বিংশ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

সকালে ঘুম ভাঙতেই তীর্থ দেখল ওর আশেপাশে কেউ নেই। তাকে ছেড়েই নীল আর শিবেন পিশাচ বধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে গেছে এই আশঙ্কায় সে ধড়ফড় করে উঠে বসে এবং সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে দেখে নীল একটা চৌকির উপর বসে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে আর কিছুটা দূরে একটা গাছতলায় ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে শিবেন। তাদের দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তীর্থ। বীরুও এইদিকে ওদের জন্য গরম গরম চা নিয়ে উপস্থিত হয়। তীর্থকে দেখে সে বলে, “আরে তীর্থ দাদাবাবু উঠে পড়েছ দেখছি। তুমি গিয়ে মুখ ধুয়ে নাও আমি তোমার চা-টা নিয়ে আসি বরং!” এই বলে সে আবার ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। এতক্ষণে তীর্থ ওর রেডিয়াম ঘড়িতে সময়টা দেখে নেয়। সকাল ৯টা বেজে গেল! এতক্ষণ ও ঘুমিয়েছে? নীলের দিকে তাকিয়ে দেখল সে এখনও ফোনে কারোর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। তাই এই সু্যোগে চটপট গিয়ে মুখ ধুয়ে নিয়ে, একটা বড়োসড়ো আড়মোড়া ভেঙে নীলের পাশে এসে বসল তীর্থ। শিবেন তখনও ধ্যানে মগ্ন। বীরু কাকাও এর মধ্যে চা নিয়ে হাজির। নীলও ততক্ষণে ফোন ছেড়ে চা পানে মনোনিবেশ করেছে। ইতিমধ্যে দু-তিনজন বীরু কাকাকে আজ দোকান না খোলার কারণ জিজ্ঞেস করতে আসলে বীরু তার শরীর খারাপ তাই আজ দোকান বন্ধ বলে তাদের ভাগিয়ে দেয়। আসলে শরীর খারাপটারাপ কিছুই নয় বীরু কাকার মন খারাপ। হওয়াটাই স্বাভাবিক, রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও যোগেন্দ্রনাথ যে ওঁর খুব কাছের ছিলেন তা বোঝা যায়।

চা-এ বিস্কুটটা চুবিয়ে মুখে পুরেই তীর্থ নীলকে জিজ্ঞেস করে, “তা আমরা কখন যাব সেই ঠাকুরমশাইয়ের কাছে?” নীল চা-টা শেষ করে পাত্রে ভাঁড়টা রাখতে রাখতে বলে, “সে শিবেনদা দেখা করে এসেছে।” তীর্থ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে নীলের দিকে। “তোর বা আমার কারোরই এতটা পথশ্রমের অভ্যেস নেই তাই দুজনেই খুব ক্লান্ত ছিলাম এবং স্বাভাবিকভাবেই সকালে আর ঘুম ভাঙেনি। কিন্তু শিবেনদা তো এইসবে অভ্যস্ত। তাই সে ভোর ভোর উঠেই চলে গিয়েছিল মন্দিরে। আমি যখন ঘুম থেকে উঠি তখন শিবেনদাকে দেখলাম ফিরে আসছে। যা বোঝার সব বুঝে গেলাম। শিবেনদাকে যখন জিজ্ঞেস করলাম সে-ও একই কথা বলল। তারপর তো গাছতলায় গিয়ে ওই যে ধ্যানে বসল ব্যস আর তার ওঠার নাম নেই!”

“ঠাকুরমশাইয়ের সাথে কী কথা হল সেইসব কিছু বলল?” তীর্থ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আরে ওটা জানার জন্যই তো চাতক পাখির মতো চেয়ে বসে আছি!” নীল হতাশ হয়ে বলল।

তীর্থ নীলের কথা শুনে পুনরায় চায়ে চুমুক দেয়।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলে পর শিবেন তার ধ্যান ছেড়ে উঠে আসে। তাকে উঠে আসতে দেখেই তীর্থ একেবারে জাপ্টে ধরে শিবেনকে।

“তুমি আমাদের না ডেকেই একা একা চলে গেলে?”

“আরেহ তোমরা ঘুমাচ্ছিলে তাই আর ডাকিনি! আর ওখানে তোমাদের তো কোনো কাজ ছিল না!”

শিবেনের কথায় তীর্থ আর কিছু না বলে ব্যাজার মুখ নিয়ে বসে থাকে। নীল হঠাৎ বলে ওঠে, “তুমি আগে বলো ঠাকুরমশাইকে পাঞ্চালীর কথা কিছু বললে?”

শিবেন একটা বড়োসড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “কী বলব? আমরা নিজেরাও তো জানি না যে পাঞ্চালী কোথায় গেল? কীই বা হল তার সাথে!”

নীল শিবেনের কথায় সায় জানায়।

নীল বলল, “তারপর বলো, ঠাকুরমশাইয়ের থেকে কী কী জানলে?”

শিবেন বলল, “খুব বেশি কিছু না! তবে যেটুকু জানলাম সেটা ভয়ানক!”

তীর্থ সকৌতূহল জিজ্ঞেস করল, “কী কী?”

শিবেন বলে, “যে মহিলাটি বিমলাকে অভিশাপ দিয়েছিল তিনি শয়তানের উপাসক ছিলেন। ওঁর অভিশাপেই বিমলার গর্ভে থাকা সন্তান শয়তানের কবলে পড়ে!”

তীর্থ অবাক হয়ে বলে, “কী বলছ! সাক্ষাৎ শয়তান!”

শিবেন বলে, “হুম! বিমলার একটি বাচ্চার শরীরে দুজনের অস্তিত্ব ছিল। একটা সেই বাচ্চার আত্মা আর একটা সাক্ষাৎ শয়তানের! সময়ের সাথে সাথে সেই শয়তান সম্পূর্ণ শরীরের দখল নিতে থাকে!”

বীরু ভয়ে বলে ওঠে, “ওওও! ওই কারণেই বাচ্চাটার শরীর দিন দিন কেমন কুচকুচে কালো হয়ে যাচ্ছিল ঠিক ওর ওই ডানদিকের মাথাটার মতো!”

শিবেন সম্মতি জানিয়ে বলল, “হুম ঠিক তাই। আচ্ছা আপনি কি একটু মনে করে বলতে পারবেন আপনাদের গ্রামে ভৈরব বাবার পরে আর কোনো তান্ত্রিক বা ওরকম কেউ কখনও এসছিলেন কিনা?”

বীরুকে উদ্দেশ করে প্রশ্নটা করলে বীরু বেশ কিছুক্ষণ ধরে কী যেন একটা ভাবতে থাকে। যেন স্মৃতির পাতা ওলটাতে ওলটাতে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছে সে। তারপর হঠাৎ মনে পড়ায় সে বলে, “হ্যাঁ এসেছিল তো। এক অঘোরী তান্ত্রিক। কী ভয়ানক তার চেহারা! আজও সেই মুখ মনে পড়লে ভয়ে আমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। উচ্চতায় প্রায় ৭ ফুট। সারা শরীর ছাই ভস্মে মাখামাখি। সবচেয়ে ভয়ানক ছিল তার চোখদুটো। টকটকে লাল চোখদুটো সবসময় যেন ভাটার মতো জ্বলত!” এই বলেই বীরু দু-হাত জড়ো করে ভগবানের উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করল।

“কিন্তু কেন বলো তো? ওই বিমলার সাথে কি ওই অঘোরী তান্ত্রিকের কোনো যোগসূত্র ছিল?”

“যোগসূত্র তো ছিলই! ওঁর কারণেই তো এই পিশাচের জন্ম!” শিবেন বলে ওঠে।

নীল, তীর্থ, বীরু তিনজনেই একত্রে সবিস্ময়ে একে অপরের দিকে চেয়ে থাকে।

শিবেন বলে, “হিংসায় জ্বলতে থাকা বিমলা গ্রামবাসীদের নিদারুণ অবহেলা আর যোগেন্দ্রনাথের প্রতি সবার এত ভালোবাসা দেখে ক্রোধের আগুনে জ্বলতে থাকে, তাই প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহায় নিজের সন্তানকে শয়তানের পায়ে বলিদান করে! আর তাকে এই কাজে সাহায্য করে সেই অঘোরী সাধু। এবারে বুঝতে পারছ তো সেই বাউডিহির পিশাচের দুখানা মাথা কেন?”

নীল আর তীর্থ নিঃশব্দে মাথা দোলায়।

এইসময় হঠাৎ নীল একটা প্রশ্ন করে, “আচ্ছা সবই তো বুঝলাম। কিন্তু পিশাচের ওই অদ্ভুত সুরের সম্পর্কটা ঠিক বুঝলাম না!”

বীরু নীলের মুখে সুরের কথা শুনে অবাক হলেন। তারপর বললেন, “বিমলার বাচ্চাটা কথা বলতে পারত না। কথা বলার চেষ্টা করলেই এক অদ্ভুত মিহি তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে আসত। এত তীক্ষ্ণ সেই আওয়াজ বেশিক্ষণ শুনলে মাথা ঝিমঝিম করত। তোমরা কি সেই সুরের কথাই বলছ!”

বীরুর কথা শুনে এবার পুরোটা পরিষ্কার হয়ে যায় শিবেনের কাছে। আসলে পিশাচের সেই পৈশাচিক সুর যা শুনলে মাথার শিরা উপশিরা যেন ছিঁড়ে যেতে চায় সেই সুর আর কিছুই না বেঁচে থাকাকালীন ওই বাচ্চাটির কথা বলতে চাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা যা এখন মৃত্যুর পর পৈশাচিক সুরে পরিণত হয়েছে। পুরোটা শোনার পর এবারে তীর্থ বলে, “তাহলে এবারে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?”

শিবেন নির্ভয়ে বলে ওঠে, “এই গ্রামের সীমান্তবর্তী জঙ্গল!”

বীরু একটু ভয়ে ভয়েই বলল, “কিন্তু ওই জঙ্গল বড়োই ভয়ানক। খুব গভীর জঙ্গল কিন্তু! ওখানে কি কিছু আর তোমরা খুঁজে পাবে?”

শিবেন হালকা হেসে বলে, “গভীরতার মাঝেই তো লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির আদিমতম রহস্য!”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%