নেহা কর্মকার
“কী হল বাবা? থেমে গেলেন যে!” বিষণ্ণ মুখে তারক গুনিনের দিকে চেয়ে কথাগুলো বলে ওঠে নগেন। বাউডিহি ঢোকার আগে তারক গুনিন সকলের গাত্র বন্ধন করে দিয়েছিলেন। সমস্ত রাস্তাটাই তিনি একটা বীজমন্ত্র জপ করতে করতে আসছিলেন কিন্তু বাউডিহির সীমানার কাছাকাছি আসতেই তিনি হঠাৎই থমকে গেলেন। তার মুখ দিয়ে আর কোনো মন্ত্রোচ্চারণ শোনা গেল না। বদলে তার মুখে ফুটে উঠল এক ভয়ের ছায়া।
একমনে তিনি দিগন্তের পানে চেয়ে থাকেন। নগেনের ডাকে তারক গুনিনের হুঁশ ফেরে। নগেনের প্রশ্নের উত্তরে এবারে তারক গুনিন যা বললেন তাতে সবাই একেবারে চমকে উঠল।
“এ কী করেছিস তোরা?”
“কেন বাবা কী হয়েছে?”
“তোদের গ্রামে এক মহা শয়তানের প্রকোপ পড়েছে। এ কোনো সাধারণ পিশাচ নয়! তোদের সামনে ভীষণ বিপদ!”
“কী বলছেন বাবা! আমাদের বাঁচান। এইসব কী করে হল? আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”
“সেটাই তো ভাবছি এত বড়ো বিপদ তোরা বাধালি কী করে? যাক গিয়ে, আগে আমাকে জানতে হবে যে কতটা ভয়ানক এই পিশাচ! নগেন...”
“আজ্ঞে বলুন বাবা!”
“আমাকে কয়েকটা জিনিস জোগাড় করে দিতে হবে কিন্তু, ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে বাবা!”
“বেশ চল এবার গ্রামে ঢোকা যাক।”
সকলকে নিয়ে গ্রামের ভিতরের দিকে রওনা দিলেন তারক গুনিন। সকলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আছে। গায়ে ঘেষাঘেষি করে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। ওইদিকে তারক গুনিনের মনে দুশ্চিন্তার মেঘ আরও ঘন হচ্ছে।
হঠাৎ সামনের অন্ধকারের মাঝে আরও একপ্রস্ত অন্ধকার দেখে তিনি থমকে গেলেন। মনে হল কী যেন একটা জ্বলজ্বল করছিল কিন্তু কী? প্রায় চোখের নিমেষেই জিনিসটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, ভালো করে দেখার সুযোগই পেলেন না তারক গুনিন। কিন্তু এবারে তার ক্রমাগতই মনে হতে লাগল কেউ বা কিছু যেন তার ওপর সমানে নজর রেখে চলেছে। তিনি ব্যাপারটাকে আর অত পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে চললেন সামনের দিকে।
গ্রামের পুরোনো বটতলায় পৌঁছে হঠাৎ গুনিন বলল, “তোরা একটা কথা ভেবে বল তো!” তারক গুণিনের গম্ভীর গলার স্বরে সবাই এদিক ওদিক ছেড়ে গুনিনের দিকে তাকাল।
“কী বাবা?”
“এই কয়েকদিনের মধ্যে বা এই দু-তিনমাসের মধ্যে তোদের গ্রামে কেউ আত্মহত্যা করেছিল বা কেউ মারা গিয়েছিল?”
তারক গুনিনের প্রশ্নে এবারে সবাই হকচকিয়ে যায়, তাদের মধ্যে চোখ চাওয়াচাওয়ি হয়।
“কী রে বল! দেখছিস কী” তারক গুনিন থেমে গিয়ে নগেনদের উদ্দেশে কথাগুলো বলে ওঠে।
“হ্যাঁ... হ্যাঁ বা…বাবা, আত্মহত্যা করেছিলেন একজন। কিন্তু আপনি বুঝলেন কী… কী…”, কাঁপা কাঁপা স্বরে কথাগুলো শেষ করতে পারে না মহেন।
“ঠিক করে বল তো যিনি আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি কি ঠাকুর দেবতার সাথে কোনোভাবে যুক্ত ছিল?” প্রশ্ন করে তারক গুনিন।
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে উত্তর দেয় নগেন, “হ্যাঁ বাবা তিনি আমাদের কালী মন্দিরের নতুন ঠাকুরমশাই ছিলেন। কেন বাবা? গ্রামে এখন যা ঘটছে তার সাথে কি ওঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে?”
“আছে বই-কি, যাই হোক আমি একটা যজ্ঞের আয়োজন করতে চাই তবে তার আগে আমাকে একটা ব্যাপার দেখে নিতে হবে... এ… এই নগেন...”
“হ্যাঁ বাবা বলুন।”
“আমাকে এক্ষুনি তিনটে ডিম এনে দে!”
“আজ্ঞে!”
নগেন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটে ডিম নিয়ে হাজির হয়। নগেন ডিম আনার পরেই তারক গুনিন ঝোলা থেকে একটা পাত্র বার করে আনেন। তার মধ্যে রাখা বেশ খানিকটা লাল আবিরে তিনি তার তর্জনীর অগ্রভাগ ডুবিয়ে দেন এবং মাটিতে একটা ত্রিভুজ আঁকেন। এরপর আবার ঝোলা থেকে তিনটে সাদা ধবধবে কড়ি বার করে ত্রিভুজের তিন কোণায় রেখে দিলেন। তারপর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল সেই ত্রিভুজের মাঝ বরাবর রেখে তিনি বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র পড়লেন। এতক্ষণে গ্রামে তারক গুনিনের আসার খবর সবাই পেয়ে গিয়েছিল। তাই সবাই একটু আশ্বস্ত হয়ে আর যতটা সম্ভব সাহস নিয়েই বাইরে বেরিয়ে আসে অলৌকিক কিছু দেখার আশায়। তারা এসে দেখে তারক গুনিন বটতলায় বসে বিড়বিড় করে কীসব যেন মন্ত্র পড়ছেন। তার পাশে নগেন, হারান আর মহেন হাত জড়ো করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে কোনো এক যাদুবলে সবার চোখের সামনেই লাল আবিরে আঁকা ত্রিভুজটা লাল আভায় জ্বলে ওঠে। এইদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সূর্যের শেষ আভাও ক্লান্ত হয়ে বিদায় নিয়েছে পশ্চিম দিগন্তে। ত্রিভুজটা বেশ কিছুক্ষণ ওইভাবে জ্বলার পর তারক গুনিন তার হাতের ইশারায় নগেনকে কাছে ডাকেন এবং কড়ির মুখ বরাবর তিনটে ডিম সাজিয়ে দিতে বলেন। নগেন তার আদেশ যথাযথ ভাবেই পালন করে। এরপরে তারক গুনিন সকলকে উদ্দেশ করে তাকে একেবারেই বিরক্ত না করার জন্য সাবধান করেন। তারপর পদ্মাসনে বসে একমনে মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকেন। হঠাৎ শূন্যের দিকে তিনি তার তিনটে আঙুল তুলে দিয়ে আবার দুর্বোধ্য ভাষায় কীসব মন্ত্র জপ করেন। তারপর তিনি সেই তিন আঙুল নীচে এনে ত্রিভুজের তিন কোণায় ডিমের অগ্রভাগ বরাবর একটা সরলরৈখিক রেখা এঁকে দেন। এরপরে আবার আগের মতো পদ্মাসনে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরেই তিনি আবার তার ঝোলা থেকে কী যেন একটা বার করে ডিমগুলোর মাথায় ছিটিয়ে দেন এবং ডিমগুলোর ভেতর দিয়ে হঠাৎ সাদা ধোঁয়া নির্গত হতে শুরু করে। এরপর তিনি পুনরায় চোখ বোজেন। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন প্রায় সবাই অধৈর্য হয়ে পড়েছে ঠিক তখনই হঠাৎ তারক গুনিনের সামনে রাখা সেই ডিমগুলো মধ্যে কম্পন শুরু হয়। ঠিক ডিম ফেটে মুরগির বাচ্চা বেরিয়ে আসার মতো। কিন্তু তাও তারক গুনিন চোখ খুললেন না। হঠাৎই তিনটে ডিম এক বিকট আওয়াজ করে একত্রে ফেটে যায় এবং দেখা যায় ভেতর থেকে এক কালো কুচকুচে আলকাতরার মতো তরল চ্যাট চ্যাটে পদার্থ বেরিয়ে আসছে। সেই পদার্থ বেরিয়ে এসে সারা মাটিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এবারে তারক গুনিন চোখ খুললেন। তিনি চোখ খোলার সাথে সাথেই নগেন, হারান এবং গ্রামের আরও কয়েকজন তারক গুনিনের দিকে ছুটে আসে। তাদের সবাইকে আশ্বস্ত করে তারক গুনিন বললেন, “তোরা ভয় পাস না। আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে এই পিশাচকে পরাজিত করার চেষ্টা করব। তোদের ওই ঠাকুরমশাই মৃত্যুর সময় ভয়ানক দোষ পেয়েছিলেন। তাই তাঁর আত্মা ভয়ানক প্রেতযোনিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা হল এই প্রেতযোনি যেমনই ভীষণ শক্তিশালী তেমনই ভীষণই প্রতিহিংসাপরায়ণ সঙ্গে অসম্ভব ধূর্ত। বলা যায় না হয়তো এখানেই কোথাও সেই পিশাচ লুকিয়ে আমাদের দেখছে ও সমস্ত কথোপকথন শুনছে!” শেষের কথাগুলো শুনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা ব্যক্তি একেবারে বিদ্যুৎ ঝটকা লাগার মতো কেঁপে উঠল। কেউ কেউ রামনাম জপতেও শুরু করল।
“আহা তোরা এত ভয় পাস না। জানবি যত বেশি ভয় পাবি তত ওই প্রেতযোনি আরও তোদের ভয় দেখাবে!” গুনিনের ভারী গলার স্বরে এবারে সবাই যেন একটু হলেও আশ্বস্ত হয়।
“আচ্ছা শোন তোরা। এখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমাদের কাছে খুব দামি। যা যা করতে বলছি মন দিয়ে শুনবি এবং তাই তাই করবি। সাবধান! যদি এদিক থেকে একটু ওদিক হয়েছে তাহলে সব শেষ!” গুণিনের কথায় সবাই এবারে একটু থতমত খেয়ে যায়।
“আমি এখানে আজ ঠিক রাত ১২টার পরেই একটা সাধনা করব। এই সাধনায় আমায় নিজস্ব সমস্ত শক্তি উৎসর্গিত করতে হবে। তবে তার আগে এই পুরো গ্রামের সীমানাকে বন্ধনী দিয়ে ঘিরে ফেলতে হবে। তার জন্য আমার সাহসী কয়েকজনকে দরকার। বল কারা করবি? চিন্তা করিস না। তোদের প্রত্যেককে আমি গাত্রবন্ধনী করে দেব। তবে তোদের একলাই যেতে হবে সীমানা বন্ধনী করতে। তোদের শুধু এই জিনিসটা দিয়ে সমস্ত গ্রামকে ঘিরে ফেলতে হবে”, এই বলেই তিনি তার ঝোলা থেকে কী যেন একটা বার করলেন এবং একটানা কথাগুলো বলে তারক গুনিন গ্রামের মানুষগুলোর দিকে চাইলেন। গুনিনের কথা শুনেই তাদের ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। মুখ ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই বেশ কয়েকজন যুবক বয়সীরা সামনের দিকে এগিয়ে আসল। তাদের চোখেমুখে কিঞ্চিৎ ভয় খেলা করলেও, রয়েছে এক চরম আত্মবিশ্বাস। তারা যে করেই হোক নিজের ভয়কে জয় করে এই গ্রামকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর। তাদের এগিয়ে যেতে দেখে তাদের বাড়ির লোকেরা হা হা করে এগিয়ে এল বাঁধা দিতে। গুনিন তাদের আশ্বস্ত করলে তারা কিছুক্ষণের জন্য একটু শান্ত হয়। এরপর গুনিন ওই যুবকদের এক এক করে বুঝিয়ে দিতে লাগল কীভাবে কী করতে হবে এবং যতক্ষণ এই গ্রাম বন্ধনী প্রক্রিয়া চলবে ততক্ষণ একটানা গুনিন এইখানে বসেই একমনে মন্ত্রোচ্চারণ করে যাবেন।
সবাইকে যে যারটা বুঝিয়ে দিয়ে তিনি দেখলেন এখনও একজনকে লাগবে। কারণ আসল জিনিসটাই যে পড়ে আছে। বন্ধনের জোড় না আটকাতে পারলে তো সবকিছুই বৃথা। তাই এই মাটির সরা দিয়ে সেই দ্বারের মুখ বন্ধ করতেই হবে। এই কথা গুনিন বলতেই হঠাৎ ভীড়ের মাঝ থেকে এক ছোটোখাটো মোটাসোটা লোক বেরিয়ে এসে গুনিনের পায়ের কাছে একপ্রকার হুমড়ি খেয়ে পড়ে। গুনিন তো তার এই কাণ্ড দেখে থতমত খেয়ে যান। লোকটি বলে, “বাবা বাকি কাজটা আমায় দিন। আমি করব!” তার কথা শেষ হতেই বাকি গ্রামবাসীদের মধ্যে থেকে এক তীব্র কোলাহল হতে শুরু করল। গুনিন তো কিছুই বুঝতে পারছে না। অবশেষে গ্রামের এক ছোকরার কাছ থেকে সমস্তটা শুনে গুনিন মনে মনেই একচোট হেসে নিলেন। মূল ব্যাপারটা হল এই, যে লোকটার কথা এখানে বলা হচ্ছে সে হল গবানন্দ ওরফে গবা। ভীষণই সরল সাধাসিধে গোবেচারা ধরনের মানুষ বা সোজা কথায় বলতে গেলে ওর মনটা পুরোই বাচ্চাদের মতো সরল কিন্তু মাথায় এতটুকু বুদ্ধি নেই আর ভীষণই ভীতু। তার ওপর উপরি পাওনা তার এই উচ্চতা। গ্রামের অনেক লোকই ওকে ভালোবাসে কিন্তু বেশিরভাগ লোকই তার পিছনে লেগে বা টিটকিরি কেটে এক স্বর্গ সুখ লাভ করে, বিশেষ করে কমবয়সীরা। তাই গবার মনে ভীষণ রাগ। সবসময় সুযোগ খোঁজে বড়ো কিছু করে দেখানোর। যাতে যারা ওকে নিয়ে মশকরা করে তাদের মুখে ভালো করে ঝামা ঘষে দিতে পারে। কিন্তু কপাল কোনোবারই তার সাথ দেয় না। প্রত্যেকবার কিছু না কিছু গণ্ডগোল সে পাকাবেই। মানে যেখানে গবা সেখানে হবে না গণ্ডগোল! নাহ, সে একেবারেই নৈব নৈব চ!
একবার গ্রামের এক মেলায় বাচ্চারা মিলে একটা ছোটোখাটো নাটকও করেছিল। নাটকের নাম দিয়েছিল “গবানন্দের গণ্ডগোল!”
সে যাক গিয়ে, এবারে আসল কথায় আসা যাক। সবাই বলতে শুরু করল, “না না ও আবার কী করবে?” ; “ওর দ্বারা এইসব হবে না, উলটে আরও বিপদ বাড়বে আমাদের”, আর একজন বলল, “উঁহু নিজের বউকে পায় যমের মতো ভয় সে নাকি আবার একা একা যাবে এই অন্ধকারে বাউডিহির সীমানা রক্ষা করতে!” আর এক দল যুবক বলল, “আরে গবাদা যাও যাও বাড়ি যাও। ওইসব তোমার কাজ নয়। তুমি বরং বাড়ি যাও গিয়ে বউদির পায়ে একটু তেল মালিশ করে দাও। বউদি তো খেটে খেটেই মরল তোমার জন্য। তোমার দ্বারা তো আর কিছু হল না!” বলেই ছেলেগুলো হাসতে থাকে। গবার কান লাল হয়ে ওঠে। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। তারক গুনিন বুঝতে পেরে গবার কাঁধে হাত রেখে বলেন, “বাকি কাজটা ওই সারবে! ওকে এইসব কথা বলা বন্ধ কর তোরা!” গুনিনের গুরুগম্ভীর গলার স্বরে সবাই চুপ হয়ে যায়। কোলাহল থেমে যেতেই আবার শ্মশানপুরীর মতো নিস্তব্ধতা হ্রাস করে গ্রামকে। গবার চোখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে আরও একবার নিজের মাথা গুনিনের পায়ের কাছে নামিয়ে বলে, “বাবা দেখবেন এবারে আর কোনো ভুল করব না আমি। একদম ঠিকঠাক করে আপনার দেওয়া কাজ সম্পন্ন করব!” গুণিনের মুখে একটা স্নিগ্ধ হাসি খেলে যায়। এমন সরল সাধাসিধে মানুষ সে এই জীবনে অনেক কমই দেখেছে। তার ভারি পছন্দ হয়েছে গবাকে। তার মন চাইছে গবাকে বিশ্বাস করতে। অন্যদিকে প্রায় সকলেই ধন্দে পড়ে গেছে, এই অবস্থায় গবাকে কি ভরসা করা ঠিক হবে। এমন পরিস্থিতিতে যেখানে মানুষের মরা-বাঁচার প্রশ্ন, সেখানে গবা!
গ্রামের মানুষের পাংশু মুখ দেখে গুনিন সকলকে আশ্বস্ত করলেন। ঝোলা থেকে একটা সিঁদুর মাখানো তাবিজ বের করে বিড়বিড় করে কী সমস্ত মন্ত্র বললেন তারপর সেটা গবাকে পরিয়ে দিয়ে গুনিন বললেন, “যাহ তোর আর কোনো ভয় নেই। কোনো প্রেত পিশাচ কিছু করতে পারবে না তোর! যতক্ষণ তোর সাথে এই তাবিজ আছে। ভুল করেও এই তাবিজ খুলবি না! তোকে শুধু এই মাটির সরা একটা বিশেষ স্থানে বসিয়ে সিয়ে আসতে হবে, ব্যস আর কোনো কাজ নেই তোর!”
গুনিনের সমস্ত কথা সবাই ভালো করে বুঝে নিয়ে সবাই যে যার কাজ করতে বেরিয়ে পড়ল। বাকি কয়েকজন গুনিনকে তার সাধনার প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করে দিতে লাগল। গুণিন আপাতত চোখ বন্ধ করে সীমানা বন্ধনী প্রক্রিয়ার মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে পদ্মাসনে লিপ্ত হলেন।
কিন্তু এইদিকে গবা তার কাজ করতে যাওয়ার আগে মহা আনন্দে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়িতে পৌঁছাল। তার মা আর বউকে খবরটা না দেওয়া অবধি কিছুতেই সে শান্ত হতে পারছে না। এই প্রথম সে এত বড়ো একটা কাজ করতে যাচ্ছে, তার ওপর তারক গুনিনের মতো সাধক মানুষ ওকে বিশ্বাস করেছে। এই কথাগুলো বলে মঙ্গলীকে একপ্রস্ত চমকে দিয়ে তার সেই অবাক মুখখানা দেখতে বড়ো মন চাইছে গবার। একমাত্র সেই যে গবার এত দুর্বলতা সত্ত্বেও তাকে মেনে নিয়েছে। রেগে গিয়ে অনেকবার অনেকরকম কুকথা বললেও সেই ক্ষোভ মনে রাখার পাত্র গবা বা তার বউ কেউই নয়। তার সংসারটাকে তো মঙ্গলীই প্রাণ দিয়েছে।
বাড়ির দাওয়ার সামনে আসতেই গবা তার মাকে বসে থাকতে দেখল। দূরের দৃষ্টি তার নেই। কাছে আসতেই বুড়ি তার ক্যানক্যানে গলায় বলে উঠল, “কে রে? কে এলি? গবা নাকি?"
গবা আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “মা! মা জানো আজ কী হয়েছে!” আনন্দে প্রায় আত্মহারা গবা।
বুড়ি আবার তার ক্যানকেনে গলায় বলল, “আহ মুরো যা! অমন ষাঁড়ের মতো চিল্লাস ক্যান?”
গবা সমস্ত কথা খুলে বলল তাকে। সমস্তটা শুনে গবার মা স্তব্ধ হয়ে যায়। “হ্যাঁ রে বাপ, তুই পারবি তো রে?” বুড়ি বলে ওঠে। গবা একটু বিরক্ত হয়ে বলে, “এই জানতাম তোমরা কেউ আমাকে বিশ্বাস করো না। মঙ্গলী কই। আমি তাকেই সব বলব। সে আমাকে অবিশ্বাস করবে না!” এই বলেই গবা হনহন করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
এইদিকে গবার মায়ের চিন্তা আরও বেড়ে গেল। মনে মনে ঠাকুরকে স্মরণ করে সে বলল, “গবাটারে দেখো ঠাওর, বড়োই সরল বাপ আমার। ওর কোনো ক্ষেতি কোরো নে!” বুড়ি কাঁপা কাঁপা হাতে প্রণামের ভঙ্গিতে কপালে হাত ঠেকায়। তারপর চোখ খুলতেই চমকে যায়। সামনে পূর্ণিমা। তাই চাঁদের আলো দিন দিন উজ্জ্বল হচ্ছে আরও। সেই আলোতেই মনে হল কেউ যেন তাদের বাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বুড়ি চোখ কচলে আরও একবার ভালো করে দেখার চেষ্টা করে। এবারে সেই ছায়ামূর্তি তার অনেকটা কাছে এগিয়ে এসছে। তার ছায়া বুড়ির গায়ে এসে পড়েছে। কী ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি সে উঠোন পার করে এল কী করে। কিছু বুঝে উঠবার আগেই বুড়ির হৃদপিণ্ড ধড়াস করে উঠল। ছায়ামূর্তি অনেকটা কাছে এগিয়ে আসায় এবারে বুড়ি ভালো করে দেখতে পারছে। বুড়ির মুখ যেন কেউ অদৃশ্য সুতো দিয়ে সেলাই করে দিয়েছে। কিছুতেই সে তার মুখ খুলতে পারছে না। কিছু বোঝার আগেই সেই ছায়ামূর্তি বুড়িকে হ্যাঁচরাতে হ্যাঁচরাতে বাড়ির পাশে ঝোপের আড়ালে নিয়ে চলে গেল।
এইদিকে গবা মঙ্গলীকে সমস্ত কথা বলতেই তার চোখও ছলছল করে উঠলো। “আমি জানতাম, আমি জানতাম এমন একটা দিন নিশ্চয়ই আসবে। গ্রামের লোকেরা বুঝবে, ওরা তোমাকে যতটা নিষ্কর্মা মনে করে, তুমি মোটেও তা নও। যাও তুমি আজই সবাইকে প্রমাণ করে দাও যে তুমি কতটা যোগ্য!” মঙ্গলীর কথায় এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি পায় যেন গবা। বেরোতেই যায় কিন্তু তার আগেই দরজায় একটা ছায়ামূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমটায় দুজনেই হকচকিয়ে যায়। তারপর গবা বুঝতে পেরে বিরক্ত হয়ে বলে, “উফ মা দরজার কাছে ওইভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? আর একটু হলেই...! যাক গিয়ে। মঙ্গলী আমি আসি!”
“অ বউ!” বুড়ির সরু গলার আওয়াজ শুনে এবারে দুজনে থমকে যায়। “বলুন মা!” উত্তর দেয় মঙ্গলী।
“শুনলুম ওই তারক গুনিন নাকি ওরে কী একটা তাবিজ দেছে। তা ওইটা একবার ঠাওরের পায়ে ছুঁইয়ে দিও কেমন! আর নয়তো আমারে দাও আমি ঠাওরের পায়ে ছুঁইয়ে আনছি!”
গবা বলে উঠল, “না না দেরি হয়ে যাবে। আর অত ঠাকুরের পায়ে ছোঁয়ানোর সময় নেই...!
“থাম তো বাছা। বউয়ের সাথে সোহাগ করার অনেক সময় আছে। আর ঠাওরের পায়ে তাবিজ ছোঁয়ানোর সময় নাই! উঁহু আদিখ্যেতা!”
মঙ্গলীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। গবার কানে ফিসফিসিয়ে সে বলে, “মা যা বলছে শোনো। নাহলে জানোই তো! আবার শুরু করবে!” এই বলেই সে রান্নাঘরের দিকে ছুটে চলে যায়।
“আচ্ছা আচ্ছা বেশ এই নাও! যা করার তাড়াতাড়ি করো!” এই বলেই গবা তার তাবিজটা খুলে তার মায়ের হাতে দিয়ে দেয়। গবা বা মঙ্গলী কেউ লক্ষ করে না, ঘর ছেড়ে বেরাতেই বুড়ির মুখে এক ক্রূর হাসি খেলে যায়।
মায়ের থেকে তাবিজটা নিয়ে সেটা গলায় গলিয়ে এবারে গবা বেরায় তার কাজে। এইদিকে বুড়ি সুযোগ বুঝে চলে যায় বা বলা ভালো শূন্যে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যায় কাছের একটা পুকুরে। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তার হাতে ধরা তাবিজটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় পুকুরের জলে। তারপর এক ভীষণ অট্টহাসি হাসতে হাসতে বাতাসে মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন