একাদশ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

ভোরের সূর্যের প্রথম আলো মুখে পড়তেই হঠাৎ করেই জ্ঞান ফিরে এল শ্রীপতির। জ্ঞান ফিরতেই ধড়ফড় করে উঠে বসেন শ্রীপতি। এদিক ওদিক চাইতেই তার চোখ যায় বটতলার দিকে। গুনিন কই গেল? কাল রাতে কী হল? প্রশ্নগুলো মাথায় আসতেই তিনি বটতলার দিকে ছুটে গেলেন। আর সেখানে গিয়ে যা দেখলেন তাতে তার চোখ কপালে উঠল। যজ্ঞের বেদির আগুন হয়তো অনেক আগেই নিভে গেছে। কিন্তু তার মধ্যে রাখা জিনিসটা দেখেই আঁৎকে উঠলেন শ্রীপতি। গুনিনের ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মাথাটা যজ্ঞের আগুনে ঝলসে গেছে। একটা হালকা ধোঁয়া হাওয়ায় ভেসে উপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এক উদ্ভট মাংস পচার গন্ধ আসছে তা থেকে। শ্রীপতির গা গুলিয়ে উঠল। কয়েক পা পিছিয়ে এসে নগেন, হারানের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় দিলেন তাদের বাড়ির দিকে।

গত রাত্রে কারোরই ঘুম সেরকম গভীর হয়নি। তাই ভোর ভোর আধোঘুমে এমন হাক ডাক চিৎকার শুনেই নগেনের ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমটায় বুঝতে না পারলেও পরে শ্রীপতির গলা বুঝতে পেরে নগেন সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে শ্রীপতি নগেনের দরজায় একের পর এক ঘুষি মেরে চলেছেন।

দুম দুম দুম...

নগেন দরজা খুলতেই তিনি নগেনকে জাপ্টে ধরলেন। নগেন জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি নগেনকে নিয়ে চললেন বটতলার দিকে। এইদিকে এত চিৎকার চেঁচামেচিতে আরও অনেকে বেরিয়ে এসেছে। তারাও একত্রে বটতলায় জড়ো হল। সবাই এসে গুনিনের ঝলসানো কাটা মাথা দেখে আঁৎকে ওঠে। বয়স্ক লোকেরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। এবারে আর কেউ ওদের বাঁচাতে পারবে না এই আশঙ্কায় সবাই হায় হায় করতে শুরু করল। না জেনেশুনে যে পাপ, যে অন্যায় তারা করেছে তার অভিশাপ থেকে কারোর নিস্তার নেই, কারোর না...

**********

“কী বলছেন কী আপনি? গবা? না না সে এরকম কাজ করতেই পারে না। আপনার নিশ্চয়ই কোনো ভুল হচ্ছে!” অবিশ্বাসের সুরে কথাগুলো বলে ওঠে গ্রামের এক প্রবীণ হারাধন বিশ্বাস।

হারাধন বাবুর প্রত্যুত্তরে শ্রীপতি বলে, “আমি ঠিকই বলছি! কোনো ভুল হচ্ছে না আমার! আমি কাল নিজের চোখে গবাকে বটতলায় মাঝরাতে আসতে দেখেছি!”

“মাঝরাতে আপনি ওখানে কী করছিলেন?” এবারের প্রশ্নটা গ্রামের এক যুবকের।

যুবকের কথার সম্মতি জানিয়ে এবারে সমবেত কণ্ঠে সবাই বলে ওঠে, “ঠিক তাই, অত রাতে আপনি একা বেরোলেন কী করে? গুনিন বাবা তো বারবার বারণ করেছিলেন আমাদের বেরোতে!”

“আমার ওই গুনিনের ওপর কোনো বিশ্বাস ছিল না, প্রথম থেকেই”, ভারী গলায় কথাগুলো বলে ওঠে শ্রীপতি। “যে কিনা এত বড়ো এক সাধক সে কিনা গবাকে দিল এত বড়ো একটা কাজ করতে। আরে গবা কি এইসব কাজের যোগ্য নাকি? আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা অঘটন ঠিক ঘটবে আর হলও তাই। কাল রাতে তো নিজের চোখেই দেখলাম। বেশ আপনাদের যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয় তাহলে চলুন এক্ষুনি গবার বাড়ি। জিজ্ঞেস করুন কাল মাঝরাত অবধি সে কোথায় ছিল?”

সবাই শ্রীপতির কথায় সায় দেয়। সবাই সমবেত হয়ে গবার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়।

“গবা… আরে এই গবা… দরজা খোল!”

গবার বাড়ির সামনে সবাই মিলে একত্রিত হয়ে একপ্রকার হইহট্টগোল জুড়ে দিল। কিন্তু ঘরের ভেতর দিয়ে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।

“কী ব্যাপার বলুন তো কোনো সাড়াশব্দই তো নেই!” হারাধনের কথায় নগেন বলে, “ব্যাটা পালিয়েছে মনে হয়!”

এবারে হারাধন সবাইয়ের উদ্দেশে বললেন, “এই দরজা ভাঙো তো সবাই!”

সবাই একত্রিত হয়ে দরজায় প্রথমে করাঘাত তারপর জোরে জোরে আঘাত ফেলতে শুরু করল। সকলের সম্মিলিত আঘাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল সদর দরজাটা। সবাই ভেতরে ঢুকে গবার খোঁজ করতে শুরু করল। কিন্তু কোথায় সবাই? বাড়ি তো পুরোই ফাঁকা। এরই মাঝে বিশাখার এক আর্তচিৎকারে সবাই একটু চমকে উঠল। বিশাখা মানে গবাদের প্রতিবেশী। সবাই মিলে ছুটল সেদিকে যেদিক থেকে চিৎকার ভেসে এল। পুকুরঘাটের দিকে গিয়ে তারা যা দেখল তাতে সবাই ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। একপাশে বাসন নীচে ছড়িয়ে রয়েছে আর তার পাশে বিশাখা পড়ে আছে। মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে গেছে। আর পুকুর ঘাটের কাছে পড়ে আছে দুটো মৃতদেহ। গবার মা আর বউ। দুজনেরই মাথা ধড় থেকে আলাদা আর সমস্ত শরীর ছিন্নভিন্ন। লাশ দুটো থেকে রক্ত পুকুরের জলে মিশে এক লালচে আভা ধারণ করেছে। এই দৃশ্য দেখে কয়েকজন ওখানেই মূর্ছা গেল। বাকি কয়েকজন গেল গবার খোঁজ করতে। শ্রীপতির পক্ষে এত নৃশংসতা সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না। তার শরীর খারাপ করতে শুরু করেছে। ওখানে আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বাড়ি ফিরে আসে সে। বিকেলের দিকে গবার ছিন্নভিন্ন মুণ্ডহীন আধখাওয়া দেহ পাওয়া যায় গ্রামের সীমানায় অবস্থিত জঙ্গলের মধ্যে থেকে। গ্রামের লোকেরা মিলেই গবা আর তার পরিবারের সবার দেহ সৎকার করে ফিরে আসে বাড়িতে। আবার একটা রাত। আবার একটা মৃত্যু। নিজেদের অদৃষ্টকে মেনে নিয়ে এক তীব্র আশঙ্কায় শিকারীর শিকার করার অপেক্ষায় ভাবলেশহীন হয়ে বসে থাকে বাউডিহির মানুষেরা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%