধুকে বাড়িটা দেখাচ্ছে, তিনি কিছু মনে করবেন না। পোশাক আশাক ওইরকমই প”রো – তুমি তো জানই - মানে বাজে বুট, ছেঁড়া টাই – এইরকম আরকি।”
তো সেই শনিবার আমি আমার সহকারীর হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে (এখানে একটা কথা বলে নেওয়া ভাল। আমার এই সহকারী রঙকানা এবং কোনও কিছুর গন্ধও পায় না। কিন্তু তাহলেও এখনও পর্যন্ত মাত্র একবারই করোনারের জুরি একে অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছিল। এতে আমি একইসঙ্গে আশ্চর্য এবং সন্তুষ্ট হয়েছি।) আমি পাটনি-র দিকে রওনা হলাম। আমার স্ত্রীকে না বলেই অবশ্য।
ব্রিটিশ গাম্বোজিয়ার একদা বিশপ, এখন অবসরপ্রাপ্ত রেভারেন্ড বার্কার বি. বার্কার-এর বাড়িটা বেশ প্রাচীন, লাল ইটের তৈরি। দারোয়ানের ঘরে গিয়ে দেখি শুধু “জ্যাকসন”-ই নয়, র্যাফিয়েল লিউইসও হাজির আছেন। বিরক্ত লাগল। হোকস তার চরিত্রমাফিক নিজেকে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে দেখলাম, কিন্তু র্যাফিয়েল – তাঁর জমকালো শনিবারের পোশাক পরা সত্ত্বেও তাঁকে পাক্কা চোরের মতো লাগছে। সারাক্ষণই তিনি বকরবকর করে যাচ্ছিলেন ‘সেই ব্যাটাকে বার করে মাটিতে পুঁতে ফেলা’-র ব্যাপারে।
যা বুঝলাম, সেদিন অন্যান্য চাকরবাকরদের ছুটি, কাজেই আমাদের সুবিধেই হয়ে গেল। আমরা পেছনের দিকে গেলাম। র্যাফিয়েল দেখে স্বস্তি পেলেন যে রান্নাঘরের দরজায় কোনও কুকুর বাঁধা নেই।
“এই ব্যাপারটা খুব বাজে,” বললেন র্যাফিয়েল, “পেছনের দরজায় কুকুর বসিয়ে রাখা। কত ভালমানুষ কাজের লোকের যে প্যান্টুল ছিঁড়ে নেয় ওরা!”
আমরা যখন পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, তখন দেখলাম র্যাফিয়েল পা টিপে টিপে উঠছেন আর কথা বলছেন কর্কশ অথচ ফিসফিসে গলায়। আমাদের সবাইকে ডাকছিলেন দোস্ত বলে, আর বলছিলেন যতটা সম্ভব শব্দ কম করতে, না হলে ওই বুড়ো শুনে ফেলবে।
ল্যান্ডিং-এ একটা ছোট্ট ঘড়ি দেখে র্যাফিয়েল দেখলাম খুবই উচ্ছাস প্রকাশ করলেন। “আমি একজনকে জানি, যাকে এই ঘড়িটা দিলে এক্ষুনি আমাকে পঁচিশ শিলিং দিয়ে দেবে, কোনও প্রশ্নই করবে না।”
যে ঘরে আমরা ঢুকলাম, সেটা বলতে গেলে একটা লাইব্রেরি-কাম-মিউজিয়াম। মেঝেটা ওক কাঠের, বাদামি আর চকচকে। ঘরে অনেক কাচ ঢাকা লম্বা লম্বা ডেস্ক, তাতে নানারকম কীটপতঙ্গের নমুনা সুন্দর করে পিন দিয়ে আটকানো আর টিকিট সাঁটা।
“মহামান্য বিশপ এসবের একজন উৎসাহী সংগ্রাহক,” বলল হোকস, “এখানে যা সব নমুনা দেখছেন, সবই ব্রিটিশ গাম্বোজিয়ার।”
“এ তো দেখছি যত রাজ্যের পোকামাকড় আর মাছি,” র্যাফিয়েল বললেন তাচ্ছিল্যের সুরে। “এসবের জন্য কেউ একটা পয়সাও দেবে না। যত্তসব!”
হোকস আঙুল দিয়ে একটা বিশেষ ছোট বাক্স দেখাল।
“সবচেয়ে ভালগুলো এখানেই রাখা আছে।”
দেখলাম সেখানে চারটে লাইনে রাখা আছে চারটে পোকা, পিন দিয়ে আটকানো। পাঁচ নম্বর পিনটা রয়েছে বটে, কিন্তু সেই জায়গাটা ফাঁকা।
“আরে, এ যে হলুদ রঙের আরশোলা!” চেঁচিয়ে উঠলেন র্যাফিয়েল কর্কশ কন্ঠে। “ওরে আমার ল্যাজারাস রে, তুই মরার সময় এগুলোর কথাই বলেছিলি! ওই বিশপ বুড়োকে এর জন্য মূল্য দিতে হবে!”
“লিউইস,” বলল হোকস দৃঢ় গলায়, “তুমি একটা মূর্খ। তুমি কী করে ভাবলে যে বিশপই এর জন্য দায়ী? তুমি কি ভেবেছ বিশপ এই মরা আর শুকনো আরশোলাগুলোর একটাকে তোমার ভাইয়ের গায়ে ছেড়ে দিয়েছে কামড়ানোর জন্য? এদিকে তাকাও। এই দেখ, এই ঢাকনাটা জোর করে খোলা হয়েছে। ওই যে কাঠের গায়ে তিনটে হালকা দাগ দেখতে পাচ্ছ, ওগুলো তোমার ভাইয়ের টিনের বাঁশির দাগ – সে এটাকে চাড় দিয়েছিল ওই বাঁশিটাকে লিভারের মতো ব্যবহার করে। তারপর এই ফাঁকটা দিয়ে সে তার সুতো আর মুচির-মোমটা ঢোকায় এবং একটা আরশোলা তুলে নেয়। সে এটা মুখে পুরে দিয়েছিল, পাছে কেউ দেখে ফেলে, তারপর ভুল করে গিলে ফেলে। তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। এই পোকাগুলো বিষাক্ত। একে তো ও প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছিল, তার ওপর বিষ এবং মদের ঘোর – শরীরটার তো মদ খেয়ে খেয়ে আর কিছু ছিল না – সব মিলিয়েই সে মারা গেছে।”
“কিন্তু একটা মরা পোকা সে চুরি করতে যাবে কেন?” আমি জানতে চাইলাম।
“ভাল প্রশ্ন করেছ। এর কারণ হল, অন্য চারখানা পোকাই সোনার তৈরি এবং গাম্বোজিয়ার বিখ্যাত হলদে পোকার প্রতিরূপ – একটা প্রাচীন মন্দির খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া যায়। ল্যাজারাস ভুল করে আসল পোকাটা তুলে ফেলেছিল। এই হল ব্যাপার।”
“আসল পোকার সোনার তৈরি নকল!” বাক্সের ওপর ঝুঁকে পড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন র্যাফিয়েল। “আমি বরাবরই বলে আসছি ল্যাজারাসটা একটা গাধা! পুরোটাই তুলে নিল না কেন?”
“আজেবাজে মন্তব্য করা বন্ধ করুন, মিঃ লিউইস,” ঠান্ডা গলায় বলল হোকস। “আপনার যা জানার জেনে গেছেন। এবার দয়া করে বাইরে চলুন।”
লিউইসকে ঘর থেকে বার করতে আমাদের একটু বেগ পেতে হয়েছিল। একখানা হাতির দাঁতের ছুরি নেওয়ার খুবই ইচ্ছে ছিল তার, আমি এমন একটা ভান করলাম যেন ওটা পকেটে পুরে ফেলেছি, আর হোকস তাকে একটা স্ফটিকের তৈরি কাগজচাপার লোভ দেখায়। তিনি আমাদের এই ব্যবহারে খুবই বিরক্ত হলেন।
“এগুলো নিলে কিই বা হবে? ও একটা খ্রিস্টান ছাড়া কিছুই না,” মন্তব্য করলেন তিনি, যেন বিশপের মালপত্র লুঠতরাজ করাটা কোনও অপরাধই না। কিন্তু আমরা এতে মোটেই পাত্তা দিলাম না। সিঁড়িতে আমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মহামান্য বিশপের। রোগাপাতলা চেহারার একজন বৃদ্ধ মানুষ। মাথার চুল সাদা, মুখ দেখলেই মনে হয় খুবই সহানুভূতিশীল। তিনি আমাদের দেখে প্রথমে একটু চমকে গেলেও পরে হোকস যখন তাঁকে বলল আমাদের আসার কারণটা, তিনি আশ্বস্ত হলেন।
“হ্যাঁ হ্যাঁ,” কানের পেছনে হাতের তালুটা বেঁকিয়ে ধরে বললেন তিনি, “ওদের সবকিছু দেখাও, বাগানে নিয়ে যাও, আর যদি ওঁরা ইচ্ছে করেন, তাহলে একটু জিঞ্জার-বিয়ারও পান করিয়ো।” র্যাফিয়েল তো তখনই পারলে সেলারে যান আরকি। আমরা অতিকষ্টে সামলালাম, বললাম যে এবার বাড়ি থেকে বেরোতে হবে। হুমদো মুখে সাইমনও পেছনের সিঁড়ির কাছটায় দাঁড়িয়ে পাইপ টানছিল, আমাদের দেখে হাত নাড়ল।
“আমি এইমাত্র চারদিকটা দেখে এলাম, র্যাফিয়েল। বাড়িটা খারাপ না, তবে আমি বলব এখানে চুরি হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। ওই জানলাটা দেখ। যে কোনও লোক একাই হাতে একটা ছেনি থাকলেই ওখান দিয়ে ঢুকে ভেতরটা সাফা করে দিতে পারবে।”
এই হল শনিবারের ঘটনা। সোমবার সকালে হোকস আমার দোকানে এল। অবস্থা দেখলাম খুব খারাপ।
“কেটে পড়েছে।”
“কেটে পড়েছে? কে?”
“বিশপ! রোববার বিকেল থেকে আর দেখছি না। সব জায়গায় খুঁজেছি, কোনও পাত্তা নেই। আমার সব গেল!”
“কি সর্বনাশ! তোমার মক্কেল ওই র্যাফিয়েলই এটা করল নাকি?”
“মনে হচ্ছে তাই। আমি তো ওকে গিয়ে ধরেওছিলাম, কিন্তু ও এমন ভান করছে যেন কিছুই জানে না। বেড়ালতপস্বী! কিন্তু আমি – আমি এখন কী করব?”
“এখনই পুলিশকে জানাও।”
“ওদের জানাব? ওরা আমাকে কী পরিমাণ ঈর্ষা করে তুমি জান না? তারপর আবার যা তা কান্ড হবে যাবে!”
“ওসব সহ্য করতে হবে। আমার ভয় হচ্ছে আবার না তোমাকে মিলব্যাংকে যেতে হয়।”
“ওরকম বলবে না বলে দিলাম!” রুক্ষ গলায় বলল হোকস।
“কিন্তু এটা তো একটা বিরাট চক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে!”
হোকস দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। আমি খানিকটা ইথার দিয়ে ওকে চাঙ্গা করে তুললাম।
সেই সারা সপ্তাহ জুড়ে খবরের কাগজগুলো প্রাক্তন বিশপের এই রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে নানারকম গালগপ্পো লিখে গেল। বৃহস্পতিবার হোকস আমাকে ডেকে পাঠাল তার বুচার অ্যাভিনিউর বাসায়। খুব নাকি জরুরি দরকার আছে।
“আমার সঙ্গে পাটনি চল,” বলল সে, “সেই হতভাগার সঙ্গে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক।”
আবার আমরা গেলাম “ইহুদির বীণা”-য়। র্যাফিয়েলকে দেখলাম বেশ অমায়িক মেজাজে।
“মিঃ হোকসকে একটু বোঝান তো,” সে বলল আমাকে। “ওঁর ধারণা আমি বিশপকে লুকিয়ে রেখেছি। ওকে নিয়ে আমি কী করব? আমার বন্ধুরা যদি শোনে আমি খ্রিস্টান বিশপের মতো একটা নোংরা জিনিসকে আমার এলাকায় রেখেছি, তাহলে আমার কি হবে জানেন?”
“তুমিই ওঁকে লুকিয়ে রেখেছ, আমি জানি,” ভীষণ গলায় বলল হোকস। “তুমি ওঁকে ধরে নিয়ে এসেছো, যদি মুক্তিপণ বা ওই ধরণের কোনও পুরস্কার পাওয়া যায়, এই আশায়,” র্যাফিয়েল কাঁধ ঝাঁকাল।
“তাহলে তো ভালই হল। পুরস্কার ঘোষণা করলেই তো ওকে যারা ধরে রেখেছে, তারা চটপট ফেরত দিয়ে দেবে। তাহলে আর পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে লাভ কি? মোটা পুরস্কারের বিজ্ঞাপন দিতে
বলুন। আমিও না হয় তাহলে খোঁজা শুরু করব।”
জমিদার যখন কথাবার্তা চালাচ্ছিল, আমি জানলার ধারে গিয়ে বাইরের আস্তাবল আর নোংরা ঘাসজমিগুলো দেখছিলাম। আস্তাবলের একদম শেষ মাথায়, যেখানে দেওয়াল রয়েছে, সেখানকার এক জায়গার মাটিটা দেখে মনে হল যেন সেটা সদ্য খুঁড়ে আবার বোজানো হয়েছে। সূর্যের আলো সেখানটায় পড়ে চকচক করছে, এবং ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে বোঝা যাচ্ছিল সেটা একটা সোনালি চশমা, মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। যা ভেবেছিলাম, তাই।
“হোকস, তুমি এখানেই খানিকক্ষণ থাকো,” আমি বললাম, “আমি পুলিশের কাছে যাচ্ছি।”
তাইই করলাম আমি। পরে যখন সে জায়গায় খোঁজাখুঁজি চলছে, তখনও দেখলাম র্যাফিয়েলের কোনও হেলদোল নেই। “সব জায়গায় খুঁজে দেখতে পার, কিছুই পাবে না।” তার গলায় যেন মাখন ঝরে পড়ছে। যদিও সেই মাখন গলে গেল, যখন বিশপকে একটা বহু প্রাচীন সেলার থেকে বার করা হল, যার হাওয়া চলাচলের ঝাঁঝরিটা মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। পুলিশ ধরে নিয়ে গেল র্যাফিয়েলকে, বিচারে তিন বছরের জেলও হল।
হোকস অবশ্য বলেছিল যে সে নিরপরাধ। আদালত তাকে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়। পরে আমি হোকসকে পরিষ্কার বললাম যে সে আগেও বহুবার এরকম গন্ডগোল পাকিয়ে বিপদ ডেকে এনেছে, ভবিষ্যতে যেন আর না পাকায় – দরকার হলে সে এই পেশা ছেড়ে দিক। “দরকার হলে জামাকাপড়ের ব্যাবসা কর, না হলে মুদি দোকান দাও, সিগারেট বেচো, কিন্তু এটা আর নয়। ভাল করে ভেবে দেখ, হোকস।”
উত্তরে সে আমার হাতটা মুচড়ে দিল খুব আন্তরিকভাবে।
“তোমার মতো বন্ধু আর হয় না, চেসমোর। কিন্তু আমি এখনই এটা ছাড়ব না। এতে যে উত্তেজনা আছে, তা অন্য কোথাও নেই। তাছাড়া আমার একটা মানসম্মান আছে। কাজেই আমার পক্ষে চট করে সাধারণ পুলিশের সঙ্গে যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা চলছে, সেটা ছাড়া সম্ভব নয়। আমি তো ওই জন্যই অত কায়দা করে নিজেকে একজন হেরে যাওয়া আর অতি সাধারণ প্রতিপক্ষ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছি।”
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন