নেহা কর্মকার
রাতের ঘন কালো অন্ধকার আরও গভীর থেকে গভীরতায় মিশে গেল। চারপাশটা এতটাই নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে যে একটা পিন পড়লেও তার শব্দ কানে তীক্ষ্ণভাবে এসে ঠেকবে। রাতচরা পাখিরা আজ অনেকদিন হল এই গ্রামের ঠিকানা ভুলেছে। জোনাকি, ঝিঁঝি পোকা কোনো কিছুরই অস্তিত্ব আর এখানে বাকি নেই।
সবাই ঘরে দোর দিয়ে বসে থাকলেও কারোর চোখে ঘুম নেই। অজানা আশঙ্কায় ভীত হয়ে আছে সবাই। এবারে সকলে শুনতে পেল বটতলার কাছ থেকে এক জলদগম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসছে। সকলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবারে শোয়ার তোড়জোড় শুরু করল।
প্রায় অনেকক্ষণ একনাগাড়ে মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে শুনতে সকলে এক গাঢ় ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল। শুধু জেগে রইল একজন! শ্রীপতি! তার চোখে কোনো ঘুম নেই। আজ রাতে কী হতে চলেছে সেই আশঙ্কায়। তার বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে। শুধুই কি সেই ভয় নাকি তার ভয়ের পিছনে আছে অন্য কোনো কারণ যা উনি ছাড়া কেউ জানেন না?
চারিপাশের পরিবেশ যেন ক্রমেই ভারী হয়ে উঠেছে। উফ দম নেওয়াও যেন দুষ্কর হয়ে উঠছে। আর শান্ত হয়ে বসে থাকতে না পেরে বিছানা থেকে উঠে জানলাটা খুলে দিলেন শ্রীপতি। তার চোখ চলে গেল দূরে সেই বটতলার দিকে। বিশাল বড়ো বটের মাথাটা এই অন্ধকারেও খানিকটা দেখা যাচ্ছে, হয়তো যজ্ঞের আগুনের কারণেই কিছুটা দৃশ্যমান হয়েছে। আর তাতেই শ্রীপতির মনের ভয়টা আরও গাঢ় হল। একবার যাব? যাওয়া কি ঠিক হবে? মনে মনে ভাবে শ্রীপতি।
কৌতূহল বড়ো বিষম জিনিস। খুব কম মানুষই এর থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে। শ্রীপতিও এই আওতার বাইরে পড়েন না। তাই তিনিও এই অন্ধকারেই দরজাটা খুব ধীরে ধীরে খুলে বাইরের দিকে পা বাড়ালেন। খুব সন্তর্পণে চারিদিকটা খেয়াল করে এসে পৌঁছালেন বটতলার অনেকটা কাছে। তারপরে অন্ধকারে নিজেকে মিশিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন আড়ালে। ওইদিকে গুনিন একমনে সাধনা করতে ব্যস্ত। হোমের বেদি থেকে পোড়ার চড়চড়ে অস্বস্তিকর আওয়াজটা এই নিস্তব্ধ পরিবেশে যেন তীব্রতর হয়ে শ্রীপতির কানে এসে বাজছে। চারিদিকে কেমন অন্ধকার পাক খাচ্ছে।
এর মাঝেই হঠাৎ কিঞ্চিৎ দূরে, অন্ধকারের মধ্যেই কিছু যেন একটা নড়েচড়ে উঠল। শ্রীপতি ভালো করে বোঝার জন্য নিজেকে আরও একটু অন্ধকারে মিশিয়ে দিয়ে সেইদিকে একভাবে চেয়ে রইলেন। কিন্তু এবারে তার শরীরে যেন কাঁটা দিয়ে উঠল। ওই জমাট অন্ধকারের মধ্যে থেকেই চারটে জ্বলজ্বলে জিনিস, না না চারটে... চারটে চোখ! যজ্ঞে বসে থাকা গুনিনের দিকেই নিবদ্ধ। চোখগুলো ভাটার মতো জ্বলছে!
গুনিন একমনে মন্ত্রোচ্চারণ করেই যাচ্ছে। তার পিছনে অনতিদূরে সেই ছায়ামূর্তি যেন হঠাৎ একটু নড়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে। শ্রীপতির কানের পাশ থেকে একটা গরম তরল ধীরে ধীরে বেয়ে নীচে নেমে গেল। তার ভয় লাগতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে সে এখান থেকে পালাতেও পারবে না। অন্ধকারের আড়াল ছেড়ে বেরোলেই সেই ছায়ামূর্তির চোখের সামনে চলে আসবে সে। তাই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে সে। এইদিকে সেই ছায়ামূর্তি এখন এসে দাঁড়িয়েছে গুনিনের সামনে। যজ্ঞের আগুনের আলোয় এখন তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কী অদ্ভুত! কোথায় সেই চার চোখ? কোথায় সেই অস্বাভাবিকতা? এ তো গবা! চমকে ওঠে শ্রীপতি। গবা এখন এখানে কী করছে? আর ও কি? এ কি সত্যি ওদের গ্রামের হাবাগোবা গবা? গবার চেহারায় এক আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তার সমস্ত সারল্যতা যেন হারিয়ে গেছে। বদলে সেখানে জায়গা করেছে এক আদিম হিঃস্রতা!
হঠাৎ গুনিনের চোখেমুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত অস্বস্তি। সে যজ্ঞ থামিয়ে হঠাৎ চোখ খুলল এবং খুলতেই সে চমকে কিছুটা পিছনে সরে গেল। গবার মুখে এবারে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। গুনিন ভয়ে ভয়ে তাকে বলল, “তু… তুই এখা... এখানে কী করছিস? বলেছিলাম না কাউকে...” কথা শেষ হওয়ার আগেই কোথায় যেন সেই সুর বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সেই সুর যেন মাথার সমস্ত শিরা উপশিরা ছিঁড়ে দিতে লাগল। গুনিন দুটো হাঁটুর মাঝে মাথা গুঁজে বসে থাকলেন। শ্রীপতিও বেশিক্ষণ এই সুর সহ্য করতে পারলেন না। ওই অন্ধকারেই তিনি চোখ বুজলেন। তিনি দেখতেও পেলেন না সামনের বটতলায় গবার শরীরটা ধীরে ধীরে ঘন কালো এক ছায়ামূর্তিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। গুনিনের দেহ থেকে এক হ্যাঁচকা টানে ধড় থেকে তার মুণ্ড আলাদা করে সেই রক্তে নিজের রক্তলালসা মেটাতে লাগল শয়তান রক্তপিশাচ! কামড়ে ছিঁড়ে নিতে লাগল শরীর থেকে দলা দলা মাংস! তীব্র আক্রোশে ছিন্নভিন্ন করে দিল পেটের কাছটা! সেখান থেকে বেরিয়ে আসা নাড়িভুঁড়ি গ্রোগাসে গিলতে লাগল সে। দেখে মনে হচ্ছে যেন কত জন্মের ক্ষুধা মেটাচ্ছে শয়তানটা!
নিজের রক্তলালসা মিটিয়ে সেই পিশাচ এবারে এক পৈশাচিক হাসিতে মেতে উঠল। তারপর গুণিনের ছিন্নভিন্ন প্রাণহীন দেহটাকে কোনো তুচ্ছ বস্তুর ন্যায় তুলে নিমেষের মধ্যে গ্রামের নদীর পারের কাছে চলে এল আর এক হ্যাঁচকা টানে একরাশ ঘৃণা নিয়ে দেহটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মাঝ নদীতে। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে সেই পিশাচ অদৃশ্য হয়ে গেল। এইদিকে নদীর স্রোতের টানে গুনিনের দেহ ভেসে চলে গেল দূর থেকে বহুদূরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন