নেহা কর্মকার
অনেকক্ষণ ধরে সুরটা কানে আসছিল বীরেনের। অনেক দূরে বলেই হয়তো খুব মিহি আর আস্তে। কিন্তু তাও এই পৈশাচিক সুর বীরেন বিলক্ষণ চেনে, তাই মটকা মেরে বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল সে। এরকম সুর বীরেন এর আগে দুবার শুনেছে। যে রাতে সে এই সুর শুনেছে তার পরেরদিন গ্রাম থেকে ওই ভয়ানক দেহ দুটো উদ্ধার হয়েছে। এই সুর যে অশুভ তা বীরেন অনেক আগে থেকেই বুঝেছিল। অনেকবার সে এই সুর গভীর রাতে স্টেশনের আশেপাশেও শুনেছে। যতবারই সে শুনেছে ততবারই দেখতে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হয়েছে কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য টানে তার সাহস হয়ে ওঠেনি। ছোটোবেলা থেকেই বড্ড ভীতু বীরেন। স্কুলের প্রত্যেকটা ছেলে বীরেনকে রাগাত এই নিয়ে। কিন্তু বীরেন খুব একটা পাত্তা দিত না। সেই বীরেনের গভীর রাতে একা বেরানো তো দূরে থাক সামান্য ঠাকুমার মুখে ভূতেদের গল্প শুনলেই সারা রাত আর ঘুম হতো না। খালি চোখ চলে যেত জানলা দিয়ে বাইরে। মনে হতো কে যেন আছে, কে যেন ক্রমাগত দেখে চলেছে বীরেনকে যার অস্তিত্ব ভীষণই অশুভ। তাই রাতে আর বীরেনের সাহস হতো না বাড়ি ফেরার। স্টেশনেই থেকে যেত সে। বাউডিহি গ্রামের স্টেশনের একমাত্র স্টেশন মাস্টার এখন বীরেনই। মাস কয়েক আগে আগের যিনি স্টেশন মাস্টার ছিলেন তিনি রিটায়ার্ড হওয়ার পরেই বীরেন জয়েন করে। একটু বেশি বয়সে চাকরিটা হলেও সে খুশি ছিল। রাত্রিটা স্টেশনমাস্টারের জন্য বর্ধিত ঘরে কাটিয়ে পরের দিন সকালে বাড়ি যেত স্নান খাওয়াদাওয়া করার জন্য।
“আআআআ...!”
তীব্র কান ফাটানো আর্তনাদে বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসে বীরেন। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। পাশের টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে গ্লাসের সমস্ত জল শেষ করে দেয় বীরেন। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ নিঃশব্দে বসে থাকে সে। এই আর্তনাদকারীর গলা সে বিলক্ষণ চেনে। কিছুক্ষণ আগেই সে এই গলার মালিককে বারণ করেছিল এত রাতে বাড়ি না ফিরতে। তার সাথে থেকে যেতে। কিন্তু বিশ্বম্ভরের চিরাচরিত ডাকাবুকো স্বভাবে যাতে কোনো ঘুণ না ধরে তাই জেদ করেই এত রাতে রওনা দিলেন গ্রামের দিকে। কী জানি কাল সকালে আবার একটা বীভৎস মৃতদেহ দেখতে হবে কিনা। হঠাৎ বীরেনের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। ওই সুর! আবার সেই পৈশাচিক সুর, এবারে যেন অনেকটা কাছে, স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে এখন।
“আহঃ!” মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে বীরেন। তার মাথার শিরাগুলো ফুলতে শুরু করেছে, যে-কোনো মুহূর্তে যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে বীরেনের, সমস্ত কিছু অন্ধকার হতে শুরু করে। তারপর সব নিশ্চুপ। পুনরায় নিস্তব্ধতায় ডুবে যায় বাউডিহি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন