নবম অধ্যায়

নেহা কর্মকার

মনে একপ্রস্ত আনন্দ নিয়ে গবা তার গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে ভুলেই যায় যে গ্রামে এক ভয়াল পিশাচের ছায়া পড়েছে। সে নিজ মনে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। মনে মনে ভাবে সে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাকি সবাইয়ের অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। ওই সবার দেরিতে যাচ্ছে।

“গুনিন বাবা বিশ্বাস করে এই মহান কাজটা দিয়েছেন আর আমি কিনা তার দেওয়া সময়ের কোনো দামই দিচ্ছি না! ছিঃ ছিঃ এ বড়ো অন্যায় হয়েছে। সব হয়েছে ওই মায়ের জন্য। শেষে এমনভাবে তাবিজটা নিতে চাইল। ঠাকুরের পায়ে ছোঁয়াতে গিয়েই এতটা দেরি হয়ে গেল।”

রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে হাঁটতে থাকে গবা। হঠাৎ তার গতি রুদ্ধ হয়। কী একটা আওয়াজ এল না? মনে হল ঘাস-পাতায় চলে বেড়ালে যেমন আওয়াজ হয় সেরকম। পাশের খেতে কি কেউ আছে? কিন্তু এত রাতে অন্ধকারে কে-ই বা থাকবে খেতে? গবার ভাবনাচিন্তা হঠাৎ থমকে যায়। তার মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠতে শুরু করে। আচ্ছা এইসব ওই পিশাচের কাণ্ড নয় তো? ভয়ের চোটে গবা কাঁপা কাঁপা গলায় রামনাম জপ করতে শুরু করে। অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার ভুলটা বুঝতে পারে। গবা দেখে যে খেতের মধ্যে থেকে কালু এক লাফে বাইরে বেরিয়ে এসে গবার পায়ের সামনে এসে লেজ দোলাচ্ছে। কালো হওয়ার দরুন গবা অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে পারেনি প্রথমটায়। কালু মহা আনন্দে গবার পায়ের কাছে মুখ বোলাতে থাকে, আর কুঁইকুঁই করে একটা আওয়াজ করতে থাকে। এবারে গবা একটু বাম হাঁটুটা মুড়ে নীচু হয়ে বসে আর কালুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। কালু চোখ বন্ধ করে সেই আদর গ্রহণ করে। কিন্তু পরক্ষণে চোখ খুলতেই কালু এক লাফে অনেকটা দূরে সরে যায়। হঠাৎ যেন তার চোখে কিছু একটা ধরা পড়েছে যেটা দেখে কিছুক্ষণ আগে অব্দিও যে এত শান্ত হয়েছিল তার মুখ দিয়ে তীব্র হিংসাত্মক একটা গড়গড় শব্দ বেরিয়ে আসছে। তার দৃষ্টি গবার ঠিক পিছনে নিবদ্ধ। কী আছে সেখানে?

গবা ভয়ে ভয়ে পিছনে ঘোরে। কিন্তু কোথায় কী? জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই। গবা আবার সামনে ঘোরে। ইতিমধ্যে কালু তার হিংসাত্মক গড়গড় আওয়াজ ছেড়ে কুঁইকুঁই করে ডাকতে শুরু করেছে। এই ডাক ভয়ের ডাক। কিছু দেখে যেন কালু খুব ভয় পেয়েছে। কালু যেন কিছু বলতে চাইছে গবাকে আর একভাবে তাকিয়ে আছে গবার পিছনের দিকে। অথচ গবা পিছন ঘুরলে কিছুই সে দেখতে পারছে না। এবারে কালু আরও জোড়ে চিৎকার করতে করতে ছুট লাগাল এবং পরক্ষণেই খেতের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। গবা ব্যাপারটাকে আর অতটা পাত্ত্বা দিল না। সে নিজের কাজ করতে শুরু করল।

বেশিক্ষণ হয়নি, হঠাৎ গবার মনে হয় ওর পিছনে যেন কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা দমবন্ধ করে দেওয়া অস্বস্তি হচ্ছে তার। তার মধ্যে একটু একটু করে ভয়ের দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সে একবার তার গলায় ঝোলানো তাবিজটায় চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেই কাজ করতে যাবে অমনি ঠিক ওর ঘাড়ের ওপর ঠান্ডা নিঃশ্বাস এসে পড়ল। গবা আঁৎকে উঠে খানিকটা দূরে ছিটকে যায়। এবারে সে বুঝতে পারে, এতক্ষণ অন্ধকার ভেবে যে ভুল গবা করছিল আসলে সেখানে একটা নির্দিষ্ট জায়গা জুড়ে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে রয়েছে। যার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। যার উপস্থিতি এই অন্ধকারের মধ্যেও আরও একপ্রস্ত গভীর অন্ধকারের সৃষ্টি করেছে। এই অবয়বে জোনাকির মতো শুধু চারটে সবুজ জ্বলজ্বলে জিনিস ক্রমাগত জ্বলছে। ভালো করে দেখলে বোঝা যায় ওটা চোখ, হ্যাঁ চারটে চোখ! ভাটার মতো জ্বলছে সেগুলো।

তীব্র আর্তনাদ করে গবা উঠে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু একি! তার হাত পা কিছুই সে নাড়াতে পারছে না। তার সমস্ত শরীর যেন এক অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধে রাখা হয়েছে। এমনকি গলা থেকে একটাও স্বর বেরোচ্ছে না। পাথরের মতো বসে থাকা ছাড়া এবারে গবার আর কিছুই করার নেই।

সে যেন বুঝতে পারছে এই ভয়ানক পিশাচের হাত থেকে তার মুক্তি নেই। কিন্তু... কিন্তু গুনিন বাবা যেন কী বলেছিল একটা! কী একটা কথা গবার মনে পড়েও পড়ে না। এবারে হঠাৎ করে মনে পড়াতে গবার সারা শরীরে এক শীতল স্রোত খেলে যায়। তার মনে পড়েছে গুনিন বলেছিল যতক্ষণ না তাঁর দেওয়া এই জিনিসটা দিয়ে সমস্ত গ্রামকে বন্ধনী করা হচ্ছে ততক্ষণ সেই পিশাচ ওঁৎ পেতে থাকবে সবার ক্ষতি করার। কিন্তু সেই পিশাচের ফাঁদে পা দিলেই সর্বনাশ! তাই একমনে যে কাজটা দেওয়া হয়েছে সেটা করে যেতে হবে। একটু ভুল হলেই সেই পিশাচ সকলকে মেরে তার রক্ততৃষ্ণা মেটাবে। এমনকি বাদ যাবে না সাধনায় বসা ব্যক্তিও। তাই যতক্ষণ না পুরো গ্রাম বন্ধনী হচ্ছে ততক্ষণ কেউ নিরাপদ নয়। সরাটা গবার হাতে তুলে দিয়ে গুনিন বলেছিল, যে সেই শেষ ব্যক্তি যে এই বন্ধনীর শেষ পর্যায় সম্পন্ন করে ফিরে আসবে। আর যতক্ষণ এই তাবিজ তার সাথে থাকবে কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। তবে এই তাবিজ গলা দিয়ে খোলা চলবে না। তাহলেই তাবিজের শক্তি অপসারিত হবে।

তবে কি সেই সময় তাবিজ খুলেই ভুল করল গবা? গবার চোখ ফেটে জল আসে। মৃত্যুর আগেও সে কারোর কোনো কাজে লাগল না। বরং গ্রামের মানুষের বিপদ সে আরও বাড়িয়ে দিয়ে চিরনিদ্রায় পাড়ি দেবে। মঙ্গলীর কথা খুব মনে পড়ছে তার। বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। মরার আগে একবারও তার সাথে আর দেখা হবে না। কথা হবে না।

বড়ো অসহায় লাগে গবার। সে এখন চাইলেও ছুটে গিয়ে কাউকে কিছু বলতেও পারবে না। সেই পিশাচ তার অনেকটা কাছে চলে এসছে।

গবার বুকের কাছটা এবারে হাপরের মতো ওঠানামা করতে শুরু করেছে। রাতের ঘন নিস্তব্ধতা ভেদ করে অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে চলা হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানির আওয়াজ শুনে গবা নিজেই চমকে ওঠে। তার কানে এবার হঠাৎ একটা সুর আসছে। প্রথমটায় খুব মৃদু। তারপর সেই সূক্ষ্ম আওয়াজটাই গবার মাথার শিরা উপশিরা যেন ভেদ করে দিতে লাগল। ক্রমে ক্রমে অসহনীয় হয়ে ওঠে আওয়াজটা। বেশিক্ষণ সহ্য করতে হয় না। তার আগেই গবার চোখে অমানিশার কালো পর্দা নেমে আসে।

*******

“কতক্ষণ হয়ে গেল এখনও গবাদার আসার নাম নেই, ধুর! এইজন্যই বলছিলাম ওর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। ওকে বিশ্বাস করাই ভুল হয়েছে আমদের!” তীব্র রাগের সহিত কথাগুলো বলে ওঠে বন্ধনী করতে যাওয়া যুবকদের মধ্যে এক যুবক, রহিম।

“ঠিকই বলেছিস ভাই!” রহিমকে উদ্দেশ করে সদানন্দ ওরফে সদাও এক কথা বলে ওঠে, “এরকম গুরুতর একটা সময় গবাকে পাঠানো একদম ঠিক হয়নি!” “গবা যদি ভুলভাল কিছু করে তাহলে তো আমরা সবাই মারা পড়ব!” কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে গ্রামের আর এক যুবক নিমাই।

“আহ তোরা থাম তো! ওই দ্যাখ গবা আসছে!” নগেনের কথায় এবারে সকলে একত্রে ঘুরে তাকায় গ্রামের পশ্চিম প্রান্তের দিকে। সেইদিক থেকে একটা ছোটো অবয়ব দেখা যাচ্ছে। দুলতে দুলতে সে এইদিকেই এগিয়ে আসছে।

“গবার সাহস তো বেশ বেড়ে গেছে দেখছি। দ্যাখ দ্যাখ কেমন হেলতে দুলতে আসছে, যেন কিছুই হয়নি। এই অন্ধকারে সীমানা বন্ধনী করতে গিয়ে তো আমার পিলে চমকে উঠেছিল!” বলে ওঠে রহিম।

“যা বলেছিস! কিন্তু গবাকে যেন একটু বেশিই চিন্তামুক্ত লাগছে না? আমার মন থেকে তো এখনও ভয় যাচ্ছে না। কী জানি কী হয় আজ রাতে!”

গ্রামের যুবকদের কথার মাঝেই গবা এসে উপস্থিত হয় ওদের সামনে। গবা আসতেই গুনিন মন্ত্রোচ্চারণ থামিয়ে চোখ মেলে তাকায়। তার গুরুগম্ভীর গলার স্বর আবার শোনা যায়। সেই স্বরে স্পষ্ট আদেশের সুর।

“তোদের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এবারে সকলে নিজের নিজের ঘরে ফিরে যা। আর খবরদার কাল ভোরের আলো ফোটা না অবদি বাড়ির বাইরে কেউ পা রাখবি না!” এই বলে গুনিন আবার ধ্যানমগ্ন হলেন। সবাই গুনিনকে জোড়হাতে প্রণাম করে বাড়ির দিকে রওনা হল। শুধু কেউ খেয়াল করল না অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা গবার মুখে ফুটে উঠল এক ক্রূর শয়তানি হাসি, ধীরে ধীরে সে মিলিয়ে গেল রাতের গভীর অন্ধকারে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%