পরকীয়ার আগুনে ছারখার ফোরপাফ ম্যানসন

উপমন্যু রায়

হঠাৎই বাড়ির ভিতরে ফাঁকা ডিনার রুমটা যেন অস্বাভাবিক চঞ্চল হয়ে উঠল। মনে হল, খাবার ঘরে কেউ একজন হেঁটে বেড়াচ্ছেন। অথচ সেখানে এত রাতে কারও থাকার কথা নয়! কেউ নেইও। কারণ কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু, তাঁর পায়ের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শব্দটা কেমন যেন গম্ভীর। একটা হতাশাও যেন সুপ্ত রয়েছে সেই আওয়াজে। যেন কোনো এক চিন্তিত পুরুষ হেঁটে বেড়াচ্ছেন ঘরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। তিনি কি পায়চারি করছেন? কে জানে! তবে, তাঁকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই বাড়িতে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। অনেকেরই নাকি এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাঁরা বলে থাকেন, ওই হতাশ পুরুষটিই নাকি এই সুবিশাল বাড়িটির প্রকৃত মালিক। তাঁর নাম জোসেফ।

মিনেসোটার এই জায়গাটি এমনিতে একটু নির্জনই। আর এখানেই আছে সেই রহস্যময় বাড়িটি। ঠিকানা ২৭৬ এক্সচেঞ্জ স্ট্রিট, সেন্ট পল।

বাড়িটি আসলে একটি ফরাসি রেস্তরাঁ। এখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত কেবল দিনেই। কেউ লাঞ্চ করতে যান। আবার কেউ যান অসময়ের খিদে মেটাতে। মানে টিফিন খেতে। সোজা কথায়, পানাহার করতে। অল্প রাতে ডিনারটাও সেরে ফেলেন কেউ কেউ। মাঝে মাঝে বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানও হয়।

সারাদিন মোটামুটি স্বাভাবিকই থাকে বাড়িটা, কিন্তু রাত গভীর হলেই সব ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। বেশি রাতে খাওয়ার অভ্যাস যাঁদের, তাঁরা সেই সময় আর সেখানে যান না। গোটা বাড়ি তখন যেন ক্রমশ জেগে ওঠে। যেন সারাদিন ধরে বাড়িটি ঘুমিয়ে ছিল। রাত হল তার জেগে ওঠার সময়। সেই জেগে ওঠার ব্যাপারটাও রীতিমতো রোমহর্ষক।

বাড়ির তিন-তলায় একটি ঘরে একটি সুন্দরী মেয়েও নাকি তখন ঘোরাফেরা করে। কাউকে যেন সেপাগলের মতো খুঁজে বেড়ায়। আবার কখনো-বা তাকে বড়ো অসহায় লাগে।

বাড়িটির ইতিহাস যাঁরা জানেন তাঁদের অনেকের ধারণা, মেয়েটির নাম মলি। বহুদিন আগে এই ঘরেই সেআত্মহত্যা করেছিল! সন্দেহ নেই বিষয়টি যথেষ্ট ভাবনারই।

এখানেই শেষ নয়। এ ছাড়াও রহস্যময় হল এই বাড়িটির বেসমেন্ট। এখনও নাকি বেশি রাতে কখনো কখনো এই বেসমেন্টের আলো আপনা হতেই জ্বলে ওঠে এবং নিভেও যায়। কারণ কেউ জানে না।

এই বাড়িতেই একবার একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই অনুষ্ঠানে প্রচুর ছবি তোলা হয়েছিল। সেইরকমই একটি ছবিতে অন্যান্যদের সঙ্গে এমন একটি মেয়ের অস্পষ্ট ছবি ধরা পড়েছিল, যাকে বিয়েবাড়ির কেউই চেনেন না! সকলের মনেই প্রশ্ন জেগে উঠেছিল, মেয়েটি এল কোত্থেকে? কার আমন্ত্রণেই-বা সেএসেছে? ওই ছবির কথা ধীরে ধীরে বিয়েবাড়িতে যাঁরা যাননি, তাঁদের কাছেও ছড়িয়ে যায়।

তাঁদের অনেকেই ছবিটি দেখে বলেছেন, এই মেয়েটিই নাকি সেই মলি!

কাহিনির শেষ নয় এখানেই। রাত গভীর হলে এখনও নাকি মাঝে মাঝেই শোনা যায়, কে যেন খুব জোরে আওয়াজ করে তিন-তলায় ঘুরে বেড়ায়। সেই চলার শব্দে যেন মারাত্মক ক্ষোভ আর অভিমান মিশে রয়েছে। বেশি শোনা যায় তার জুতোর শব্দ। কিন্তু, কথা হল, আজ পর্যন্ত তাকে কেউ দেখতে পায়নি। অনেকের বক্তব্য, রাতে অশান্ত মলিই নাকি হেঁটে বেড়ায় সেখানে।

বাড়িটি সত্যিই খুব পুরোনো। ১৮৭০ সালে বাড়িটি তৈরি হয়। তৈরি করেছিলেন জোসেফ ফোরপাফ। স্ত্রী মেরি এবং দুই মেয়েকে নিয়ে এই বিশাল বাড়িতেই থাকতেন তিনি। স্বাভাবিক দিনই কাটছিল তাঁর।

কিন্তু সমস্ত কিছু এলোমেলো করে দিল বাড়ির পরিচারিকা মলির সৌন্দর্য। সব এলোমেলো হয়ে গেল তারপর। প্রেমে পড়লেন জোসেফ। এ প্রেম যেমন-তেমন প্রেম নয়। পাগলের মতো গভীর প্রেমে পড়েন তিনি। সাড়া দিল মলিও। কিন্তু জোসেফ সেই প্রেম লুকিয়ে রাখতে পারলেন না বেশি দিন।

স্ত্রী মেরি একদিন জোসেফ এবং মলিকে একই বিছানায় রীতিমতো ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ আবিষ্কার করলেন। ব্যাস, আর কী! আগুন লাগল ফোরপাফ সংসারে। তারপরই রণক্ষেত্র হয়ে উঠল এই ভিক্টোরীয় প্রাসাদ।

শেষে জোসেফই হার স্বীকার করেন। এ ছাড়া তাঁর উপায় ছিল না। কারণ, মলির প্রেম ধরে রাখলে স্ত্রী-সন্তানদের ত্যাগ করতে হবে তাঁকে। সম্ভব হল না সেই সাহস দেখাতে। বিয়ে টিকিয়ে রাখতে মলির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন তিনি। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মলির পেটে তখন জোসেফের সন্তান। তবু তিনি স্বার্থপরের মতো অস্বীকার করলেন মলিকে।

জোসেফ সরে যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়ে মলি। কী করবে সে? জগতের কাছে কী পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকবে তার সন্তান?

এখন কুমারী মায়ের সন্তানের কথা পশ্চিমি দুনিয়ায় আকছারই শোনা যায়। কিন্তু তখন তা এতটা সহজ ছিল না। আবার তৎকালীন রক্ষণশীল খ্রিস্টান সমাজে কথায় কথায় গর্ভপাতও করানো সহজ ছিল না।

জোসেফ পাশ থেকে সরে যাওয়ায় সমস্যায় পড়ে যায় মলি। কী করবে বুঝতে পারে না। পেটে ভালোবাসার সন্তান অথচ পিতার দায়িত্ব নেবেন না প্রেমিক জোসেফ। সমাজের কাছে এই সন্তান অবৈধ বলে পরিচিত হবে।

মাথা খারাপ হয়ে গেল মলির। সম্মান, পেটে বাড়তে থাকা সন্তান আর ভালোবাসায় ব্যর্থতা, সমস্ত কিছু তাকে বেপরোয়া করে দেয়।

তাই নিজের সম্মান রক্ষা করতে আত্মহননের পথ বেছে নেয় মলি। তিন-তলার সেই ঘরে ঝাড়বাতি থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ে।

সম্পর্ক ঘুচিয়ে দিলেও মলির মৃত্যু কিন্তু সহ্য করতে পারেননি জোসেফ। ব্যাপারটা গভীরভাবে রেখাপাত করে তাঁর মনে। সত্যিই ভালোবেসেছিলেন মলিকে। মলির পেটের সন্তান যে তাঁরই, জানতেন। কিন্তু, স্ত্রী-সন্তানদের ভয়ে সেকথা স্বীকার করার মতো সৎসাহস তাঁর ছিল না।

তাই বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। একটা অপরাধবোধ তাঁকে গ্রাস করে। অথচ, তাঁর নিজের স্ত্রী মেরি কিন্তু স্বামীর মনের অবস্থা বুঝতে পারেননি কখনো।

অবশেষে এল সেই দিন। ১৮৯২ সালের এক সন্ধ্যা ছিল সেটি। প্রাসাদের কাছে একটি পার্কে গিয়ে বসেন তিনি। বেশ মনোরম বাতাস বইছিল তখন। কিন্তু সেই বাতাসও তাঁর ভালো লাগছিল না। বড়ো অসহ্য মনে হচ্ছিল।

আসলে সেখানে যাওয়ার একটা উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। যদিও অন্য দিনগুলিতেও সন্ধ্যার সময় তিনি পার্কে যান। বসে থাকেন কিছুক্ষণ। বাড়ির সকলেই সেকথা জানেন। তাই মেরিও কিছু মনে করেননি।

কিন্তু জোসেফ অন্যরকম কিছু-একটা ভেবেই পার্কে গিয়ে বসেছিলেন সেদিন। বাড়ির কেউ সেকথা আঁচও করতে পারেনি।

কিছুক্ষণ বসে থাকার পর জোসেফ পকেটে হাত দেন। সন্ধ্যা তখন গভীর হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে রাতের দিকে। হিমেল অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে।

তাঁর পকেটে ছিল পিস্তল। সেই পিস্তল ধীরে ধীরে বের করে আনলেন। চারদিক দেখে নিলেন। কেউ কোথাও নেই।

তারপর সেই পিস্তল ঠেকালেন নিজের মাথায়।

একমুহূর্ত মাত্র। রাতের অন্ধকার ভেঙে খান খান হয়ে গেল গুলির শব্দে।

হ্যাঁ, এভাবেই আত্মহত্যা করেন তিনি। তারপর থেকেই এই প্রাসাদ ক্রমশ রহস্যময় হয়ে ওঠে। সকলের মুখে নানা ধরনের কথা শোনা যেতে থাকে। রাতে এই প্রাসাদে থাকার কথা কেউ ভাবতেও পারেন না।

যাঁরা সাহস দেখিয়ে থাকতে গিয়েছেন, তাঁরা সম্মুখীন হয়েছেন অদ্ভুত সব ঘটনার। যেসব ঘটনার ব্যাখ্যা তাঁরা অন্তত পাননি।

এখন অবশ্য এই বাড়িতেই গড়ে উঠেছে বিশাল এক ফরাসি রেস্তরাঁ। সেই রেস্তরাঁ বেশ জনপ্রিয়। পুরোনো সৌন্দর্য ও কাঠামো ধরে রেখেও যথেষ্ট আধুনিক এই রেস্তরাঁ। তবু এখনও নাকি গভীর রাতে এই রেস্তরাঁ-বাড়িতে অস্বাভাবিক নানা ঘটনার সাক্ষী হন অনেকেই। তাই রহস্যসন্ধানী মানুষের কাছে ফোরপাফ ম্যানসনের এই রেস্তরাঁটি বেশ জনপ্রিয়।

প্রতিদিনই খোলা থাকে। ইচ্ছে করলে সেই রহস্যের অনুসন্ধানও করতে পারেন যে কেউ। রেস্তরাঁয় যান অনেকেই। তবে, রহস্যকে জানার বা বোঝার সাহস দেখান খুব কম মানুষই। তবু কেউ কেউ তো একটু ব্যতিক্রম হনই। তাঁদের অনেকেই কিন্তু নানা ভয়ংকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন সেখানে।

তাঁদের মুখেই অতিপ্রাকৃত সেইসব ঘটনার কথা শোনা যায়। হ্যাঁ, এখনও।

অধ্যায় ১ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%