প্রথম অধ্যায়

শ্রীজাত

রাজকন্যার খুব মনখারাপ। বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে আসছে, এখনও তার মনখারাপ সারছে না। সে অবশ্য কয়েকদিনই হল সারছে না, আজ সে-কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু কথা হল এই যে, মনখারাপ কিছুতেই সারছে না। আর এই সময়টায়, এই যখন বেলা গড়িয়ে দুপুর হয় কিংবা দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তখন তার মনখারাপ আরও ভারী হয়ে চেপে বসতে থাকে। এটা সে খেয়াল করেছে। খেয়াল করে, এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়, এই ভারী মনখারাপের সময়গুলোয়।

এখানে যদিও, এই কাঠের বাড়ির বাইরে, দিনের নানা সময় আলাদা করে বোঝা যায় না তেমন। শুধু এখানে কেন, এই যে অরণ্যের রাজ্য তাদের, আর অরণ্যের বাইরে এই যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বিছিয়ে থাকা উপত্যকা-জোড়া রাজ্য, যে-রাজ্যের সে একমাত্র রাজকন্যা, সেই অরণ্য আর উপত্যকার বেশিরভাগ অঞ্চলেই দিনের নানা সময়কে আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। সেই যে রাত ভেঙে ভোর হয় আস্তে-আস্তে, সেই ভোর থেকে, যতক্ষণ আকাশে আলো থাকে, এই অরণ্য হয়ে থাকে স্যাঁতসেঁতে, কুয়াশামোড়া, নিঝুম, মেঘ-মেঘ। যেন মেঘের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত গাছপালা, আর মেঘেরাই এই অরণ্যের অভিভাবক। এমনটা রাজকন্যা সেই ছোট্ট থেকেই দেখে আসছে। যদিও সে শুনেছে যে, আগে এমনটা ছিল না। বছরের সবক’খানা ঋতুই খুব সুন্দরভাবে বোঝা যেত এই উপত্যকায় আর অরণ্যে। তারপর কবে যেন এরকম হয়ে গেল। সারা বছর কুয়াশার চাদরে সবকিছু মোড়া। যেন সবই আছে, কিন্তু পুরোপুরি নেই কিছুই।

বছরের এই সময়টা এখানে হয় টিপটিপ, নয় মুষলধারে বৃষ্টি। সে-বৃষ্টি যে কোত্থেকে নেমে আসছে অরণ্যের মাটিতে, তা বোঝার উপায় নেই। মাথা তুলে তাকাও, দেখতে পাবে লম্বা-লম্বা গাছেদের চেহারা দিয়ে অরণ্যের সবজেটে কালচে ছাউনি প্রায় ঢেকেই রেখেছে আকাশকে। সেইসব ছাউনির বয়স্ক ছাঁকনি দিয়ে যাও-বা কিছু রোদ্দুর ঢুকতে পারত, সারা বছরের পাহারাদার মেঘ আর কুয়াশার দল সে-উপায়টুকুও রাখেনি আর। তাই এখানে দিন হওয়া মানেই ভেজা-ভেজা, ঘুম-ঘুম, শীত-শীত, মেঘ-মেঘ, কুয়াশা-কুয়াশা, নেভা-নেভা একখানা আলো, যে অনেক আগে কখনও রোদ ছিল, কিন্তু এখন সমস্ত চুল যার পেকে গিয়েছে।

তাই এমন আলো অভ্যেসই আছে রাজকন্যার। এই আলতো ভিজে আভার মধ্যেই সে বড় হয়েছে আজ অবধি। কিন্তু আজ অবধি তার এমন মনখারাপ একবারও হয়নি। কোনওদিনও না। খুব ছোট্টবেলায় যখন একবার ভারী শখের একখানা পুতুল ভেঙে গিয়েছিল, তখন সে একবার কেঁদেছিল। আর তার চেয়েও ছোট্টবেলায়, যেদিন মহামন্ত্রীমশাই এসে তাকে বলেছিলেন যে, তার বাবা-মা আর কোনওদিন ফিরবেন না, অন্য রাজ্যের সফর সেরে ফেরবার পথে তাঁদের ঘোড়া পড়েছিল ঝড়ের মুখে আর তাঁরা তলিয়ে গিয়েছেন খাদে, সেইদিন সে একটু চুপ করে গিয়েছিল। তারপর সেই মেনে নেওয়াটুকু নিয়েই এত বড় হয়েছে। আর হ্যাঁ, আরও একখানা ঘটনায় তার ভারী মনখারাপ হয়েছিল বটে সেই ছোটবেলাতেই, কিন্তু সে-কথা পরে। তবে এটা ঠিকই যে, এত বেশিরকম মনখারাপের বিচ্ছিরি দিন সে আর মনেই করতে পারল না, অনেক চেষ্টা করেও।

কাঠের বাড়ির মচমচে বারান্দায় এসে দাঁড়াল তাই রাজকন্যা। বারান্দায় কাঠের হাতল দিয়ে ঘেরা একখানা বসার জায়গা, আর সেখান থেকে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচ পর্যন্ত, অরণ্যের শুকনো পাতার স্তূপে যার শেষ পাদানি মিশে গিয়েছে এখন। পাতারা অবশ্য শুকনো নেই এখন। ওহ হ্যাঁ, খেয়াল হল রাজকন্যার, এখন শীতকাল। তাই বলে কিন্তু বৃষ্টির কাজে ছুটি নেই। সে কখনও ঝিরঝিরিয়ে আর কখনও ঝমঝমিয়ে পড়েই চলেছে, আর আরও ভেজা-ভেজা কুয়াশায় মুড়ে যাচ্ছে শীতের এই পাহাড়ি অরণ্য। এই যেমন এখনই, কাঠের বারান্দার ছাদের নকশা কাটা জাফরি থেকে টলটল করে পড়ার অপেক্ষায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বৃষ্টির দুই ফোঁটাকে। তার মানে একটু আগেও হচ্ছিল। নইলে সামনে বিছিয়ে থাকা হলদে আর লাল চিনার গাছের পাতাদেরই বা অমন ভেজা দেখাবে কেন?

কাঠের বাড়ির ছোট্ট ফটকের দিকে একবার চাইল রাজকন্যা। অস্ত্র হাতে রাজার দু’জন প্রহরী সেখানে দাঁড়িয়ে। পাহারা দিচ্ছে। তারা একবার রাজকন্যার দিকে তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল। আজ থেকে কয়েকদিন আগে হলেও সেলাম ঠুকত, কিন্তু এখন ঠুকবে না। তাতে ভারী বয়েই যাচ্ছে রাজকন্যার। সেলাম সে চায় না। সে চায় অন্য কিছু। যার জন্য তার এই মনখারাপ। এই ভারী, ভেজা, শীত-শীত কুয়াশার মতো মনখারাপ।

যেদিন থেকে এই কাঠের বাড়িতে রাখা হয়েছে তাকে, সেদিন থেকে মুখে কিছু রুচছে না। রাজকন্যা ভারী ভালবাসে আপেল খেতে। লাল, রসালো, নরম আর টুকটুকে সব আপেল। তাদের এই অরণ্যের পাশের ঢালু উপত্যকাতেই সেসব হয়। আপেলগাছে ছেয়ে থাকা সেই পাহাড়ি ঢালের দিকে তাকিয়ে থাকলেই যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। সেখানকার সেরা আপেলগুলি বরাবরই পৌঁছয় রাজকন্যার হাতে। এমনও তো হয়েছে, একটা গোটা দিন সে শুধু আপেল খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন সেই আপেলেও রুচি নেই। অত মিষ্টি স্বাদ মুখে কেমন যেন তেতোই ঠেকছে তার। রুচি নেই গরম গরম রুটির সঙ্গে টাটকা মাখনের সুগন্ধে। এমনকী এই শীতের সময়ে বুনো গাইয়ের দুধে তৈরি ঘন সেমাইয়ের মিঠে পায়েস, সেও সে মুখের কাছে তুলে নামিয়ে রেখেছে গতকাল। উঁহু, কিচ্ছু খেতে ভাল লাগছে না তার।

রাজপ্রাসাদের গমগমে রসুইঘর থেকে অবশ্য চারবেলা তার জন্য ভালমন্দ পাঠানো হচ্ছে। সে-ব্যাপারে কোনও কসুর রাখা হচ্ছে না কোথাও। আজ একটু আগেই যেমন হালুইকর এসে প্রহরীদের হাতে মিঠাইয়ের গরম বাক্স তুলে দিয়ে চলে গিয়েছে। কাঠের বাড়ির বসার ঘরের জানলা দিয়ে, সাদা ফিনফিনে পর্দা সরিয়ে তা দেখেওছে রাজকুমারী। কিন্তু লোভ হয়নি মোটেই। কেবল খাওয়া কেন, স্নান করতেও যে তার ইচ্ছে করছে না একটুও। তার বাদামি, লম্বা চুলে জট পড়ে গিয়েছে এই ক’দিনে, ভাল করে মুখেচোখে জল না দেওয়ায় তারা কেমন যেন বসে বসে যাচ্ছে। যে-দু’চোখের খ্যাতি দূর-দূর রাজ্যের রাজকুমারদের স্বপ্নে লোভ দেখায়, সেই দু’চোখের নীচে এখন কালি। তার গোলপানা অথচ প্রায়-তেকোনা মুখ, ছোট্ট থুতনি, টানটান নাক আর সদ্য ফোটা তুলোফুলের মতো পাতলা অথচ ভরপুর গোলাপি ঠোঁট, এসব মিলিয়ে যে-আশ্চর্য জৌলুস তৈরি হয়, তার অনেকটাই এখন ম্লান। রাজকন্যা উঠে দাঁড়ালে বা হেঁটে বেড়ালে যে ছিপছিপে ঝলমলানি ছড়িয়ে পড়ে তার চারদিকে, তাও যেন কতকটা নিভে এসেছে। পোশাক, নাহ, এই ক’দিনে পোশাকও বদলায়নি রাজকন্যা। কেবল তার মন আছে আগেরই মতো নরম, জেদি, বুদ্ধিদীপ্ত আর তীক্ষ্ণ। তাই তো সে কষ্ট পাচ্ছে এত।

কাঠের এই বাড়িতে সে অবশ্য একা নয়, তার দুই সহচরীও তার সঙ্গে আছে। এক সহচরী, আর আরেক সহচরী। সেই অনেক কিশোরীবেলায় একবার এই অরণ্যের মধ্যে পথ হারিয়েছিল রাজকুমারী। গুল্মলতায় ঢাকা, ঠান্ডা একখানা গুহায় ঢুকে পড়ে আর বেরোতে পারছিল না কিছুতেই। তখন, তারই সমবয়সি দুই আশ্চর্য কিশোরী তাকে পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল প্রাসাদ পর্যন্ত। নাহ, প্রাসাদে তারা ঢোকেনি, প্রাসাদ তাদের জন্য নয়। কিন্তু তারা কথা দিয়েছিল, রাজকন্যা যখনই প্রাসাদের বাইরে এই অরণ্যে বা উপত্যকায় ঘুরবে, তারা সঙ্গ দেবে। সেই কথা তারা রেখেছে। তারপর থেকে আজ, রাজকন্যার এই আঠারো বছর বয়স অবধি, অরণ্যের কত-কত অজানা কোনায় যে এই দুই সহচরী তাকে ঘুরিয়ে এনেছে, উপত্যকার ঢালে কত নাম-না-জানা পাখি আর ফুল দেখিয়েছে তাকে, সেসবের হিসেব নেই। আর রাজকন্যাও, এই দুই সহচরীকেই কেবল খুলে বলতে পেরেছে তার মনের কথা, যা সে আর কাউকে কোনওদিন পারেনি। আজ তাই, এই ভারী মনখারাপ, আর হ্যাঁ, বিপদের দিনে, এই দুই সহচরীই সঙ্গে আছে তার, চেষ্টা করছে সাধ্যমতো যত্নআত্তি করার।

আশ্চর্য কেন তারা? কেননা, তারা ঠিক আর সকলের মতো নয়। মানে, এই যেমন মানুষ চারপাশে দেখে বড় হয়েছে রাজকন্যা, তেমন নয় মোটেই। তারা কখনও ফিনফিনে পোশাক পরে, কী সব অপূর্ব জরির কাজ তাতে, আবার চাইলে, পোশাক গায়েব করে ফেলতে পারে তাতে হাত না দিয়েই। তারা অনেক সময়ে কিচ্ছুটি না প’রে, দিব্যি পোশাকহীন হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের এ-বিষয়ে কোনও লজ্জাশরম নেই। বরং অরণ্যের মধ্যে ঘোড়সওয়ার বা কাঠুরে বা রাজপেয়াদাদের হুটহাট খুনসুটি করে লজ্জায় ফেলে দেওয়াটাই তাদের পছন্দের মশকরা।

তাদের কিন্তু লুকিয়ে রাখা ডানা আছে একজোড়া করে। গোলাপি পালকের মস্ত ডানা। তারা ইচ্ছে করলেই তাদের কাঁধ থেকে বেরিয়ে আসে সেই গোলাপি ডানার নরম বিস্তার, আর তারা সেটা ঝাপটে, বাতাসে আওয়াজ করে যেদিকে খুশি উড়ে যেতে পারে। তারা চাইলে গায়ের রং, চোখের মণির রং, চুলের রং পালটে ফেলতে পারে লহমায়। কিন্তু যেটা সবচাইতে বিপজ্জনক, সেটা হল, তারা কখনও মিথ্যে কথা বলে না। বলতে পারে না, জানেও না। হ্যাঁ, ছল করতে পারে বটে, কিন্তু মিথ্যে কক্ষনও নয়। তাই মুখের উপর সত্যি বলে দেয় অনেক সময়ে। এই জন্যে, এই সমস্ত কারণের জন্যে এই অরণ্যরাজ্যের বাসিন্দারা এই দুই মেয়েকে রহস্যময়ী বা কুহকিনী নাম দিয়েছে। যতই তারা সুন্দরী হোক, যতই তারা আকর্ষণীয় হোক, যতই তারা মোহময়ী হোক, তাদের ভয় পায় সক্কলে। সকলে অবশ্য চেনে না তাদের, দেখেওনি সামনে থেকে। তবে হ্যাঁ, যারা চেনে, তারা সমঝে চলে বই কী। একজন ছাড়া। খোদ রাজকন্যা। সে তাদের ভালবাসে ভারী। মন থেকে।

“তুমি এইবেলা একটু মিঠাই আর রুটি খেয়ে নাও, কেমন? নইলে কিন্তু শরীর খারাপ করবে,” বারান্দায় এসে পাশে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল এক সহচরী।

“আরেকটু অপেক্ষা করে নিই, তারপর,” ভারী পাতলা আর ক্লান্ত কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এল রাজকন্যার পাতলা আর শুকনো ঠোঁটের পাতাদের ফাঁক দিয়ে। যেমন পাতলা আর শুকনো এখন উপত্যকার চিনার গাছের পাতারা সবাই।

“কিন্তু এমনি করে চললে যে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে!” বোঝানোর চেষ্টা করে এক সহচরী। রাজকন্যা ক’দিন খাচ্ছে না বলে তারাও খাচ্ছে না। কিন্তু তাদের এমনিতে খিদে পায়ও না। এই বাতাস আর মেঘেই তাদের কাজ চলে যায়।

“আচ্ছা, তা হলে গায়ে শীতপোশাক অন্তত চাপাও একখানা? কাল দেখে এলাম, আমাদের অরণ্যের বাইরে, উপত্যকায় একটু-একটু বরফ পড়ছে। ওইদিক থেকে উত্তরের বাতাসও তো ঢুকতে শুরু করেছে। এই শীতে এরকম পোশাক পরে না থাকাই তো ভাল রাজকন্যা।”

ভারী কাতর গলায় বলে সহচরী। রাজকন্যা কোনও রকম উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরের দিকে। সহচরী তার উদাস চাহনির পিছু-পিছু একবার তাকিয়েই বুঝতে পারে, যতদূরে তাকিয়ে আছে রাজকন্যা, আসলে সে তার চাইতেও দূরে তাকাতে চাইছে। তাকাতে চাইছে ভবিষ্যতের দিকে।

সহচরী তড়িঘড়ি ঘর থেকে পশমের একখানা ওড়না এনে ভালরকমে রাজকন্যার গায়ে জড়িয়ে দিল। রাজকন্যার আরামবোধ হল কি না, সে নিজে জানে না অবশ্য।

রাজকন্যা চোখ বন্ধ করে বাতাসে দীর্ঘ একখানা প্রশ্বাস ছাড়ল। সহচরী দেখতে পেল, এই দুপুরের কুয়াশার মধ্যেও, রাজকন্যার মুখ থেকে বেরিয়ে এল সাদা আর শীতল ধোঁয়া। রাজকন্যা একবার ভাবল উপত্যকার কথা। এই বিশাল অরণ্য পেরিয়ে গেলেই খাড়াই উঁচু পর্বতমালা, যার মাথা সারাবছর ঢাকা থাকে ধবধবে সফেদ তুষারে, আর সেই পর্বতমালার পায়ের কাছে ঢালু হয়ে যাওয়া উপত্যকা, যেখানে অনেকঘর প্রজাদের বসবাস, সেই কবে থেকে। সেখানেই চাষের কাজ, সেখানেই লোহা পেটাই আর অস্ত্র তৈরির কাজ, সেখানেই পশুপালন আর খেতখামার। সেই উপত্যকার সেরা কোনা জুড়েও রাজপ্রাসাদ আছে এক, বিশাল প্রাসাদ, মণিমানিক্যে মোড়া। আর এই অরণ্যের মধ্যে, ঠিক মাঝখানে, হ্রদের ধারেও আছে এক রাজপ্রাসাদ। কাঠের। প্রাচীন আর মস্ত সেই প্রাসাদে নানান রাজনৈতিক বৈঠক হয়, শলা-পরামর্শের সভা বসে, কিন্তু রাতে তেমন থাকার পাট সেখানে নেই। এই শীতে তো নয়ই। পাতাঝরা শুরু হলে সেসব জরুরি আর গোপন বৈঠকও অনেক সময়ে উপত্যকার রোদ্দুরময় প্রাসাদেই বসানো হয়, চারপাশের প্রহরাকে আরও কড়া করে দিয়ে।

আর অরণ্যের এক কোণে, গাছেরা যেখানে আরও একটু ঘন আর পুরনো হয়ে এসেছে, সেইখানে এই কাঠের বাড়ি ছিল রাজকন্যার বাবা-মা-র বানানো। তাঁদের অবসর কাটানোর বাড়ি ছিল এটা। এমনিতে সামনে থেকে খুব সাধারণ, কিন্তু এর পিছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরের সেই বরফঢাকা পর্বতমালা দেখতে পাওয়া যায়। সেই বাড়ি এখন কুঠুরিতে বদলে গিয়েছে, যেখানে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে রাজকন্যাকে। তার আঠারো বছর বয়স হতে খুব দেরি নেই আর। কিন্তু তার আগেই বন্দি হতে হল তাকে।

“তুমি কি ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করবে ততক্ষণ? শীতটা বাড়ছে তো,” বলল সহচরী। কিন্তু রাজকন্যা জানে, দমবন্ধ করা এই অপেক্ষায় ঘরের মধ্যে বসে থাকলে তার নিশ্বাস আরও আটকে আসবে। তার চেয়ে এই ভাল।

এমন সময় বাতাস একটু জোর হল, কোনদিক থেকে যেন হু-হু করে ছুটে আসছে ঝাপটার মতো। আর একখানা শীতল সুগন্ধ দূর থেকে কাছে এল। রাজকন্যার দৃষ্টি ফিরে এল সামনে, অরণ্যের মাটিতে, যেখানে গোলাপি পালক ঝরিয়ে, ডানা মুড়ে ফেলে নেমে আসছে তার আরেক সহচরী। সে গেছিল উপত্যকায়, খবর আনতে।

দুই প্রহরী ভয়ে সরে দাঁড়াল দু’পাশে, অতটা আকাশ ওড়ার ক্লান্তিকে তুচ্ছ করে রাজকন্যার আরেক সহচরী দ্রুত পায়ে উঠে এল কাঠের মচমচে আর পুরনো বারান্দায়। রাজকন্যা তার চোখের দিকে তাকাল কেবল, সেখানেই তার প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। মুখ ফুটে কিছু বলছে না সে তাই। তার ওই ক্লান্ত, কালিপড়া চোখের দিক থেকে এক ঝটকায় চোখ সরিয়ে নিল আরেক সহচরী।

তার দু’কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাজকন্যা বলল, “চুপ করে থেকো না সহচরী, দোহাই তোমার!”

“তুমি খেয়েছ আজ কিছু? না আগের মতোই শুকনো রয়েছ?” কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল আরেক সহচরী। যদিও সে জানে, লাভ নেই। সত্যিটা তাকে বলতেই হবে।

রাজকন্যা সে-কথায় কান না দিয়ে আরেক দফা ঝাঁকালো তাকে, আর বলল, “দয়া করো আমার প্রতি। বলো, কী সংবাদ, কী হল?”

রাজকন্যার দু’হাত নিজের কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে মুঠোর মধ্যে পুরে নিয়ে, তার চোখের দিকে সোজাসুজি বিষণ্ণভাবে তাকিয়ে আরেক সহচরী উত্তর দিল, “বিপ্লবীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। সামনের পূর্ণিমার সকালবেলা তাকে মেরে ফেলা হবে।”

অধ্যায় ১ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%