নেহা কর্মকার
আজ বীরেন তাড়াতাড়িই ফিরে আসে। তাকে এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে দেখে কমলা অবাক হয়ে যায়। বীরেন বলে, “ও কটা দিন বাপ্পাদা সামলে নেবেখন। তাকে বলেছি আজ কতগুলো বছর পর আমার ভাই এসেছে, এবারে বাউডিহি অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে!” কথাগুলো বীরেন বলে ঠিকই কিন্তু শিবেনের মুখ থমথমে হয়ে থাকে। বীরেন তা লক্ষ করে। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে এসে বসে শিবেনের সামনে। ইতিমধ্যে নীল আর তীর্থও এসে যোগ দেয় ওদের সাথে।
বীরেনই প্রথম কথা শুরু করে, “কী রে তোর চোখমুখ এরকম লাগছে কেন?”
শিবেন কিন্তু চুপ করেই থাকে। তীর্থ আজ সকালে জলাশয়ের সামনে সাধনা করার কথা সমস্তটা বলে বীরেনকে। বীরেন সমস্ত কথা শুনে আবার শিবেনকে জিজ্ঞেস করে, “কী রে কিছু জানতে পারলি?”
এবারে শিবেনের গম্ভীর গলার স্বর ভেসে আসে।
“যোগেন্দ্রনাথ মুখার্জি কে দাদা?”
শিবেনের মুখে এই নামটা শুনে চমকে ওঠে বীরেন।
“তুই ওঁর নাম জানলি কী করে?”
“সাধনার মাধ্যমে!”
বীরেনের চমকে যাওয়া দেখে নীল আর তীর্থ দুজনেই খুব অবাক হয়।
বীরেন বলে, “তোমাদের সেই ঠাকুরমশাইয়ের কথা বলেছিলাম না? ওঁরই নাম ছিল যোগেন্দ্রনাথ মুখার্জি!”
শিবেন শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে, “ওঁর সাথে কী ঘটেছিল দাদা?”
ওদের কথার মাঝেই কমলা চা আর হালকা জল খাবার নিয়ে আসে এবং বীরেনকে সমস্ত কথা খুলে বলতে বলে। বীরেনও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে, “বেশ কয়েক মাস আগের কথা, একদিন হঠাৎ আমাদের গ্রামে একজন সৌম্যকান্তি পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। বলিষ্ঠ চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, দেহ থেকে যেন দিব্য জ্যোতি ঠিকরে বেরোচ্ছে। সাক্ষাৎ ঈশ্বরের দূত। সেই সময় আমাদের বর্তমান ভূস্বামী নৃপতি রায় চৌধুরী এই গ্রামে এসেছিলেন কী একটা কাজে। উনি মূলত পাশের গ্রামেই থাকেন। কিন্তু আশেপাশের দু-চারটে গ্রামের ভূস্বামী তিনি। সে যাই হোক, তো সেদিন তিনি সমস্ত কাজ সেরে ভোর ভোরই রওনা দিয়েছিলেন। ওহ বলতে ভুলে গিয়েছিলাম ওঁর সাথে ওঁর বড়ো ছেলেও এসেছিলেন। আসলে এখন উনি যেখানেই যান তার বড়ো ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যান। তো সবাই যখন ফিরছিলেন তখন হঠাৎই ওঁদের এক লেঠেল ভীষণ অসুস্থ বোধ করে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন নৃপতি বাবু। ওঁরা জঙ্গলের পথ ধরেই ফিরছিলেন। ওই লেঠেল একটা গাছের নীচে বিশ্রাম করতে বসে। নৃপতি বাবু নায়েবের সাথে কথোপকথনে ব্যস্ত ছিলেন। ওঁর বড়ো ছেলে একটু এদিক ওদিক ঘুরছিলেন। হঠাৎ একটা আর্তনাদে সবাই চমকে উঠলেন। ছোটো কর্তার গলার আওয়াজ। সবাই পড়িমরি করে ছুটল চিৎকারের উৎসস্থলে। গিয়ে দেখা গেল এক ভয়ানক দৃশ্য। ছোটো কর্তা নীচে উপুড় হয়ে পড়ে কাতরাচ্ছেন আর তার পাশ থেকে সরে গেল এক ভয়ানক বিষধর সাপ। নৃপতিবাবুর তো কপালে হাত। এক ছেলেকে তিনি খুইয়েছেন ছোটো থাকতে থাকতেই আর এক ছেলেকে কিছুতেই হারাতে পারবেন না। তিনি ওখানে বসেই মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। নায়েব, লেঠেলরা সবাই ছুটল গ্রামের দিকে যদি কোনো উপায় ছোটো কর্তাকে বাঁচানো যায়। বাকি লেঠেলরা ছোটো কর্তাকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। তার এমন অবস্থা শুনে গ্রামেরই কিছু মানুষ তাদের বাড়িতে ছোটো কর্তাকে রাখার ব্যবস্থা করে দেয়।
সময়ের পর সময় কেটে যায় কিন্তু কেউ কোনোভাবেই ছোটো কর্তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় না। কিছুটা সুস্থ হলেও আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোটো কর্তার শরীর পুরো নীলাভ বর্ণ ধারণ করে। শরীর মরা মানুষের মতো শীতল হয়ে যায়। নৃপতিবাবুর তো ছেলের এই দশা দেখে পাগল পাগল অবস্থা। ঠিক এই সময়ই নৃপতি বাবুর এক লেঠেল হঠাৎ একজনকে নিয়ে আসে। সবাই সেইদিকে ফিরে তাকায়, আর আগন্তুককে দেখেই সবাই যেন থমকে যায়। সেই বলিষ্ঠ চেহারার দেবতুল্য মানুষটাকে দেখে অজান্তেই নৃপতিবাবু সহ সবাই হাত প্রণামের ভঙ্গিতে কপালে হাত ঠেকায়। সবার সমস্ত জিজ্ঞাস্যকে অগ্রাহ্য করে সে এগিয়ে যায় নৃপতিবাবুর অসাড় হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটির দিকে। কাঁধের ঝোলা থেকে একটা জবা ফুল বের করে আনেন তিনি তারপর সেটা ছেলেটার মাথায় ছুঁইয়ে কী যেন বিড়বিড় করতে থাকেন। সেই ফুলটা ধীরে ধীরে নীলাভ হয়ে ওঠে আর ছোটো কর্তার নিস্তেজ চেহারায় পুনরায় প্রাণ ফিরে আসে। কয়েক মিনিটের নিস্তব্ধতা তারপর হঠাৎই সবাইকে চমকে দিয়ে ছেলেটি উঠে বসল। সেই দেখে নৃপতি বাবু ছুটে গিয়ে তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। বাপ-ছেলের এমন আবেগঘন মুহূর্ত দেখে সবারই চোখে জল চলে এল।
সবার আড়ালেই সেই দেবতুল্য ব্যক্তি বিদায় নিচ্ছিলেন কিন্তু নৃপতিবাবু তা দেখতে পেয়ে ওঁকে দাঁড়াতে বললেন এবং তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েন। সেই দেখে সেই ব্যক্তি একেবারে হা হা করে উঠলেন, বারণ করলেন তাকে পা ছুঁতে। নিজেই নৃপতিবাবুকে দাঁড় করিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।
এরপরেই আমরা সেই ব্যক্তির পরিচয় পাই। তার নাম যোগেন্দ্রনাথ মুখার্জি। তিনি অনেক দূর থেকে এই গ্রামে এসেছেন কী এক সাধনার উদ্দেশ্যে। তিনি যে পথে আসছিলেন গ্রামের দিকে সেই পথেই সেই লেঠেল যাচ্ছিল। লেঠেলকে এরকম উত্তেজিত দেখে তিনি নিজেই জিজ্ঞেস করে সমস্ত ঘটনা জানেন এবং সেই লেঠেলের সাথে এখানে উপস্থিত হন। সমস্ত কথা শুনে নৃপতি বাবু ভীষণই আপ্লুত হয়ে ওঁকে নিজের সাথে রাজবাড়িতে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি এক বাক্যে তা নাকচ করে দেন এবং তাকে এই গ্রামেই থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং নৃপতিবাবুও সেই অনুরোধ স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করেন”, একটানা এতগুলো কথা বলে এবারে একটু থামে বীরেন।
এতক্ষণ বীরেনের সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনছিল সবাই। এবারে শিবেন বলল, “তুমি তো একজনের কথাই বললে আর একজনের তো বললে না!”
বীরেন হঠাৎ চমকে যায়। নীল, তীর্থ অবাক হয়ে বীরেনের দিকে তাকায়।
বীরেন বলল, “হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস। যার কথা বলিনি সে হল পাঞ্চালী। ঠাকুরমশাইয়ের স্ত্রী!”
কথাগুলো যেন বীরেন একটা তীব্র ঘৃণার সাথে বলে ওঠে। সে আবার শুরু করে, “পাঞ্চালীও ঠাকুরমশাইয়ের সাথেই ছিল। তার রূপ একদম যেন লক্ষ্মী ঠাকুরের মতো। কিন্তু তার চরিত্র একেবারে, ছিঃ। আমার বলতেও মুখে বাঁধছে। অমন দেবতুল্য মানুষের কিনা এরকম চরিত্রহীন স্ত্রী? শুধুমাত্র ওর জন্যই তাকে এইভাবে অকালে চলে যেতে হল।”
নীল কৌতূহল প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করল, “ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বল তো বীরেনদা। আমি তো কিছুই বুঝছি না।”
“হুম বলছি”, বীরেন আবার শুরু করে, “নৃপতিবাবু ঠাকুরমশাই ও তার স্ত্রী-র থাকার ব্যবস্থা করেন এবং আমাদের পুরোনো কালীমন্দিরের নতুন পুরোহিত পদে তাঁকে নিয়োগ করে রাজবাড়ি ফিরে যান। বেশ ভালোই দিনগুলো কাটছিল। গ্রামের সমস্ত মানুষকে তিনি তার সাধ্যমতো সাহায্য করতেন। কাউকে তিনি ফেরাতেন না। সবাই ঠাকুরমশাইকে ভগবান সমান মানতে শুরু করল। পাঞ্চালীও তাই। সে-ও তার স্বামীকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করত। মাঝেমধ্যেই গরীব মানুষদের তারা খাওয়াতেন। আমাদের সবার চোখে তারা ছিলেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী নারায়ণ।
আমার সাথেও ঠাকুরমশাইয়ের বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। আমি ভোর ভোর বেরাতাম স্টেশনে যাওয়ার জন্য আর উনিও সেই সময় হাঁটতে বেরোতেন। কতদিন আমরা একসাথে গিয়েছি। কত অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা জেনেছি তার কাছ থেকে। কত গল্পই না করেছি। ওঁকে দেখে, ওঁর সাথে কথা বলে মনে একটা ভারী তৃপ্তি পেতাম। ওঁকে দেখলে এত আপন মনে হতো। মনে হতো… মনে... হতো যেন আমার বড়ো দাদা আমার মাথার উপর বটগাছের ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে সবসময় বিপদ থেকে আগলানোর জন্য!”
বীরেনের চোখ জলে ভরে আসে। কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে সে আবার বলতে শুরু করে, “সবই ঠিক চলছিল কিন্তু ভগবান বুঝি বেছে বেছে ভালো মানুষগুলোকেই চরম দুর্যোগ দিয়ে থাকেন। সেদিনও তাই হল। সেইদিন আমার বেরোতে একটু দেরিই হয়েছিল, ঠাকুরমশাই সেদিন আগেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের ওই পুরোনো পুকুর ঘাটের ওদিক থেকে যে রাস্তা চলে গেছে সেইদিক থেকেই আমরা যেতাম। আমি ভেবেছিলাম ওই পথই ধরি, রাস্তায় হয়তো দেখা পেয়ে যাব ঠাকুরমশাইয়ের। হায় সেদিন যদি আমি একটু তাড়াতাড়ি যেতে পারতাম!” এই বলেই বীরেন হো হো করে কাঁদতে শুরু করে।
এই অবস্থায় বীরেনকে পরের ঘটনা বলতে বলার সাহস নীলের হয় না। তীর্থ উশখুশ করতে থাকে।
এরপরে হঠাৎই শিবেন বলতে শুরু করে, “এরপরের ঘটনা আমি বলছি। অভ্যেস মতো হাঁটতে বেরিয়েছিলেন সেদিন যোগেন্দ্রনাথ। পথে পুকুরঘাটের কাছে তিনি গ্রামেরই একটি মহিলাকে দেখতে পান পুকুরে নিত্যনৈমিত্তিক কাজ সারতে। তিনি স্বাভাবিকভাবেই ওখান দিয়ে হেঁটে সামনের দিকে অনেকটা এগিয়ে যান। বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দেয় কিছু একটা খারাপ ঘটছে। ওঁর মধ্যে এই অদ্ভুত ক্ষমতাটা ছিল। উনি দূর থেকেই খারাপ কিছু ঘটার আভাস পেয়ে যেতেন। তিনি চোখ বন্ধ করে তার ক্ষমতার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন আর তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছুক্ষণ আগে পুকুরঘাটে দেখা সেই মহিলার মুখ। তিনি তৎক্ষণাৎ সেই পুকুরঘাটের দিকে ছুটে যান। তার পৌঁছাতে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল, তিনি যতক্ষণে গিয়ে পৌঁছালেন ততক্ষণে মেয়েটার যা সর্বনাশ ঘটার তা হয়ে গেছে। বেশ কিছু ছেলেকে অর্ধনগ্ন মেয়েটার সামনে অট্টহাস্য করতে দেখে তিনি সমস্তটা বুঝে যান। তখনই ছুটে যান সেইদিকে। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে সেই ছেলেগুলো ওখান থেকে চম্পট দেয়। ঠাকুরমশাই এসে অচৈতন্য মেয়েটার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন। সেই মেয়েটি জ্ঞান ফিরে পেয়ে পাগলের মতো করতে শুরু করে। যোগেন্দ্রনাথের পক্ষে তাকে সামলানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে সেই ছেলেগুলো গ্রামের মানুষকে ভুল বুঝিয়ে সেই পুকুরঘাটে নিয়ে আসে। গ্রামের মানুষেরা যোগেন্দ্রনাথকে ওইরকম অবস্থায় মেয়েটার পাশে দেখে সেই ছেলেগুলোর কথাই বিশ্বাস করে নেয়। তীব্রভাবে অপমান করতে শুরু করে সবাই মিলে তাকে। কেউ কেউ তো গায়ে অবধি হাত তোলে। যোগেন্দ্রনাথকে কোনো কথা বলার সু্যোগ পর্যন্ত দেওয়া হয় না। ইতিমধ্যে সেই মেয়েটি একটা চরম ভুল করে বসে। সবার অলক্ষ্যে সে নিজেকে ওই পুকুরের জলে আত্মবলিদান দেয়। এতে গ্রামের মানুষ আরও চোটে যায়। তাকে অপমান করে গ্রামের বাইরে বার করে দেওয়া হয়!”
এতটা বলে শিবেন থামলেই বীরেন বলে, “হ্যাঁ ওঁকে গ্রামের বাইরে বার করে দেওয়া হয় ঠিকই কিন্তু দুদিন পর উনি ফিরে আসেন তার স্ত্রী পাঞ্চালীকে নিয়ে এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ার জন্য। আমার সাথে ওঁর দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন যে তিনি তার স্ত্রীকে ভীষণই ভালোবাসেন, তাই কখনওই স্বার্থপরের মতো তাকে একা এই গ্রামে ছেড়ে চলে যাবেন না। ততদিনে পাঞ্চালীকে গ্রামের সবাই একঘরে করে দিয়েছে। দুদিন ধরে ঠিক মতো খেতে না পেয়ে, ঘরে বন্দি হয়েই ছিল। কিন্তু ঠাকুরমশাই যখন ওখানে গিয়ে পৌঁছান তিনি গিয়ে পাঞ্চালীকে দুইজন পুরুষের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় আবিষ্কার করেন। এই চরম ধাক্কাটাই তিনি আর সামলাতে পারেন না। সেখান থেকে ছুটে চলে যান নদীর ধারের বটতলায় আর তারপর সেখানেই ফাঁস লাগিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন!”
“আর এরপরেই খুব অদ্ভুতভাবে পাঞ্চালীকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তাই তো?” শিবেন জিজ্ঞেস করে বীরেনকে। বীরেন কথার সম্মতি জানিয়ে ওপরে নীচে মাথা দোলায়। নীল আর তীর্থ দমবন্ধ করে শুনছিল সমস্ত ঘটনাটা। সমস্তটা শুনে নীল শিবেনকে বলল, “আপনি এতকিছু জানলেন কী করে?”
শিবেন হালকা হেসে বলে, “সবই তোমাদের দুপুরে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার ফল!”
“সবই তো বুঝলাম কিন্তু বাউডিহির অবস্থার সাথে এর সম্পর্ক কী?” উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞাসা করে বীরেন।
“সম্পর্ক তো একটা আছে দাদা না হলে সাধনায় আমি কিছুতেই ওঁর মুখ দেখতাম না। আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয় তবে এই গ্রামে শুধু এই দুটো পাপ না তার সাথে আরও একটা পাপ ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে!”
“কী বলছিস কী শিবু, কীসের পাপ?”
শিবেন সন্দিগ্ধ চোখে তাকায় বীরেনের দিকে, “যোগেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর পাঞ্চালী কোথায় গেল তা একবারও খোঁজ নিয়ে দেখলে না? জানার চেষ্টা করলে না যে জিনিসটা তোমরা চোখের সামনে দেখেছ সেটা আদৌ সত্যি কিনা? তোমাদের কারোর মনে হয়নি একবার যাচাই করে দেখা উচিত ছিল!”
শিবেনের কথা শুনে বীরেন বেশ খানিকটা অবাক হয়। কী বলতে চাইছে শিবেন? তবে কি তাদের আরও বড়ো কোনো ভুল হয়ে গেল? প্রশ্নটা ক্রমশই বীরেনকে ভাবাতে লাগল।
এর মাঝে হঠাৎই তীর্থ একটা অদ্ভুত কথা বলে ওঠে, “আচ্ছা তোমরা একটা জিনিস খেয়াল করেছ এই পিশাচ কিন্তু কখনওই সকালে বা সূর্যের আলো থাকাকালীন মানুষের কোনো ক্ষতি করে না!” সবাই একটু অবাক হয় কিন্তু সবাই তীর্থের কথায় সম্মতি জানায়।
নীল প্রশ্ন করে, “আচ্ছা এমনটা যদি হয় তাহলে সকালে সেই পিশাচ থাকে কোথায়?”
এই কথাটা কিন্তু এতদিন কেউ ভেবে দেখেনি। এবারে সত্যিই বীরেন আর কমলার মুখে চিন্তার ছাপ দেখা গেল। শিবেন কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “আচ্ছা এই মৃত্যুগুলো ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল বলো তো?”
কমলা একটু ভেবে উত্তর দেয়, “ঠাকুরমশাই মারা যাওয়ার ওই দু-তিনদিন পর থেকেই।”
শিবেন জিজ্ঞেস করে, “এর মধ্যে কেউ উধাও হয়ে গেছে বা হারিয়ে গেছে? এ যাবৎ যারা মারা গেছে তাদের সবারই মৃতদেহ তো তোমরা দেখেছ, তাহলে এমনকি কেউ আছে?
বীরেন বা কমলা এমন কাউকেই মনে করতে পারল না। কিন্তু কমলা মনে মনে কী যেন একটা ভাবতে লাগল। “আচ্ছা ঠাকুরমশাই মারা যাওয়ার পর হঠাৎই দুদিনের জন্য রাকার মা উধাও হয়ে গিয়েছিল না? আর তারপরে হঠাৎই ফিরে আসে। কেমন যেন বদলে গিয়েছিল সে। অদ্ভুত তার আচরণ। তাকে দেখে যেন কোনো অচেনা মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।” কিন্তু সেই কথা কমলা কাউকেই বলেনি। “এর সাথে কি রাকার মায়ের কোনো সম্পর্ক আদৌ আছে? একবার কি বলব শিবেন কে?” মনে মনে ভাবতে থাকে কমলা। শিবেন তা লক্ষ করে কমলাকে জিজ্ঞেস করে, সে কিছু বলতে চায় কিনা?
কমলা সমস্ত কথা খুলে বলে শিবেনকে। সমস্তটা শুনে শিবেনের ভ্রূ আরও কুঞ্চিত হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন