আশ্চর্য এক বাজনদার

জেকব গ্রিম, ভিলহেল্‌ম্‌ গ্রিম

এক ছিল আশ্চর্য বাজনদার। সে যখন তার বেহালা তুলে নিয়ে বাজাতো, যে-ই শুনুক সে-ই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতো। বাজনদার একদিন একা বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আর নানা বিষয় ভাবছে। ভাবতে ভাবতে তার ভাবনা প্রায় ফুরিয়ে গেল। তখন সে বললে— এই বনের মধ্যে একা চলেছি, সময় আর কাটে না। দাঁড়াও একটি ভালো সঙ্গীকে ডেকে আনি। বলে তার বেহালা কাঁধে নিয়ে বাজাতে শুরু করে দিল। বেহালার সুর গাছে গাছে ধ্বনিত হয়ে এগিয়ে চললো। একটু পরেই বন জঙ্গল ভেদ করে বেরিয়ে এল এক নেকড়ে বাঘ।

বাজনদার বলল— এ যে দেখছি নেকড়ে বাঘ, একে নিয়ে কি করব!

কিন্তু নেকড়ে এগিয়ে এসে বললে— দেখুন বেহালা-বাজিয়ে, আপনি বড় সুন্দর বাজান। আমাকে শিখিয়ে দেবেন?

বাজনদার বলল— এ আর শক্ত কি? আমি যা বলি কর।

নেকড়ে বললে— ছাত্র যেমন তার শিক্ষকের কথা শোনে আমিও তেমনি আপনার বাধ্য হব।

বাজনদার তখন তাকে নিয়ে কিছুদূরে গিয়ে দেখলে একটা বুড়ো ফাঁকা ওক গাছের গুঁড়ির গায়ে মস্ত একটা ফাটল। বাজনদার বললে— শোন, যদি বেহালা বাজানো শিখতে চাও তো সামনের পা দুটো এই ফাটলের মুখে রাখো।

নেকড়ে পা রাখতেই বাজিয়ে করলো কি, একটা পাথর তুলে নিয়ে নেকড়ের পায়ের উপর এমন বাড়ি মারল যে তার পা এঁটে গেল ফাটলের মধ্যে। নেকড়ে বন্দী হল।

বাজনদার বলল— যতক্ষণ না আমি ফিরি এখানেই থাকো। এই বলে চলে গেল।

কিছুদূর যাবার পরেই তার ফের একঘেয়ে লাগতে লাগল। সে ভাবল, সময় যে আর কাটে না। একজন সঙ্গী পেতে হবে। দেখি।

এই ভেবে সে তার বেহালা বার করে আবার বাজাতে আরম্ভ করলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল এক শেয়াল বনের মধ্যে বেরিয়ে তার দিকে আসছে। বাজনদার বলল— এ যে দেখছি শেয়াল। শেয়ালের সঙ্গে আমার কি বা দরকার?

শেয়াল তার কাছে এসে বলল— দাদা, আপনার বাজনার হাত বড় চমৎকার। আমাকে শেখাবেন?

বাজনদার বলল— এ আর শক্ত কি? আমি যা বলি শুধু তাই করো, তাহলেই শিখতে পারবে।

শেয়াল বললে— আপনি আমার গুরু। গুরু যা বলবেন ছাত্র তাই করবে।

বাজনদার তখন বললে— এসো আমার পিছনে পিছনে।

কিছুদূরে গিয়ে তারা এক রাস্তায় পৌঁছল। তার দু-ধারে গাছের ঘন ঝোপ। বাজিয়ে সেখানে এসে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গাছগুলোকে লক্ষ করতে লাগল। ডান দিকে ছিল একটা হেজেল বাদামের গাছ, তার একটা ডাল প্রায় মাটির কাছ পর্যন্ত নুয়ে পড়েছে। বাজনদার তার এক পা দিয়ে সেই ডালটা মাটিতে চেপে ধরল। তারপর অপর পাশ থেকে আর একটা গাছের ডাল নুইয়ে অন্য পায়ে চেপে ধরল।

—এসো তো শেয়াল ভায়া, এবার তোমার প্রথম শিক্ষা হোক। যদি শিখতে চাও, তোমার সামনের বাঁ পা এগিয়ে দাও।

বলতেই শেয়াল তার বাঁ পা এগিয়ে দিলে আর বাজনদার সেটা শক্ত করে বাঁদিকের ডালে বেঁধে ফেলল।

—এবার তোমার ডান পা এগিয়ে নিয়ে এস দেখি।

শেয়াল তার ডান পা এগিয়ে ধরতেই বাজিয়ে সেটা ডান দিকের ডালে বেঁধে ফেলল।

তারপর যখন সে দেখল দুটো পা-ই শক্ত করে বাঁধা হয়েছে সে ডাল দুটো ছেড়ে দিল। আর অমনি গাছের শাখা সোজা উঠে গেল আকাশে। দু-পা ফাঁক করে শেয়াল শূন্যে ঝুলতে লাগল।

বাজনদার বলল— আমি যতক্ষণ না ফিরি এইখানে অপেক্ষা কর। বলে নিজের পথ ধরল।

চলতে চলতে সময় আর কাটে না। বাজনদার বলল— বনের পথে সময় বড় ধীরে কাটছে। আর একজন সঙ্গী দেখা যাক। বলে বেহালা তুলে আবার সে বাজাতে শুরু করল। বনের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলল তার প্রতিধ্বনি।

একটি ছোট্ট খরগোস ছুটতে ছুটতে এসে হাজির।

বাজনদার বললে— এ যে দেখছি খরগোস। খরগোসে আমার কি হবে?

খরগোস বললে— বাজনদার দাদা, আপনি বড় সুন্দর বেহালা বাজান। আমায় শিখিয়ে দেবেন?

বাজনদার বললে— এ আর শক্ত কি? আমার কথা যদি শোন, চট্‌পট্‌ শিখে যাবে।

খরগোস বললে— ছাত্ররা যেমন গুরুর কথা শোনে আমিও তেমনি আপনাকে মান্য করব।

তারা কিছু দূর গিয়ে এক খোলা জায়গায় এক পাইন গাছ তলায় এসে পৌঁছল। বাজনদার খরগোসের গলায় একটি লম্বা দড়ি বেঁধে দড়ির অপর অংশ গাছের গুঁড়িতে বেঁধে দিল। তারপর বলল— এবার চট্‌পট্‌ গাছের চারিদিকে কুড়ি পাক ঘোরো তো।

খরগোস সঙ্গে সঙ্গে তার আদেশ পালন করতে লেগে গেল। কুড়ি পাক হতে না হতেই খরগোস গাছের গুঁড়ির গায়ে লেপটে গেল। বাজনদার তাকে সেখানে শক্ত করে বেঁধে বললে— যতক্ষণ না আমি ফিরি, এইখানে থাকো।

ইতিমধ্যে নেকড়ে তার পা টানা-হ্যাঁচড়া করে গুঁড়ি কামড়ে প্রাণপণে মুক্ত হবার চেষ্টা করে চলেছে। শেষে অনেক কষ্টে ছাল-চামড়া তুলে রক্তপাত করে সে ফাটল থেকে পা বার করে ফেলল। রাগে ফুলতে ফুলতে সে চললো বাজনদারের খোঁজে— তাকে পেলেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। শেয়াল তাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বলল— নেকড়ে ভায়া, আমাকে বাঁচাও। দেখ বাজনদার আমার কী দুর্দশা করে গেছে।

নেকড়ে গাছের ডাল টেনে নামিয়ে শেয়ালের পায়ের বাঁধন কেটে দিলে। তখন দুজনে চললো বাজনদারের উপর প্রতিশোধ তুলতে। কিছুদূরে গিয়ে পাওয়া গেল খরগোসকে। তখন খরগোসকেও মুক্ত করে তারা একত্রে চললো শত্রুর খোঁজে।

বাজনদার পথ চলতে চলতে আবার তার বেহালা বাজাতে আরম্ভ করেছে। এবারে তার ভাগ্য ভালো। বাজনার শব্দ গিয়ে পৌঁছল এক গরীব কাঠুরের কানে। সঙ্গে সঙ্গে সে তার কাঠ কাটা ফেলে কুড়ুল বগলে করে এগিয়ে এল বাজনদারের কাছে।

বাজনদার বললে— এতক্ষণে একজন উপযুক্ত সঙ্গী পাওয়া গেল। মানুষ— জন্তু নয়। বলে সে এমন সুন্দর করে তার বেহালা বাজাতে লাগল যে কাঠুরে সেখানে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজনা শুনছে। হঠাৎ দেখে যে এক নেকড়ে, এক শেয়াল আর এক খরগোস আসছে। তাদের এগোনোর ভঙ্গীটা কাঠুরের ভাল লাগল না। মনে হল এদের কোনো কুমতলব আছে। সে তখন তার কুড়ুল উঁচিয়ে বাজনদারকে পিছন করে দাঁড়ালো। তার ভঙ্গী দেখে মনে হল যেন বলছে— বাজনদারের দিকে যদি এক পা এগোতে চাও, আমার এই ধারালো কুড়ুল আছে।

কাঠুরের মূর্তি দেখে জন্তুরা ভয়ে বনের মধ্যে ছুটে পালালো।

সকল অধ্যায়
১.
ভূমিকা
২.
তুষারিণী আর সাত বামনের গল্প
৩.
লাল-ঢাকা খুকি
৪.
বারো ভাইয়ের গল্প
৫.
চরকা-কাটা তিন বুড়ি
৬.
হাঁস-চরানি মেয়ে
৭.
মুচি আর দুই পরী
৮.
সোনার পাহাড়ের রাজা
৯.
খুনীর সঙ্গে বিয়ে
১০.
বুড়ো-আংলা টম
১১.
ব্যাঙ ও রাজকন্যা
১২.
ধড়ফড়ি মাছ
১৩.
বুনো গোলাপের বেড়াল
১৪.
রুম্‌পেল্‌-স্টিল্‌ট্‌-স্খেন্‌
১৫.
পাঁশমনি
১৬.
কাঁপুনি শেখার গল্প
১৭.
সুলতান কুকুরের গল্প
১৮.
নেকড়ের বড়াই
১৯.
শেয়াল আর বেড়ালের গল্প
২০.
ফুর্তিভায়ার অ্যাড্‌ভেঞ্চার
২১.
এক-চোখো, দু-চোখো আর তিন-চোখো
২২.
বুড়ো ঘোড়া
২৩.
নেকড়ে আর শেয়ালের গল্প
২৪.
বনের বাড়ি
২৫.
জীবন-বারি
২৬.
জুনিপার গাছ
২৭.
বুড়ো আর তার নাতি
২৮.
দুই পথিকের গল্প
২৯.
চোর-চূড়ামণি
৩০.
ফ্রিয়েম মাস্টার
৩১.
একটি পেরেক
৩২.
নাচুনি রাজকন্যা
৩৩.
দোয়েল আর ভাল্লুক
৩৪.
নেকড়ে বাঘ আর সাতটি ছাগলছানা
৩৫.
রোলাণ্ডের গল্প
৩৬.
নুটুরানী
৩৭.
আশ্চর্য সালাদ
৩৮.
হানস্‌ল্‌ ও গ্রেট্‌ল্‌
৩৯.
গোলাপ-খুকি
৪০.
লোহার হান্স্‌
৪১.
ব্রেমেন শহরের বাজিয়ের দল
৪২.
খড়, কয়লা আর শিমের বিচি
৪৩.
পাখিয়া
৪৪.
কার্ল কাটৎস-এর ঘুম
৪৫.
সাত-সাবাড়ে দর্জির গল্প
৪৬.
রাখাল ছেলে
৪৭.
হাঁদুরামের সোনার হাঁস
৪৮.
বারোটি শিকারীর গল্প
৪৯.
দাঁড়কাক
৫০.
সাদা সাপ
৫১.
হাতকাটা মেয়ে
৫২.
তিন রকমের ভাষা
৫৩.
ইচ্ছা-পূরণ
৫৪.
ভালুচাম
৫৫.
সিংহ রাজপুত্র
৫৬.
চাষীর চালাক মেয়ে
৫৭.
চাষী আর শয়তান
৫৮.
চতুরা গ্রেট্‌ল্‌
৫৯.
কে কত বোকা
৬০.
চাকিওলার চাকর আর তার বেড়াল
৬১.
কাঁচের কাফিন
৬২.
খরগোস আর সজারুর গল্প
৬৩.
পাতালরাজের মাথায় তিন সোনার চুল
৬৪.
ভাই-বোন
৬৫.
হুতুম-থুমো
৬৬.
ইঁদুর, পাখি আর সসেজ
৬৭.
বেড়াল আর ইঁদুরের সংসার
৬৮.
সাতটি দাঁড়কাক
৬৯.
ফ্রেডেরিক ও ক্যাথেরিন
৭০.
তিন টুকরো সাপ
৭১.
হাড়ের গান
৭২.
চতুরা এল্‌সি‌
৭৩.
সর্বনেশে অতিথি
৭৪.
আশ্চর্য গেলাস
৭৫.
শেয়াল আর হাঁসের দল
৭৬.
ডাক্তার সবজান্তা
৭৭.
ধনী কৃষকের গল্প
৭৮.
তিনটি কঠিন কাজ
৭৯.
কাঠুরের মেয়ে
৮০.
আশ্চর্য এক বাজনদার
৮১.
স্বর্গে ঢুকে দর্জি কি করেছিল
৮২.
ট্রুডে গিন্নী
৮৩.
যমরাজের ধর্মছেলে
৮৪.
ছোট চাষী
৮৫.
নেকড়ে-বৌ আর শেয়ালের গল্প
৮৬.
শবাচ্ছাদনী
৮৭.
সূর্যের আলোয় সব কিছু প্রকাশ হবে
৮৮.
সুন্দর কনে আর কালো কনে
৮৯.
গাধা
৯০.
অকৃতজ্ঞ পুত্র
৯১.
আকাশ-ঝরা টাকা
৯২.
চুরি-করা আধলা
৯৩.
কোন কন্যা সব চেয়ে ভালো
৯৪.
শ্লাউরাফ্‌ফেন দেশের গল্প
৯৫.
ডিট্‌মার্শের আশ্চর্য গল্প
৯৬.
বিচক্ষণ চাকর
৯৭.
স্বর্গের দ্বারে কৃষক
৯৮.
জীবনের দৈর্ঘ্য
৯৯.
মৃত্যু-দূত
১০০.
ঈভের নানান ছেলেমেয়ে
১০১.
কবরের মধ্যে গরীব ছেলেটি
১০২.
অলস বৌ
১০৩.
কুকুর আর চড়াইয়ের গল্প
১০৪.
কুঁড়ে হরি
১০৫.
য়োরিণ্ডা আর য়োরিঙ্গেল
১০৬.
বুড়ো বাপের তিন ছেলে
১০৭.
বিশ্বাসী জন্‌
১০৮.
গোলাপ কুমারী

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%