অমিত দেবনাথ
যে কোনও বড় শহরে যে কোনও লোক হঠাৎই হারিয়ে যেতে পারে মোমবাতির এক ফুঁয়ে নিভে যাওয়ার মতই, কোনও চিহ্ন না রেখে। তখনই যেখানে যত এজেন্সি আছে, সব তদন্তে নেমে পড়ে – নেমে পড়ে প্রশিক্ষিত কুকুর, পেশাদার গোয়েন্দার দল, শখের গোয়েন্দারাও কম যায় না। কিন্তু তাতে যে বিশেষ ফল হয় তা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষগুলোর টিকিটি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো খুঁজে পাওয়া যায় উলটোপালটা সব জায়গায় – শেবয়গান-এ, বা টের হট-এর জঙ্গলে – নিজের পরিচয় দেয় “স্মিথ” বা ওই ধরনের কোনও নাম বলে, আর একটা বিশেষ সময় পর্যন্ত কোনও কিছুই তার মনে থাকে না, এমনকী মুদির দোকানের বিল পর্যন্ত। আবার কখনো কখনো দেখা যায় সে পাশের বাড়িতে গেছে, যদিও এর মধ্যেই তার খোঁজে নদীতে ফেলা হয়েছে জাল, বড় বড় রেস্তোরাঁগুলোতে ঢুঁ মারা হয়েছে - যদি সে ভাল মন্দ খাবারের খোঁজে সেখানে গিয়ে থাকে, এই আশায়। ব্ল্যাকবোর্ড থেকে চকের দাগ মুছে ফেলার মতোই মানুষজনের এরকম নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও যে কোনও নাট্যশিল্পের একটা জবরদস্ত বিষয়। কাজেই, মেরি স্নাইডারের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনাও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না।
মিকস নামের একটা মাঝবয়সি লোক পশ্চিম থেকে নিউ ইয়র্কে এসেছিল মিসেস মেরি স্নাইডার নামে বিধবা বোনের কাছে। এখানকারই কোনও ঘিঞ্জি এলাকায় থাকেন ভদ্রমহিলা। নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ করতেই তাকে বলা হল মেরি স্নাইডার মাস খানেক আগে এখান থেকে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন? না, সেটা তাদের জানা নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে মিঃ মিকস ধরলেন এক পুলিশকে। রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়েছিল পুলিশটা।
“আমার দিদি খুবই গরিব,” বললেন মিঃ মিকস, “ওকে খুঁজে পাওয়া খুবই দরকার। সিসের খনিতে দুটো পয়সা লাভ হয়েছে, বুঝলেন স্যার, তাই ভাবছিলাম সেখান থেকে ওকে কিছু দেব। কিন্তু খুঁজে না পেলে তো -। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েও লাভ নেই, ও পড়তে পারে না।”
পুলিশটা তার গোঁফ জোড়া মুচড়ে গভীর চিন্তা শুরু করল। তার হাবভাব দেখে মিঃ মিকসের আর কোনও সন্দেহই রইল না যে তিনি দিদিকে ফেরত পাবেন। এমনকী দিদির চোখের জল তাঁর ঝাঁ চকচকে নীল রঙা টাইয়ে যে ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়ছে, তাও যেন তিনি অনুভব করতে পারলেন।
“আপনি এক কাজ করুন,” শেষে বলল পুলিশটা, “এখান দিয়ে হেঁটে ক্যানাল স্ট্রিটে চলে যান। ওখানে একটা ঠেলাগাড়ির গ্যারাজ আছে। একটা ঠেলাগাড়ি চালানোর কাজ জুটিয়ে নিন। বড়ো ঠেলাগাড়ি নেবেন। দেখবেন বয়স্ক মহিলা আর বুড়িরা ঠেলাগাড়িতে ধাক্কা খাবেই খাবে। আর কি! আপনার কাজ শেষ। দিদিকে পেয়ে যাবেন। তবে যদি এটা আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে হেডকোয়ার্টারে গিয়ে কথা বলুন। ওরা নিশ্চয়ই আপনার দিদিকে খোঁজার জন্য লোক দিয়ে দেবে।”
পুলিশের সদর দপ্তরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য মিকস সাহায্য পেলেন। সব জায়গায় সতর্কবার্তা পাঠানো হল এবং মিকসের কাছে তার দিদির যে ছবিটা ছিল, তাও সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হল। মালবেরি স্ট্রিট-এর বড়ো কর্তা গোয়েন্দা মালিনসকে এই কাজের দায়িত্ব দিলেন।
গোয়েন্দাপ্রবর মিকসকে একবার এপাশ থেকে, আর একবার ওপাশ থেকে দেখল।
“এ সব কেস আমার কাছে বাঁ হাতের খেলা। গোঁফটা কামিয়ে, পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে বেলা তিনটের সময় ওয়ালডর্ফ-এর কফি-খানায় আমার সঙ্গে দেখা করবেন।”
সেই মতো মিকস দেখা করলেন মালিনসের সঙ্গে। এক বোতল ওয়াইন ফাঁক করার ফাঁকফোঁকরে গোয়েন্দা মিকসকে জিজ্ঞেস করতে লাগল তাঁর হারানো দিদির ব্যাপারে।
তারপর বলল মালিনস, “দেখুন, নিউ ইয়র্ক একটা বিশাল বড়ো শহর, কিন্তু আমরা, গোয়েন্দারা একটা সিস্টেমে চলি বলে আমাদের অসুবিধে হয় না। আপনার দিদির ক্ষেত্রেও দুটো পদ্ধতি আছে। একটা একটা করে এগোই। আপনার দিদির বয়স বাহান্ন বললেন, তাই না?”
“সামান্য বেশি,” বললেন মিকস।
গোয়েন্দা মিকসকে নিয়ে একটা বহুল প্রচারিত খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন বিভাগে গেল। সেখানে বসেই একখানা বিজ্ঞাপনের খসড়া লিখে মিকসের হাতে দিল। সেখানে লেখা আছেঃ
“এক্ষুনি চাই – একটি নতুন মিউজিকাল কমেডির জন্য একশো জন কোরাস গার্ল জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। যোগাযোগ করুন – আজ সারাদিন … নং ব্রডওয়ে।”
মিকস বোকার মত তাকালেন। “আমার দিদি খুব পরিশ্রমী, গরিব আর বয়স্ক মহিলা। এই বিজ্ঞাপন দিয়ে তাকে কী করে খুঁজে পাওয়া যাবে বুঝতে পারছি না।”
“বুঝলাম যে আপনি নিউ ইয়র্কের কিছুই জানেন না,” বলল গোয়েন্দা। “ঠিক আছে, এতে আপনার আপত্তি থাকলে অন্য পদ্ধতি। এবার পাওয়া যাবেই, তবে আপনার একটু খরচ হবে।”
“খরচা নিয়ে ভাববেন না,” বললেন মিকস, “কাজটা হোক।”
তারা আবার ফিরে গেল ওয়ালডর্ফে। গোয়েন্দা বলল, “বেশ কয়েকটা বেডরুম ভাড়া নিন, আর একটা পার্লার। তারপর আমরা ওপরে যাব।”
সেই মতো ঘর ভাড়া নিতেই তাদের দুজনকে চারতলার এক দুর্দান্ত স্যুইটে নিয়ে যাওয়া হল। মিকসকে হতভম্ভ দেখাচ্ছিল। গোয়েন্দা একখানা ভেলভেটের আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে চুরুটের বাক্সটা বার করল।
“একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছিলাম,” বলল সে, “ঘরগুলো সারা মাসের জন্য ভাড়া করলেই ভাল করতেন। কত আর খরচা হত?”
“সারা মাস?” চেঁচিয়ে উঠলেন মিকস, “মানে?”
“এই পদ্ধতিতে সময় একটু বেশি লাগে। আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম খরচা বেশি পড়বে। আমাদের এখানে অপেক্ষা করতে হবে। বসন্ত এলে একটা নতুন সিটি ডিরেক্টরি বেরোয়। তাতে নিশ্চয়ই আপনার দিদির নাম ঠিকানা থাকবে।”
তক্ষুনি মিকস কেটে পড়েলেন সেখান থেকে, পুলিশের গোয়েন্দার হাত ছাড়িয়ে। পরদিন তাঁকে কেউ একজন বলল নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ শামরক জোনসের সঙ্গে দেখা করতে, যার দক্ষিণা সাংঘাতিক চড়া, কিন্তু যে কোনও রহস্যের সমাধানে ভেলকিবাজি দেখাতে তিনি ওস্তাদ।
সেই বিখ্যাত গোয়েন্দার অ্যাপার্টমেন্টের লাগোয়া ঘরে পাক্কা দুটি ঘন্টা অপেক্ষা করার পর ডাক পড়ল মিকসের। ভেতরে গেলেন তিনি। জোনস বসেছিলেন একটা হাতির দাঁতের তৈরি দাবার টেবিলের সামনে, পরনে বেগুনি রঙের ড্রেসিং গাউন, সামনে খোলা একটা ম্যাগাজিন, চেষ্টা করছিলেন “তাদের” রহস্য সমাধান করার। এই বিখ্যাত গোয়েন্দার সরু বুদ্ধিদৃপ্ত মুখ, তীক্ষ্ণ চোখ আর কথা পিছু পারিশ্রমিকের বিবরণ দেওয়া নিষ্প্রয়োজন, সবাই এ ব্যাপারে সব কিছুই জানে।
মিকস জোনসের কাছে সমস্যাটা বলে ফেললেন। “সফল হলে আমার পারিশ্রমিক পাঁচশো ডলার,” বললেন শামরক জোনস। মাথা নাড়লেন মিকস। তিনি রাজি।
“আপনার কেসটা আমি নিলাম, মিঃ মিকস,” বললেন জোনস, “এ শহর থেকে লোক হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বরাবরই আমাকে ভাবায়। বছরখানেক আগের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একবার ক্লার্ক নামের একটা পরিবার তাদের ফ্ল্যাট থেকে হারিয়ে যায়। আমি দু মাস ধরে ওই ফ্ল্যাটের ওপর নজর রেখেছিলাম সূত্রের খোঁজে। হঠাৎই করেই একদিন আমার মনে হল যে, এখানে একটা দুধওয়ালা আর একটা মুদি দোকানের ছেলে যখনই মাল নিয়ে আসে, তারা উলটোবাগে হাঁটে। এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে গেল সমাধানটা। ওই ফ্যামিলিটা হলঘরের পাশের ফ্ল্যাটে চলে গেছে, আর নামটা পালটে করেছে ক্রালক। আগে ইংরেজি বানানটা ছিল CLARK, এখন হয়েছে KRALC। নামটা উলটে নিয়েছে আর কি।”
মিকসকে নিয়ে শামরক জোনস চললেন সেই ভাড়া বাড়িতে, যেখানে মেরি স্নাইডার থাকতেন। ডিটেকটিভ ঘরটা দেখতে চাইল। ঘরটা মেরি চলে যাওয়ার পর থেকে ফাঁকাই পড়ে আছে।
ঘরটা ছোট আর নোংরা, আসবাবপত্রও তথৈবচ। মিকস ম্লান মুখে বসে রইলেন একটা ভাঙা চেয়ারে, জোনস ঘরের দেয়াল, মেঝে আর পুরোন আসবাবপত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন, যদি কিছু ক্লু পাওয়া যায়।
আধ ঘন্টা বাদে জোনসের কাছে দেখা গেল কিছু তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিস – একটা সস্তা কালো টুপির পিন, একটা থিয়েটারের প্রোগ্রামের ছেঁড়া টুকরো আর একটা কার্ডের ছোট্ট ছেঁড়া অংশ, যার শুধু “left” আর “C 12” – এটুকুই পড়া যাচ্ছে।
শামরক জোনস ম্যান্টেলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মিনিট দশেক ধরে, হাতের ওপর মাথা রেখে। মুখ দেখেই মনে হচ্ছে গভীরভাবে কিছু একটা চিন্তা করছেন। তারপর মুখ তুলে বললেন উৎফুল্ল কন্ঠে, “চলুন, মিঃ মিকস, সমাধান হয়ে গেছে। আপনার বোন যেখানে আছে, সরাসরি সেখানেই নিয়ে যাচ্ছি। আর তাঁকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই – তাঁর কাছে এখন যথেষ্ট টাকা পয়সা আছে।”
মিকস আনন্দিত আর অবাক হয়েছেন সমান মাত্রায়। “কী করে ধরলেন ব্যাপারটা?” তাঁর গলায় গদগদ ভাব। শ্রোতাদের চমক দেখাতে পারলে জোনস আর কিছু চান না। এ জন্য তিনি সর্বদাই প্রস্তুত এবং এটাই বোধহয় জোনসের একমাত্র দুর্বলতা।
“সম্ভাবনাগুলোকে একে একে বাদ দিয়ে,” বললেন জোনস, “মিসেস স্নাইডার শহরের যে সব জায়গায় যেতে পারেন, সেগুলোর কিছু কিছু বাদ দিলাম। এই টুপির পিনটা দেখেছেন? এটাতে বাদ গেল ব্রুকলিন। হ্যাট পিন ছাড়া কোনও মহিলাই ব্রুকলিন ব্রিজ থেকে বাসে উঠে লড়াই করে সিটের দিকে যেতে পারবে না। আবার উনি যে হারলেমেও যাননি, তার প্রমাণ দেখুন। এই দরজার পেছনের দেয়ালে দুটো হুক আছে। এর একটায় মিসেস স্নাইডার তাঁর মাথার ঢাকনা বা বনেটটা ঝুলিয়ে রাখতেন, আরেকটায় তাঁর শাল। খেয়াল করলে দেখবেন, শাল ঝুলিয়ে রাখলে দেয়ালের নিচের দিকের প্লাস্টারে ধীরে ধীরে একটা দাগ ধরে যায়। এখানে দেয়ালে কোনও দাগ নেই, তার মানে শালে কোনও ঝালর নেই। আপনি এ রকম একটি ঘটনাও পাবেন না, যেখানে কোনও মাঝবয়সী মহিলা হারলেমের ট্রেন ধরেছে, অথচ তার শালের ঝালর গেটে আটকে পেছনের লোকজনদের দেরি করিয়ে দেয়নি। কাজেই হারলেম বাদ।
“কাজেই বুঝতে পারলাম মিসেস স্নাইডার খুব দূরে যাননি। এই ছেঁড়া কার্ডটা দেখুন। এখানে লেখা আছে left, C আর 12। আমি জানি যে ১২ নং সি অ্যাভিনিউ একটা ফার্স্ট ক্লাস বোর্ডিং হাউজ, আপনার বোনের যা অবস্থা বলেছেন, তাতে তো ওখানে থাকা সম্ভব না। কিন্তু তারপরেই আমার হাতে আসে দোমড়ানো থিয়েটারের প্রোগ্রামটা। এর থেকে আপনি হয়ত কিছুই বুঝবেন না, কিন্তু আমরা, যারা সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম জিনিস নিয়ে কাজ করি, তাদের কাছে এর অনেক দাম।
“আপনি বলেছেন আপনার বোন ধোয়ামোছার কাজ করেন। উনি নিশ্চয়ই অফিস আর হলঘরের মেঝে মোছামুছির কাজ করেন। ধরা যাক উনি কোনও থিয়েটারে এই কাজ পেয়েছেন। কোন জায়গায় খুব ঘন ঘন গয়নাগাটি হারায়, মিঃ মিকস? থিয়েটারে, বুঝতেই পারছেন। মিঃ মিকস, এই প্রোগ্রামটা ভাল করে দেখুন। দেখুন, এর মধ্যে একটা গোল ছাপ পড়েছে। এটা দিয়ে কোনও বালা – সম্ভবত দামি বালা মুড়িয়ে আনা হয়েছিল। মিসেস স্নাইডার থিয়েটারের মেঝে মুছতে গিয়ে এটা পান। তিনি চট করে একটা প্রোগ্রাম ছিঁড়ে বালাটা মুড়িয়ে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। পরদিন তিনি এটা বিক্রি করেন এবং যে টাকা পান, তাই দিয়ে ভাল কোনও জায়গায় উঠে যান। কাজেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে আমি দেখতে পাচ্ছি ১২ নং সি অ্যাভিনিউতে উঠে যাওয়াটা তাঁর কাছে কোনও ব্যাপারই না। আমরা আপনার বোনকে ওখানেই পাব, মিঃ মিকস।”
মুখে একটা হাসি দিয়ে বক্তব্য শেষ করলেন শামরক জোনস, একজন সফল আর্টিস্টের মতোই। মিকস কী বলে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানবেন বুঝতে পারলেন না। তারপর তাঁরা চললেন ১২ নং অ্যাভিনিউ সি-এর দিকে। পুরোন ধাঁচের বাড়ি, ব্রাউনস্টোনে তৈরি, জায়গাটাও বেশ অভিজাত।
ঘন্টি বাজিয়ে খোঁজখবর করে জানা গেল সেখানে মিসেস স্নাইডার বলে কেউ নেই, আর গত ছয় মাসের মধ্যেও এখানে কোনও নতুন ভাড়াটে আসেনি। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর মিঃ মিকস বোনের পুরোন ঘর দেখে তাঁর কী মনে হয়েছিল, সেটা ব্যক্ত করে ফেললেন।
“আমি গোয়েন্দা নই,” থিয়েটারের প্রোগ্রামটা জোনসের মুখের সামনে তুলে ধরে বললেন মিঃ মিকস, “তবে এই কাগজটা দেখে আমার মনে হয়েছে কোনও বালা নয়, বরং এতে করে এক রকমের গোল পেপারমিন্ট ড্রপ মুড়ে আনা হয়েছিল। আর এই ঠিকানা লেখা কার্ডটা দেখে আমার মনে হয়েছে এটা সিট নম্বর লেখা কুপন – বাঁ দিকের সি রো-এর ১২ নং সিট।”
শামরক জোনস দূর উদাস চোখে কী যেন ভাবছিলেন।
“আপনি একবার জাগিন্সের সঙ্গে কথা বলুন,” বললেন জোনস।
“জাগিন্স কে?” মিকসের জিজ্ঞাসা।
“আধুনিক ডিটেকটিভ স্কুলের হেড,” বললেন জোনস। “ওদের পদ্ধতি আমাদের থেকে আলাদা, তবে শুনেছি জাগিন্স কয়েকটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া কেসের সমাধান করেছে। চলুন, আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।”
জাগিন্স জোনসের থেকেও বড়ো গোয়েন্দা। তাঁকে অফিসেই পাওয়া গেল। মানুষটি ছোটোখাটো, মাথার চুল পাতলা, এক মনে নাথানিয়েল হথর্ন-এর বুর্জোয়া লেখা পড়ছেন।
দেখা হতেই দুই ঘরানার দুই গোয়েন্দা হাত মেলালেন হাসি মুখে। দেওয়া হল মিকসের পরিচয়।
“কী হয়েছে বলুন,” বই পড়তে পড়তেই বললেন জাগিন্স।
মিকসের বলা শেষ হতে বই বন্ধ করলেন গোয়েন্দা জাগিন্স।
“আপনার বোনের বয়স বাহান্ন, নাকে একটা বড় তিল আছে, খুব গরিব, বিধবা, ঘরদোর মুছে খুব কষ্ট করে থাকেন আর দেখতে শুনতে ঘর গেরস্থালি ধরনের। ঠিক আছে?”
“একদম ঠিক,” মাথা নাড়লেন মিকস। জাগিন্স উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় টুপি পড়লেন। বললেন, “পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি তাঁর ঠিকানা জেনে ফিরছি।”
শামরক জোনসের মুখ শুকিয়ে গেলেও জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখলেন। পনেরো মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলেন জাগিন্স, হাতে একটা কাগজের স্লিপ।
“আপনার বোন মেরি স্নাইডারকে ১৬২ নং চিলটন স্ট্রিটে পাওয়া যাবে,” স্মিত মুখে বললেন জাগিন্স। “পাঁচতলার পেছনের হলের বেডরুমে আছেন তিনি। বাড়িটা এখান থেকে চারটে ব্লক দূরে। আপনি বরং গিয়ে দেখে আসুন। মিঃ জোনস আপনার জন্য অপেক্ষা করবেন বলেই আমার মনে হয়।”
প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন মিকস, মিনিট কুড়ি বাদে যখন ফিরলেন, তখন মুখে হাসি ঝলমল করছে।
“আছে, আছে, ওখানেই আছে! ভাল আছে!” মিকস আনন্দের চোটে প্রায় চেঁচিয়েই উঠেছেন। “আপনার ফি-টা বলুন।”
“দু ডলার,” বললেন জাগিন্স।
মিকস বিল মিটিয়ে চলে যাওয়ার পর শামরক জোনস জাগিন্সের সামনে টুপি খুলে দাঁড়ালেন।
“যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে যদি –,” কথা আটকে যাচ্ছিল জোনসের, “মানে যদি বলেন – কীভাবে –”
“নিশ্চয়ই,” বললেন জাগিন্স প্রশান্ত মুখে, “আপনার নিশ্চয়ই মিসেস স্নাইডারকে কেমন দেখতে খেয়াল আছে? এরকম কোনও মহিলাকে কি আপনি চেনেন যে নিজের ক্রেয়ন পোর্ট্রেট আঁকানোর বদলে প্রতি সপ্তাহে পয়সা পায়? এই পোর্ট্রেট আঁকানোর সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরিটা ওই কর্নারে। আমি ওখানে গিয়েই ওদের বই থেকে ওঁর ঠিকানাটা পেয়ে গেলাম।”
মালবেরি স্ট্রিটঃ ৩০০ মালবেরি স্ট্রিট (Mulberry Street)-এ ১৮৬৩ সাল থেকে নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশের সদর দপ্তর ছিল। ১৯০৯ সালে এটি সরিয়ে ২৪০ সেন্টার স্ট্রিটে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এটাই ছিল নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশের সদর দপ্তর।
------------
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন