ষোড়শ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

ভবেশ আর যগার কথা শুনে তখনই বীরেন উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গেল বটতলার দিকে। সাথে কমলা, ভবেশ আর যগা-ও। নীল, তীর্থ কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু যে গতরাতে তাদের প্রাণ বাঁচাল তাকে একবার দেখার লোভ সামলাতে পারল না তারা। তাই শরীর দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বটতলার দিকে এগিয়ে গেল দুজনে।

বীরেন বটতলায় এসে পৌঁছাতেই দেখল বেশ কয়েকজন লোক জায়গাটাকে আগেই ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা চাপা কোলাহল ভেসে আসছে সেইদিক থেকে।

ভীড় সরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে বীরেন। সামনের চাতালে বসা লোকটিকে দেখে যেন সে পাথর হয়ে যায় কয়েক মুহূর্তের জন্য। আর তারপরেই চিৎকার করে ডেকে ওঠে, “শিবু রে! শিবু! কোথায় চলে গিয়েছিলি ভাই আমার!”

এবারে সবাই চমকে ওঠে। বটতলায় এই মুহূর্তে যে সাধক বসে আছে সে শিবু? বীরেনের ভাই! এতক্ষণে কমলা, ভবেশ, যগা, নীল, তীর্থ সবাই এসে উপস্থিত হয়েছে বটতলায়। বীরেন ততক্ষণে মাটিতে বসে সমানে তার ভাইকে ডেকে চলেছে। কিন্তু যার উদ্দেশে এই ক্রন্দন ধ্বনি তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই, একভাবে পাথরের মতো বসে তিনি, ধ্যানমগ্ন।

এবারে নীল বলে ওঠে, “ইনিই কাল আমাদের বাঁচিয়েছেন। ইনি কাল না থাকলে সেই পিশাচ আমাকে আর তীর্থকে... উফ!” আর বলার সাহস পায় না নীল। হয়তো বিভীষিকাময় রাতটার কথা মনে পড়তেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে নীলের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। তীর্থ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সমস্ত ঘটনাটা তাদের জানায়। সবাই হতভম্ব হয়ে যায় এবং তৎক্ষণাৎ সকলে হাঁটু মুড়ে বসে কপালে প্রণাম ঠেকিয়ে বলতে থাকে, “বাবা আপনিই পারবেন আমাদের বাঁচাতে!” কেউ বলে, “আপনিই আমাদের শেষ আশা। আমাদের বাঁচান!” গ্রামের বয়স্ক লোকেরা একটু আবেগ প্রণোদিত স্বরে বলে, “ওরে শিবু রে! একবারটি চোখ মেলে তাকা! দেখ কী দশা হয়েছে আমাদের! শিবু, ও শিবু!”

এবারে হঠাৎ সবাই লক্ষ করল সাধকের শরীর যেন একটু কেঁপে উঠল। তার মুখে একটা হালকা হাসি! এইবারে সে চোখ মেলে তাকাল। তার চোখও কি সামান্য অশ্রুসিক্ত?

সে হাত তুলে সবাইকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “তোমরা কেউ কিছু চিন্তা কোরো না, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। এতগুলো বছর ধরে আমি সাধনা করেছি, নানা শক্তি লাভ করেছি। আশা করছি সেই সাধনা আমার বিফলে যাবে না। তোমরা এখন এস। আমি একা থাকতে চাই কিছুক্ষণ!”

সবাই তার কথা শুনে উদ্বিগ্ন মুখে যে যার কাজে ফিরে গেল। শুধু বটতলায় দাঁড়িয়ে রইল বীরেন, কমলা, নীল আর তীর্থ।

নীলই প্রথম বলা শুরু করল, “আপনাকে যে কী করে ধন্যবাদ জানাব! আপনি না থাকলে যে কী হতো আমাদের!”

নীলের কথা শেষ হতে না হতেই বীরেন বলে, “শিবু, তুই আমাকে একদম ভুলে গিয়েছিস বল!” বীরেনের আবেগঘন স্বরে এবারে শিবু হেসে ফেলে। “দাদা তোমার শিবু আর সেই ছোটো শিবু নেই গো! তোমার শিবু এখন শিবশঙ্কর তান্ত্রিক!”

“থাম তুই! যত বড়োই সাধক হয়ে যাস না কেন, তুই আমার ছোটো শিবু ছিলি আর তাই থাকবি! এবারে চল তো, ঘরে চল, কত বছর পর এলি!”

শিবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “না গো দাদা। সাধক মানুষদের গৃহস্থ্যের বাড়িতে যেতে নেই। তাতে গৃহস্থ্যের অকল্যাণ হয়। আমি এই বটতলায় ঠিক আছি!”

বীরেন শিবুর কোনো কথাই শোনে না। বাচ্চাদের মতো জেদ করতে থাকে। কমলা, নীল আর তীর্থ সবাই মিলেই অনুরোধ করল যাওয়ার জন্য। শেষে কোনো উপায় না দেখে শিবুও রাজি হয়ে গেল তার দাদার বাড়িতে যেতে কিন্তু একটাই শর্তে, খাওয়া নিয়ে বা থাকা নিয়ে কোনো জোড়াজুড়ি করা যাবে না।

**********

“তুই ঘরে বোস, আমি চট করে একবার স্টেশন থেকে ঘুরে আসি বুঝলি তো! কই গো কমলা খেতে দাও, আমি বেরাই!” বীরেন কথাগুলো বলেই নীলের দিকে তাকায়, আবার বলে, “ইস দাদাবাবু তোমাদের চোখমুখের কী অবস্থা হয়েছে! তোমরা বরং একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও! কাল রাতে তো ঠিক করে ঘুম হয়নি তোমাদের!”

বীরেনের কথা শেষ হতেই তীর্থ বলে ওঠে, “আরে সে হবে খন। আগে বউদির হাতে একটু কড়া করে চা খাই। আর তা ছাড়া এখন চিন্তা কীসের? এখন উনি এসেই গেছেন!”

নীল একেবারে অবাক হয়ে যায় আর বলে, “বাবা তুই আবার এত এক্সাইটেড হচ্ছিস যে! তোর তো এইসব ভূতপ্রেত, তন্ত্র মন্ত্র কোনোকিছুতেই তো বিশ্বাস ছিল না!”

নীলের কথা শুনে তীর্থ মুচকি হাসে।

এরমধ্যেই কমলা কড়া করে সবার জন্য চা নিয়ে আসে আর শিবেনের কথামতো তার জন্য এক বাটি মুড়ি।

বীরেন তা দেখে বলে, “তুই শুধু মুড়ি খাবি? আর কিছু খাবি না!”

শিবেন হালকা হেসে মুড়ির বাটিটা তুলে খেতে শুরু করে। নীল, তীর্থও তাদের চা নিয়ে নেয়।

বীরেনও খেতে চলে যায়, তাকে বেরোতে হবে এক্ষুনি!

শিবেন একমনে কী যেন একটা ভাবছিল, হঠাৎ নীলের ডাকে সংবিৎ ফেরে তার।

“শিবুদা আমায় চিনতে পারছ?”

শিবেন একটু অবাক হয়। নীল বুঝতে পেরে বলে, “আমি তোমাদের পাশের গ্রামের চৌধুরি বাড়ির ছেলে! আমার মায়ের নাম বিজয়া!”

এবারে শিবু চিনতে পারে। আসলে বীরেন আর শিবেনের মা যখন ওদের বাড়িতে কাজে যেত তখন শিবেন খুবই ছোটো আর নীল তো সবে চোখ খুলে হাসতে শিখেছিল তখন। তাই কারোর পক্ষেই একে অপরকে মনে রাখা সম্ভব ছিল না। অনেকদিন পর পুরোনো দিনের সমস্ত কথা মনে পড়ে বেশ একটা স্বস্তি হচ্ছিল শিবেনের মনে।

খেয়ে নিয়ে বীরেন হাত ধুয়ে গামছা রাখতে রাখতে বলে, “কী গো দাদাবাবুরা, তোমরা বাড়ি যাবে তো? এখন তো আর রাত নেই। কোনো অসুবিধা হবে না। চলো আমার সাথে একসাথে বেরিয়ে যাবে!”

বীরেনের কথা শুনেই তীর্থের মুখ ভেটকে যায়। সেই দেখে নীল মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। বীরেন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে, “দেখো দাদাবাবু অন্যসময় হলে বলতাম না, কিন্তু এখন যা অবস্থা, আমি চাই না তোমাদের বড়ো কোনো ক্ষতি হোক। এই কয়েকদিনেই আমরা অনেকজনকে হারিয়েছি। মুনিয়াকেও ওর মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি এইসবের কারণে! তোমরাও থেকো না এখানে, চলে যাও!”

তীর্থ কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তার কথার মাঝেই গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে শিবেন, “এখন ওরা কোথাও যেতে পারবে না! ওই পিশাচের নজর পড়েছে তীর্থের ওপর। যতক্ষণ না ওর কার্যসিদ্ধি হচ্ছে ততক্ষণ ও কোনো না কোনো ভাবে ওদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে!” শিবেনের কথা শুনে বীরেনের চোখ কপালে ওঠে। “কী বলছিস রে শিবু! না না তুই যেভাবে হোক ওদের বাঁচা। ওদের যেন কোনো ক্ষতি না হয় রে!”

শিবেন আশ্বস্ত স্বরে তার দাদাকে বলে, “চিন্তা করিস না। আমি আছি। তুই কাজে যা। ফিরে এসে কথা হবে!”

বীরেন উদ্বিগ্ন হয়ে কাজে বেরিয়ে যায়।

কমলা এসে ওরা কিছু খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে।

শিবেন বলে ওঠে, “না গো বউদি এখন আর কিছু খাব না। আমাকে একবার আমাদের ওই পুরোনো পুকুর পাড়ে যেতে হবে!” এই বলে উঠে দাঁড়ায় সে। পুটলিটা কাঁধে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। কমলা আর কিছু বলে না। রান্নাঘরে নিজের কাজ করতে চলে যায়। তীর্থ নীলকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে, “ওখানে উনি কী করবেন?”

নীলও খুব ধীরে ধীরে জবাব দেয়, “সাধনা!”

শিবেন কিছুটা গিয়েই থমকে দাঁড়ায়। কী যেন সে দেখতে পেয়েছে। পিছন ঘুরে নীল আর তীর্থ-র দিকে তাকায় একবার। ইশারা বুঝতে অসুবিধা হয় না তাদের। তারাও ছুটে এসে শিবেনের সাথে পুরোনো পুকুর ঘাটের দিকে যেতে শুরু করে।

**********

“আচ্ছা পুকুরে গিয়ে কী করবেন?” কথাটা জিজ্ঞেস করে নীল, অবশ্যই শিবেনকে উদ্দেশ করে।

শিবেন প্রত্যুত্তরে বলে, “রুদ্রপঞ্চঅঙ্গং সাধনা করতে হবে!”

“কী কী... রু… রুদ্র… কী সাধনা!” তীর্থ তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করে শিবেনকে।

শিবেন হালকা হাসে, “তোমাদের এইসব বুঝে কাজ নেই। তোমাদের খালি আমায় শুধু একটু সাহায্য করতে হবে তাই তোমাদের নিয়ে যাওয়া!”

নীল আর তীর্থ কিছু বলে না। চুপচাপ হাঁটতে থাকে একসাথে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তারা পৌঁছে যায় পুকুর পাড়ে।

“আচ্ছা এই সাধনা এখন করার মানে কী? না মানে আমি তো শুনেছি যে-কোনো ধরনের সাধনাই রাতের বেলায় হয়ে থাকে!” প্রশ্নটা করে নীল।

“আগে আমাকে জানতে হবে এই পিশাচের হঠাৎ আগমন কী কারণে? কী কারণে এতগুলো মৃত্যু ঘটছে? এ কি কোনো মানুষের আত্মা যে মৃত্যুর সময় কোনো দোষ পেয়ে পিশাচে পরিণত হয়েছে? নাকি কেউ ইচ্ছে করেই এই পিশাচকে ডেকে এনেছে বাউডিহির মানুষের ক্ষতি করতে, যদি তা হয়েই থাকে তবে কে করল আর কেনই বা করল? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্যই এই সাধনা করা। রোগের কারণই যদি না খুঁজে পাই তাহলে আর রোগের চিকিৎসা করব কীভাবে তাই না?” একটানা কথাগুলো বলে থামে শিবেন। সামনে পুকুর ঘাট দেখতে পায় তারা। পুকুরটা বেশ প্রশস্ত আর আকৃতিটা খানিকটা বর্গক্ষেত্রের মতো।

পুকুরের দিকে এগিয়ে গিয়ে শিবেন তার ঝোলা থেকে চারটে ছোটো ছোটো ত্রিশূল বের করে আনে আর তারপর নীল আর তীর্থকে ইশারায় কাছে ডাকে। ওরা কাছে আসতেই শিবেন ওদের হাতে দুটো করে ত্রিশূল দিয়ে দেন আর বর্গক্ষেত্র বিশিষ্ট পুকুরের চারকোণায় সেইগুলো ভালো করে পুঁতে দিতে বলেন।

শিবেনের কথামতো নীল আর তীর্থ খুব সন্তর্পণে পুকুরের ধার বরাবর গিয়ে চারকোণায় একটা করে ত্রিশূল পুঁতে দেয়। তারপর ওরা ফিরে এলে শিবেন ওদের একটু দূরে গিয়ে বসতে বলে, ওরাও শিবেনের কথা শুনে কিছুটা দূরে সরে যায়। কিছুটা দূরে একটা পাথরের ঢিবির ওপর গিয়ে ধপ করে বসে পরে তীর্থ। নীল গিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে তার একরাশ উদ্বিগ্নতা।

অন্যদিকে শিবেন তার ঝোলা থেকে আর একটা বড়ো মতো ত্রিশূল বের করে আনে। তারপর সেটাকে নিয়ে পুকুরের মাঝ বরাবর সোজা পুঁতে দিয়ে তার সামনে পদ্মাসনে উপবিষ্ট হয়। নীল আর তীর্থ ওই দূর থেকেই একটা গম্ভীর গলায় মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে পায়।

ওঁ নমঃ ভগবতে বাসুদেবায় ওঁ নমঃ...

ওঁ নমঃ ভগবতে বাসুদেবায় ওঁ নমঃ...

এরপরে সেরকম আর মন্ত্রোচ্চারণ নীল বা তীর্থ শুনতে পায় না। বিড়বিড় করে কীসব যেন বলতে থাকে শিবেন। এইভাবে প্রায় আধঘণ্টা কেটে যায়। একটা অস্বস্তি হতে থাকে শিবেনের যা তার মুখের অভিব্যক্তিতেই স্পষ্ট। ব্যাপারটা যে কী ঘটছে তা কিছুই মগজস্থ হয় না নীল আর তীর্থের। তারা শিবেনকে অমন চিন্তিত দেখে এগিয়ে যায় তার দিকে। শিবেন ওদেরকে দেখে বলে, “এই পুকুরে নিশ্চয়ই কোনো অপকর্ম হয়েছিল!”

নীল হতভম্ব হয়ে যায় তার কথা শুনে। শিবেন আবার বলে, “যদি তা নাই হতো এতক্ষণ ধরে সাধনা করার পরেও কেন আমি সিদ্ধিলাভ করতে পারছি না? সাধনা যে সঠিক পথে এগোচ্ছে তার ইঙ্গিত পর্যন্ত পাচ্ছি না! কিছু না কিছু একটা অপবিত্র কর্ম এই পুকুরের সাথে জড়িত আছেই!”

নীল বা তীর্থ এই বিষয়ে কোনো সাহায্যই শিবেনকে করতে পারে না।

শিবেন ওদেরকে আবার তাদের জায়গায় ফিরে যেতে বলে সাধনায় বসে। কীসের একটা মিশ্রণ বার করে ছুঁড়ে ফেলে পুকুরে। তারপর নিঃশব্দে মন্ত্র আওড়াতে শুরু করে। হঠাৎ পুকুরের জলের মধ্যে যেন একটা আলোড়ন শুরু হয়। ফুটন্ত জলের মতো বুদবুদ উঠতে থাকে। শিবেনের ধারণাই ঠিক হয়। তার মুখের অভিব্যক্তি পুরোপুরি পালটে যায়। চোখের মণিগুলো দপদপ করে জ্বলতে থাকে।

সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে তার সামনে রাখা ত্রিশূলটা হাতে তুলে নেয়। পুকুরের প্রায় মাঝ হাঁটু বরাবর জলে নেমে শিবেন তার হাতের ত্রিশূলটা জলের ওপরে শুইয়ে দিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে কিন্তু ত্রিশূলটার ডুবে যাওয়া উচিত কিন্তু সেরকম কিছুই হয় না। অদ্ভুতভাবে ত্রিশূলটা কিন্তু জলের ওপর ভাসতে থাকে। এইবারে শিবেন এক হাঁটু জলে বাম পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়ালেন এবং ডান পা-টি মুড়ে ডান পায়ের গোড়ালিটি বাম পায়ের হাঁটুতে লাগিয়ে হাত দুটো মাথার ওপর সূর্য প্রণামের ভঙ্গিতে জোড় করলেন। ওই অবস্থাতেই তিনি নিঃশব্দে মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন। কিছুক্ষণ ওইভাবে চলার পর এইবারে একটা কালো কুচকুচে পোড়া হাত জলের বাইরে বেরিয়ে আসে। দেখে মনে হচ্ছে যেন সেটা আকুতি মিনতি করছে তাকে বাঁচানোর জন্য। শিবেনের কিন্তু সেইদিকে কোনো হুঁশ নেই। সে একমনে মন্ত্রোচ্চারণ করেই যাচ্ছে। এবারে শিবেন ওই অবস্থাতেই সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ত্রিশূলটা হাতে তুলে নেয় এবং সেটা দিয়েই জলে যেন কী একটা আঁকিবুকি কাটতে থাকে। সেটা সম্পন্ন হতেই একটা বীভৎস আর্ত চিৎকার শুনতে পায় শিবেন। নীল আর তীর্থ দূর থেকেই সেই আওয়াজ শুনে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। এ যেন এক তীব্র যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই হাত ধোঁয়ার মতো হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল। পুকুরের চারপাশের আবহাওয়া পোড়া বিশ্রী গন্ধে ভরে উঠেই মিলিয়ে গেল খানিকক্ষণের মধ্যেই। পুকুরের জলে এবারে তীব্র আন্দোলন শুরু হল। শিবেন তাড়াতাড়ি পাড়ে উঠে এসে ঝোলা থেকে হরিতকী, হোম যজ্ঞের ছাই, ধুনো ইত্যাদির সংমিশ্রণে তৈরী একটা মিশ্রণ বের করে হাতের মুঠোয় নিয়ে মুখের সামনে এনে মন্ত্র পড়ে ছুঁড়ে দিল সমস্ত পুকুরটায়। সাথে সাথে আন্দোলন থেমে যায় এবং একটা স্বর্গীয় মনোমুগ্ধকর সুগন্ধে ভরে ওঠে চারিপাশ। শিবেন বুঝল এতক্ষণে এই জলাশয় পাপমুক্ত হয়েছে। পুঁতে রাখা ত্রিশূলগুলো এই সমস্ত প্রক্রিয়া চলাকালীন কালো বর্ণ ধারণ করেছিল। এতক্ষণ পরে সেগুলো পুরোনো রঙে ফিরে আসে।

শিবেন এবারে তার হাতের ত্রিশূল পূর্ব জায়গায় রেখে তার সামনে বসে মন্ত্রোপাঠ শুরু করে তার অসমাপ্ত সাধনা শেষ করার উদ্দেশ্যে। ঘণ্টা দেড়েক এই একইভাবে মন্ত্রোপাঠ চলতে থাকে। অপরদিকে নীল, তীর্থ একেবারে অধৈর্য হয়ে পড়ে। একঘেয়ে বসে থাকতে তাদের আর ভালো লাগে না। ওদের কাছে এই দেড়ঘণ্টা একঘেয়ে বসে থাকা ভীষণই কষ্টকর কিন্তু সাধকদের কাছে এ তো কোনো ব্যাপারই না।

একটানা তিন ঘণ্টা ধরে সাধনা করার পর ধীরে ধীরে চোখ খোলে শিবেন। পুকুর পাড় থেকে তাকে উপরে উঠে আসতে দেখা যায়।

নীল আর তীর্থ তাকে উঠে আসতে দেখে সেইদিকেই ছুটে যাচ্ছিল কিন্তু শিবেন তাদের হাত দেখিয়ে মানা করে সেইদিকে আসতে। তারপর শিবেন হঠাৎ গিয়ে পাড়ে বসলেন এবং এমনভাবেই বসলেন যেন দেখে মনে হয় কী যেন একটা তিনি একমনে পুকুরে দেখে চলেছেন। কিছু একটা বোঝার চেষ্টায় সে রত। এইভাবে অনেকক্ষণ দেখার পরে শিবেন ঝোলা আর ত্রিশূলটা নিয়ে নিজেই নীল আর তীর্থের দিকে এগিয়ে এল। তাকে এগিয়ে আসতে দেখেই তীর্থ বলল, “উফ আপনি তো আমাদের অপেক্ষা করিয়ে করিয়ে মেরে ফেললেন। তা কিছু বুঝলেন? জানতে পারলেন কিছু?”

শিবেন বলে, “হুম অনেক কিছু জানলাম। চলো বাড়ি গিয়ে এইসব নিয়ে আলোচনা করা যাবেখন। তোমাদের নিশ্চয়ই এখন খুব খিদে পেয়েছে!”

“হ্যাঁ সেই ভালো বরং, পেটে ইঁদুররা সব দৌঁড়াতে শুরু করে দিয়েছে!” বলে তীর্থ।

“তবে তার আগে যে ত্রিশূল চারটে পুঁতলে সেইগুলো নিয়ে আসো, তারপর একসাথে বাড়ি যাব! আর হ্যাঁ আসার সময় ওইগুলো ভালো করে একটু ধুয়ে নেবে!”

শিবেনের কথা মতো নীল আর তীর্থ পুকুরের চারকোণায় পোঁতা ত্রিশূল চারটে ধুয়ে নিয়ে আসে। তারপর তারা একসাথে রওনা দেয় বাড়ির উদ্দেশে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%