দ্বাদশ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

এক নির্জন গ্রামের নাম না জানা নদীর পারে শ্মশানের অন্ধকারে একা একা বসে আছে এক তান্ত্রিক। এই ১৫ বছরে সে অনেক জায়গায় ঘুরেছে, অনেক সাধু সন্ন্যাসীদের সান্নিধ্যেও এসেছে। দিনের পর দিন কঠিন সাধনার মাধ্যমে নানান শক্তি সে অর্জন করেছে। কিন্তু এখন তার কিছু বিশেষ শক্তি লাভের পালা আর তার জন্য তাকে করতে হবে আরও ভয়াবহ কিছু সাধনা। সেই সাধনার জন্য দরকার একটা শবদেহ। সেই কারণেই সে এই নির্জন শ্মশানঘাটে বসে আছে শবদেহের অপেক্ষায়।

এমন সময় সে দেখতে পায় নদী বেয়ে একটা মৃতদেহ ভেসে আসছে। তান্ত্রিকের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। তাহলে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে আর বেশি দেরি নেই। কিন্তু মৃতদেহটা কাছাকাছি আসতেই সে কিছুটা থমকে যায়। কারণ মৃতদেহটি মুণ্ডহীন এবং ক্ষতবিক্ষত। শুধু তাই নয়, দেহ থেকে অনেক মাংস যেন খসে পড়েছে। তান্ত্রিক একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে দেহটাকে দাঁড় করায় তারপর সেটাকে টেনে পাড়ে নিয়ে আসে। দেহটার এমন অবস্থা দেখে তার কৌতূহল যেন আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ সে বুঝতে পারে এইভাবে মুণ্ডচ্ছেদ করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সে দেহটাকে মাটিতে তুলে এনে এক বিশেষ সাধনায় বসে।

দু-চারটে শুকনো কাঠ জড়ো করে তাতে আগুন জ্বালায়, তারপর তার ওপরে চাপিয়ে দেয় একটা মাটির সরা। কাঁধের পুটলি থেকে বের করে আনে কিছু বিশেষ উপাচার। সেই উপাচারগুলিকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করার পর জলে ভেসে আসা শবদেহটা থেকে একটুকরো মাংস ছিঁড়ে নিয়ে তার ভেতরে দেয়। সেই সাথে একটা বিশেষ গুঁড়ো ছড়ায় সরার ওপরে। তৎক্ষনাৎ সড়ার ওপর আগুন জ্বলে ওঠে। চারিপাশ ধোঁয়ায় ভরে যায়। সেই ধোঁয়ায় দৃশ্যমান হয় এক বীভৎস মূর্তি। তার দেহ যেন নরকের গহীন অন্ধকার হতে উঠে এসেছে। সবচেয়ে ভয়ানক তার ঊর্ধ্বতন অংশ। তার দুটো মাথা সাথে চারটে সবুজাভ জ্বলজ্বলে চোখ। চোখগুলো ভাটার মতো জ্বলছে। তান্ত্রিক দেখল সাধনায় বসা এক ব্যক্তির শরীর থেকে অনায়াসে সেই পিশাচ ছিঁড়ে ফেলল লোকটার মুণ্ড। তারপর তার শরীরটাকে প্রবল আক্রোশে ছিন্নভিন্ন করতে লাগল। শরীরের সমস্ত রক্ত এক লহমায় শুষে নিল। পেটের নাড়িভুঁড়ি বার করে গ্রোগাসে সেইগুলো খেতে শুরু করল। তারপর এক তীব্র ঘৃণা নিয়ে দেহটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল নদীর জলে। পিশাচ অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথেই চারিপাশের ধোঁয়া কেটে গেল। তান্ত্রিকের কপালে দেখা গেল বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুণ্ডচ্ছেদ করার আগে সে সেই ব্যক্তির মুখ দেখেছে। তাকে চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি তার। চাঁদডুবি গ্রামের নামকরা তারক গুনিন। আর নদীর ঘাটটা চিনতেও তার বেশি দেরি হয়নি। এই ঘাট তার বহুদিনের চেনা। তার ছোটোবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই নদীর ঘাটের সাথে। সে বুঝতে পারে তার এখন কী করণীয়। সাথে সাথে নিজের পুটুলিটা নিয়ে সে পা বাড়ায় উত্তরের দিকে, কারণ সেইদিকেই তো রয়েছে বাউডিহি গ্রামের পথ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%