নেহা কর্মকার
“আচ্ছা দাদা এখানে যোগেন্দ্রনাথ মুখার্জির বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারবেন?” অচেনা গলার আওয়াজে চায়ের দোকানের লোকটি আর বেঞ্চে বসে থাকা দুজন ব্যক্তি বেশ খানিকটা অবাক হল।
বেঞ্চে বসে থাকা একজন ব্যক্তি তাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “আপনারা কি এই গ্রামে নতুন?”
নীল স্মিত হেসে বলল, “হ্যাঁ আজই এলাম এখানে!”
চায়ের দোকানের ব্যক্তি বললেন, “তা আপনারা যোগেনকে খুঁজছেন যে সে তো আর এখানে থাকে না। অনেক মাস আগেই অন্য গ্রামে চলে গেছে!”
শিবেন দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “হ্যাঁ সে জানি। আমরা বলতে চাইছি যে যোগেন্দ্রনাথের বাড়ি বা ওর পরিবারের কোনো লোক এখানে থাকে কিনা?”
দ্বিতীয় ব্যক্তি বললেন, “হ্যাঁ সে তো আছে! কিন্তু আপনারা হঠাৎ যোগেনের বাড়ি খুঁজছেন?”
লোকগুলো যে কিছু লোকাচ্ছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারল শিবেন। কিছু যেন তারা বলেও বলছে না।
চায়ের দোকানের ব্যক্তি বললেন, “ওর বাড়ি যেতে হলে তো এখান দিয়ে আরও বেশ খানিকটা যেতে হবে। এখন তো রাত হয়ে গেছে অনেকটা। ওইদিকে তো আবার জঙ্গলও পড়ে!”
এবারে সত্যিই নীল, তীর্থ ধন্দে পড়ে। শিবেনের কাছে এ নয় কোনো ব্যাপার নয় কিন্তু ওদের কাছে এতটা হেঁটে এসে আবার জঙ্গল হেঁটে পার করা প্রায় অসম্ভব। ওদের অবস্থাটা বুঝতে পেরে শিবেন চায়ের দোকানের লোকটিকে বলে, “আচ্ছা আজ রাতটা থাকার জন্য একটু কোথাও আশ্রয় পাওয়া যাবে কি? আমাকে নিয়ে চিন্তা নেই। শুধু ওদের দুজনের থাকার জন্যই!”
নীল এবারে শিবেনের কথায় বেশ জোড়েই বলল, “শুধু আমাদের জন্য মানে? তুমি থাকবে কোথায়? থাকলে একসাথেই থাকব!”
শিবেন আশ্বস্ত করে বলতে গেল, “আরে আমার এইসবের অভ্যেস আছে...”
চায়ের দোকানের ব্যক্তি বললেন, “আছে তো, আমার বাড়িই আছে তো। আপনারা আজকের রাতটা না হয় ওখানেই থেকে যান। আমি একাই থাকি!”
তীর্থ উৎফুল্লিত হয়ে বলল, “বাহ এই তো আজ রাতের থাকার ব্যবস্থাটাও হয়ে গেল। চল এবারে একটু গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে লম্বা ঘুম দেব!” এই বলে আড়মোড়া ভাঙতে যায় তীর্থ কিন্তু নীলের একটা গুঁতো খেয়েই, “উরি বাবা!” বলে চেঁচিয়ে ওঠে। নীলের চোখ পাকানো দেখে তীর্থ জিভ কাটে।
চায়ের দোকানের ব্যক্তি হেসে বলে, “হে হে। ও ঠিক আছে। আমার বাড়িতে রান্নাবান্না সব করা আছে। গিয়ে হাত পা ধুয়ে নিয়ে লম্বা ঘুম দিওখন! দাঁড়াও দোকানটা বন্ধ করে নিই!”
তীর্থ বলল, “কাকু তোমার নামটাই তো জানা হল না!”
চায়ের দোকানের ব্যক্তি বললেন, “আমার নাম? বীরু কাকু বলেই ডেকোখন!”
**********
তীর্থ বলল, “আহহহ! ঠান্ডা জলটা দিতেই শরীরের সাথে সাথে মনটাও চাংগা হয়ে গেল একেবারে!”
বীরু হেসে বলল, “হে হে নাও এবারে গরম গরম চা খাও তো দেখি!”
তীর্থ আনন্দে বলল, “আহহ! প্রাণটা জুড়িয়ে গেল! এই চাটা খুব দরকার ছিল!”
এবারে বীরু তাদের জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা তোমরা যোগেন্দ্রকে খুঁজছ কেন তা তো জানাই হল না! কতগুলো দিন হয়ে গেল ছেলেটাকে দেখিনি!”
নীল বলল, “তোমাদের বুঝি রোজ দেখা হতো?”
“হ্যাঁ, সে রোজ আসত আমার দোকানে চা খেতে। সবার খোঁজখবর নিত সে। ভারি ভালো ছেলে ছিল! শুধু একটাই আক্ষেপ, ছেলেটা বাবা মায়ের ভালোবাসাই আর পেল না গো!”
তীর্থ ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, “ব্যাপারটা একটু খুলে বলো তো কাকু!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ সে বলছি, কিন্তু তুমি তো কিছুই নিলে না। শুধু মুড়ি খাচ্ছ!”
শিবেন বলে উঠল, “না না আমি ঠিক আছি, আপনি বলুন!”
“বেশ তবে বলি শোনো!”
যোগেন্দ্র কোনো সাধারণ ছেলে ছিল না। এক বিশেষ দিনে ওর জন্ম হয়েছিল। যোগেন্দ্র আসার পরেই আমাদের সবার জীবন যেন বদলে গিয়েছিল। আমার মনে আছে সেইবার সবার জমি ফসলে ভরে গিয়েছিল। ব্যাবসারও দারুণ উন্নতি হয়েছিল।
যোগেন্দ্রর মা প্রসন্নর অনেকটা বেশি বয়সেই বাচ্চা হয়েছিল। শুনেছিলাম প্রসন্ন কোন এক সাধুবাবার আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়েছিল আর তার আশীর্বাদেই জন্ম হয়েছিল যোগেন্দ্র। উনি বলেই দিয়েছিলেন যে এ কোনো সাধারণ ছেলে হবে না। যোগেন্দ্রর যে দিব্য শক্তি আছে তা মনুষ্য জগতকে যে-কোনো অশুভ শক্তি থেকে বাঁচাতে সক্ষম। সময়ের সাথে সাথে ও নানান সাধনার মাধ্যমে আরও শক্তি সঞ্চয় করবে। হয়েছিলও তাই। খুব অদ্ভুত লাগলেও এটা সত্যি যে গ্রামের মানুষের যা বিপদই হোক না কেন যোগেন্দ্র কিন্তু প্রত্যেককে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করত। গ্রামের মানুষ ওকে একদম মাথায় করে রাখত! ঈশ্বরের থেকে কম সম্মান ওকে করা হতো না। বুঝলে!”
নীল বলল, “বাহ তাহলে তো বলতে হয় যোগেন্দ্রনাথ আপনাদের চোখের মণি ছিলেন!”
“ঠিক বলেছ, ঠিক তাই। কিন্তু বেছে বেছে ভালো মানুষগুলোর কপালেই ভগবান খারাপ কিছু লিখে রাখবেই!”
তীর্থ জিজ্ঞেস করল, “কীরকম?”
“যোগেন্দ্রর বাপ ছিল একেবারে ওই যাচ্ছেতাই। খালি মদ গিলে আসত আর প্রসন্নর ওপর অত্যাচার করত। আমরা পাড়ার লোকেরা মিলে কতবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু ও শুধরায়নি। একদিন তো এমন কাজ করল যে তার জন্য প্রসন্নটা জলে ডুবে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল!”
এবার শিবেন প্রশ্ন করল, “কী করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথের বাবা?”
“একদিন হঠাৎ কোথা থেকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এল প্রসন্নর সতীনকে! যোগেন্দ্রর বয়স তখন সবে ৮ না ৯। দুদিন চরম অশান্তি হল। পাড়ার লোকেরা কিছু বলতে গেলেই সেই মহিলার কি যাচ্ছেতাই কথাবার্তা। একদম দজ্জাল প্রকৃতির ছিল ওই মহিলা। মহিলা বলে গায়ে হাত দিতেও কেউ পারছিল না আর কেউ ওর সাথে মুখ লাগাতেও চাইছিল না। কে আর যেচে অপমানিত হতে চায়? দুদিন চরম অশান্তি হওয়ার পর একদিন হঠাৎ প্রসন্ন বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল। তার পরেরদিন পুকুরে ভেসে উঠল প্রসন্নর ফুলে যাওয়া লাশ। ও আত্মহত্যা করেছিল কিনা সে নিয়ে আজও আমার সন্দেহ আছে, কী জানি হয়তো সেই মহিলাই প্রসন্নকে...”
নীল বলল, “হুম বুঝলাম। কিন্তু তারপর যোগেন্দ্রনাথের কী হল?”
“এই ঘটনার পর থেকে যোগেন্দ্রনাথের জীবন একেবারে দুর্বিষহ হয়ে উঠল। উঠতে বসতে চলতে থাকলো সেই মহিলার মানসিক অত্যাচার। গায়ে হাত দিতে সাহস সে পেত না কারণ সে খুব ভালো মতোই জানত যোগেন্দ্রর গায়ে যদি একটা আঁচড়ও পড়ে তাহলে গ্রামের মানুষেরা ওকে ছেড়ে দেবে না। তাই সেইদিক থেকে ও খুব সাবধানীই ছিল। এইভাবেই প্রায় একটা বছর কেটে গেল। যোগেন্দ্রর এরকম অবস্থা যখন তখন হঠাৎই একদিন আমাদের গ্রামে এক ভৈরব বাবার আবির্ভাব ঘটল। সে যোগেন্দ্রকে দেখেই বুঝলেন যে এ কোনো সাধারণ বাচ্চা নয়। তিনি যোগেন্দ্রকে নানান বিদ্যে দিতে শুরু করলেন। এই ভৈরব বাবা ছিলেন আমাদের এখানে যে পুরোনো কালীমন্দির আছে সেখানকার পুরোহিতের চেনা। ভৈরব বাবার পরামর্শেই ঠাকুরমশাই যোগেন্দ্রকে নিজের কাছে রাখা শুরু করলেন, একদম নিজের ছেলের মতো। মন্দিরে থাকতে থাকতে মন্দিরের কাজকর্মও সব শিখে নিল সে। এর মধ্যেই যোগেন্দ্রর বাবাও একদিন হঠাৎ করেই মারা যায়। ফলত ওই বাড়িতে আর পিছুটান যোগেন্দ্রর ছিল না। তাই সে-ও বাড়ি ছেড়ে চলে এল ঠাকুরমশাইয়ের কাছে। এই ঠাকুরমশাইয়ের এক মেয়েও ছিল, পাঞ্চালী। পরবর্তীকালে ওর সাথেই আমাদের যোগেন্দ্রর বিয়ে হয়।
ইতিমধ্যে যোগেন্দ্র ভৈরব বাবার থেকে বিদ্যে পেয়ে আরও নানান বিষয়ে পারদর্শী হতে শুরু করে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ওর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে, ওর আশ্চর্য ক্ষমতা সম্পর্কে আরও মানুষ অবগত হয়।
ওইদিকে যোগেন্দ্রর এত নাম দেখে রাগে আর হিংসায় জ্বলতে থাকে যোগেন্দ্রর সৎ মা বিমলা। বিমলা তখন আট মাসের অন্তসত্ত্বা। আগেই বলেছি বিমলা ছিল দজ্জাল প্রকৃতির মহিলা আর তার ওপর তার রাগ একদম নাকের ডগায় লেগে থাকত। একদম বদরাগী যাকে বলে। একবার প্রতিবেশীর দুই ছেলে খেলতে খেলতে ভুল করে বল ছুঁড়ে মেরেছিল বিমলার সবেমাত্র ধুঁয়ে ঝোলানো সাদা শাড়িটায়। ব্যস কাদা লেগে সে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। এই দেখে বিমলার মাথায় চণ্ডাল ভর করল যেন। লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারতে লাগল বাচ্চা দুটোকে। হাত, পা, মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়ে গেল। কিন্তু তাও বিমলার থামার কোনো নাম নেই। এত মার খেয়ে ছোটো ছেলেটা অসুস্থ হয়ে ওখানেই অজ্ঞান হয়ে গেল। বড়ো ছেলেটা কোনোভাবে বাড়িতে গিয়ে নিজের মাকে গিয়ে পুরো ঘটনাটা বলল। সব শুনে ছেলেটার মা ক্রোধের আগুনে ফেটে পড়ল। বিমলার বাড়িতে গিয়ে ছোটো ছেলেটাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে মহিলাটি বিমলাকে ও তার আসন্ন বাচ্চাকে অভিশাপ দিয়ে বসল। শুনেছিলাম ওই মহিলা নাকি কীসব নিম্ন মার্গের সাধিকা ছিলেন। আমি ওইসব অত শত কিছু বুঝি না। সে যাক গিয়ে। বিমলা বুঝতে পারে ক্রোধের বশে এসে সে কী বড়ো ভুল করে ফেলেছে। সে ক্ষমা চায় ওই মহিলার কাছে কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এর প্রায় পাঁচদিনের মাথায় জন্ম নেয় বিমলার সন্তান। আট মাসেই! কিন্তু তার বাচ্চাকে দেখে গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ ভয়ে শিউরে উঠল!”
নীল সকৌতূহল জিজ্ঞেস করল, “কেন কেন?”
“বিমলার সন্তানের শরীর তো সাধারণ মানুষের মতোই ছিল কিন্তু তার মাথা...”
তীর্থ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তার মাথা কী?”
“সে একটা শরীরেই দুটো মাথা নিয়ে জন্মেছিল। একটা মানুষের মাথা আর একটা শয়তানের!”
বীরুর থেকে দুটো মাথাওয়ালা শিশুর জন্মানোর কথা শুনেই তীর্থর খটকা লাগল, সে শিবেনের দিকে তাকিয়ে দেখল তার কপালেও চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। এইসময় নীল বলে, “বলেন কী? দুটো মাথা আর একটা শরীর!”
“হ্যাঁ। ততদিনে সেই সাধিকা তার সন্তানদের দিয়ে ওই জায়গা ছেড়ে বিদায় নিয়েছে। এইদিকে বিমলার তো সেই সন্তানকে নিয়ে পাগল পাগল অবস্থা। একে তো বিমলাকে কেউ পছন্দ করত না তার ওপর তার ওই সন্তান। মানুষের মনে প্রথম থেকেই ওই সন্তানকে দেখে তীব্র ঘৃণা জন্মাল। বাচ্চাটা সত্যিই ভীষণ অদ্ভুত ছিল। আমিও নিজের চোখে দেখেছিলাম তাকে। তার বাম দিকের মুখটা মানুষের মতোই কিন্তু তার ডান পাশের মুখ একদম কুচকুচে কালো। দেখলেই হাত পা একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়। আমার তো ভিরমি খাওয়ার অবস্থা হয়েছিল!”
নীল জিজ্ঞেস করল, “তা এরপর গ্রামের লোক কী করল?”
“গ্রামের লোক আর কীই বা করতে পারে। প্রথম প্রথম সবাই ওই বাচ্চাকে দেখে তাকে মেরে ফেলা হবে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হল। কিন্তু যতই হোক বিমলাও তো আর পাঁচজন মায়েদের মতোই একজন মা। সে নিজের সন্তানের যত খুঁতই থাকুক না কেন, ফেলে তো দিতে পারে না। তাই গ্রামের মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও সে কিছুতেই কাউকে তার বাচ্চাকে স্পর্শ করতে দিল না। দু-তিনবার চেষ্টা করেও সবাই হাল ছেড়ে দিল। কেই বা বারবার বিমলার ওই কুৎসিত বাক্যবাণের সম্মুখীন হতে চায়? কিন্তু এরপর থেকে বিমলা ও তার বাচ্চাকে একদম একঘরে করে রাখা হল। বাড়িতে থাকা খাবার একদিন ফুরিয়ে এল। বিমলা এর কাছে তার কাছে গিয়ে ভিক্ষে চাইতে শুরু করল কিন্তু ওর কোলে ওই বাচ্চাকে দেখেই ঘেন্নায় সবাই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিত। এরপর একদিন হঠাৎই বিমলা আর ওর বাচ্চা উধাও হয়ে গেল। কেউ কেউ ওই গ্রামের শেষের দিকের ঘন জঙ্গলটাতে ওদের শেষবারের মতো দেখেছিল। দু-একবার কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করা হয় কিন্তু জঙ্গলের ভেতরে ঢোকার সাহস আর কেউ দেখায়নি। তা ছাড়া বিমলার ওপর সবার একটা রাগ থাকার দরুণ ওই ‘আপদ বিদেয় হয়েছে’ এই ভেবেই সবাই আবার যে যার নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেল!”
পুরোটা প্রথম দিয়ে শুনে শেষে আসল জায়গায় এসে অসম্পূর্ণ গল্পটা শুনে নীল আর তীর্থ দুজনেরই মুখ বাংলার পাঁচ হয়ে গেল। এইদিকে শিবেন কিন্তু শান্ত হয়ে কিছুতেই বসে থাকতে পারল না। তার কপালের ভাঁজ আরও সংকুচিত হল।
বীরু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, “হে হে শেষটা মনে হয় তোমরা এমনটা আশা করোনি? আসলে সত্যি বলতে কি কৌতূহলটা আমারও আছে যে শেষ অব্দি ওদের কী হল? কিন্তু কী আর করা যাবে যা নিজে থেকে হারিয়ে গেছে তাকে তো আর খুঁজে পাওয়া যায় না!”
শিবেন বলল, “হারিয়ে যায়নি বরং লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়েই সে আসল কাজটা করেছে। খুব বড়ো ভুল হয়ে গেছে আপনাদের। তখনই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলা উচিত ছিল আপনাদের!”
বীরু খানিকটা ভয় ভয় বলল, “কেন বাবা এরকম কেন বলছ? কিছু খারাপ ঘটেছে? যোগেন... যোগেন্দ্র কেমন আছে?”
বীরুর প্রশ্নে নীল আর তীর্থ দুজনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শিবেন বাউডিহিতে ঘটা সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত জানায় বীরুকে। সমস্তটা শুনে বীরু মাথায় হাত দিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। নীল আর তীর্থ দুজনে মিলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে।
শিবেন শান্ত স্বরে বলে, “আপনি শান্ত হন দেখুন এইভাবে কাঁদবেন না। আমরা বুঝতে পারছি যে যোগেন্দ্রনাথ আপনার সন্তানসম ছিলেন। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, এখন আমাদের বাউডিহিকে সেই পিশাচের হাত রক্ষা করতে হবে। আচ্ছা আপনি কী বলতে পারবেন যে সেই সাধিকা মহিলা বিমলার বাচ্চাকে কী অভিশাপ দিয়েছিল?”
বীরু চোখের জল মুছে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে, “তা তো জানি না বাবা। তবে তুমি আমাদের কালীমন্দিরের ওই ঠাকুরমশাইকে জিজ্ঞেস করতে পারো। যদি উনি কিছু জেনে থাকেন তো!”
শিবেন বলে, “আচ্ছা বেশ, এবারে আপনি গিয়ে একটু বিশ্রাম নিন!”
বীরু আর কিছু বলে না, নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে যায়। এইদিকে তীর্থ খুব ধীরে ধীরে বলে ওঠে, “আরে আমাদের রাতের খাওয়ারটার কথা তো বলাই হলো না ওঁকে!”
নীল কটমট চোখে তীর্থের দিকে চেয়ে বলে, “তোর লজ্জা করে না। এইসময়ও তোকে হ্যাংলামি করতে হয়?”
তীর্থ মুখ কাচুমাচু করে বলে, “কিন্তু আমার হেব্বি খিদে পেয়েছে ভাই!”
নীল বলে উঠল, “নে এটা খা। আমি জানতাম যে তোর রাহুর খিদে তাই বউদি আমাদের রান্না করেই দিয়েছিল পথে খাওয়ার জন্য। তখন তো আর খাওয়া হয়নি এখন খেয়ে নে তুই!”
তীর্থ জিজ্ঞেস করল, “তুই খাবি না তো?”
নীল বলে, “আমাকে দেখে কি তোর মানুষ মনে হয় না? আমার খিদে পায় না?”
নীল আর তীর্থের এই কথা কাটাকাটির মাঝে শিবেন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। তারপর মাটিতে পাতা মাদুরে টানটান হয়ে একপাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পরে। শিবেনকে শুয়ে পড়তে দেখে নীল আর তীর্থও বেশি কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে নিয়ে মুখ হাত ধুয়ে এসে শুয়ে পড়ে। পথশ্রমে ক্লান্ত থাকায় খুব তাড়াতাড়িই ওরা ঘুমিয়ে পড়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন