নেহা কর্মকার
“যাক গিয়ে রাত হচ্ছে তোমরা সবাই খেয়ে নাও!” বীরেন সবাইকে উদ্দেশ করে বলে কথাটা। শিবেন কিন্তু কিছু খায় না। সে কিছুক্ষণ একা থাকতে চায় বলে ঘরে গিয়ে দোর দেয়। সবাই ভাবে সে নিশ্চয়ই সেই পিশাচকে শেষ করার কোনো ফন্দি করছে। তাই এই সময় তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।
তাই নীল, তীর্থ, বীরেন একসাথে খেতে বসে যায়। এর মাঝে কখন যে শিবেন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় তা তারাও বুঝতেও পারে না।
কমলার থেকে রাকাদের বাড়ির ঠিকানা আগেই জোগাড় করে নিয়েছিল সে। খুব একটা বেশি দূরে নয়। এই রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোলেই ডানদিকে কিছুটা গেলেই একটা মাঠ। মাঠের শেষের বাড়িটাই রাকাদের। মহিলা একাই থাকে। স্বামী মারা গেছে অনেকদিন আগে। মেয়ে রাকারও বিয়ে হয়ে গেছে। মহিলা কোথায় দিনমজুরীর কাজ করে। কারোর সাথেই খুব একটা মেশেন না। ওই যা একটু কমলার সাথেই কথা হতো। কিন্তু গত কয়েক মাস যাবৎ তার আচার-আচরণ যেন পুরো বদলে গেছে। যেন আলাদা একটা মানুষ, শুধু তার মুখটাই রাকার মায়ের মতো। এখানেই শিবেনের সন্দেহ। রাতারাতি কোনো মানুষ এতটা বদলে যেতে পারে না। তার সন্দেহ যদি ঠিক হয় তাহলে ওই পিশাচের সাথে রাকার মায়ের কোনো সম্পর্ক নিশ্চয়ই আছে। আচ্ছা এমন নয় তো এই পিশাচ তার দেহ আশ্রয় করেই লুকিয়ে আছে? হয়তো আসল মানুষটা অনেক আগেই মারা গেছে! শিবেনের দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। এত বছর ধরে সে এত সাধনা করেছে। যে-কোনো ভূত পিশাচ তার হাতের তালুর মতো চেনা। কিন্তু সে তার সাধনা জীবনে এরকম কোনো পিশাচের অস্তিত্ব আছে বলে কোনোদিন জানতে পারেনি। ভারি আশ্চর্য এর ক্ষমতা আর তেমনই ধূর্ত, নাহলে এতদিন ধরে সে এখানে লুকিয়ে রয়েছে আর কেউ একবারও টের পায়নি। আজ যদি তীর্থ কথাটা না তুলত তাহলে তো তার মাথায়ও কথাটা আসত না।
ভাবতে ভাবতে শিবেন সেই বাড়ির সামনে এসে পড়ে। বাড়ির দশা দেখে শিবেন অবাক হয়ে যায়। এ তো পুরোই ভূতের বাড়ির দশা হয়েছে। পুরো বাড়িটাই অন্ধকারে ডুবে আছে। কয়েক মাস যে এই বাড়িতে কোনো মানুষের আনাগোনা হয়নি তা স্পষ্ট। এখানে সেই পিশাচের লুকিয়ে থাকা অসম্ভব নয়। শিবেন এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজায় ধাক্কা দেয়। একটু জোড়ে চাপ দিতেই দরজাটা ক্যাচ করে একটা বিদঘুটে আওয়াজ তুলেই খুলে যায়। ভ্যাপসা বাতাসে ঘিরে আছে ঘরের ভেতরের আবহাওয়া। ভেতরে কিন্তু অজাগতিক কিছুর থাকার অস্তিত্ব শিবেন টের পায় না। আরও কিছুক্ষণ ঘরের এদিক ওদিক ভালো করে লক্ষ করে বাইরে বেরিয়ে আসে শিবেন। দু পা এগোতেই এবারে তার পায়ের একদম সামনে ওপর থেকে কেউ যেন ভারী কিছু ছুঁড়ে ফেলে। প্রথমটায় কিছুটা চমকেই যায় শিবেন। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই চাঁদের আলোয় যতটা সম্ভব দেখার চেষ্টা করে। একটা মৃতদেহ, একটা মহিলার মৃতদেহ উপুড় হয়ে পড়ে আছে তার পায়ের সামনে। শিবেন হাঁটু মুড়ে বসে মহিলার মৃতদেহটা সামনের দিকে ঘোরায়। শিবেন রাকার মা-কে কখনও দেখেনি কিন্তু তার বুঝে নিতে কোনো অসুবিধা হয় না যে এই সেই মহিলা। এঁর মৃত্যু ছয় মাস আগেই হয়ে গেছে কিন্তু মৃতদেহতে কোনো পচন ধরেনি। সেটাই স্বাভাবিক। মৃতদেহ নষ্ট হয়ে গেলে সেই পিশাচ নিজেকে লুকিয়ে রাখবেই বা কোথায়? সে তো মনুষ্য সমাজে মানুষের শরীর আশ্রয় করেই লুকিয়ে ছিল এতদিন, তাহলেই তো মানুষের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল থাকতে পারবে।
এবারে একটা অদ্ভুত হাড় হিম করা জান্তব হাসির আওয়াজে পিছন ফিরে তাকায় শিবেন। মাটি থেকে কয়েক হাত উপরে ভেসে রয়েছে একপ্রস্ত অন্ধকারে মাখা সেই পিশাচ। তার বিকট হাসিতে তাচ্ছিল্যের সুর উপস্থিত। এবারে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে শিবেনের দিকে। কিন্তু শিবেনের দু হাত দূরত্বের মধ্যে এসেই সেই পিশাচ পাঁচ হাত দূরে ছিটকে যায়। ব্যাপারটায় যে সেই পিশাচ বেশ অবাক হয়েছে তা শিবেনের বুঝতে অসুবিধা হয় না। সে সাধনার মাধ্যমে যে সমস্ত শক্তি অর্জন করেছে এ তার মধ্যে অন্যতম। কোনো প্রেত পিশাচ সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাকে ছুঁতে পর্যন্ত পারবে না। এ ব্যাপারে যদিও সেই পিশাচ অবগত নয়। সে ক্রোধের আগুনে ফুটছে। হয়তো ক্ষমতা থাকলে সে এখনই শিবেনকে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলত। সে পুনরায় তার সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে আসতে থাকে কিন্তু এবারে শিবেনও প্রবল মন্ত্রোবলে তার ত্রিশূলটা সেইদিকে ছুঁড়ে মারেন। সেই ত্রিশূল থেকে এক আগুনের হলকা সৃষ্টি হয় এবং যে মুহূর্তে সেটা সেই পিশাচের গায়ে গিয়ে পড়ে সেই মুহূর্তে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করে তার কালো শরীর। বিকট আওয়াজে চিৎকার করে ওঠে সেই নরপিশাচ। কিন্তু শিবেন ভালো মতোই জানে এর মাধ্যমে কিছুদিনের জন্য এই পিশাচের শক্তিক্ষয় করা গেল কিন্তু এতে ওর বিনাশ নেই। যেটুকু সময় সে পেল তাতে আরও শক্তি সঞ্চয় করে সে ফিরে আসবে আর তার আগেই শিবেনকে এই পিশাচকে বিনাশ করার উপায় খুঁজে পেতেই হবে। এতে একমাত্র সাহায্য যে করতে পারে তা হল শিবেনের গুরুদেব, ভৈরব বাবা।
সেই পিশাচ শিবেনের শক্তির সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারল না। অচিরেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল। শিবেন মহিলাটির মৃতদেহটিকে নিয়ে উপস্থিত হলেন এই গ্রামের সীমানায় অবস্থিত নির্জন শ্মশানটায়। তারপর কিছু মন্ত্রোচ্চারণ করে শিবেন সেই মৃতদেহটাতে অগ্নিসংযোগ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল দেহটি।
**********
শ্মশানের এক নীরব স্থানে বসে একমনে ধ্যান করে যাচ্ছে শিবেন। সামনে তার হোম যজ্ঞের আগুন লকলকে শিখায় দুলছে। দূর থেকে শেয়াল ডাকার আওয়াজ ভেসে আসছে। মৃদু মৃদু ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। এই শ্মশানটা এতটাই নিস্তব্ধ যেন মনে হচ্ছে এ অন্য কোনো জগৎ।
বেশ কিছুক্ষণ একটানা গম্ভীর গলায় মন্ত্রোচ্চারণ করে এবারে থামে শিবেন। সামনের যজ্ঞের আগুনে একটা অদ্ভুত আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। কারোর অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাতে। তার উপস্থিতির আভাস পেয়েই এবারে চোখ খোলে শিবেন। হাত জড়ো করে ভক্তিভরে প্রণাম করে সে।
সেই অবয়ব থেকে এবারে দৃঢ় কন্ঠস্বর ভেসে আসে।
“বলো শিবশঙ্কর কী জানতে চাও? তোমার মন এত উতলা কেন?”
“গুরুদেব! আমি এক মহান সমস্যায় উপনীত হয়েছি, আমি কিছুতেই এই সমস্যা থেকে উদ্ধারের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি আমার সাধনা জীবনে এরকম কোনো ধূর্ত পিশাচের সম্মুখীন কখনও হয়নি। আমার কি সাধনা তবে অসম্পূর্ণ রয়ে গেল? কী এই পিশাচের উৎস? এর ক্ষমতাই বা কতদূর? আর কীভাবেই বা এর বিনাশ সম্ভব? কিছুই যে বুঝছি না গুরুদেব!”
সামনের অবয়বটি এবারে একটু হালকা হেসে ওঠে তারপর বলে, “শান্ত হও শিবশঙ্কর। মাথা ঠান্ডা করে সমস্তটা ভাবো, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তোমার চোখের সামনেই আছে। তবে আমি তোমায় একটা সাহায্য করতে পারি। তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি পাবে শক্তিগড়ে গেলেই!”
“শক্তিগড়!” অস্ফুটে উচ্চারণ করে শিবেন। “ধন্যবাদ গুরুদেব! আপনি আমায় আশীর্বাদ করুন যাতে এই নরপিশাচকে শেষ করে আপনার দেওয়া শিক্ষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি।”
অবয়বটি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে বলে, “সফল হও!”
এরপর সাথে সাথেই সেই অবয়ব অদৃশ্য হয় এবং আগের মতোই যজ্ঞের আগুন শান্ত হয়ে আসে।
এবারে শিবেন কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করে, ধীরে ধীরে পা বাড়ায় বাড়ির দিকে।
ওইদিকে ঘরের ভেতরে শিবেনকে না দেখে বীরেন সহ বাড়ির সকলকে দুশ্চিন্তা হ্রাস করে। কিছুক্ষণ উশখুশ করতে করতে বীরেন এবারে যখন বাইরের দিকে পা বাড়াতে যাবে ঠিক এমন সময় শিবেন বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে উপস্থিত হয়। তাকে দেখে ধরে প্রাণ আসে বীরেনের।
শিবেন কাছে এসে দাঁড়াতেই বীরেন সেই ছোটোবেলার মতো শিবেনকে শাসন করতে থাকে। দাদার কাণ্ড দেখে শিবেন হেসে ফেলে, “দাদা আমি আর তোর সেই ছোটো শিবু নই। এইসব প্রেত পিশাচ আমার ধারে কাছে ঘেঁষতে পর্যন্ত পারবে না!”
“সে তুই যত বড়োই হয়ে যাস না কেন, তাই বলে হুট করে বেরিয়ে যাবি? বাড়ির কাউকে তো কিছু বলে যাবি! আমাদের তো চিন্তা হয় নাকি? সেই ছোটোবেলার মতো একই রয়ে গেলি! একটুও বদলালি না!”
শিবেন আবার হেসে ফেলে।
নীল জিজ্ঞেস করে, “তা তুমি এতক্ষণ ছিলে কোথায়?”
শিবেন রাকার মায়ের বাড়িতে যাওয়া থেকে শুরু করে সমস্ত ঘটনাটা তাদের খুলে বলে। সমস্তটা শুনে কমলা হতবাক হয়ে যায়। এর মানে ও এতদিন যাকে দেখে এসেছে, যার সাথে কথা বলেছে সে আদতে রাকার মা ছিলই না? রাকার মায়ের আড়ালে সেই পিশাচ ছিল? কমলার সারা শরীর কেঁপে ওঠে।
তীর্থ জিজ্ঞেস করে, “এবার কী করণীয় আমাদের?”
শিবেন শান্ত হয়ে বলে, “আমাদের কালই শক্তিগড়ের দিকে রওনা দিতে হবে। এই পিশাচকে বিনাশ করার উপায় ওখানেই লুকিয়ে আছে!”
কমলা ভয়ে ভয়ে বলে, “আর তোমার না থাকার সুযোগে যদি সেই পিশাচ...”
শিবেন অভয় প্রদান করে বলে, “তা নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না। আমি আমার শক্তির দ্বারা কিছুদিনের জন্য ওই পিশাচকে রোধ করে রাখতে পারব! কিছুদিন ওই পিশাচ গা ঢাকা দিয়েই থাকবে!”
বীরেন কিছু একটা ভাবছিল। শিবেন তা দেখে জিজ্ঞেস করে, “দাদা কী ভাবছো? তুমি যাবে তো?”
বীরেন একটু ভেবে বলে, “শক্তিগড়! এই নামটা কোথায় যেন আমি শুনেছি! ইম... কিছুতেই মনে পড়ছে না! কোথায়... কোথায়... হ্যাঁ… হ্যাঁ... মনে পড়েছে। ঠাকুরমশাই... হ্যাঁ হ্যাঁ ঠাকুরমশাই তো শক্তিগড়েই থাকতেন! উনি নিজে আমাকে বলেছিলেন!”
শিবেন অবাক হয়ে যায়, “কী! যোগেন্দ্রনাথ?”
বীরেন নীরবে ওপরে নীচে মাথা দোলায়।
**********
ভোর হওয়ার সাথে সাথেই শিবেন তৈরি হয়ে নেয় শক্তিগড় যাওয়ার জন্য। বীরেন যেতে চেয়েছিল কিন্তু তাকে এক্ষুনি একবার স্টেশনে যেতে হবে। নীল আর তীর্থকে শিবেন সাথে নিতে চায়নি। কিন্তু তীর্থ এমন জোড়াজুড়ি শুরু করল যে শেষ অবধি রাজি হতেই হয় শিবেনকে। সকলে মিলে বাড়ি থেকে বেরোতে যাবে ঠিক তখনই বাড়ির এক নির্দিষ্ট দিকে শিবেনের নজর পড়ে। কিছু যেন ওখানে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করে উঠল। কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে শিবেন। একটা অদ্ভুত দেখতে ত্রিশূল। এই ত্রিশূল শিবেনের বিলক্ষণ চেনা। এর জন্যই সেই পিশাচ এই বাড়ির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেও ঢুকতে পারেনি। এই একইরকম ত্রিশূল তার কাছেও রয়েছে। এই ত্রিশূল তাকে দিয়েছিল তার গুরুদেব, ভৈরব বাবা। তবে কি ভৈরব বাবা যোগেন্দ্রকে চিনত? তবে গুরুদেব তাকে কিছু বলল না কেন?
সকাল সকাল রওনা হলেও বেশ কিছুক্ষণ লাগবে শক্তিগড়ে পৌঁছাতে। কিছুটা হেঁটে গিয়েই ভ্যানে উঠবে তারা।
“আচ্ছা আপনার এই সাধনা জীবনে আসাটা কীভাবে হল?” বেশ একটা কৌতূহল নিয়েই প্রশ্নটা করে তীর্থ।
শিবেন মাথা নীচু রেখেই হাঁটছিল। এবারে সে মুখ তোলে এবং বলে, “সে তো অনেক বছর আগের কথা। বাবা তো কবেই মরে গিয়েছিল আর তার কয়েক বছর পর মা-ও চলে গিয়েছিল। বাড়িতে মোটে মন টিকত না। সারাদিন শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়াতাম, সাধু সন্ন্যাসীদের সাথে সময় কাটাতাম। পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। এই নিয়ে বিস্তর ঝামেলা হতো দাদার সাথে। একদিন রাগের মাথায় আমাকে বাড়ি থেকে বার করে দিল। তখন কতই বা বয়স আমার, ১৮/১৯ হবে। আমিও রাগ দেখিয়ে সেদিনই গ্রাম ছাড়লাম। তারপর দীর্ঘদিন পথেঘাটে ঘুরে, এখানে ওখানে ছোটোখাটো কাজ করে দিন গুজরান করেছি। শেষ যে দোকানে কাজ করেছিলাম সেই দোকানের মালিক আমাকে একবার কাশী নিয়ে যায়। ওখানে আবার আমি সাধু সন্ন্যাসী, তাদের তন্ত্র সাধনা এইসবের প্রতি আকৃষ্ট হই। ব্যস তারপর যা হওয়ার তাই হল। সেই মালিকের হাত থেকে পালিয়ে আমিও সাধু সন্ন্যাসীদের ভীড়ে গিয়ে পড়লাম। আজ এই সন্ন্যাসী কাল সেই সন্ন্যাসী, সবার কাছ থেকে নানান তন্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করতে লাগলাম। কিন্তু আমি যেন কিছুতেই প্রসন্ন হতে পারছিলাম না। তাই পারি দিলাম আরও দূরে। আর তারপরেই খোঁজ পেলাম ভৈরব বাবার!”
নীল জিজ্ঞেস করল, “মানে আপনার গুরুদেব?”
শিবেন ওপরে নীচে মাথা দোলাল। “ওঁর হাত ধরেই আমি তন্ত্রবিদ্যার জগতে পদার্পণ করলাম। এখন তোমাদের সামনে যে শিবশঙ্করকে দেখছ, এই নামকরণ আমার গুরুদেবের শেখানো তন্ত্রবিদ্যার জোড়েই পাওয়া! মহাদেবের বিশেষ বরপ্রাপ্ত আমি, বুঝলে!”
নীল আর তীর্থ অবাক হয়ে তার সমস্ত কাহিনি শুনল। তীর্থ কিছু বলতেই যেত কিন্তু তার আগেই ভ্যান দেখতে পেয়ে শিবেন সেইদিকে ছুটে গেল। নীল আর তীর্থও শিবেনকে অনুসরণ করল।
ভ্যান এখন চলতে শুরু করেছে। তীর্থ আবার শিবেনকে প্রশ্ন করে, “আচ্ছা শক্তিগড় তো শুনেছি বেশ বড়ো গ্রাম। ওখানে গিয়ে আমরা কীভাবে সেই পিশাচকে শেষ করার উপায় খুঁজে পাব?”
“খোঁজা হয়তো কঠিন কিন্তু অসম্ভব তো নয়। আমাদের আগেই গ্রামে গিয়ে যোগেন্দ্রনাথের সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। আমার বিশ্বাস উনি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। আমার অনুমান যদি সঠিক হয় তাহলে এই পিশাচ যোগেন্দ্রনাথ আর পাঞ্চালীকে মারতেই এসেছিল। ওদেরকে অনুসরণ করেই সে বাউডিহি গ্রামে পৌঁছেছিল। যদি তাই হয় তাহলে আমাদের খুঁজে বার করতে হবে কে এই পিশাচকে আহ্বান করেছে! একমাত্র সেই পারবে এই পিশাচকে পুনরায় নরকে পাঠাতে!”
নীল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সে কি? তাহলে ওই প্রেত যদি যোগেন্দ্রনাথকেই মারতে আসত তাহলে সে তাকে কিছু না করে গ্রামের লোকগুলোকে মারছে কেন?”
শিবেন গম্ভীর স্বর বলল, “বললাম না, উনি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। উনি জন্মাবস্থাতেই ঈশ্বরের আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। হয়তো উনি বাউডিহিতে এসেছিলেন সাধনা করার জন্য। বাউডিহির কালভৈরবী মন্দির সংলগ্ন স্থানটি একটা আদর্শ সাধন ক্ষেত্র। হয়তো ওঁর কাছে সেই সময় সেই পিশাচকে দমন করার কোনো ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু উনি ওঁর ক্ষমতার দ্বারা তাকে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর দীর্ঘদিন এইরকম বন্দি অবস্থায় থাকার জন্য সেই পিশাচের খিদে ক্রমশই বাড়তে থাকে। যোগেন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার সাথে সাথেই তার দ্বারা তৈরি বন্ধনও কেটে যায়। আর তারপরেই শুরু হয় পিশাচের নারকীয় শিকার!”
তীর্থ বলল, “বুঝলাম কিন্তু আমার কাছে এখনও একটা জিনিস ধোঁয়াশা হয়ে আছে!”
শিবেন একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাস্যু দৃষ্টিতে তীর্থের দিকে তাকায়।
তীর্থ সকৌতূহল জিজ্ঞেস করল, “আপনি বলেছিলেন যে বাউডিহি গ্রামে নাকি তিনটে বড়ো পাপ ঘটে গেছে আর তার ফলে বাউডিহির পবিত্র ভূমিও কলুষিত হয়েছে। একটা হল সেই মহিলার সাথে ঘটা পুকুরঘাটের ঘটনা আর একটা এই ঠাকুরমশাইয়ের ঘটনা আর একটা পাপ কী?”
শিবেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “সেই উত্তরও পেয়ে যাবে খুব শীঘ্রই আর তার উত্তর শক্তিগড়ে নয় বাউডিহিতেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য শক্তিগড়। এখন আর কোনো প্রশ্ন নয়। অনেকটা পথ যেতে হবে, বিশ্রামের প্রয়োজন। তোমরাও একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও!”
শিবেনের দৃঢ় কণ্ঠস্বর শুনে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায় না তীর্থ। নীলের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে একবার ঢোক গেলে। না জানি আর কী কী ভয়ানক ঘটনা তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন