নেহা কর্মকার
হন্তদন্ত করে বীরেনকে বাড়ি ফিরতে দেখে যেন ধড়ে প্রাণ ফেরে কমলার। সারা রাত সে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কোনোরকমে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু কোনোভাবেই কমলা ঘুমোতে পারেনি। গভীর রাতের ওই পৈশাচিক আওয়াজ শুনেই সে বুঝেছিল আবার সেই অশুভ কিছুর আগমন ঘটেছে, কোনো অনিষ্ট না করে সে যাবে না। সেই আওয়াজ কমলাদের উঠোনের কাছ পর্যন্ত এসেই খানিকক্ষণের জন্য থেমে যায়। ক্ষনিকের জন্য কমলা ভেবেছিল হয়তো সেই অশুভ প্রেত বিতাড়িত হয়েছে। কমলার মনের কোণে একটা কৌতূহল উঁকি দেয়। মন বলতে থাকে একবার বাইরে গিয়ে দেখি। কিন্তু পরক্ষণেই বীরেনের সাবধানবাণী মনে পড়ে যায়, “রাতে যাই হয়ে যাক কমলা, দরজা ঘুণাক্ষরেও খুলবে না, যদি আমিও এসে ডাকি তবে তাও না, মনে রাখবে রাতে যে আসে সে কোনো মানুষ না!” সঙ্গে সঙ্গে দরজার খিলের কাছ থেকে হাত সরিয়ে নেয় কমলা। হঠাৎ দরজার ওপাশে উঠোনের দিক থেকে একটা চাপা অট্টহাসি ভেসে আসে। মুহূর্তের জন্য কমলার সারা শরীর শিউরে ওঠে। ছুট্টে গিয়ে বিছানায় উঠে মেয়েকে জড়িয়ে কাঁপতে থাকে সে। ছোট্ট মেয়েটি মায়ের হঠাৎ এমন আচরণে প্রথমে হকচকিয়ে যায় তারপর কী যেন একটা বলতে যাবে ঠিক সেই সময় কমলা তার মুখ চেপে ধরে, ইশারায় বুঝিয়ে দেয় এখন কোনো কথা নয়।
বেশ কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সেই প্রেত আর তার অট্টহাসি মিলিয়ে এলে কমলা কিছুটা শান্ত হয়। বুকে জড়িয়ে রাখা তার মেয়ের দিকে চোখ যায় তার। কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আস্তে করে তাকে শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে পড়ে কমলা। কিন্তু ঘুম আর আসে না। চোখ বন্ধ করতে গেলেই সেই প্রেতের হাসি যেন তার কানের কাছে বেজে ওঠে। ভোরের আলো ফুটতেই কমলা ঘরের থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে কিছু নিয়ে একটা হইহট্টগোল বেঁধেছে। সবাই কিছু একটা আলোচনা করতে করতে মাঠের দিকে ছুটছে। কাল রাতে আবার নাকি কে মারা পড়েছে। কমলার বুকের ভেতরটা হাপরের মতো ওঠানামা করতে থাকে। ভোলার মা কমলাদের প্রতিবেশী। কমলাকে বাড়ির দাওয়ায় ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি আর মাঠের দিকে না গিয়ে কমলার কাছে আসেন।
“কী গো কমলা, এরকম পানসে মুখ নিয়ে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছো?”
ভোলার মাকে দেখেই কমলা বলল, “দিদি তুমি একটু মুনিয়ার কাছে থাকবে? আমি তাহলে একটু মাঠের দিকটায় দেখে আসতাম।”
“কেন গো, তুমি ওইদিকে যাবে কেন, তুমি কি...” চিন্তিত মুখে ভোলার মা জিজ্ঞেস করে।
“আসলে মুনিয়ার বাবা তো এখনও বাড়ি ফেরেনি তাই আর কি একটু দে… দেখে আস… আসতাম…”
কমলার কথা আটকে আটকে যায়। ভোলার মা বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করে। আসলে শুধু কমলা নয়, রাতে যেই বাইরে থাকে তাদের বাড়ির লোকেদের আজকাল এইরকম দুশ্চিন্তা নিয়েই রাত কাটাতে হয়। কী জানি এবারে সেই প্রেতের পরের শিকার তার বাড়ির লোকই হবে কিনা!
মুনিয়াকে ভোলার মায়ের কাছে রেখেই কমলা ছুট দেয় মাঠের দিকে। ভীড়ের মধ্যে কোনোদিকেই বীরেনকে সে দেখতে পায় না। কমলা এবারে সত্যিই ভয় পায়। ধীরে ধীরে ভীড় ঠেলে এগোতেই সেই বীভৎস লাশটার দিকে চোখ যায় কমলার, সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীর গুলিয়ে ওঠে তার। শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে। এবারের লাশের অবস্থা আগেরগুলোর চেয়েও আরও খারাপ আরও নৃশংস। সবাই তাই নিয়েই বলাবলি করছে। লাশের পেট চিড়ে কেউ নাড়িভুঁড়ি বার করে দিয়েছে। সারা শরীরের সমস্ত জায়গা থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়া। মুণ্ডটার মাথা থেকে ঘিলু বার করা। মুখটার একপাশ আধখাওয়া। সেখান থেকে রক্তে কিছুটা জায়গা লেপ্টে রয়েছে, শুধু শরীরে এক ফোঁটাও রক্ত নেই।
কমলা আর এইসব সহ্য করতে পারে না। ভীড়ের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাতাসে কিছুটা শ্বাস নিয়ে নেয়। তারপর টলমল পায়ে বাড়ি ফিরে এসেই চোখেমুখে জল দেয়। কমলাকে ওই অবস্থায় ফিরতে দেখেই ভোলার মা ছুটে যায় কমলার দিকে। তারপর তাকে ধরে ধরে এনে ঘরের দাওয়ায় বসিয়ে হাতপাখা দিয়ে মাথায় হাওয়া দিতে থাকে। কথায় কথায় কমলা ভোলার মাকে বলে যে ওটা বিশ্বম্ভরবাবুর লাশ, দুদিন আগে ওঁকে কমলা দেখেছিল ওই পাজামা-পাঞ্জাবি পরেই তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কমলার চিন্তা আরও বাড়তে থাকে যখন দুপুর হয়ে গেলেও বীরেন বাড়ি ফেরে না দেখে। অবশেষে বীরেনকে দূর থেকে আসতে দেখেই কমলার ধড়ে যেন প্রাণ আসে। বীরেন এলে এবারে ভোলার মা তার বাড়ির দিকে রওনা দেয়। কাল রাতের সমস্ত ঘটনা কমলা বীরেনকে সবিস্তারে জানায়। বীরেনের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে। কাল রাতে যে সেও ওই প্রেতের অস্তিত্ব টের পেয়েছে তা খুব সন্তর্পণে এড়িয়ে যায় বীরেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন