ষষ্ঠ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

এখানে শ্রীপতিবাবুর পরিচয়টা দিয়ে রাখি।

এই বাউডিহি এখন একটি ছোটো গ্রাম হলেও বহু বছর আগে বাউডিহি, তার পাশের চন্দডিহি, চাঁদডুবি এবং আরও তিন-চারটে ছোটো ছোটো গ্রামের ভূস্বামী ছিলেন ভূপতি রায় চৌধুরী। তখন এই গ্রামগুলো মিলে একটা বড়ো এলাকা ছিল।

ভূপতির তিন ছেলে ছিল। ছোটো ছেলে ৭ বছর বয়সে কোনো এক অজানা রোগে ভুগে অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। দুবছর পর সে মারা যায়। ভূপতি তার ছেলে বিয়োগের শোক সামলাতে পারেননি কোনোদিন। তিনিও ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার সমস্ত দায়িত্ব ও জমি-জায়গা ভাগ করে যান তার বড়ো ছেলে ও মেজ ছেলেকে।

কৃষ্ণপতি রায় চৌধুরী হলেন তার মেজ ছেলে। তার ভাগেই পড়েছিল এই বাউডিহি, চন্দডিহি ও চাঁদডুবি গ্রাম। এই কৃষ্ণপতির ছিল দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। মেয়ের নাম সীমন্তি, বড়ো ছেলে নৃপতি আর ছোটো ছেলে হলেন এই শ্রীপতি। ছোটো থেকেই ভীষণ অবাধ্য ছিলেন শ্রীপতি। নিজে যা ঠিক মনে করতেন তাই করতেন। খুবই বেপরোয়া যাকে বলে। অন্যদিকে নৃপতি আর সীমন্তি ছিল বাবা-মায়ের একদম বাধ্য সন্তান। পড়াশোনাতে নৃপতি ছিলেন অসামান্য। সীমন্তিও বাবার মতো দায়িত্বশীল আর মায়ের মমতাময়ী গুণ পেয়েছিল। খুব বড়ো এবং ভালো ঘরে তার বিয়েও হয়ে যায়। নৃপতিও প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বাবার জমিদারির ভার নেয়। এই রায়চৌধুরী বংশ তাদের দান ধ্যানের জন্য আশেপাশের গ্রামে খুবই পরিচিত।

কৃষ্ণপতিকে গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ ভগবানের চোখে দেখত। নৃপতিও বাবার গুণ পাওয়ায় গ্রামের প্রত্যেকটা লোক তাকে যেমনি শ্রদ্ধা করে তেমনি খুব ভালোও বাসে। কোনোরকম অহং বোধ তার মধ্যে এতটুকু নেই। তিনি গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষের বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ান। কোনোরকমের অত্যাচার তো দূরে থাক, গ্রামের কোনো মানুষ কোনোরকম বিপদে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে লোক পাঠিয়ে তার বিপদ নিরাময় করতেন। তাদের সময় কোনো মেয়ে বউয়ের সম্মানহানিও হয়নি। তাদের কোনোরকম বদ নেশা ছিল না। সারাদিন শুধু কাজ নিয়ে থাকতেই তারা ভালোবাসতেন।

কিন্তু এর সম্পূর্ণ উলটো প্রকৃতির মানুষ হল এই শ্রীপতি। জমিদারিতে তার কোনোদিনই খুব একটা নজর ছিল না। তিনি মেতে থাকতেন জুয়া, মদ, গাজায়। খুব কম বয়সেই তিনি নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন। প্রথম প্রথম অনেক বারণ করা হয় তাকে কিন্তু তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। নৃপতি তার ছোটো ভাইকে ভীষণ ভালোবাসতেন। তিনি মনে প্রাণে চেয়েছিলেন যে তার ভাই সুস্থ পথে ফিরে আসুক। নৃপতি এও বলে যে শ্রীপতি যদি ঠিক পথে ফিরে এসে জমিদারির ভার নেয় তাহলে সে তার ভূস্বত্বের অধিকাংশটাই তার নামে লিখে দেবেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। শ্রীপতির কোনোদিনই সম্পত্তির প্রতি লোভ ছিল না। তার শুধু একটাই দোষ এই নেশার আসক্তি।

পরবর্তীকালে পরিবর্তন তো দূরে থাক একটা সময় তিনি লুকিয়ে আনন্দ ফূর্তি করার জন্য নটীবাড়ি যাওয়াও শুরু করেন। কিন্তু খুব বেশিদিন তার কপালে এই সুখ সইল না। নৃপতি বাবুর কাছে শ্রীপতির লুকিয়ে লুকিয়ে নটীবাড়ি যাওয়ার খবর চলে আসে। আর তারপরেই তার ক্রোধের বাঁধ ভাঙে। তিনি নৃপতিকে মহল থেকে বার করে দেন। তার মন না চাইলেও শ্রীপতিকে শিক্ষা দিতে তাকে এটা করতেই হয়। কিন্তু ভেতর ভেতর তিনি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। তার স্ত্রী সমস্তটা বুঝতে পেরে স্বামীকে বোঝান। তার পরামর্শতেই পাশের গ্রাম বাউডিহিতে শ্রীপতির জন্য একটা একতলা বাড়ি তৈরি করা হয়। তাকে বলে দেওয়া হয় যে রাজবাড়ির সাথে আর কোনোরকমের সম্পর্ক তার থাকবে না। সে গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষের মতোই সাধারণের মতো জীবনযাপন করবে, খেটে খাবে। কোনোরকম সাহায্য রাজবাড়ি থেকে দেওয়া হবে না। সেইদিন থেকেই নৃপতি আর শ্রীপতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যান। শ্রীপতি নিজের ভুল মনে মনে অনুভব করলেও বাইরে তা প্রকাশ করেন না। তিনি চুপচাপ রাজবাড়ি ছেড়ে বাউডিহিতে এসে বসবাস শুরু করেন। সাধারণের মতোই জীবনযাপন করতে থাকেন। সেই ঘটনার পর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। এখন নৃপতির বড়ো ছেলে রমাপতি সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে নিয়েছে। নৃপতিও তার সমস্ত দায়িত্ব বড়ো ছেলেকে দিয়ে নিশ্চিন্তে তার স্ত্রীর সাথে বার্ধক্যকাল অতিবাহিত করছেন। ছোটো ছেলে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় থাকে। দু-তিন মাসে একবার সে এই গ্রামে আসে। আর এক ছেলে ছোটো অবস্থাতেই কোনো এক অজানা জ্বরে ভুগে মারা গিয়েছিল।

এতটা সময় কেটে গেলেও নৃপতি বা শ্রীপতির মধ্যে কিন্তু আজও সেই অভিমানের পরিমাণ এতটুকুও কমেনি। বরং সময়ের সাথে তা বেড়েই গেছে। গ্রামের মানুষের কাছেও শ্রীপতি একজন সাধারণ মানুষের মতোই হয়ে গেছে। তার গায়েও যে রাজবাড়ির রক্ত বইছে তা একপ্রকার সকলে ভুলেই গেছে। তবে গ্রামের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ খুব অদ্ভুতভাবে শ্রীপতিবাবুর ওপরই নির্ভর করে।

শ্রীপতি সবার সাথে মেশেন না। তার বন্ধু সংখ্যা ওই ৫-৬ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের বলতে হারান, নগেন, মহেন আর প্রকাশ এই চারজনই মাত্র। যাই হোক এবারে গল্পে আসা যাক।

রাত্রি ৯টার মধ্যেই সকলে খেয়ে যে যার বরাদ্দ ঘরে চলে গেল ঘুমানোর জন্য। পরেরদিন ভোরের আলো ফুটলেই পাশের গ্রামে যেতে হবে তারক গুনিনের কাছে। তা ছাড়া রাত্রি গভীর হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়াই শ্রেয়, এই মনে করেই সকলে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখ বুজে থাকলেও সকলের মনে মনে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনায়মান। না জানি আজ আবার কার প্রাণ যায়। হারান, নগেন এক ঘরে একসাথে আর মহেন, প্রকাশ আর এক ঘরে একসাথে শুয়েছে। রামু আজ বৈঠকখানাতেই নিজের বিছানা বানিয়ে নিয়েছে।

প্রায় অনেকটা সময় কেটে গেছে মহেন ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্ধকারে তার তীব্র নাসিকাগর্জন সেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্নতার জানান দিচ্ছে। কিন্তু প্রকাশের চোখে কোনো ঘুম নেই। কী যেন একটা তাকে তীব্র দংশনে বিদ্ধ করে যাচ্ছে ক্রমাগত। সেই প্রথম দিন থেকেই তার মন বলছে ঠাকুরমশাই এরকম ঘৃণ্য কাজ করতেই পারেন না। তিনি খুবই পবিত্র মনের একটা মানুষ ছিলেন। আর কেউ না জানুক প্রকাশ জানে এবং মনে মনে তাকে বিশ্বাসও করে। কিন্তু তাহলে সেদিন, যেদিন সকলে তার বিরুদ্ধে কথা বলছিল, অপমানে লাঞ্চনায় জর্জরিত করে দিচ্ছিল, পাঞ্চালী সমানে এসে তার কাছে কাকুতিমিনতি করছিল তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য, কই সেইদিন তো প্রকাশ কিছু বলতে পারল না। কোনো প্রতিবাদ করল না। আর পাঁচ জনের মতো তো সেও সেদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠাকুরমশাইয়ের অপমানই সহ্য করেছিল। ঠাকুরমশাইয়ের আত্মহত্যার পর পাঞ্চালীর সেই তীব্র ক্রোধান্বিত চক্ষু দেখে শিউরে উঠেছিল প্রকাশের অন্তরাত্মা। সেই চোখ আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে প্রকাশকে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই মুখাবয়ব, সেই চোখ!

প্রকাশ এবারে শুয়ে থাকতে না পেরে উঠে পড়ে। তার ভীষণ অস্বস্তি হতে শুরু করেছে। এত ঘাম হচ্ছে কেন? আর নিঃশ্বাস নিতেও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে আসা চাঁদের নামমাত্র আলোয় হাতড়ে হাতড়ে কলসি থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলে সে। কিন্তু তাতেও তার অস্বস্তি কমতে চায় না। এবারে হঠাৎই তার মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। এই ঘন নিঃশব্দতার মাঝে তার হৃৎপিণ্ডের তীব্র ধুকপুকানির আওয়াজ যেন কানে খুব বাজতে শুরু করেছে। সর্বনাশ তবে কি রামু তার খাবারে কিছু মিশিয়ে দিল? প্রকাশ এবারে গলগল করে ঘামতে শুরু করে। নাহ এক্ষুনি একবার বাইরে গিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে না পারলে সে এখানেই দমবন্ধ হয়ে মারা পড়বে। প্রকাশ হন্তদন্ত হয়ে বাইরের দরজার দিকে ছুটে যায়। এতকিছুর মধ্যে তার বাউডিহিতে ঘটে চলা নৃশংস হত্যালীলার কথা মাথাতেই থাকে না। এইদিকে প্রকাশকে বাইরের দরজার দিকে ছুটে যেতে দেখে অন্ধকারে মিশে থাকা একটা আবছা অবয়বও তার পিছু নেয়। প্রকাশ প্রধান দরজার কাছে এসে দরজাটা খুলতেই যায় কিন্তু তার আগেই সে বুঝতে পারে যে বাড়ির সদর দরজা খোলা। সে বুঝতে পারে ইচ্ছে করেই পুরো পরিকল্পনামাফিক এইসব করা হচ্ছে। এর মানে তার অনুমানই সঠিক। পাঞ্চালীর উধাও হয়ে যাওয়ার পিছনে এদেরই হাত আছে। শ্রীপতির সাথে হয়তো রামুও সমস্ত কিছু জানে। ওরা নির্ঘাত প্রকাশের খাবারে কিছু মিশিয়ে দিয়েছে আর ইচ্ছে করেই সদর দরজা খুলে রেখেছে যাতে রাতে শ্বাস নিতে না পেরে আমি বাইরে চলে যাই আর বাইরে যাওয়া মানেই তো সেই... আর কিছু ভাবতে পারে না প্রকাশ, তার আগেই কেউ পিছন থেকে এক ধাক্কা মেরে তাকে বাইরে ফেলে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় টাল সামলাতে না পেরে ওখানেই মাথা ঘুরে পড়ে যায় সে। তার মাঝেই দুটো শব্দ তার কানে আসে। একটা দরজায় হুড়কো লাগানোর শব্দ আর বহু দূর থেকে আগত একটা শিসের মতো শব্দ। যে শব্দের আগমনে বাউডিহির প্রত্যেকটা মানুষ কেঁপে ওঠে। প্রকাশ ধীরে ধীরে চোখ বোজে। তার উঠে দাঁড়ানোর কোনো ক্ষমতা থাকে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল বেরিয়ে এসে মাটির খানিকটা অংশ ভিজিয়ে দেয়। আর একটা নৃশংস মৃত্যুর কথা কাল সকলের মুখে মুখে ঘুরবে। হয়তো রমা আর প্রকাশের মা ছুটে এসে তার ছেলের বীভৎস মৃতদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়বে। সবাই মিলে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করবে। তার কিছুদিন পর সবাই সব ভুলে গিয়ে অসহায়ের মতো অপেক্ষা করবে সেই বিভীষিকার। নতুন কোনো মৃত ব্যক্তির বাড়ির লোকেদের হাহাকারে মিলিয়ে যাবে প্রকাশের স্ত্রী আর মায়ের কান্না। সবাই হয়তো প্রাণের তাগিদে এই গ্রাম ছাড়বে একে একে। শুধু বাউডিহি শ্মশানে পড়ে থাকবে প্রকাশ আর তার সাথে মারা যাওয়া মানুষের পোড়া ছাই। বাউডিহির বাতাসে ঘুরে বেড়াবে মৃতদের আর্ত কান্না। শুধু কেউ এটা জানবে না কত বড়ো অন্যায় ঘটে গেছে এই গ্রামেরই মাটিতে। যাকে সবাই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে সেই এই কর্মের জন্য দায়ী। কেউ জানবে না পাঞ্চালীর সাথে কী হয়েছিল। কেউ জানবে না!

সব কিছু অন্ধকার হওয়ার আগে প্রকাশ মনে মনে ঈশ্বরকে একবার স্মরণ করে, হয়তো শেষ ইচ্ছা ভগবানকে জানায়, হয়তো পাঞ্চালীর প্রতি হওয়া অন্যায়ের ন্যায় বিচার চায়। হঠাৎ প্রকাশ তার গলা আর মাথার কাছে এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে। একটা তীব্র আর্তনাদ আর তারপর সব অন্ধকার, সব নিশ্চুপ। পুনরায় বাউডিহি নির্জনতার গহন অন্ধকারে তলিয়ে যায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%