নেহা কর্মকার
সকালে লোকেদের কোলাহলে ঘুম ভাঙে রামুর। প্রথমটায় কিছু বুঝে উঠতে পারে না সে। তারপর হঠাৎ ভীড়ের মধ্যে থেকে নিজের আর শ্রীপতির নাম শুনতে পেয়েই এক ছুটে সদর দরজার কাছে চলে আসে সে। বাড়ির বাইরে তখনও লোকেরা চিৎকার করে বাড়ির ভেতরের সদস্যকে ডেকে যাচ্ছে। প্রথমে দরজা খুলে সামনের দিকে জিজ্ঞাস্য চোখে তাকায় সে। তারপর ভীড়ের লক্ষ্য অনুসরণ করে সেইদিকে তাকাতেই এক তীব্র আর্তনাদ করে ওঠে রামু। বাড়ির উঠোনের একেবারে পশ্চিমদিকের কোণে পড়ে আছে একটা ক্ষতবিক্ষত লাশ। মাথা দেহ থেকে ছিন্ন। সারা দেহের মাংস খুবলে খুবলে খাওয়া। পোশাক দেখে চিনতে অসুবিধা হয় না রামুর। এই লাশ প্রকাশের। এতদিন শুধু সে এই মৃত্যুর কথা শুনে এসেছে। কিন্তু দেখতে যাওয়ার সাহস তার হয়নি। কিন্তু আজ এইরকম বীভৎসতা নিজের চোখের সামনে দেখে ওখানেই মূর্ছা যায় সে। বাইরের কোলাহল আরও বেড়ে যায়। এইবারে একে একে শ্রীপতি, নগেন, হারান, মহেন সক্কলে বেরিয়ে আসে। বাইরের ওই দৃশ্য দেখে সবার চোখ কপালে উঠে যায়। শুধু একজন খুব একটা অবাক হয় না।
প্রকাশের মা তার ছেলের এই অবস্থা দেখে উন্মাদের মতো ছুটে এসে সেই ছিন্ন ভিন্ন দেহের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে। প্রকাশের স্ত্রীও জ্ঞান হারিয়ে ওখানেই পড়ে যায়।
একের পর এক এরকম ভয়ানক আর আজব ঘটনা ঘটতে থাকায় এবারে ঘটনাগুলো গ্রাম ছাড়িয়ে আশেপাশের অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে কেউ আর বাউডিহি গ্রামে আসা তো দূর, গ্রামের সীমানার ধারে কাছে ঘেঁষে না। ইতিমধ্যে দুদিন কেটে গেছে। এখনও কারোর মৃত্যুর কথা আর শোনা যায়নি। সবাই দমবন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে পরবর্তী ভয়াবহ কিছু ঘটার। প্রকাশের ঘটনায় সবাই এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে দুদিন কেউ গ্রামের বাইরে যাওয়ার সাহসটুকু পায়নি। কিন্তু তিন দিনের দিন হারানেরা ঠিক করল এবারে ওই তারক গুনিনের কাছে যাবেই। এই তল্লাটে কিংবা আশেপাশের তল্লাটে উনি ছাড়া এমন আর কেউ নেই যে এই বিপদ থেকে বাউডিহিকে বাঁচাতে পারে। পরের দিন ভোর হতেই সকলে একত্রে রওনা দিল পাশের গ্রাম চন্দডিহির উদ্দেশ্যে।
**********
“কী রে! একমনে কী এত চিন্তা করছিস?” ভাবনার মাঝে এতটাই ডুবে ছিল নীল যে কখন তীর্থ এসে তার পিছনে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি। নীলের ভাবনার জাল ছিন্ন হয় তীর্থের হঠাৎ এসে পিঠে চাপড় মারার কারণে।
“উফ! এই তুই কি হাত না চালিয়ে কথা বলতে পারিস না?” মুখ বিকৃত করে কথাগুলো তীর্থের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে নীল।
“এই সরি বস, একটু জোরে হয়ে গেল”, বলেই জিভ কাটে তীর্থ।
পাশের ঘর থেকে রানু মাসি বেশ একটু চিল্লিয়ে বলে ওঠে, “তা কী করবে দাদাবাবু? তোমাকে কখন থেকে বাইরের ঘর থেকে ডেকে গেলাম তুমি তো নিজের জগতেই হারিয়ে আছো! সাড়াই দিলে না, তাই তো তীর্থ দাদাবাবুকে তোমার ঘরে পাঠালাম, চাপর মেরে তোমার ঘুম ভাঙাতে”, বলেই ফিক করে হেসে ফেলে রানু মাসি। সেই দেখে নীল আরও চোটে যায়। তীর্থ এবারে রানু মাসিকে গরম গরম কফি বানিয়ে আনতে বলে নীলের মুখোমুখি চেয়ারে এসে বসতে বসতে বলে, “কী ভাবছিস বল তো এত, কোনো গুরুতর সমস্যা নাকি?” নীল চেয়ারে আরও একটু শরীরটা এলিয়ে দেয়, “গুরুতর কিনা জানি না কিন্তু খুবই অদ্ভুত ব্যাপারটা!”
নীলের মুখে বিস্তৃত চিন্তার ছাপ নজর এড়ায় না তীর্থের। সে আবার জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁ রে তোর গ্রামে কারোর কিছু হল নাকি? আর তা ছাড়া তুই গ্রামে গেলি না এবারে? কী যেন নাম… বা… হ্যাঁ বাউডিহি। পরীক্ষা তো সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে!”
গ্রামের কথা শুনতেই নীলের ভ্রূ জোড়া আরও কিছুটা সংকুচিত হল।
নীল বলে উঠল, “বাউডিহি নয় চাঁদডুবি আমার গ্রাম। তবে আমার গ্রামে যেতে হলে এই বাউডিহি দিয়েই যেতে হয়!”
রানু মাসি কফি দিয়ে গেলে নীল তীর্থকে তার পাশের গ্রামে মানে বাউডিহিতে ঘটে চলা সমস্ত অলৌকিক ঘটনাগুলো একে একে বলতে শুরু করে। ঘটনাগুলো খুব মন দিয়ে শুনতে থাকে তীর্থ।
তীর্থ আর নীল খুবই ভালো বন্ধু। নীল গ্রামের ছেলে হলেও তীর্থ কখনওই ভেদাভেদ করেনি নিজেদের মধ্যে। ওদের বন্ধুত্ব, আলাপ পরিচয় সেই কলেজ লাইফ থেকে। এখন দুজনেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করছে। তীর্থ প্রত্যেকবারই দেখেছে সেমিস্টার শেষ হলেই নীল অন্তত দুদিনের জন্য হলেও তার দেশের বাড়ি মানে চাঁদডুবি গ্রামে যায়। ও বলে ওর গ্রাম নাকি ওর কাছে অক্সিজেনের মতো। তাই পরীক্ষার পর একবার সেখানে যেতে না পারলে ও পড়ায় কিছুতেই মন বসাতে পারবে না। কিন্তু এবারে সেই নীলই যখন পরীক্ষার এতগুলো দিন পরেও ওখানে যায়নি তখন নিশ্চয়ই শারীরিক কোনো গণ্ডগোল হয়েছে এই ভেবে খোঁজ নিতে নীলের ভাড়া বাড়িতে চলে আসে তীর্থ। কিন্তু এসে নীলকে ওরকম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে তীর্থ বুঝতে পারে নিশ্চয়ই গ্রামে কোনো সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এখন নীলের মুখ দিয়ে সমস্ত ঘটনা শুনে তীর্থ আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
“উফ বাবা, এই ব্যাপার, ওফ… হ্যাঁ রে তুই এইসবে বিশ্বাস করিস হ্যাঁ? কীসব ভূত প্রেত পিশাচ! ওরে এই বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়েও এইসব গাঁজাখুরি গল্পতে যে তোর এত বিশ্বাস তা আমি আশা করিনি! শোন ওইসব কিছুই নয়, দেখ গিয়ে সব গ্রামের মানুষদের রটানো গল্পকথা! কাকিমাকে বল এত চিন্তা না করতে।”
নীল এবারে তীর্থের কথায় একটু বিরক্তই হয়। “তীর্থ তুই মানিস আর নাই মানিস। এই যুগে দাঁড়িয়ে এখনও এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যার কার্যকরণ যুক্তির কষ্ঠিপাথরে যাচাই করা যায় না। সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনায় বা বিজ্ঞানমনস্কতা দিয়েও সেইসব অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কলকাতার আলো ঝলমলে পরিবেশে বসে বাউডিহির গা ছমছমে পরিবেশ তুই কল্পনাও করতে পারছিস না!” একটানা কথাগুলো বলে যায় নীল।
“আরে আরে ঠিক আছে এত চটে যাচ্ছিস কেন?”
“দেখ এই খবরটা”, বলেই নীল তীর্থের দিকে পেপারটা এগিয়ে দেয় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অঙ্গুলিনির্দেশ করে। তীর্থ পেপারটা নিয়ে সেখানে কী লেখা আছে পড়তে থাকে। পড়তে পড়তে তার চোখগুলো যেন একবার জ্বলজ্বল করে ওঠে।
“এ তো তোর এই গ্রামেরই...”
“যার কথা ওখানে লিখেছে সেটা প্রকাশ কাকু। গত পরশুদিন রাতেই উনি মারা যান!” বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীল।
“তুই চিনতিস ওঁকে?” তীর্থ জিজ্ঞেস করে।
“হুম!” উত্তর দেয় নীল।
“আচ্ছা তুই সেই বলছিলি না, বাউডিহিতে তোদের কে থাকে?”
নীল এবার একটু অবাক হয়, “হ্যাঁ বীরেনদা। মানে ওঁর মা শান্তা মাসি আমাদের বাড়িতে কাজ করত, বীরেনদা তখন ছোটো ছিল বলে মাসি বীরেনদাকেও নিয়ে আসত আমাদের বাড়ি। সেই থেকেই আলাপ। আমরা ছোটোবেলায় একসাথে খেলতামও। কিন্তু কেন বল তো?”
তীর্থের চোখ যেন চকচক করে ওঠে।
“শোন তুই ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু কর। এবারে আমিও তোর সাথে তোর গ্রামে যাব বেড়াতে!”
তীর্থের এমন কথা শুনে নীল একেবারে হকচকিয়ে যায়। “তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুই বুঝতে পারছিস না বাউডিহির কী অবস্থা এখন। আমাদের গ্রামে যেতে হলে এই বাউডিহি দিয়েই যেতে হবে! আর সেখানে তোর যদি কিছু হয়ে যায় তখন সমস্ত দায় আমার ঘাড়ে এসে চাপবে। না না আমি তোকে নিয়ে এত বড়ো রিস্ক কিছুতেই নিতে পারব না!”
নীল সমানে মানা করতে থাকে কিন্তু তীর্থ একেবারে নাছোড়বান্দা, সেও ছাড়ার পাত্র নয়। অবশেষে নীল তীর্থের জেদের কাছে হার শিকার করে। কিন্তু নীল এও বলে যে সকালের আলো থাকতে থাকতেই বাউডিহি গ্রাম পেরোতে হবে। তা না করে তীর্থ নিছক কৌতূহলের বশে যদি সে মনে করে থাকে যে সে বাউডিহির রহস্য উদঘাটন করবে তাহলে নীল কিছুতেই যাবে না। তীর্থ নীলের শর্তে রাজি হয়ে যায় এবং তৎক্ষণাৎ নিজের ব্যাগপত্র গোছানোর জন্য বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়।
“এই এই ধীরে যা, এত তাড়াহুড়ো কিসের? আমরা কি আজই বেরাব নাকি?” চিন্তিত মুখে তীর্থর দৌড়ে যাওয়া লক্ষ করে কথাগুলো বলে ওঠে নীল।
“আজ বেরাই আর পরশু! যাচ্ছি তো এটাই ফাইনাল!” তীর্থর কথা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
নীল একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মন সমানে কু-ডাক ডেকে চলেছে। একটা চাপা অস্বস্তি ঘিরে ধরছে যেন তাকে। ও কি তীর্থের কথা শুনে ঠিক করল? না জানি কী ঘটতে চলেছে তাদের জীবনে? নীল তীর্থকে খুব ভালো করেই চেনে। ওর গ্রামে যাওয়ার আসল উদ্দেশ্য যে শুধু বেড়াতে যাওয়া নয় তা নীল ভালোই বুঝতে পেরেছে। যে করেই হোক ওকে ওর কার্যসিদ্ধি থেকে আটকাতেই হবে। তীর্থ চিরকালই শহরে বড়ো হয়ে এসেছে। গ্রামের অতিপ্রাকৃত ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই নেই। তীর্থ এইসবে বিশ্বাস না করলেও নীল কিন্তু পুরো ব্যাপারটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না।
নীলের সংবিৎ ফেরে রানু মাসির ডাকে। তার রান্না হয়ে গিয়েছে, এর মানে নীলকে এখন স্নানে যেতে হবে। ঘড়িতে একবার সময়টা দেখে নেয় সে। প্রায় ১টা ছুঁইছুঁই। নীল আর দেরি না করে টাওয়ালটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়।
**********
“না না আমার এখন সময় নেই, তোরা যা তো দেখি, আর জ্বালাস না আমায়!” জলদগম্ভীর গলায় আদেশ দেয় তারক গুনিন। তার এমন আদেশ শুনে এক লাফে তার পায়ের সামনে লুটিয়ে পড়ে কাচুমাচু মুখ নিয়ে নগেন বলে, “এরকম বলবেন না বাবা, এখন আপনি ছাড়া আর কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না। আপনিই এখন একমাত্র ভরসা আমাদের! দয়া করে আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না। বড়ো আশা করে এসছি আপনার কাছে!”
নগেনকে দেখে হারান, মহেনও তারক গুনিনের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না দেখে খানিকটা বিরক্ত হয়েই তারক গুনিন বলে, “আচ্ছা বেশ বেশ ওঠ দেখি এবার, আমি যাব তোদের সাথে। ছাড় ছাড় পা ছাড়!” তারক গুনিন যেতে রাজি হওয়ায় এবারে সকলের চোখেমুখে একটা উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে।
নগেন বলে ওঠে, “উফ বাবা আপনি বাঁচালেন আমাদের। জয় বাবা তারক বাবার জয়! জয় বাবা তারক বাবার জয়!”
“থাম আর জয়ধ্বনি দিতে হবে না। চল দেখি এবার, তোদের গ্রামের পানে রওনা দিই!” তারক গুনিনের কথা শেষ হতেই হারান, নগেন আর মহেনের চোখেমুখে এক ভয়ের রেখা ফুটে উঠল। তারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। তাদের চোখমুখের পরিবর্তন তারক গুনিনের নজর এড়ায় না। সে আবার তার জলদগম্ভীর স্বরে বলে ওঠে, “কী রে, এই তো এতক্ষণ আমার মাথা খাচ্ছিলি, কী হল হঠাৎ? সিদ্ধান্ত বদলালি নাকি?”
হারান একেবারে হা হা করে ওঠে, “না না বাবা এ কী বলছেন, এখন এই অবস্থায় আপনিই একমাত্র আমাদের রক্ষক!”
“তবে? তোদের এত দুশ্চিন্তা কীসের?”
“আসলে বাবা এখানে পৌঁছতেই তো দুপুর গড়িয়ে গেল। এখন আমাদের গ্রামের দিকে রওনা হলে যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে...!”
“তো? ভয় করছে? হা হা হা হা...!”
বাতাস কাঁপিয়ে গম্ভীর গলায় এক চোট হেসে নিলেন তারক গুনিন। তার হাসির দমকে নগেনরা চমকে ওঠে।
“আমি তোদের সাথে যাচ্ছি তাতেও তোদের এত ভয়? বেশ, চিন্তা করিস না। আমি তোদের প্রত্যেকের গাত্র বন্ধন করে দিচ্ছি। কোনো প্রেত পিশাচ তোদের টিকিটাও ছুঁতে পারবে না!”
নগেনদের চোখে-মুখে পুরোনো উজ্জ্বলতা ফিরে আসে তারক গুনিনের কথায়। আবার শোনা যায়, “জয় বাবা তারক বাবার জয়! জয় বাবা তারক বাবার জয়!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন