দ্বাবিংশ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

বীরুর বাড়ির কাছাকাছি আসতে আসতেই সন্ধে পেরিয়ে রাত নামল। বাড়িতে আসতেই বীরু দেখল কালীতলার ঠাকুরমশাই মানে পাঞ্চালীর বাবা এসে বসে আছেন। শিবেনকে আসতে দেখেই তিনি বললেন, “আমি আপনাদের সাথে বাউডিহিতে যেতে চাই। যোগেন্দ্রর এমন অবস্থা শোনার পর আমি কিছুতেই শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারছি না। হয়তো আমার মেয়েটাও আর বেঁচে নেই! কিন্তু তা-ও আমি যাব, আমার মেয়ের সাথে কী হয়েছিল তা আমাকে জানতেই হবে!” তার চোখ জলে ভিজে উঠল। শিবেন তার কাঁধে হাত রেখে তাকে আশ্বাসের সুরে বলল, “আমি আপনাকে আটকাব না। অবশ্যই আপনার অধিকার আছে আপনার মেয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার! তবে আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে। রাতের মধ্যে যে করেই হোক বাউডিহিতে পৌঁছাতেই হবে। নাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে!”

বীরু বলে উঠল, “তোমায় চিন্তা করতে হবে না। আমি আগে থেকেই আমার এক বন্ধুকে বলে রেখেছি। ও এক্ষুনি তোমাদের জন্য ভ্যান পাঠাল বলে! ও… ওই তো গদাই এসে গেছে। ওই তোমাদের নিয়ে যাবে বাউডিহিতে। নাও এবারে তোমরা বেরিয়ে পড়ো আর সাবধানে যেও!”

বীরুকে বিদায় জানিয়ে ওরা চারজন উঠে পড়ল ভ্যানে। সকলেরই চোখে মুখে দুশ্চিন্তা খেলা করে বেড়াচ্ছে। শিবেনের কথা মতো আজ মধ্যরাতেই সেই পিশাচের জেগে ওঠার সম্ভাবনা আছে। যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে বাউডিহি গ্রামে মড়ক লেগে যাবে। তখন শিবেনেরও কিছু করার থাকবে না। সেই পিশাচ হবে আগের থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। তবে এত সহজে এটা ভাবলেও বাউডিহিতে পৌঁছানো যে কঠিন হবে তা আর কেউ না বুঝুক শিবেন ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে। তাকে পথে আটকানোর জন্য নানান বাঁধা এসে উপস্থিত হবে। কিন্তু সেটা যে এত তাড়াতাড়ি ঘটবে তা শিবেন সত্যিই আশা করেনি।

গদাই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি ভ্যানটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু হঠাৎই অন্ধকারের মাঝে রাস্তার মধ্যিখানে একটা কালো কুচকুচে বেড়াল এমনভাবে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল যে গদাই বুঝতে না পেরে তার গায়ের ওপরেই দিল ভ্যানটা তুলে। বেড়ালটা চরম আর্তনাদ করে উঠল। অন্যসময় হলে হয়তো ওরা সবাই নীচে নেমে দেখত কিন্তু শিবেনই বারণ করল। কারণ এই মুহূর্তে বাউডিহিতে পৌঁছানো আগে প্রয়োজন।

কিন্তু এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটল আর এক বিপদ। মাঝ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই ভ্যানের ডান চাকা গেল খুলে। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল নীল, তীর্থ, শিবেন আর ঠাকুরমশাই। আর কোনো উপায়ান্তর না দেখে শিবেন হেঁটেই বাউডিহিতে পৌঁছাবে বলে স্থির করল। নীল বা তীর্থকে নিয়ে কোনো অসুবিধা না থাকলেও শিবেনের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল ঠাকুরমশাইকে নিয়ে, তিনি ষাটোর্ধ্ব মানুষ, তার পক্ষে এখন এতটা হেঁটে বাউডিহিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কিন্তু ঠাকুরমশাইয়ের অসীম জেদ ও মনের জোড় দেখে শিবেন আপ্লুত হয়। সে কোনোমতেই এই বিপদ দেখে পিছু হটতে রাজি নয়। অগত্যা চারজনে হেঁটে যাওয়া মনস্থির করে। রাস্তাতে নানান ছোটোখাটো বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় ওদের। কখনও অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, রাস্তা ভুল করে অন্য দিকে চলে যাওয়া, কখনও হঠাৎ চোখের সামনে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হওয়া, একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকে। কিন্তু কোনো কিছুই তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না। অবশেষে একটা সময় পর ওরা এসে উপস্থিত হয় বাউডিহি গ্রামের সীমান্তে। কিন্তু গ্রামের কাছাকাছি আসতেই একটা ব্যাপার বুঝতে পেরে ওরা হতচকিত হয়ে যায়। দূর থেকে অনেক মানুষের সম্মিলিত কোলাহল ভেসে আসছে। কিছুটা এগোতেই ব্যাপারটা ওদের বোধগম্য হয়। নীল হঠাৎ ভয়ার্ত স্বরে বলে ওঠে, “শিবেনদা দেখো জঙ্গলে আগুন লেগেছে!”

শিবেন বিস্ফারিত চোখে তা দেখে বলে, “সর্বনাশ তবে যেটা ভয় পাচ্ছিলাম সেটাই হল শেষমেশ?”

নীল বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, “মা… মানে কী হয়েছে?”

শিবেন গম্ভীরভাবে বলল, “পিশাচ জেগে উঠেছে, এখান থেকে যা বুঝতে পারছি তাতে মনে হচ্ছে সে তার তাণ্ডবলীলা শুরু করেছে! তাড়াতাড়ি চলো!”

গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই ওরা দেখল গ্রামের মানুষ যে যেদিকে পারছে ছুটে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা বাড়িতে আর দূরে জঙ্গলে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় অনেকাংশ দৃশ্যমান হয়েছে। তার মধ্যেই একটা দৃশ্য দেখে তাদের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। বেশ কয়েকটা মুণ্ডহীন ক্ষতবিক্ষত খুবলে খাওয়া দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে নীচে। বাউডিহির অবস্থার কথা জানলেও এই ভয়াবহতা নিজের চোখের সামনে যে এইভাবে প্রকট হয়ে উঠবে তা পাঞ্চালীর বাবা আশা করেননি। তাই তার পাশে দাঁড়ানো নীলের হাতের কবজি ধরে ভয়ে কাঁপতে থাকেন তিনি।

শিবেন এবারে ব্যস্ত হয়ে নীলকে বলে, “নীল, তোমাকে আসার পথে যা যা বুঝিয়ে দিয়েছি তোমার সমস্তটা মনে আছে তো?”

নীল তাকে আশ্বস্ত করে বলে, “হ্যাঁ শিবেনদা মনে আছে!”

শিবেন বলে, “বেশ তবে তুমি আর দেরি না করে এক্ষুনি ওই লাল পুটুলিটা নিয়ে শ্মশানে যাও আর তোমার সাথে ঠাকুরমশাইকেও নিয়ে যাও। উনি এইসব দৃশ্য সহ্য করতে পারবেন না!”

শিবেনের কথা শেষ হওয়া মাত্রই নীল ঠাকুরমশাইকে নিয়ে শ্মশানের দিকে রওনা দিল।

ওইদিকে শিবেনকে দেখতে পেয়ে বীরেন, কমলা আরও কয়েকটা গ্রামের লোক ছুটে আসে তাদের দিকে।

বীরেন বলে ওঠে, “শিবু রে! সর্বনাশ হয়ে গেছে। সেই নরপিশাচ জেগে উঠেছে রে। সবাইকে মেরে তার খিদে মেটাচ্ছে শয়তানটা! তুই কিছু কর রে...”

কথা শেষ হওয়ার আগেই কমলার তীব্র চিৎকারে সবাই সেইদিকে ফিরে তাকায় আর তাকাতেই তাদের শরীরে যেন বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে যায়। তীব্র ভয়ে তারা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। কয়েকজন সেখান থেকে পালিয়ে যায়, “ওরে পালা রে! কমলাকে ধরেছে এবারে, সবাইকে মেরে শেষ করবে ওই পিশাচ, কেউ বাঁচবে না আর!”

তীর্থ শিবেনের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। পিশাচকে পুনরায় নিজের চোখের সামনে দেখতে পেয়ে সেইদিনকার রাতের স্মৃতি ফিরে আসে তার। ভয়ে শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে ওঠে। এবারে হঠাৎ একটা চেনা মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে পায় সে। শিবেনের মুখনিঃসৃত সেই মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি তার খুব চেনা। সেইদিন রাতেও ওরা এই মন্ত্রোচ্চারণই শুনেছিল। সেই মন্ত্রোচ্চারণ শুরু হতেই পিশাচের নজর পড়ল শিবেনের দিকে। কমলাকে তুচ্ছ বস্তুর ন্যায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এবারে সে শিবেনের দিকে এগোতে লাগল। এইবারে শিবেন হঠাৎ তার ত্রিশূল পিশাচের অভিমুখে সরাসরি ধরে চোখ বন্ধ করল এবং পরক্ষণেই তার চোখ খোলার সাথে সাথেই এক তীব্র আলোকরেখা সেই ত্রিশূল থেকে নির্গত হয়ে ঘিরে ফেলল সেই পিশাচকে। সেই জ্বলন্ত চক্রব্যূহে আটকা পড়ে তীব্র গর্জন করতে লাগল নরপিশাচ।

গ্রামবাসীরা ছোটাছুটি বন্ধ করে এই অবাক কাণ্ড চাক্ষুষ করছিল। এবারে তারা দেখল হঠাৎ শিবেনের চারিপাশ থেকে যেন এক লাল আলোর আভা নির্গত হচ্ছে। আলোটা তার শরীরের ভেতর থেকে নির্গত হয়ে ক্রমশই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে এরকম লাল আভা নিঃসৃত সৌম্যকান্তি পুরুষকে দেখে অজান্তেই সবাই কপালে প্রণাম ঠুকল। এইদিকে সেই লাল আভা যত তীব্র হচ্ছে সেই পিশাচের নারকীয় আর্তনাদ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটা সময় সেই লাল আভা প্রবল বেগে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই পিশাচটার ওপর। সকলে নিজের চোখের সামনে দেখতে থাকে কী অদ্ভুতভাবে সেই লাল আভা শিবেনের দেহ থেকে নিঃসৃত হয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিচ্ছে সেই পিশাচকে। তার অজাগতিক আর্তনাদ শুনে ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে প্রত্যেকটা মানুষ। এইদিকে ঠাকুরমশাইকে নিয়ে শ্মশানে পৌঁছে নীল শিবেনের কথামতো সমস্ত কাজ শুরু করে দিয়েছে। দূর থেকে সেই পিশাচের আর্তনাদ শুনতে পেয়ে তাদের হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছে। সেই অমানুষিক পরিবেশেও নিজেকে শক্ত রেখে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করে নীল আর পাঞ্চালীর বাবা। পিশাচের তীব্র গর্জনে ঢাকা পড়ে যায় তাদের মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি।

সেই লাল আলোর ঝটকায় ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল পিশাচটা। তার নারকীয় আর্তনাদ কমে গিয়ে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। একটার পর একটা এরকম মানসিক আঘাতে বিধ্বস্ত বাউডিহির মানুষ যখন ধীরে ধীরে আশার আলোয় আলোকিত হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই এক অপ্রত্যাশিত অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হল সবাই। কোথা থেকে একটা ধারালো ত্রিশূল প্রায় তীব্র বেগে উড়ে এসে গেঁথে যায় শিবেনের বুক বরাবর। একটা আর্তনাদ করে ওঠে প্রায় লুটিয়েই পড়ে সে। সবাই এই ঘটনায় হকচকিয়ে যায়। প্রত্যেকে ছুটে আসে শিবেনকে বাঁচাতে। কিন্তু একটা বীভৎস বিকট অট্টহাসিতে সবাই ওখানেই থমকে যায়। সেই মুহূর্তে সেখানে আর একটা অবয়বের আবির্ভাব ঘটে। যাকে দেখে বাউডিহির প্রত্যেকটা মানুষের গায়ের রোম খাঁড়া হয়ে যায়। সারা শরীর ছাই ভস্মে মাখামাখি, রক্তজবার মতো লালচে চোখ, প্রায় ৭ ফুট উচ্চতার জটাধারী সেই ব্যক্তি, অঘোরী তান্ত্রিক।

এবার তার গনগনে তাচ্ছিল্য ভরা স্বর শোনা যায়, “শিবশঙ্কর তান্ত্রিক! হা হা হা! মহাদেবের আশীর্বাদপ্রাপ্ত শিবশঙ্কর তান্ত্রিক? এইটুকুই তার ক্ষমতা? সব শেষ, সব শেষ করে দিলাম। আমার সাধনায় বাঁধা? ভেবেছিলি আমায় অমরত্ব লাভ থেকে আটকাবি? দেখ এখন। দেখ, দেখ তোরাও দেখ তোদের প্রিয় শিবেনের কী হাল করেছি দেখ!” এই বলেই সে আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

মাটিতে লুটিয়ে থাকা শিবেনের দিকে তাকিয়ে বাউডিহির মানুষগুলো থরথর করে কেঁপে ওঠে। বীরেন বুঝি কাঁদতেও ভুলে গেছে। কিছুক্ষণ শিবেনের দেহটার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে পরক্ষণেই তীব্র ক্রোধে ফেটে পড়ে সে। পাশে পড়ে থাকা শিবেনের ত্রিশূলটা নিয়ে তীব্র বেগে ছুটে যায় অঘোরীর দিকে তাকে সেই ত্রিশূল দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করতে। কিন্তু তার আগেই অঘোরী তার লম্বা হাত দিয়ে বীরেনের টুটি চিপে ধরে, তাকে শূন্যে তুলে ধরে। শ্বাস নিতে না পেরে বীরেন অঘোরীর শক্ত হাতের বাঁধনে ছটফট করতে থাকে। আবার তার ভারী গলার স্বর সবার কর্ণগোচর হয়। “এখনও তেজ যাই না তোদের? তোরা কী ভাবছিস, তোরা বেঁচে যাবি? তোদের প্রত্যেককে আমি শেষ করব। উজার করে দেব বাউডিহি। শিবেনের মতো তোদেরকেও...”, পুরো কথা শেষ করার আগেই একটা তীব্র আর্তনাদ শোনা যায়, বিশাল বড়ো ত্রিশূল এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় অঘোরীর দেহ। প্রবল যন্ত্রণায় লুটিয়ে পরে সে মাটিতে। অঘোরীর লুটিয়ে পড়ার সাথে সাথেই দেখা যায় শিবেনকে। কী আশ্চর্য! কোথায় তার ক্ষতস্থান? রক্তের ছিঁটেফোঁটাও লেগে নেই তার শরীরে। সকলে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে শিবেনের দিকে। পাশে পড়ে বীরেনও হতবাক হয়ে যায় শিবেনকে দেখে।

“ক্ষমতা কী তোর একারই আছে নাকি? আর কী বলছিলি? বাউডিহিকে নিশ্চিহ্ন করে দিবি? আমি থাকতে কিছুতেই তুই তা করতে পারবি না। শিবশঙ্কর তান্ত্রিক মহাদেবের আশীর্বাদপ্রাপ্ত। তুই কেন, কেউ আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার না, আজ তোর শেষ দিন। তোর সৃষ্ট পিশাচের সাথে সাথে তোকেও আমি নরকে পাঠাব। তোর মতো নরপিশাচের স্থান ওটাই! নরকে চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে থাকবি তুই। তোর মুক্তি ঘটবে না। প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়াবি নরকের বুকে। নরকের জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করবি তুই। এই হবে তোর শাস্তি!” এই বলে বীরেন চোখ বন্ধ করে তার ডান হস্ত উপরে প্রসারিত করে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হয় একটা বিশাল খর্গ। সেই খর্গ দিয়ে এক কোঁপে শিবেন আলাদা করে দেয় অঘোরীর দেহ থেকে তার মুণ্ডটি। তারপরেই শোনা যায় এক তীব্র বজ্রপাত। সেই আলোতে সকলের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় তাদের নড়াচড়ার শক্তিটুকুও যেন লোপ পেয়েছে। এবারে তারা চোখ খুলতেই দেখে শিবেনের পায়ের কাছে পরে থাকা রক্তাক্ত অঘোরীর মুণ্ডহীন শরীরটা ধীরে ধীরে একটা কালো ধোঁয়ায় পরিণত হচ্ছে আর সেই ধোঁয়া ক্রমশ ওপরে প্রসারিত হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকে এই অলৌকিক কাণ্ড দেখে যেন কাঠের পুতুলের মতো স্তম্ভিত হয়ে যায়, এবারে শিবেন পড়ে থাকা পিশাচের নারকীয় দেহটার বুক বরাবর তার নিজের ত্রিশূলটা সজোরে গেঁথে দেয় আর সাথে সাথেই খুব কাছেই কোথায় যেন আবার বাজ পড়ে। সবাই অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকায়, সেখানে এখন রাশি রাশি কালো মেঘের সঞ্চার হয়েছে। তীব্র ঘন কালো মেঘের গর্জন শুরু হয়েছে। সেই কালো মেঘের মাঝে হঠাৎ একটা গর্তের সৃষ্টি হয়। সেই গর্ত দেখে মনে হয় তার এমন ক্ষমতা রয়েছে যা সবকিছু নিমেষে শুষে নিতে পারে। সেই ক্ষমতার বলেই হয়তো শিবেনের সামনে পড়ে থাকা পিশাচের দেহটাও অঘোরীর দেহের সাথে একটা বৃহৎ কালো ধোঁয়ায় পরিবর্তিত হয়ে সেই মেঘের গর্তের মধ্যে ঢুকে বিলীন হয়ে যেতে থাকে। কেউই এর আগামাথা কিছুই বুঝতে পারে না। বীরেন আর তীর্থ এসে শিবেনকে জিজ্ঞেস করে, “এইসব কী হচ্ছে, আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”

শিবেন বলে ওঠে, “এই গর্তটা দেখছ, ওটা নরকের দ্বার। এই মুহূর্তে নরকের দ্বার খুলে গিয়েছে! সমস্তটা আমি তোমাদের পড়ে খুলে বলব। এই মুহূর্তে বুঝে নাও যে এই পিশাচের উৎসস্থলের বিলুপ্তি ঘটেছে তাই তাকে চলে যেতে হবে নরকে। তার জন্য নরকের দ্বার খোলা বাঞ্ছনীয়। আর সেই দ্বারই এখন খুলে গেছে!”

ইতিমধ্যে নিজেদের কাজ সেরে ওখানে হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত হয়েছে নীল আর ঠাকুরমশাই। তারাও অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে আকাশের দিকে।

শিবেন খুব আস্তে আস্তে বলে, “এই নরকের দ্বার খুলল বটে কিন্তু এতে আর এক বিপদ এসে উপস্থিত হবে। তা আমি খুব ভালো মতোই অনুভব করতে পারছি!”

তীর্থ বিস্ময়ে বলে ওঠে, “কী বিপদ?”

শিবেন বলে, “সে যাক গিয়ে, সেইসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। তোমরা বরং গ্রামবাসীদের নিয়ে আগুন বেশি ছড়িয়ে যাওয়ার আগে তা নেভানোর ব্যবস্থা করো। আর একটু পরেই ভোরের আলো ফুটবে!”

ওদের কথা শেষ হতেই দেখা যায় আকাশের ঘন কালো মেঘ কখন সরে গিয়ে পুব আকাশে হালকা রঙের ছটা দেখা দিতে শুরু করেছে। অবশেষে এতগুলো দিন পর বাউডিহিতে নৃশংস মৃত্যুলীলা শেষ হয়ে একটা শুভ দিনের শুরু হতে চলেছে।

**********

সকাল হতেই দেখা গেল সবার মেজাজ বেশ ফুরফুরে, এতদিন পরে সবাই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ইতিমধ্যে আগুন নিভিয়ে দেওয়া গেছে। জঙ্গলের কিছুটা অংশ পুড়ে গেছে। কারোর কারোর বাড়িরও একটু ক্ষতি হয়েছে। তবে নৃপতিবাবু আর ওঁর ছেলে যা দয়ালু মানুষ তাতে তাদের একবার বললে সাহায্য করতে একটুও কুণ্ঠা বোধ করবেন না তারা। যারা যারা মারা গেছে তাদেরকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কোথাও একটা স্বস্তির মধ্যেও হালকা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে এখনও। স্বজনহারাদের কান্না। হয়তো এই বাউডিহি সমস্ত বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে গেল, শিবেন তাদের বাঁচিয়ে নিল কিন্তু তাদের প্রিয়জনরা যে চলে গেল না ফেরার দেশে, এই কষ্ট ভুলতে তাদের সময় লাগবে। তবে সময়ের সাথে সাথে যে-কোনো ব্যথাই বিলীন হয়ে যায়। একদিন তারাও সবকিছু ভুলে আবার নতুন করে জীবনযুদ্ধে সামিল হবে।

এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু শিবেনের মুখের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি কাটে না। বীরেন তাকে কারণ জিজ্ঞেস করে, “কী রে, এত উদাস হয়ে আছিস কেন? এখন তো সব ঠিক আছে। কত সুন্দর পরিবেশ এখন। সমস্ত এলাকা আজ এতদিন পরে স্বস্তির আনন্দে মেতে উঠেছে। তুই এত চিন্তার মধ্যে ডুবে আছিস কেন?”

শিবেন বলে, “দুশ্চিন্তার কারণ তো আছেই। যে নরকের দ্বার খুলে গিয়েছিল তার জন্য এক ভয়ানক বিপদ আসতে পারে। প্রতিমুহূর্তে আমি তা অনুভব করতে পারছি। সমস্ত নরকের দ্বার খুলে যাওয়ায় নরক থেকে বিভিন্ন ঋণাত্মক শক্তি যা মোটেই সামান্য শক্তিশালী নয় ভয়ানক শক্তিশালী সেই সমস্ত ঋণাত্মক শক্তি বেরিয়ে আসতে পারে এই পৃথিবীর বুকে। ফলে যে প্রলয়ের সৃষ্টি হবে তার ফল হবে মারাত্মক। বিভিন্ন জায়াগায় ভৌতিক, অলৌকিক, নৃশংস সব ঘটনা ঘটার প্রবণতা দেখা দিতে পারে এবং কত জায়গায় যে এইসব ঘটনা ঘটবে তার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। এইসব কিছুর জন্য দায়ী আমি। কিন্তু বাউডিহিকে বাঁচাতে আমাকে এটা করতেই হতো!”

বীরেন বলল, “চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর ওপর আমার পুরো ভরসা আছে। তুই যেমন ভাবে এটা ঠিক করলি ঠিক সেইভাবে তুই ওইগুলোও ঠিক করে দিবি। ওই খারাপ শক্তিগুলোকে পুনরায় নরকে পাঠিয়ে আবার দ্বার অবরুদ্ধ করে দিতে তুই-ই পারবি, আমি জানি। ওইসব এখন আর এত ভাবিস না!”

শিবেন ওর দাদার কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

বীরেন বলল, “নে এবার একটু বিশ্রাম কর তো। অনেক ধকল গেল তোদের!”

শিবেন বলে উঠল, “আমার কাজ যে এখনও শেষ হয়নি!”

বীরেন তার কুঞ্চিত ভ্রূ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আবার কীসের কাজ, সব তো মিটে গেল!”

শিবেন বলল, “দাঁড়াও দাঁড়াও, আসল নাটক তো এবারে শুরু হবে! ওই দেখো, কে আসছে!”

শিবেনের চোখের ইশারা লক্ষ করে সেইদিকে তাকাতেই বীরেন দেখে শ্রীপতি বাবু তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে নগেন, হারান সবাই রয়েছে। শিবেনের কাছে এসেই তিনি এবং তার চ্যালারাও সবাই মিলে শিবেনকে এক প্রণাম ঠুকল।

নগেন বলে উঠল, “তোমায় যে কী বলে ধন্যবাদ দিই! তোমার কারণেই আমরা এত বড়ো একটা বিপদ দিয়ে মুক্ত হতে পারলাম!”

হারান বলল, “আমি ভেবেছিলাম সত্যিই এই বুঝি শেষ আর বেঁচে ফেরা হবে না! কিন্তু শিবেন আমাদের বাঁচিয়ে নিল!”

শ্রীপতি বলে উঠল, “এই আনন্দেই তোমাকে আমার বাড়িতে আজ দুপুরে খাবারের জন্য নিমন্ত্রণ জানাতে এলাম। কোনো বারণ শুনব না। আসতেই হবে কিন্তু!”

শিবেন একটা চওড়া হাসি হেসে বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আপনি এত কষ্ট করে এসেছেন আমায় নিমন্ত্রণ করতে আর আমি যাব না, এ হতে পারে? আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি ঠিক চলে যাব!”

শিবেনের কথা শুনে শ্রীপতিসহ সকলেই বেশ খুশি হয় এবং টুকটাক কিছু কথা বলে সেখান থেকে প্রস্থান করে। ব্যতিক্রম শুধু বীরেন। সে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকে শিবেনের দিকে! “হ্যাঁ রে এতদিন হল আমার বাড়ি এসছিস তুই, এতদিনে একবারও ভাত মুখে নিলি না আর তুই শ্রীপতিবাবুর বাড়ি যাবি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে?”

শিবেন বলল, “আজ দুপুরটা হতে দাও, সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে!”

শ্রীপতি শিবেনকে দেখে বলে উঠল, “আরে তুমি এসে গেছো। ভেতরে এস!”

শিবেন বলল, “আপনাকে এত ব্যস্ত হতে হবে না! তা বাড়িতে কেউ নেই? আপনি একাই থাকেন নাকি?”

শ্রীপতি বলে, “না না, রামু থাকে তো আমার সাথে। আসলে দুদিন ধরে ওর মেয়ের শরীর একদম ভালো নেই তাই ও আসতে পারছে না। তবে আজকে আমার সাথে নগেন আছে! তুমি ভেতরে দাঁড়িয়ে কেন! এস! দাঁড়াও নগেনকে বলি এক গ্লাস শরবত করে আনতে, বাইরে যা গরম!”

এই বলে শিবেনকে বসিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল শ্রীপতি। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করে শিবেনের পায়ের সামনে প্রায় লুটিয়ে পরে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে রামু।

রামু বলে ওঠে, “আপনি আমার মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দিন, ও ছাড়া আমার এ জগতে আর কেউ নেই!”

শিবেন যেন এই মুহূর্তটার অপেক্ষাই করছিল, সে-ও বলল, “আমি তোমার মেয়েকে বাঁচিয়ে দেব কিন্তু তার বদলে তোমাকে সমস্ত সত্যিটা সকলের সামনে বলতে হবে, রাজি?”

রামুও কাঁদতে কাঁদতে বলে, “হ্যাঁ আমি রাজি!”

এইসময় শ্রীপতি আর নগেন দুজনেই একত্রে ঘরে ঢোকে আর রামুকে দেখেই ওরা একটু চমকে যায়।

“একি রামু তুমি এখানে? তোমার মেয়ে কেমন আছে? এই নাও শিবেন, শরবতটা খেয়ে নাও!”

রামু শ্রীপতির প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। মাথা নীচু করে বসে থাকে। শিবেন বলে, “তার আগে একবার বাইরে চলুন। একটা বোঝাপড়া এখনও বাকি!”

শ্রীপতি একটু অবাক হয়ে বলে, “বোঝাপড়া! কীসের বোঝাপড়া?”

শিবেন বলে, “সেটা বাইরে গেলেই বুঝতে পারবেন!”

এই বলেই সে রামুকে নিয়ে হনহন করে বাইরে বেরিয়ে যায়। শ্রীপতি আর নগেন এক অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, কিছুই তাদের বোধগম্য হয় না। কিন্তু কোনো কথা না বলে তারাও বাইরে বেরিয়ে আসে আর তারপরেই শ্রীপতি চমকে দু-পা পিছিয়ে যায়। বাইরে বেশ বড়ো একটা গ্রামবাসীদের জটলা। কিন্তু যাকে দেখে শ্রীপতি সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে সে সবার সামনেই দাঁড়িয়ে। নৃপতি রায় চৌধুরী। শ্রীপতির একমাত্র দাদা, এই গ্রামের ভূস্বামী।

সবাই জিজ্ঞাস্য চোখে শিবেনের দিকে চেয়ে থাকে। এবারে শিবেন বলতে শুরু করে, “ঠাকুরমশাই মারা যাওয়ার পর আপনারা সবাই পাঞ্চালীকে একঘরে করে দিয়েছিলেন। যে কিনা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণারূপে আপনাদের প্রত্যেককে মায়ের মতো স্নেহ, ভালোবাসা দিয়েছিল তাকেই আপনারা ভুল বুঝলেন। ঠিকমতো দুদিন খেতে পর্যন্ত দিলেন না!”

গ্রামবাসীদের মধ্যেই কেউ একজন বলে উঠল, “মানছি ঠাকুরমশাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু ওই মেয়েমানুষ একদম ভালো চরিত্রির ছিল না গো শিবেন!”

শিবেন দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল, “চুপ করো। নিজেদের স্বার্থ ছাড়া তোমরা আর কিচ্ছু বোঝো না। তোমাদের কি আমি চিনি না? তোমরা ১৫ বছর আগেও এক ছিলে আর এখনও সেই একই আছো। নিজেদের স্বার্থে ঘা পড়ল অমনি নিজেদের আসল রূপ বেরিয়ে পড়ল। অবশ্য যেখানে শ্রীপতির মতো লোকজন থাকে সেখানে তোমাদের মতো লোক থাকাও খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয়!”

এবারে শ্রীপতি বেশ উচ্চস্বরে বললেন, “মানে কী বলতে চাইছ কী তুমি শিবেন?”

শিবেন এবারে চোখের ইশারায় ভীড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলেকে কী যেন একটা বলে আর তা বুঝেই দীপক ওরফে দীপু ও আরও কয়েকজন ছেলেদেরকে গিয়ে সে কীসব বলাবলি করে নিয়ে গেল শ্রীপতিবাবুর বাড়ির পিছনের দিকটায়। তাদেরকে বাড়ির পিছনের দিকে যেতে দেখে শ্রীপতির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, “আরে কী করছ কী? কোথায় যাচ্ছ তোমরা? ওইদিকে যেও না!”

শিবেন বলতে শুরু করল, “সেইদিন রাতে রাকাদের বাড়ি থেকে ফেরার সময় হঠাৎই দীপুর সাথে আমার ধাক্কা লাগে। অত রাতে দীপুকে দেখে তো আমি অবাক। দীপুকে বেশ সাহসী বলতে হয়। যেখানে প্রত্যেকটা মানুষ পিশাচের ভয়ে জবুথবু হয়েছিল সেখানে একা অত রাতে দীপু ওখানে কী করছিল? ওকে জাপ্টে ধরতেই ব্যাটা আসল কথা বলল। ও যখনই সুযোগ পায় শ্রীপতির বাড়িতে উঁকিঝুঁকি মারে। ও নাকি একবার রামুকে জিজ্ঞেস করেছিল, যে রামু সারাদিন এখানে-ওখানে পরিষ্কার করে বেড়ায়, নিজের হাতে বাগানের পরিচর্যা করে, বাড়ির সামনে কেউ ময়লা ফেললেই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে সেখানে শ্রীপতির বাড়ির পিছনের বাগানের গাছপালা যখন মানুষের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে গিয়ে ঝোপ জঙ্গলের আকার নেয় তখন সন্দেহ একটু হয় বই-কি। একদিন উঁকি মারতে গিয়ে রামুর হাতে ধরা পড়ে যায় সে, কিন্তু একটুও ভয় না পেয়ে রামুকে চেপে ধরে। রামুকে বাগানের দিকে নিয়ে যেতে বললে সে কিছুতেই রাজি হয় না। সেদিন শ্রীপতি বাড়ি ছিলেন না। সেই সুযোগে দীপু জোড় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে বাগানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে আর তখনই সে দেখতে পায় একটা জায়গায় বেশ খানিকটা মাটি খোঁড়া আর সেখানে কিছু পচা ফুল, সিঁদুর পড়ে রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো পূজার আচারবিধি করা হয়েছে ওখানে। সেটা দেখেই মনে আরও সন্দেহ হয় দীপুর। গ্রামের লোকেরা খুব ভালো মতোই জানে যে শ্রীপতি বাবুর অত ঠাকুরদেবতায় ভক্তি শ্রদ্ধা নেই, সেখানে তিনি বাড়ির পিছনে পুজো করলেন? তা কেউ জানতেও পারল না?

দীপুকে তখন রামু বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে বার করে দিলেও তারপর থেকেই দীপু শ্রীপতিদের বাড়ির ওপর নজর রাখতে শুরু করে। আর সেই দিন সে একই কাজে সেখানে গিয়েছিল কিন্তু অন্ধকারে বুঝতে না পেরে আমাকে ধাক্কা মেরে দেয় এবং তারপর আমি জোড় করলে পর পুরো কথাটা তাকে খুলে বলে! অনাথ ছেলে, পৃথিবীতে ওর আপন কেউ নেই। তাই নিজের মৃত্যুর পরোয়াও তার নেই! আজ ও না থাকলে সত্যি হয়তো এত বড়ো সত্যিটা কখনওই সামনে আসত না!”

গ্রামবাসীরা এবারে সবিস্ময়ে সমস্বরে বলে ওঠে, “কী কী? কী সেই সত্যি?”

“তোমরা এখনও বুঝতে পারলে না ওই বাগানে কী আছে? ওই বাগানেই পোঁতা আছে পাঞ্চালীর দেহ!”

শেষের কথাটা শুনে হঠাৎ করেই বজ্রপাত হল যেন। বিস্ময় নিয়ে সবাই একে অপরের দিকে চাইতে লাগল। নৃপতির চোখ মুখ দেখলে বোঝা যায় এই মুহূর্তে তার মনের অবস্থাখানা। কিন্তু এবারে হঠাৎই শ্রীপতি বলে, “চুপ করো, কীসব বলছ তুমি? মিথ্যেবাদী, ভণ্ড। তোমাকে আমি ছাড়ব না, তোমার শেষ না দেখে...” কথাটা শেষও করতে পারেন না তিনি তার আগেই তার গালে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দেন নৃপতি। এরই মাঝে দীপু এসে খবর দেয় বাগানে খোঁড়াখুঁড়ি শেষ। সবাই মিলে পিছনে পৌঁছাতেই হকচকিয়ে যায়। সেখানে সত্যিই মাটিতে একটা কঙ্কাল পুঁতে রাখা হয়েছিল এতদিন। একটা তীব্র পচা গন্ধ সেখান থেকে নির্গত হচ্ছে। এবারে রামু আর চুপ থাকতে পারে না, কান্নায় ভেঙে পড়ে, “সেইদিন পাঞ্চালীর কোনো দোষ ছিল না। ঠাকুরমশাই এসে যে দুজনকে পাঞ্চালীর ঘরে দেখেছিলেন সেই দুজন শ্রীপতি বাবু আর নগেন দাই ছিলেন। সেইদিন তিনি ওখানে আর কিছুক্ষণ দাঁড়ালে হয়তো তিনি পাঞ্চালীকে এই ভুলটা বুঝে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতেন না। পাঞ্চালীর কোনো চরিত্রের দোষ ছিল না। বরং তাকে জোড় করেই!” আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে সে, “দুদিন খেতে না পেরে বড়ো দুর্বল হয়ে পড়েছিল পাঞ্চালী। আর সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে শ্রীপতি আর নগেন মিলে ওকে ধর্ষণ করে। সে এই অপমান কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তাই তখনই সে নিজের প্রাণ ত্যাগ করে। রাতের অন্ধকারে তার দেহ নিয়ে এসে এখানে পুঁতে দেয় ওরা আর এই ঘটনাটা কোনোভাবে প্রকাশ জেনে গিয়েছিল। তাই সেদিন রাতে ওর খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয় শ্রীপতিবাবু! আমি সব জেনেও কিছু করতে পারিনি। আমি এক হতভাগ্য পিতা, সব জেনেও নিজের মেয়েকে বাঁচাতে আমি এই পাপিষ্ঠগুলোকে এতদিন সবার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলাম। আজ যখন আমার মেয়েও নেই তখন আর আমার কোনো ভয় নেই, কোনো ভয় নেই!" এই বলে এবারে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

শিবেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রামুর কাছে এগিয়ে যায়, তারপর তার কাঁধ ধরে তাকে উঠতে সাহায্য করে! “বললাম না মানুষ স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না। তুমি যেমন তোমার মেয়ের স্বার্থে এতদিন এদের বাঁচিয়ে এলে আর আজ তোমার মেয়ে নেই বলে ওদের সমস্ত কুকর্ম ফাঁস করে দিলে। পাঞ্চালীর সাথে ঘটা ঘটনা তো তোমার মেয়ের সাথেও হতে পারত কিংবা গ্রামের অন্য মেয়ের সাথেও হতে পারত তখনও কি তুমি চুপ করে থাকতে পারতে? ওইদিকে তাকিয়ে দেখো, সে-ও এক হতভাগ্য পিতা যাকে তার মেয়ের দেহাবশেষ নিজের চোখের সামনে দেখতে হয়। তার এখন কী অবস্থা তা তুমি অনুভব করতে পারছ?” পাঞ্চালীর বাবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে শেষের কথাগুলো বলে ওঠে শিবেন। সে বুঝি কাঁদতেও ভুলে গেছে। স্তব্ধ হয়ে একভাবে চেয়ে আছে মাটিতে পড়ে থাকা পাঞ্চালীর দেহাবশেষের দিকে। রামুও মুখ নীচু করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ একটা চেনা গলার স্বরে “বাবা” শুনতেই সে থতমত খেয়ে যায়। তার মেয়ে মুন্নি এসেছে, তার দিকে তাকিয়ে হাসছে খিলখিল করে। এ কী করে সম্ভব। একটু আগেই তো সে দেখল তার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, শরীরে এতটুকু প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে সে কি স্বপ্ন দেখছে, তবে কি মেয়ের শোকে তার মানসিক বিকারগ্রস্ততা দেখা দিল।

শিবেন বলল, “আমি জানতাম তোমার মেয়ে অসুস্থ ছিল। তুমি পাশের গ্রামে যে কবরেজের থেকে ওষুধ নিতে তার ওষুধ বদলে আমার তৈরি করা একটা ওষুধ রেখে দিই। অবশ্যইই দীপু আমাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করে। এই ওষুধ খাওয়ার ফলে তোমার মেয়ের শরীর আরও খারাপ হতে শুরু করে। কবরেজও হাত তুলে দেয়। ধীরে ধীরে তোমার মেয়ের শরীর মৃত মানুষের মতো ঠান্ডা হয়ে যায় আর তুমি ধরেই নাও যে তোমার মেয়ে মারা গেছে। আমি জানতাম তোমার মেয়ে তোমার ভীষণই দুর্বল একটা জায়গা। সত্যিটা সবার সামনে আনার জন্য আমাকে এটা করতেই হতো। তবে চিন্তা করো না তোমার মেয়ে এখন পুরোপুরি সুস্থ!” শিবেনের কথা শেষ হতেই রামু গিয়ে তার মুন্নিকে জড়িয়ে ধরে। ওইদিকে নৃপতি তার লেঠেলদের শ্রীপতি আর নগেনকে কুঠুরিতে চিরকালের জন্য বন্দি করার আদেশ দিয়ে সবার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেন। পাঞ্চালীর দেহাবশেষ নিয়ে যাওয়া হয় সৎকার করার জন্য। সকলেই অশ্রুসিক্ত চোখে পাঞ্চালীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। কেউ দেখতে না পেলেও শিবেন ঠিকই দেখে দূরে আকাশের দিকে দুটো অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারা শিবেনের দিকে তাকিয়ে একটা কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হাসি জ্ঞাপন করে এবং পরমুহূর্তেই তারা বাতাসে মিলিয়ে যায়। সবকিছু মিটে যেতেই এবারে বীরেন একটা বড়োসড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তীর্থ বলে, “নীল, আজ না একটু মাটন খেতেই হবে। ভাই দেখ, অনেক খাটাখাটুনি গেছে। একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছি। এবারে মাটন না খেলে আমি শুকিয়েই মরে যাব!”

নীল চোখ পাকিয়ে বলে, “তোর হ্যাংলামি আর গেল না!”

সবাই ওদের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল। বীরেন বলে, “তোমার সমস্ত ইচ্ছে পূরণ আমি করব। আজ রাতেই একদম দেশি পাঠার ঝোল, তোমার জন্য স্পেশাল!”

এই শুনে তীর্থ বীরেনকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বলে, “ওহ বীরেনদা তুমি বেস্ট!”

তীর্থের কাণ্ড দেখে পুনরায় হাসির রোল ওঠে সেখানে। তারপর একে একে সকলে মিলে পা বাড়ায় বীরেনের বাড়ির উদ্দেশে।

(সমাপ্ত)

অধ্যায় ২২ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%