নেহা কর্মকার
ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে থাকে বাউডিহি গ্রামে। পশ্চিমের আকাশ ক্রমশ কমলা বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই কমলা বর্ণে লালের আভা এসে মিশে জানান দেয় যে সূর্য সম্পূর্ণ অস্ত যেতে শুরু করেছে। এর মানে আর একটি রাত, আর একটা নৃশংস মৃত্যু। গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ এইরকম একটা পরিবেশের জন্য ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করে। আগে যে গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই প্রত্যেকটা বাড়ির তুলসীতলায় গ্রামের মেয়ে বউদের প্রদীপ জ্বালাতে দেখা যেত এখন তারাই সন্ধে নামতে না নামতেই ঘরের দরজায় খিল তুলে দেয়। গ্রামের অজয়দার চায়ের দোকানে এখন আর আগের মতো হারান খুড়ো, নগেন খুড়োদের চায়ের আড্ডাও বসে না। সন্ধের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই মাঝিরা নৌকা ঘাটে বেঁধেই যে যার বাড়ির দিকে ছুট দেয়। সবাই প্রাণ যাওয়ার ভয়ে ভীত। গ্রামের আকাশে আর আগের মতো রংবেরঙের পাখি উড়তে দেখা যায় না, যেন হঠাৎ করেই তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষ আগে ঝিঁঝি পোকার একঘেয়েমি ডাকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ত, কুকুরগুলোর আচমকা চিৎকারে তিতিবিরক্ত হয়ে মাঝরাতেই তাদের তাড়াতে উদ্যত হতো, সেইসব হঠাৎই সব উবে গেছে। কোনো ঝিঁঝি পোকার ডাক নেই, রাতচড়া পাখির কর্কশ চিৎকার নেই, কুকুর বা বিড়াল কোনো প্রাণীর টু শব্দটুকুও নেই। পুরো গ্রামটা আস্তে আস্তে নিঃশব্দের অন্ধকারে ডুবে গেছে। এই নিঃশব্দই গ্রামের মানুষের কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের। এই নিঃশব্দের মাঝেই হয়তো হঠাৎই বেজে উঠবে সেই পৈশাচিক সুর। আবার কেউ শিকার হবে ওই প্রেতের হাতে।
রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়।
প্রকাশ, মহেন, হারান, নগেন কেউই আজ বাড়ি ফেরে না। বলা ভালো শ্রীপতিবাবুই কাউকে আর ফিরতে দেন না। তিনি একা মানুষ। একাই থাকেন এই একতলা বাড়িতে। সঙ্গে থাকে রামু নামের একজন বয়স্ক কাজের লোক।
হারান ও নগেন দুভাই। কেউই বিয়ে করেনি। তাই বাড়ির প্রতি টান বিশেষ নেই। মহেনের স্ত্রীও মারা গেছে তা প্রায় ৫-৬ বছর হল। তার বাড়িতে আছে তার ছেলে, ছেলের বউ আর ৬ বছরের এক নাতি। ভরা সংসার হলেও ছেলে বা ছেলের বউ কেউই তেমন পোছে না মহেনকে তাই মহেনেরও বাড়ির প্রতি টান বিশেষ নেই। শুধু নাতির সাথেই একটু যা ভালো সম্পর্ক। নাতি তো দাদু বলতে অজ্ঞান। কিন্তু তার মায়ের জন্য এখন চাইলেও দাদু বা নাতি কেউই আর কাছাকাছি আসতে পারে না। প্রকাশ এদের থেকে বয়সে একটু ছোটো। বয়স এখনও ৫০-এর কোঠা পার করেনি। তবে তার শারীরিক গঠনের জন্য তাকে খানিকটা বেশি বয়স্কই দেখায়। বাড়িতে তার মা, বউ আছে। তবে চিরকালই তার একটা বাউন্ডুলে স্বভাব। প্রকাশের মা ভেবেছিলেন হয়তো বিয়ে দিলে ছেলে ঠিক হবে, কিন্তু হয়েছে পুরো তার উল্টো। বিয়ে দেওয়ার পর প্রকাশের বাউন্ডুলামি আরও বেড়ে গিয়েছিল। অনেকে অনেক ভাবে বুঝিয়েছে কোনো লাভ হয়নি। অবশেষে সবাই হাল ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে প্রকাশের এই স্বভাব নিয়েই তাকে সবাই মেনে নেয়।
সকালের ওই বীভৎস দেহ দেখার পর কেউই আর ঠিকমতো খেতে পারেনি। এখন রামু এসে এক গামলা মুড়ি তেল, লঙ্কা, পেঁয়াজ দিয়ে ভালো করে মেখে ওদের দিয়ে গেল। দুপুরের দিকে ওরা সবাই এসে জড়ো হয়েছিল শ্রীপতিবাবুর বাড়িতে। আগে পরিস্থিতি ঠিক ছিল যখন তখন রোজ গ্রামের পুরোনো বটতলায় পাঁচ মাথা এক হতো। কিন্তু বহুকাল সেসব এখন বন্ধ। তাই অগত্যা শ্রীপতিবাবুর বাড়ির বৈঠকখানাই তাদের জন্য মনোনীত হল। তা ছাড়া পরপর এরম ঘটনায় সকলেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আছে তাই ঘরে একা থাকার চেয়ে সবাই একসাথে থাকলেই বিপদ কম মনে করেই এই সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া এই নিয়ে আলোচনারও প্রয়োজন, এরকম তো আর চলতে দেওয়া যায় না।
গামলা থেকে একদলা মুড়ি তুলে নিয়ে মুখে পুরে প্রথম কথা শুরু করল মহেন।
“ছোটোবেলায় মা-ঠাকুমাদের মুখে কত প্রেত পিশাচের গল্প শুনেছি। তখন সব হেসে উড়িয়ে দিতাম, ভাবতাম সব গল্পকথা। তখন কি আর বুঝেছিলাম? একদিন সেই গল্পই বাস্তবে ঘটবে!”
“শোনো ভায়া বাস্তবে কোনো ঘটনা যদি নাই ঘটে তবে গল্পই বা সৃষ্টি হল কোথা থেকে?” মুড়ি চিবোতে চিবোতে বলে ওঠে হারান, “আমাদের মা-ঠাকুমারা তো আর এমনি এমনি গল্প বলত না, নিশ্চয়ই সেরকম ঘটনা ঘটেছিল বলেই তারা বলতে পারত আর এখন তো নিজের চোখের সামনেই প্রমাণ পেয়ে যাচ্ছ যে প্রেত পিশাচ শুধু গল্পই নয় বাস্তবও বটে!”
“হুম সবই তো বুঝলাম কিন্তু আমি যা জানি, এই প্রেত পিশাচ তো আর নিজে থেকে আসতে পারে না যতক্ষণ না তাকে আহ্বান করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই কাজটা করল কে? আমাদের গ্রামে তো কেউ তন্ত্রমন্ত্র জানে বলে তো আমার মনে হয় না!” চিন্তামগ্ন মুখে কথাগুলো বলে ওঠেন শ্রীপতিবাবু।
“একজন কিন্তু ছিল যে তন্ত্রমন্ত্রের ব্যাপারে জানত!” নগেনের কথায় বৈঠকখানায় উপস্থিত সবাই চমকে ওঠে। শ্রীপতিবাবুর ভ্রূ জোড়া কিছুটা কুঞ্চিত হয়। হারান নগেনের কথা শুনে বলে, “তুই কার কথা বলতে চাইছিস বল তো? বীরেনের ভাই?”
নগেন ধীরে ধীরে ওপর নীচে মাথা দোলায়।
“কিন্তু সে গ্রাম ছেড়ে গেছে তা আজ প্রায় ১৫-১৬ বছর হতে চলল! এত বছর পর সে এইসব করতে যাবে কেন? চাইলে তো সে অনেক আগেই করতে পারত। না না আমার মনে হয় না এটা ঠিক!” শ্রীপতিবাবুর কথায় হারান, মহেন দুজনেই সায় দেয়।
“আহা তোমরা বুঝতে পারছ না! মানুষের প্রতিশোধস্পৃহা বেড়ে গেলে মানুষ হেন কোনো কাজ নেই যে করতে পারে না, তা ছাড়া ও যখন গ্রাম ছেড়ে যায় তখন ও নিতান্তই ছোটো। হতেই তো পারে এতগুলো বছর সাধনা করে নিজের শক্তি বাড়িয়ে এইসব কাণ্ডকারখানা করছে, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য!”
নগেনের কথার পরিপ্রেক্ষিতে এবারে শ্রীপতিবাবু কিছু বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু তার মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়েই প্রকাশ বলল, “প্রতিশোধ! কীসের প্রতিশোধ? মনে করে দেখো নগেনদা বীরেনের ভাই কিন্তু নিজের ইচ্ছাতেই বাড়ি, গ্রাম সব ত্যাগ করেছিল। ওকে কোনোরকম কোনো জোড় করা হয়নি। ও নিজের ইচ্ছাতেই চলে গিয়েছিল কারণ বীরেন ওর ওই সাধু সন্ন্যাসীদের সাথে মেলামেশা, তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে মেতে থাকা পছন্দ করত না। তাই সে গ্রাম ছেড়েছিল!”
“ঠিক তাই, আমিও এটাই বলতে যাচ্ছিলাম। নাহ নাহ আমার মনে হচ্ছে না এইসবের পেছনে বীরেনের ভাইয়ের কোনো হাত আছে। বরং আমার তো মনে হচ্ছে...”
“আমারও তাই মনে হচ্ছে!”
শ্রীপতিবাবুর কথার মাঝেই আবার বলে ওঠে প্রকাশ।
বাদবাকিরা কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
শ্রীপতিবাবু প্রকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। প্রকাশ বলে, “এইসমস্ত ঘটনা কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকেই ঘটছে যেদিন ওই ঠাকুরমশাই গলায় দড়ি দিয়েছিলেন। মনে করে দেখ। যেইদিন সকালে আমরা ঠাকুরমশাইয়ের ঝুলন্ত দেহ পাই তার দুদিন পর রাতেই প্রথম ভবাপাগলার মৃত্যু হয়!”
“তার মানে তুমি কী বলতে চাইছ? ঠাকুরমশাইয়ের আত্মাই কি তবে ফিরে এল তার অপমানের প্রতিশোধ নিতে?” কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্নগুলো করে মহেন। প্রকাশ একটা ছোটো দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “হতেই পারে ওঁর আত্মা কোনো দোষ পেয়ে ভয়ানক পিশাচে পরিণত হয়েছে। আমি ছোটোবেলায় মামার বাড়িতে এক ঠাকুরমশাইয়ের কাছে এরকম শুনেছিলাম। কোনো নির্দিষ্ট তিথিতে অপঘাতে মারা গেলে সেই মৃতদেহের আত্মা নাকি দোষ পায়, তখন জন্ম হয় বিদেহী পিশাচের!” প্রকাশের কথায় নগেন বাদে সক্কলেই একটু চমকে ওঠে। শুধু নগেন বলে, “আরে থামো তো ভাই! যত্তসব গালগল্প! ওই কালীতলার ঠাকুরমশাই একটা ভণ্ড লোক ছিল। উনি যদি ওই পাপ কাজ না করতেন তবে কি কেউ তাকে কিছু বলতে পারত? হুহ নিজে যত ভুলভাল কাজ করবে আর কেউ কিছু বলতেও পারবে না। শোনো ভায়া তাকে যেটুকু কড়া কথা বলা উচিত ছিল সেইটুকুই বলা হয়েছিল, এখন যদি তিনি সেটা সহ্য করতে না পেরে নিজের অপমান মনে করে গলায় দড়ি দেয় তাহলে তো তাতে আমাদের কোনো দোষ নেই!” বেশ রাগত স্বরেই কথাগুলো বলে ওঠে নগেন।
“কিন্তু সেইদিন ওঁকে একটু বেশিই অপমান করা হয়ে গিয়েছিল, এতটা না হলেই বরং ভালো হতো। আমাদের আর একটু যাচাই করে দেখা উচিত ছিল!” খুব ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে ওঠে প্রকাশ।
“মানে তুমি কী বলতে চাইছ, এই সব কিছুই আমাদের জন্য হয়েছে?” এবারে বেশ উচ্চ কণ্ঠে কথাগুলো বলে ওঠে নগেন।
শ্রীপতিবাবু পরিস্থিতি গম্ভীর বুঝে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বলেন, “আহা যা হয়ে গেছে তা তো আর আমরা বদলাতে পারব না। বরং এখন যে সমস্ত ঘটনাগুলো ঘটছে তার একটা সমাধান খুঁজে বার করতে হবে। এই মহেন তুমি বলছিলে না তোমার কোন চেনা এক গুনিন না কে আছে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ তারক গুনিন। পাশের গ্রামেই থাকে। শুনেছি ওঁর নাকি বেশ নাম। আমার মনে হয় উনিই এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারেন!”
“বেশ বেশ তবে তুমি কালই একবার ওঁর কাছে যাও, দরকার পড়লে আমাকেও ডেকে নেবে। একসাথেই যাব না হয়। গিয়ে কথা বলে ওঁকে কালই এই গ্রামে আনার ব্যবস্থা করতে হবে!”
ওদের আলোচনার মাঝখানেই রামু এসে বলে যায় রাতের খাবার তৈরি। কথায় কথায় যে কখন রাত নেমে গেছে তা কেউ টেরই পায়নি।
“চলো তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়বে চলো, রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকার দরকার নেই। না জানি কখন সেই সর্বনেশে পিশাচ এসে হাজির হয়! কাল ভোরের আলো ফুটলেই পাশের গ্রামে রওনা দিতে হবে”, শ্রীপতিবাবু মহেন, নগেন, হারান আর প্রকাশকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলে ওঠে।
প্রকাশ বাদে শ্রীপতিবাবুর কথায় সায় দিয়ে সবাই উঠে দাঁড়ায়। প্রকাশ সবাইকে খেয়ে নিতে বলে, সে আর শ্রীপতিবাবু একসাথে বসবে খেতে। তার কথা শুনে হারান, নগেন আর মহেন খেতে চলে যায়।
বৈঠকখানায় এখন চুপচাপ বসে আছে শ্রীপতি আর প্রকাশ। হ্যারিকেনের হলদেটে আলোয় দেওয়ালে তাদের ছায়া দুটো তিরতির করে কাঁপছে। গ্রামে বিদ্যুৎ এলেও বেশিরভাগ সময়ই এখানে কারেন্ট থাকে না। তাই হ্যারিকেনই একমাত্র ভরসা।
শ্রীপতিবাবু বেশ কিছুক্ষণ ধরে কিছু নিয়ে একটা চিন্তা করছিলেন। কী মনে হতেই তিনি হঠাৎ মাথা তুলে তাকালেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলেন। প্রকাশ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কী যেন ছিল সেই দৃষ্টিতে, দেখেই শ্রীপতিবাবু চমকে উঠলেন। হ্যারিকেনের আলো আগের থেকে অনেকটাই কমে এসেছিল, আর তার মধ্যে প্রকাশ যেদিকটা বসে ছিল সেদিকটায় আলো কিছুটা কমই পড়েছিল। তাই আলো আঁধারির একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল সেখানটায়। সেই আলো আঁধারিতেই প্রকাশের চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছিল। যে-কোনো মানুষই হঠাৎ করে ওরকম দেখলে চমকে উঠতে বাধ্য।
এবারে বেশ একটা অস্বস্তি বোধ হতে লাগল শ্রীপতিবাবুর। প্রকাশের দৃষ্টি যেন শ্রীপতিবাবুকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে চাইছে। যেন খুব সন্তর্পণে মনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমস্ত কথাগুলো এক এক করে পড়ে নিচ্ছে সে। এত অস্বাভাবিক কেন ঠেকছে তার? তবে প্রকাশ কি কিছু আন্দাজ করল?
“কী হল শ্রীপতিদা? কী ভাবছেন এত?” প্রকাশের গম্ভীর গলা শুনে চমকে উঠলেন শ্রীপতি।
“কই… কী… ক... কী নি…য়ে আর ভাব…ভাবব, কিছুই না!” শ্রীপতিবাবুর কথাগুলো আটকে আটকে যায়। হঠাৎই তার প্রকাশকে ভয় লাগতে শুরু করেছে, সে কি কিছু জানে তার কুকীর্তির কথা? “সর্বনাশ! যদি সে সব কিছু ফাঁস করে দেয়। না না আগে তাকে বুঝতে হবে প্রকাশ কতটা জানে! হয়তো কিছুই জানে না। শুধু শুধুই…” গোপনে কথাগুলো মনে মনে একবার ভেবে নেয় শ্রীপতি। তাকে ওইভাবে ভাবলেশহীন মুখে বসে থাকতে দেখে প্রকাশের মুখে একটা বাঁকা হাসির রেখা ফুটে যায়। ঘরের উত্তর দিকের জানলা দিয়ে একটা বেশ মন ভালো করা শীতল হাওয়া ভেসে আসছিল অনেকক্ষণ ধরেই। তাই এই লোডশেডিং হলেও হাতপাখার দরকার পড়ছিল না। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর হাওয়ায় ঘরের ভেতর একটা ঠান্ডা আমেজ এমনিই সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে হঠাৎ করেই শ্রীপতির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের রেখা ফুটে ওঠে। কী বলবে সে বুঝতে পায় না, ক্রমশই ঢোক গিলতে থাকে। শ্রীপতির এই অবস্থা দেখে প্রকাশের মুখের হাসি আরও কিছুটা চওড়া হয়।
“ঠাকুরমশাই গলায় দড়ি দেওয়ার পর রাতারাতি কেমন পাঞ্চালীও উধাও হয়ে গেল। খুঁজেই পাওয়া গেল না তাকে, তাই না শ্রীপতিদা?” শ্রীপতির দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে কথাগুলো বলে ওঠে প্রকাশ।
প্রকাশের মুখে পাঞ্চালীর নামটা শুনেই শ্রীপতির বুকটা ধড়াস করে ওঠে। “যা আন্দাজ করেছিলাম ঠিক তাই, প্রকাশ কিছু একটা জানে! কিন্তু কী করে, তবে কি সেইদিন রাতে সে কি কিছু দেখেছিল? না না সে কী করে সম্ভব!” মনে মনে কথাগুলো ভাবে শ্রীপতি। কিন্তু প্রকাশের সম্মুখে এক মুহূর্তের জন্য বিচলিত না হয়ে তিনি বলেন, “সে কোথায় গেছে তা আমি কী করে জানব? দেখো গিয়ে সেও কোথাও গিয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে কিনা? স্বামীর মৃত্যু শোক হয়তো তার সহ্য হয়নি। কিংবা দেখো গিয়ে কারোর সাথে পালিয়েও যেতে পারে, যার স্বামী অমন অপকর্ম করতে পারে তার স্ত্রীর চরিত্র আদৌ ঠিক কিনা তা নিয়ে আমার বেশ সন্দেহ আছে!” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় শ্রীপতি। প্রকাশকে দেখে মনে হয় সেও একটু বিচলিত হয়ে পড়েছে, হয়তো এত তাড়াতাড়ি এত স্পষ্ট জবাব সে আশা করেনি শ্রীপতিবাবুর থেকে। প্রকাশ হয়তো আরও কিছু বলতে যেত কিন্তু তার আগেই ঘরে রামু এসে জানিয়ে যায় যে সবার খাওয়া শেষ এবারে শ্রীপতি আর প্রকাশ খেয়ে নিলেই হয়ে যাবে। শ্রীপতি যেন মনে মনে এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিলেন, কী করে প্রকাশকে এড়ানো যায়। সে সুযোগ রামু এনে দেওয়াতেই সে সঙ্গে সঙ্গে বলে, “রামু তুমি যাও, প্রকাশ আর তুমি একসাথে খেয়ে নাও। আজ আমি আর কিছু খাব না, শরীরটা ভালো লাগছে না!”
রামু তার মালিকের কথা শুনে ছুটে আসার আগেই শ্রীপতি হাত তুলে তাকে সান্ত্বনা দেয় যে সে ঠিক আছে, তার এত উতলা হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তারপর প্রকাশের দিকে ফিরে তাকে একটা লম্বা চওড়া হাসি দিয়ে, খেয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে শ্রীপতি নিজের ঘরের দিকে রওনা দেয়। বলা ভালো পালিয়ে যায়। সে চলে গেলে পরে রামু প্রকাশকে তাড়াতাড়ি এসে খেয়ে নেওয়ার অনুরোধ করে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। ফাঁকা ঘরে হ্যারিকেনের হালকা আলোয় একলা বসে প্রকাশ রাগে ফুঁসতে থাকে। সে খুব ভালো মতোই জানে যে শ্রীপতি কী অপকর্মটাই না করেছেন! শুধুমাত্র প্রমাণের অভাবে সে কিছু বলতে বা করতে পারছে না। শ্রীপতিবাবুর বাড়িতে আসার কারণই তার এই গোপন রহস্যটা জানা, নাহলে এই নিকৃষ্ট মনের মানুষের বাড়িতে আসার তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। সে চটপট উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সে লক্ষও করে না যে ঘরের বাইরে আড়ালে দাঁড়িয়ে খুব সন্তর্পণে কেউ তার সমস্ত ভাবভঙ্গি লক্ষ করছিল। প্রকাশ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সেই অবয়বও ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন