পঞ্চদশ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

রাতের বেলা গ্রামের পরিবেশ যে একদম অন্যরকম তা নীল ভালো করে জানে। কিন্তু এই প্রথমবার গ্রামে এসে ওর এতটা অস্বস্তি হচ্ছে। অন্যসময় তো তাও রাতচরা পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ কিংবা ঝিঁঝি পোকার একঘেয়েমি আওয়াজ কানে আসত কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে পৃথিবীতে বুঝি প্রাণের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে গেছে।

নীলের চোখে তন্দ্রা নেমে এলেও তীর্থের কিছুতেই ঘুম আসছে না। আসলে তার কাছে এই পরিবেশটা একেবারেই নতুন। তাই তাড়াতাড়ি এর সাথে মানিয়ে নেওয়া ভীষণই কঠিন। তাই চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে সে আর সন্ধের সেই কালো অবয়বটাকে মনে করার চেষ্টা করে। কী ছিল ওটা কোনো মানুষ নাকি সত্যিই সেই...

রাত তখন কটা বাজে কে জানে হঠাৎ নীলের ঘুম ভেঙে গেল একটা খুট শব্দে। ঘুম চোখেই নীল অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করে আর পরক্ষণেই ধড়ফড় করে উঠে বসে সে। পাশে তীর্থ নেই, দরজার পাল্লাটা খোলা। মানে একটু আগের সেই আওয়াজটা দরজা খোলার ছিল। আর এ কী! এ কেমন সুর। মাথার শিরা উপশিরা যেন ছিঁড়ে যেতে চাইছে। মাথার একপাশটা চেপে ধরে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে নীল। বীরেন বা কমলার কথা বেমালুম ভুলে যায় সে। কারণ সে দেখতে পায় তীর্থ সদর দরজাটা খুলেও বাইরে চলে গেল। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়েছে কিন্তু তা নিয়েও নীল তীর্থের পিছু নেয়। দৌড়ানোর মতো ক্ষমতা তার নেই। কারণ তার মনে হয় তার হাত পা যেন আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ ভারী থেকে আরও ভারী হচ্ছে তার শরীর।

গলা ফাটিয়ে ডাকার চেষ্টা করে নীল তীর্থকে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বরই বেরোয় না। তীর্থকে যেন বশীভূত করা হয়েছে, আশেপাশের কিছুই তার নজরে পড়ছে না। এইভাবে একটা সময় পরে হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যেই আরও এক গাঢ় অন্ধকারের আবির্ভাব হয়। নীল বুঝতে পারে কিন্তু তীর্থের চলনবলনে তার কোনো প্রভাবই পড়ে না। এবারে কালো অন্ধকার মাখা বস্তুটার থেকে আরও তীব্রভাবে সেই সুর শোনা যায়। এইবারে তীর্থর আচমকাই যেন সমস্ত জ্ঞান ফিরে আসে। যেন সবেমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কী আশ্চর্য সে বাড়ির বাইরে এল কখন? আর এখনই বা কোথায় সে। আচমকা একটা গোঙানির আওয়াজে পিছন ফিরে তাকায় তীর্থ। আধা চাঁদের আলোতে কিছুটা দৃষ্টিগোচর হয় তার সবকিছু। “নীল!” নীলকে মাটিতে শুয়ে কাতরাতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় সে। ছুটে সেদিকে যেতে চায় কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে পেরে সেইখানেই লুটিয়ে পড়ে সে। এবারে তীর্থ দেখে সেই কালো অবয়ব! কিন্তু এবারে আরও একটু স্পষ্ট। এবারে হঠাৎ একটা মাংসপচা গন্ধ আসে তার নাকে, গা গুলিয়ে ওঠে তীর্থর। কিন্তু তার থেকেও এখন বীভৎস যে জিনিসটা সেটা হল এই পিশাচটার দেহ। তার শরীর বলতে কিছুই নেই। সারা শরীর পচাগলা মাংসে পরিপূর্ণ। তার বুকের পাজর অবধি দেখা যাচ্ছে। হাতের নখগুলো যেন শাণিত ছুড়ির ফলা। আর সবচেয়ে ভয়ানক তার দুটো মাথা। সেই চারটে চোখ এখন লাল বর্ণ ধারণ করেছে। তার মুখ থেকে বেরিয়ে আছে একটা বিশাল লম্বা লালচে জিভ। তা থেকে লালা ঝরে পড়ছে। এ নরকের কোন গহীন অন্ধকার থেকে উঠে এসেছে ভূমিতে। ভয়ে সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে তীর্থ আর নীলের। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে যেন তাদের কান্না পায়।

ঠিক যেমন কোনো বুভুক্ষু বাঘ চোখের সামনে শিকারকে দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিক সেইভাবেই সেই নরকের পিশাচটা তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল এবারে। আর বাঁচার কোনো উপায় না দেখে আসন্ন মৃত্যুভয়ে দুজনেই নিজের চোখ বন্ধ করে নেয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই এক গম্ভীর গলার মন্ত্রোচ্চারণ শুনে চকিতে ফিরে তাকায় তারা সেইদিকে যেইদিক থেকে এই স্বর আসছে। পিশাচের গতিও রুদ্ধ হয়েছে সেই স্বর শুনে। অনৈসর্গিক সেই পরিবেশে এক তীব্র শ্বেতশুভ্র আলোক অবয়ব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটা পবিত্র সুবাসে চারিপাশ ছেয়ে যায় সাথে সাথে মাংস পচা দুর্গন্ধটা খানিকটা ম্লান হয়ে যায়। নিমেষে সেখানে সৌম্যকান্তি দিব্য জ্যোতির্ময় এক পুরুষের আবির্ভাব হয়। সেই সাথে সেই পিশাচের পৈশাচিক উল্লাস থেমে যায় সেই সঙ্গে আস্ফালনও। নীল আর তীর্থর আড়ষ্টতাও যেন কেটে যায়। হঠাৎ একটা পাশবিক চিৎকারে নতুন করে শিহরিত হয় নীল আর তীর্থ। তারা দেখে পুণ্যাত্মা মহান সাধকের প্রতিরূপের দিক থেকে এক চোখ ধাঁধানো নীলাভ আলোকরশ্মি অব্যর্থ লক্ষ্যে আঘাত আনে সেই নরপিশাচটার ওপর। তীব্র গগনবিদারী আর্তনাদে নীল আর তীর্থর কানে যেন তালা লেগে যায়। এইবারে আর সহ্য করতে পারে না তারা। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তৎক্ষণাৎ।

**********

ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়ে কমলা, এইদিকে বীরেনও আজ উঠে পড়েছে অনেক তাড়াতাড়ি। তাকে স্টেশনে যেতে হবে এক্ষুনি। কমলা ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। বীরেন সকালের প্রাকৃতিক কাজ সারতে বাইরে যাবে ঠিক সেই সময় তার চোখে পরে পাশের ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা, ভিতরে ঘর খালি। বীরেন ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কমলাকে হাঁক পাড়তে থাকে। কমলা এসে ফাঁকা ঘর দেখে সে-ও থমকে যায়। বীরেন এবারে হন্তদন্ত হয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য দরজা খোলে আর তখনই সে থমকে যায়। বীরেনকে হঠাৎ শান্ত হতে দেখে কমলার ভ্রূকুঞ্চিত হয়। সে-ও এসে পাশে দাঁড়ায় এবং হতবাক হয়ে যায়। নীল, তীর্থ দুজনেই অচৈতন্য হয়ে দরজার কাছে পড়ে আছে। বীরেন চিন্তিত মুখে ঝুঁকে পড়ে নীল আর তীর্থকে তাদের নাম ধরে ক্রমাগত ডাকতে শুরু করে। “নীল দাদাবাবু, তীর্থ দাদাবাবু, আরে ওঠো কী হল তোমাদের? নীল দাদাবাবু, তীর্থ দাদাবাবু, শুনতে পারছ?” ইতিমধ্যে কমলা ভেতর থেকে জল নিয়ে নীল আর তীর্থের মুখে ছেটাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে আসে। আস্তে আস্তে উঠে বসে নীল ও তারপর তীর্থ। চোখ খুলেই তারা বীরেন আর কমলার চিন্তিত দৃষ্টির সম্মুখীন হয়। মনে করার চেষ্টা করে কাল রাতে ঠিক কী ঘটেছিল। চকিতে সবকিছু মনে পড়ে যায় নীলের। তীর্থের বেরিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সেই অপরিচিত ব্যক্তির আগমন অব্দি সমস্ত কথা খুলে বলে সে। সমস্ত কথা শুনে বীরেন আর কমলার চোখ কপালে ওঠে। কে সেই ব্যক্তি যার আগমনের সাথে সাথে এত বড়ো কাণ্ড ঘটল। এতদিন কত তান্ত্রিক, গুনিনের পরামর্শ নেওয়া হল কিন্তু কারোর দ্বারাই সেই পিশাচকে দমন করা তো দূরে থাক, বরং তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক চরমতম অন্ধকার। সেখানে এই আগন্তকের আগমনে এক রাতেই যেন বাউডিহির পুরো পরিবেশই পালটে গেছে। কে এই আগন্তক তাদের জানতেই হবে। হঠাৎ করেই মনে যেন একটা আশার আলো খুঁজে পায় বীরেন আর কমলা। এই সমস্ত কথা গ্রামবাসীদের জানা দরকার। আচ্ছা সেই আগন্তক কি এখনও গ্রামে আছেন, যদি না থাকে তবে তো...

ঠিক এইসময় হালকা একটা কোলাহল শোনা যায়। ওরা সবাই দেখে ভবেশ আর যগাদা হন্তদন্ত হয়ে তাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে।

“ভাই বীরেন, কোনো খবর জানো? আরে বটতলায় এক তান্ত্রিকের আগমন ঘটেছে। প্রথমে তো বুঝিনি কিন্তু তারপর বুঝতে পারলাম কে তিনি!”

বীরেন অবাক হয়ে যায়। এবারে যগাও বলে, “হ্যাঁ গো বীরেনদা। তুমি বিশ্বাস করবে না। এতগুলো বছর কেটে গেছে কিন্তু এখনও সেই ছোটোবেলার মুখের সাথে কি মিল! তার ওপর সেই কটা চোখ আর মাথার সেই কাটা দাগ!”

“তোমরা কার কথা বলছ বলো তো? আমি তো কিছুই বুঝছি না!”

এবারে ভবেশ আর যগা একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আর তারপর বলে, “বটতলায় শিবেন এসেছে রে, শিবেন। পনেরো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আমাদের শিবু। তোর ভাই!”

বীরেনের হাত থেকে জলের গ্লাসটা পরে যায়, ধপ করে বসে পড়ে সে মাটিতে। এ সে কী শুনল? শিবু এসেছে, শিবু? এতগুলো বছর পর! অজান্তেই তার চোখ জলে ঝাপসা হয়ে ওঠে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%