নেহা কর্মকার
সূর্য এখন মাথার ওপরে। শিবেন, নীল, তীর্থ সবাই এসে উপস্থিত হয়েছে গ্রামের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত জঙ্গলের প্রান্তে। বীরুও এসেছে ওদের সাথে। শিবেনের মতে এই জঙ্গলে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু পাওয়া যাবে কিন্তু এত বড়ো জঙ্গলে কিছু খুঁজে পাওয়া খড়ের গাদায় সূঁচ খুঁজে পাওয়ার মতোই অবস্থা।
শিবেন তো একমনে খুঁজে যেতেই ব্যস্ত, কী যে খুঁজছে সে কিছুই তীর্থের বোধগম্য হচ্ছে না। তার মন এখন চরম বিরক্তিতে ভরে উঠেছে। এখন মনে হচ্ছে, না এলেই ভালো হতো। বেশি রোমাঞ্চ অনুভব করতে এসে না এখন জঙ্গলের বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড় খেতে হয়।
এগোতে এগোতে অনেকটা জঙ্গলের গভীরে চলে এল ওরা। এবারে ওদের খানিকটা অবাক হওয়ার পালা। কারণ যতই ওরা এগোচ্ছে ততই গাছপালা গভীর হওয়ার বদলে হালকা হচ্ছে। খুব অদ্ভুত লাগলেও এটাই সত্যি। বীরু কাকার মতে, হয়তো সেই অঘোরী তান্ত্রিক এসে এখানে বসবাস করতেন বলে এরকম হলেও হতে পারে কিন্তু সে তো অনেকদিনের আগের কথা। এতদিনেও এখানে গাছপালা জন্মায়নি? এটা কিন্তু বড়োই অদ্ভুত।
আরও কিছুটা এগোতেই এবারে বিকট মাংসপচা গন্ধে শিবেন বাদে সকলের গা গুলিয়ে উঠল।
তীর্থ ঘৃণায় বলে উঠল, “ইশ মা গো! অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে এল!”
নীলও বলে উঠল, “নির্ঘাত কোনো জন্তু জানোয়ার মরে পড়ে আছে আর তার থেকেই এমন বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে!”
বীরু বেশ খানিকটা অবাক হয়ে বলল, “জন্তু! আমি তো সেই ছোটো থেকে গ্রামে, এই জঙ্গল থেকে কোনো জন্তু ঢুকেছে বলে শুনিনি!”
তীর্থ বলল, “তোমার বয়স হয়েছে তাই তোমার মনে নেই। এমন বিকট গন্ধ আর কোথা থেকেই বা আসবে?”
বীরু নিশ্চিত হয়ে বলল, “না গো বাবু আমার কোনো ভুল হচ্ছে না। এই জঙ্গলে কোনো জন্তু নেই!”
নীল বলল, “তাহলে এই জঙ্গলে কেউ ঢোকে না কেন?”
বীরু পরিষ্কারভাবে বলল, “আরে এদিকটায় রাজবাড়ি ছিল! সে অনেক বছর আগের কথা। এই রাজবাড়ির লোকেরা সব ছেড়ে শহরে চলে গেছে। এখন ওই রাজবাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। আর তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ কোনো গ্রামে পরিত্যক্ত রাজবাড়ি থাকলে কী কী সব ঘটনা রটে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, তার ওপর ওই অঘোরী সাধু এখানে এসে থাকার পর আর কেউই এদিকটায় আসার সাহস পায় না!”
শিবেন এবারে হঠাৎ বলল, “আমাকে ওই রাজবাড়ির দিকটায় নিয়ে চলুন!”
শিবেনের কথা শুনে বীরু একেবারে হা হা করে ছুটে এল কিন্তু শিবেন কোনো কথা শোনার পাত্র নয়। উপরন্তু তার কটা চোখের রাঙানি দেখে বীরু মুখ কাচুমাচু করে আমাদের সেই রাজবাড়ির দিকে নিয়ে চলল।
রাজবাড়ির যত কাছাকাছি এগোচ্ছে ওরা ততই সেই দুর্গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বাতাসে এমন বিকট গন্ধে দম নেওয়াও মুশকিল হচ্ছে। এবারে তীর্থ থেমে গিয়ে বলল, “ব্যস আর আমি এগোতে পারছি না। এবারে খোলা বাতাসে দম না নিতে পারলে নির্ঘাত এখানেই মারা পড়ব!”
নীল আর বীরুকে দেখেও মনে হল তারাও তীর্থের কথায় সায় জানাচ্ছে। শিবেন ওদের অবস্থা দেখে কিছুটা মুচকি হাসে। তাদের সকলের অবস্থা সত্যিই খুব শোচনীয়।
শিবেন বলল, “বেশ তোমাদের আর এগোতে হবে না! তোমরা বরং এখান থেকে ফিরে যাও। আমি আমার কাজ সেরে ঠিক পৌঁছে যাব!” এই বলে শিবেন একা একা সামনের দিকে এগিয়ে গেল হনহন করে। নীল, তীর্থ, বীরু ওখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে নীল বলল, “এতদূর এসে আসল জায়গায় মিস করব? না না তোমরা বরং এখানে দাঁড়াও আমি একটু এগিয়ে দেখে আসি কী হচ্ছে!”
বীরু নীলের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে বলে, “দাদাবাবু একা যেও না। উনি সাধক মানুষ তাই ওঁর কাছে কোনো ব্যাপার না, কিন্তু আমরা তো সাধারণ মানুষ বলো। এই যে এই দুর্গন্ধ এটা কি তোমার স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে?”
তীর্থ হঠাৎ, “আচ্ছা বীরু কাকু, তুমি বলছিলে যে বিমলাকে নাকি শেষবার সবাই এই জঙ্গলেই ঢুকতে দেখেছিল। আচ্ছা এরকম তো হতেই পারে যে বিমলা অনেকদিন আগেই মারা গেছে, আর তার লাশই পচে পচে এরকম দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে!”
এই ব্যাপারটা কিন্তু বীরুর মনে সত্যিই আসেনি। এবারে সে ধন্দে পড়ল।
তীর্থও এবারে বীরুকে বলে, “চলো চলো এগিয়ে দেখাই যাক শিবেনদা কী করে!”
নীল বলে, “তুই তো এতক্ষণ ধরে এগোবি না বলছিলি!”
তীর্থ বলল, “ঠিক আছে এখন তো বলছি, চল এবারে! বীরু কাকু তুমি বলো রাজবাড়িটা কোনদিকে?”
বীরু বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ ওই তো ওইদিকে, এস, সাবধানে এগোবে!”
পুনরায় তিনজনে সামনের দিকে এগোতে থাকে।
রাজবাড়ির কাছে এসে কিন্তু শিবেনকে দেখা গেল না। রাজবাড়ির সামনে, পিছনের দিকে সব জায়গাই খোঁজা হল কিন্তু শিবেনকে খুঁজে পাওয়া গেল না। ওইদিকে তীর্থ এত বড়ো রাজবাড়ি দেখে সত্যিই খুব অবাক হয়েছে। এখন না হয় এই বাড়ির ভূতুড়ে অবস্থা কিন্তু একটা সময় যে এই রাজবাড়ি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল তা বোঝাই যায়।
কোথাও শিবেনকে না পেয়ে নীল বলল, “আমার মনে হচ্ছে শিবেনদা ভেতরেই গেছে! চলো একবার ভেতরে গিয়ে দেখে আসি!” বাকি দুজন নীলের কথায় সম্মতি জানিয়ে যেই না ভেতরে পা বাড়াবে অমনি রাজবাড়ির একটা নির্দিষ্ট কক্ষ থেকে ভেসে এল গুরুগম্ভীর গলার স্বর। “এইদিকে! এইদিকে চলে এস সবাই!”
সবাই ওই গলার স্বর অনুসরণ করে যেখানে এসে পৌঁছাল সেখানে দুর্গন্ধটা মাত্রা ছাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। নীল বলে, “উফ! আর পারা যাচ্ছে না শিবেনদা দরজাটা খোলো আমার মনে হয় এখানেই কোনো জন্তু মরে পচে আছে!” নীলের কথা শুনে শিবেনের মুখে একটা বাঁকা হাসি খেলে যায়।
“তোমাদের কি সত্যিই মনে হচ্ছে এখানে কোনো জন্তু মরে পড়ে আছে?” শিবেনের কথায় নীল, তীর্থ আর বীরু বেশ অবাক হয়!
তীর্থ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “মানে কী আছে ভেতরে? তুমি দেখেছ?”
শিবেন বলে, “ভেতরে যিনি আছেন তাকে দেখে তোমাদের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাবে এইটুকু বলতে পারি!” এই বলে একটা অদ্ভুত চাপা হাসি হাসতে হাসতে এক ধাক্কায় দরজাটা ভেঙে ফেলল শিবেন। সেকেলের পুরোনো দরজাটা ভাঙার সাথে সাথে ভেতরের দুর্গন্ধময় তীব্র অন্ধকার নীলেদের মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বীরু আর সহ্য করতে পারে না। কিছুটা দূরে ঝোপজঙ্গলের মধ্যে গিয়ে সকালের খাওয়া সমস্ত খাবার উগড়ে দিলেন। তীর্থও প্রবল ঘেন্নায় ওয়াক করতে লাগল। শুধু নীল দাঁড়িয়ে রইল বিস্ফারিত চোখে। এতক্ষণ অন্ধকার থাকার দরুন খেয়াল না করলেও এবারে অন্ধকারে চোখ ভালোই পরিষ্কার হয়েছে। শিবেনের ধাক্কা মারার সাথে সাথে দরজাটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে গিয়েছিল, সাথে ওই ঘরের একপাশের দেওয়াল থেকেও চুন, সুড়কি, ইট যা ছিল তা জায়গায় জায়গায় পড়ে গিয়ে বাইরের সামান্য আলো ভেতরে আসার উপায় করে দিল আর সেই অল্প আলো অল্প আঁধারেই নীল দেখল এক ভয়াল দর্শন জীব বসে আছে। তার সারা শরীরে পচন ধরেছে। সেখান থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে মাংস! অজস্র পোকামাকড় ঘিরে রয়েছে জীবটাকে। মনে হচ্ছে জীবটার দেহ থেকে সমস্ত মাংস, রস, মজ্জা শুষে খাচ্ছে সেগুলো। জীবটার মধ্যে কিন্তু এখনও প্রাণের অস্তিত্ব আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে বহুকাল পরে তার চোখে আলো এসে পড়েছে কারণ আলোটা আসার সাথে সাথেই সে বিকট চিৎকার করতে শুরু করেছে। এক তীব্র গোঙানি, মনে হচ্ছে আলো না কেউ আগুনের হলকা ছেড়ে দিয়েছে তার গায়ে।
নীল ভয়ার্ত স্বরে বলে, “এ… এ… এটা কী? কী এটা?”
শিবেনের মুখের বাঁকা হাসি এখনও দৃশ্যমান, তার মুখ দিয়ে শুধু একটাই নাম শোনা যায়, “বিমলা!”
**********
এখন সূর্য অস্ত গিয়ে পশ্চিম দিগন্তে ছড়িয়ে রেখে গেছে এক মায়াবী লাল আভা। বীরু সেদিকেই বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে ছিল, হুঁশ ফিরল নীলের ডাকে।
“বীরু কাকু এখন কেমন বোধ করছ?” নীলের কথা শুনে এবারে বীরু হালকা করে ওপরে নীচে মাথা দোলায় মানে সে এখন সুস্থ বোধ করছে।
তীর্থও পাশেই বসে ছিল, এবারে সে হঠাৎ বলল, “বি… বিমলার এ… এরকম অবস্থা হল কী করে ভাই? কী বীভৎস, আমার তো এখনও গা-হাত-পা কাঁপছে। বাউডিহিতে যে আছে সে নয় প্রেত কিন্তু বিমলা তো জীবন্ত প্রেতে পরিণত হয়েছে!”
নীল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “সবই অতিরিক্ত হিংসা আর লোভের ফল! সেদিন যদি সে নিজের রাগকে সংবরণ করতে পারত, যোগেন্দ্রকে মেনে নিয়ে একসাথে সংসার করত তাহলে আজ কত সুন্দর একটা সংসার পেতে পারত সে! শুধু বিমলার অতিরিক্ত হিংসার জন্যই আজ যোগেন্দ্রর মতো ভালো মানুষ শেষ হয়ে গেল, নিজের সন্তান অমন অভিশাপ নিয়ে জন্মাল আর মৃত্যুর পর অমন পিশাচে পরিণত হল, যে কিনা এখন গোটা বাউডিহির ত্রাস!” নীলের কথায় তীর্থ, বীরু দুজনেই সমর্থন জানায়। এতক্ষণে সেই মাংসপচা গন্ধ বিদায় নিয়েছে। শিবেন কী একটা মন্ত্রোচ্চারণ করে সাদা মতো জিনিস ছড়াতেই বাতাসে একটা পবিত্র সুবাস ছড়িয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সেই দুর্গন্ধও দূর হয়।
বীরু জিজ্ঞেস করে, “কিন্তু বিমলার এই হাল হল কী করে?”
“সবই কর্মফল!” ওদের কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ এসে দাঁড়ায় শিবেন! “আজ থেকে বহু মাস আগে বিমলা এসেছিল এই জঙ্গলে অঘোরী তান্ত্রিকের কাছে তার হিংসা চরিতার্থ করতে। যোগেন্দ্রর প্রতি হিংসা তো সেই প্রথম থেকেই ছিল তার কিন্তু গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষের কাছ থেকে লাঞ্চিত হতে হতে সেই হিংসাই জন্ম নেয় এক ভয়ানক ক্রোধে। সেই ক্রোধের বশেই সে অঘোরী তান্ত্রিকের কথায় নিজের ছেলেকে বলিদান দেয় শয়তানের কাছে, যোগেন্দ্রকে শেষ করার উদ্দেশ্যে। মূর্খ বিমলা বুঝতেও পারে না কী চরম ভুল সে করল। সেই তান্ত্রিক বিমলাকে কোনো সাহায্য করতে নয় বরং নিজের ভয়ানক কোনো সাধনার কাজে তাকে লাগিয়েছিল। সেই সাধনার জন্য তার প্রয়োজন ছিল এক বীভৎস প্রেতের যে হবে মারাত্মক শক্তিশালী একইসাথে হবে ধূর্ত!”
নীল জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু প্রেতের জন্মে অঘোরীর কী লাভ ছিল?”
শিবেন বলল, “লাভ অনেক ছিল। সেই বাচ্চাটি অবহেলা, ঘৃণা এবং ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে করতেই মারা যায়। অঘোরী নিজের শক্তি প্রয়োগ করে তার আত্মাকে বানিয়েছিল এমন এক অসীম ক্ষুধার অধিকারি প্রেত যার ক্ষুধা নিবারণ কখনও সম্ভব নয়। ক্ষুধার যেমন কোনো লয় নেই ঠিক সেরকম ওই পিশাচেরও ক্ষুধার কোনো অন্ত নেই। সেই ক্ষুধিত প্রেত শিকার করে নিজের ক্ষুধা নিবারণ করছিল ঠিকই কিন্তু তোমাদের কী মনে হয় সেই মৃত মানুষগুলো কি মুক্তি পেয়েছিল?”
এই কথা শুনে সবাই বিস্ফারিত হয়ে শিবেনের দিকে তাকিয়ে থাকে। শিবেন ক্রমাগত বলে যায়, “সেই প্রেতের শিকার করা প্রত্যেকটা মানুষের আত্মা বন্দি হচ্ছিল সেই অঘোরীর কাছে। অমরত্ব পেতে হলে তো এইসব তাকে করতেই হতো! বাউডিহির প্রেত তো একটা মাধ্যম মাত্র!”
শিবেনের কথায় সবাই হতচকিত হয়ে যায়। একটা পিশাচের আবির্ভাবের পেছনে এতগুলো মানুষের এমন এমন সব কাহিনি থাকতে পারে তা সত্যি না শুনলে বা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না নীল বা তীর্থর!”
বীরু বলল, “বিমলার এই অবস্থার কারণ না হয় বুঝলাম কিন্তু প্রেতকে শেষ করার উপায় কোথায় হল?”
শিবেন একটু হেসে বলে, “প্রেতকে শেষ করার উপায় তো ওই ঘরেই রয়েছে!”
তিনজনই এই কথা শুনে আরও অবাক হয়ে যায়।
ওরা যে কিছু বোঝেনি তা তাদের মুখ দেখেই স্পষ্ট। “ওই প্রেতের সমস্ত শক্তির আধার রয়েছে বিমলার শরীরে। অঘোরী তান্ত্রিক অসাধারণ বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তিনি এই গ্রামের মানুষের ভয়কে কাজে লাগান। এই জঙ্গলের একটা দুর্নাম আগে থেকেই ছিল, অঘোরী আসার পর সেই দুর্নাম আরও বৃদ্ধি পায়। সে খুব ভালো মতোই জানত, জঙ্গলের ধারে কাছে কেউ আসে না, আর বিমলাও গ্রামবাসীদের চক্ষুশূল, তাই সে উধাও হল নাকি মারা গেল সেই নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাবে না। এই উপায়টাকেই সে কাজে লাগায়। সকলের চোখের আড়ালে বিমলাকে লুকিয়ে রাখে এখানে আর এমন একটা ঘরে তাকে লুকিয়ে রাখে যার সামনে ঝোপ জঙ্গলে ভর্তি। ফলে সাপখোপের ভয়ে এদিকে কেউ পা মাড়াবে না!” এই বলে শিবেন থামে। তার সমস্ত কথা শুনে নীল, তীর্থ আর বীরু তিনজনই অবাক চোখে নিশ্চুপ হয়ে থাকে খানিকক্ষণ।
“এবার যদি তোমরা জিজ্ঞাসা করো যে বিমলার এই অবস্থা হল কী করে তাহলে তোমাদের আর একটা কথাও জানিয়ে রাখি, তোমরা যাকে চোখের সামনে দেখলে তার মৃত্যু অনেকদিন আগেই ঘটে গেছে! শুধু সেই আত্মা বন্দি হয়ে রয়েছে সেই শরীরে! সেই শরীর গলে পচে গিয়ে হাড় বেরিয়ে গেলেও বিমলার আত্মার মুক্তি ঘটবে না যতক্ষণ না সে নিজেই নিজের কাজে অনুতপ্ত হয় এবং কোনো পুণ্যাত্মা সাধক তাকে মুক্ত করে!” এইবারের কথাটা শুনে তিনজনই অবাক বিস্ময়ে এবং কৌতূহলী চোখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।
নীল বিস্ময়ে বলল, “কী বলছ কী? এও সম্ভব?”
শিবেন একটু বাঁকা হাসি হেসে বলে, “সবই সম্ভব!”
বীরু বাবু একটা ক্লান্ত হাসি হেসে বলেন, “বিমলার কি ভাগ্য! মৃত্যুর পরও তার শান্তি নেই!”
শিবেন বলল, “সবই বিমলার কর্মফল। কী জানেন তো একটা কথা, মানুষের প্রত্যেকটা কর্মের হিসাব তোলা থাকে নির্দিষ্ট জায়গায়। প্রত্যেককেই নিজের কর্মফল একজন্মেই ভোগ করে যেতে হয়। যাক গে সে সব কথা, এখন আমাদের আসল কাজটা সেরে ফেলতে হবে। বেশি দেরি হয়ে গেল খুব মুশকিল। বাউডিহির পিশাচ একবার যদি জেগে ওঠে তাহলে তার শক্তি হবে আগের থেকেও দ্বিগুণ। তখন সে নারকীয় মৃত্যু খেলায় মেতে উঠবে। তাই তার আগেই তাকে বিনাশ করতে হবে!” এই বলেই শিবেন আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে পুনরায় সেই ঘরে প্রবেশ করে যে ঘরে বিমলার পচা গলা শরীর পড়ে রয়েছে। তার আগে সে নীল, তীর্থ আর বীরুকে বিশেষ তিনটে জায়গার কথা বলে দেয় যার মধ্যে যে-কোনো একটি জায়গায় সেই বাচ্চাটির দেহাংশ পুঁতে রাখা আছে। সেই দেহাংশকে এক বিশেষ মন্ত্র পড়ে সৎকার করতে হবে বাউডিহির শ্মশানে তবেই সেই পিশাচের মুক্তি সম্ভব। তাই তারা শিবেনের কথা মেনে চলে যায় রাজবাড়ির তিনদিকে তিনটি বিশেষ স্থানে বাচ্চাটির দেহাংশ খুঁজতে।
এইদিকে শিবেন ঘরের ভেতর ঢুকে বিমলার পচা গলা শরীরটার পাশে এসে কী যেন বিড়বিড় করে বলে আর তারপরেই এক ভয়াল নারকীয় স্বর শুনতে পাওয়া যায়। বিমলার আত্মা! সে মুক্তি চাইছে! কাতর স্বরে আর্জি জানাচ্ছে তার সামনে বসে থাকা পুণ্যাত্মা সাধকটিকে তাকে মুক্ত করার জন্য! তার গলা থেকে নির্গত জান্তব স্বরেই সে বলার চেষ্টা করছে, সে অনুতপ্ত, অনেক বড়ো পাপ করে ফেলেছে সে, এই অবস্থার জন্য সে নিজেই দায়ী। কিন্তু এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করার মতো শক্তি আর নেই তার! সে মুক্তি চায়, মুক্তি!
শিবেন হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বোজে, শুরু করে মন্ত্রোচ্চারণ!
ওইদিকে তীর্থ রাজবাড়ির একদিকে অবস্থিত ভাঙাচোড়া মন্দিরের চারিপাশ যতটা সম্ভব তন্নতন্ন করে খুঁজল কিন্তু যেটা দরকার সেরকম কিছুই হস্তগত হল না তার। নীলও রাজবাড়ির মাঝ বরাবর অবস্থিত কক্ষে চারিপাশ ভালো করে খুঁজেও একরাশ ঝুল আর ধুলোয় জমাটবাঁধা পুরোনো দিনের আসবাবপত্র ছাড়া কিছুই পেল না। অন্যদিকে বীরু গেল রাজবাড়ির পিছনের দিকে। সে বুদ্ধি করে টর্চটা নিজের সাথেই এনেছিল। টর্চের আলোয় সে ভালো করে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে এগোতে শুরু করল। সামনের দিকে বেশ কিছুটা এগিয়েই কিছুর মধ্যে পা পড়তেই একটা আর্তনাদ শোনা গেল। চমকে ওঠে দু পা পিছিয়ে সেইদিকে টর্চ ফেলতেই বীরু দেখলো একটা কালো কুচকুচে কুকুর তার দিকে তাকিয়ে গড়গড় করে আওয়াজ করে যাচ্ছে আর তার মুখে ধরা আছে একটা হাড়, মানুষের হাড়। কুকুরটার চোখে তীব্র আলো পড়তেই সে পালাতে শুরু করল। তাই দেখে বীরু চিৎকার করে নীল আর তীর্থকে ডাকতে থাকে। ওরাও বীরুর চিৎকার শুনে রাজবাড়ির পিছনের দিকে ছুটে যায়।
বীরু বলে ওঠে, “কুকুরটাকে আটকাও, আটকাও। হাড় নিয়ে পালাচ্ছে ব্যাটা!”
পায়ের সামনে একটা পাথর পড়ে থাকতে দেখে নীল সেটাকে তুলে সটান ছুঁড়ে মারল কুকুরটাকে লক্ষ করে। এইবারে কুকুরটাও সেই আচমকা আঘাতে মাটিতে পড়ে কুইকুই করে ডাকতে লাগল। তার পাশে পড়ে থাকা হাড়টা সাথে সাথে এসে তুলে নেয় বীরু। কুকুরটা তখনও ওইভাবেই ডাকছে। বেচারার খুব জোড়েই লেগেছে কিন্তু ওদেরও কিছু করার নেই। কিছুক্ষণ পর ব্যথা কমাতেই কুকুরটা নিজেই উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়।
ওইদিকে বীরুও নীল আর তীর্থকে রাজবাড়ির পিছনের দিকে নিয়ে আসে যেখানে সে দেখেছিল কুকুরটাকে হাড় মুখে নিয়ে। সেখানে ভালো করে দেখতেই একটা জায়গায় মাটি কিছুটা খোঁড়া দেখে ওদের সন্দেহ হয় এবং সেখানে গিয়ে পুরোটা খুঁড়তেই একটা লাল কাপড়ে মুড়ে রাখা কিছু একটা বেরিয়ে আসে। সেটাকে খুলতেই দেখা যায় একটা বাচ্চার হাড়গোড় আর দুটো মাথার খুলি!
সেইগুলো নিয়ে ওরা চলে আসে শিবেনের কাছে। ততক্ষণে সেই জান্তব আওয়াজে কান পাতা দায়। বাইরে দাঁড়িয়েই তারা দেখতে পেল এক অদ্ভুত রক্তের মতো লাল আলোর শিখা বেরিয়ে আসছে বিমলার পচাগলা শরীর ভেদ করে আর তাতেই তার করুণ আর্তনাদও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু সময়ের মধ্যেই সেই আলোক শিখা শিবেনের হাতের তালুতে এসে স্থির হল এবং সাথে সাথে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সেই আলো ধীরে ধীরে মিশে যেতে লাগল শিবেনের শরীরে এবং একটা সময় তার শরীর থেকে একটা লাল আলোর আভা বিচ্ছুরিত হতে শুরু করল, সঙ্গে সঙ্গে বিমলার করুণ আর্তনাদ একটা তীব্র বিকট আওয়াজ করেই থেমে গেল চিরকালের মতো। আর তারপরেই মুহূর্তের মধ্যেই ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ির এক অংশ ধসে পড়ে গেল। ব্যাপারটা এতটাই দ্রুত ঘটল যে ওরা তিনজন জায়গা থেকে নড়তে পর্যন্ত পারল না। এবারে তিনজনেই ভয় পেয়ে সমস্বরে শিবেনকে ডেকে উঠল।
“শিবেন!” “শিবেন দা!”
“আমাদের এখানের কাজ শেষ হয়েছে, এবারে আমাদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে বাউডিহিতে!”
পিছন থেকে চেনা গলার স্বর পেয়ে ঘুরে তাকাল নীল, তীর্থ আর বীরু। সাথে সাথে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল ওরা।
তীর্থ বিস্ময়ে বলে উঠল, “তু... তুমি তো ওখানে ছিলে তাহলে এখানে কী করে...”
শিবেন হালকা হেসে ফেরার পথ ধরে।
নীল তীর্থের হা হয়ে থাকা দেখে বলে, “সত্যিই তুই কি মাঝে মাঝে ভুলে যাস যে উনি শিবশঙ্কর তান্ত্রিক। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ উনি নন! নে মুখটা এবারে বন্ধ কর আর চল!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন