চতুর্দশ অধ্যায়

নেহা কর্মকার

দরজায় তীব্র কড়াঘাতের শব্দে চমকে ওঠে কমলা। এখন আবার কে এল। বীরেনের আসার তো কথা নয়। আর আশেপাশের কেউ এখন আসবেও না। ভয়ে ভয়ে আওয়াজ দেয় কমলা, “ক... কে… কে?”

“আমি… আমি বীরেন। শিগগিরই দরজা খোলো!” বীরেনের গলায় আশ্বস্ত হয় কমলা কিন্তু সাথে সাথে সে অবাকও হয় কারণ বীরেন তো রাতে বাড়িতে আসে না। সে যাক গে! তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলে দেয় কমলা। দরজা খুলতেই বীরেন, নীল আর তীর্থ হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢোকে। বীরেন সঙ্গে সঙ্গে দরজার হুড়কোটা তুলে দেয় আর আঁটোসাটো করে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। দুজন অপরিচিত মানুষকে ঘরে ঢুকতে দেখে প্রথমে চমকে ওঠে কমলা। বীরেনের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় সে। বীরেন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে, “সব বলছি, আগে একটু জল দাও!”

কমলা সাথে সাথে রান্নাঘর থেকে জল নিয়ে আসে। জল খেয়ে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বীরেন নীল, তীর্থের পরিচয় থেকে শুরু করে পথে ঘটা সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলে কমলাকে। সমস্তটা শুনে কমলার হাত থরথর করে কাঁপতে থাকে।

“আজকের রাতটা ওরা এখানেই থাক। তুমি রাতের খাবারের আয়োজন করো। আমি ওদের ঘরটা দেখিয়ে দিই!” এই বলে বীরেন নীল আর তীর্থকে তাদের ঘরের দিকে নিয়ে গেল। কমলা ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে ভয় পেয়েছে, ভীষণ ভয়। নাহ বীরেনের কথা শুনে নয়। সে ভয় পেয়েছে তখনই যখন সে দরজা খোলার সাথে সাথেই চকিতে প্রায় বিশ হাত দূরে একটা কালো অবয়বকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। তার চোখ ভুল করেনি। সেটা ওই পিশাচটাই ছিল। ওর নজর পড়েছে তীর্থ দাদাবাবুর ওপর, এবারে ও নিজের শিকার না পাওয়া অব্দি কিছুতেই থামবে না। কমলা কাঁপা কাঁপা হাতে ভগবানের নাম স্মরণ করতে থাকে। তারপর রান্নাঘরের দিকে চলে যায় রাতের খাবারের বন্দোবস্ত করতে।

**********

রাত ৯টার মধ্যেই কমলা ডাল, দুরকম ভাজা, আলু পোস্তর তরকারি সহযোগে গরম গরম ভাত পরিবেশন করে বীরেন, নীল আর তীর্থকে। সেই সন্ধেবেলায় আসা থেকে তীর্থ কোনো কথাই বলছে না। চুপচাপ ঘরে বসেছিল। তার নাস্তিক মনে যে এরকম হঠাৎ করে চরম আঘাত এসে পড়বে তা বোধহয় ও আশা করেনি।

খাবার দেওয়ার সাথে সাথেই নীল ডাল দিয়ে ভালো করে ভাত মেখে মুখে পুরতেই বলে ওঠে, “আহঃ বউদি তোমার রান্নার হাত কিন্তু দারুণ মানতেই হবে!”

“আরে দাদাবাবু আলু পোস্তটা খেয়ে দেখো, ওটা কমলা দারুণ করে!” বীরেন নীলকে বলেই তীর্থের দিকে চায়, সে এখনও অবধি ভাত মুখে নেয়নি, একমনে আঁকিবুঁকি কেটে যাচ্ছে ভাতের মাঝে। বীরেনের দৃষ্টি অনুসরণ করে কমলাও সেইদিকে চায় আর একটু দুঃখের স্বরেই বলে, “তীর্থ দাদাবাবুর মনে হয় রান্না পছন্দ হয়নি!”

এবারে তীর্থ মুখ তুলে চায়, খানিকটা লজ্জা পায় সে। “আরে না না বউদি আসলে সন্ধের ঘটনাটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। কেমন যেন একটা ফিল হচ্ছে তোমাদের বোঝাতে পারছি না। আচ্ছা বীরেনদা তারপর তো বললে না সেই ঠাকুরমশাইয়ের কী হল?”

“সব বলব। আগে তোমরা বরং খেয়ে নাও। তারপরে ঘরে গিয়ে সব...!”

“কোনো দরকার নেই রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকার। না জানি কখন সেই অলুক্ষণে সুর শুরু হয়ে যাবে। ওই সুর কানে একবার গেছে তো মরেছ। তাই বলছি যা কথা বলার সকালে বলবে!” বীরেনের কথা মাঝপথে থামিয়েই কথাগুলো বলে ওঠে কমলা। বীরেনও কমলার সাথ দেয়। কিন্তু নীল যে কিছুটা অবাক হয়েছে তা বোঝা যায়। “অলুক্ষণে সুর? মানে? সে আবার কী?”

নীলের কথা শেষ হতেই তীর্থ বলে, “এটা সেই সুর। আরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসার সময় একটা সুর শুনেই আমি থমকে গিয়েছিলাম। তারপর কীভাবে যেন সেই সুর আমায় আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল। মাথাটা পুরো ঝিমঝিম করছিল, চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না। আর তারপরেই তো সেই কালো অবয়ব…”

“তুমি সেই সুর শুনেছ দাদাবাবু?” তীর্থ বীরেনের বিস্ফারিত চোখ দেখে কিছুটা অবাক হয়।

“হ্যাঁ মানে…”

“সর্বনাশ করেছে। দাদাবাবু এটা তুমি আগে বলোনি কেন? হে ভগবান! শোনো দাদাবাবু রাতে যাই হয়ে যাক, যেই ডাকুক এমনকি যদি আমি বা কমলা কেউ ডাকে কোনো মতেই দরজা খুলবে না। দরকার হলে কানে বালিশ চাপা দিয়ে ঘুমাবে। আর তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। এক্ষুনি শুয়ে পড়বে চলো। আমি জানি তোমাদের এত তাড়াতাড়ি শোয়ার অভ্যেস নেই। কিন্তু কিছু করার নেই। কেন এইসব বলছি তা আমি কাল সকালে বলব তোমাদের!”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেই বীরেন উঠে যায়। নীল আর তীর্থ কিছু বলে না, শুধু একে অপরের দিকে একবার চেয়ে খাওয়ায় মনোনিবেশ করে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%